ডায়মন্ড হারবারের সাহিত্যচর্চার ইতিবৃত্ত
আট.
ডায়মন্ডহারবারের সৌভাগ্য প্রায়শই সেখানে প্রশাসনিক পদের দায়িত্ব নিয়ে কোনও না কোনও কবি সাহিত্যিকের আগমন ঘটেছে।কবি বাসুদেব দেব এবং কবি ও কথাকার তপন বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ডায়মন্ডহারবার ত্যাগ করলেন চাকরিতে বদলির সুবাদে, তখন কবি সুধীর দত্ত ডায়মন্ডহারবার এক নম্বরের ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক হিসেবে কর্মভার গ্রহণ করলেন কয়েক মাসের মধ্যেই। ফলে ডায়মন্ডহারবারের সংস্কৃতিপ্রাণ ও সাহিত্যরসিক মানুষজনের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে গেল অচিরেই। স্থানীয় সাহিত্যসেবীগণ তাঁকে কাছে টেনে নিলেন পরম আন্তরিকতার সঙ্গে।ব্যাবেল টাওয়ারের চূড়া তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ,এছাড়া আরশি টাওয়ার ,প্রাকপুরান প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থগুলি তাঁর কবি প্রতিভার পরিচায়ক। শরৎসুনীল নন্দী,রামচন্দ্র প্রামাণিক , সুধীর দত্ত এই তিনজনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হত সংবেদ নামের অত্যন্ত উচ্চ মানের একটি সাহিত্য পত্রিকা।কবিতাকেন্দ্রিক এই পত্রিকায় যেমন উচ্চাঙ্গের প্রবন্ধ প্রকাশিত হতো,তেমনই কবিতা ও থাকত।গল্পও ছাপা হয়েছিল দু একবার। নিয়মের টানে তাঁকেও বদলি হতে হল একসময়।তাঁর শূন্যস্থানে এসে বসলেন আর এক কবি। কবি অমিতাভ মৈত্র। মৃদুভাষী চমৎকার স্বভাবের এই মানুষটির ও
স্থানান্তর ঘটল কালের নিয়মে।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পদার্পণ থেকে যার সূচনা, কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের বংশধর কবি সুধেন্দু মল্লিক,কবি বাসুদেব দেব, কবিও কথাশিল্পী তপন বন্দ্যোপাধ্যায়,সুধীর দত্ত ,অমিতাভ মৈত্রতে এসে আপাতত তার সমাপ্তি ঘটল।
কিন্ত চর্চা চলতে থাকল তার নিজের গতিতে।দেখা গেল ডায়মন্ডহারবার মহকুমার বিভিন্ন স্থানে অন্তঃসলিলা স্রোতঃধারার মতো সাহিত্য চর্চার ধারাও ক্রম বহমান। ডায়মন্ড হারবারের মাথুর মানখন্ড কামারপোল জোবরালি প্রভৃতি এলাকায় সাহিত্য চর্চার ধারা চোখে পড়ে ।নিষ্ঠা, একাগ্রতা থাকলেও উপযুক্ত মান রক্ষার দিকে সঠিক দৃষ্টির অভাব ওইসব প্রচেষ্টাকে উল্লেখযোগ্য সফলতা দান করতে পারেনি বলেই মনে হয়। এই মুহূর্তে কবি শুকদেব হালদার এবং কবি ,সম্পাদক চিত্তরঞ্জন দাস এই দুজনকে বিশেষভাবে মনে পড়ছে । এসবের মধ্যেও কারো কারো ব্যক্তিগত সদিচ্ছা ও মেধাবী প্রচেষ্টা সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশেষ সাফল্য এনে দিয়েছিল ।
ড. নলিনীরঞ্জন কয়াল এরকম এক ব্যক্তিত্ব ।গবেষণামূলক বহু প্রবন্ধ এবং পুস্তক রচনা করেছেন মাথুর মানখন্ড অঞ্চলের এই বিদগ্ধ মানুষটি। পদবী নিয়েওতাঁরউল্লেখযোগ্যকাজআছেবলে জানা যায়।শ্রীযুক্ত অজিতকুমার সামন্ত আর একজন সাহিত্যসেবী।মাথুর হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনিও সাহিত্য চর্চায় নিরত ছিলেন ।তাঁর বহু প্রবন্ধ উল্লেখযোগ্যতার দাবিদার ।
শ্রী অরুণ কুমার পুরকাইত মাথুর গ্রামের বাসিন্দা ।বর্তমানে কলকাতায় থাকেন ।তাঁর লেখা বহু ছোটগল্প কলকাতার দৈনিক, সাপ্তাহিক পত্র- পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে ।তাঁর দুখানি গল্প সংকলন ও প্রকাশিত হয়েছে।অরুণ কুমার কলকাতার পত্র- পত্রিকার ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে পরবর্তীকালে লেখা ছেড়ে দেন ।
কিন্তু আর এক অরুণ, ফলতার সোনাকোপা গ্রামের বাসিন্দা অরুণ পাঠক দারুণ লড়াই ক'রে, মেধা এবং সময়ের প্রতি সুবিচার ক'রে, আধুনিক কবিতাকে রক্তধারায় গ্রহণ করে সুন্দর, স্বভাবসিদ্ধ, নিজস্বতার পরিচয়বাহী কবিতা রচনা করে চলেছেন তুমুল উৎসাহে ও যোগ্যতায়।কবিতা, কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধ, পুস্তক সমালোচনা ছাড়াও অরুণ দীর্ঘদিনব্যাপী সম্পাদনা করছেন 'সাহিত্যের বেলাভূমি 'নামে একটি অতীব উচ্চ মানের লিটল ম্যাগাজিন ।বাংলা কবিতার জগতে অরুণ এক সমীহ উদ্রেককারী নাম।অরুণ অনেকগুলো কাব্যগ্রন্থের জনক।
ডায়মন্ডহারবার মহকুমার আশুরালী গ্রামের আশুরালী গ্রামোন্নয়ন পরিষদের কর্ণধার অমৃতলাল পাড়ুই এক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ।পরিষদের মুখপত্র হিসেবে তিনি সম্পাদনা করতেন 'গ্রামোন্নয়ন কথা ' নামে একটি উল্লেখযোগ্য এবং সমীহসূচক পত্রিকা ।যাতে গবেষণামূলক প্রবন্ধের বিচিত্র সমাবেশ ঘটত,ও ছাড়া পত্রিকায় থাকত মহকুমার সাহিত্য ও সংস্কৃতির সুলুক সন্ধান ,থাকত খোঁজখবর।
অমৃতলাল নিজেও পুতুল নাচ নিয়ে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন শুধু নয়, প্রায় বিলুপ্তির পথে এগিয়ে চলা পুতুল নাচের দলকে বিভিন্নভাবে সাহায্য ও উৎসাহিত করতেন সক্রিয়ভাবে ।প্রায় কুড়ি বছর ধরে ধরে নিয়মিত প্রকাশ করেছেন 'গ্রামোন্নয়ন কথা '।সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন তিনি।
ডায়মন্ডহারবারের বাসুলডাঙা অঞ্চলের বাসিন্দা নিখিলরঞ্জন হালদার সুন্দর কবিতা লিখতেন ।তাঁর অকাল প্রয়াণে এলাকার সাহিত্যসেবীগণ শোকাহত । ফজলুর রহমান নামে এক তরুণ সম্পাদনা করতেন হুগলির বাঁকে নামে একটি পত্রিকা ।পত্রিকার প্রকাশ দীর্ঘদিন বন্ধ ।মগরাহাট অঞ্চলের আহমদ আলি হালদার গল্প কবিতা লিখতেন একসময় ।তাঁর কলম আপাতত স্তব্ধ ।এম বাকিবিল্লা ছই নামের একটি পত্রিকা সম্পাদনার সাথে সাথে ছোটগল্পও লিখতেন, বর্তমানে তাঁর কলম ছুটিতে ।পলাশকেতন ছদ্মনামে আব্দুল রাজ্জাক লস্কর লিখতেন কবিতা ।বহুদিন তাঁর চর্চার কোনো খবর নেই ।আজিজুল হক বাবলু প্রকাশ করতেন পার্ল হারবার নামের পত্রিকা ।সেটিও বর্তমানে বন্ধ ।আজিজুর হক নামের আর এক তরুণ কয়েকবছর ধরে প্রকাশ করে আসছেন রেঁনেসা নামের পত্রিকা,পত্রিকাটি এখনও নিয়মিত প্রকাশিত হয়।
আটের দশকে ডায়মন্ডহারবারে একসময় জন্ম নিল আরও একটি পত্রিকা,নাম জনতীর্থ।সম্পাদক এবং প্রকাশ ডায়মন্ডহারবারের লেনিন নগরের বাসিন্দা শ্রী অজিত কুমার বসু।পত্রিকাটি কয়েকবছর চলার পর পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়।
আটের দশকের মাঝামাঝি ডায়মন্ডহারবারে আরও কয়েকটি পত্রিকার প্রকাশ ঘটে। কবি অমলেন্দু বিকাশ দাশের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় স্ফূটনাঙ্ক নামের পত্রিকা।কবিতা,গল্প, প্রবন্ধ ও ছড়ার সমাবেশ ঘটত সেখানে।বেশ কয়েকবছর চলার পর তার চলনও রুদ্ধ হয়,স্ফূটনাঙ্ক- দ্যুতিও মুখ লুকোয়। অমলেন্দু কবিতা, ছড়া লেখার পাশাপাশি প্রবন্ধ,ভ্রমণকাহিনী এবং উপন্যাস ও লিখে থাকেন ।এসব বিষয়ে বেশ কয়েকটি গ্রন্থের জনক অমলেন্দু বিকাশ দাশ।
ঊনিশ শ পঁচাশি সাল নাগাদ কবি সাকিল আহমেদ এর সম্পাদনায় প্রকাশিত হল কুসুমের ফেরা নামের পত্রিকা।কবিতাকেন্দ্রিক এই পত্রিকার পাতায় স্থান পায় কবিতা, ছড়া ,ছোট নিবন্ধ কখনও কখনও ছোটগল্প। সাকিল সাংবাদিকতার কাজ করতেন। আনন্দবাজার, আজকাল, প্রতিদিন প্রভৃতি দৈনিক পত্র পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার পর বর্তমানে কলম নামের দৈনিক কাগজের সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন ।পত্রিকা প্রকাশ ছাড়া সাকিল আহমেদ আরও একটি উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। নিজ উদ্যোগে ও প্রচেষ্টায় অন্তত দশবার বইমেলার আয়োজন করেছেন ডায়মন্ডহারবারে।আকরে তা বড়ো না হলেও ওইসব বইমেলা ডায়মন্ডহারবারের সংস্কৃতিপ্রাণ মানুষের কাছে অনেক অনেক ধন্যবাদ ভালোবাসা ও সমর্থন আদায় করেছিল।বইমেলায় নিত্যদিন সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সাথে সাথে একদিন থাকত সাহিত্য বিষয়ক আলোচনা এবং কবি সম্মেলনের আয়োজন। ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে ওসবের অবদান অবশ্যই মনে রাখার এবং স্মরণ করারও।সাকিল আহমেদ এর কুসুমের ফেরা আজও জীবিত এবং চলিষ্ণু। সাকিল আহমেদ কাব্যগ্রন্থ, ছড়াগ্রন্থ ও একটি উপন্যাস লিখেছেন।
গত প্রায় চোদ্দ বছর ধরে ডায়মন্ডহারবারের ধনবেড়িয়া গ্রাম থেকে কবি, ছড়াকার সুব্রত মন্ডলের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়ে চলেছে আলোর মিছিল নামের পত্রিকা ।পত্রিকায় বড়দের উপযোগী গল্প, কবিতা, প্রবন্ধের পাশাপাশি ছোটছোট ছেলে মেয়েদের লেখা ছড়া, কবিতা এবং তাদের আঁকা চিত্রকর্মও মুদ্রিত হয় ।যা অভিনব শুধু নয় বেশ উৎসাহব্যঞ্জক।
নিলয় ভট্টাচার্য এবং তাঁর সহধর্মিণী দীপালি ভট্টাচার্য দীর্ঘদিন প্রকাশ করেছেন প্রতিবাদ নামের সংবাদ সাহিত্য ফোল্ডার ।বর্তমানে তা আর প্রকাশিত হয় না।
শ্রী নীলরতন মন্ডল কয়েকবছর ধরে প্রকাশ করছেন একটি পত্রিকা, নাম হীরকদ্যুতি। তবে তার প্রকাশ খুবই অনিয়মিত । নীলরতন এলাকার আঞ্চলিক ইতিহাস তথা মন্দির মসজিদ নিয়ে প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন ।ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্যচর্চার জগতে এইসব ক্রিয়াকান্ড সবিশেষ উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
ছবি : বিধান দেব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন