সোমবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২১

ল্যাপিস লাজুলি ।। সায়ন রায়



অগভীর স্রোত পার হয়ে এসে সুদূর পিয়াসি নীল
Speech after long silence; it is right,
All other lovers being estranged or dead,
Unfriendly lamplight hid under its shade,
The curtains drawn upon unfriendly night,
That we descant and yet again descant
Upon the supreme theme of Art and Song :
Bodily decrepitude is wisdom; young 
We loved each other and were ignorant.
 [ After Long Silence—W.B.Yeats]
 
পোকার জীবন, মাকুর জীবন।শুধু আকুতি অফুরান। সুস্থ ভাবে ভাবা।সুন্দর করে চাওয়া।সাদা হাসির দ্যুতি যেন ঘিরে থাকে মনের দুপার।দুদণ্ড আয়েশ করে স্মৃতির ফুলগুলিকে নতুন ভাবে সাজানো।বিন্যাস পালটে পালটে দেখা তাদের রস ও রহস্য।ভাষা এক পথ।সেই পথ ধরে অলিগলি মাঠঘাট ফেলে, নদীর চর ধরে অনেকদূর হেঁটে এসে এক আশ্চর্য,অনুপম, স্ফটিকস্বচ্ছ নক্ষত্রের দেশ। কী নরম মিষ্টি আলো! কী লাবণ্যে ভরা আকাশ! দৈব এক বিভা। মহামহিমান্বিত। মহত্তম সুরের এক স্রোত নেমে আসছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠছে জলাধার। 
~~
মনোজ মিত্রের একটি অসাধারণ নাটক 'গল্প হেকিম সাহেব'। যে নাটকে এক গ্রাম্য হেকিম দাওয়াই তৈরি করে তার ল্যাংড়া গাধায় চেপে গ্রামে গ্রামে রুগীর কাছে পৌঁছে যান। অনিচ্ছুক রুগীকে জোর করে চিকিৎসা করেন।বিনিময়ে গরীব নিঃস্ব মানুষজন যে যা পারে খেতের কলাটা মুলোটা তার প্রিয় গাধা 'মোতি'-র পিঠে রাখা বস্তায় ফেলে দেয়। দিনশেষে সেই দিয়ে হয় তার ক্ষুন্নিবৃত্তি।নদীর দুইপারে একই জমিদারের অধীন দুই তালুক—দরিয়াগঞ্জ ও পলাশপুর।দুই তালুকদারের মধ্যে বিস্তর রেষারেষি।কার কত লেঠেল, কার কত ডাকাত ( একে অন্যের তালুকে ডাকাতও লেলিয়ে দেয়) কার কটা বউ মায় কার সবচেয়ে কচি বউ—এসব নিয়েও চলে বারফাট্টাই।কিন্তু কোথায় যেন জিতে যায় দরিয়াগঞ্জ, তাদের দরদীদিল্ হেকিম সাহেব আছেন বলে।তবু এহেন হেকিমের জীবনেও নেমে আসে বিপর্যয়। কারণ শুধু রোগ নয় রোগের কারণগুলি সম্পর্কেও তিনি সচেতন করছিলেন প্রজাদের। বিশুদ্ধ পানীয়জলের জন্য দীঘি কাটানো দরকার,পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা করা দরকার।ফলে প্রজাবিক্ষোভ বাড়ে। নিজের অজান্তেই তিনি হয়ে ওঠেন গরীবের মসীহা।তালুকদারের চক্ষুশূল। ফলতঃ মানুষের সেবায় নিবেদিত হলেও, কোনো তালুকেই ঠাঁই হয় না তার।কিন্তু আসলে যেটা বলতে চাইছি একজন শিল্পীর মত, কবির মত তিলে তিলে অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে,প্রতিটি ধাপে সযত্ন প্রয়াসে তিনি প্রস্তুত করেন তার দাওয়াই।তবে না তা হয়ে ওঠে মহার্ঘ্য। সাবলাইম। রোগের জন্য অব্যর্থ।গ্রামের এক বাগদি বউ 'গঙ্গামণি' তাকে দাওয়াই তৈরিতে সাহায্য করে।উনুনে একসাথে অনেকগুলো কাঠ দিয়ে দিলে তিনি কিছু কাঠ সরিয়ে নিতে নিতে তাকে শেখান—জলের যেমন মাপ আছে,আগুনেরও আছে।কাঠের আগুন, পাতার আগুন,তুষের আগুন—একেক আগুনের একেক রূপ,তেজ। দাওয়াইয়ের হাঁড়িটি পূর্ণ জ্যোস্নার নীচে রাখতে রাখতে তিনি বলেন : রাতভোর একটানা জোছনা খাবে, শীতল বাতাস খাবে। তার দাওয়াই ফুলের সুরভি খায়,ফজরের নেহের খায়,মধু খায়মৃগনাভি খায়,বনের সবুজও খায়।আশমানের দিগন্তজোড়া কালো মেঘে বিদ্যুতের ঝলকানি উঠলে সেই ঝলকানিও খায়। হাঁড়ির মুখ চাপা দিয়ে ধরে রাখতে হয় গঙ্গামণি ! 
~~
হাঁড়ির মুখ চাপা দিয়ে একজন কবি ধরার চেষ্টা করেন সেইসব মহাজাগতিক রশ্মিসমূহ।সেইসব সমূহ বিস্ময়। শাশ্বত সত্যগুলি সুঘ্রাণ বিলোয় রাতের বাতাসে।আর কবি কেঁপে কেঁপে ওঠে। তার সারা শরীর আজ রাতের অ্যান্টেনা।রক্তজালিকায় খেলা করে স্রোত।ভরাকোটালের বেগ।সে ভারি কঠিন। সে বেগে ভেসে যাওয়া যেমন আছে, তেমনি লাগামও টেনে রাখতে হয়। নইলে সমূহ বিপদ। অর্থহীন হয়ে পড়ে নৌকোখানি। বৃথা সে যাত্রা।বৃথা সে অবগাহন। ঠারেঠোরে সজাগ রাখতে হয় মন।পুরোপুরি মূর্ছা যাওয়া চলে না।ভরসা রাখতে হয় বোধে।আস্থা রাখতে হয় অন্তরতর সত্তার ওপর।
~~
শ্রীঅরবিন্দ তাঁর 'ভবিষ্যতের কবিতা' গ্রন্থে 'মহত্তর জীবনের স্পন্দন' নিবন্ধে যে কথাগুলি জানিয়েছেন : 'কবির সৃষ্টিতে যে শক্তি আলো দেখায় সেটি হল তাঁর সত্যের প্রত্যক্ষ দর্শন, আর যে শক্তিটি তাকে চালিয়ে নিয়ে যায় সেটা হল সৌন্দর্য ও আনন্দের আবেগ; কিন্তু যেটি তাঁর সৃষ্টিতে স্থায়ী শক্তিসঞ্চার করে, যে শক্তি তাকে মহান্ ও প্রাণবান্ করে তোলে সেটি হল জীবনের স্পন্দন। যে কাব্যে প্রাণ নেই, যার সবটাই চিন্তা, এমন চিন্তা যা প্রাণের প্রস্রবণের সঙ্গে নিরবিচ্ছিন্ন যোগটি বজায় রাখে না, তার রসক্ষরণে নিজেকে নিত্য সঞ্জীবিত করে রাখে না, সে কাব্য যদি নিপুন পদ্যবন্ধের আধারে বলিষ্ঠ, উন্নত বা বিদগ্ধ দার্শনিকতা বা নৈতিকতার অতিরিক্ত কিছুও হয়, এমনকি যদি তার মধ্যে সূক্ষ্মদর্শন ও বুদ্ধিগত সৌন্দর্যও থাকে তাহলেও সে কাব্যে প্রাণের দীপ্তি  এবং জীবদেহের উত্তাপের অভাবটি চিরকাল থেকেই যায়; জীবনকে সে কাব্য পরিপূর্ণরূপে আয়ত্ত করতে পারেনি। কাব্যের যেটা করা উচিত এবং সমস্ত মহৎ কাব্যসৃষ্টিই যেটা করে থাকে সেটা হল জীবনকে ধরে ঊর্ধ্বায়িত করা, তাকে মধুময় ও জ্যোতির্ময় করে তোলা ; সেইটি করার জন্যে কাব্যের দরকার অন্তরতর সত্তার উপরে তার পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।'
~~
আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে জীবন।জীবনের রেণুগুলি গায়ে মাখি, বাতাসে ওড়াই। ভুলগুলি ফুল হয়ে ঝরে ঝরে পড়ে।আমার সাজি খালিই থেকে যায়। লাগে না গায়ে মুক্ত বাতাস। উন্নতশির আলো আসে না জানলা দিয়ে।চাপচাপ বিষাদ। এই আঁধারসুড়ঙ্গ বেয়ে যেতে চাই চোখের গহীন, বোধের গহীন। যতটা বাঁধন ততটাই মুক্তি।  যুক্তি দিয়ে বেঁধে ফেলি যুক্তিহীনতাকে। সকল যুক্তির ভেলা ভেসে যায় যুক্তিহীনতায়। তবুও গান বাঁধে, গায়। মহত্তর এক বোধের আশায়।অনুভূতির দার্ঢ্যবাসা বাঁধে চোখের কোটরে।
~~
হোরেস পরবর্তী ধ্রুপদী কাব্যতাত্ত্বিক লনজাইনাস।তাঁর জন্ম প্রাচীন গ্রিসে আর বসবাস রোমে।অনুমান করা হয় তিনি খ্রি: প্রথম শতকে জীবিত ছিলেন। হোরেস এবং লনজাইনাস দুজনেই গ্রিক আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত।দুজনেই অ্যারিস্টটলের সার্থক উত্তরসূরি হয়েও রোমান ক্ল্যাসিসিজমের প্রবক্তা।হোরেস যেখানে তাঁর 'আর্স পোয়েটিকা'(Ars Poetica) গ্রন্থে  প্রকাশ বা এক্সপ্রেশনকেই কাব্যের মূল কথা বলেছেন, লনজাইনাস তাঁর 'On the Sublime' গ্রন্থে  সাবলাইম-এর ধারণাকে স্পষ্ট করেছেন। যা আত্মিক দিক থেকে অনুভূত, যা সর্বজনীন, চিরন্তন, যা সংহত এবং যার প্রকাশ মহত্তম তাকেই লনজাইনাস 'Sublime’ নামে চিহ্নিত করেছেন। কাব্যে Sublimity সৃষ্টির উৎস হিসেবে লনজাইনাস পাঁচটি দিককে চিহ্নিত করেছেন।সেগুলি হল :
1.     The command of full blooded ideas
2.     The inspiration of vehement emotion
3.     The proper construction of figure
4.     Nobility of phrase
5.     General effect of dignity and elevation 
 
~~
একটা তুচ্ছ ও ক্ষুদ্র জীবনেও আসে সেই ক্ষণ। কখনো-সখনো। সারা মাঠ জুড়ে বিদ্যুৎচমকের বিভা।একটানা গর্জন আর হাওয়ার তুফান।তছনছ হয়ে চলেছে চারদিক।আর সেই বিপর্যয়ের ভিতর থেকেই জেগে উঠছে ধ্যান। করুণাসাগর। মায়ার প্রাসাদ। নিমীলিত হয়ে আসে চোখ।
 
                                                                         (ক্রমশ)

ছবি : বিধান দেব 

সায়ন রায় : জন্ম ১৯৭৭-এ। পেশা শিক্ষকতা।বিষয় ইংরেজি। প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'মহামানবের পোশাক' প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে 'কবিতাপাক্ষিক' থেকে।এখনও পর্যন্ত কবিতার বইয়ের সংখ্যা সাত। পেয়েছেন 'শব্দসিঁড়ি' পত্রিকা প্রদত্ত 'সুভাষ মুখোপাধ্যায় স্মারক সম্মান'।সম্পাদনা করেন 'গুহালিপি' নামের একটি কবিতা বিষয়ক পত্রিকা। একমাত্র গদ্যের বই An Endless Journey : Revisiting Goutam Ghose Cinema।শখ : বইপড়া, ঘুরে বেড়ানো।

1 টি মন্তব্য: