কবিতার যাত্রাপথে অনাসক্ত আত্মার ঝিলমিল
Self is a sea boundless and measureless.
Say not, ‘I have found the truth,’ but rather, ‘I have
found a truth.'
Say not, ‘I have found the path of the soul.’ Say
rather, ‘I have met the soul walking upon my path'.
For the soul walks upon all paths.
The soul walks not upon a line, neither does it grow
like a reed.
The soul unfolds itself, like a lotus of countless
petals.
( THE PROPHET : KAHLIL GIBRAN )
সবুজ গোলাপের চারাটি নার্সারি থেকে এনে যত্ন করে লাগিয়ে ছিল মা।সবুজ গোলাপ আগে কখনো দেখিনি।তাই এই গোলাপ গাছটির হয়ে ওঠা আর তার ভেতরে যে লুকিয়ে আছে ফুল, তাকে প্রত্যক্ষ করার এক তীব্র ইচ্ছে তৈরি হয়েছিল ভিতর মহলে।কিন্তু কী আশ্চর্য! গোলাপ চারাটি কিছুদিনের মধ্যেই এক অদ্ভুত অবস্থা ধারণ করলো। গায়ের পাতা ঝরিয়ে দিয়ে এক নির্জীব অবস্থায় পৌঁছে গেল।কিন্তু পুরোপুরি মারাও গেল না।কোমায় থাকার মত থেকে গেল বহুমাস।প্রচ্ছন্ন হয়ে রইলো তার ভেতরের সকল সম্ভাবনা। মা কিন্তু জল,সার দিয়েই চললেন।তার যত্নের কোনো খামতি ছিল না।
~~
গোধূলিবেলার আলো তেরছা ভাবে এসে পড়েছে জানলার কাচে।এই আলো মায়াবী ও মহৎ। আমার সমগ্র সত্তা জুড়ে তৈরি হচ্ছে আলোর ঝিলমিল।শেষ বিকেলের এই আলোয় ভেসে যাচ্ছে সকলরকম জাড্য ও জড়তা।অবগাহনের আনন্দে জেগে উঠছে সংলাপ।আত্মার গর্ভগৃহ থেকে ভেসে আসছে সুর।প্রবাদপ্রতিম এক বিশ্বাস সারা গায়ে চামর বুলিয়ে বুলিয়ে প্রশমিত করছে শিরা-উপশিরা।শান্তরস বয়ে চলেছে চরাচর জুড়ে।
~~
সত্যজিৎ রায় একবার বলেছিলেন : In my city Calcutta, in my own house, sitting on my chair I feel creative. সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে শিকড়ের তাহলে এমত অবিচ্ছেদ্য ও গহন সম্পর্ক। শেষ বয়সে শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে যখন শান্তিনিকেতনের অতিথি অধ্যাপক করে নিয়ে যাওয়া হয়,অতিথিনিবাসের ঘরগুলিতে বারান্দা না থাকায় প্রায় সারাদিনই বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়াতেন কবি।বিরক্তি ভরে জানিয়েছিলেন: শান্তিনিকেতনে কবিতা লেখা যায়? হায়! সৃষ্টিশীল হবার পক্রিয়াটি কেমন ব্যক্তিভেদে বদলে বদলে যায়।স্থান, কাল, পরিপ্রেক্ষিত সবই আপেক্ষিক।
~~
আকাশে মেঘের ঘনঘটা। একেকটা প্রকাণ্ড বিদ্যুতের ছটা আকাশকে চিরে দিচ্ছে আড়াআড়ি ভাবে। আর সেই ফাটলের মধ্যে দিয়ে উঁকি দিচ্ছে গহন ও গহীন এক দূরবর্তী দ্বীপ। সারাবছর জ্যোৎস্নালোকিত সেই দ্বীপে সূক্ষ্মদেহ হাওয়ার সংসার।মৃত গ্রহের ধুলো দিয়ে তৈরি এই দ্বীপে ঝড় ওঠে কখনো সখনো। সেই ঝড় বড়ই করুণ আর বড়ই ধূসর।চোখে পানি এসে গেলে ব্যক্তি বিশেষে প্রত্যক্ষ হতে পারে সেই ঝড়। তাও সম্ভাবনা ক্ষীণ।
~~
জেন সন্ন্যাসিনী ৎসুং-চি-এর মতে সত্যকে বারবার দেখা যায় না।সত্যকে দেখলে একবারেই দেখা যায়।বোধি লাভ হঠাৎই হয়।এই কথাটির সূত্র ধরেই জেনধর্মে পরবর্তীকালে সাধন ভজনের একটি ঘরানা তৈরি হয়েছে।তারা বলে—সত্য হঠাৎই প্রতিভাত হয়।সাধকের এই অবস্থাকে বলে সাতোরি বা সাটোরি।জেন ঋষিরা বাদামের খোলা ফাটিয়ে সত্যে পৌঁছাতে চান।তাই তাদের উচ্চারিত শব্দ,বাক্যগুলি প্রহেলিকাময়,প্যারাডক্সিকাল। জেন পরিভাষায় এগুলি হল 'কোয়ান'।জেন গুরু-শিষ্য সংলাপের একেকটা ইউনিট হল কোয়ান।জেন সাধু রিন-ঝাই যখন কোয়ানের পথে অন্তর্দৃষ্টি পাওয়ার কথা বলেন,তখন আরেক সাধু শি-তুর নির্দেশিত পথ 'সোটো' নীরব ধ্যানের কথা বলে।জেন আমাদের এই শিক্ষা দেয় : মনকে চিন্তাশূন্য করলে,ভালো-মন্দ বোধ থেকে মুক্ত করলে,যেমন আছে সবকিছু তেমন দেখলে, মহৎ ও তুচ্ছের তফাৎ করা থেকে স্বাধীন হলে—তবেই বোধিজ্ঞান লাভ হবে।
~~
আমি বোধহীন হয়ে একা একা ঘুরে বেড়াই পথে পথে।একটা শ্যাওলা ধরা দেওয়াল আমায় মোহিত করে।কত না-বলা গল্প,সঙ্কেত ও ধ্বনি মাথাকে বেড় দিয়ে মাথার চারিদিকে ঘুরতে থাকে একদল দুধসাদা হাঁসের মত।নির্ভার হয়ে আসে শরীর।ক্রমশ শূন্যে উঠে যাই।ভাসতে থাকি হাওয়ায় হাওয়ায়। হাঁসেদের সঙ্গ নিয়ে পাড়ি দিই দূর বহুদূর। চেনা পথ,মাঠঘাট, চেনা জনপদ ছেড়ে চলে আসি অচেনা তালুকে।এইবার ভয় হতে থাকে।এতক্ষণ যা ছিল স্বপ্নের উড়ান,এইবার তাতে যোগ হল পিছুটান।ফলতঃ পতন।শূন্য থেকে সবেগে পড়তে থাকি নীচে।দমবন্ধ হয়ে আসে,ঘোর লেগে যায়, ভয় তাড়া করে ফেরে।মুখ থুবড়ে পড়ি পচা পাঁক আর পূতিগন্ধময় এক জলায়।
~~
'আলো ক্রমে আসিতেছে'—না, এই শব্দকটি আর বলতে পারি না এক নিঃশ্বাসে। ক্রমে ক্রমে নিভে আসছে সবকটি আলো।আত্মার উত্তরণ না অবতরণ—এইসব ধন্দ নিয়ে কেটে যায় জীবন।বেঁচে থাকা ও বাঁচিয়ে রাখা এইসব কূটপ্রশ্ন থেকে দৌড়ে যাই যোজন যোজন দূরে।আপাতত নিজের পোষ্যটির গায়ে মাথায় বুলিয়ে দিচ্ছি হাত। এক অপূর্ব মায়ায় ভেসে যাচ্ছে চোখ।না,এত সহজে বিদায় নিচ্ছি না।আরো কিছু ক্ষণ ও ক্ষমা দুহাতে ছড়াতে ছড়াতে উপভোগ করবো এই চিরচেনা জল,মাটি,আকাশ ও আশ্চর্য। ততদিন বৃষ্টিধারা তুলোট কাগজে ছবি এঁকে যাবে।ততদিন মহানিমগাছ ঢেউ তুলে জানান দেবে অস্তিত্বের প্রতিটি ফাঁক ও ফোকর।
ছবি : বিধান দেব

কাব্যিক সুষমা ভরা গদ্য। ভালো লাগল।
উত্তরমুছুনবেশ লেখা, ঝিলমিল ব্যক্তিতত্ত্ব ও মুক্ত বোধিতত্ত্বের সহাবস্থান।
উত্তরমুছুনপড়লাম । ভালো লাগলো ।
উত্তরমুছুননানা রঙের নানা আকারের টালি বসিয়ে বানানো এক ভিত্তিচিত্র যেন। চমৎকার এক পাঠবস্তু।
উত্তরমুছুন