সোমবার, ২৪ মে, ২০২১
সম্পাদকের কথা
প্রথা ভেঙে এই সংখ্যাটি কয়েকদিন আগেই প্রকাশিত হল। ইয়াসের ভ্রুকুটি যেভাবে আমাদের মনে ত্রাস সঞ্চার করেছে তাতে ইয়াস পরবর্তীতে কতখানি দ্রুততার সঙ্গে সবকিছু সামলে ওঠা যাবে জানি না। একের পর এক কালান্তক ব্যাধি ইতিমধ্যেই আমাদের দুয়ারে দুয়ারে হানা দিয়েছে।অনেক ক্ষেত্রেই আমরা ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলেছি। একমাত্র বেঁচে থাকা ছাড়া এই মুহূর্তে আর কিছুই জরুরী নয় আমাদের কাছে। আবেগে ভেসে যাওয়া কাগজের নৌকার মতো আমরা অনেকেই আমাদের চিন্তা ভাবনা পেশা ও নেশাকে ভাসিয়ে দিয়েছি। স্বার্থপরতা ও মানবিকতার সংঘাতে মানবিকতাই এখন আশ্রয়হীন। তবু জানি জীবনের জয় হবেই। জীবন...জীবন...
রবিবার, ২৩ মে, ২০২১
গদ্য ।। পার্থজিৎ চন্দ
‘পঞ্চায়েতের নিকট চৌকিদারের আর্জি’ ও তারাপদ রায়ের কবিতা
‘Comrades,’ he said, ‘here is a point that must be settled. The wild creatures, such as rats and rabbits – are they our friend or our enemies? Let us put it to the vote. I propose this question to the meeting: Are rats comrades?’
The vote was taken at once, and it was agreed by an overwhelming majority that rats were comrades. There were only four dissentients, the three dogs and the cat, who was afterwards discovered to have voted on both sides.
(Animal Farm/George Orwell)
জর্জ অরওয়েলের আদ্যন্ত রাজনৈতিক এই উপন্যাসটি বারবার পড়ি। পড়ি কারণ এই লেখাটির ছত্রে ছত্রে লুকিয়ে রয়েছে ‘অসম্ভব বেদনার’ সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকা অমোঘ আমোদ বা অসম্ভব আমোদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকা অমোঘ বেদনা।
আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমাদের ভাষায় (সম্ভবত ‘রেঁনেসা’ নামক এক ঘটনার কারণেই কিছুটা) ছদ্মগাম্ভীর্যের মুখোশটিকে কিছুতেই খুলে ফেলা গেল না। বিশেষ করে ঊনবিংশ শতাব্দীর পর থেকে সেটি এক কালান্তক ব্যাধি হয়ে রইল, চিনের প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। কিছুতেই সে প্রবেশ করতে দিল না অন্য প্রবণতাকে। এক-দু’জন ঈশ্বর গুপ্ত জন্মালেন, দাদাঠাকুর জন্মালেন। ঈশ্বর গুপ্ত-কৃত সাহিত্যের হয়তো সু-উচ্চ সাহিত্য মূল্য নেই, ‘মেনে নেওয়া গেল’ অনেক দূর পর্যন্ত। কিন্তু কবিতার ক্ষেত্রে, এতদূর হেঁটে চলে আসা বাংলা ভাষার দিকে তাকিয়ে বেশ অবাকই লাগে। তার যাবতীয় ভাঙচুর শাস্ত্রবিরোধীতা থেকে শুরু করে দিন-বদলের কাব্য – সবই সীমাবদ্ধ হয়ে রইল ওই ঘুরে-ফিরে চলা একটি-দুটি ডিকশনের মধ্যে। অথচ চর্যাপদ থেকে শুরু করে রেঁনেসা-পূর্ব বাংলা কবিতার মধ্যে এই প্রবণতা প্রায় ছিলই না। ছদ্ম-ভাষার মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া এক sobriety হয়ে উঠল আমাদের ভাষার মৌল-লক্ষণ। অনেকাংশে এটি ইউরোপের অবদান।
এই ধাঁচ ভেঙে বেরিয়ে আসার কিছু উদাহরণ তবুও গদ্যের ক্ষেত্রে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু কবিতার ক্ষেত্রে ব্যাপারটি প্রায় অপরিবর্তনীয় থেকে গেল। জীবনানন্দ-পরবর্তী সময়ে সেটি হয়ে দাঁড়াল বেশ মজার। বাহ্যিক কিছু আলগা-খড়’কে ধরে যারা টান মারলেন তাদের বেশ প্রথা-বিরোধী ও ভাষাকে আক্রমণ করে ছিন্নবিছিন্ন করে দেওয়া কবি বলে মাণ্যতা দেওয়া হল। কিন্তু আজ পিছনের দিকে তাকালে অবাক হয়ে যেতে হয়। অন্তত এই একটা প্রশ্নে তারা চিরাচরিত – সবাই গম্ভীর এক ভাষায় কথা বলে গেলেন। শেষ পর্যন্ত তাদের বেশিরভাগই ঘুরেফিরে ভাষার মূল কাঠামোটি অক্ষুন্ন রেখে তার ‘গাম্ভীর্য’কে অক্ষুন্ন রেখে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি শব্দ ও প্রকরণ প্রয়োগের দিকে ধ্যা্ন দিলেন। যাবতীয় ভাঙচুর ওই পরিসরেই থেমে গেল।
ঠিক এই জায়গায় এসে তারপদ রায়’কে অসামান্য বলে মনে হয়। তিনি এমন এক পবিত্র-পাইরেট যিনি তাঁর সমস্ত মেধা ও ক্ষমতা নিয়ে ‘গাম্ভীর্যের ভারে এক ডুবো-ভাষার এক ডুবো-জাহাজের খোলের মধ্যে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। তুলে এনেছিলেন অসামান্য সব রত্ন। এবং সেগুলিকে যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন এক রত্নদ্বীপে, ভবিষ্যত-পাঠকের জন্য।
কবির ভবিষ্যত এমনই, আজ তা্রাপদ আবিষ্কৃত হচ্ছেন নতুন করে। তরুণ কবিরা ফিরে পড়ছে তাঁর লেখা। বাংলা কবিতা অন্তত একটি ক্ষেত্রে একটু একটু করে শাপমুক্ত হচ্ছে তাঁরই হাত ধরে। এর থেকে বড় বেঁচে ওঠা একজন কবির ক্ষেত্রে আর কিছুই হতে পারে না।
২
তারপদ রায় একটু মন দিয়ে পড়লে দেখা যাবে, তাঁর কবিতার দর্শনগত ভিত্তিটি বেশ জটিল। এখানে অনেক পাঠক ভুল বুঝতে পারেন, তাঁর কবিতা ‘জলের মতো সহজ’ মনে হলেও দর্শনগত ভিত্তির কথা বলা হচ্ছে এখানে। এই বাংলার এক বড় অংশের চিন্তক ও সমালোচক শিল্পের মূল্যা্য়নের ক্ষেত্রে ‘হিস্টোরিসিজম’-এর বাইরে বেরুতে পারলেন না। এই যে ‘ইজম’দিকে কবিতার ক্ষেত্রটিকে এক কাল্পনিক ও অশ্লীল সীমারেখায় বেঁধে দেওয়া, এটিও সম্পূর্ণ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে গত দুই শতাব্দীতে। কবিতা-লেখকেরাও দ্রুত এই জিনিসটি বুঝে যান ও তাদের কলমে বারবার লিখিত হতে থাকে সেই কবিতা যা এই ধারণাকে জাস্টিফ্যাই করে। Homo Faber থেকে Homo Aestheiticus হয়ে ওঠার মসৃণ জার্নিটুকু ছাড়া যেন আর কিছুই নেই ও ছিল না পৃথিবীতে। এমনই এক মৌলবাদী ধারণা গড়ে উঠেছে আমাদের অনেকের। এই মৌলবাদ অনেক সময়ে জন্ম দিয়েছে আরেক মৌলবাদের, সেখানে আবার জীবনের প্রত্ন-ছায়াপাত ছাড়া আর কিছুকেই শিল্পের উপকরণ হিসাবে গণ্য করা হয়নি।
তারপদ রায় এই দুই-প্রবণতার বিরুদ্ধে যে খুব কালাপাহাড়ী বিদ্রোহ চালিয়ে ছিলেন তা নয়; তিনি এই দুই প্রবণতা সম্পর্কে অতিশয় সচেতন ছিলেন অবশ্যই। ছিলেন বলেই, অনেকটা কৌশলগত কারণে হয়তো বেছে নিয়েছিলেন এক অপেক্ষাকৃত কম ব্যবহৃত অ্যভেনিউ। এটিই তাঁকে স্বাধীনতা দিয়েছে সব থেকে বেশি।
তারপদ’র পুনরুক্তি নেই।
তারাপদ’র ভাবালুতা নেই।
তারাপদ’র নিছক ‘বাক-নির্মিতির’ প্রচেষ্টা ছিল না।
অনেকেই বলে থাকেন তারাপদ’র কবিতার মূল উপকরণ শ্লেষ ও হিউমার। এটি অংশত মানা গেলেও সর্বাংশে সঠিক নয়। তারাপদ’র কবিতায় সব থেকে বেশি আছে এক মায়াচ্ছন্নতা ও আধুনিক মানুষের খণ্ডিত অস্তিত্ত্বের যন্ত্রণা। নিজেকে ‘হাসির উপকরণ’ করে তোলা আধুনিক শিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা। তারপদও তাই করেছেন,
‘দাঁতাল শুয়োর দিয়ে খেলা করা,
একমাত্র তোমাকেই তোমাকে মানায়,
বদ্ধঘরে মুখোমুখি চকচকে আয়নায়
নিজের ছায়ার সামনে পরিতৃপ্ত তারাপদ রায়।‘ (একমাত্র তোমাকেই)
-এই চারলাইনের কবিতাটি যতবার পড়েছি মনে হয়েছে এক ক্যানভাসের কথা। রঙ-তুলি হাতে বসে রয়েছেন এক শিল্পী। ক্যানভাসের মধ্যে দুমড়ে-মুচড়ে গলে যাচ্ছে ঘড়ি ও সময়। ক্যানভাসের মধ্যে একবার ঢুকে পড়ছেন ও বেরিয়ে আসছেন পেইন্টার। ক্যানভাসের মধ্যে ফুটে ওঠা পেইন্টার ও ক্যানভাসটিকে মোটা ব্রাশের স্ট্রোক দিয়ে, কোনও রকম পূর্ব-পরিকল্পনা ছাড়া, ভরিয়ে চলা পেইন্টার একে অপরকে যুগপৎ দেখে চলেছে।
শিল্প কি তাহলে সেই ‘দাঁতাল শুয়োর’? কিন্তু ‘তারপদ রায়’ পরিতৃপ্ত কেন? তিনি পরিতৃপ্ত নিজের ছায়ার সামনে।শিল্পবস্তুকে শিল্পবোধে রূপান্তরিত করার এক নিজস্ব প্রক্রিয়া ছিল তাঁর। অনেক কবিই এই দুই সম্পর্কের মধ্যে যোগসূত্রটিকে মাণ্যতা দেন না। তারাপদ’র কবিতা আপাতভাবে ‘সহজ’ মনে হলেও তিনি যে বিষয়টি সম্পর্কে অতি-সচেতন ছিলেন তা এই লেখাটিতেই পরিষ্কার।
তারাপদ’র কবিতায় বস্তুভার বেশ কম। অর্থাৎ তিনি প্রায় শূন্য থেকে শুরু করে একটি কবিতা নির্মাণ করতে পারতেন। যেমন ‘নিঝুমপুর’এর দিকে চলে যাওয়া একজন মানুষ। নিঝুমপুর কোথায় সেখানে শালফুল ফুটেছে কী-ফোটেনি তাও জানেন না কবি। শুধু এক চলা। তারাপদ লিখলেন,
‘পথের পাশে শোভা আকাশ বা পাখি
বাদাম গাছের নীচে বাদামি আঁধার
কিছুই দ্রষ্টব্য নয়।
নিঝুমপুর গ্রাম না শহর
কিছুই জানিনা শুধু
নিঝুমপুর চলো, চলো, চলো।‘ (নিঝুমপুর)
-আরোপিত দর্শনের দ্বারা আক্রান্ত হবার চূড়ান্ত সম্ভাবনা থাকা স্বত্তেও তারাপদ সে পথ পরিহার করলেন। কয়েকটি অতি-চেনা শব্দকে নিয়ে প্রায় জাগলিং করতে করতে তিনি হেঁটে গেলেন। এবং পাঠক’কে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন এক সফরে।
অথবা ধরা যাক ‘শ্রীচরণকমলেষু’ কবিতাটির কথা,
‘পথে নিমগাছ
নীচের পুকুরে,
সবুজ জলের নীচে সাদা পুঁটি মাছ,
ঘুরে ঘুরে
জলে ঝরে পড়া সাদা ফুল।
নিমের ফুলের তুমি, সবুজ জলের তুমি, শ্রীচরণকমলেষু, হায় জন্মভূমি,
সাদা ফুল,
বহুদিন চিঠি নেই, পত্র নেই,
প্রাণের অতুল।‘
-একটি জলরঙের ক্যানভাস। শুধু কয়েকটি অতিচেনা ছবি। আর কিছু নেই। কিন্তু ছিন্নমূলের কান্নার জন্য সে ক্যানভাসটিকেও ছোট বলে মনে হয়।
হায় বাংলা কবিতা, ‘কালুর বাড়ি’ কবিতাটির মধ্য তীব্র মাইনের মতো বিস্ফোরণ’কে চিনে নিতে এত দেরি হয়ে গেছে আমাদের! অ্যন্টিপোয়েট্রি ভাঙচুরের কবিতা নতুনধারার কবিতা ইত্যাদি অভিধাতে নিজের কবিতাকে অভিহিত করেননি বলেই কি তারাপদ’র এই ভাঙচুরের দিকে আমরা চোখ ফেরালাম না? নজর দিলাম না? তারপদ লিখছেন,
‘কিছুদিন বেশ চুপচাপ।
তারপর একদিন কালুর বাড়িতে কারা আসে,
বেল বাজে।
আমি শুয়ে শুয়ে বেল শুনে টের পাই,
লোকগুলো সুবিধের নয়;
আজ খুব হল্লা হবে কালুর বাড়িতে।
আমি শুয়ে শুয়ে নাকে অমল স্কচের গন্ধ পাই
মাংসের কিমার বড়া, ডিম ভাজা
এরই মধ্যে একজন গেয়ে ওঠে,
‘আমি অকৃতী অধম’,
সকলেই একসঙ্গে গেয়ে ওঠে,
‘আমি অকৃতী অধম।‘
কালু আর কালুর বৌয়ের গলা আমি টের পাই।
কালুদের আদিখ্যেতা বড় বেশী,
বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি রেগে যাই,
খুব রেগে যাই।‘
-অমল স্কচের মধ্যে ভেসে থাকা জীবনের থেকে উঠে আসে, ‘আমি অকৃতী অধম’… সেই গান। প্রথমে একজনের গলায়। তারপর সবার গলায় খেলা করে সেই গান। একটি সহজ আনন্দ-মাছ যেন খেলা করতে শুরু করেছে নীল জলের মধ্যে। আর কিছুই নেই। জীবনের সব আনন্দ বিষাদ পেরিয়ে এক সমর্পণের দিকে ছুটে যাচ্ছে আমাদের সব গান ও প্রহর।
কিন্তু আমাদের আধুনিক মনন কি এই ‘গ্রাম্য স্থূল অপরিশুদ্ধ’ (স্কচের বাস্তবতাটুকু বাদ দিলে) আনন্দকে গ্রহণ করতে অপারগ? কালু ও তার বউয়ের আচরণের মধ্যে আমরা কি অবিরাম লক্ষ্য করে যাব নাগরিক-মননের অভাব? দোয়েল-ফড়িং-এর জীবনের সঙ্গে যেমন আমাদের আর দেখা হবে না ঠিক তেমনই আর দেখা হবে না কালু ও তার বউ-য়ের জীবনের সঙ্গেও। আমাদের মধ্যে থাকবেন একজন তারাপদ রায় যিনি বারবার দেখিয়ে দেবেন এক মেকি জীবনের অন্তঃসারশূন্যতা।
কী জাদু থাকে একটি লেখায় যা দিনের পর দিন সন্ধ্যামালতীর মতো ফুটে থাকে আমাদের কাছে? কোন জাদুবলে? যে লেখা থাকে তা নিজের নিয়মেই থাকে। পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় কোনও লেখা সে নিয়ম মেনে সময়কে অতিক্রম করে যেতে পারে না। তারাপদ’র লেখার মধ্যে সেই জাদু লুকিয়ে রয়েছে তীব্রভাবে। সব জটিলতা আর ‘ইজম’তাড়িত পাঠাভ্যাসকে একটু সরিয়ে রেখেই আসতে হয় তারপদ’র কবিতার কাছে। আর একবার এসে পড়লে সম্ভবত ফেরার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। পরম মমতায়, অনেকটা শিশু যেমন মগ্ন হয়ে থাকে তার খেলায়, সেই সারল্যে একটি একটি করে শব্দ এনে তিনি বসিয়ে চলেছেন। খুব সাধারণ আটপৌরে সব শব্দ,
‘অনেকদিন দেখা হয় না।
তারপর একদিন দেখা হবে।
দু’জনেই দু’জনকে বলবো,
‘অনেকদিন দেখা হয়নি।’
এইভাবে যাবে দিনের পর দিন
বৎসরের পর বৎসর।
তারপর একদিন হয়তো জানা যাবে
হয়তো জানা যাবে না,
যে
তোমার সঙ্গে আমার
অথবা আমার সঙ্গে তোমার
আর দেখা হবে না।’ (এক জন্ম)
-মহাবিস্ফোরণের কালে এক সেকেন্ড সময়ের মিলিয়ন মিলিয়ন মিলিয়ন ভাগের এক-ভাগ হেরফেরে এই ব্রহ্মাণ্ডের পরিণতি অন্যরকম হয়ে উঠত। কোন সে মায়াজাল, কোন সে শিকল যার এক একটি বালা আমরা! কোন গূঢ় কারণে ও অকল্পনীয় সমাপতনের ফলে আমাদের দেখা হয়ে গেল!
তারাপদ’র এই কবিতাটি পড়ে গা ছমছম করে ওঠে। কারণ আমাদের যে দেখা হবে না আর তা সুনিশ্চিত। কিন্তু কবিতাটির সব থেকে ঘাতক অংশ ঠিক তার আগে, ‘তারপর একদিন হয়তো জানা যাবে/ হয়তো জানা যাবে না।’
অর্থাৎ দুটি সম্ভাবনা – এই কোটি কোটি তারার মাঝে আমরা দেখা না-হবার বিষয়ে নিশ্চিত হব। অথবা দেখা আর হবে না সেটি নিশ্চিত; কিন্তু সেটি আমাদের জানার বাইরে রয়ে যাবে।
মহা-অন্ধকারে হয়তো ঘুরে বেড়াবে দুটি অস্তিত্ব। বারবার সে ভাববে আবার দেখা হবে। কিন্তু আর যে দেখা হবে না সেটি তার জানার বাইরে। এই অবস্থাটি আরও ভয়ংকর। আরও অসহায়তার দিকে ঠেলে দেওয়া। এবং তারাপদ এক শান্ত ডোরাকাটা বাঘের মতো আমাদের উঠোনের ঘাস-বন থেকে বেরিয়ে এসে এভাবেই ছারখার করে দিতে পারেন। কোনও দুষ্প্রবেশ্য বনাঞ্চলের প্রয়োজন না তাঁর।
শোনা যায়, নিজেকে নিয়ে ‘মসকরা’ করা পৃথিবীর সব থেকে দুরুহ কাজ। আধুনিক মানুষের মধ্যে নার্সিসাস-প্রবণতা সব থেকে বেশি। ইতিহাসের আর কোনও সময়ে মানুষ এতটা নার্সিসাস হয়ে ওঠেনি। তার একটা বড় কারণ হয়তো, আজ আর তার প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকার অবসর নেই। তাই সে ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে নার্সিসাস। তার যাবতীয় শিল্পের প্রতি সে অতি-নার্সিসাস। এটিকে হাসতে হাসতে নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন তারাপদ রায়’
‘সিমেন্টের বাঁধানো চত্বরে
তিরিশ বছর আগের এক বেড়ালের
সামনের দুই থাবার স্পষ্ট ছাপ জমাট হয়ে আছে
এই রকম সামান্য দৃশ্য, এই রকম তুচ্ছ জিনিস
এর জন্যেও অনন্তকাল অপেক্ষা করতে হলো।
এমন কি এই যে এলোমেলো তুচ্ছাতিতুচ্ছ কবিতা
তার জন্যেও অপেক্ষা করতে হলো
বহুদিন অপেক্ষা করতে হলো।’ (তুচ্ছাতিতুচ্ছ)
-তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল নিসর্গসুন্দরী দেবীর। তিনি ভয় পেয়েছিলেন। হ্যাঁ, তারপদ রায়’ও ভয় পান,
‘শ্রীচরণেষু,
ভারতবর্ষ,
এতদিন পরে আমার আবার ভয় হয়,
আমি স্বদেশী না আমি বিদেশী?’ (‘শ্রীচরণেষু ভারতবর্ষ)
-কবিরা ক্রান্তদর্শী, এমন একটি কথা প্রচলিত আছে। তিনি কি এই ভারতবর্ষকেও দেখতে পেয়েছিলেন?
পেয়েছিলেন, শুধু কোনও ‘ডিসকোর্স’ খাড়া করতে চাননি কবিতায়। শুধু বহুদিন পর একজন বাঙালী কবির ‘বাঙলা কবিতা’ লিখিত হয়েছিল তাঁর হাত ধরে।
কবিতা-প্রতিকবিতা ইত্যাদি তো অনেক দূরের জিনিস; একজন মানুষ ঠিক কতটা জোরে হাসবেন বা কাঁদবেন সেটাও যে ইতিমধ্যে ঠিক করে দিয়েছেন বাংলা কবিতার ‘স্কলার’রা... তারাপদ রায়ের কবিতা পড়তে পড়তে সেটিও মনে পড়ে যায় বারবার। আর বারবার শিউরে উঠতে হয়।
তিনি যথার্থ বলেছেন, ‘পঞ্চায়েতের নিকট চৌকিদারের আর্জি’। খাপ-পঞ্চায়েত ঘেরা বাংলা কবিতার দুরারোগ্য কর্কটরোগ সহজে সারে না। তারপদ রায় তার প্রমাণ।
ছবি : বিধান দেব
ধারাবাহিক গদ্য ।। দীপক হালদার
ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্যচর্চার ইতিবৃত্ত
ধারাবাহিক গদ্য ।। অভিজিৎ দাশগুপ্ত
১৭.
যখন খেলি তখন এমন এক খেলানোর কথা বলো যাতে দৌড়ে এসে হৃদয়কে ছুঁতে হয়
যে ছোঁয় সেই পায় ধুলোয় খেলার মজা ।
যখন পাপড়ি খোলে ফুলও তো সেই উদোম হয়
যে একেবারেই এক ফুলের মত উদোম
সে এমন একটা বৃদ্ধি পায় !
উদাহরণের পেছন ছেড়ে
যে সামনে দিয়ে ঘুরে আসে
সে-ই কলম দিয়ে লেখে
ঠিক বলে ফেলার মতো
অনুপস্থিতের হয়ে
সে-ই কিছু কথা বলে যায়।
স্বদেশ সেনের ' খেলা ' কবিতাটির পাঠপর্ব আমাকে বারবার ভাবনার সীমাবদ্ধতা থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গেছে। প্রথম প্রথম কবিতাটি পাঠ করবার সময় প্রেমের একটা সরু সুতো সূত্রের মত খুঁজে পেতাম । সেই বালক বয়সির ভালো লাগা , ' ধুলোয় খেলার মজা ', সঙ্গে কারও হৃদয় ছুঁতে চাওয়ার দুর্মর বাসনা।
আজ আর সেদিকে মন হাঁটা দেয় না । বরং দেশ-কাল সমাজকে সামনে থেকে দেখাটাই যে বড় হয়ে ওঠে কবিতাটি পড়ার সময় । বর্তমান পরিস্থিতিতে আপামর জনগণের হৃদয় ছুঁতে চায় সে। আর যে বা যিনি ছুঁতে পারেন , তিনিই পান ' ধুলোয় খেলার মজা '। তারপর বিপরীতে যখন পাপড়ি খোলে , তখন কি হয় তা বিশ্ববাসী প্রতি মুহূর্তে দেখছেন । চোরের নেই বাটপারের ভয় । তাই উদোম হয়ে নিজ ক্ষমতার প্রকাশ করাই এখন ভবিতব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে । আর যারা তার সহযোগী তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ পুরস্কার ---
" যে একেবারেই এক ফুলের মতো উদোম
সে এমন একটা বৃত্তি পায়! "
অর্থাৎ সঙ্গে থাকার ক্ষমতা । এই ক্ষমতাধরেরা অন্যায় করবে , তাকে কেউ ধরতে পারবে না । তারা যে সব বৃত্তিভোগী ।
কিন্তু এখানেই শেষ নয় কবির মন । সেই চিন্তাশীল হৃদয় লিখে ফেলে অমোঘ এক বার্তা । ----
" সে-ই কলম দিয়ে লেখে
ঠিক বলে ফেলার মতো
অনুপস্থিতের হয়ে
সে-ই কিছু কথা বলে যায় । "
তাহলে বলার লোক আছে । শুধু তাদের খুঁজে বার করতে হবে । এঁরা বয়স্ক বা প্রৌঢ় হতে পারে । হতে পারে কম বয়সি । আমি যে খুঁজে বার করার কথা বললাম , তা ঠিক নয় । প্রচুর মানুষ এখন ' ঠিক বলে ফেলার মতো ' অবস্থায় ।
আমি কবিতাটি আবার পড়বো। আর পড়তে পড়তে একসময় মূক হয়ে যাব । সচেতন পাঠকের মনে পড়বে শঙ্খ ঘোষের ' সম্প্রীতির সাহিত্য ' বলে তিন বন্ধুর কথোপকথনের ভাবনাটি । সেখানে সাত্যকি তার বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুভমনকে একটি কথা বলেছে যা সময় এবং এই কবিতার সঙ্গে অদ্ভুত ভাবে মিলে যায় ।
" সংকটের এক-একটা মুহূর্ত যখন আসে জীবনে, ও-রকম হিসেব করে তখন ভাবতে পারে না কেউ, তোমার মতো। মনে রেখো, তখন তোমার আমার ওর সকলেরই কিছু-না-কিছু কাজ করবার দায় এসে যায়। যে যেটুকু পারে, সেটুকু তাকে করতেই হয় তখন। "
এ আমারও জীবনেতিহাস। হ্যাঁ আমাদেরও জীবনের ইতিহাস । নিজেকেই বলি ; ভাবো ভাবো । কেউ ভাবনা থেকে দূরে থাকলেই অসময় গ্রাস করবে পৃথিবীকে। ভারী অসুখ তার । আমরাই
ওষুধ । আমাদের ' ঠিক বলে ফেলার মতো ' ঘটনাই একদিন যন্ত্রণা অসূয়ার মধ্যে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে নতুন এক সকাল।
১৮.
স্থির চোখ টলমল হয়ে আসে
সে তো ঘুম না
তবু ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন
স্বপ্নের মধ্যে স্মৃতি খুব বালকবেলা
একা একা কোথায় সে কোন ধু-ধু মাঠে
পথ হারিয়ে কান্না
দুচোখ ভরে জল, সেই অশ্রু, সেই দুঃখ
এমন কেন মাঝে মধ্যেই
ঘুম না তবু ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন
স্বপ্নের মধ্যে স্মৃতি
স্থির চোখ টলমল
আর সেই স্মৃতির মধ্যে দুঃখ, সেই অশ্রু
সেই দুচোখ ভরা জল
মাঝে মধ্যেই সেই ঘুম না তবু স্বপ্ন
স্বপ্নের মধ্যে স্মৃতি
আর স্থির চোখ টলমল হয়ে আসে
টলমল হয়ে আসে।
একটু যাদের বয়স হয়েছে , মহাদেব সাহার এই কবিতাটি ( ' স্থির চোখ টলমল হয়ে আসে ' ) পড়তে পড়তে হারিয়ে যেতে হবে তাঁদের । কতবার পড়েছি। তবু যেন পড়াই হল না । ওই যে স্মৃতি স্বপ্ন আর ঘুম--- তারা যেন জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে চৌকাঠে । এটা ধরে টান দিচ্ছে , তো কখনো অন্য একটা ধরে এনে মনের সামনে হাজির করছে ।ফেলে আসা অনুভূতিকে ছুঁয়ে যায় সে অবলীলায়। ঠিকই বলেছেন কবি , ' ঘুম না তবু ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন '।
প্রতিটি দিন আমাদের নির্মম পরিসর দেয় অতীতকে দেখবার জন্য । অবচেতনে ঘুরে আসে জীবনে হারিয়ে যাওয়া কত নাম কত ঘটনা । সে নাম মল্লিকা হতে পারে , হতে পারে সঙ্গীতা বা শৈবাল- সঞ্জয় । আবার হঠাৎ-ই মনে এলো সুভাষের নাম। সমবয়স্ক সে আমার । গুলি খেলার , টিকিট খেলার সাথী । যা কিছু জেতা-হারা সব যৌথভাবে সংঘটিত হত । চোখ না বুজেও দেখতে পাচ্ছি ; আমি , সুভাষ আর পিন্টু শীতের বেলায় সরকারি আবাসনের মাঠে বসে গুলি আর টিকিটের হিসেবে ব্যস্ত । হেরে যাওয়া বন্ধুর প্রতি দোষারোপ নয় , অথবা জেতার জন্য নেই অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস । সেই ঘটনাই কি আজ স্থির চোখকে টলমল করে দেয় । নাকি প্রশ্ন ওঠে মনে ---- ' এমন কেন মাঝে মধ্যেই... '।
এই স্বপ্ন তো ফ্রয়েড বা ইয়ুং - এর স্বপ্ন সন্ধানী দৃষ্টি নয় । তাঁরা স্বপ্ন বলতে বোঝেন যান্ত্রিকতাকে অথবা উদ্দেশ্যকে । ফ্রয়েড যদি অতীতচারী হন ,
তবে ইয়ুং বর্তমান আর ভবিষ্যতের । সে দিক থেকে দেখলে ' চরক সংহিতা' বা বৌদ্ধ দর্শনকে বরং গ্রহণ করা যেতে পারে । সেখানে এর অনেক প্রকারের উল্লেখ রয়েছে । যেমন --- অতীত স্মৃতি , ভবিষ্যতের বার্তা , আধ্যাত্বিক নির্দেশনা , দুঃস্বপ্ন , ইচ্ছাপূরণ , জ্ঞানলাভ ইত্যাদি । আসলে এগুলো দিয়ে কখনই এই কবিতাকে সম্পূর্ণ ধরা যাবেনা । বরং যদি অন্য ভাবে দেখি । যদি মনে করি , স্বপ্ন দেখার পরিমাণ যত বয়স বাড়ে ততই কমে আসে । তাহলে...
এখানেই কবির জিৎ । স্বপ্ন যত অধরা হবে ততই স্মৃতির ঝাঁপি খুলে যাবে । দীর্ঘপথের চড়াই-উৎরাইকে সে দেখবে নিস্পৃহ মন নিয়ে ।
সেই স্থির চোখে এ কথাই স্পষ্ট জানান দেবে যে
' শুদ্ধ বিশ্বাস রাখো একদিন শাপমুক্ত হবে '।---
' তখন সুবর্ণ হবে ঘাস ।'
মানব এসেছি কাছে । ওই সহজ একটা চলন কবিতাটির মধ্যে স্নিগ্ধতা নিয়ে বয়ে গেছে যেন । তাকে ধরতে পারবো না । অথবা ধরে ফেলতে সামান্য সময়। কিন্তু তারপর... অবশ্যই ' স্থির চোখ টলমল হয়ে আসে '।
ধারাবাহিক গদ্য ।। চন্দন মিত্র
জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন গল্পের অমায়িক ভুবন
চতুর্থ আচার্য তাও সিন : আপসহীন এক মুক্তিকামী
এরকমই হয়, যার যেমন ভাব, তার তেমন লাভ। বালক তাও-সিন (Tao-hsin) মুক্তি-ভূতের পাল্লায় পড়ে গোল্লায় যেতে বসেছিল। পারিবারিক বৌদ্ধ-আবহ ও বিবিধ শাস্ত্রপাঠের ফলে তার ভাবনাচিন্তা এলোমেলো হয়ে পড়েছিল। কীভাবে মুক্তি লাভ করা যায় সেই চিন্তায় সে, দিনরাত বিভোর হয়ে থাকত। এমন ছেলে যে বাড়িতে বেশিদিন টিকতে পারবে না, তা অনুমান করার জন্য রাজ-জ্যোতিষী হওয়ার দরকার নেই। মুক্তির পথ যার করায়ত্ত, এমন কোনও মহামানবকে খুঁজে বের করতে হবে, এই ভাবনায় সে ঘর ছাড়ে। আর মিলেও যায় এক মহাজন। হুয়াংমেই-এর পার্বত্য অঞ্চলে বিচরণের সময় তার সঙ্গে চতুর্থ আচার্য সেং ৎসান-এর দেখা হয়ে যায়। তখন তাও-সিনের বয়স চোদ্দো বছর। এর আগেও সে অনেক ভিক্ষু দেখেছে, কিন্তু এমন করে কেউ তাকে টানেনি। তার মন বলছে এই মানুষের কাছে আছে মুক্তিপথের হদিশ। সে ভণিতা না-করে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে সপ্রতিভভাবে জিজ্ঞাসা করে,
– প্রভু, দয়া করে বলে দিন কীভাবে মুক্তি পাব !
- আরে এমন করছ কেন, কে তোমাকে বেঁধে রেখেছে ?
- না, আসলে আমাকে কেউ বেঁধে রাখেনি।
- কেউ যদি তোমাকে বেঁধে না-রাখে তাহলে মুক্তির জন্য এমন ব্যাকুল হয়ে উঠেছ কেন ?
সত্যিই তো তাও-সিন এমনভাবে কখনও ভেবে দেখেনি। নানা মুনির নানা মত শুনে, আর অল্প বয়সে আজেবাজে শাস্ত্র গিলে বদহজমের ফলেই তার মাথা এমন বিগড়ে গেছিল। তবে এই লোকটাকে সে ছাড়ল না, আঁকড়ে ধরে থাকল। একদিন নয়, দুদিন নয়, টানা ন-বছর। ততদিনে সে বুঝে গেছে এ লোকটা যা-তা লোক নয়, তৃতীয় চ্যান-আচার্য সেং ৎসান। আচার্যের জীবনের লক্ষ্য, যোগ্য উত্তরসূরির হাতে গুরুপ্রদত্ত জ্ঞানবর্তিকাটি তুলে দেওয়া। সেং ৎসান, যথাসময়ে তাও-সিন-এর হাতে তুলে দিলেন পরম্পরিত চীবর ও ভিক্ষাভাণ্ড। তাও-সিন হলেন চ্যানধারার চতুর্থ আচার্য। সেং ৎসান, তাঁর গুরুদায়িত্ব তাও-সিন-এর উপর ন্যস্ত করে চললেন অন্য কোনও নিভৃত স্থানে। তাও-সিন গুরুকে অনুসরণ করতে চেয়েও গুরুর নিষেধাজ্ঞা মেনে ভিন্ন পথে পাড়ি জমালেন।
তাও-সিন (৫৮০-৬৫১ খ্রিস্টাব্দ) সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। তবে তাঁর জীবনের কিছু উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ের কথা বিভিন্ন নথিপত্র থেকে জানা যায়। Transmission of The Dharma Jewel থেকে তাওসিনের জীবনের এক আশ্চর্য অধ্যায়ের কথা আমরা জানতে পারি। ৬১৭ খ্রিস্টাব্দ, তখন সুই রাজবংশ (Sui Dynasty) শাসন ক্ষমতায়। তাও-সিন, সপার্ষদ জি (Ji) পরগনা ভ্রমণে গেলেন। সেখানে তাঁরা এমন এক নগরে পৌঁছালেন, যে নগরটিকে একটি দস্যুদল টানা সতেরো দিন ধরে অবরোধ করে রেখেছিল। নগরবাসীদের মুখের দিকে তাকানো যায় না, মুখে মুখে দুশ্চিন্তার কালো ছায়া। নবীন ভিক্ষুদের দেখে তাঁরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাও-সিন, তাঁদের আশ্বস্ত করেন। তাঁদের স্মৃতিধার্য করিয়ে দেন, মহাপ্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রের শ্লোক। তাঁরা কম্পমান ঠোঁটে অপরিচিত শব্দগুলি আশ্চর্য ভঙ্গিতে উচ্চারণ করতে থাকেন। অনেকেই মস্তক মুণ্ডন করে ভিক্ষুদের মতো বেশবাস ধারণও করেন। মৃতপ্রায় নগরীতে প্রাণের জোয়ার আসে। নগরপ্রাকারের উপরে যখন দলবদ্ধভাবে সূত্রপাঠ চলে, তখন এক অভিনব দৃশ্য তৈরি হয়। দূর থেকে তা পর্যবেক্ষণ করে ডাকাতদল ভাবে, নগরের লোকেরা বোধহয় ভূতুড়ে সৈন্যের ব্যবস্থা করেছে। প্রাণ বাঁচাতে তারা অবিলম্বে নগরলুঠের পরিকল্পনা ত্যাগ করে।
৬২৪ খ্রিস্টাব্দে তাও-সিন সঙ্গীসাথিদের নিয়ে ফিরে আসেন সেই হুয়াংমেই পার্বত্য অঞ্চলে। সেখানে পতোউ (Potou) উপত্যকায় বানিয়ে ফেলেন ঝেংজুই (Zhenjue) নামের একটি মঠ। এই নামের বাংলা অর্থ, প্রকৃত আলোকপ্রাপ্ত। সার্থকনামা এই মঠ। চ্যান ইতিহাসে এটাই আদি মঠ। পূর্ববর্তী আচার্যগণ কখনও কখনও মঠের জীবন কাটিয়েছেন। তবে সেসব মঠ ছিল রাজা বা রাজন্যবর্গ নির্মিত ও মূলত তাঁদের অনুদাননির্ভর। তাও-সিন বানালেন পৃথিবীর প্রথম স্বাধীন চ্যান-মঠ। কেবল মঠ নির্মাণ নয়, সুপরিকল্পিত নিয়মনীতিও তিনি প্রণয়ন করেন। তিনি অনুদান গ্রহণের পথ বাতিল করে চাষবাসের মাধ্যমে এক স্বয়ংসম্পূর্ণ আত্মনির্ভর জীবনের দিকে তিনি ভিক্ষুদের এগিয়ে দেন। চাষবাসের সঙ্গে সঙ্গে ফসল রক্ষার জন্য কীটপতঙ্গ বিতাড়ন ও বিনাশের ব্যবস্থা করতেই হয়, এ তো প্রকারান্তরে হিংসাবৃত্তিকেই জাগিয়ে রাখা ! এজন্য পরম্পরিত বৌদ্ধধারায় এতদিন চাষবাস নিষিদ্ধ ছিল। তাও-সিন সেই সংস্কারের বিরুদ্ধে গিয়ে ভিক্ষুদের জন্য এক সম্মানীয় জীবনের পথ খুলে দিলেন। তাও-সিন-এর দেখানো পথ পরবর্তীকালে বহু চ্যানমঠ আত্মস্থ করেছিল। অষ্টম শতাব্দীর শেষের দিকে জনপ্রিয় চ্যান-গুরু বাইঝাং হুয়াইহাই (Baijhang Huaihai) এবং তাঁর অনুসারীরা এই ধারাটি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। সানলুন (Sanlun) এবং তিয়ানতাই (Tiantai) ঘরানার মতো প্রতিষ্ঠিত বৌদ্ধমঠও তাও-সিন-এর দেখানো পথকে অনুসরণ করে। কেবল চাষবাসের প্রচলন নয়, তাওসিন চ্যানধারায় বেশকিছু পরিবর্তন আনেন। তিনি বোধিধর্মের চিন্তাধারার সঙ্গে অন্যান্য বৌদ্ধধারার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে চ্যানধারাটিকে আরও গ্রহণযোগ্যতা দান করেন। বোধিসত্ত্ব ধারণার অন্তর্ভুক্তি, লঙ্কাবতার সূত্রের পাশাপাশি মহাপ্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র ও বজ্রছেদিকা সূত্র পাঠের প্রচলন, এমনকি বুদ্ধনাম জপের মতো ছেড়ে আসা প্রথাও তাও-সিন-এর চ্যানধারায় অবলীলায় স্থান পেয়ে যায়। তবে একথাও সত্য তাও-সিন চ্যানধারার মৌলিক আদর্শকে কখনওই ত্যাগ করেননি। তথাকথিত মহাযানীদের বুদ্ধপূজা তথা ব্যক্তি বুদ্ধদেবের উপর ভগবানত্ব আরোপকে তিনি অস্বীকার করেছিলেন। এ বিষয়ে তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য ছিল। তিনি বলতেন, মনই বুদ্ধ, মনের বাইরে বুদ্ধের কোনও অস্তিত্বই নেই। তাওসিন-এর হাত ধরে চিনের বৌদ্ধঘরানায় চ্যানধারা তার নিজস্ব পরিসর গড়ার পথে অনেকটাই এগিয়ে যায়।
Genealogy of The Dharma jewel থেকে তাও-সিন-এর জীবনের এক অনন্য আখ্যানের কথা জানা যায়। ৬৪৩ খ্রিস্টাব্দের কথা। সম্রাট তাই ৎসাং (Tai Tsung) দূত পাঠিয়ে তাও-সিনকে তাঁর রাজসভায় আমন্ত্রণ জানান। তাও-সিন বিনয়ের সঙ্গে দূতকে জানান, বয়সজনিত কারণে তাঁর পক্ষে রাজসভায় যাওয়া সম্ভব নয়। সম্রাটের আমন্ত্রণ নিয়ে দূত আরও দুবার তাও-সিন-এর কাছে আসেন এবং যথারীতি প্রত্যাখ্যাত হন। তাও-সিন বুঝেছিলেন এ আসলে আমন্ত্রণ নয়, আমন্ত্রণের ছলনায় আদেশ। তাই তিনি শেষবার বীতশ্রদ্ধ হয়ে দূতের হাতে একটি চিরকুট ধরিয়ে দেন। তাতে লেখা ছিল, যদি আপনি আমার শির চান দিতে পারি, কিন্তু আপনার আদেশ শিরোধার্য করতে পারব না। সম্রাট তাই ৎসাং, এক সামান্য ভিক্ষুর এহেন উদ্ধত আচরণ দেখে জ্বলে উঠলেন। চতুর্থবার দূত এলেন সঙ্গে কোতোয়াল। দূত তাও-সিন-এর মৃত্যু-পরোয়ানা পাঠ করে শোনালেন। তাও-সিন হাসি মুখে গর্দানখানি কোতোয়ালের সামনে পেতে বললেন – কাটো এবং নিয়ে যাও। দূত ও কোতোয়াল হতভম্ব হয়ে তাঁকে অভিবাদন জানিয়ে ফিরে গেলেন। সম্রাট তাই ৎসাং, চ্যানসাধু তাও সিন-এর এই শৌর্যের কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি দূত মারফত মহামূল্যবান রেশমবস্ত্র পাঠিয়ে তাও-সিনকে যথাবিহিত সম্মান প্রদর্শন করেন। চতুর্থ আচার্যের জীবনের এই প্রবাদপ্রতিম আখ্যান পরবর্তী জেন আচার্য ও জেনগুরুদের উপর এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছে। তাই আমরা দেখি জেন আচার্যদের কেউই রাজ-অনুগ্রহের কাঙাল বা রাজার রক্তচক্ষুর ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকতেন না। বরং তাঁরা হিম্মতের সঙ্গে মহামান্য সম্রাটের চোখে চোখ রেখে কথা বলেছেন, অকুতোভয়ে তাঁদের আদেশ অমান্য করেছেন। তাঁরা কখনওই ঋতপথ পরিত্যাগ করে অর্থ বা খ্যাতির মোহে শাসক বা রাজকর্মীর সামনে নতজানু হয়ে বসেননি। জেনের এই আদর্শ আক্ষরিক অর্থেই অলোকসামান্য। আমরা চেনা পারিপার্শ্বিকতায় যখন তথাকথিত বিজ্ঞজনেদের ফেরেববাজ নেতামন্ত্রিদের সামনে নীলডাউন হয়ে অর্থ, পদ বা খেতাব আহরণ করতে দেখি, তখন বুঝতে পারি পর্বতপ্রমাণ জেনসাধুদের কাছে এঁরা নেহাতই মূষিক-শাবক ! জ্ঞানচর্চার বড়াই এঁদের বাগাড়ম্বর ছাড়া অন্য কিছু নয়। জেনসাধুরা তাঁদের জীবনচর্যার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন, যে জ্ঞানচর্চা আত্মজাগরণকে অস্বীকার করে তা নিছকই পুথিসর্বস্ব, জীবনবিমুখ এক কৌশল ; যা আসলে নাম-কাম হাতানোর পরিশীলিত হাতিয়ারমাত্র।
একদিন তাও-সিন হুয়াংমেই-এর পথে পদচারণা করছিলেন। হঠাৎ তাঁর সঙ্গে এক অসাধারণ দেহসৌষ্ঠবের অধিকারী বালকের দেখা হয়ে গেল। তারপর শুরু হল অসামান্য কথোপকথন।
– বালক, তোমার নাম কী ?
- আমার একটা নাম আছে, তবে তা স্থায়ী নয়।
- নামটি শুনি ।
- বুদ্ধ ।
- সত্যিই কি তোমার অন্য কোনও নাম নেই।
- নাম তো শূন্য, ও নিয়ে আমি মোটেও মাথা ঘামাই না।
তাও-সিন-এর নিজের বাল্যাকালের কথা মনে পড়ে গেল। এর মাথায়ও ভূত চেপেছে। আর তা তাড়ানোর দায়িত্ব তাঁকেই নিতে হবে। তিনি যে আধারের খোঁজে এতদিন হন্যে হয়ে ঘুরেছেন আজ সেই আধার তাঁর এতটা নিকটে ! তিনি বালকটির সাকিন ইত্যাদির হদিশ নিয়ে হাসি মুখে মঠে ফিরলেন।
৬৫১ খ্রিস্টাব্দ, তাও-সিন তখন বাহাত্তর। নবম চান্দ্রমাসের চতুর্থ দিন। তাও-সিন মঠের সবাইকে ডেকে বসালেন। অত্যন্ত শান্ত স্বরে তিনি বলতে শুরু করলেন – অগণিত আচারসর্বস্ব ধর্মকে পৃথিবী থেকে দূর করে দেওয়া উচিত। প্রত্যেকে এই জ্ঞানটুকু ধরে রাখবে এবং ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে দেবে । এইটুকুই তাঁর বলার ছিল। উপস্থিত সবাই দেখলেন উপবিষ্ট অবস্থাতেই তিনি মহাপ্রস্থানের পথে এগিয়ে চললেন। যেখানে বসে তিনি বক্তব্য রাখতেন, তার কাছাকাছি তাঁকে সমাহিত করার স্তূপ প্রস্তুত ছিল। তাঁর নির্দেশ অনুসারে কোনও আড়ম্বর ছাড়াই তাঁকে সমাহিত করা হয়। দিন চারেক পরে আকস্মিকভাবে স্তূপের দরজা খুলে যায়। মুক্তিই যাঁর আবাল্যের সাধনা তাঁকে কী বদ্ধ স্তূপের ভিতরে আবদ্ধ রাখা যায় !
- তথ্যসূত্র :
১. DENKOROKU; THE RECORD OF THE TRANSMISSION OF THE LIGHT BY KEIZAN JOKIN ; TRANSLATED BY HUBART NEARMAN, OBC SHOSTA ABBEY PRESS , CALIFORNIA .
২. HISTORY OF ZEN BY YU-HISIU KU; SPRINGER, SINGAPORE.
৩. THE ILLUSTRATED ENCYCLOPEDIA OF ZEN BUDDHISM BY HELEN J. BARANI, THE ROSEN PUBLICATION GROUP , NEW YORK
৪. THE A TO Z OF BUDDHISM BY CARL OLSON, THE SCARECROW PRESS , UK.
৫. ZEN MASTERS OF CHINA : THE FIRST STEP EASTBY RECHARD BRYAN MC DANIEL; TUTTLE PUBLICATION, TOKYO/ VERMONT/ SINGAPORE.
৬। AN INTRODUCTION TO ZEN BUDDHISM BY D.T. SUZUKI, GROVE PRESS, NEW YORK.
৭। CHINES BUDDHISM BY REV. JOSEPH EDKINS AND KEGAN PAUL, TRENCH TRUBNERS CO.LTD, LONDON, -
৮। A POPULAR DICTIONARY OF BUDDHISM BY CHRISTMAS HUMPHREYS, THE BUDDHIST SOCIETY, LONDON, 1997.
৯। ZEN AND THE ZEN CLLASICS BY R. H. BLYTH , HEIAN INTERNATIONAL , SAN FRANCISCO 1982.
১০। ZEN CHINESE HERITAGE BY ANDY FERGUSON, WISDOM PUBLICATION, BOSTON 2000.
১১। THE STORY OF CHINESE ZEN BY NAN HUAI CHIN TRANSLATED BY THOMAS CLEARY, CHARLES E. TUTTLE COMPANY, TOKYO 1995.
১২। MANUAL OF ZEN BUDDHISM BY DAISETZ TEITARO SUZUKI 1935.
ছবি : বিধান দেব
-
কবিতা : অনিমেষ মণ্ডল
কবিতা : শর্বরী চৌধুরী
কবিতা : শান্তনু ভট্টাচার্য
সংকল্প
কবিতা : প্রজ্ঞা ভট্টাচার্য
ঘরে ফেরা
সাদা কাপড়ে মুড়ে শবের ঠান্ডা স্পর্শ করল অনেকদূরে , সেখানে বিন্বিখই উড়িয়ে,হরিধ্বনি দিয়ে অপু ফিরছে নিজে্র ঘরে । হয়তো বা তাকে ডাকতে এসেছিলো মেঘের বাড়ি থেকে
কিন্তু সে ফিরছে আজ নিজে্র বাড়িতে।
সাদা কাশে মুড়ে মাঠ অপুর অপেক্ষায় হয়তো তারা
ফিরছে অপু,এতদিন ধরে অপেক্ষা করেছিলো যারা। স্বৰ্গতে যেতে চায়না সে,স্বৰ্গ যখন মৰ্ততে
অপূৰ্ব রায় ফিরছে আজ নিশ্চিন্তপুরে নিশ্চিন্ত ঠিকানাতে।
অপুর প্ৰত্যাবর্তন
প্ৰবন্ধটা আর হলো না শেষ , চল্লুম ফিরে অনেক দূ্র। স্মৃতির ভিড়ে স্মৃতি হয়ে , স্মৃতি ঘেড়া নিশ্চিন্দিপুর। রেলগাড়ি টা বুঝি শুধুই কাড়ে সেই ছেলেবেলায় দিদিৱ সাথে কাশবনের ধাৱে , প্ৰথম দেখা । তারপর ই সে গেলো চলে , নিশ্চিন্দিপুর ছাড়লাম,তাও রেলগাড়ি চড়ে। বাবাও তারপর গেলো চলে। মাও গেলো রেলগাড়ির ই অপেক্ষা কৱে। আবার রেলগাড়ি চাপিয়ে যখন অপৰ্ণাকে পাঠালাম বাপেরবাড়ি, তখন কী জানতাম সেও আমার সাথে করবে এভাবে আড়ি!! তাই এবার রেলগাড়িটাকে দিলুম ছাড় , আচ্ছা,, দিনের' শেষে কীবা রইল আমার! বাবা হয়েও আমার শোনা হলো না বাবা , আমি এমন ই অভাগা । পুলুর সাথেও শেষ দেখা সেই কবে! স্মৃতির অতলে সে কি আর মনে পরে? মনে্র কোন আজ শুধুই ধোঁয়াটে দৃষ্টিটা দিন দিন হয়ে আসছে ঘোলাটে। ঝরাপাতাগুলো আজও ওড়ে, ওদের সাথে সম্পৰ্ক বহুদিনের। তবু কেন আজ তাদের দেখলে মনে হয়
তারা কোন সূদূরের ঠিকানা হারা পথিক দুজন ঝরাপাতার ও নাই ঠিকানা আমি নাহয় পেলুম ফিরে নিশ্চিন্দি পুরে নিশ্চিন্ত ঠিকানা।
ছবি : বিধান দেব
কবিতা : শান্তনু প্রধান
যদি তুমি জল হও
তুমি জল হলে চিকন আলো নেমে আসে
দূরে ঘাসবন চিরে ছুটে যায় আকাঙ্ক্ষার অশ্রুজল
সেই জল ছুঁয়ে কেন যে এই সমর্পণ
আমার দুই মুঠোর ভেতর কোলাহলহীন একটি রাত্রি
অবৈধ সম্পর্ক সন্তর্পনে এড়িয়ে ঘাস ফড়িং-এর ডানায়
কেন যে লিখে ফেলে তোমার প্রশংসা
ফিনফিনে বাতাস আমাকে টুকরো টুকরো করে
ঠিক তখনই বিপন্ন সময়ের ঘন কুয়াশা
চিকন আলোর অতীত ঠিকানা পর্শ করে
ফাগুন লেগে থাকা তোমার আগুন শরীর ভিজিয়ে দেয়
তুমি জল হলে তোমাকেই ভেজাই
বারে বারে ভেজাই
কখনও যদি সমুদ্র হয়ে ওঠো
সেই সৈকতে বালির পাঁজরে আমার শেষ নিঃশ্বাস রেখে
উড়ে যাব তারাদের সংসারে
কার কিবা দোষ বেলো
শুধু একবার তুমি জল হও
তোমার শরীরে পানসি ভাসাই
ভোট টুম্পা
ভোটের মাছি খুঁটির জোরে উঠবে এবার কাদের চালে
আমার চালে ডুমো মাছি টুম্পা গানে মাদ যে ঢেলে
আরে বাবা রাঘববোয়াল সবতো পাবে রেজাল্ট শেষে
এখন রেখো কান্না চেপে ঘুরছে জুজু ছদ্মবেশে
পাশ ফিরলে মাছের মাথা এমনি পাবে বিড়ালবুড়ো
আর কি তবে ঝিকিরমিকি মেঘ গুলো সব মিথ্যে খুড়ো
যখন তখন দৌড়ে এসে কামড়ে খাবে তোমার বাটি
তাই কি হল তোমার ছাদে টুম্পা নাচের শক্ত ঘাঁটি
প্রিয় কথা তোর বুকে হাত রাখি
সেখানে কয়েকটা মাছরাঙা
নীল মাছে ঠোঁট গুঁজে তাক লাগায়
পিপীলিকার শরীর আমার কেন যে মাখো বিসর্জনের আতর
নির্ঘুম সমুদ্র এসো
আলোকিত করো কথার স্বরলিপি
সমস্ত বাতিঘর নিভে গেলে প্রিয় পাণ্ডুলিপি এসো
চুম্বন করে স্পর্শের ভার সরাই
তুমুল ইচ্ছে এবং আমি
ফুল আর তুমি কখনোই কেউ কারোর গুণিতক নাও
নিশ্চিত যুদ্ধ হবে জেনে গন্ধহীন বর্ণহীন
সমগ্র নিখিল জুড়ে শুধু আমি একা স্বপ্নের খোলস গুলো জড়ো করি
অভ্যাস মত এক মুহূর্তের জন্য মুড়ে ফেলি শেষ রাতের জ্যোৎস্না
পরপর তুমি এবং ফুল তাও যে কেন কেউ দরজায় কড়া নাড়ছে
হালকা ডোরাকাটা চাঁদের বুক থেকে প্রবাহিত ফোঁটা
ধ্রুবতারা হয়ে যাদের ভিতরে প্রবেশ করলো
তাদেরও সভ্যতায় কীট ও বর্বরতা
চৈত্রের শেষ বাতাসে মল্লিকা বন পেরিয়ে রক্তের নদী পেরিয়ে
চুম্বনরত নগ্ন শরীর অবয়বহীন গোপন লোভাতুরা
কবিতা
সম্পাদকের কথা
দ্বিতীয় বর্ষ ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২ খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...
-
চণ্ডী কথা ১ সুরথ সমাধি আখ্যান রাজ্যহারা রাজা সুরথ ঘুরতে ঘুরতে মেধামুনির আশ্রমে এলেন । ভাগ্যহারা বিষণ্ণ রাজা । কিন্তু ফেলে আসা রাজ্য ...
-
দোলায় আছে ছ'পণ কড়ি এক হেমন্তের গোধূলি আর সন্ধ্যার ভেতরে তেমন তো কোনও ফারাক থাকে না। ১৭ নভেম্বর ২০২০ হির্শবার্গের সন্ধ্যা আর কলকা...
-
শমীপোকা ও অর্জুনের বিষাদযোগ লাল, রেকসিনে বাঁধাই ছিল বইটা। ঠাকুরঘরে ঢুকে নকুলদানা খেলে কেউ কিছু বলত না, কিন্তু এই বইটায় হাত দেওয়া যাবে না...









