সোমবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২১
সম্পাদকের কথা
ল্যাপিস লাজুলি ।। সায়ন রায়
সুপুরি বনের ছায়ায় ছায়ায় ।। সুবীর সরকার
প্রথম পর্ব
উত্তরাঞ্চলের শহর কুচবিহারে সেই শুরু হওয়া জার্নি আজও চলছে।
তবে কবিতা লিখবো,কবিতা আর লেখা পড়া ছাড়া আমার বেঁচে থাকাটা পুরো অর্থহীন এই চেতনা তৈরি হয়েছিল আমার ২১ বছর বয়সে।১৯৯১ সালে।
যদিও ৯১_৯৪ পর্যন্ত লেখা আমার সমস্ত কবিতা আমি নষ্ট করে ফেলেছিলাম।কেননা,যা লিখছিলাম সেগুলি কখনোই কবিতা হচ্ছে বলে আমার মনে হয় নি।১৯৯৫_তে লেখা কবিতা থেকে বাছাই করে ১৯৯৬_এ প্রকাশিত হয়েছিল আমার এক ফর্মার প্রথম কবিতার বই_"যাপনচিত্র"।প্রকাশক_"কবিতা পাক্ষিক"।
ইতিমধ্যে চিঠিপত্রের মাধ্যমে সারা বাংলার জেলা মহকুমা ব্লক জুড়ে তৈরি হয়েছিল আমার লেখা পড়ার বন্ধুরা।স্বজনেরা।অসম মহারাষ্ট্র ত্রিপুরা তৎকালীন বিহার মধ্যপ্রদেশ আর বাংলাদেশেও ছিলেন স্বজনেরা।
ক্রমে আমি ডুবে পড়ছিলাম একটা ঘোর আর স্বপ্নের ভেতর।
কবিতা পাক্ষিক,খনন,কৌরব,মথ,মৈনাক,কবিতা ক্যাম্পাস,পঁচিশে বৈশাখ,বালাসন, জাটিঙ্গা,বাংলাদেশের দ্বিতীয় চিন্তা,জীবনানন্দ এবং আরো কয়েকটি পত্রিকায় আমি তখন, মানে শুরুর দিনগুলিতে নিয়মিত লিখি।পাঠক তৈরি হতে থাকে।চিঠিতে সম্পাদক পাঠকের সঙ্গে আড্ডাও জমে ওঠে।
সে এক তুলকালাম পর্ব।
কিছু পরে,১৯৯৭ এর দিক থেকে নিয়মিত লিখতে থাকি "দৈনিক বসুমতী"_তে।দৈনিকবসুমতী তখন নিয়মিত প্রকাশ পাচ্ছে উত্তরের শিলিগুড়ি থেকে।
অস্বীকারের উপায় নেই,দৈনিক বসুমতী আমাকে উত্তরবাংলার বৃহত্তর পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল।
এর পর থেকে উত্তরের লিটিল ম্যাগ গুলিতে নিয়মিত লিখতে থাকা।
এত কথা বলে ফেলতে হলো!
আসলে শুরুর দিনগুলির কথা লিখতে গেলে এই কথা না বলে যে কোন উপায় নেই!
২.
এই লেখায় আমি লেখালেখির জীবনে সঙ্গ সান্নিধ্য পাওয়া কিছু অগ্রজের কথা বলবো।যারা আমাকে পুষ্ট করেছেন।আমার স্বপ্নের উনুনে গুঁজে দিয়েছেন কাঠ।আমাকে জেদী হতে,লড়াকু হতে,আমাকে ক্ষুধার্ত এক পাগল হয়ে উঠতে সাহায্য করেছেন।
তবে এই লেখায় একমাত্র কলকাতার সুব্রত রুদ্র
ছাড়া আমি কেবল আমার ইতিহাস_ভূগোলের মানে এই উত্তর জনপদের অগ্রজদের কথাই লিখবো।যারা আমার জীবনের,আমার পড়া লেখার জীবনের অবশিক অংশ।
৩.
ইতিমধ্যে কলেজে পড়বার সময় পরিচয় হয়ে গিয়েছিল ভগীরথ দাসের সঙ্গে।সদা উদ্যমী ভগীরথ দাস সম্পাদনা করতেন চমৎকার পত্রিকা "চারুবাক"।ভগীরথ দার সঙ্গে বন্ধুত্ব আমাকে বদলে দিছিল ভেতর থেকে।ভগীরথ দার উৎসাহেই আমি সম্পাদনা শুরু করি "সোনালী আকাশ"।সেই সময় পিঠে স্নেহের হাত রেখেছিলেন আমার দুই স্যার।উত্তম দত্ত আর অম্লানজ্যোতি মজুমদার।পরবর্তীতে আমাকে দেশ বিদেশের চিত্রকলার সঙ্গে পরিচয়ের নিবিড় পাঠ দেন অম্লান জ্যোতি মজুমদার।
আমি অম্লান বাবুর কাছে টিউশন পড়তে যেতাম।আর দেখতাম সুবিশাল গাম্ভীর্য নিয়ে বারান্দার টেবিলে বসে লিখছেন অম্লান বাবুর বাবা শ্রীযুক্ত অমিয়ভূষণ মজুমদার।মাঝে মাঝে ছবিও আঁকতেন তিনি।পরিচয়ের সাহস পাইনি তখন।অনেক পরে ১৯৯৭ এর শেষ দিকে আমি প্রবেশ করবার সুযোগ পাই অমিয়ভূষণের অন্দরমহলে।এটা নিয়ে আলাদা করে লিখবো।
ভগীরথ দার সৌজন্যে পরিচয় হয় কবি নিখিলেশ রায়ের সঙ্গে।বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সবুজ কালিতে লেখা নিখিলেশ রায়ের পোস্টকার্ডগুলি আমাকে শিখিয়েছে অনেক।
ইতিমধ্যে সখ্যতা গড়ে ওঠে ভানু ভট্টাচার্য, আশিষ ভট্টাচার্য,জয়ন্ত নাথ সরকার,সুনীল সাহা,আশিষ দে সরকার,রমেন দাস,উপেন দা প্রমুখের সঙ্গে।
ইতিমধ্যে কুচবিহার জেলার নিজস্ব এক বন্ধুমন্ডল তৈরি হচ্ছিল আমার।
চৈতালী ধরিত্রীকন্যা,অলোক সাহা,অভিজিৎ দাস,আমিনুর রহমান,রূপক সান্যাল,চন্দন কুমার চন্দ,স্বপন দেবনাথ,বিপুল আচার্য্য আরো কত নাম।
দল বেঁধে ঘুরি,হুল্লোড় করি,স্বপ্ন দেখি।
আর বুঝে যাইকবিতাজীবন আসলে তীব্র পাখির শিস।
পাঠকের হাট ।। অরুণ পাঠক
[আমার কাব্যজ্ঞানের প্রারম্ভিক পর্যায় থেকেই দেখে আসছি অগ্রজ কবিরা তাঁদের বই অকাতরে উপহার দিচ্ছেন। মুখে তৃপ্তির হাসি দাতা ও গ্রহীতার। চার চোখে সমান আগ্রহ। আশে পাশে কৌতুহল। বয়সে অনেক ছোট হলেও বহু প্রতিষ্ঠিত বিদ্বান কবি অল্পবয়সী আমাকেও তাঁদের কাব্যগ্রন্থ উপহার দিয়েছেন। আমিও আমার কাব্যগ্রন্থ ঝোলা থেকে বের করে কাঁপা কাঁপা হাতে কোনও শ্রদ্ধেয় অথবা স্নেহভাজন কবিকে উপহার দিয়ে স্বর্গীয় তৃপ্তি উপলব্ধি করি। আজও কোনও অনুষ্ঠানে গেলে এই কাব্যগ্রন্থ দেওয়া-নেওয়ার একটি বিশেষ পর্ব অলিখিতভাবে সূচিভুক্ত থাকে। তার বাইরে ডাক বিভাগের মাধ্যমেও অনেক কবি তাঁদের কাব্যগ্রন্থ আমার ঠিকানায় পাঠান।
নবীন-প্রবীণ, পরিচিত-অপরিচিত সেইসব কবিদের কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আমি এবার আমার অনুভবের দু-চার কথা বলতে চাইছি এখানে। তবে শুধু উপহার পাওয়া কাব্যগ্রন্থ নয় সেইসঙ্গে গাঁটের কড়ি খরচ করে যে অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ আমি এযাবৎ কিনেছি সেইসব কাব্যগ্রন্থেরও কোনও কোনওটি এই আলোচনার উপলক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।]
ভেঙে পড়া পাহাড়ি কোনও সেতুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে যখন গভীর খাদের দিকে তলিয়ে যেতে থাকি তখন ইহজন্মের শেষ আশ্রয় হিসেবে আঁকড়ে ধরি কোনও না কোনও কাব্যগ্রন্থ-কে। আর খুব অলৌকিকভাবে আটকে যাই পাহাড়ের সানুদেশে বেড়ে ওঠা কোনও গাছের শেকড়ে। মনে হয়, বেঁচে আছি এখনও নাকি কোনও পূর্বজন্মের স্মৃতি আমাকে মন্থন করাচ্ছে সুদূর জীবনের কোনও কবিতা-জীবন :
'জাতিস্মর জেগে ওঠে শারদ প্রভাতে
জেগে ওঠে পুরনো ক্রন্দন, আঁধি-ডিঙোনো সন্ধ্যার
তোমার চাঁদের মতো মুখ
চাঁদমালা হয়ে আছে দেবীর দক্ষিণ হাতে--
দেখে
কৃতাঞ্জলিপুটে আসি স্মৃতিগাছ
তোমার শিকড়ে
নিভৃতে প্রণাম রাখি...'
হ্যাঁ, এই সেই স্মৃতিগাছ যা আমাকে অনিবার্য পতন থেকে বারবার বাঁচিয়ে তোলে আর আমি কৃতজ্ঞতাবশতঃ যার শিকড়ে কৃতাঞ্জলিপুটে নিভৃতে প্রণাম রেখে আসি। আজ আমি যে স্মৃতিগাছ-এর আশ্রয় নিয়েছি তিনি কবি সুদীপ্ত মাজি। গত শতাব্দীর ন'য়ের দশকের অন্তিম কালে যার সঙ্গে আমার পরিচয় আর ততদিনে যিনি ওই দশকের একজন সুচিহ্নিত কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। যখন আমার কোনও জীবনই ছিল না তখন জীবনের ওই মহীরুহ একই বেঞ্চে আমার পাশে বসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক কবিতার ক্লাস করছেন। বয়সে জ্যেষ্ঠদের আমি সাধারণত দাদা বলে থাকি। সেক্ষেত্রে সুদীপ্ত আমার থেকে বয়সে বড় হলেও আমি তাকে সুদীপ্ত ও তুমি সম্বোধন করে বন্ধুত্বের উত্তাপ নিয়েছি। আমার সংজ্ঞাহীন শ্রমকল্পে সে এক উন্নত বিষাদ। তার কবিতার নাম, প্রতিটি পঙক্তি কমা ড্যাস সেমিকোলন আমার ছবির মতো মনে থাকে। আর সেগুলো আঁকড়ে ধরে আমি প্রতিটি মুহূর্ত নতুন নতুন করে বেঁচে উঠি। আমাদের ব্যক্তিগত যাপনের ইতিহাস অন্তরিন থাকুক। কিন্তু কৌতুকপ্রিয়, সংগ্রামী, চূড়ান্তভাবে নাগরিক এই এই কবি সময়স্পৃষ্ট চতুরতার চিহ্নগুলোকে কীভাবে শুধু মোমের রেখায় এঁকে দেন আর অপেক্ষা করেন পাঠকের অন্তর্গত জলে ভিজে ওঠার জন্য তা আমি জানি। কিন্তু কৃতঘ্ন সময় তাকে হতাশ করে :
'আত্মপরিচয়ের দিকে হাঁটতে গিয়ে দেখা গেল বেদনার পাতা উড়তে পরিপার্শ্বে/ আর/ অবনমিত হয়ে রয়েছে তোমাদের বিশ্বাসের পতাকা' ( হারিয়ে যাওয়া ময়ূর)।
'ফুরোনো মনের বনে ঘুরিফিরি আজ' ( মোহর)।
কিন্তু কী ফুরিয়েছে আমাদের?
'ফুরিয়েছে যত গান, সুর, স্বরলিপি
স্মরণিকা ভরে থাকা কথার সরিৎ
জেগে ওঠে, জ্যান্ত হয়-- অবিশ্বাস্য একার সমাজে!'
( মোহর)
সুদীপ্তর কবিতা বরাবরই বেদনানিটোল। চোখের জল মুক্তোর দানা হয়ে ঝলমলিয়ে ওঠে তার কবিতায়। বেপরোয়া শব্দবান্ধবের আলেয়ায় সহজে তা ধরা দেয় না। কিন্তু আন্তরিক অভিনিবেশের শব্দসজ্জা যথাযথ বেদনার অলিন্দে এনে ফেলে আমাকে। এই তো এখানেই 'উৎসব' নামাঙ্কিত একটি কবিতা পড়ছি। তুলে দিচ্ছি আপনাদের জন্য :
'যে কোনও আতসবাজি শেষ অবধি বিরহসম্ভব
শ্রমিকের ক্ষয়ে যাওয়া অস্থি-র সমগ্র আর
দীর্ঘশ্বাসের চাপা করুণ বিষাদ দিয়ে বানানো,/ জলজ'
সামান্য তিন পঙক্তির এই কবিতা ধরে আছে শ্রেণিচেতনা, ব্যাষ্টির উল্লাসের অধোগতে বিরহের জলজ বিষাদ। মনে পড়ে একদিন আমাদের 'রাত্রির তপস্যা' ছিল। এখন স্বভাবতই জীবনে সুদিন এসেছে। কিন্তু ভোলা কি যাচ্ছে :
'মৃণালের খুব নিচে, জলজ ঘুমন্ত সাপ' ( পদ্ম)
না। ওই জলজ ঘুমন্ত সাপের সঙ্গেই আমাদের সহবাস ছিল। এখন পদ্মের ঘ্রাণ যারা নিচ্ছে নিক। কিন্তু ইউনিভার্সিটির করিডোরে বসে পড়া আমাদের কলমের ডগায় থাকা লাইটার জ্বেলে সিগারেট ধরানোর আত্মমশাল অনেক আগে থেকেই জ্বালানো ছিল সুদীপ্তর। জীবনকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে সদ্য সে উঠে এসেছে। আর এখনও তাই :
'জীবনমৃত্যুর এক জলভরা ছায়া নিয়ে
নবীন শিশির নিয়ে
টলমল করে ওঠে পদ্মপাতা,দূরে' ( পদ্ম)
অর্থাৎ, জীবনের অনিশ্চয়তাকে এখনও কাটানো গেল না। বরং তা আরও পেঁচিয়ে ধরছে গলা। পার্থিব বৈষয়িক সুখ কখনও এই অনিশ্চয়তাকে দূর করতে পারে না। তাই কৈশোর কিংবা যৌবনের প্রিয় বিচরণভূমিকেও অচেনা লাগে এক সময়:
'বেড়াতে এসেছি দূরে, বিষণ্ণ মলিন দেশে, দূষিত ধুলোর দেশে/ চৈত্রশেষে, একা' ( আঁধি)
নিরাসক্তি, উদাসীনতা তখনই আসে যখন আমরা নির্বিকল্প চৈতন্যের সন্ধান পাই। শ্রীমদ্ভাগবদ্- গীতার দ্বিতীয় অধ্যায় সাংখ্যযোগ অংশের ৫৬ সংখ্যক শ্লোক বলছে :
'দুঃখেষ্বনুদ্বিগ্নমনা সুখেষু বিগতস্পৃহঃ।
বীতরাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীর্মুনিরুচ্যতে।।'
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি দুঃখে উদ্বিগ্ন নয়, সুখেও স্পৃহাহীন-- যাঁর আসক্তি নাই, ভয় নাই, ক্রোধ নাই তাঁকেই স্থিতপ্রজ্ঞ মুনি বলে। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি পড়তে পড়তে সুদীপ্তকে আমার স্থিতপ্রজ্ঞ বলেই মনে হচ্ছে। কারণ সুদীপ্ত লিখেছেন:
'দুপুর অনন্ত লাগে, এ শহরে
যুদ্ধে বিজিত, যেন অল্প সংখ্যক প্রাণী
বিষণ্ণ, আতুর
আচ্ছন্ন হয়ে থাকে নির্বিকল্প ঘুমে' ( আঁধি)
কবি কথিত এই 'নির্বিকল্প ঘুম' কি নির্বিকল্প সমাধি-র সমার্থক? আর তাই কি : 'ঘুম থেকে উঠে এসে আবার ঘুমের দিকের পথ' ( গান)? আরও, আরও:
'আঙ্গিকবিহীন এই প্রণিপাত
যে বোঝে সে বোঝে' ( প্রণিপাত বিষয়ক)
'অল্প সংখ্যক প্রাণী', 'যে বোঝে সে বোঝে'--- এই যে একা হয়ে যাওয়ার খেলায় কবি মেতেছেন ক্রমশ তা কি এক অসীম সত্যের মুখোমুখি করছে না আমাদের? জানি, আমরা কঠিন সত্যকে ভয় পাই। কিন্তু মেনে তো নিতে হবেই :
'তমসার বুকে ছিলে
আত্মলীন, অবরুদ্ধ, একা--' ( অভিজ্ঞান)
এখানে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দের সম্মোহন একজন অনুভবীকে গ্রস্ত করবেই। এই সুদীপ্তকে এবার কিন্তু আমার একটু অচেনাই লাগছে। কেন না ধর্মীয় লোকাচার, সংস্কারকে তিনি এতদিন পাশে পাশেই রেখেছিলেন। আজ এত বেদনাভার কেন তার রচিত কবিতার শব্দগুলোকে তীর্থস্নান করাচ্ছে? তা কি বয়স? অভিজ্ঞতা? একাকীত্ব? সে যাই হোক। আমরা দেখতে পাচ্ছি :
'পরবাসের ভেতর থেকে বটের ঝুরি নেমে এসেছে। জমা হয়েছে প্রাচীন বল্কল।' ( পুরোনো জার্নাল থেকে)
পরবাস-ই তো বটে। পৃথিবীর নিয়মতান্ত্রিক পরিবেশে, সংখ্যাচিহ্নিত মানবতাহীন, নির্মমতায় বাধিত, নষ্ট হুতাশনে পীড়িত কবি লেখেন :
'অনন্তের ঘরবাড়ি কুয়াশাশাসিত। নীরবতা
তার মাতৃভাষা।
সংখ্যার শাসন থেকে দূরে বহুদূরে...'
( জন্মদিনের লেখা : ২)
বাড়ি সুদীপ্তর খুব প্রিয় বিষয়। তার একাধিক কাব্যগ্রন্থনামে বাড়ি শব্দটি আছে। তবে চৈত্রপবন কিংবা গান বাঁধানো বাড়ি থেকে এ বাড়ি অনেক দূরবর্তী। সে বাড়ি কি লালন কথিত বাড়ি ( ঘর) ?
এই বাড়িতে কে বাস করে? সেই বাড়িতেই বা কে? এরা দুঃখ ও সুখ নামে চিহ্নিত? কিন্তু কবি জানেন :
'দুঃখ ও সুখের মধ্যে উড়ে চলা পাখিগুলি চির-যাযাবর/ --এই স্থির সত্য, এই আলো' (১৮৬১)।
সুখ-দুঃখহীন এই যাযাবরবৃত্তির মাঝখানে ভুল করে এই যে ক্ষণিক বিশ্রাম তাতেই জানা গেল সেইসব অধরা উন্মোচনখনি। ভালো লাগল :
'বহুকাল পরে এই ধর্মসমন্বয়' ( বসুন্ধরা রোড)।
বহুকাল পরে এক অজানা সুদীপ্তকে আবিষ্কার করলাম। বিষয়বিষহীন নির্লিপ্ত সুদীপ্ত। তবুও :
'গল্পের গেরুয়া থেকে গানের গহনে যেতে একটু সমুদ্রনীল/ মিলে মিশে গেলে / একটি আসক্তিরেখা জন্মালো গোপনে' ( দোয়েল) ।
মনে পড়ে জীবনের সব আলো যখন সহজ সত্য হয়ে ধরা দিয়েছিল, আনন্দে অবগাহনের সেই পুণ্য ক্ষণে সমুদ্র অন্তর্বর্তী একটি দ্বীপে একাকী আমাদের সেই নিভৃত যাপনের কয়েকটি দিন। সস্ত্রীক সুদীপ্তর সেই যাওয়া আর 'ফুরোনো বনের ময়ূর' নিয়ে ফিরে আসার মধ্যে যে দিনগুলি নিঃশেষ হয়ে গেল সে দিনগুলি খুঁজে ফিরি তারই কবিতায়।
সুদীপ্ত, তুমি আমাদের তরঙ্গের পাশে ভোরবেলা। তুমি আমাদের তরঙ্গের মাঝে ভোরবেলা হয়ে উঠেছ।
ফুরোনো বনের ময়ূর : সুদীপ্ত মাজি ।। দি সী বুক এজেন্সি ।। দাম : ১৫০ টাকা
ছবি : বিধান দেব
অরুণ পাঠক: এই শতাব্দীর সূচনালগ্নের কবি। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ বারোটি। প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'প্রশস্তির ভিন্ন রূপ' ২০০২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। এখনও পর্যন্ত শেষ কাব্যগ্রন্থ ' হাসি হাসি কান্নার বরফ' প্রকাশিত হয় ২০২০ সালে কলকাতা বইমেলায়। সম্পাদিত পত্রিকা : সাহিত্যের বেলাভূমি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গভাষা ও সাহিত্য-এ স্নাতকোত্তর ও শিক্ষক শিক্ষণ ডিগ্রীপ্রাপ্ত।
পেশা : শিক্ষকতা। কবিতা লেখা ও পত্রিকা সম্পাদনার জন্য বেশ কয়েকটি পুরস্কারে ভূষিত।
নয়া বৃহদারণ্যক ।। দেবাশিস দাশ
৪
আত্মতত্ত্ব (contd.)
আনখপ্রবিষ্ট তিনি সমস্ত শরীরে
খাপে ভরা ছুরি যেন— আত্মা, ধীরে ধীরে
বিভিন্ন কর্মের ভেদে পৃথক-পৃথক।
তিনিই ইন্দ্রিয়— চোখ, বাক্, কান, ত্বক।
দেখা, শোনা, কথা বলা ছাড়াও যখন
মানুষ মনন করে, তিনি হন মন।
প্রশ্বাস-নিঃশ্বাস নিয়ে যে-প্রাণী জীবিত,
তারই দেহে তিনি প্রাণ নামে পরিচিত।
আলাদা-আলাদাভাবে অদৃশ্য অন্তরে
হারানো পশুর পদচিহ্নের অক্ষরে
তিনিই থাকেন, তাঁর প্রকৃত সন্ধান
পেতে হলে একীভূত রূপে তাঁর ধ্যান
করা চাই,— এই তত্ত্বে কীর্তি-যশোলাভ
করে সত্য-উপাসক, থাকে না সন্তাপ।
'আমি মনু, আমি সূর্য'— জগৎ-সংসারী—
সর্বময় ব্রহ্ম তিনি, স্বরূপ আমারই—
আমিই উপাস্য ব্রহ্ম, আমি উপাসক
জগৎ সৃষ্টির আগে ছিলাম একক।
তাহলে আত্মাই সব? মানুষ, দেবতা—
সকলেরই জন্য ধর্ম পূর্ণাঙ্গ সভ্যতা।
ইন্দ্র, সোম, রুদ্র, যম, পর্জন্য, বরুণ,
মৃত্যু ও ঈশান— এরা ক্ষত্রিয় তরুণ।
এরা সর্বশ্রেষ্ঠ, যজ্ঞে এদের নীচেই
বসে ব্রাহ্মণেরা, আর যজ্ঞাগ্নি নিজেই
দেবতাদলের মধ্যে ব্রাহ্মণ আখ্যাত।
ব্রাহ্মণই উৎপত্তিস্থল সমস্ত জাতির
বংশ-বিস্তারের জন্য ঋষির খাতির
ছিল বহুযুগ আগে, 'গোত্র' থেকে তার
কিছুটা আন্দাজ মেলে, পুরাণকথায়
বাকি গল্প পাওয়া যাবে।— রাজমহিষীর
গর্ভসঞ্চারের জন্য পবিত্র ঋষির
দ্বারস্থ হতেন বহু নপুংসক রাজা।
তাছাড়া, গোপন কেচ্ছা হাজার-হাজার
বহুকাল ধরে চালু ছিল পৃথিবীতে।
সেহেতু ব্রাহ্মণদের শ্রদ্ধা করা রীতি।
প্রকৃত ব্রাহ্মণ হতে লাগে ব্রহ্ম-মিতি।
ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় গড়ে ব্রহ্ম বুঝলেন
বাকি রইল কর্মবিশ্বে আরও লেনদেন।
তাই তিনি বৈশ্য সৃষ্টি করলেন নিখুঁত—
বসু, রুদ্র, বিশ্বদেব, আদিত্য, মরুৎ।
তবুও সমস্ত ব্যক্ত হল না, তখন
শৌদ্রবর্ণ সৃষ্টি হল, করবে যে পোষণ।
'পূষা' অর্থে পৃথিবীকে বোঝায় আসলে।
অবশেষে কর্মনীতি নির্ধারিত হলে
ভারসাম্য ঠিক রাখা প্রয়োজন বলে
'ধর্ম' নামে ডিসিপ্লিন গঠন করলেন।
শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ, পীত প্রত্যেকের ব্রেন
আকারে সমান। এই গোটা পৃথিবীর
সমস্ত মানুষে তাঁর অস্তিত্ব নিবিড়।
ঘোর পাপ: বর্ণহিংসা, অ্যাপারথাইড।
সম্প্রীতিই শ্রেষ্ঠ ধর্ম, জগতের ভিত।
(ক্রমশ)
ছবি : বিধান দেব
জন্মের আগের মুখ ।। চন্দন মিত্র
জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন কোয়ানের অমায়িক ভুবন
দ্বাদশ পর্ব
ইয়ুনমেন/উমমন সম্প্রদায়
চিনের পূর্ব উপকূলে চিয়াংশি নগরে ৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে চাং পরিবারে জন্ম নেন ওয়েনইয়েন। তাঁর জন্মের দুই দশক আগে চিনের তাং-সম্রাট উজোঙ (৮১৪-৮৪৬ খ্রিঃ) বৌদ্ধধর্মকে বহিরাগত হিসাবে চিহ্নিত করে বৌদ্ধমুক্ত চিন গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এই বৌদ্ধবিনাশ কর্মসূচি গ্রহণের ফলশ্রুতিতে সারা দেশে প্রায় সাড়ে চার হাজার বৌদ্ধবিহার ও প্রায় চল্লিশ হাজার বৌদ্ধমঠ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। দুই লক্ষেরও বেশি সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীকে বলপূর্বক সাংসারিক জীবনযাপনে বাধ্য করা হয়। তবে বছর খানেক চলার পরে এই দমন-পীড়ন বন্ধ হয়ে যায়। হয়তো এই বৌদ্ধবিনাশের ইতিহাস বালক ওয়েনইয়েনকে প্রভাবিত করে থাকবে। পরিণত বয়সে তিনিই হয়ে উঠবেন প্রখ্যাত চ্যান-ব্যক্তিত্ব ইয়ুনমেন, জাপানি উচ্চারণে উমমন। ভবিষ্যতে তাঁর হাত ধরেই দক্ষিণ চিনে গড়ে উঠবে চ্যান ঐতিহ্যের উল্লেখযোগ্য ধারা ইয়ুনমেন বা উমমন সম্প্রদায়।
ওয়েনইয়েন সম্পর্কে তথ্য খুব একটা অপ্রতুল নয়। ওয়েনইয়েন ছিলেন স্মৃতিধর, মেধাবী ও কাব্য-অনুরাগী। তিনি অল্প বয়সেই ধর্মমনা হয়ে ওঠেন এবং স্থানীয় কুং-উয়াং মঠে চি ছাং নামক সন্ন্যাসীর কাছে বৌদ্ধধর্ম সংক্রান্ত মূল পাঠ নেন। কুড়ি বছর বয়সে তিনি দীক্ষিত হন। তারপর বেড়িয়ে পড়েন তীর্থ পর্যটনে। ঘুরতে ঘুরতে তিনি সন্ধান পান তাও-চোঙ নামক এক চ্যান-শিক্ষকের। তাঁর বাড়ি সত্তর মাইল দূরে মুচৌ নামক স্থানে। ওয়েনইয়েন তখন পঁচিশ বছরের টগবগে যুবক। তিনি সেই দীর্ঘ দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে চললেন তাও-চোঙ-এর বাড়ি। তাও-চোঙ সম্পর্কে একটু বলে নেওয়া সমীচীন। একদা তিনি ছিলেন ওবাকুর শিষ্য, লিন-চি তখন ছিলেন তাঁর সতীর্থ। বিভিন্ন মঠ ঘুরে তিনি যখন কাও-আন এর মি-শান মঠে থিতু হয়েছিলেন তখন তিনি বৃদ্ধা মায়ের অসুস্থতার সংবাদ পান। দেরি না-করে তিনি বাড়ির উদ্দেশে হাঁটা শুরু করেন। মুচৌতে ফিরে বাড়ির কাছাকাছি লংশিং মঠকেই তিনি বসবাসের স্থান হিসাবে বেছে নেন। বছর কয়েক সেখানে থাকার পরে মায়ের দেখভালের জন্য তিনি পাকাপাকিভাবে বাড়িতেই বসবাস শুরু করেন। জীবিকা হিসাবে বেছে নেন চর্মকারের পেশা। মা-ছেলের অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা হয়ে যায়। কালক্রমে তাও-চোঙ নামের বদলে স্থাননামের প্রভাবে তিনি মুচৌ তাওমিং নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ওয়েনইয়েন যখন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান তখন তিনি যথেষ্ট বৃদ্ধ হয়েছেন। মুচৌ-এর সঙ্গে দেখা করা সহজ ছিল না। ওয়েনইয়েন পরপর দুদিন দরজায় টোকা মেরে ব্যর্থ হন। তৃতীয়দিন ওয়েনইয়েনকে আসতে দেখে মুচৌ দরজা বন্ধ করে দেন। নাছোড় ওয়েনইয়েন বেশ জোরে জোরে দরজায় টোকা দিতে থাকেন। বাধ্য হয়ে মুচৌ দরজা খুলে বাইরে উঁকি মারেন। কথোপকথন শুরু হয়।
মুচৌ— কে আপনি ?
ওয়েনইয়েন— আমি ওয়েনইয়েন।
মুচৌ— আপনি বারবার আমার কাছে কেন আসছেন বলুন তো ?
ওয়েনইয়েন— আমি নিজেকে ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। আপনি এব্যাপারে আমাকে পথ দেখান।
মুচৌ— অপদার্থ কোথাকার !
কথা শেষ করে মুচৌ, ওয়েনইয়েনকে দিলেন এক প্রচণ্ড ধাক্কা। সেই ধাক্কার প্রতিক্রিয়ায় ওয়েনইয়েন-এর বোধি জাগরিত হয়। এই ঘটনার অন্য এক বয়ান অনুযায়ী ওয়েনইয়েন মুচৌ-এর কক্ষে প্রবেশ করতে চাওয়ায় তিনি দরজা সজোরে বন্ধ করে দেন। দরোজার ফাঁকে আটকে যাওয়ার ফলে ওয়েনইয়েন-এর একটি পা ভেঙে যায়। প্রচণ্ড সেই যন্ত্রণা ওয়েনইয়েন-এর বোধি জাগ্রত করে। শেষমেশ মুচৌ তাঁকে শিষ্য হিসাবে গ্রহণ করেন।
ওয়েনইয়েন বছর পাঁচেক মুচৌ- এর কাছে থাকেন। তারপর মুচৌ-এর নির্দেশে যান মিন রাজ্যে (বর্তমান ফুজিয়ান প্রদেশ) প্রখ্যাত চ্যান-শিক্ষক শিউয়ে ফাং-এর মঠে। মঠটি ছিল শিউয়ে পর্বতের উপরে। তখন সেখানে বাস করতেন প্রায় হাজারখানেক শিক্ষার্থী। পর্বতের পাদদেশের এক গ্রামে ওয়েনইয়েন-এর সঙ্গে জনৈক সন্ন্যাসীর দেখা হয়। ওয়েনইয়েন তাঁর সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা জুড়ে দেন।
ওয়েনইয়েন— আপনি বুঝি আজকেই পর্বতের উপরে শিউয়ে ফাং-এর মঠে যাবেন ?
সন্ন্যাসী— হ্যাঁ।
ওয়েনইয়েন— আপনি দয়া করে মঠাধ্যক্ষকে আমার একটি জিজ্ঞাসা নিবেদন করবেন। তবে ভুলেও আমার কথা বলবেন না। বলবেন জিজ্ঞাসাটি আপনার।
সন্ন্যাসী— ঠিক আছে। আপনার জিজ্ঞাসাটি বলুন।
ওয়েনইয়েন— আপনি মঠে পৌঁছে ধর্মসভা শুরু না-হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। মঠাধ্যক্ষ মঞ্চে উপবিষ্ট হওয়ার পরে আপনি তাঁর দিকে এগিয়ে যাবেন, তাঁর সামনে গিয়ে করজোড়ে বলবেন, হে প্রাজ্ঞবন্ধু, আপনার কাঁধের উপর যে লৌহ খ্যাঙ্কো (তৎকালীন চিনে অপরাধীদের সাজা দেওয়ার জন্য তাদের কাঁধে একটি কাঠের খাপ বা খ্যাঙ্কো লাগিয়ে দেওয়া হতো, যা ছিল খুব যন্ত্রণাদায়ক) বহন করে চলেছেন, তা নামিয়ে ফেলছেন না কেন ?
বোধহয় সেই সন্ন্যাসী ছিলেন নিতান্ত সহজসরল অথবা ওয়েনইয়েনকে কথা দিয়েছিলেন বলে আসন্ন বিড়ম্বনাকে এড়িয়ে যেতে পারেননি। সন্ন্যাসী শ্রোতৃমণ্ডলীর ভিড়ের মধ্য দিয়ে পৌঁছে যান মঠাধ্যক্ষ শিউয়ে ফাং-এর কাছে। তারপর বিনীতভাবে নিবেদন করেন ওয়েনইয়েন-কথিত জিজ্ঞাসাটি। শিউয়ে ফাং এমন জিজ্ঞাসায় অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। তিনি বুঝতে পারেন একজন নিতান্ত সাধারণ সন্ন্যাসীর পক্ষে এমন গূঢ় জিজ্ঞাসা নিবেদন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তিনি আসন থেকে নেমে এসে সন্ন্যাসীকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন।
শিউয়ে ফাং— বলুন, বলু্ন, কী বলছিলেন বলুন!
সন্ন্যাসী থতমত খেয়ে যান। শিউয়ে ফাং তাঁকে ধরে ঝাঁকুনি দিতে থাকেন। সঙ্গে জেরাও চলতে থাকে।
শিউয়ে ফাং— এ আপনার কথা নয়। বলুন কার কাছ থেকে শিখে এসে এসব বলছেন?
সন্ন্যাসী— না। এ আমার কথা।
শিউয়ে ফাং— হতেই পারে না। আপনি মিথ্যাচার করছেন।
অচিরেই শিউয়ে ফাং-এর নির্দেশে সেই সন্ন্যাসীকে বেঁধে ফেলা হয়। সন্ন্যাসী হেনস্থা থেকে বাঁচতে পূর্বাপর সব ঘটনা গড়গড় করে বলে ফেলেন। রহস্য প্রকাশিত হলে শিউয়ে ফাং, তখন সেই সমাবেশের উদ্দ্যেশ্যে ঘোষণা করেন— সুধীবৃন্দ, এমন এক সন্ন্যাসীকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত হোন, যিনি অদূর ভবিষ্যতে শত শত শিক্ষার্থীকে পথ দেখাবেন।
সেই প্রাজ্ঞ আগন্তুককে মঠে আনার জন্য শিউয়ে ফাং, লোকজন পাঠিয়ে দেন। মঠে আগত ওয়েনইয়েনকে সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে শিউয়ে ফাং বলেন, আসুন, আপনার অপেক্ষাতেই ছিলাম। যেন কতদিনের চেনা ! ওয়েনইয়েন প্রায় এক দশক শিউয়ে ফাং-এর মঠে কাটান।
৯০৮ খ্রিস্টাব্দে শিউয়ে ফাং-এর মৃত্যুর পর ওয়েনইয়েন ষষ্ঠ আচার্য হুইনেং-এর স্মৃতিধন্য তীর্থস্থানগুলি ভ্রমণ করতে করতে ৯১১ খ্রিস্টাব্দে শাওকুয়ান নগরে পৌঁছান। শাওকুয়ান, দক্ষিণ চিনের কুয়াংতুং প্রদেশের অন্যতম নগর। কুয়াংতুং প্রদেশের একটি ইতিহাস আছে। উপকূল-ছোঁয়া অঞ্চলটি ছিল নৌবাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য স্থান। ফলে অর্থনৈতিক দিক থেকে অঞ্চলটির বিশেষ গুরুত্ব ছিল। মিন প্রদেশের এক ভ্যাগ্যান্বেশী লিউ-ইন, ডেরা বেঁধে সুদিন ধরার অপেক্ষায় পড়ে ছিল কুয়াংতুং অঞ্চলে। হুয়াং চাও বিদ্রোহ (৮৭৪-৮৮৩ খ্রিঃ) শুরু হলে তিনি তাং বাহিনীতে যোগ দিয়ে বিদ্রোহ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। তাঁর এই অবদানের জন্য ৯০৫ খ্রিস্টাব্দে তাং-মন্ত্রীসভা তাঁকে ওই অঞ্চলের প্রধান সামরিক আধিকারিকের পদ দেন। ৯০৭ খ্রিস্টাব্দে তাং সাম্রাজ্যের পতন হলে বিস্তীর্ণ দক্ষিণ চিন লিউ-ইন-এর শাসনে চলে আসে। তবে তিনি নিজেকে রাজা বা সম্রাট হিসাবে ঘোষণা দেননি। ৯১৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ভাই লিউ ইয়ান সম্রাট কাওজু নাম নিয়ে নতুন রাজ্যের সূচনা করেন। প্রথমে তিনি রাজ্যের নামকরণ করেন ‘উয়ে’ পরে তা পরিবর্তিত করে রাখেন ‘হান’। সেই নাম পরবর্তীকালে ‘দক্ষিণের হান রাজ্য’ হিসাবে ঐতিহাসিক খ্যাতি পায়। ওয়েনইয়েন, শাওকুয়ান নগরের লিংশু মঠে বসবাস শুরু করেন। লিংশু পর্বতের উপরে অবস্থিত বলেই মঠটি ওই পর্বতের নামেই চিহ্নিত হয়েছিল। মঠাধ্যক্ষ রুমিন-তাংশি ওয়েনইয়েনকে ঠিকই চিনেছিলেন। তিনি তাঁর উপর মঠের প্রধান সন্ন্যাসীর গুরুদায়িত্ব ন্যস্ত করেন। ৯১৮ খ্রিস্টাব্দে রুমিন তাংশি মারা গেলে সম্রাট কাওজু তাঁর অন্ত্যেষ্টির দায়িত্ব নেন এবং মঠে তাঁর একটি মর্মর মূর্তি স্থাপন করেন। এইসময় লিংশু মঠে সম্রাট কাওজুর সঙ্গে ওয়েনইয়েন-এর সাক্ষাৎ হয়। সম্রাট, নবপরিচিত সন্ন্যাসীর আচরণে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে আন্তরিক শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ৯১৯ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট কাওজু ওয়েনইয়েনকে প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁকে চীবর উপহার দেন এবং লিংশু মঠের মঠাধ্যক্ষ নির্বাচন করেন। ৯২৩ খ্রিস্টাব্দে রাজ-আনুকূল্যে ইয়ুনমেন পর্বতে একটি নতুন মঠের নির্মাণকাজ শুরু হয়। পাঁচবছর পরে নির্মাণকাজ শেষ হলে ওয়েনইয়েন নবনির্মিত সেই মঠের অধ্যক্ষ হন। পর্বতের নামে মঠের নাম হয় ইয়ুনমেন মঠ এবং অধ্যক্ষ ওয়েনইয়েন কালক্রমে ইয়ুনমেন নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। এখন থেকে আমরা ওয়েনইয়েনকে ইয়ুনমেন নামেই চিহ্নিত করব।
৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ১০ মে ইয়ুনমেন তখন পঁচাশি বছরের বৃদ্ধ। মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বে তিনি উত্তরসূরিদের জন্য একটি নির্দেশিকা লিপিবদ্ধ করে যান। তাঁর অনমনীয় আদর্শের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসাবে আজও সেই লিপিটি অমলিন হয়ে আছে। আসুন আমরা দেখে নিই তাঁর সেই অন্তিমলিপিটি—
‘আমার মৃত্যুর পর সামাজিক প্রথা মেনে শোক-প্রকাশক পোশাক পরিধান করা বা বিলাপপূর্ণ অন্ত্যেষ্টিযাত্রায় আমি নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যাচ্ছি। কারণ তা বুদ্ধের নীতির লঙ্ঘন এবং চ্যানচর্চার পথে সমস্যা সৃষ্টি করবে।’
বলাবাহুল্য তাঁর মৃত্যুর পর এই নিষেধাজ্ঞা মানা হয়নি। তাঁর অন্তিম শোভাযাত্রায় সহস্রাধিক মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
ইয়ুনমেন-এর শিষ্যসংখ্যা ছিল প্রায় আটশো। এছাড়া অতিথিদের আনাগোনা তো লেগেই ছিল। তিনি আন্তরিকভাবে সকলকেই বোধির পথে এগিয়ে দিতেন। যষ্টিপ্রহার ও পিলে-চমকানো হঠাৎ চিৎকার ছিল তাঁর শিক্ষাদানের অপরিহার্য অঙ্গ। ইয়ুনমেন অনেকসময় শিষ্যদের জিজ্ঞাসার উত্তরে একটিমাত্র আপাত অর্থহীন শব্দ উচ্চারণ করতেন। তাঁর উচ্চারিত এই একশব্দের উত্তরগুলিকে চিনা ভাষায় বলা হতো ‘কুয়ান’ যার বাংলা অর্থ— বাধা। এই কুয়ানগুলি চ্যান ঐতিহ্যে ‘ইয়ুনমেন-এর এক শব্দের বাধা’ হিসাবে সুপরিচিতি। শব্দগুলি ছিল সংক্ষিপ্ত, ধারালো ও অমোঘ। দু-একটি দৃষ্টান্ত উদ্ধার করা যাক।
এক
জিজ্ঞাসা— যে তার বাবা ও মাকে হত্যা করে সে বুদ্ধের কাছে স্বীকার করে। কিন্তু যে বুদ্ধ ও আচার্যকে হত্যা করে সে কার কাছে স্বীকার করবে ?
উত্তর— প্রকট।
দুই
জিজ্ঞাসা— পশ্চিম থেকে আচার্য আসার তাৎপর্য কী ?
উত্তর— গুরু।
তিন
জিজ্ঞাসা— প্রকৃত শিক্ষার উদ্দ্যেশ্য কী ?
উত্তর— সর্বত্র।
চার
জিজ্ঞাসা— চ্যান কী ?
উত্তর— এটাই।
চ্যান-বিষয়ক কোনও জিজ্ঞাসার পরিপ্রেক্ষিতে একাধিক শব্দ বা বাক্যের গূঢ় তাৎপর্যবাহী উত্তর ‘কোয়ান’ নামে পরিচিত। ইয়ুনমেন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জিজ্ঞাসার উত্তর দিয়েছেন, সেগুলি তাঁর শিষ্যদের কেউ কেউ লুকিয়ে লিপিবদ্ধ করেছেন। লুকিয়ে লিপিবদ্ধ করার কারণ তাঁর কথাবার্তা লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে ইয়ুনমেন-এর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা ছিল। ইয়ুনমেন-এর কোয়ানগুলি মেধা ও মননের নির্যাস সমৃদ্ধ। আদিযুগের বা বর্তমান সময়ের এমন কোয়ান-সংকলন নেই যেখানে ইয়ুনমেন অনুপস্থিত !
ইয়ুনমেন-এর একটি বিখ্যাত কোয়ান-এর স্বাদ নেওয়া যাক। একদা ইয়ুনমেন তাঁর সমাবেশে উপস্থিত সন্ন্যাসীদের উদ্দ্যেশ্য করে বলেন, আমি আপনাদের পনেরো তারিখের আগের দিনগুলি সম্পর্কে কিছুই জানতে চাইছি না। কিন্তু জানতে চাইছি পনেরো তারিখের পরের দিনগুলি কেমন হবে ? তাঁর এই জিজ্ঞাসা শুনে উপস্থিত সবাই থতমত খেয়ে যান। কেউ আর উত্তর দিতে পারেন না। শেষে উত্তর দেন ইয়ুনমেন স্বয়ং— প্রতিটি দিনই একটি ভালো দিন।
ইয়ুনমেন সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ চ্যান-ইতিহাসের একটি স্মরণযোগ্য অধ্যায়। এই ধারার অনেকেই চিত্রকলা ও কাব্যচর্চার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। শি-তউ জোঙ-শিয়েন (৯৮০-১০৫২ খ্রিঃ) ছিলেন রীতিমতো প্রথাসিদ্ধ কবি। তাঁর গুরু তথা ইয়ুনমেন-এর ধর্মসূরি চি-মেন কুয়াং-শু (মৃত্যু ১০৩২ খ্রিঃ) ও ছিলেন স্বনামধন্য কবি। ইয়ুনমেনও কিছু পদ রচনা করেছিলেন । এছাড়া তিনি ছিলেন চ্যান-ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাগ্মী। প্রায় তিনশো বছর এই ধারাটি বহমান থাকার পর দ্বাদশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে তা লিন-চি সম্প্রদায়ের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। তবু শেষ হয়েও হইল না শেষের মতো এই সম্প্রদায়ের একটি ক্ষীণ স্রোত প্রবাহিত ছিল। বিংশ শতাব্দীতে সেই ক্ষীণ স্রোতটিকে পুনরায় প্রাণবন্ত করে তোলেন এই ধারার সুযোগ্য উত্তরসূরি সু-ইয়ুন (১৮৪০-১৯৫৯ খ্রিঃ)। তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্যগণ এই ঐতিহ্যশালী ধারাটিকে কৃতিত্বের সঙ্গে বহন করে নিয়ে গেছেন ইউরোপ-আমেরিকায়।
তথ্যসূত্র :
১. ZEN MASTER YUNMEN : HIS LIFE AND ESSENTIAL SAYINGS ; TRANSLATED AND EDITED BY URS APP ; SHAMBHALA 2018.
২.ZENBUDDHISM: A HISTORY
৩.ZEN MASTERS OF CHINA : THE FIRST STEP EASTBY RECHARD BRYAN MC DANIEL; TUTTLE PUBLICATION, TOKYO/ VERMONT/ SINGAPORE.
৪.ZENS CHINESE HERITAGE BY ANDY FERGUSON ; WISDOM PUBLICATION, BOSTON.
ছবি : বিধান দেব
চন্দন মিত্র : জন্ম নভেম্বর ১৯৭৬, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ডায়মন্ড হারবার মহকুমার ভগবানপুর (হরিণডাঙা) গ্রামে। বাংলা ভাষা-সাহিত্যের শিক্ষক। কবিতা লেখার সূত্রে লেখালেখির জগতে প্রবেশ। লেখেন প্রবন্ধ ও গল্প ।
প্রকাশিত পুস্তক :
কাব্য পুস্তক : আমার আত্মার পায়ে বাঁধার ঘুঙুর, যাপনচিত্র, ২০১৯; সরলতা ক্রমশ গায়েব হইতেছে, সাহিত্যের বেলাভূমি ২০২০
প্রবন্ধ পুস্তক : জেন : রিপুতাড়িত মানবের নিকট সুসমাচার ও অন্যান্য প্রবন্ধ, কলিকাতা লেটার প্রেস, ২০১৯
সম্পাদিত পত্রিকা : পাড়ি
আবহবিকার ।। রাজদীপ রায়
তৃতীয় পর্ব
পুষ্পবিতান
প্রার্থনা কী ও কেমন, তখনও জানি না। হাত জোড় করে কী যেন বিড়বিড় করে চাইতে দেখেছি অনেককে। সেইসমস্ত অব্যক্ত গুঞ্জন কোথায় গিয়ে পৌঁছতে চায় তা ভাববার মতো মন তখনও জন্মায়নি। ছোটবেলায় বদমায়েশি করলে মা হুঁশিয়ারি দিত বোর্ডিং-এ ভর্তি করে দেবে। বাড়িতে নয়, সেখানে থেকেই করতে হবে পড়াশুনো। বাড়িতে আসতে দেবে, কিন্তু খুব কম, তাও দু-এক দিনের জন্যে। এমন পরিস্থিতিতে যখন প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হলাম, হাতের চাঁদ পাওয়া গেল। এবার অন্তত বোর্ডিং যেতে হবে না। কোথায় ভর্তি হব? পুষ্পবিতানে। আমাদের পাড়ারই মেয়ে রূপা মিস। আমার বাবাকে মামা বলতেন, তার স্কুলেই ভর্তি হলাম। হাসিখুশি রূপা মিসকে ছোট থেকেই চিনতাম; তাই স্কুলে ভর্তি হওয়ার বিষয়টাকে খুব ভীতিপ্রদ কিছু মনে হয়নি। স্কুলে গিয়েই আমি সচেতনভাবে প্রথম হাতজোড় করি কোনও কিছুর উদ্দেশ্যে। আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে..., বল বল সবে শতবীণা বেণু রবে..., উঠো গো ভারতলক্ষ্মী..., এইসব ছিল প্রার্থনাসঙ্গীত। কত গান এইভাবে শিখে গিয়েছি তখন। কত গলা সমবেত ভঙ্গিতে নিজেদের খামতিগুলো ঢেকে ফেলছে অনায়াসে। মাধুরী মিস, কাজল মিস, বড় মিস সবার উদাত্ত কণ্ঠ ইছাপুরের রোস্টেড বাতাসে কিছুক্ষণের জন্যে মায়াপশম ছড়িয়ে দিচ্ছে। বড় মিসকে খুব ভয় পেতাম অবশ্য। খুব রাসভারি ছিলেন তিনি। বড় মিসের মেয়ে এলিসাও আমাদের সঙ্গে পড়ত। একটি ক্লাব এই স্কুলকে পরিচালনা করত। ১৯৮৮-৮৯ সাল, তখন স্কুলে ভর্তি করবার এত প্রতিযোগিতা ছিল না। এত উদ্বেগ কাজ করত না বাবা-মায়েদের মধ্যে। স্কুলজীবন আমার তেমন ভালোলাগেনি কোনওদিন। মা যখন স্কুলে দিয়ে ফিরে যেত, তখন যতদূর দেখা যায়, বিন্দু হয়ে যাওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে থাকতাম তার দিকে। নার্সারিতে পড়বার সময় আমাকে বোঝানো হত—মা ঠিক দরজার বাইরেই বসে আছে, অতএব আমার ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। সেই মিথ্যেকেই আজীবন সত্যি ভেবে কেটে গেল নার্সারিজীবন।
স্বাদ-গন্ধ চলে যাওয়ার মতো করে একদিন স্মৃতিরাও চলে যায়। মনে রাখতে ইচ্ছে করে সবকিছু; কিন্তু কিছুতেই সবকিছু মনে থাকে না। পুষ্পবিতানের কত সুগন্ধ হারিয়ে ফেলেছি। সদ্য কুঁড়ি-ওঠা বন্ধু, তারা হারিয়ে গেছে ফুল হবার আগেই। একই কথা মনে হয় ইছাপুর হাই স্কুলের ক্ষেত্রে। এখানে পরিচয় হয় অনাথ আর বিনয়ের সঙ্গে। দুজনেই বসত পিছনের বেঞ্চিতে। আমার একটা অদ্ভুত স্বভাব ছিল। যাদের ভাল লাগত, তাদের হাতের লেখা নকল করতে চাইতাম। একবার অনাথের মতো, তো একবার বিনয়ের মতো। এমন নয় তাদের লেখা খুবই সুন্দর। কিন্তু তাদের লেখার কোনও বিশেষত্ব আমাকে টানত। কারোর দ-লেখার টান, কারোর ধ-এর মাথার শুঁড়টা। সেই ভালোলাগাটুকু আমি আমার লেখায় তুলে নিতাম। এ-কারণেই ছোট থেকে অনেকবার আমার হাতের লেখা পালটেছে। আমার মনে প্রভাব ফেলেছে বাবা, রাঙা কাকা, আমার শিক্ষকদের কেউ কেউ। ইছাপুর স্কুল মানে কুলের আচার, বনকুল, সাবুর নলিপাঁপড়, ঝালমুড়ি, এইসব। কিন্তু পুষ্পবিতানে তো এসব স্বাধীনতা ছিল না। সেখানে টিফিনে মায়ের দেওয়া সন্দেশ-বিস্কুট পর্যন্ত দিদিমনিদের নজরে খেতে হত। আর এইসব দিনগুলোকে এখন অনেক দূর থেকে দেখে মনে হয় মৌলিকতা কথাটা আদতে বিষণ্ণ ধাপ্পা। নিজস্বতা বলে যাকে গড়ে তুলতে চাইছি; যে অলীক ব্যক্তিত্বকে উপস্থাপিত করতে চাইছি কোনও বিশেষ অভিপ্রায়ে, সেখানে অতিজীবনের ছকে ধরা পড়ে এইসব বুজরুকি। এ-জীবন অন্যের অলংকৃতি। আমি খানিক অন্যের মধ্যে, অন্যেও খানিক আমার মধ্যে। বিনয় আমাকে মাঞ্জা-দেওয়া শেখাতে চেয়েছিল; পারেনি। আমিও বিনয়ের হাতের লেখা সুন্দর করতে পারিনি। এই ব্যর্থতা পারস্পরিক, সীমাহীন। উভয়েই এ-কারণে দুঃখিত হয়েছি। আমরা সেই ছোট বয়সে তুমুল বিশ্বাস করতাম হাওড়া শহরে মরে যাওয়া মাঠেদের আত্মা ছোট ছোট ছেলেদের নাম করে ডাকে। সেইসব ছেলেদের আর পড়াশুনো হয় না। তারা সব বুঁদ হয়ে ছুটে যায় কাঁচা টাকার পেছনে। নোটের তারায় ফুরিয়ে যায় প্রকাশ্য শৈশব। ভেতরে পাক দিয়ে ওঠে বিষ। তারপর হৃদয়ে ক্ষত নিয়ে সেইসব পাখিরা কোথায় হারিয়ে যায়—কেউ তার কোনও খবর রাখে না। বিনয়ও এমনই কোনও স্কুলফেরত বিকেলের আলোয় নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল।
প্রার্থনার অকৃত্রিম জোর আছে। আমি অনাথকে দেখতাম মন দিয়ে প্রার্থনা করতে। আমি মন দিয়ে কোনদিন প্রার্থনা করতে পারিনি কারণ, যখন প্রার্থনা হত আমি অনাথের দিকে মুখ করে থাকতাম। যার হাতের লেখা আমাকে টানত, তার প্রার্থনার ভঙ্গিমাও আমাকে স্তব্ধ করে রাখত। কষ্ট একটাই সেই স্কুলবাড়ি উঠে গেছে। ইছাপুর হাই স্কুল কতিপয় ছাত্রসংখ্যা নিয়ে মৃতপ্রায়। আর পুষ্পবিতান প্রথমে নাম পালটে নবজাগরণ, পরে সেইটুকুও মুছে গেছে। এখন সেই বাড়ি নিছক ক্লাবঘর মাত্র। সারাদিন ক্যারাম পেটানো হয়। রাতে মদের আসর বসে। যখন সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি, এমন সময় হঠাত্ রূপা মিস। আমি নমস্কার করতে যেতে রীতিমতো চমকে উঠলেন; পরিচয় দিতে তার চোখে-মুখে প্রশান্তি নেমে এলো। এরপর একদিন সেই সূর্যাস্তের আভাটুকুও আর রইল না। একদিন নাটক দেখে একটু রাত করেই ফিরছি; এমন সময় ভুলে যাওয়া পুষ্পবিতানের ছাদে কোমর দুলিয়ে দুজন নাচছে। তাদের শরীর থেকে ছিটকে পড়ছে জ্বলন্ত অঙ্গার। সেদিন নাটক দেখা চোখে ভুলক্রমে যেন তাদের বিনয় এবং অনাথ মনে হয়েছিল।
মেয়ে সদ্য স্কুলে ভর্তি হয়েছে। মনে খুব ভয়। কিছুতেই যাবে না। তাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে স্কুলে নিয়ে যাই। সাইকেলের সামনের ছোট্ট সিটে মেয়ে বসে জিজ্ঞেস করে: আমরা কোথায় যাচ্ছি?—ট্রেন দেখতে। --ট্রেন দেখা হয়ে গেলে বাড়ি ফিরে আসব তো?—আসব, তার আগে একটু দিদিমনিদের সঙ্গে দেখা করে নিই। নাহলে তারা মনে কষ্ট পাবেন না? মেয়ে ইতস্তত করতে করতে একসময় মেনে নেয়। ‘প্রতিদিন ভোরে আমি, অবাক শিশুর চোখে দেখি, চরাচর/ মর্নিং স্কুলের মতো প্রাণচ্ছল, শান্ত ও সুন্দর!’ একসময় হাত ছাড়বার সময় আসে। মেয়ে আব্দার করে, আমি যাবার আগে একবার কোলে নাও। কোল থেকে নেমে ও প্রজাপতির মতো স্কুলে ঢুকে যায়। আমি একমনে ওর যাওয়া লক্ষ করি। মনে পড়ে যায়, কোনও একসময় আমি এভাবেই লক্ষ করতাম মায়ের চলে যাওয়া। সেদিন আর আজকে খুব বেশি পার্থক্য নেই। শুধু ইস্কুলের রাস্তা হারিয়ে ফেলা এক স্কুলবালকের বিকেলগুলো কেটে যাওয়া ঘুড়ির মতো কোনও পাঁচিলের কোণঘেঁষে থম মেরে পড়ে আছে।
• উদ্ধৃত কবিতাংশর উত্স : মর্নিং স্কুলের কবিতা, রণজিত্ দাশ
(ক্রমশ)
ছবি : বিধান দেব
রাজদীপ রায় : জন্ম: ১৯৮৪। পেশা শিক্ষকতা। কবিতা ও গদ্য প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। কবিতার বই আছে পাঁচটি। 'যদি না পুনর্জন্ম হয়', 'ধানদূর্বার দেশ', 'জন্মান্ধের আলো','সূর্যের বিষাদ', 'বিশল্যকরণী'। প্রকাশিত হতে চলেছে 'রামকৃষ্ণের মুখে গল্প'।
গুচ্ছ কবিতা ।। অমিত কাশ্যপ
ভয়
১
গুটি গুটি পায়ে কখন যেন সন্ধে নামত
মা তুলশিতলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে
ঘরে ঘরে আলো দিতেন
বৈঠকখানা হেঁসেল দাওয়া বড়োঘর
অন্ধকার তবুও ঘাপটি মেরে
চৌকিরতলা বারান্দার কোণা সিঁড়ির নিচটা
আমরা মায়ের কাছাকাছি
ঠাকুমা যদ্দিন ছিলেন তাঁর কাছে, ঘেঁষে ঘেঁষে
কেমন এক ভয়, জড়িয়ে জড়িয়ে পায়ে
বড়ো হচ্ছি, বুনিয়াদি শেষ করে বড়ো ক্লাস
কলেজ জীবন হুস করে চলে গেল
লন্ঠন হ্যারিকেন উঠে গিয়ে বিজলি বাতি
অন্ধকার তবুও গেল না, ভয়ও গেল না
কোণায় কোণায় সযত্নে রয়ে গেল ঘাপটি মেরে
২
অন্ধকার বলতে অন্ধকার নেমে এল
আলো বলতে এল না, এরকম হল
যে মুখ মনে করতে চেষ্টা করি
আচম্বিতে অন্য মুখ এসে দাঁড়ায়
এরকম হয় বলে ভয়ে ভয়ে থাকি
চেনা মানুষকেও ডাকতে ভয় পাই
হয়তো উনি বলে উঠতে পারেন
আমি নই, ভুল করছেন
নরম বিকেলের পর সন্ধে নামে
ঝুমকো ঝুমকো অন্ধকার, ভুল যানে উঠে
ভুল জায়গায় নামি, কোলাহল গোলমাল
আবার জড়িয়ে জড়িয়ে ধরে, এভাবেই চলি
বাজার দোকান হাঁটাহাঁটি অফিস
বাড়িতে বিনোদনটুকুও ভুলতে বসেছি
সর্বত্র তন্ন তন্ন করে খুঁজে চলি সেই আশ্চর্য
ভয়হীনতার বটিকা, অন্বেষণ অন্বেষণেই থাকে
ঘর
১
এই ঘর এখন আনন্দ ঘর হয়ে উঠেছে
আগে ছিল না
এই ঘরের প্রতিটি জায়গায় যেন কত স্মৃতি
আগে মনে হয়নি
আগেও এই ঘরে উল্লাশ দিনের পর রাত
মসৃণ রাতের পর দিন প্রকাশ হত সাবলীল
মনে হয়নি কেন, এমন আনন্দময় অনুভূতি
এখন দেওয়ালের নোনাধরা, রংওঠা চারিপাশ
মেঝের ফাটলের প্রশাখা, আগেও তো ছিল
আগেও কড়ি-বর্গা নেমে আসার ভগ্নদশা
এখন এতো করে মনে হচ্ছে কেন
মনে হচ্ছে কেন পৃথিবীটা ছোট হয়ে আসছে
ঘরের মধ্যে যাবতীয় অতীত, ক্ষয়ে আসা সামগ্রী
বিস্তার হচ্ছে, হতশ্রীর মধ্যে আনন্দ করছে
২
হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে এ ঘর ও ঘর করি
জানালার বাইরে এখন মসৃণ রোদ
দূরে রাস্তা হেঁটে যায় সাবলীল ঢঙে
শুধু রাস্তারই ছায়া, আশপাশের বাড়িগুলো
হলুদ মেখে লাজুক, নত গোধূলির ভারে
রাস্তা আরো দূরে গিয়ে সরে দাঁড়াল
দূরে আরো কি কি হল যেন অস্পষ্ট
জানালার বাইরে হাত রাখতে নরম গোধূলি আরো কিছু নীল আকাশ থেকে উঠে আসতে
মনে হল, এমন অনেক দিন দেখিনি তো
কতকিছুই তো দেখা হয় না, তবুও তো হয়
এই যেমন এ ঘর ও ঘর করি এখন
এখন দূর কেমন কাছে এসে মিনতি করে
বাইরেটা কেমন ছোট হয়ে ঘরবন্দি হয়
৩
কেমন করে আমরা একদিন ঘরে ঢুকে পড়লাম
বাইরে কোনো দাঙ্গা নয়, প্রবল বর্ষণ নয়
জলোচ্ছ্বাস নয়, ভূমিকম্প নয়, ধ্বংসলীলা নয়
কেমন এক আতঙ্ক, যেন গিলে গিলে খাচ্ছে
সবাই ঘরমুখো, প্রয়োজনীয় মুহূর্তটুকু রেখে
সুরুৎ করে গৃহে, প্রায় গৃহবন্দী জীবন এখন
এ ঘর ও ঘর, পায়চারির মতো অনাবিল ছাদ
অনেকেই, আকাশে লাট খাওয়া ঘুড়ির মতো
ঘরেও এখন বিকেল শেষে অন্ধকার দাঁড়ায়
ভয়ও, ভয় নেই বলতে বলতে আলো জ্বালাই
আলো জ্বলে, মন প্রশান্তিতে ভরে গেলেও
কেমন এক উৎকণ্ঠা, অস্পষ্ট, কথা জড়ায়
অদ্ভুত এক বেঁচে থাকার ভেতর
অবিনাশ বলে বসে, সাহস নাও সাহস নাও
আলো ভেতর ভয়ের ভেতর অন্ধকারের ভেতর
আশ্চর্য সাহস দরজার বাইরে কড়া নাড়ে
ছবি : বিধান দেব
গুচ্ছ কবিতা ।। দেবাশিস তেওয়ারী
কথার খেলাপি দিনে