জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন কোয়ানের অমায়িক ভুবন
দ্বাদশ পর্ব
ইয়ুনমেন/উমমন সম্প্রদায়
চিনের পূর্ব উপকূলে চিয়াংশি নগরে ৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে চাং পরিবারে জন্ম নেন ওয়েনইয়েন। তাঁর জন্মের দুই দশক আগে চিনের তাং-সম্রাট উজোঙ (৮১৪-৮৪৬ খ্রিঃ) বৌদ্ধধর্মকে বহিরাগত হিসাবে চিহ্নিত করে বৌদ্ধমুক্ত চিন গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এই বৌদ্ধবিনাশ কর্মসূচি গ্রহণের ফলশ্রুতিতে সারা দেশে প্রায় সাড়ে চার হাজার বৌদ্ধবিহার ও প্রায় চল্লিশ হাজার বৌদ্ধমঠ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। দুই লক্ষেরও বেশি সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীকে বলপূর্বক সাংসারিক জীবনযাপনে বাধ্য করা হয়। তবে বছর খানেক চলার পরে এই দমন-পীড়ন বন্ধ হয়ে যায়। হয়তো এই বৌদ্ধবিনাশের ইতিহাস বালক ওয়েনইয়েনকে প্রভাবিত করে থাকবে। পরিণত বয়সে তিনিই হয়ে উঠবেন প্রখ্যাত চ্যান-ব্যক্তিত্ব ইয়ুনমেন, জাপানি উচ্চারণে উমমন। ভবিষ্যতে তাঁর হাত ধরেই দক্ষিণ চিনে গড়ে উঠবে চ্যান ঐতিহ্যের উল্লেখযোগ্য ধারা ইয়ুনমেন বা উমমন সম্প্রদায়।
ওয়েনইয়েন সম্পর্কে তথ্য খুব একটা অপ্রতুল নয়। ওয়েনইয়েন ছিলেন স্মৃতিধর, মেধাবী ও কাব্য-অনুরাগী। তিনি অল্প বয়সেই ধর্মমনা হয়ে ওঠেন এবং স্থানীয় কুং-উয়াং মঠে চি ছাং নামক সন্ন্যাসীর কাছে বৌদ্ধধর্ম সংক্রান্ত মূল পাঠ নেন। কুড়ি বছর বয়সে তিনি দীক্ষিত হন। তারপর বেড়িয়ে পড়েন তীর্থ পর্যটনে। ঘুরতে ঘুরতে তিনি সন্ধান পান তাও-চোঙ নামক এক চ্যান-শিক্ষকের। তাঁর বাড়ি সত্তর মাইল দূরে মুচৌ নামক স্থানে। ওয়েনইয়েন তখন পঁচিশ বছরের টগবগে যুবক। তিনি সেই দীর্ঘ দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে চললেন তাও-চোঙ-এর বাড়ি। তাও-চোঙ সম্পর্কে একটু বলে নেওয়া সমীচীন। একদা তিনি ছিলেন ওবাকুর শিষ্য, লিন-চি তখন ছিলেন তাঁর সতীর্থ। বিভিন্ন মঠ ঘুরে তিনি যখন কাও-আন এর মি-শান মঠে থিতু হয়েছিলেন তখন তিনি বৃদ্ধা মায়ের অসুস্থতার সংবাদ পান। দেরি না-করে তিনি বাড়ির উদ্দেশে হাঁটা শুরু করেন। মুচৌতে ফিরে বাড়ির কাছাকাছি লংশিং মঠকেই তিনি বসবাসের স্থান হিসাবে বেছে নেন। বছর কয়েক সেখানে থাকার পরে মায়ের দেখভালের জন্য তিনি পাকাপাকিভাবে বাড়িতেই বসবাস শুরু করেন। জীবিকা হিসাবে বেছে নেন চর্মকারের পেশা। মা-ছেলের অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা হয়ে যায়। কালক্রমে তাও-চোঙ নামের বদলে স্থাননামের প্রভাবে তিনি মুচৌ তাওমিং নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ওয়েনইয়েন যখন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান তখন তিনি যথেষ্ট বৃদ্ধ হয়েছেন। মুচৌ-এর সঙ্গে দেখা করা সহজ ছিল না। ওয়েনইয়েন পরপর দুদিন দরজায় টোকা মেরে ব্যর্থ হন। তৃতীয়দিন ওয়েনইয়েনকে আসতে দেখে মুচৌ দরজা বন্ধ করে দেন। নাছোড় ওয়েনইয়েন বেশ জোরে জোরে দরজায় টোকা দিতে থাকেন। বাধ্য হয়ে মুচৌ দরজা খুলে বাইরে উঁকি মারেন। কথোপকথন শুরু হয়।
মুচৌ— কে আপনি ?
ওয়েনইয়েন— আমি ওয়েনইয়েন।
মুচৌ— আপনি বারবার আমার কাছে কেন আসছেন বলুন তো ?
ওয়েনইয়েন— আমি নিজেকে ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। আপনি এব্যাপারে আমাকে পথ দেখান।
মুচৌ— অপদার্থ কোথাকার !
কথা শেষ করে মুচৌ, ওয়েনইয়েনকে দিলেন এক প্রচণ্ড ধাক্কা। সেই ধাক্কার প্রতিক্রিয়ায় ওয়েনইয়েন-এর বোধি জাগরিত হয়। এই ঘটনার অন্য এক বয়ান অনুযায়ী ওয়েনইয়েন মুচৌ-এর কক্ষে প্রবেশ করতে চাওয়ায় তিনি দরজা সজোরে বন্ধ করে দেন। দরোজার ফাঁকে আটকে যাওয়ার ফলে ওয়েনইয়েন-এর একটি পা ভেঙে যায়। প্রচণ্ড সেই যন্ত্রণা ওয়েনইয়েন-এর বোধি জাগ্রত করে। শেষমেশ মুচৌ তাঁকে শিষ্য হিসাবে গ্রহণ করেন।
ওয়েনইয়েন বছর পাঁচেক মুচৌ- এর কাছে থাকেন। তারপর মুচৌ-এর নির্দেশে যান মিন রাজ্যে (বর্তমান ফুজিয়ান প্রদেশ) প্রখ্যাত চ্যান-শিক্ষক শিউয়ে ফাং-এর মঠে। মঠটি ছিল শিউয়ে পর্বতের উপরে। তখন সেখানে বাস করতেন প্রায় হাজারখানেক শিক্ষার্থী। পর্বতের পাদদেশের এক গ্রামে ওয়েনইয়েন-এর সঙ্গে জনৈক সন্ন্যাসীর দেখা হয়। ওয়েনইয়েন তাঁর সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা জুড়ে দেন।
ওয়েনইয়েন— আপনি বুঝি আজকেই পর্বতের উপরে শিউয়ে ফাং-এর মঠে যাবেন ?
সন্ন্যাসী— হ্যাঁ।
ওয়েনইয়েন— আপনি দয়া করে মঠাধ্যক্ষকে আমার একটি জিজ্ঞাসা নিবেদন করবেন। তবে ভুলেও আমার কথা বলবেন না। বলবেন জিজ্ঞাসাটি আপনার।
সন্ন্যাসী— ঠিক আছে। আপনার জিজ্ঞাসাটি বলুন।
ওয়েনইয়েন— আপনি মঠে পৌঁছে ধর্মসভা শুরু না-হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। মঠাধ্যক্ষ মঞ্চে উপবিষ্ট হওয়ার পরে আপনি তাঁর দিকে এগিয়ে যাবেন, তাঁর সামনে গিয়ে করজোড়ে বলবেন, হে প্রাজ্ঞবন্ধু, আপনার কাঁধের উপর যে লৌহ খ্যাঙ্কো (তৎকালীন চিনে অপরাধীদের সাজা দেওয়ার জন্য তাদের কাঁধে একটি কাঠের খাপ বা খ্যাঙ্কো লাগিয়ে দেওয়া হতো, যা ছিল খুব যন্ত্রণাদায়ক) বহন করে চলেছেন, তা নামিয়ে ফেলছেন না কেন ?
বোধহয় সেই সন্ন্যাসী ছিলেন নিতান্ত সহজসরল অথবা ওয়েনইয়েনকে কথা দিয়েছিলেন বলে আসন্ন বিড়ম্বনাকে এড়িয়ে যেতে পারেননি। সন্ন্যাসী শ্রোতৃমণ্ডলীর ভিড়ের মধ্য দিয়ে পৌঁছে যান মঠাধ্যক্ষ শিউয়ে ফাং-এর কাছে। তারপর বিনীতভাবে নিবেদন করেন ওয়েনইয়েন-কথিত জিজ্ঞাসাটি। শিউয়ে ফাং এমন জিজ্ঞাসায় অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। তিনি বুঝতে পারেন একজন নিতান্ত সাধারণ সন্ন্যাসীর পক্ষে এমন গূঢ় জিজ্ঞাসা নিবেদন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তিনি আসন থেকে নেমে এসে সন্ন্যাসীকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন।
শিউয়ে ফাং— বলুন, বলু্ন, কী বলছিলেন বলুন!
সন্ন্যাসী থতমত খেয়ে যান। শিউয়ে ফাং তাঁকে ধরে ঝাঁকুনি দিতে থাকেন। সঙ্গে জেরাও চলতে থাকে।
শিউয়ে ফাং— এ আপনার কথা নয়। বলুন কার কাছ থেকে শিখে এসে এসব বলছেন?
সন্ন্যাসী— না। এ আমার কথা।
শিউয়ে ফাং— হতেই পারে না। আপনি মিথ্যাচার করছেন।
অচিরেই শিউয়ে ফাং-এর নির্দেশে সেই সন্ন্যাসীকে বেঁধে ফেলা হয়। সন্ন্যাসী হেনস্থা থেকে বাঁচতে পূর্বাপর সব ঘটনা গড়গড় করে বলে ফেলেন। রহস্য প্রকাশিত হলে শিউয়ে ফাং, তখন সেই সমাবেশের উদ্দ্যেশ্যে ঘোষণা করেন— সুধীবৃন্দ, এমন এক সন্ন্যাসীকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত হোন, যিনি অদূর ভবিষ্যতে শত শত শিক্ষার্থীকে পথ দেখাবেন।
সেই প্রাজ্ঞ আগন্তুককে মঠে আনার জন্য শিউয়ে ফাং, লোকজন পাঠিয়ে দেন। মঠে আগত ওয়েনইয়েনকে সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে শিউয়ে ফাং বলেন, আসুন, আপনার অপেক্ষাতেই ছিলাম। যেন কতদিনের চেনা ! ওয়েনইয়েন প্রায় এক দশক শিউয়ে ফাং-এর মঠে কাটান।
৯০৮ খ্রিস্টাব্দে শিউয়ে ফাং-এর মৃত্যুর পর ওয়েনইয়েন ষষ্ঠ আচার্য হুইনেং-এর স্মৃতিধন্য তীর্থস্থানগুলি ভ্রমণ করতে করতে ৯১১ খ্রিস্টাব্দে শাওকুয়ান নগরে পৌঁছান। শাওকুয়ান, দক্ষিণ চিনের কুয়াংতুং প্রদেশের অন্যতম নগর। কুয়াংতুং প্রদেশের একটি ইতিহাস আছে। উপকূল-ছোঁয়া অঞ্চলটি ছিল নৌবাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য স্থান। ফলে অর্থনৈতিক দিক থেকে অঞ্চলটির বিশেষ গুরুত্ব ছিল। মিন প্রদেশের এক ভ্যাগ্যান্বেশী লিউ-ইন, ডেরা বেঁধে সুদিন ধরার অপেক্ষায় পড়ে ছিল কুয়াংতুং অঞ্চলে। হুয়াং চাও বিদ্রোহ (৮৭৪-৮৮৩ খ্রিঃ) শুরু হলে তিনি তাং বাহিনীতে যোগ দিয়ে বিদ্রোহ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। তাঁর এই অবদানের জন্য ৯০৫ খ্রিস্টাব্দে তাং-মন্ত্রীসভা তাঁকে ওই অঞ্চলের প্রধান সামরিক আধিকারিকের পদ দেন। ৯০৭ খ্রিস্টাব্দে তাং সাম্রাজ্যের পতন হলে বিস্তীর্ণ দক্ষিণ চিন লিউ-ইন-এর শাসনে চলে আসে। তবে তিনি নিজেকে রাজা বা সম্রাট হিসাবে ঘোষণা দেননি। ৯১৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ভাই লিউ ইয়ান সম্রাট কাওজু নাম নিয়ে নতুন রাজ্যের সূচনা করেন। প্রথমে তিনি রাজ্যের নামকরণ করেন ‘উয়ে’ পরে তা পরিবর্তিত করে রাখেন ‘হান’। সেই নাম পরবর্তীকালে ‘দক্ষিণের হান রাজ্য’ হিসাবে ঐতিহাসিক খ্যাতি পায়। ওয়েনইয়েন, শাওকুয়ান নগরের লিংশু মঠে বসবাস শুরু করেন। লিংশু পর্বতের উপরে অবস্থিত বলেই মঠটি ওই পর্বতের নামেই চিহ্নিত হয়েছিল। মঠাধ্যক্ষ রুমিন-তাংশি ওয়েনইয়েনকে ঠিকই চিনেছিলেন। তিনি তাঁর উপর মঠের প্রধান সন্ন্যাসীর গুরুদায়িত্ব ন্যস্ত করেন। ৯১৮ খ্রিস্টাব্দে রুমিন তাংশি মারা গেলে সম্রাট কাওজু তাঁর অন্ত্যেষ্টির দায়িত্ব নেন এবং মঠে তাঁর একটি মর্মর মূর্তি স্থাপন করেন। এইসময় লিংশু মঠে সম্রাট কাওজুর সঙ্গে ওয়েনইয়েন-এর সাক্ষাৎ হয়। সম্রাট, নবপরিচিত সন্ন্যাসীর আচরণে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে আন্তরিক শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ৯১৯ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট কাওজু ওয়েনইয়েনকে প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁকে চীবর উপহার দেন এবং লিংশু মঠের মঠাধ্যক্ষ নির্বাচন করেন। ৯২৩ খ্রিস্টাব্দে রাজ-আনুকূল্যে ইয়ুনমেন পর্বতে একটি নতুন মঠের নির্মাণকাজ শুরু হয়। পাঁচবছর পরে নির্মাণকাজ শেষ হলে ওয়েনইয়েন নবনির্মিত সেই মঠের অধ্যক্ষ হন। পর্বতের নামে মঠের নাম হয় ইয়ুনমেন মঠ এবং অধ্যক্ষ ওয়েনইয়েন কালক্রমে ইয়ুনমেন নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। এখন থেকে আমরা ওয়েনইয়েনকে ইয়ুনমেন নামেই চিহ্নিত করব।
৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ১০ মে ইয়ুনমেন তখন পঁচাশি বছরের বৃদ্ধ। মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বে তিনি উত্তরসূরিদের জন্য একটি নির্দেশিকা লিপিবদ্ধ করে যান। তাঁর অনমনীয় আদর্শের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসাবে আজও সেই লিপিটি অমলিন হয়ে আছে। আসুন আমরা দেখে নিই তাঁর সেই অন্তিমলিপিটি—
‘আমার মৃত্যুর পর সামাজিক প্রথা মেনে শোক-প্রকাশক পোশাক পরিধান করা বা বিলাপপূর্ণ অন্ত্যেষ্টিযাত্রায় আমি নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যাচ্ছি। কারণ তা বুদ্ধের নীতির লঙ্ঘন এবং চ্যানচর্চার পথে সমস্যা সৃষ্টি করবে।’
বলাবাহুল্য তাঁর মৃত্যুর পর এই নিষেধাজ্ঞা মানা হয়নি। তাঁর অন্তিম শোভাযাত্রায় সহস্রাধিক মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
ইয়ুনমেন-এর শিষ্যসংখ্যা ছিল প্রায় আটশো। এছাড়া অতিথিদের আনাগোনা তো লেগেই ছিল। তিনি আন্তরিকভাবে সকলকেই বোধির পথে এগিয়ে দিতেন। যষ্টিপ্রহার ও পিলে-চমকানো হঠাৎ চিৎকার ছিল তাঁর শিক্ষাদানের অপরিহার্য অঙ্গ। ইয়ুনমেন অনেকসময় শিষ্যদের জিজ্ঞাসার উত্তরে একটিমাত্র আপাত অর্থহীন শব্দ উচ্চারণ করতেন। তাঁর উচ্চারিত এই একশব্দের উত্তরগুলিকে চিনা ভাষায় বলা হতো ‘কুয়ান’ যার বাংলা অর্থ— বাধা। এই কুয়ানগুলি চ্যান ঐতিহ্যে ‘ইয়ুনমেন-এর এক শব্দের বাধা’ হিসাবে সুপরিচিতি। শব্দগুলি ছিল সংক্ষিপ্ত, ধারালো ও অমোঘ। দু-একটি দৃষ্টান্ত উদ্ধার করা যাক।
এক
জিজ্ঞাসা— যে তার বাবা ও মাকে হত্যা করে সে বুদ্ধের কাছে স্বীকার করে। কিন্তু যে বুদ্ধ ও আচার্যকে হত্যা করে সে কার কাছে স্বীকার করবে ?
উত্তর— প্রকট।
দুই
জিজ্ঞাসা— পশ্চিম থেকে আচার্য আসার তাৎপর্য কী ?
উত্তর— গুরু।
তিন
জিজ্ঞাসা— প্রকৃত শিক্ষার উদ্দ্যেশ্য কী ?
উত্তর— সর্বত্র।
চার
জিজ্ঞাসা— চ্যান কী ?
উত্তর— এটাই।
চ্যান-বিষয়ক কোনও জিজ্ঞাসার পরিপ্রেক্ষিতে একাধিক শব্দ বা বাক্যের গূঢ় তাৎপর্যবাহী উত্তর ‘কোয়ান’ নামে পরিচিত। ইয়ুনমেন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জিজ্ঞাসার উত্তর দিয়েছেন, সেগুলি তাঁর শিষ্যদের কেউ কেউ লুকিয়ে লিপিবদ্ধ করেছেন। লুকিয়ে লিপিবদ্ধ করার কারণ তাঁর কথাবার্তা লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে ইয়ুনমেন-এর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা ছিল। ইয়ুনমেন-এর কোয়ানগুলি মেধা ও মননের নির্যাস সমৃদ্ধ। আদিযুগের বা বর্তমান সময়ের এমন কোয়ান-সংকলন নেই যেখানে ইয়ুনমেন অনুপস্থিত !
ইয়ুনমেন-এর একটি বিখ্যাত কোয়ান-এর স্বাদ নেওয়া যাক। একদা ইয়ুনমেন তাঁর সমাবেশে উপস্থিত সন্ন্যাসীদের উদ্দ্যেশ্য করে বলেন, আমি আপনাদের পনেরো তারিখের আগের দিনগুলি সম্পর্কে কিছুই জানতে চাইছি না। কিন্তু জানতে চাইছি পনেরো তারিখের পরের দিনগুলি কেমন হবে ? তাঁর এই জিজ্ঞাসা শুনে উপস্থিত সবাই থতমত খেয়ে যান। কেউ আর উত্তর দিতে পারেন না। শেষে উত্তর দেন ইয়ুনমেন স্বয়ং— প্রতিটি দিনই একটি ভালো দিন।
ইয়ুনমেন সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ চ্যান-ইতিহাসের একটি স্মরণযোগ্য অধ্যায়। এই ধারার অনেকেই চিত্রকলা ও কাব্যচর্চার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। শি-তউ জোঙ-শিয়েন (৯৮০-১০৫২ খ্রিঃ) ছিলেন রীতিমতো প্রথাসিদ্ধ কবি। তাঁর গুরু তথা ইয়ুনমেন-এর ধর্মসূরি চি-মেন কুয়াং-শু (মৃত্যু ১০৩২ খ্রিঃ) ও ছিলেন স্বনামধন্য কবি। ইয়ুনমেনও কিছু পদ রচনা করেছিলেন । এছাড়া তিনি ছিলেন চ্যান-ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাগ্মী। প্রায় তিনশো বছর এই ধারাটি বহমান থাকার পর দ্বাদশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে তা লিন-চি সম্প্রদায়ের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। তবু শেষ হয়েও হইল না শেষের মতো এই সম্প্রদায়ের একটি ক্ষীণ স্রোত প্রবাহিত ছিল। বিংশ শতাব্দীতে সেই ক্ষীণ স্রোতটিকে পুনরায় প্রাণবন্ত করে তোলেন এই ধারার সুযোগ্য উত্তরসূরি সু-ইয়ুন (১৮৪০-১৯৫৯ খ্রিঃ)। তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্যগণ এই ঐতিহ্যশালী ধারাটিকে কৃতিত্বের সঙ্গে বহন করে নিয়ে গেছেন ইউরোপ-আমেরিকায়।
তথ্যসূত্র :
১. ZEN MASTER YUNMEN : HIS LIFE AND ESSENTIAL SAYINGS ; TRANSLATED AND EDITED BY URS APP ; SHAMBHALA 2018.
২.ZENBUDDHISM: A HISTORY
৩.ZEN MASTERS OF CHINA : THE FIRST STEP EASTBY RECHARD BRYAN MC DANIEL; TUTTLE PUBLICATION, TOKYO/ VERMONT/ SINGAPORE.
৪.ZENS CHINESE HERITAGE BY ANDY FERGUSON ; WISDOM PUBLICATION, BOSTON.
ছবি : বিধান দেব
চন্দন মিত্র : জন্ম নভেম্বর ১৯৭৬, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ডায়মন্ড হারবার মহকুমার ভগবানপুর (হরিণডাঙা) গ্রামে। বাংলা ভাষা-সাহিত্যের শিক্ষক। কবিতা লেখার সূত্রে লেখালেখির জগতে প্রবেশ। লেখেন প্রবন্ধ ও গল্প ।
প্রকাশিত পুস্তক :
কাব্য পুস্তক : আমার আত্মার পায়ে বাঁধার ঘুঙুর, যাপনচিত্র, ২০১৯; সরলতা ক্রমশ গায়েব হইতেছে, সাহিত্যের বেলাভূমি ২০২০
প্রবন্ধ পুস্তক : জেন : রিপুতাড়িত মানবের নিকট সুসমাচার ও অন্যান্য প্রবন্ধ, কলিকাতা লেটার প্রেস, ২০১৯
সম্পাদিত পত্রিকা : পাড়ি
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন