বুধবার, ৩০ মার্চ, ২০২২

সম্পাদকের কথা


দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২


 খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর বাঁধ। আমরা জানি। কিন্তু আমাদের বেঁধে বেঁধে রাখার জন্য কবিতা ছিল। কবিতা কী করে? সে প্রশ্ন বার বার মনে এসেছে। কিন্তু বিভিন্ন প্রেক্ষিতে তার জবাবও পেয়েছি। যেকোনও সামাজিক-রাষ্ট্রিক নিপীড়ন লাঞ্ছনার প্রতিবাদে কবিকে তলব করা হয়েছে শেষ পর্যন্ত। কবিতাই ধার্মিকের ঢাল অধার্মিকের তলোয়ার। নিজেকে লুকানোর গুপ্তগুহা। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন —
'এসো যুগান্তের কবি
আসন্ন সন্ধ্যার শেষ রশ্মিপাতে
দাঁড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে;
বলো, 'ক্ষমা করো'—

হ্যাঁ, সবাই এখন ব্যস্ত 'কবিরা কোথায়'?

যখন সত্যিই কারোর কিছু করার থাকে না তখনই কবির প্রকৃত প্রয়োজন হয়। এখন সেই সময়। টিমটিমে জ্যোৎস্নার আলোয় মৃদুমন্দ বসন্ত বাতাসে সুমিত কণ্ঠে ছন্দোচর্চা না করে কবির এখন সময় হয়েছে ক্ষমা চাওয়ার। ঠিক যেমন এর আগে আগেও কবি করেছেন। পৃথিবীতে দুর্দিন যখনই ঘনিয়ে এসেছে ঠিক তখনই। 

নয়া বৃহদারণ্যক ।। দেবাশিস দাশ


 


*৫. আত্মতত্ত্ব* 

আবার তিনের খেলা— কর্ম, নাম, রূপ

আলাদা আলোয় এরা তাসের তুরুপ।

'উক্থ' মন্ত্রে ত্রিবিধের উত্থান বর্ণিত।

বাক, চক্ষু ও শরীর— তিন ব্রহ্মে ধৃত—

যথাক্রমে নাম, রূপ আর কর্ম, তাই

সাম মন্ত্রে সাম্য গেঁথে ব্রহ্মত্ব শোনাই।—

বাক মানে শব্দ, সব নামের ধারক 

রূপের সমীকরণ বোঝে শুধু চোখ। 

শরীরই কর্মের ব্রহ্ম— ধারক বা সাম

তিন ব্রহ্ম মিলেমিশে গড়ে অন্তর্যাম।

বাক, চোখ, দেহী আত্মা— প্রত্যক্ষ গোচর

নাম, রূপ আর কর্ম পরোক্ষ, ধূসর। 

আলাদা হয়েও আল্লা আশ্চর্য একক— 

তিনি প্রাণশক্তি, তিনি বৃহদারণ্যক 

শ্রুতিতে দুর্জ্ঞেয় আত্মা, তিনিই অমৃত 

নাম-রূপ সত্তা তাঁকে করেছে আবৃত।


আত্মাই অমৃত, আত্মা একাকিত্ব-ভয়

অচিরে কাটিয়ে উঠে গড়েন আশ্রয়। 

আদিতে ছিলেন তিনি অব্যক্ত অরূপ 

দ্বিতীয় ইচ্ছায় হন উভলিঙ্গ-স্তূপ।

আদিতে সমস্ত ছিল ব্যাকরণহীন

আত্মবান মৃত্যু একা শান্তিতে বিলীন।

অকস্মাৎ মহাকাল স্বভাব-ঈক্ষণে

স্ফূর্ত হয়ে চতুর্লোক গড়েন বিজনে।

সেই সঙ্গে লোকপাল পুরুষ নিমেষে

পিণ্ডরূপ অণ্ড ফেটে পঞ্চেন্দ্রিয়-বেশে

আকৃতি নিলেন দেহে, এবং নিজেকে

ব্রহ্মরন্ধ্রে গুঁজে, খুলি দিয়ে নেন ঢেকে।

নাভিমূলে মৃত্যু আর হৃদিমধ্যে মন,

শিশ্নদ্বারে প্রজাপতি আবির্ভূত হন।

অন্যান্য ইন্দ্রিয় সব দেবতা-প্রতীক— 

চোখে সূর্য, নাকে বায়ু, কানে দিকপতি,

জিভে অগ্নি, ত্বক-রোমকূপে বনস্পতি।

অন্যদিকে পঞ্চভূতে ব্যাকৃত গতিক— 

প্রকৃতির ঘনীভূত রূপই অন্ন, তার 

গ্রাহক অপানবায়ু, নাভিতে আহার। 


এইসব আলবাল নানা গল্পচ্ছলে 

পরমাত্মা-জীবাত্মার ভাবরঙ্গ চলে। 

মোদ্দা কথা, টাইম-স্পেস— মানব-শরীরে

রহস্য ভাষায় ব্যক্ত হল ধীরে-ধীরে।


সৃষ্টিতে প্রবিষ্ট আত্মা অনাম-অকায়

নাম-রূপে মূর্ত হন প্রত্যেক সত্তায়।

ওঙ্কার তাঁরই নাম— বাক-রসনায়

বিকৃত আকৃতি তিনি চোখের তারায়।

তিনিই অমৃত, যিনি প্রাণের স্বরূপ

সমস্ত কর্মের মূল তিনিই কামরূপ।

মূর্ত ও অমূর্ত— দুই শিল্পে তাঁকে চিনি 

আমি গঙ্গানদী হলে মহাসিন্ধু তিনি। 

পাশ্চাত্য দর্শনে সিন্ধু ঢোঁড়ে ওল্ড ম্যান 

প্রাচ্যের চৈতন্যে তিনি ধ্যানলব্ধ জ্ঞান।


ছবি : বিধান দেব 


দেবাশিস দাশ। মিনিস্ট্রি অভ্ কালচার থেকে কবিতা নিয়ে জুনিয়র ফেলো নির্বাচিত হয়েছেন। শিবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন বিচ্ছিন্নভাবে। কবিতার জন্য উত্তরবঙ্গে ভ্রাম্যমাণ। স্বনামে ও ছদ্মনামে কবিতা ও গল্প লিখেছেন দেশ, আনন্দমেলা, সানন্দা, কবিতীর্থ, কৃত্তিবাস, ভাষানগর ও অন্যান্য বহু পত্রপত্রিকায়। অনুবাদ করেছেন টেড হিউস এবং জেমস জয়েসের কবিতা। 
কাব্যগ্রন্থ: পাথুরে মানুষ, মাটির মানুষ, কবিতীর্থ। জ্বলন্ত মৃত্যুর মুখে বাঁশি, কৃত্তিবাস। অণুজীবনের দীর্ঘশ্বাস, যাপনচিত্র। বিচালিঘাটের কথা, কুবোপাখি। মেঘে আঁকা ভাঙা সেতু, সিগনেট প্রেস।


জন্মের আগের মুখ ।। চন্দন মিত্র


 

জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন কোয়ানের অমায়িক ভুবন     


 ষোড়শ পর্ব

সামন্ততান্ত্রিক জাপান :

দাইমিয়ো, সামুরাই, শোগুন, শোগুনশোকু ও জোদো শু-র উত্থান   

 

হেইয়ান যুগের সময়সীমা ৭৯৪-১১৮৫ খ্রিস্টাব্দ। এই যুগের শেষের দিকে ফুজিওয়ারা, মিনামোতা, তাইরা, তাচিবানা প্রভৃতি পরিবারকেন্দ্রিক কিছু শক্তিশালীগোষ্ঠী মাথা চাড়া  দেয়। তারা সরাসরি রাজ-সিংহাসনের দাবি না-করলেও শাসনক্ষমতার নিয়ামক হয়ে  ওঠার জন্য নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে থাকে। বিভিন্ন প্রদেশের জমিজমা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা করে নেয়। সরকার তাদের এই সামন্তপ্রভু তথা জমিদার হয়ে ওঠাকে আটকাতে না-পেরে প্রকারান্তরে তাদের এই অনৈতিক দখলদারিত্বকে স্বীকৃতি দেয়। এই সামন্তপ্রভুরা জাপানে দাইমিয়ো নামে চিহ্নিত হয়ে আছে। সরকার তাদের তুষ্ট করার জন্য তাদের সম্পত্তির কর মকুব করলেও তারা কিন্তু নিজেদের দখলীকৃত অঞ্চলে বসবাসকারী কৃষকদের কাছ থেকে  চড়া হারে কর আদায় করত। দুর্ভিক্ষ বা মহামারী কবলিত সময়েও তারা প্রজাদের অব্যাহতি দিত না। এই দাইমিয়ো সামন্তপ্রভুরা নিজেদের বাহিনী গড়তে গিয়ে সামুরাই নামক ভয়ংকর যোদ্ধাদের জন্ম দেয়। জাপানি সামুরাই শব্দের অর্থ পরিষেবা দান। এই যোদ্ধারা ঘোড়ার পিঠে চেপে তলোয়ার ও তীরধনুক নিয়ে লড়াই করত। মাথায় থাকত শিং-শোভিত শিরস্ত্রাণ, বুকে থাকত চামড়ার বা ধাতুর বর্ম। সামুরাইরা কঠোরভাবে মেনে চলত তাদের নিজস্ব যুদ্ধনীতি বুশিদো (বাংলা অর্থ, যোদ্ধার পথ)। এই নির্ভীক যোদ্ধারা সামন্তপ্রভুদের সম্মান রক্ষার জন্য নিজেদের জীবন দিতেও পিছপা হত না। পরাজিত হয়ে বন্দি জীবন যাপনের থেকে আত্মহননকে তারা শ্রেয় বলে মনে করত। আত্মসম্মান রক্ষার জন্য তারা তলোয়ার বা ছুরি দিয়ে নিজেদের পেট চিরে আত্মহত্যা করত। আত্মহননের এই পদ্ধতি হারাকিরি নামে প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে

    ১১৮০ খ্রিস্টাব্দে জাপানের প্রভাবশালী দুই গোষ্ঠী তাইরা ও মিনামোতো নিজেদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী এক ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ে। এই যুদ্ধ গেনমেই কাসসেল নামে জাপানের ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। ১১৮৫ খ্রিস্টাব্দে তাইরা গোষ্ঠীর পরাজয়ের মাধ্যমে এই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। মিনামোতো গোষ্ঠীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন মিনামোতো নো ইয়োরিতোমো। সে সময় গো-তোবা (শাসনকাল, ১১৮০-১২৩৯ খ্রিঃ) ছিলেন জাপানের সম্রাট। তিনি এই ভেবে আশঙ্কিত হন যে, এবার  বোধহয় ইয়োরিতোমো সিংহাসনের দাবিদার হয়ে উঠবেন। তিনি তড়িঘড়ি করে তাঁকে শোগুন উপাধিতে ভূষিত করেন। শব্দটি ‘সেএইতাই শোগুন’ শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ ;   যার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায়, বর্বরবিরোধী বাহিনীর অধিনায়ক। এই উপাধি দানের  মাধ্যমে তিনি ইয়োরিতোমোকে সেনাপতিত্বে বরণ করে নেন। এই ঘটনা জাপানের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করে। সেনাপতির পদ পেয়ে ইয়োরিতোমো রাজধানী হেইয়ান (বর্তমান, কিয়োতো) ত্যাগ করে তিনশো চল্লিশ কিমি দূরে কামাকুরা নগরে চলে যান। সে সময় কামাকুরা ছিল হনশু দ্বীপের এক অখ্যাত উপকূলীয় অঞ্চল। রাজধানী থেকে নিরাপদ দূরত্বে বসে ইয়োরিতোমো, তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবায়নের পথে পা-রাখেন। ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে তিনি কামাকুরাতে সামরিক রাজধানী স্থাপন করেন। এই ঘটনার মাধ্যমে জাপানে সূচিত হয় দীর্ঘস্থায়ী কামাকুরা যুগ (১১৯২-১৩৩৩ খ্রিঃ)। সামুরাই যোদ্ধাদের সহায়তা তখন তাঁকে প্রায় অজেয় করে তুলেছে। সম্রাট গো-তোবা সব জেনেও নীরব থাকলেন। ফলত, জাপানে শুরু হল  দ্বৈত-শাসন-ব্যবস্থা। সম্রাট থাকলেন নামসর্বস্ব, প্রকৃত ক্ষমতা থাকল শোগুন তথা সামরিক প্রধানের হাতে। এই ব্যবস্থা জাপানে শোগুনশোকু নামে পরিচিত। ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে মেইজি যুগ সূচিত হওয়ার আগে পর্যন্ত শোগুনশোকু জাপানে বহালতবিয়তে টিকে ছিল।

    হেইয়ান যুগের শেষের দিকে তেন্দাই ও শিঙ্গন বৌদ্ধ সম্প্রদায় যথেষ্ট প্রভাব ও প্রতিপত্তি লাভ করেছিল। এই দুই সম্প্রদায় রাজপুরুষ ও অভিজাতদের সমর্থন পেয়ে পল্লবিত হয়ে ওঠে। কামাকুরা যুগের সূচনায় হোনেন শোনিন (১১৩৩-১২১২ খ্রিঃ)  জোদো শু নামের পৃথক এক বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রবর্তন করেন। হোনেন, প্রথম জীবনে  ছিলেন তেন্দাই সম্প্রদায়ের একনিষ্ঠ কর্মী। কিন্তু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল কার্যকলাপে বীতশ্রদ্ধ হয়ে তিনি নতুন পথের সন্ধান করতে থাকেন। বিভিন্ন মঠ ও  গ্রন্থাগারে ঘুরতে ঘুরতে একদা তাঁর হস্তগত হয় চিনা বৌদ্ধ সন্ন্যাসী শানতাও (৬১৩- ৬৮১ খ্রিঃ)-এর ভাষ্য সমন্বিত ‘অমিতায়ুরধ্যান সূত্র’ গ্রন্থটি। এই গ্রন্থের একটা অংশে তাঁর চোখ আটকে যায় “কেবল অমিতাভ বুদ্ধের নাম জপ করুন। হাঁটুন, দাঁড়ান, বসুন  বা শয়ন করুন একবারের জন্যও জপ বন্ধ করবেন না। সমস্ত সংকট কেটে যাবে ; এটাই বুদ্ধের প্রকৃত পথ।” চিনদেশে প্রচলিত ‘জিং থং জোঙ’ (ইংরেজিতে ‘পিওর ল্যান্ড’ ; বাংলাতে ‘বিশুদ্ধ ভূমি’) নামের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপাস্য এই অমিতাভ বুদ্ধ। চিনে তৃতীয় খ্রিস্টাব্দে এই সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল। শানতাও ছিলেন উক্ত সম্প্রদায়ের প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে উত্তর-পশ্চিম ভারতের এক সন্ন্যাসী রাজপুত্র ধর্মকর বা ধর্মকারা একটি পুথি লেখেন ‘সুখবতীব্যূহ সূত্র’। এই সূত্রে তিনি পাঠকদের আশ্বস্ত করেছিলেন যারা তাঁর নির্দেশিত পথে চলবেন তিনি নিজের তপোবলে তাদের জন্য এক জগৎ বানাবেন। তিনি তাঁর নির্মিত সেই জগতে অমিতাভ  বুদ্ধ হয়ে অনুগামীদের প্রতীক্ষায় থাকবেন। ‘সুখবতীব্যূহ সূত্র’ চিনে পৌঁছায় খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকে। মূলত এই সূত্রের প্রভাবেই চিনদেশে ‘জিং থং জোঙ’ সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল। ভারতীয় অমিতাভ চিনা উচ্চারণে হয়েছিল এইমিতোফু, এবার জাপানি উচ্চারণে তা হল, অমিদা। হোনেন ১১৯৮ খ্রিস্টাব্দে লিখে ফেললেন ‘সেনচাকু হোঙগান নেমবুৎসু শু’ নামের এক পুস্তক। সেখানে তিনি অমিদা বুদ্ধের নাম জপের মন্ত্রটি  এইভাবে উল্লেখ করেন, ‘নামু অমিদা বুৎসু’ (বাংলা, আমি অমিতাভ বুদ্ধের শরণ নিলাম)। এই জপমন্ত্রের সংক্ষিপ্ত রূপ ‘নেমবুৎসু’ অচিরেই মুখে মুখে ফিরতে থাকে। হোনেন আসলে নতুন কোনো বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সূত্রপাত করেননি। তিনি চিনে  প্রচলিত ‘জিং থং জোঙ’-এর জাপানি-সংস্করণ করেছিলেন মাত্র। ‘সুখবতীব্যূহ সূত্র’ অনুযায়ী অমিতাভ বুদ্ধ ‘পশ্চিম স্বর্গ’ নির্মাণ করে তাঁর অনুচর বোধিসত্ত্বদের নিয়ে অপেক্ষমাণ। শরণাগতদের তিনি তাঁর নির্মিত সেই অক্ষয় স্বর্গে স্থান দিতে বদ্ধপরিকর। কেবল তাঁর নামজপ করলেই অনুগামীরা পুনর্জন্ম পাবে। পশ্চিম স্বর্গে তারা পাবে পদ্মসম্ভব জীবন, অর্থাৎ তারা মাতৃগর্ভ নয় পদ্ম থেকে জন্ম নেবে। সেই স্বর্গে ব্যাধি, বার্ধক্য বা মৃত্যু নেই, আছে অপার শান্তি ও সৌন্দর্য। সেখানে আছে সুন্দর পোশাক ও সুখাদ্যের বন্দোবস্ত। কোনো রিপুর তাড়না নেই সেই স্বর্গে। সেখানে সুদৃশ্য প্রাসাদগুলি মূল্যবান রত্নমণ্ডিত, ভূমি আচ্ছাদিত সোনার পাতে। অতিকায় পদ্মের দল সেখানে সুবাস ছড়াচ্ছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে স্বর্গীয় সুর ও সুবাস। এই একবিংশ শতাব্দীতেও মানুষ যুক্তিবুদ্ধি বন্ধক দিয়ে স্বর্গের লোভে নিজেকে বা অন্যকে ধ্বংস করতে পিছপা হচ্ছে না, আর সামন্ততান্ত্রিক মাৎস্যন্যায়পীড়িত সাধারণ জাপানিদের  কাছে এই লোভনীয় আশ্বাস যে মৃতসঞ্জীবনীর মতো সুপেয় হয়ে উঠবে তাতে আর আশ্চর্য কী ! এমন স্বর্গ নাগালে এনে দেওয়ার জন্য হোনেন রীতিমতো প্রণম্য হয়ে উঠলেন। ক্রমশ তাঁর অনুগামীদের সংখ্যা বাড়তে লাগল। দারিদ্র্য, মহামারী, দুর্ভিক্ষ, ক্ষমতাশালীদের অত্যাচার বিড়ম্বিত করে তুলেছিল সাধারণ মানুষের জীবন। তারা হোনেন-এর দেখানো পথে হাতে যেন স্বর্গ পেল। জীবনের দিনগত পাপক্ষয় থেকে পলায়নের এক প্রশস্ত পথ পেল তারা। নাম জপের মাধ্যমে তারা মনের বিবিধ বিকার থেকেও মুক্তি পেল। হোনেন-এর এই উত্থানে তেন্দাই ও শিঙ্গন সম্প্রদায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাল। তারা ‘সেনচাকু হোঙগান নেমবুৎসু শু’ পুস্তকটি যেখানে পেল পোড়াতে শুরু করল। তাদের মন্ত্রণায় সম্রাট ৎসুচিমিকাদো (১১৯৮-১২১০ খ্রিঃ) ১২০৭ খ্রিস্টাব্দে হোনেনকে রাজধানী শহর হেইয়ান থেকে দূরবর্তী তোশো নামক স্থানে নির্বাসিত করেন। কেবল তাই নয় হোনেন-এর অনুগামীদের কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়, এমনকি প্রাণদণ্ডও দেওয়া হয়। জনমতের চাপে ১২১১ খ্রিস্টাব্দে হোনেনকে আবার হেইয়ানে ফিরিয়ে আনা হয়। কালক্রমে হোনেন কর্তৃক প্রচারিত জোদো শু জাপানের অন্যতম জনপ্রিয় বৌদ্ধ সম্প্রদায় হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিককালেও জাপানে এই সম্প্রদায়ের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি।  

 

তথ্যঋণ       



A Guide to Japanese Buddhism Published by Japan Buddhist Fedaration, 2004.

A New History of Shinto by John Been and Mark T. Ueen ; Wiley –Blackwell 2010.

Studies in Japanese Buddhism by A. K. Reischuer ; The Macmillan Company 1917.

A Brief History of Japan : Samurai, Shogun and Zen by : Tuttle Publication 2017.

A History of Japan by K. G. Henshall : Palgrave macmillan 1999.   

Pure Land Pure Mind : The Buddhism of Master Chu-hung and Tsung-pen ; Translated by J. C. Cleary. The Corporate Body of the Buddha Educational Foundation 1994.  

ছবি :বিধান দেব 


  চন্দন মিত্র। ।    জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৬, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ডায়মন্ড হারবার মহকুমার ভগবানপুর (হরিণডাঙা) গ্রামে। বাংলা ভাষা-সাহিত্যের শিক্ষক। কবিতা লেখার সূত্রে লেখালেখির জগতে প্রবেশ। লেখেন প্রবন্ধ ও গল্প । 

প্রকাশিত পুস্তক   : 

কাব্য পুস্তক : আমার আত্মার পায়ে বাঁধার ঘুঙুর, যাপনচিত্র, ২০১৯; সরলতা ক্রমশ গায়েব হইতেছে, সাহিত্যের বেলাভূমি ২০২০

প্রবন্ধ পুস্তক : জেন : রিপুতাড়িত মানবের নিকট সুসমাচার ও অন্যান্য প্রবন্ধ, কলিকাতা লেটার প্রেস, ২০১৯ 

সম্পাদিত পত্রিকা : পাড়ি





পাঠকের হাট ।। অরুণ পাঠক


 চাঁদের জমানো জলে মেঘ রঙ ছায়ার ফড়িং



যে কবিতা পার হতে গেলে মেঘের প্রতিরোধ এসে যায় সেরকম কবিতার মুখোমুখি বসে আমি বড় হয়েছি। বীজনের নেশায় তীব্র অশরীরী এক ঘোর আমার কবিতাশৈশবে যে সব কবিতার সামনে আমাকে দাঁড়াতে দিয়েছিল, যেসব কবিতার প্রত্যেকটি শব্দ তসবিহের দানার মতো এককালে আমি জপ করতাম তাদেরই স্রষ্টাদের একজন যখন দেশের মানচিত্র টপকে পার্শ্ববর্তী আরেক দেশের অপর একটি দেওয়াল এনে জুড়ে দেন নিজের মেঝেতে তখন বিস্ময়ের চেয়েও বেশি জাগে  সমৃদ্ধির প্রশ্ন। প্রসঙ্গত জানাই পার্শ্ববর্তী দেশ নিয়ে মাতোয়ারা আমার দেশের কিছু কবিবন্ধু যখন আহ্লাদের সঙ্গে নিজের দেশের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার সীমা লঙ্ঘন করেন তখন তাঁদের সেইসব আচরণকে নিতান্ত ফেক এবং অসভ্যতা বলে মনে হয়। কিন্তু সেসবের বিপরীতে যখন পড়ি:

'সকাল থেকে অন্ধকারে হাত ডুবিয়ে বসে আছে শাহীন। তার চোখের ভেতর ভেসে চলেছে নৌকো অথবা পালতোলা সোনার জাহাজ।'
                               (কব্জি কেঁদে ওঠে শাহীনের)
কিংবা

'কিছু মেঘ রোদ চুরি করে পালাচ্ছে, আর কিছু নক্ষত্র পুলিশ হয়ে ধাওয়া করছে তার পিছু। চোর পুলিশের এই 'খেলায় আমার ভূমিকা নিতান্তই দর্শকের, কিন্তু যখন ক্যাসিনোকে হটিয়ে পেঁয়াজের কিছু ঝাঁজ এসে গ্রাস করে নিলো চোখের করোটি, ঠিক তখনই ঘুম ভাঙল রাখালের, শষ্যের শেষ রক্ষায় মাঠে নেমে এলো কবি।'
                                                              (কবি)

উল্লিখিত দুই কবিতাংশের প্রথম কবি সৌমিত বসু এবং দ্বিতীয় কবি শাহীন রেজা । প্রথমজন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আর দ্বিতীয়জন বাংলাদেশের আটের দশকের খ্যাতিমান দুই কবি। একই উপমহাদেশের দুই বিচ্ছিন্ন বঙ্গ প্রদেশের একই সময়ের এই দুই কবির এক মলাটের ভেতর দুটি দুফর্মার কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা ২০২২-এ।
১। চাঁদের জমানো জলে মুখ দেখা যায়— সৌমিত বসু
২৷ মেঘরঙ ছায়ার ফড়িং—  শাহীন রেজা

দুজনেই বহুপ্রজ কবি। দুজনেরই প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ সংখ্যা ছাব্বিশ।
সৌমিত বসুর সুদীর্ঘ কবিতাযাত্রার ইতিবৃত্ত ইতিপূর্বে আমি লিখেছি। আটের দশকের প্রতিভাবান এই কবি নিজেকে বহুবার ভেঙেছেন। প্রশ্ন করেছেন নিজের কবিসত্তাকে। চ্যালেঞ্জ করেছেন, ঝুঁকি নিয়েছেন। নিজের স্বতন্ত্র কাব্যভাষা খুঁজে পেতে একজন কবিকে কতটা পথ হাঁটতে হয় কবি সৌমিত বসু তার প্রমাণ। অথচ তার পথের আনন্দ, যা আমরা কুড়িয়ে পেয়েছি, অমূল্য সে সব।

'তোমার নখ থেকে কাঠবেড়ালি বেরিয়ে
অসহায়ভাবে আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে
উপমাটি কি অবাস্তব হয়ে গেল খুব?'
                            (তরঙ্গ ছুঁয়ে যায় কবিতার পাতা)

বহুদিন পর কবিকে স্বমেজাজে পেলাম মনে হচ্ছে। নখ থেকে কাঠবেড়ালি বেরিয়ে আকাশে উড়ছে— এই অসামান্য দৃশ্য তো একজন কবিই দেখতে পান! যদিও কবি এই দৃশ্যটিকে খুব অবাস্তব কিনা প্রশ্ন করেছেন তার পাঠকদের। যদিও সেই অবাস্তবতার অনর্থ নিয়েই তিনি সারাজীবন বাঁচতে চান।




'আমি এই কাঠবেড়ালি, মেঘ আর আকাশ নিয়েই বেঁচে থাকতে চাই। সারাটাজীবন।' প্রাত্যহিকতার সব প্রয়োজনের বাইরে দাঁড়িয়ে একজন কবিকে মোকাবিলা করতে হয় একঘেয়ে সমস্ত প্রণালীর। আর এগিয়ে দিতে হয় এক অকৃত্রিম সাধুস্বভাব।

'সম্পর্কগুলো থমকে রয়েছে ভেবে কাঁধে হাত রাখি
লাউডগার মতো কাঁধ, মাখনের ভেতরকার ছুরির মতো
আমার হাত বসে যায় তার কাঁধের ভেতর।
তখন সামনের গলি ওয়াক করে উগরে দিচ্ছে চাঁদ।'
                                                                        (ঝড়)
সৌমিত বসুর কবিতার মধ্যে এক অন্ধকার আর্তি থাকে।
তা একদিকে মেটাফিজিক্যাল ডার্কনেস হতে পারে, হতে পারে ডাডাইজমের ঝোড়োপ্রকল্পোত্তর সব তছনছ। স্পষ্টবাদিতা, বৈপ্লবিক সমাজশাসনের বিরুদ্ধাচরণ তাঁর মধ্যে কি দেখতে সাহায্য করে না নতুন কোনও চারু মজুমদার কিংবা শৈলেশ্বর ঘোষকে!
'একটি ফনিমনসা দু-হাতে আতঙ্ক মেখে নিচুমুখে এসে দাড়াচ্ছে/ গ্যারেজের পেছনে।' (ঝড়)

এই দু-হাতে আতঙ্কমাখা ফনিমনসাই সৌমিত বসুর কবিতা। বেশ কিছু কবিতা তিনি এখানে লিখেছেন বর্তমান বিশ্বে আলোচিত ওয়ার্ড পেন্টিং-এর মতো। শব্দে ছবি সেখানে বেজে যায় সংগীতের মতো।

'ঝড় জঙ্গলের ভেতর থেকে নেমে আসে লালটিপ।
নেমে আসে। আর দু-হাতে সাবান মেখে উড়িয়ে দিয়েছে যারা
তাদের নাভির ওপর চেরা দাগ। ঘুড়ি উড়ছে পতঙ্গ মতো।'
                                                  (গৃহ)

বেশ দীর্ঘ টানা কবিতা। শব্দ—ছবি—সংগীত।

বাংলাদেশের কবি শাহীন রেজাকে প্রথম দর্শনেই ভালবেসে ফেলা যায়। কাকদ্বীপে তিনি একবার এসেছিলেন। সেখানেই আলাপ। ভালোবাসা যার সম্পদ তিনি অনির্বান। কবি শাহীন রেজার কবিতাও জলের স্পর্শের মতো সহজ, আনমিতা। বাংলাদেশের কবিতায় যে আবেগ মাতৃভাষা ও মাতৃদেশকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে তা সত্তর দশক পর্যন্ত বহমান ছিল। আশির দশক থেকে তা কিছুটা বাঁকবদল করে। জীবন ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে যে লড়াই তার পৌনপুনিকতা থেকে বাংলা কবিতার উচ্চারণকে স্বতন্ত্র পথে নিয়ে এসেছেন কবি শাহীন রেজা।

'চোয়ালের কাটা দাগটাকে গোলাপ ভেবে যেদিন তুমি ছুঁয়ে দিয়েছিলে,/ সেইদিন বুঝেছিলাম/ আমার মৃত্যু সে তোমার হাতে।/ লালের জলসায় সারারাত ডাহুকীর গল্প শোনার পর ভোরের আলো/ ফুটে উঠতেই/ ইথারে ইথারে 'আচ্ছালাতু খয়রুম মিনান নউম'।/ জেগে ওঠার মন্ত্রে পুনর্জন্ম আমার; আমাদের।'
                                                            (বিস্মরণ)

শাহীন রেজা প্রেমিক কবি। সে প্রেম হৃদয় নিঙরানো। ইতিহাস দোহন করা।

'বেদনা রেখেছি এঁকে দু'ঠোঁটের ফাঁকে
মনে পড়ে আজ, খুব মনে পড়ে তাঁকে
জানালার গ্রীলে কত পাখি আসে
কত চেনা মুখ আলোজলে ভাসে
সেই আশালতা তবু খোঁজে চোখ
ইকারুসে কি নিপুন করোটির শোক।'
                                    (শামসুর রাহমান)





একটি ছোট্ট এলিজি। সুনিপুন সংহতিতে গড়া। আ মরি বাংলা ভাষায় গড়ে ওঠা কবির মননে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ থেকে শক্তি-শামসুর হয়ে একালের তরুণ কবিরাও এসে যান।
'এখন আকাশে জমে উঠলে ধূসর, মনের বীণায় আহা রবীন্দ্রনাথ; শুধু ভালোবাসাবাসি।' (নিবেদন)

'ক্লাস নাইনের সিঁড়ি পেরুতে না পেরুতেই আমার মগজে ঢুকে যায় বনলতা সেন।'     (বনলতা সিনড্রোম)

'কবি যায়, ট্রামের জানালা দিয়ে ঘুম ঘুম তারাগুলো
ডাকে তাকে; ডাকে ইশারায়।'   (শক্তির জন্মদিনে)

কবি শাহীন রেজা, আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আপনার মেঘমেদুর কবিতা আপনার সরল হৃদয়ের একান্তে আমাদের প্রিয়তম একটি দেশকে চিহ্নিত করে যা একদা আপন মেয়ের মতো নিজের ছিল, এখন আত্মীয় হয়ে গেছে।

চাঁদের জমানো জলে মুখ দেখা যায়— সৌমিত বসু
মেঘরঙ ছায়ার ফড়িং—  শাহীন রেজা
দি সী বুক এজেন্সি ।। কলকাতা ।। ১০০ টাকা ।। প্রচ্ছদ: চারু পিন্টু

ছবি : বিধান দেব 

অরুণ পাঠক ।। জন্ম: ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ কাঁজিয়াখালি, হাওড়ার মাতুলালয়ে। পিতৃভূমি দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সোনাকোপা গ্রাম। সেখানেই আবাল্য বসবাস। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  বঙ্গভাষা ও সাহিত্য-এ  স্নাতকোত্তর।
শিক্ষক শিক্ষণ ডিগ্রিপ্রাপ্ত। পেশা শিক্ষকতা। এই শতাব্দীর সূচনা (শূন্য) দশকের কবি। কবিতা ও কবিতা বিষয়ক  সাহিত্যপত্র 'সাহিত্যের বেলাভূমি ' পত্রিকার সম্পাদক। স্যাক সাহিত্য সম্মাননা, বনানী পুরস্কার, সামসুল হক স্মৃতি পুরস্কার প্রভৃতি একাধিক পুরস্কারে সম্মানিত। কবিতা পড়তে একাধিকবার বাংলাদেশে গিয়েছেন। বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়েছে কাব্যগ্রন্থ 'দ্বিতীয় বার একা'। কবিতাই তাঁর প্রথম এবং একমাত্র আশ্রয়।

সুপুরিবনের ছায়ায় ছায়ায় ।। সুবীর সরকার


 


৯.
আমি আমার ১৮ বছর বয়স থেকে বাবু দার কাছে যাই।বাবু দা, মানে শ্রী দেবজ্যোতি রায়।লেখার মানুষ।মুক্তচিন্তার মানুষ।নকশালবাড়ি আন্দোলনের মানুষ।প্রখর পড়ুয়া।গভীর দুই চোখের ভেতর একজন সন্ত বুঝি।সন্ন্যাসী ও সৈনিক বুঝি।কিভাবে বাবু দার সাথে পরিচয় হয়েছিল আজ আর সেটা মনে নেই।বাবুদা তখন থাকতেন কুচবিহারের পাটাকুড়ার বাড়িতে।একটা স্কুটার ছিল বাবু দার।
তখন তিনি রাজনৈতিক সক্রিয়তা থেকে সরে এসেছেন।নিমজ্জিত হয়েছেন লেখা পড়া মানব অধিকার সংক্রান্ত কাজকর্মে।
আমি সপ্তাহে তিনদিন সাইকেল চালিয়ে বাবু দার বাসায় যেতাম।ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার সামনে বসে থাকতাম।সাহিত্য সমাজ নিয়ে বাবু দা বলে যেতেন নানা কথা।মাঝে মাঝে শোনাতেন নিজের লেখা।
তবে কবিতা নয় বাবু দার গদ্য আমাকে আকৃষ্ট করতো।এখনও করে।নিজের রাজনৈতিক জীবনের নানান অভিজ্ঞতা শোনাতেন তিনি।কত কত মানুষ।ঘটনা।অভিজ্ঞতা।আমি উদ্বেল হয়ে পড়তাম।উত্তেজিত হয়ে পড়তাম।সেই সময় নিজের রাজনীতি আর জীবন নিয়ে একটা বড় গদ্য লিখছিলেন বাবু দা।মাঝে মাঝে শোনাতেন।গণপিটুনি,ধরা পড়া,জেলযাত্রা আর চোরাবালিতে ডুবে পড়বার গল্পগুলি মন্ত্রমুগ্ধের মতন শোনা হয়ে যেত আমার।পরবর্তীতে সেই লেখা বই হয়ে বেরিয়েছিল_"নরকের থেকে একটুকরো অনির্বচনীয় মেঘ"।
আমার ভেতরে জীবন আর সৃজন নিয়ে কত প্রশ্নই তো জমতো।সেই সব প্রশ্নগুলো ছুড়ে দিতাম আর বাবু দা শান্ত ভাবে সেই সব নিয়ে কথা বলে যেতেন।আমার জীবনবোধ কেমন বুঝি বদলে বদলে যেত।ভেতরের খিদে বেড়ে যেত।
এক নুতন মানুষ হয়ে উঠতে থাকতাম আমি।
আমার সৃজন জীবনে মস্ত এক ছায়া হয়েই থাকবেন বাবু দা।
যদিও এখন আর আগের আড্ডা হয় না।
জাস্ট দেখা আর কুশল বিনিময় হয়।
শ্রী দেবজ্যোতি রায়ের কাছে অনন্ত ঋণ আমার।
১০.
প্রায় ৩৫ বছর আগে আমার সঙ্গে পরিচয় আর ক্রমে সখ্যতা জমেছিল ভানু দার সাথে।ভানু ভট্টাচার্য।তিনি নিজে কবিতা লিখতেন না।গিটার বাজাতেন।টিউশন করতেন।আর সম্পাদনা করতেন "অহংকারী অন্বেষা" নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা।আমি ডাকে লেখা পাঠাই।লেখাটি প্রকাশিত হয়।তারপর একদিন সাইকেল নিয়ে সটান হাজির সম্পাদকের ইন্দ্রজিৎ কলোনির বাড়িতে।সেটা ছিল বৈশাখের তপ্ত দুপুর।একজন হাসিখুশি মজলিসি মানুষ ছিলেন ভানু ভট্টাচার্য।প্রথম আলাপেই আমাকে কাছে টেনে নিলেন।আমার ভেতর স্বপ্ন ছড়িয়ে দিলেন ভানু দা।
আমিও যুক্ত হয়ে পড়লাম "অহংকারী অন্বেষা"_র সঙ্গে। পরে আমাকে সহ সম্পাদক করেছিলেন ভানু দা।তীব্র তেজ নিয়ে আমি ঘুরে বেড়াতে থাকলাম সমস্ত শহর।আমাকে তখন কবিতায় পেয়েছে।আমি আর ভানু দা প্রায় দিন আড্ডা দিতাম।কখনো যোগ দিতেন রমেন দাস,ভগীরথ দা,কুমার শিবেন্দ্র নারায়ণ,ঘেঘিরঘাট থেকে এসে জুটতো চন্দন কুমার চন্দ।নিজেদের লেখা,স্বপ্ন আর পত্রিকা নিয়ে নানান পরিকল্পনা নিয়ে সে এক উন্মাদনার পর্ব।সে এক উত্তাল প্রস্তুতিপর্ব আমার জীবনের।
১৯৯৭ সালে পত্রিকা চালাতে না পেরে বন্ধ করে দিলেন ভানু দা।আমিও তখন তীব্র বেকার।আর্থিক ভাবে দাড়ানো সম্ভব ছিল না পাশে।ভানু দাও আর্থিক কষ্টে সময় কাটাচ্ছেন।বিয়ে করেছেন।সেই দায় তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।
এর পর ২০০৫ সালে আমি কুচবিহার ছেড়ে মাথাভাঙ্গা চলে গেলাম।ইতিমধ্যে ভানু দার সঙ্গে যোগাযোগ কমে এসেছিল।
আমিও জীবন নিয়ে ব্যতিব্যস্ত।
অনেক পরে একদিন শুনলাম ভানু ভট্টাচার্য আর নেই।একটি চিট ফান্ডে জড়িয়ে গিয়ে তিনি তীব্র হতাশায় আত্মহনন করেছেন।
আচমকা হারিয়ে গেছে রমেন দাও।
চন্দন কবিতা ছেড়ে আশ্রম বানিয়ে সাধু হয়ে গেছে।
আমার জীবনে ভানু দা শান্ত এক সুপুরি গাছের ছায়া।গহিন মায়া।
যতদিন বাঁচবো,ভানু দাকে বহন করবো আমি।

ছবি : বিধান দেব 

সুবীর সরকার. জন্ম 1970, 3 জানুয়ারি. নয়ের দশকে লিখতে আসা এ কবি উত্তরের লোকজীবনের সাথে জড়িয়ে আছেন তীব্র ভাবে. ত্রিশ বছরের বেশী সময় ধরে কবিতা, গদ্য সহ বিভিন্ন ধারায় অনায়াস যাতায়াত করেছেন. বাংলা ভাষার প্রায় সব কাগজে নিয়মিত লেখালিখি করেছেন, করছেন. 1996 সালে তাঁর প্রথম কবিতাবই প্রকাশিত হয় কবিতা পাক্ষিক থেকে. গুরুত্বপূর্ণ কবিতা ও গদ্যের বইগুলো- ধানবাড়ি গানবাড়ি, মাহুত বন্ধু রে, নির্বাচিত কবিতা, বিবাহ বাজনা, নাচঘর, উত্তরজনপদবৃত্তান্ত, মাতব্বর বৃত্তান্ত, ভাঙা সেতুর গান. পেশায় শিক্ষক এ কবি ভালোবাসেন রবিশস্যের খামার বাড়ি, সাদা ঘোড়া আর যৌথ যাপনে চাঁদের আলোয় কবিতা আড্ডা, লোকগানের আমেজ.

এ মাসের কবি ।। মাধবী দাস

 

 সন্ধ্যার সিলিকন


শ্রীহীন নক্ষত্র দেখে ধূসর পাণ্ডুলিপির কথা 

মনে পড়েছিল

যে রশ্মি জানার জন্য ইশারায় জল-বিভাজিকা

গোলাপি আঙুলে আংটি পরা পূর্ণিমার রাত দেখা

সে রশ্মি সন্ধ্যার স্তব্ধ সিলিকন ভ্যালি


আমি তো আয়নার চারদিকে ঘুরে ঘুরে 

আলো হাতে জ্বলে উঠতে পারি

কৃত্রিম আবেশে তারা গোনার নাটকও করতে পারি

চূড়ান্ত দুঃখেও সুখী সুখী অভিনয় করতে পারি

হাসিতে ছড়িয়ে দিতে পারি মোহজাল

আমার উজ্জ্বলতায় ম্লান হতে পারে 

হাজার তুষারশুভ্র হৃদয়ের চূড়া


দিন শেষে জালুকবাড়ির 

না-বলা কথারা তবু মাথাচাড়া দিলে

সমস্ত অহংকারের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়


বৈদুর্যমণির তীব্র আকর্ষণ আজও

জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে 

নৈঃশব্দ্যের একক মুহূর্তে


দেখার ইচ্ছে


গতিজাড্যে ধুলো হয়ে ওড়ে

অস্বীকৃত সম্পর্কের ছাদ

অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে

মাধুকরী তৃষ্ণা মিটছে বলে

অস্বীকার করছো আলোকেই


চোখের দেখাটা দেখতে চাইলে

প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিয়ে শোনাও আসন্ন যুদ্ধকথা 

আমিতো দুচোখে জ্যোৎস্না মেখে

একটু ভালো থাকতেই চেয়েছি

লতানো গাছের মতো মায়াজালে তো জড়াতে চাইনি 


ছুঁতে চাওয়া মানুষের মতো

দেখতে চাওয়া অনুভূতিগুলো

এভাবে ক্রমশ অহংকারে

পতিত হয়েই যুদ্ধে হেরে যাবে

সেদিন আয়নার সামনে নিজেকে দেখতেই

মানুষ হাঁফিয়ে উঠবে দেখো


'হে মহাজীবন' 

স্পর্শ কেড়ে নিয়েছ তা নাও !

দেখার ইচ্ছেটা তো থাকুক!



উত্তরের গান



এখানে সবুজ মাঠে কত পাখি দানা খুঁটে খায়

লক্ষ্যহীন পথ বেয়ে উদ্ভ্রান্ত চলেছে পরিযায়ী 

ঈশ্বর বিরোধী মন আত্মদীপ জ্বেলে দিয়ে যায়

পোয়াতি ধানের ক্ষেতে হেমন্ত দুপুর আততায়ী 

জীবনে মৃত্যুতে তুমি অধিকার নিয়ে ফিরে এসো

সংসারে কল্যাণ হোক শান্ত সহ-অবস্থান রেখে

উত্তর বাংলার পথে আমাদের গান ভালোবেসো

চাঁদের শরীর থেকে নিখাদ কলঙ্ক মেখে মেখে


ছায়াকে ছাপিয়ে ওঠো চুপ-রাত্রি তোর্ষার আদরে

পাথরের আরশিতে চুমু খেয়ে শীত খোঁজে চাঁদ

অন্ধকার আলো হবে বছর খানেক আরও পরে

ক্যালেন্ডার বাজি রাখি, সব যেন জোনাকির ফাঁদ। 

আকাশ পিয়ানো বাজে সহজিয়া বাউলের সুরে

পুরনো নভেল ফেলে প্রেম খুঁজি বালুচর খুঁড়ে।


 পতনের শব্দ


বৃষ্টির মতন যদি ব্যর্থ মানুষের

পতনের শব্দ শোনা যেত

রক্তের ফোয়ারা থেকে আপশোসের মতো 

পুরনো গ্রহের দোষ বের হয়ে আসত

আমি দক্ষিণের জানলা খুলে

দু'চারফোঁটা শান্তিজল ছিটিয়ে দিতাম

সবাইকে বুঝিয়ে দিতাম 

চোখের জলের তাপ ফুটন্ত লোহাকে

কীভাবে হারিয়ে দেয়


প্রতিবার বর্ষা এলে হাড়ে হাড়ে বুঝি

আগুনের থেকে এই বৃষ্টিই 

আমাকে পোড়ায় বেশি


শূন্য দিয়ে মৃত্যু আঁকি


ব্যথাকে ব্যথিত করে এগিয়ে চলেছি 

এক- দুই- একশো -দুশো হাজার ছাড়িয়ে লক্ষ 

এভাবে শূন্যের পিঠে শূন্য বসে বসে 

গুণিতক সংখ্যা রোজ শুধু বিয়োগান্ত 

নির্বাক অঙ্কের ছবি ঘিরে

শূন্যের মহিমা নাটকীয় ...


অশনি চানক্য টুঁটি চেপে ধরে আছে

কান্নায় ফুঁপিয়ে উঠছে হাজার হাজার 

নদী উপত্যকা

বরফ গলে না তবু ধূর্ত কৌশলের...


কত শবদেহ গন্ধ পেল না ফুলের 

পেল না রুপোলি অশ্রুধারা 

বুকের উপর নুয়ে পড়ল না লালন


গাছের মগডালে ঝুলে থাকা

নিম- তেতো বিশ্ব থেকে কুয়াশার মতো 

গড়িয়ে গড়িয়ে নামছে নীল পরাভব 

মিথ্যে বিস্ফোরকে 

পাল্টে যাচ্ছে বিপদ সংকেত


এভাবে মুখোশ পরে আমরা 

বীতনিদ্র জনস্রোতে বেঁচে

শূন্য দিয়ে মৃত্যু আঁকছি ভাতের থালায়...


ছবি : বিধান দেব 

মাধবী দাস। জন্ম কর্ম  কোচবিহার। শিক্ষক বাবা মায়ের সন্তান । কর্মজীবন শুরু কোচবিহারের আচার্য ব্রজেন্দ্র নাথ শীল মহাবিদ্যালয়ের আংশিক সময়ের শিক্ষক হিসেবে। বর্তমানে মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ছাত্রাবস্থায় লেখালেখি শুরু। বাংলার বহু বানিজ্যিক ও লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত কবিতা ,গল্প,প্রতিবেদন,বুকরিভিউ,উত্তর সম্পাদকীয় লিখে বিশেষ পরিচিত কলম।রয়েছে পাঁচটি টি কাব্যগ্রন্থ - অযোগবাহ বর্ণ, আদিধর্মকথা,ঋতুজন্ম ,মৃত্যুর ব্যাকরণ, সন্ধ্যার সিলিকন। সম্পাদনা করছেন পত্রিকা গোল্লাছুট। অযোগবাহ বর্ণ এর জন্য পেয়েছেন বহু সম্মাননা । তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কবিতাপাক্ষিক সম্মাননা, সৈয়দ আহাসন আলী সম্মাননা,‌ বিবর্তন সম্মান ইত্যাদি।

রবিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

সম্পাদকের কথা


         দ্বিতীয় বর্ষ  ।। সপ্তম সংখ্যা ।। ফেব্রুয়ারি ২০২২

মহামারীর ঝড়ঝাপটা সামলাতে না সামলাতে মহাযুদ্ধ। মানুষের আর নিস্তার নেই। যে কোনও ঘটনার প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষ দায় আমাদের নিতে হয় সকলকেই। সেই দায় বইতে বইতে আমরা দিশেহারা। ফুল খেলার দিন বুঝি এই বিশ্বে কখনোই আর আসবে না। কিন্তু মানুষের নিঃশ্বাস আর বিশ্বাস যতদিন থাকবে ততদিন সে আশাকে রোপন করবেই। জল দেবে প্রত্যয়ের। তারই ফলশ্রুতি বিভিন্ন উৎসব। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বইমেলা। লিটল ম্যাগাজিন মেলা। আমরা প্রাণ পেলাম। আমাদের মুখের ভাষা মরে গেছে। কিন্তু মনের ভাষা এখনও জাগ্রত। সেই মনের ভাষা মলাটবন্দি হয়ে ঘুরছে টেবিলে টেবিলে, স্টলে স্টলে, হাতে হাতে। যুদ্ধ-দুর্ভিক্ষ-মহামারী থাকবে। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও মানুষের প্রেমকে কখনোই ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। প্রেম শুধু নারী-পুরুষের নয়। তা মানুষকে সামাজিক-রাষ্ট্রিক-বৈশ্বিক কল্যাণের পথে নিয়ে যায়। আমাদের প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ সেই প্রেম থেকেই উৎসারিত। তা যেন কখনও ব্যক্তিগত স্তরে আটকে না যায়। গানে গানে আমাদের যাবতীয় সংকীর্ণ বন্ধন টুকে যাক। বৃহৎ বন্ধনে আবদ্ধ হই আমরা। বিশ্বের যত সুখ যত দুঃখ সব যেন আমাদের চিত্তমাঝে সমানভাবে আঘাত করে। প্রণাম হে কবিতাকাণ্ডারী।

গদ্য ।। সুরজিৎ প্রামাণিক


 নৈরাজ্য ও অবক্ষয়ের কবি শামশের আনোয়ার




শামশের আনোয়ার গত শতাব্দীর ষাটের দশকের অন্যতম একজন বলিষ্ঠ কবি। ষাটের দশকের বাংলা কবিতায় উল্লিখিত আন্দোলন গুলির কোনটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থেকেও, হাংরি আন্দোলনের প্রচ্ছন্ন প্রভাব তাঁকে চালিত করেছিল বলে মনে হয়। প্রবল নৈরাজ্য, নৈরাশ্য, আত্মক্ষয়, নৈতিক অবক্ষয়ের ক্লান্তি ঘিরে ধরেছিল কবি শামশেরকে। ষাটের সমাজ ও সময় সম্পর্কে অহ্নিক বসু তাঁর 'একটি হিমশীতল স্বীকারোক্তি : শামশের আনোয়ারের কবিতা' শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন ---


"বাইরে স্বাধীন ভারতের স্বপ্নের ধ্বংসস্তূপ, প্রত্যাশার লাশ, চীন- ভারত যুদ্ধ, কমিউনিস্ট পার্টির ভাঙ্গন, নকশাল আন্দোলন। আর ভেতরে মেধাজীবি মধ্যবিত্তের বিষন্ন একাকীত্ব। এই দশকেই সোমেশ নন্দীর নাটকে অ্যাবসার্ড চিন্তাধারার সাথে আমাদের পরিচয়, অন্তঃসারশূন্য ছকে বাঁধা জীবন নিয়ে প্রশ্ন এই প্রথম। এই দশকেই বাদল সরকারের 'এবং ইন্দ্রজিৎ', মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যু সংবাদ। কবিতার ক্ষেত্রেও পাল্টে গেল অনেক কিছু।"


অর্থাৎ সমকালই শামশের আনোয়ারকে ভয়ঙ্কর নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিয়েছিল তা বলাই যায়। ফলে শামশের আনোয়ারের কবিতা সমকালকে প্রেক্ষাপটে ধারণ করে হয়ে উঠেছিল তীব্র অস্বস্তিকর। তাই শামশেরের কবিতা নান্দনিক সহ্যের সীমাটিও পার হয়ে গেছে অনবরত। এই প্রসঙ্গে ব্যক্তি শামশের সম্পর্কে আমরা বিশেষ কিছু জানতে পারি দে'জ প্রকাশিত তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতার ভূমিকায় তাঁরই বন্ধু কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর স্মৃতিচারণে--- 


"শামশেরের সঙ্গে বন্ধুত্বটাই ছিলো একটা বাঘের সঙ্গে বন্ধুত্বের মতো। এতটাই উদ্দামতা, সজীবতা, দুঃসাহসিকতা ছিল শামশেরের--- এতটাই আক্রমনাত্মক, বিষন্ন আর ক্ষুব্ধ--- এতটাই আন্তরিক ছিলো শামশের--- এতটাই আন্তরিক যে, প্রকৃত শামশেরকে খুঁজে পাওয়াই ছিলো মুশকিল।"


এবং সেইসঙ্গে কবি ভাস্কর চক্রবর্তী আরও বলেন--- 


"আমাদের ভাষায় এমন সশস্ত্র এক আধুনিক কবি, সত্যিই, খুঁজে পাওয়া ভার।"


অর্থাৎ শামশের আনোয়ার কবি হিসেবে একইসঙ্গে সশস্ত্র এবং আধুনিক। কারণ তিনি প্রকৃত অর্থেই একজন সময়ের যথার্থ সন্তান এবং তাঁর কবিতা প্রকৃতপক্ষে সময়েরই যথার্থ অর্জন হয়ে উঠেছে। তাই শামশেরের সমস্ত কবিতাই এক অর্থে আত্ম-জৈবনিক। মাত্র তিনটি কবিতার বই লিখেই বাংলা কবিতায় অনন্য নজির স্থাপন করে গেলেন তিনি। তাঁর কাব্যের বই---


'মা কিংবা প্রেমিকা স্মরণে', 

'মূর্খ স্বপ্নের গান' এবং 

'শিকল আমার গায়ের গন্ধে'। 


তাঁর 'মা কিংবা প্রেমিকা স্মরণে' কাব্যগ্রন্থের নামকরণে আমরা এক অদ্ভুত চমক দেখি। সেখানে অন্যান্য জটিলতার সঙ্গে ইদিপাস কমপ্লেক্স- এর কি কোন সম্পর্ক আছে ! 


"আমি তোমার সবুজ তলপেট জরায়ু আর হৃদয় খুঁড়ে- খুঁড়ে

ফিরে পেতে চেয়েছিলাম স্মৃতির ধ্বংসাবশেষ।

কুসুমিত স্তনদুটির কাছে প্রার্থনা ছিলো

তোমার মায়ের কৈশোরিক গোলাপের ঘ্রাণ

অই সুড়ঙ্গেতে আছে তাঁর বালিকাবেলার অব্যবহৃত চোরাকুঠুরী

অথচ তুমি কোনোদিনই গর্ভধারণের মতো ঘনিষ্ঠ হলে না।"

---('মা কিংবা প্রেমিকা স্মরণে')


এই কবিতাংশে অবদমিত যৌনতার কাব্যিক রসাভাস মা এবং প্রেমিকাকে কোন বিচ্ছিন্ন বোধে পৃথক করে না। কারণ--- 


"তোমার শরীরের পাতায় পাতায় আমি খুঁজেছি তারই রক্তের দাগ

বুকের মধ্যাহ্ন আকাশে যৌবনের দীপ্ত জ্বালা

---(মা কিংবা প্রেমিকা স্মরণে) 


যে প্রেমিকার মা পাগলিনী প্রায় হয়ে ব্যকুল বাঘিনীর মত কবিকে স্তন্যপান করিয়েছিলেন একদিন, কবির তৃষ্ণার কান্নায় যার শুকনো বুকে দুকুল ছাপিয়ে দুধের বান ডেকেছিল, কবি তাঁর উদ্দেশ্যেই বলেন---


"আমি তাঁর গর্ভের চোরা কুঠুরিতে ঘুনের মতো লুকিয়ে বেঁচেছি" 

---(মা কিংবা প্রেমিকা স্মরণে) 


যৌনতার এহেন সীমা লংঘনকারী বাস্তবতা তাঁর কবিতাকে অচিরেই সেই সময়ের কবিতার মধ্যে স্বাতন্ত্র্য এনে দিয়েছিল। 


শামশের আনোয়ার তাঁর জীবন- যাপনে এবং কবিতায় এমনই এক আধুনিকতার সন্ধান করেছিলেন, যা অকৃত্রিম যুগ- পরিহাসের অনেক উপরে। তিনি লিখতে পারেন---


"তোমার শরীর ডাক্তারের চেম্বারের মতো

সুবিন্যস্ত, জটিল ও দ্যুতিময়

আমি ঐ শরীরের তীব্র ভেষজ গন্ধ, বক্রমুখ পিপাসু ছুরি

ও রক্তাক্ত ব্যান্ডেজ তুলো খুঁজে পাই

অথচ ওসব কিছুই আমার ভালো লাগে না

আমার বড়দিনে পিকনিক, কলকন্ঠ হাসি

কিংবা প্রচুর স্বাস্থ্য ভালো লাগেনা

ওষুধের গন্ধ-মাখা আধুনিকতা ভালো লাগে না আমার।"

---(তোমার গলার স্বর টেলিফোনের ওপাশে) 


ওষুধের গন্ধমাখা আধুনিকতা অর্থাৎ মেকি স্মার্টনেস ও কৃত্রিমতাকে বর্জন করে তিনি হতে চেয়েছেন অকপট। সম্ভ্রান্তের সমস্ত ঐশ্বরিক শর্তকে নস্যাৎ করে তিনি নেমে আসতে চেয়েছিলেন ভনিতাহীন পৃথিবীর নিকৃষ্টতায়। কিন্তু সেখানেও যখন তিনি তাঁর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাকে স্পর্শ করতে পারেন না, তখন সেই আত্মিক অবদমন তাঁকে হতাশাগ্রস্ত করে। বৃথা রোমান্টিকতার তীব্রতম তরীটি ভাসিয়ে তিনি নতুন কোনো আশাবাদকে প্রতিষ্ঠা করতে চান না তার কাব্যিক বোধের বৈতরণীতে। তাই জীবনানন্দের মত বলিষ্ঠ কবির আশাবাদী উচ্চারণকে তিনি সরাসরি গ্রহণ না করে কখনও কখনও বরং ত্রিশের আর এক অন্যতম উল্লেখযোগ্য কবি সমর সেনের পথেই হাঁটতে ভালোবেসেছেন। জীবনানন্দের স্বপ্নরূপ পৃথিবীর ভেতর আরেক পৃথিবী নির্মাণের যে অতি-বাস্তব পংক্তিমালা ছড়ানো থাকে বাংলা কবিতায়, তাকে প্রকৃতপক্ষেই অধরা বলে মনে হয় শামশেরের। বরং কলকাতার আজন্ম নাগরিক কবিতার আবশ্যিক রোমান্টিকতাকে পরিহার করে পঙক্তির পর পংক্তিতে তিনি সমর সেনের মতো হতে চেয়েছেন কঠোর বাস্তববাদী এবং অবসেসিভ---


''কোনো বিদর্ভ নগরী আমার স্বপ্নের ভিতর জেগে ওঠে না

ইতিহাসে কোনো অর্থ নেই মূঢ়তাও ভ্রান্তি ছাড়া

যে নারী আমাকে পথে বসালো তার ক্রুর হাসির ছাপ

লেগে আছে ইতিহাসের পৃষ্ঠায়

আমি জানি মানুষের কোনো উত্তরণ ক্লিওর আঁচলে বাঁধা নেই

এই কলকাতা আর আমার নিঃসঙ্গ বিছানা ছাড়া কোনো সত্যের

অপেক্ষা আমি রাখিনা"

---(এই কলকাতা আর আমার নিঃসঙ্গ বিছানা) 


তিরিশের দশকে পরাধীন ভারতে কবিতা লিখতে বসে জীবনানন্দ দাশ যখন জগতের নিঃসীম ভয়াবহতাকে উল্লেখ করেও, কলকাতা শহরের প্রাত্যহিক জীর্ণতা, মূঢ়তা ও ক্লীবত্বকে প্রকাশ করেও, আশাকে অক্ষুন্ন রেখে বলেন---


"কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে 

তবুও তোমার কাছে আমার হৃদয়।"

---(সুচেতনা) 


সেখানে কবি শামশের আনোয়ার কলকাতাকে নিঃসঙ্গ বিছানা বলে উল্লেখ করেন, স্বাধীন দেশের একজন নাগরিক হয়েও। আসলে উত্তর ঔপনিবেশিক কলকাতার নৈতিক নীচতাকে, নাগরিক জীবনের ক্লান্ত ঔদাস্যকে কুষ্ঠরোগীর জল চেটে খাওয়ার অধঃপতনের মতোই নগ্নভাবে প্রকাশ করেন শামশের। এই উত্তর-ঔপনিবেশিক নৈরাজ্যের ভার তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়---


"প্রেম আর স্মৃতি আমি উড়িয়ে দিয়েছি সিগারেটের ধোঁয়ায়

জ্বর আসে নি তবুও আমি জ্বরের ঘোরেই বাঁচি 

মদের ঘোরে ভাঁড়ামো ক'রে আমার দুপুর কাটে 

মাড়ওয়ারি দম্পতির নির্লজ্জ সঙ্গম দেখে ছাদের ওপর

রাত্রির প্রহর পুড়ে যায়"

---(এই কলকাতা আর আমার নিঃসঙ্গ বিছানা) 


এক্ষেত্রে কি বাংলা কবিতার পাঠকের স্মৃতিতে পূর্ব কবি সমর সেনকে মনে পরেনা ! যিনি শামশেরের থেকে বহুদিন বেশি বেঁচে থেকেও কয়েকটি মাত্র কাব্যগ্রন্থ লিখে কবিতা লেখা থেকে স্বেচ্ছা- অবসর নিয়েছিলেন। 'উর্বশী' কবিতায় সেই সময় দাঁড়িয়ে তিনি লিখেছিলেন---


"তুমি কি আসবে আমাদের মধ্যবিত্ত রক্তে

দিগন্তে দুরন্ত মেঘের মতো !

কিম্বা আমাদের ম্লান জীবনে তুমি কি আসবে,

হে ক্লান্ত উর্বশী,

চিত্তরঞ্জন সেবাসদনে যেমন বিষণ্নমুখে

উর্বর মেয়েরা আসে :

কত অতৃপ্ত রাত্রির ক্ষুধিত ক্লান্তি,

কত দীর্ঘশ্বাস,

কত সবুজ সকাল তিক্ত রাত্রির মতো,

আরো কতদিন !"

---(ঊর্বশী)


কিংবা---


"আমি নহি পুরুরবা হে উর্বশী' 

মোটরে আর বারে

আর রবিবারে ডায়মন্ড হারবারে

কয়েক টাকার কয়েক প্রহরের আমার প্রেম,"

---(স্বর্গ হতে বিদায়) 


কিন্তু সমর সেনের কবিতায় যে নার্ভাস স্ট্রংনেস পাওয়া যায়, পাওয়া যায় আভিজাত্যের সুউচ্চ টাওয়ার থেকে কলোনিয়াল কলকাতার নৈরাজ্য ও অধঃপতনের দর্শন, তারও তিক্ত ঐতিহাসিক দু'দশক পরে ফ্যাসিস্ট শাষিত কলকাতার নাগরিকদের একজন হয়েই শামশের কবিতা লিখেছেন। জীবনানন্দের অতি- বাস্তবতার রোমান্টিক স্বপ্নময়তা থেকে সরে এসে তাই শামশেরকে সমর সেনের রুক্ষ বাস্তবের পথ গ্রহণ করতে হয়েছে। যদিও সমসাময়িক সময়ে তাঁর কবি জীবন এবং কবিতার ফ্রম একত্রিত হয়ে তৈরি হয়েছিল তাঁর কাব্য প্রবণতা। সেই প্রবনতা থেকে নিজের জবানিতেই তিনি উদ্ধৃত করেন--- 


"ইনসমনিয়া নাইটমেয়ার, নার্ভাস ব্রেকডাউন, অর্থাৎ ফিয়ার অফ সাইকোসিস ছাড়া আমার পক্ষে সম্ভব হত না কবিতা লেখা"


আর এটাই প্রকাশ করে একজন প্রকৃত কবির লেখার অথেন্টিক প্রসেস। ফলোতো শামশেরের কবিতায় আছে এক চূড়ান্ত মর্বিডিটি। প্রথাগত মৃত্যু চেতনার সঙ্গে যার আকাশ পাতাল পার্থক্য। এ প্রসঙ্গে কতগুলি পংক্তি পরিলক্ষণ করলেই তা স্পষ্ট হবে পাঠকের কাছে----


১। "খোলা ব্লেড দেখলে তৃষ্ণায় আমার গলা জ্বলে

পাখার হুক দেখলে মনে পড়ে যায়। 

সোনালী পাশের কথা"

---(এই কলকাতা আমার নিঃসঙ্গ বিছানা) 


২। "হতাশার লোমে ভর্তি কদাকার হাত 

আমার গলা চেপে ধরে"

---(জীর্ণ ছবি) 


৩। "আজ আমি খুরপি নিয়ে শুয়েছি

কোপাবো নিজেকে"

---(পৌরাণিক) 


৪। "নিজেকে আহার করো--- এসো

পান করো নিজের সমস্ত অনুতাপ ও বর্ষণমুখর বৃষ্টির ধারা"

---(বর্ষা) 


আত্ম- পীড়নের এত এত উপাদান শামশের তাঁর কবিতায় উল্লেখ করেছেন যে, কখনও কখনও তিনি পাঠকের কাছে অস্বস্তিকরও হয়ে উঠেছেন। সময়ের ব্যর্থতম কদর্যতার উপর যারা ভদ্রতাকে কৃত্রিমভাবে বজায় রাখে সেই সুসভ্যতার প্রতিভূদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন---


"আমি তোমাদের মুখের ওপর ছড়িয়ে দিই থুতুর নক্ষত্রমালা।"

---(থুতু ) 


শামশেরের কবিতা উত্তম পুরুষে লেখা। সেখানে যে 'আমি' ব্যবহৃত তার একটি সময়ের যন্ত্রণাকে চিহ্নায়নের প্রতীক রূপে সমকালীন সমাজ থেকে সৃষ্ট হয়েছে। নিছক ব্যক্তি আমির মধ্যে তা আবদ্ধ নয়। শামশেরের এই 'আমি' ক্ষোভ, ক্রোধ ও বিবমিষার সংমিশ্রণ। যা তাঁর ব্যক্তি-জগৎ থেকে উঠে আসা, কিন্তু রাস্ট্র-প্রসূত। 


প্রচলিত চিত্রকল্পময়তার এক বৈপরীত্য এবং পরাবাস্তবতার এক নতুন ভঙ্গি তাঁর কবিতায় দেখা গেছে। যা কেবল নিছক বর্ণনা হয়ে থাকে নি। তাঁর কবিতার ভাষাও পেলব নয়। যেমন---


১। "আক্রোশে চিবাই পাথর"

২। "আক্রোশে চিবাই জ্যোৎস্না"

৩। "অজন্তার পাথরে দেখি মাটি ও মলের বিপ্লব"


জীবনানন্দ উত্তর বাংলা কবিতায় এক নতুন প্রকাশ- ভঙ্গির কবি হিসাবে তাই শামশের চিহ্নিত হতে পারলেন। যে কারণে সুনীল গাঙ্গুলী তাঁর কবিতার স্বীকৃতি স্বরূপ প্রথম কৃত্তিবাস পুরস্কার কবি শামসের আনোয়ারকেই অর্পণ করেছিলেন। 


তাঁর কবিতা নিজে ব্যক্তিজীবনের বেপরোয়া স্বভাবের মতোই রাগী ভাষায় নির্মিত। তিনি প্রতিনিয়ত নিজেকে ভেঙেছেন, চূর্ণ করেছেন তাঁর কবিতায়। এই ভাঙ্গন যেন "চোখের সুরঙ্গ দিয়ে উড়ে যায় মাথার জঙ্গলে"। পাশাপাশি তাঁর কবিতায় এক প্রবল অস্থিরতাবোধ পরিলক্ষিত হয়েছে বারবার। কাজেই প্রাবন্ধিক অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্যের একটি উক্তি শামশেরের কবিতা প্রসঙ্গে আমাদের কাছে ভীষনই প্রাসঙ্গিক মনে হবে--- 


"স্বদেশ সমাজ ও ইতিহাসের পালাবদলের দিনগুলিতে চরম বিচ্ছিন্নতার আগ্রাসী অন্ধকারই সেদিনের বহু তরুণ কবির কাছে সার্বভৌম ও অবিকল্প হয়েছিল। নাস্তির তিমির তখন এতই দুর্ভেদ্য যে, দান্তের নরকও সম্ভবত কাম্য তার চেয়ে।" 


মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় আর মানুষের বীভৎস উউন্মাদনায় উত্তাল নগরীর বুকে কবি শামশের আনোয়ার হতাশা ও ক্লান্তিতে দীর্ণ হয়েছেন নিরন্তর। কিন্তু প্রশ্ন হল--- তিলোত্তমা নগরী কি সবসময়ই কবিকে হতাশায় ভরিয়ে দিয়েছেন। সেখানে কি কখনই কোন মঙ্গলের বার্তা ছিল না ! নিশ্চিত ছিল। অথচ মঙ্গলের দিনেও প্রবল এক অমঙ্গলের আশঙ্কায় কবি থরথরিয়ে কেঁপে উঠেছেন বারবার। যখন শঙ্খের পবিত্র ধ্বনি উঠেছে আকাশে- বাতাসে, তখনই কবির শূন্য বুকের ভেতর জীর্ণ পাতা ঝরে পড়েছে অবিরল ধারায়। আসলে মানব জীবনের সংঘাত বিপন্নতায় কবি অসহায় বোধ করেছেন। শঙ্খ আর উলুধ্বনির শুদ্ধ স্রোতে তিনি তাই অবগাহন করার পরিবর্তে বরং তাঁর অসহায় চোখ হারিয়ে গেছে আসমুদ্র নিঃসঙ্গতার অতলে। কাজেই পৃথিবীর নির্জনতম দ্বীপের গভীরে যে শূন্যতা নিহিত আছে, সেই প্রকাণ্ড শুন্যতার মত কবি উপলব্ধি করেন মানুষের চৈতন্যের মড়ক। তাই বক্তব্যের বিন্যাসে, আঙ্গিকের তাৎক্ষণিক চমক সৃষ্টি করার পরিবর্তে কবি শামসের আনোয়ার আরও ভয়ংকর ভাবে দেখাতে পারেন পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এর ইতিবৃত্তটি। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই কবির আকাঙ্খার সমগ্রতা জুড়ে খেলা করে যায় এক বিদীর্ণ পৃথিবীর নিঃসঙ্গ আর্তনাদ। কবি লেখেন---


"আজ এই মঙ্গলের দিন কী এক ঘোর অমঙ্গলের ভয়ে

আমার সমস্ত আঙুল ভীতা জননীর মতো কেঁপে ওঠে

তোমাদের শঙ্খের ধ্বনি এই নিষ্পত্র বুকের ভিতর

করুন ফুঁ দিয়ে জীবনের শীতরিক্ত পাতাগুলো ঝরিয়ে দেয়। 

যেন দূর দিগন্ত ভেঙে ছুটে আসে সন্ন্যাসীর আহ্বান

তোমাদের উলুধ্বনি আর চুলের কলরবের স্রোতে

আমার দুই অসহায় চোখ বারবার করুন পাক খেয়ে

হারিয়ে যায় ভীষণ নিঃসঙ্গ"

---(এই মঙ্গলের দিন ) 


প্রসঙ্গত লক্ষণীয় যে, 'এই মঙ্গলের দিন' শিরোনামটিকে কবিতায় ধারণ করলেও কবি আদতে মঙ্গলের শুভ মুহূর্তেও অশুভ অমঙ্গলের আশঙ্কায় জর্জরিত হয়ে যান। এক্ষেত্রে আমাদের মত সাধারণ পাঠকের মনে জাগতে পারে তিরিশের অন্যতম কবি জীবনানন্দের 'সুচেতনা' শীর্ষক কবিতাটির কথা। সেখানেও কবি, আলোকিত চেতনা স্বরূপিনী সুচেতনাকে কবিতার শিরোনামে স্থান দিলেও, আদতে সমগ্র কবিতাটির শরীর জুড়ে পৃথিবীর অসহায় আর্তনাদ আর মানুষের সামাজিক, মানবিক ভাঙনের ইতিকথাটিকেই যেন তুলে ধরতে চাইলেন। মানুষের চৈতন্য সত্তার জাগরণ হলে মুক্তির আলোর দীপ্তি উদ্ভাসিত হয়, কিন্তু যে চেতনায় নিরন্তর পাপের বিষ প্রবাহিত হয়, সেই চেতনাকে জাগ্রত করার পথ কে বা জানে। তাই আলোকিত চেতনা স্বরূপিনী সুচেতনা আমাদের লৌকিক পৃথিবী থেকে অনেক দূরে যেন কোন এক কল্পনাপ্রসূত জগতে চলে গেছে। কবির মনে হয়---


"কেবলি জাহাজ এসে আমাদের বন্দরের রোদে

দেখেছি ফসল নিয়ে উপনীত হয় ;

সেই শস্য অগণন মানুষের শব ;

শব থেকে উৎসারিত স্বর্ণের বিস্ময়

আমাদের পিতা বুদ্ধ কনফুসিয়াসের মতো আমাদেরও প্রাণ

মূক করে রাখে ; তবু চারিদিকে রক্তক্লান্ত কাজের আহ্বান।"

---('সুচেতনা'/ জীবনানন্দ দাশ) 


কবি জীবনানন্দ যেখানে পৃথিবীর চারিদিকে রক্তমাখা কাজের আহ্বান শোনেন, সেখানে কবি শামশের আনোয়ার যুগের ক্লান্তি, বিষণ্ণতা ও বিতৃষ্ণার ছবিটি প্রত্যক্ষ করেন। তাই আমাদের পিতা- প্রপিতামহরা বুদ্ধ কিংবা কনফুসিয়াসের মত মহাজ্ঞানী হলেও, পিলসুচের তলার অন্ধকার ঘোচাতে পারেন না। কাজেই সময়ের ঘোর অন্ধকারে কদর্য সর্বনাশের রেড ক্রসিং কবি শামশের আনোয়ারকে ক্রমাগত ভীতসন্ত্রস্ত করে। তবুও কবি তো সমাজের মধ্যে বাস করে, সমাজেরই একজন রক্তমাংসের মানুষ ফলে পারিপার্শ্বিক বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মায়াজালেই কবি তাঁর মানব অস্তিত্বটিকে খুঁজে পেতে চান। অজ্ঞানতার নিবিড় অন্ধকারে বেঁচে থাকা মানুষের জীবনে কবি তাঁর ব্যক্তিজীবনের ঘোরালো সিঁড়িটি বেয়ে "নীরব আহুতির মত ঝ'রে পড়ে''-ন। সেখানে প্রেমিকার ললাট বিবাহের হোমাগ্নি স্পর্শ করলে, কবি তাঁর কাব্যিক বোধের সীমাটিতে দাঁড়িয়ে প্রত্যক্ষ করেন, তা যেন বিবাহের হোমের আগুন নয়, প্রকারান্তরে তা যেন প্রেমিকার চিতার দাউ দাউ আগুন। যে আগুনে প্রেমিকার মুখাগ্নি হয়, আর বিষন্ন যুবকেরা হতাশ ভঙ্গিতে বিষণ্ণতার গান গেয়ে চলে। আসলে কবি এখানে দেখাতে চান প্রতিটি মানুষই তার নিজের কাছে কী ভীষণ অসহায়, মানব সংসার ও মানব সভ্যতা তাদেরকে কি সাংঘাতিক বঞ্চনার শিকার করে। তাই কবি বলেন,---


"বিবাহের হোম ছুঁয়ে দেয় তোমার কপাল

আমি দেখি তোমারই চিতা ঘিরে কয়েকটি বিষন্ন যুবক

উদাস স্বরে গান গায়

আগুনের সাতটি শিখা (গম্ভীর স্বরে বলেছিলো পুরোহিত) 

আমি দেখি আগুনের সাতটি শিখায় তোমার সাতটি

স্বপ্নের শরীর ওই অচেনা পুরুষের আঙুলের ফাঁক দিয়ে

নীরব আহুতির মতো ঝরে পড়ে"

---('এই মঙ্গলের দিন') 


অবক্ষয়ের এই চূড়ান্ত বিকার কবি বিষ্ণু দে-র কবিতাতেও প্রবলভাবে রূপ লাভ করেছে। বিষ্ণু দে তাঁর 'স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যত' কাব্যগ্রন্থে দেখিয়েছেন গ্লানির প্রগাঢ় অন্ধকারে ঢেকে গেছে মানুষের অতীত। মানুষের সত্তার বর্তমান অস্তিত্বটিও ক্লেদপঙ্কিল হয়ে উঠেছে। আর ভবিষ্যৎ জনজীবন ভয়াবহ এক রণসাজে কেমন সজ্জিত। আমাদের চেতনার আকাশ নির্বোধ অমানুষিক নিষ্ঠুর অভদ্রতার অপঘাতে দগ্ধ হয়ে গেছে। তাই বিবাহসভায় প্রচ্ছন্ন নরকে আজ বর না থাকলেও নানা রকম বরযাত্রীর ভিড় বাড়তে থাকে। যেখানে আমরা রয়েছি সেই মানবসভ্যতা নরকে পরিণত হয়ে গেছে। সেখানে বাঁচবার আসা আর বাঁচাবার ভাষা হারিয়ে যায়। সেখানে কান্নার সুর হয়ে যায় একঘেয়ে,---


"আজ শুধু একদিকে মুমূর্ষু বিকার

আর অন্যদিকে নাটুকে প্রলাপ নির্বোধ নিষ্ঠুর অমানুষিক অভদ্র।

কে দেবে ধিক্কার কাকে আঠারো তলায়

সারাদেশে চতুর্দিকে যত অবান্তর

উন্মাদ বিলাসী খেলা !"

---('স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যত'/ বিষ্ণু দে) 


দেশে দেশে এই বন্ধ্যা ক্ষেতরূপ সভ্যতায় সৃষ্টির সরস ফসল ফলানোর জন্য আর কোনো অবিরল বর্ষা নেই। আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির প্রার্থনা করলেও সকাল থেকে বিকাল অভাব- মৃত্যু- অনাহারে- অপঘাতে ভরে গেছে হৃদয়ের শুকানো দিঘী। তাই মৃত্যুর বিকারে নরকের ব্যঙ্গ চিত্র ফুটে ওঠে। আত্মার গ্লানিতে আমাদের অন্তর্গত রক্তক্ষরণের ভিতরে কেবলই অবসাদ আর বিপন্নতা। তাই কবি এই নরকের মানুষের টিকে থাকাকে দুঃস্বপ্নের মতো মনে করেন,---


"এ নরকে 

মনে হয় আশা নেই জীবনের ভাষা নেই,

যেখানে রয়েছি আজ সে কোন গ্রামও নয়, শহরও তো নয়,

প্রান্তর পাহাড় নয়, নদী নয়, দুঃস্বপ্ন কেবল,"

---('স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যত'/ বিষ্ণু দে) 


একইভাবে কবি বুদ্ধদেব বসুও তাঁর কবিতায় দেখিয়েছেন দেশে দেশে পৃথিবীর উপকূলে লুব্ধতার লালা ঝরে। বর্বর রাক্ষস হাঁকে পৃথিবীতে সেই শ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে বড়। উন্মত্ত জন্তুর মুখে জীবনের সোনার হরিণ কেঁপে ওঠে। কাজেই, আমরা পরিলক্ষণ করি শামশের আনোয়ার কিংবা তাঁর অগ্রজ কবিদের কাব্য অনুভূতিতে প্রবল এই নৈরাজ্য ও অবক্ষয়ের জঘন্য চিত্রটি। কিন্তু তবুও কবিরা তো আশাবাদী হন, ফলে তাঁদের আশাবাদের নিরিখে সভ্যতার মুক্তির আকাঙ্খাটিও ধ্বনিত হতে থাকে। তাঁরাএতসব কদর্য প্রলাপ প্রত্যক্ষ করার পরেও প্রেমে ফিরে যেতে পারেন। কারণ আমাদের রক্তের অসুখ প্রেমই সুস্থ করে দিতে পারে। সুতরাং শামশের আনোয়ারও সেই ভাবনার ব্যতিক্রমী নন। তাঁর কবিতায় এত রক্ত, এত হতাশা, এত ক্লান্তি, এত আত্মহননের গান থাকলেও, প্রেমকে তিনি অস্বীকার করতে পারেন না। বলা ভালো প্রেমের মহিমময় স্বরূপটিকে তিনি এড়িয়ে যেতে পারেন না। তাই 'ভালোবাসাহীনতার কষ্ট' কবিতায় কবি অপ্রেমের অসহায় যন্ত্রণাটি উপলব্ধি করতে পারেন,---


"একটা পতঙ্গভুক বৃক্ষের মতো ওর তৃষিত ডালপালাগুলো

আপ্রাণ চেপে ধরে আমার শরীর

নাভিমূলে তীব্র বঙ্কিম কুঠারের আঘাত হানে

শব্দ হয়

ভালোবাসাহীনতার শব্দে চারিপাশের দেয়াল ফেটে পড়ে"

---('ভালোবাসা হীনতার কষ্ট') 


দিনের সূর্য অস্তমিত হলে নিস্তব্ধ সন্ধ্যা যেমন নেমে আসে শিশিরের শব্দের মতন। তখন সেই অন্ধকারে বনলতা সেনের মতো প্রেমিকার মুখোমুখি বাসার স্বাদ যেমন হয় কবির, ঠিক একইভাবে শামশের আনোয়ারও 'মূর্খ স্বপ্নের গান' কবিতায় প্রেমিক- প্রেমিকাকে মুখোমুখি বসান। কবি দেখাতে চান প্রেমের মহান অনুভূতিতে আত্মসমর্পণের সুখ এবং প্রেমহীনতায় বেঁচে থাকা কেমন অসম্ভব---


"একটি মেয়ে, একটি ছেলের চোখের ওপর চোখ রেখে, স্থির গলায় বলে :

'হ্যাঁ, অনেক ভেবে দেখেছি, কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমাকে ছাড়া বাঁচা

অসম্ভব।'

একটি মেয়ে একটি ছেলের কোলের ওপর মাথা রেখে বলে :

'না, না, আজ আমার জন্মদিন নয়। যেদিন সব ছেড়ে, সব ফেলে তোমার

কাছে আসতে পারব, সেদিন, সেদিনই আমার জন্মদিন !"

---('মূর্খ স্বপ্নের গান') 


তাই শামশের আনোয়ারের কবিতা শুধু শিল্প বা সাহিত্য হয়ে আবদ্ধ থাকে নি। একটা অস্ত্র হয়ে হাজির হয়েছে পাঠকের দরজায়। কবিতার প্রচলিত নন্দনতাত্ত্বিক উপরি-পরিকাঠামোকে সযত্নে উপেক্ষা করে, ভেতরের বয়ান টাকেই অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। কাজেই শামশেরের কবিতা এক অর্থে তাঁর নিজের অস্তিত্বের সারোৎসার এ কথা বলাই যায়। আর কবি বলেন,---


"সঙ্গমের ইচ্ছা হলে নিজেকে জড়িয়ে ধরে সঙ্গম করি।" 


ফ্রয়েডীয় মনোবিকলন তত্ত্ব হয়তো এখানে ব্যাখ্যাত হতে পারে। কিন্তু তবুও, একই সঙ্গে তীব্র বিষাদ, তীব্র ক্রোধ ও অনির্দেশ্য এক ঈর্ষা শামশের আনোয়ারের কবিতার জগত নির্মাণ করেছে। হয়তো নার্ভাস ব্রেকডাউন, ইনসমনিয়া নাইটমেয়ার অথবা ফিয়ার অফ সাইকোসিস তাঁর অবদমিত ইচ্ছার বিরুদ্ধাচারণ করা পৃথিবীর পক্ষে তাঁকে নিরাপদ বলে মনে করেনি। তাই খুব কম বয়সেই আত্মঘাতী প্রতিভাবান এই কবির কাছে পড়ে থাকে আমাদের এক অজ্ঞাত প্রত্যাশা। আরো দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকলে হয়তো সেই প্রত্যাশা তিনি পূরণ করে যেতেন।





গ্রন্থঋণ :

১। শামশের আনোয়ারের শ্রেষ্ঠ কবিতা, দে'জ পাবলিশিং।

২।জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা, দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, দে'জ পাবলিশিং

৩। বিষ্ণু দে-র শ্রেষ্ঠ কবিতা, দে'জ পাবলিশিং

৪। https://sillypoint.co.in


ছবি : বিধান দেব 


সুরজিৎ প্রামাণিক

জন্ম : ২২ আগস্ট ১৯৯৩, দঃ ২৪ পরগনার নীলা গ্রামে। প্রথম কবিতার বই 'শূন্য প্রতিধ্বনির অন্ধকারে' প্রকাশিত হয় সাহিত্যের বেলাভূমি প্রকাশনার দপ্তর থেকে ২০১৪ সালে। কবিতা বিষয়ক ষান্মাসিক সাহিত্যপত্র 'নিরক্ষরেখা'-র সম্পাদক। ২০১৭ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বঙ্গভাষা ও সাহিত্য বিভাগে স্নাতকোত্তর। ২০২০ সালে পশ্চিমবঙ্গ সেট ও ন্যাশনাল ফেলোশিপ সহ ইউ.জি.সি নেট উত্তীর্ণ।

সুপুরি বনের ছায়ায় ছায়ায় ।। সুবীর সরকার


 



৭.
সেই কবে,কত কত বছর আগে আমার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল সনৎ চট্টপাধ্যায়ের সাথে।কালচিনির গাঙ্গুটিয়া চা বাগানে থাকতেন।কবিতা লিখতেন।পত্রিকা সম্পাদনা করতেন।চা বাগানের শ্রমিকদের নিয়ে সাদরি ভাষায় নাটক উপস্থাপন করতেন।সারা বছর কর্মচঞ্চল এক যাপনে থাকতেন সনৎ দা।
কাধে ঝোলা,পাজামা পাঞ্জাবী সনৎ দা অন্তহীন ঘুরে বেড়াতেন ডুয়ার্সের গঞ্জ গ্রামে।
খুব মায়াময় আর সহজ কবিতা লিখতেন।
সনৎ দা লিখেছিলেন_
"আমার মা খুব সুন্দর
ঝিঙে পোস্ত রাধেন"
কিংবা_
"এবার ভালো করে একটা প্যান্ডেল করো।"
কুচবিহারে ভগীরথ দাসের ডেরায় মাঝে মাঝে হানা দিতেন সনৎ দা।সেখানে বসে যেত আমাদের আড্ডা।মজলিস।ভালো গান গাইতেন তিনি।
বেশ মেজাজ বিছিয়ে দিতেন আড্ডায় আমাদের সনৎ দা।খুব পান খেতেন।আমাদের পানাহার চলতো আড্ডার পাশাপাশি।
পুরোন ডুয়ার্সের নাটক,কবিতা, গণনাট্যের গান নিয়ে ঘণ্টার পর ঘন্টা কথা বলে যেতেন তিনি।
তার কাছেই জেনেছিলাম সতী সেনগুপ্ত আর লাল শুক্র ওরাওয়ের কথা।একটা লুপ্ত পৃথিবীর গন্ধ ফিরিয়ে আনতেন সনৎ দা।
জীবনের শেষের পর্বে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন।মুখে মুখে কবিতা বলতেন।বৌদি লিখে রাখতেন।সনৎ দা প্রয়াত হবার পরে আমি আর কখনও গঙ্গুটিয়ায় যেতে পারি নি।
আগামীতে কাজ হওয়া জরুরী কবি সনৎ দাকে নিয়ে।
একজন বহুবর্ণ মানুষ।আমি অনেক শিখেছি তার কাছ থেকে।অনেক ঋণ তার কাছে।
সনৎ দা আমার ভেতরে থাকবেন অনিবার্য ভাবেই।

৮.
রঘু দা।কবি পূণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত।এই উত্তর জনপদের আদ্যন্ত এক বোহেমিয়ান জাত কবি।সমস্ত জীবন জুড়ে কবিতা আর কবিতাকে নিয়ে বারবার স্বপ্ন দেখা ছাড়া আর কিছুই তো করলেন না রঘু দা। হ্যাঁ,পূণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত আমাদের কাছে আদ্যন্ত রঘু দা।এমন জাত কবি আর তার ঈর্ষণীয় যাপন খুব কাছ থেকেই দেখবার সুযোগ হয়েছে।আসলে এত এত ব্যাক্তিগত স্মৃতি রয়েছে রঘু দার সঙ্গে যে গুছিয়ে লেখা প্রায় অসম্ভব।
রঘু দার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ১৯৯১ সালে কবি সমীর চট্টোপাধ্যায় ধূপগুরিতে রঘু দার বাসায় "শব্দ" পত্রিকার অনুষ্ঠানে।
এরপর ক্রমে কিভাবে রঘু দা তুমুল আত্মীয় হয়ে গেলেন আমার।সম্পর্ক ছিল আমৃত্যু।
ভীষন স্নেহ পেয়েছি পূর্ণিমা বৌদির কাছে।আর রঘু দার কাছে তো অঢেল প্রশ্রয়।আশ্রয়।
কৃষিবউ,ভাটফুল,উডবার্ন ওয়ার্ড,কুয়াশার বাগান আর ডুয়ার্সের লোকায়ত দুনিয়ায়,অনন্ত সব হাটের পরিসর জড়িয়ে তীব্র এক কবিতার জীবন কাটিয়ে গেছেন আজন্ম বাউন্ডুলে কবি পূণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত।
তার জীবন আর জীবনভঙ্গিমা ছিল প্রবল ঈর্ষণীয়।তরুণ কবিদের মস্ত এক আশ্রয় ছিলেন রঘু দা।
কবিতা ছাড়া আর কিছুই করতে চান নি।
দারিদ্র,অভাব উড়িয়ে দিয়ে বরাবর ধরে রেখেছিলেন হাসিমুখ।কবি হিসেবে শক্তিশালী রঘু দা সবসময় নুতন নুতন স্বপ্ন নিয়েই বাঁচতেন।
কত কত বার ডাকবাংলো পড়ার বাসায় উঠে গেছি সটান সিড়ি বেয়ে।কত আড্ডা।নুতন কবিতা শোনাতেন শেষের দিকে ফোনে।
এত এত স্মৃতি তো আর লেখা যায় না।বুকের খুব গহিনে সংরক্ষণ করে রেখে দিতে হয়।
পূণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত যে কোন নুতন লিখতে আসা কলমের কাছে একটা আইডল।
এমন জাত কবি আজ অতিবিরল।

ছবি : বিধান দেব 

সুবীর সরকার. জন্ম 1970, 3 জানুয়ারি. নয়ের দশকে লিখতে আসা এ কবি উত্তরের লোকজীবনের সাথে জড়িয়ে আছেন তীব্র ভাবে. ত্রিশ বছরের বেশী সময় ধরে কবিতা, গদ্য সহ বিভিন্ন ধারায় অনায়াস যাতায়াত করেছেন. বাংলা ভাষার প্রায় সব কাগজে নিয়মিত লেখালিখি করেছেন, করছেন. 1996 সালে তাঁর প্রথম কবিতাবই প্রকাশিত হয় কবিতা পাক্ষিক থেকে. গুরুত্বপূর্ণ কবিতা ও গদ্যের বইগুলো- ধানবাড়ি গানবাড়ি, মাহুত বন্ধু রে, নির্বাচিত কবিতা, বিবাহ বাজনা, নাচঘর, উত্তরজনপদবৃত্তান্ত, মাতব্বর বৃত্তান্ত, ভাঙা সেতুর গান. পেশায় শিক্ষক এ কবি ভালোবাসেন রবিশস্যের খামার বাড়ি, সাদা ঘোড়া আর যৌথ যাপনে চাঁদের আলোয় কবিতা আড্ডা, লোকগানের আমেজ.

জন্মের আগের মুখ ।। চন্দন মিত্র


 


জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন কোয়ানের অমায়িক ভুবন     

 

 

পঞ্চদশ পর্ব

চ্যান > জেন জাপান-পর্ব

একদা চিন থেকে চ্যান পৌঁছে যায় উদীয়মান সূর্যের দেশে। জাপানিদের উচ্চারণে   চ্যান হয়ে যায় জেন। জাপান থেকেই জেন ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপ-আমেরিকায়। ফলে চিন ছাড়া প্রায় সারা পৃথিবীতে চ্যান উচ্চারিত হতে থাকে জেন নামে এখন থেকে আমরাও চ্যানকে জেন হিসাবেই জানব।

  

   চিনের মতো জাপানেও জেনের ভিত্তিভূমি প্রস্তুত করেছিল মহাযান বৌদ্ধধর্ম ও সংশ্লিষ্ট সূত্রাবলি। কোরিয়ার একদল রাজ-প্রতিনিধির মাধ্যমে জাপানিরা প্রথম বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়। ৫৫২ (মতান্তরে ৫৩৮) খ্রিস্টাব্দে কোরিয়ার পেকচে রাজ্যের রাজা সঙমিয়ঙ একদল কূটনৈতিক প্রতিনিধিকে জাপানে পাঠান। তাঁদের সঙ্গে উপহার স্বরূপ ছিল ধাতব বুদ্ধমূর্তি, বিভিন্ন বৌদ্ধসূত্র, পোশাকপরিচ্ছদ, অলংকার ইত্যাদি। জাপানের তৎকালীন সম্রাট কিমুমেই (৫৩২-৫৭১ খ্রিঃ) এই প্রতিনিধিদলকে সাদর অভ্যর্থনা জানান। কোরিয়ান প্রতিনিধিদলের মার্জিত আচার-ব্যবহার, পোশাকপরিচ্ছদ, ধর্মাদর্শ ইত্যাদি রাজসভা ও রাজধানীকেন্দ্রিক পরিমণ্ডলে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করে। সম্রাট কিমুমেই বৌদ্ধধর্মের অনুরাগী হয়ে ওঠেন। বহিরাগত একটি ধর্মের রাজসভায় এমন সমাদর জোটায় প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলির মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। নাকাতোমি গোষ্ঠী বৌদ্ধধর্মের বিরোধিতা শুরু করে। তাদের যুক্তি ছিল, জাপানের পরম্পরিত ধর্মকে ছেড়ে বিদেশি ধর্মকে প্রাধান্য দিলে দেশের সভ্যতা-সংস্কৃতি বিপন্ন হবে। তারা চেয়েছিল অন্যান্য দেশ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন রেখে জাতিগত বিশুদ্ধতা রক্ষা করতে। প্রসঙ্গত জাপানের পরম্পরিত ধর্ম শিন্তো সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে রাখা সমীচীন। শিন্তো শব্দটি ‘শেন’ (শব্দটি আত্মা, ঈশ্বর, দেবতা ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়) ও ‘তাও’ (শব্দটির অর্থ পথ) এই দুই চিনা শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। সুতরাং শিন্তো শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় আত্মা বা দেবতার পথ। আগে জাপানিদের এই আদিধর্ম ‘কামি নো মিচি’ নামেই পরিচিত ছিল, যার অর্থ কামির পথ। জাপানি ‘কামি’ শব্দটিকে বাংলায় আত্মা বা দেবতা বা ঈশ্বর বা প্রভু ইত্যাদি অর্থে অনুবাদ করা যায়। তবে ‘কামি’ কেবল স্বর্গীয় বা বায়বীয় বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি, গাছগাছালি, পশুপাখি, পাহাড়-পর্বত ইত্যাদিও কামি-র অন্তর্ভুক্ত তথা উপাস্য। প্রাথমিক পর্যায়ে ‘আমাৎসুকামি’ (স্বর্গীয় কামি) ও ‘কুনিৎসুকামি’ (পার্থিব কামি) এই বিভাজন ছিল। পরবর্তীকালে এই বিভাজন গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। বস্তুত পক্ষে শিন্তো তেমন কোনো পাকাপোক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ছিল না। বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি ও পূর্বপুরুষদের আত্মাকে সন্তুষ্ট করার জন্য আদিম জনগোষ্ঠীর পালনীয় প্রথাসমূহই কালক্রমে একটি ধর্মের রূপ পায়। প্রাথমিক যুগে এই লোকধর্মে কোনো মূর্তি, মন্দির, ধর্মগ্রন্থ বা শাস্ত্রও ছিল না। কেবল ‘জিনজা’  নামে একটি উপাসনাস্থল থাকত। লোকেরা বিশ্বাস করত জিনজা আসলে এক বা একাধিক কামির অবস্থানস্থল। আদিকালে যা ছিল মূলত পাথুরে বেদি, পরবর্তীকালে তা সুদৃশ্য মন্দিরে রূপান্তরিত হয়। নাকাতোমি গোষ্ঠীর এই ঐতিহ্যপ্রীতির বিপরীতে সোগা গোষ্ঠী দৃঢ়ভাবে বৌদ্ধধর্মের পক্ষে দাঁড়ায়। তারা যুক্তি দেখায় বৌদ্ধধর্ম জাপানের সভ্যতা-সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করার মতো রসদে ভরপুর এবং তা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপনের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। এই প্রগতিশীল গোষ্ঠী চেয়েছিল কোরিয়া ও চিনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে জ্ঞানবিজ্ঞান তথা আধুনিকতার ছোঁয়া পেতে। শেষমেশ বৌদ্ধধর্মের দিকেই পাল্লা ভারি হয়ে ওঠে।  

 

   সম্রাট কিমুমেই মারা যাওয়ার পরে সিংহাসনে বসেন বিতাৎসু (৫৭১-৫৮৫ খ্রিঃ)। সিংহাসনে বসে তিনি শিন্তো ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করেন। ৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে জাপানের সম্রাট হন ইয়োমেই। তিনি বৌদ্ধধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। ইয়োমেই- এর মৃত্যুর পরে সম্রাট সুশুন প্রায় ছয় বছর রাজত্ব করেন। তাঁর মৃত্যুর পরে ৫৯২ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেন সম্রাজ্ঞী সুইকো। তিনি ছিলেন সম্রাট কিমুমেই এর তৃতীয় কন্যা ও সম্রাট বিতাৎসু-র স্ত্রী। তাঁর শাসনকালে জাপানের নীতিনির্ধারক হিসাবে  মনোনীত হন, সম্রাট ইয়োমেই-এর পুত্র রাজকুমার শোতোকু (৫৭৪-৬২২খ্রিঃ)। সম্রাজ্ঞী সুইকো ও রাজকুমার শোতোকু উভয়ে ছিলেন বৌদ্ধধর্মের একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক। তাঁদের প্রচেষ্টায় জাপানে বৌদ্ধধর্মের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়; বৌদ্ধধর্ম রাষ্ট্রধর্মের স্বীকৃতি লাভ করে। রাজকুমার শোতোকু ছিলেন চিনের তাং-রাজাদের অনুসৃত বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির একান্ত অনুরাগী। চিনা সভ্যতা-সংস্কৃতি তথা জ্ঞানবিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের দেশকে আধুনিক তথা উন্নততর করে তোলার স্বপ্ন দেখতেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি বেশ কয়েকবার চিনদেশে প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছিলেন। জাপানি শিক্ষার্থীদেরও তিনি চিনদেশে পড়াশোনার জন্য পাঠাতেন। কেবল বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির অনুসন্ধান নয়, কনফুসীয় দর্শন, চিকিৎসা বিদ্যা, শাসনসংক্রান্ত বিভিন্নদিকের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিভিন্ন তথ্য ও তত্ত্ব সংগ্রহ করে তিনি জাপানের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান, আইনকানুন, পঞ্জিকা, শিক্ষাব্যবস্থা ইত্যাদির আমূল সংস্কার সাধন করেন। তাঁর উদ্যোগেই প্রথম জাপানি সংবিধান প্রণীত হয়। মূলত কনফুসীয় নীতিতত্ত্বের দিকে তাকিয়ে সংবিধানের বিভিন্ন ধারা-উপধারাগুলি লিখিত হয়েছিল। এই সংবিধানে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের কথা বলা হয় যার মধ্যমণি হবেন স্বয়ং সম্রাট। তাঁকে সাহায্য করার জন্য একদল আমলা নিয়োগের কথা বলা হয়। আসলে রাজকুমার শোতোকু চেয়েছিলেন বিভিন্ন গোষ্ঠীর সামন্তদের হাত থেকে শাসনক্ষমতা কেড়ে এক অখণ্ড শক্তিশালী দেশ গড়তে। ‘কাঞ্জি’ নামক চিনা লিখনপদ্ধতিকে জাপানি ভাষার লিখনে কাজে লাগান তিনি। এর ফলে একই চিনা অক্ষর দ্বারা গঠিত শব্দ চিনে  ও জাপানে সমার্থবোধক হলেও উচ্চারণগত দিক থেকে পার্থক্য দেখা দেয়। যেমন, যে  শব্দটি চিনা ভাষায় ‘হুইকে’ হিসাবে উচ্চারিত হয়, সেই শব্দটিই জাপানি ভাষায় ‘একা’ হিসাবে উচ্চারিত হয় ; এই পদ্ধতিতেই চিনা ‘চ্যান’ জাপানি উচ্চারণে হয়েছে ‘জেন’ রাজকুমার শোতোকু সমগ্র জাপানে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি বেশ কিছু বৌদ্ধ মঠ-মন্দির নির্মাণ করেন। সদ্ধর্মপুণ্ডরীক, বিমলাকীর্তি ও শ্রীমালাদেবী সিংহনাদ এই তিন মহাযানী সূত্রের ভাষ্যও তিনি রচনা করেন। বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও প্রসারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকার জন্য তিনি ‘জাপানি বৌদ্ধধর্মের জনক’ হিসাবে খ্যাত হয়ে আছেন।

  

   জাপানে প্রথম চ্যান তথা জেন-বিষয়ক ধারণা বহন করে নিয়ে যান, জনৈক বৌদ্ধ ভিক্ষু তোশো (৬২৯-৭০০ খ্রিঃ)। তিনি ৬৫৩ খ্রিস্টাব্দে চিনে গিয়ে প্রখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত হিউয়েন সাং (৬০২-৬৬৪ খ্রিঃ)-এর কাছে যোগাচার দর্শনের চর্চা করেন। হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে হিউয়েন সাং আমাদের দেশে এসেছিলেন। তিনি ভারত থেকে বহু বৌদ্ধপুথির প্রতিলিপি নিয়ে গিয়েছিলেন। হিউয়েন সাং, তোশোকে জনৈক চ্যানসাধুর  শিষ্যত্ব গ্রহণের উপদেশ দেন। তোশো গুরুর আদেশ শিরোধার্য করে চ্যান-শিক্ষা গ্রহণ করেন। দেশে ফিরে তিনি গ্যাংগো মঠে একটি ধ্যানকক্ষ নির্মাণ করে জেনচর্চায় মনোনিবেশ করেন। তোশোই প্রথম জাপানি যাঁর দেহ সমাধিস্থ না-করে দাহ করা হয়। তাঁর অন্তিম ইচ্ছানুসারে অভিনব অন্ত্যেষ্টির বন্দোবস্ত করেছিলেন তাঁর অনুগামীরা। তোশোর মৃত্যুর পরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত হোশো ঘরানাটি খুব বেশিদিন স্থায়িত্ব লাভ করেনি।   

  

   ৭১০ খ্রিস্টাব্দে নারা শহরে রাজধানী স্থাপনের মাধ্যমে সম্রাজ্ঞী গেনমেই জাপানে নারা যুগ (৭১০-৭৮৪ খ্রিঃ) সূচিত করেন। চিনের তাং যুগের রাজধানী চাং-আন-এর স্থাপত্য ও নগর-পরিকল্পনার অনুকরণে এই রাজধানী শহরটিকে এমনভাবে নির্মাণ করা হয়, যেন শহরটি চাং-আন-এর একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। নারা যুগের প্রথমার্ধে শিন্তো অনুসারীদের প্রভাব বাড়তে থাকে। সামন্ততন্ত্র পোক্ত হয়ে ওঠে রাজকুমার শোতোকুর আমলে যে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা সূচিত হয়, তা ক্রমশ বংশানুক্রমিক হয়ে পড়ে। চিনের তাং-শাসনের অনুকরণে এই আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা জাপানে গৃহীত হলেও চিনের মতো কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার দ্বারা এখানে আমলা নির্বাচন করা হত না। ফলে অচিরেই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বজনপোষণ শুরু হয় এবং অযোগ্য আমলাদের ভিড়ে যোগ্যজনেরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে। জাপানের কৃষকেরা কঠোর পরিশ্রম করে জমিতে ধান, গম, জব, জোয়ার-বাজরা ফলিয়ে জনগণের মুখে খাদ্য তুলে বিনিময়ে পেত করের বোঝা আর তা পরিশোধ করতে না-পারায় সহ্য করত অসহ্য অত্যাচার। এর হাত থেকে বাঁচতে কোথাও কোথাও তারা হাতে অস্ত্রও তুলে নিতে শুরু করে। কেউ কেউ লড়াই করতে করতে অস্ত্রশস্ত্র চালনায় পারদর্শী হয়ে উঠে পেশা বদলে যোদ্ধা হয়ে ওঠে। তাদের কাজে লাগাতে শুরু করে গ্রামাঞ্চলের ভূস্বামীরা। এইভাবে সামুরাই নামক মহাযোদ্ধাদের আবির্ভাবের পটভূমি প্রস্তুত হতে থাকে।            

   রাজকুমার শোতোকুর মৃত্যুর পরে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বৌদ্ধধর্মের প্রচারপ্রসারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন সম্রাট শোওমু (৭০১-৭৫৬ খ্রিঃ)। তাঁর উল্লেখযোগ্য কীর্তি নারা শহরে ‘দাইবৎসু’ (মহান বুদ্ধ) নামক বৃহদাকার ধাতব বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ। এই বুদ্ধমূর্তির  অভিষেক উপলক্ষে ৭৩৬ খ্রিস্টাব্দে নারা শহরে পদার্পণ করেন ভারতীয় ভিক্ষু বোধিসেনা (৭০৪-৭৬০ খ্রিঃ)। এই বৌদ্ধমূর্তি নির্মাণ নিয়ে শিন্তো অনুসারীদের আপত্তি ছিল প্রবল। তাদের অভিমত ছিল এই বিদেশি ধর্মগুরুর মূর্তি নির্মাণ করার অর্থ পরম্পরিত কামিদের অপমান করা। শেষমেশ হোশো ঘরানার বৌদ্ধ ভিক্ষু গয়োকি  শিন্তোদের অন্যতম প্রধান উপাস্য স্বর্গীয়কামি সূর্যদেবী আমেতেরাসুর ‘জিনজা’য় হত্যে দিয়ে তাঁর দৈবাদেশ আদায় করে নেন। কালক্রমে শিন্তো ও বৌদ্ধদের মধ্যে সম্প্রীতির ভাব গড়ে ওঠে। অনেকেই একসঙ্গে শিন্তো ও বৌদ্ধমতে আস্থাজ্ঞাপন করতে থাকেন। শোওমু প্রত্যেক প্রদেশে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীদের জন্য দুটি করে জাতীয় মঠ নির্মাণ করেন। সন্ন্যাসীদের মঠগুলির নাম ছিল ককুবুন-জি এবং সন্ন্যাসিনীদের মঠগুলির নাম ছিল ককুবুননি-জি। এই মঠগুলির সঙ্গে সংযোগ সাধনের জন্য তিনি নারা শহরে একটি কেন্দ্রীয় মঠ তোদাই-জি গড়ে তোলেন। এই মঠগুলি ছিল একাধারে বিদ্যালয়, অনাথআশ্রম, চিকিৎসালয়, ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষার জায়গা। নারা যুগের অন্তিম পর্যায়ে শ্যানরোন, হোশো, কেগান, রিৎশু, কুশা ও যোজিৎশু এই ছয়টি বৌদ্ধঘরানার সন্ধান পাওয়া যায়। তবে এই ঘরানাগুলির মধ্যে তেমন কোনো আদর্শিক বিরোধ ছিল না। এমনকি একই মঠে তাদের সহাবস্থানও ছিল। সকলের উদ্দেশ্য ছিল একটাই নবাগত ধর্মকে জাপানের মাটিতে পোক্ত ভিত্তি দেওয়া।  

  

   ৭৯৪ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট কামমু তেননো (রাজত্বকাল ৭৮১-৮০৬ খ্রিঃ), হেইয়ান কিয়ো (বর্তমান, কিয়োতো) শহরে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। শুরু হয় হেইয়ান যুগ (৭৯৪-১১৮৫ খ্রিঃ)। নারা শহরের মতো হেইয়ানকেও চিনের রাজধানী চাং-আন-এর আদলে গড়ে তোলা হয়। হেইয়ান যুগে চিন থেকে তেন্দাই ও শিঙ্গন এই দুই বৌদ্ধঘরানা  জাপানে পৌঁছায়। তেন্দাই ঘরানাকে জাপানে নিয়ে যান সাইচো (৭৬৭-৮২২ খ্রিঃ)। তিনি চিনে গিয়ে তিয়েনতাই বৌদ্ধধর্ম, গুহ্য বা তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম ও জেন সম্পর্কিত  শিক্ষা গ্রহণ করেন। দেশে ফিরে তিনি কিয়োতো-র হিয়েয়ে পর্বতে একটি তেন্দাই মঠ স্থাপন করেন। তাঁর উদ্যোগে শ্যানরোন ও হোশো ঘরানা তেন্দাই সম্প্রদায়ের অঙ্গীভূত  হয়। সাইচো, সদ্ধর্মপুণ্ডরীক সূত্রের ভিত্তিতে জাপানের সকল বৌদ্ধ মতাবলম্বীকে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসতে সচেষ্ট হন, এমনকি শিন্তো অনুগামীরাও তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। সাইচো-পরবর্তী সময়ে তাঁর দুই সুযোগ্য শিষ্য এননিন (৭৯৪-৮৬৪ খ্রিঃ) ও এনচিন (৮১৪-৮৯১ খ্রিঃ) তেন্দাই সম্প্রদায়কে দৃঢ়ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন।

  

   সাইচো-র সমসাময়িক কোবো দাইশি (৭৭৪-৮৩৫ খ্রিঃ) চিনে গিয়ে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম চর্চা করেন। জাপানে ফিরে তিনি কাওইয়ে পর্বতে শিঙ্গন মঠ নির্মাণ করেন। তিনি মহাযান মতের পাশাপাশি হীনযান মতেরও চর্চা করতেন। তিনি শিঙ্গন মতাদর্শকে গুহ্য ও প্রকাশ্য এই দুইভাগে বিভক্ত করেন। কোবো দাইশি সমকালীন  জাপানি বৌদ্ধ ঘরানাগুলির একটি তালিকা প্রকাশ করে শিঙ্গনকে জাপানের শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ সম্প্রদায় হিসাবে ঘোষণা দেন।

  

   তেন্দাই ও শিঙ্গন এই দুই বৌদ্ধ সম্প্রদায় জাপানে প্রচলিত ছয়টি বৌদ্ধ ঘরানাকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে নেয়। রাজন্যবর্গ ও আমলাদের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে এই দুই সম্প্রদায় নিজস্ব মঠ-মন্দির বানিয়ে বা পুরানো মঠ-মন্দিরের দখন নিয়ে  প্রাতিষ্ঠানিকতার ভিতকে বেশ মজবুত করে তোলে। ক্রমশ এই দুই সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা নিজ নিজ সম্প্রদায়ের সংখ্যাধিক্য তথা শক্তি সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। তারা নতুন এক শক্তিশালী ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে থাকে। ক্ষমতার আস্বাদ পাওয়ায় ক্রমশ সন্ন্যাসীদের আচারব্যবহার ও কার্যকলাপে অবক্ষয় লক্ষিত হতে থাকে। দুর্নীতি ও চারিত্রিক অধঃপতনের শিকার হয়ে সন্ন্যাসী বা ভিক্ষুদের কেউ কেউ সামাজিক মর্যাদা হারিয়ে ফেলে। সাধারণ মানুষ নতুন এক সমুন্নত আদর্শের সন্ধান পেয়ে বৌদ্ধ ধর্মকে আত্মস্থ করতে চেয়েছিল। কিন্তু মঠ-মন্দিরের এই অবক্ষয় দেখে তারা আশাহত হয়। আবার তারা নতুন কোনো ধর্মীয় বা দার্শনিক আদর্শের সন্ধান করতে থাকে, যা তাদের আত্মিক অবক্ষয়ের অন্ধকার থেকে মুক্ত করে মুক্তির প্রশস্ত পথ বাতলে দেবে। জেন, সাধারণ জাপানিদের কাছে সেই  আত্মদীপ প্রজ্বলনের বার্তা বহন করে নিয়ে যায়।  

     

তথ্যঋণ       

A Guide to Japanese Buddhism Published by Japan Buddhist Fedaration, 2004.

A New History of Shinto by John Been and Mark T. Ueen ; Wiley –Blackwell 2010.

Studies in Japanese Buddhism by A. K. Reischuer ; The Macmillan Company 1917.

A Brief History of Japan : Samurai, Shogun and Zen by : Tuttle Publication 2017.

A History of Japan by K. G. Henshall : Palgrave macmillan 1999. 


ছবি : বিধান দেব 


লেখক পরিচিতি 

জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৬, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ডায়মন্ড হারবার মহকুমার ভগবানপুর (হরিণডাঙা) গ্রামে। বাংলা ভাষা-সাহিত্যের শিক্ষক। কবিতা লেখার সূত্রে লেখালেখির জগতে প্রবেশ। লেখেন প্রবন্ধ ও গল্প । 

প্রকাশিত পুস্তক   : 

কাব্য পুস্তক : আমার আত্মার পায়ে বাঁধার ঘুঙুর, যাপনচিত্র, ২০১৯; সরলতা ক্রমশ গায়েব হইতেছে, সাহিত্যের বেলাভূমি ২০২০

প্রবন্ধ পুস্তক : জেন : রিপুতাড়িত মানবের নিকট সুসমাচার ও অন্যান্য প্রবন্ধ, কলিকাতা লেটার প্রেস, ২০১৯ 

সম্পাদিত পত্রিকা : পাড়ি




                                            

   

 




কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...