সোমবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২১

আবহবিকার ।। রাজদীপ রায়


 তৃতীয় পর্ব 


পুষ্পবিতান 


প্রার্থনা কী ও কেমন, তখনও জানি না। হাত জোড় করে কী যেন বিড়বিড় করে চাইতে দেখেছি অনেককে। সেইসমস্ত অব্যক্ত গুঞ্জন কোথায় গিয়ে পৌঁছতে চায় তা ভাববার মতো মন তখনও জন্মায়নি। ছোটবেলায় বদমায়েশি করলে মা হুঁশিয়ারি দিত বোর্ডিং-এ ভর্তি করে দেবে। বাড়িতে নয়, সেখানে থেকেই করতে হবে পড়াশুনো। বাড়িতে আসতে দেবে, কিন্তু খুব কম, তাও দু-এক দিনের জন্যে। এমন পরিস্থিতিতে যখন প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হলাম, হাতের চাঁদ পাওয়া গেল। এবার অন্তত বোর্ডিং যেতে হবে না। কোথায় ভর্তি হব? পুষ্পবিতানে। আমাদের পাড়ারই মেয়ে রূপা মিস। আমার বাবাকে মামা বলতেন, তার স্কুলেই ভর্তি হলাম। হাসিখুশি রূপা মিসকে ছোট থেকেই চিনতাম; তাই স্কুলে ভর্তি হওয়ার বিষয়টাকে খুব ভীতিপ্রদ কিছু মনে হয়নি। স্কুলে গিয়েই আমি সচেতনভাবে প্রথম হাতজোড় করি কোনও কিছুর উদ্দেশ্যে। আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে..., বল বল সবে শতবীণা বেণু রবে..., উঠো গো ভারতলক্ষ্মী..., এইসব ছিল প্রার্থনাসঙ্গীত। কত গান এইভাবে শিখে গিয়েছি তখন। কত গলা সমবেত ভঙ্গিতে নিজেদের খামতিগুলো ঢেকে ফেলছে অনায়াসে। মাধুরী মিস, কাজল মিস, বড় মিস সবার উদাত্ত কণ্ঠ ইছাপুরের রোস্টেড বাতাসে কিছুক্ষণের জন্যে মায়াপশম ছড়িয়ে দিচ্ছে। বড় মিসকে খুব ভয় পেতাম অবশ্য। খুব রাসভারি ছিলেন তিনি। বড় মিসের মেয়ে এলিসাও আমাদের সঙ্গে পড়ত। একটি ক্লাব এই স্কুলকে পরিচালনা করত। ১৯৮৮-৮৯ সাল, তখন স্কুলে ভর্তি করবার এত প্রতিযোগিতা ছিল না। এত উদ্বেগ কাজ করত না বাবা-মায়েদের মধ্যে। স্কুলজীবন আমার তেমন ভালোলাগেনি কোনওদিন। মা যখন স্কুলে দিয়ে ফিরে যেত, তখন যতদূর দেখা যায়, বিন্দু হয়ে যাওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে থাকতাম তার দিকে। নার্সারিতে পড়বার সময় আমাকে বোঝানো হত—মা ঠিক দরজার বাইরেই বসে আছে, অতএব আমার ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। সেই মিথ্যেকেই আজীবন সত্যি ভেবে কেটে গেল নার্সারিজীবন।  


স্বাদ-গন্ধ চলে যাওয়ার মতো করে একদিন স্মৃতিরাও চলে যায়। মনে রাখতে ইচ্ছে করে সবকিছু; কিন্তু কিছুতেই সবকিছু মনে থাকে না। পুষ্পবিতানের কত সুগন্ধ হারিয়ে ফেলেছি। সদ্য কুঁড়ি-ওঠা বন্ধু, তারা হারিয়ে গেছে ফুল হবার আগেই। একই কথা মনে হয় ইছাপুর হাই স্কুলের ক্ষেত্রে। এখানে পরিচয় হয় অনাথ আর বিনয়ের সঙ্গে। দুজনেই বসত পিছনের বেঞ্চিতে। আমার একটা অদ্ভুত স্বভাব ছিল। যাদের ভাল লাগত, তাদের হাতের লেখা নকল করতে চাইতাম। একবার অনাথের মতো, তো একবার বিনয়ের মতো। এমন নয় তাদের লেখা খুবই সুন্দর। কিন্তু তাদের লেখার কোনও বিশেষত্ব আমাকে টানত। কারোর দ-লেখার টান, কারোর ধ-এর মাথার শুঁড়টা। সেই ভালোলাগাটুকু আমি আমার লেখায় তুলে নিতাম। এ-কারণেই ছোট থেকে অনেকবার আমার হাতের লেখা পালটেছে।  আমার মনে প্রভাব ফেলেছে বাবা, রাঙা কাকা, আমার শিক্ষকদের কেউ কেউ। ইছাপুর স্কুল মানে কুলের আচার, বনকুল, সাবুর নলিপাঁপড়, ঝালমুড়ি, এইসব।  কিন্তু পুষ্পবিতানে তো এসব স্বাধীনতা ছিল না। সেখানে টিফিনে মায়ের দেওয়া সন্দেশ-বিস্কুট পর্যন্ত দিদিমনিদের নজরে খেতে হত। আর এইসব দিনগুলোকে এখন অনেক দূর থেকে দেখে মনে হয় মৌলিকতা কথাটা আদতে বিষণ্ণ ধাপ্পা। নিজস্বতা বলে যাকে গড়ে তুলতে চাইছি; যে অলীক ব্যক্তিত্বকে উপস্থাপিত করতে চাইছি কোনও বিশেষ অভিপ্রায়ে, সেখানে অতিজীবনের ছকে ধরা পড়ে এইসব বুজরুকি। এ-জীবন অন্যের অলংকৃতি। আমি খানিক অন্যের মধ্যে, অন্যেও খানিক আমার মধ্যে। বিনয় আমাকে মাঞ্জা-দেওয়া  শেখাতে চেয়েছিল; পারেনি। আমিও বিনয়ের হাতের লেখা সুন্দর করতে পারিনি। এই ব্যর্থতা পারস্পরিক, সীমাহীন। উভয়েই এ-কারণে দুঃখিত হয়েছি। আমরা সেই ছোট বয়সে তুমুল বিশ্বাস করতাম হাওড়া শহরে মরে যাওয়া মাঠেদের আত্মা ছোট ছোট ছেলেদের নাম করে ডাকে। সেইসব ছেলেদের আর পড়াশুনো হয় না। তারা সব বুঁদ হয়ে ছুটে যায় কাঁচা টাকার পেছনে। নোটের তারায় ফুরিয়ে যায় প্রকাশ্য শৈশব। ভেতরে পাক দিয়ে ওঠে বিষ। তারপর হৃদয়ে ক্ষত নিয়ে সেইসব পাখিরা কোথায় হারিয়ে যায়—কেউ তার কোনও খবর রাখে না। বিনয়ও এমনই কোনও স্কুলফেরত বিকেলের আলোয় নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল। 


প্রার্থনার অকৃত্রিম জোর আছে।  আমি অনাথকে দেখতাম মন দিয়ে প্রার্থনা করতে। আমি মন দিয়ে কোনদিন প্রার্থনা করতে পারিনি কারণ, যখন প্রার্থনা হত আমি অনাথের দিকে মুখ করে থাকতাম। যার হাতের লেখা আমাকে টানত, তার প্রার্থনার ভঙ্গিমাও আমাকে স্তব্ধ করে রাখত। কষ্ট একটাই সেই স্কুলবাড়ি উঠে গেছে। ইছাপুর হাই স্কুল কতিপয় ছাত্রসংখ্যা নিয়ে মৃতপ্রায়। আর পুষ্পবিতান প্রথমে নাম পালটে নবজাগরণ, পরে সেইটুকুও মুছে গেছে। এখন সেই বাড়ি নিছক ক্লাবঘর মাত্র। সারাদিন ক্যারাম পেটানো হয়। রাতে মদের আসর বসে। যখন সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি, এমন সময়  হঠাত্‍ রূপা মিস। আমি নমস্কার করতে যেতে রীতিমতো চমকে উঠলেন; পরিচয় দিতে তার চোখে-মুখে প্রশান্তি নেমে এলো। এরপর একদিন সেই সূর্যাস্তের আভাটুকুও আর রইল না। একদিন নাটক দেখে একটু রাত করেই ফিরছি; এমন সময় ভুলে যাওয়া পুষ্পবিতানের ছাদে কোমর দুলিয়ে দুজন নাচছে। তাদের শরীর থেকে ছিটকে পড়ছে জ্বলন্ত অঙ্গার। সেদিন নাটক দেখা চোখে ভুলক্রমে যেন তাদের বিনয় এবং অনাথ মনে হয়েছিল। 


মেয়ে সদ্য স্কুলে ভর্তি হয়েছে। মনে খুব ভয়। কিছুতেই যাবে না। তাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে স্কুলে নিয়ে যাই। সাইকেলের সামনের ছোট্ট সিটে মেয়ে বসে জিজ্ঞেস করে: আমরা কোথায় যাচ্ছি?—ট্রেন দেখতে। --ট্রেন দেখা হয়ে গেলে বাড়ি ফিরে আসব তো?—আসব, তার আগে একটু দিদিমনিদের সঙ্গে দেখা করে নিই। নাহলে তারা মনে কষ্ট পাবেন না? মেয়ে ইতস্তত করতে করতে একসময় মেনে নেয়। ‘প্রতিদিন ভোরে আমি, অবাক শিশুর চোখে দেখি, চরাচর/ মর্নিং স্কুলের মতো প্রাণচ্ছল, শান্ত ও সুন্দর!’  একসময় হাত ছাড়বার সময় আসে। মেয়ে আব্দার করে, আমি যাবার আগে একবার কোলে নাও। কোল থেকে নেমে ও প্রজাপতির মতো স্কুলে ঢুকে যায়। আমি একমনে ওর যাওয়া লক্ষ করি। মনে পড়ে যায়, কোনও একসময় আমি এভাবেই লক্ষ করতাম মায়ের চলে যাওয়া। সেদিন আর আজকে খুব বেশি পার্থক্য নেই। শুধু ইস্কুলের রাস্তা হারিয়ে ফেলা এক স্কুলবালকের বিকেলগুলো কেটে যাওয়া ঘুড়ির মতো কোনও পাঁচিলের কোণঘেঁষে থম মেরে পড়ে আছে। 


উদ্ধৃত কবিতাংশর উত্‍স : মর্নিং স্কুলের কবিতা, রণজিত্‍ দাশ  

                                                                   (ক্রমশ)

ছবি : বিধান দেব 

 রাজদীপ রায় :  জন্ম: ১৯৮৪। পেশা শিক্ষকতা। কবিতা ও গদ্য প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। কবিতার বই আছে পাঁচটি। 'যদি না পুনর্জন্ম হয়', 'ধানদূর্বার দেশ', 'জন্মান্ধের আলো','সূর্যের বিষাদ', 'বিশল্যকরণী'। প্রকাশিত হতে চলেছে 'রামকৃষ্ণের মুখে গল্প'।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন