বৃহস্পতিবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২১

ধারাবাহিক গদ্য ।। অভিজিৎ দাশগুপ্ত


 

সাধনপর্বের  নির্জনতা



১৫.

ভাসান
এবার  ভাসিয়ে দিতে হবে আমার এই তরী।
       তীরে ব’সে যায় যে বেলা মরি গো মরি।
   ফুল -ফোটানো সারা করে বসন্ত যে গেল সরে,
     নিয়ে ঝরা ফুলের ডালা বলো কী করি ?।

   জল উঠেছে ছলছলিয়ে ঢেউ উঠেছে দুলে—
    মর্মরিয়ে ঝরে পাতা বিজন তরুমূলে।
   শূন্যমনে কোথায় তাকাস ? সকল বাতাস সকল
                                                          আকাশ
              ওই পারের ওই বাঁশির সুরে উঠে শিহরি ॥
                                  (  ' সঞ্চয়িতা ' )
সামনেই তাঁর জন্মদিন ।  শুধুই কি একটা জন্মের  দিন । এই দিনটা তো আমাদেরও  নতুন জন্মলাভের দিবস ।  পুরানো নতুনের মিলন- ই হোক বা আত্মোন্নতি----  সবক্ষেত্রেই জন্মদিনটি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর প্রানের প্রিয় গান বা কবিতা নিয়ে রচিত হোক শ্রদ্ধার্ঘ্য ।
'এবার ' শব্দটি দিয়ে কবিতাটি শুরু। আবার পুরো লেখাটির মধ্যে ওই একটি শব্দই বাইরে রেখেছেন কবি ।  কেন ? যা কিছু পুরনো , সমস্ত সরিয়ে নতুনের আহ্বান ? নাকি জীবনকে আরো একবার দেখে নেওয়া। আরো একবার জেনে নেওয়া । বসন্ত তার কাজ শেষ করেছে । ফুল- ফোটানোর শেষ করে তার এখন চলে যাওয়ার সময় হয়েছে। জল  উঠেছে ছলছলিয়ে। পাতার মর্মর ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। কবি অন্য পারের বাঁশির শব্দ শুনেছেন।
আমরাও শুনছি দূরাগত আহ্বান ।  প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে ।  এক পক্ষের বিদায় তো অন্য পক্ষের আসবার মাহেন্দ্রক্ষণ । দুপক্ষই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চায় ।  থাকতে চায় রং মেখে কুশীলবদের মত । এই থাকতে চাওয়াটা দোষের কিছু নয় ।  বঙ্গ জীবনের অঙ্গ হতে হবে সকলকে। সমাজ -মনস্তত্ত্ব বলছে মানুষের মনে রাখার বিষয়গুলি ব্যক্তি -ইচ্ছার দ্বারা চালিত । বৃহত্তর স্বার্থ থেকে ক্ষুদ্রতর স্বার্থের দিকে চালিত মানুষ তার বোবা যন্ত্রণাকে যুক্তিসংগত বলেই চিরকাল ধরে নেয় । সেই যে কবি বলেছেন , " নাহি জানে কার দ্বারে দাঁড়াইবে বিচারের আশে,...। "
আমাদের শক্তি আমাদের নিজস্ব। কবি তাঁর জীবনকে আশাবাদের চূড়ান্তে নিয়ে গেছেন । তাই বসন্তের পর বৈশাখ , আবার চৈত্রের পর গ্রীষ্ম---- চলতেই থাকে, থাকবে । আজ আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর সময় ।  ' ওই পারের ওই বাঁশির সুরে'  ক্ষণিকের পর্যবেক্ষণ নয় , লগ্ন হয়ে আছে জীবনের অন্তর্ভূমি ।  তিনি যে মনের কথা গুলি নীরবে উচ্চারণ করে গেলেন তা বুঝতে দেরি হলে লজ্জার শেষ থাকবে না।
একটি ঘটনা দিয়ে শেষ করব লেখা। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি কালাম দক্ষিণ আফ্রিকায় যান নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে দেখা করতে ।  তাঁকে এগিয়ে দিতে এসে ম্যান্ডেলা নিজের লাঠিটি আর  সঙ্গে নেননি ।  কালামকেই অবলম্বন করেন । এই ঘটনা আমাদের কিছু কি ইঙ্গিত করল ! জানি না ! হয়তো...

১৬.

অর্ঘ্য

তীর্থে  এসেছে , কাদা লেগে আছে পায় ;
কাঁটা ফুটে আছে পায় ।
লাল পদ্মের মতো দেবতার পদযোগে কি উপায়
হাঁটু গেড়ে বসা যায় ।

কবি বলেছেন 'নতজানু ' তার এইভাবে বসাটাকে;
সে কিছু জানে না ; হাঁটু ভেঙে যায় তার :
লাল পদ্মের মতন  হৃদয় তুলে ধরে , ধরে থাকে;
এই তার উদ্ধার ।

সম্প্রতি নারায়ণ  সান্যালের ' পথের মহাপ্রস্থান ' বইটি  পড়ছিলাম ।  তার আগে অবশ্যই প্রবোধ সান্যালের ' মহাপ্রস্থানের পথে ' পড়েছি। সেই দুর্গম যাত্রাপথের বর্ণনা দিচ্ছেন লেখক।
  " বাঁ দিকে নিচে এবার নতুন নদী , দক্ষিণ বাহিনী অলকানন্দা , গঙ্গার মতোই তার স্রোতের শব্দ, নীল নির্মল প্রবাহ ; জলের অবিশ্রান্ত আওয়াজে নীরবতা আরো গভীর হয়ে উঠেচে, ---- চড়াই পথে আমরা চলেছি উত্তরদিকে । ক্রমাগত উত্তর দিকেই আমাদের গতি , মহাযোগীর জটাকে স্পর্শ করবার জন্য নিরন্তর তার দেহ বেয়ে উঠচি  যত পিপীলিকার দল  ।  তীর্থের এই দীর্ঘ পথটিই  আমাদের তপস্যা, পথ শেষ হলেই সকলের ছুটি ।  জীবনেও এমনি, অবিচ্ছিন্ন অগ্রগতি আমাদের বাঁচা, আমাদের সাধনা;  পরম পরিনামকে স্পর্শ করতে আমরা এগিয়ে চলেচি, কোথায় গিয়ে পৌঁছবো  জানিনে। "
কি নিদারুণ সত্য ! কবিতাটির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে যেন ।  কত পরিশ্রম , কত কষ্ট শেষ করে তবে পৌঁছনো যায় দেবতার লাল পদ্মের মতো পদযুগলের কাছে । এর প্রতিটি পদক্ষেপ কাঁটায় কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত ।  কিন্তু ভক্ত প্রাণের কাছে যে তা অতি সাধারণ বিষয় । সে এই কষ্ট স্বীকার করতে চায়। যুগ যুগ ধরে মানুষ মনে করে এসেছে কষ্টের গুরুত্ব ।  তাই কষ্টের সঙ্গে মিলিয়ে 'কেষ্ট ' এসেছে । অর্থাৎ পরমকে পাওয়ার জন্য চরম পথের সন্ধান।
শুধুই কি ঈশ্বর ! যেকোনো লক্ষ্যের জন্যই এই কষ্ট স্বীকার করতে হয় সকলকে ।  বীতশোক ভট্টাচার্যের 'দ্বিরাগমন '  কাব্যগ্রন্থের 'অর্ঘ্য ' কবিতাটি আমাদের স্মরণে-বিস্মরণে জেগে থাকে ।   ভক্ত ঈশ্বরকেই লীলাময়  ভাবছেন , আবার ভাবছেন মঙ্গলকামী। সূক্ষ্ম  স্থূল কত রূপেই তার প্রকাশ।
কবিতাটি পড়তে পড়তে মনে পড়ে গেল ১৯৭৭ সালে হরিদ্বার ভ্রমণের একটি ঘটনা। নিতান্তই ছোট আমি ও বোন ।  সেসময় মনসা মন্দির অথবা চন্ডী মন্দিরে যাওয়ার রোপওয়ে / সিঁড়ি ছিলনা। পথ যদিও এক-দেড় ঘণ্টার ( চন্ডী পাহাড় তুলনায় বেশি ) তবু সেই পথটুকু ভাঙতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল মা-বোন আর আমার ।  মা একবার পাহাড়ে হুমরি খেয়ে পড়তে পড়তে বাঁচেন ।  নিচেই ট্রেন চলে যাওয়ার লাইন ।  ভক্ত প্রাণের অর্ঘ্য সাজিয়ে সেদিন আমরা সন্ধ্যা নাগাদ পৌঁছে যাই মন্দিরে ।  পুজো দিয়ে নেমে এলাম ।  কিন্তু মন কি সেদিন কোনো আত্মীয়তা গড়ে তুলতে পেরেছিল ।  আঘাত ; তা যত ছোটই হোক , মায়ের সেই  প্রায় পড়ে যাবার ছবিটি মনের ভেতর অনভিপ্রেত একটা জিজ্ঞাসা  তুলে দিয়ে যায় ।  মা কি সত্যি সেদিন তাঁর হৃদয় পদ্মকে তুলে ধরেছিলেন 'উদ্ধার ' পাওয়ার জন্য । কিন্তু কী থেকে উদ্ধার ! আমাদের চারজনের জীবন তো  সুন্দর ছিল ।  ছিল খুশি আর  আনন্দের মিলিত গান। যত মানুষ প্রতিদিন ভক্ত প্রাণের অর্ঘ্য  সাজায় , তারা কি সবাই মানবজীবনের টানাপোড়েনে ক্ষতবিক্ষত। তা নয় ! তাহলে !
প্রতিটি মানুষ নিজেকেই কি ' তীর্থ ' বলে ভেবে এসেছে ।  যে জায়গায় সে ছুটে যাচ্ছে , তার সৌন্দর্য সে দেখবে , সে গ্রহণ করবে পথের কষ্ট ।  কারণ ঐটুকুই তার জীবনের সম্বল ।  সহিষ্ণুতার পরাকাষ্ঠা হয়ে একসময় দুঃসহ জীবনও  হয়ে উঠবে বিপুল আনন্দের । তখন নিজের হৃদয় পদ্মকেই বারবার প্রণাম জানাবে কাদা আর কাঁটায় ঘেরা লতাগুল্মময় পদযুগল । সেই উদ্ধারের আশায় বসে আছে চির যুগের ধর্মপ্রাণ মানব - মানবী।

   

ছবি : বিধান দেব

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...