জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন গল্পের অমায়িক ভুবন
তৃতীয় আচার্য সেং ৎসান : এক ভুবনবিলাসী ভবঘুরে
তার ভাবনা ছিল এরকম, সংসারে আপাদমস্তক জড়িয়ে পড়ার অর্থ— রোগব্যাধি, শোকতাপ, দুঃখ দুর্দশা ইত্যাদিকে সাদর আমন্ত্রণ জানানো। মোটের উপর সংসার তার কাছে দুঃখের আখড়া হিসাবেই প্রতিভাত হয়েছিল। সংসার সম্পর্কিত এই নেতিবাচক ধারণাই তাকে এক অনিকেত জীবনের অনিশ্চিত পথে ছুটিয়ে নিয়ে গেছে। জনৈক অজ্ঞাতকুলশীল ভবঘুরে হিসাবেই সে জীবনটা কাটিয়ে দিতে চেয়েছিল। যথার্থ পরিব্রাজকের মতো নির্মোহ মন নিয়ে সে পদব্রজে ঘুরে বেড়িয়েছে, কোথাও শিকড় চারাতে দেয়নি। থিতুও হয়নি কোথাও। কখনও প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে থেকেছে দিনের পর দিন। প্রাণধারণের রসদ ও প্রাণের আরাম দুটোই জুগিয়েছে মাতৃস্বরূপা প্রকৃতি। কখনও মানুষের সঙ্গ করে বুঝে নিতে চেয়েছে মানবচরিত্রের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলি। সাধ্যমতো মানুষের পাশে দাঁড়াতে সে কখনও পিছপা হয়নি। আকস্মিকভাবে তার জীবনে নেমে আসে এক দুরপনেয় বিপর্যয়। একদিন সকালে জেগে উঠে সে দেখে শরীরের বিভিন্ন স্থানে কিছু ক্ষত তৈরি হয়েছে। কয়েকদিন ধরে সে সারা দেহে ব্যথা অনুভব করছিল। আজ বুঝল সেই যন্ত্রণাই ছিল এই বীভৎস রোগের উপসর্গ। কয়েকদিন সে নিজের জানা ভেষজের সাহায্যে ক্ষত নিরাময়ের চেষ্টা চালায়। কিন্তু কোনও লাভ হয় না। চিকিৎসকেরা তাকে ফিরিয়ে দেন। বিজ্ঞেরা শোনান এ তার পাপের ফল; এর নিরাময় অসম্ভব। কৃতকর্মের খোঁজে সে অতীতচারণা শুরু করে। না, এমন কোনও গুরুতর অপরাধের কথাও মনে পড়ে না, যাকে পাপ হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। হতে পারে তার স্মৃতি বিশ্বাসঘাতকতা করছে ? অথবা এমনও হতে পারে সে হয়তো পূর্বজন্মের পাপের ফল এজন্মে ভুগছে। তবে বছর কয়েক আগের একটা ঘটনার কথা তার বেশ মনে পড়ে। কোনও একটা গ্রামে ঢোকার রাস্তার ধারে একটা অসুস্থ লোক পড়েছিল। সে তাকে সেবা শুশ্রূষা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছিল। লোকটির সর্বাঙ্গে ছিল দগদগে ঘা। সে আর ভাবতে চায় না, ভাবতে গেলে সেই নিরীহ অসহায় লোকটিকেই দায়ী করতে হয় তার এই ভয়ানক রোগের জন্য। শেষমেশ অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, সে নিজেকে ঘৃণা করতে শুরু করে। মানুষের সংস্পর্শ এড়ানোর জন্য সে আশ্রয় নেয় ইয়াংসি নদীছোঁয়া হুয়ানগং পর্বতের এক নিভৃত অরণ্যে।
খ্রিস্টীয় হিসাবে তখন পৃথিবীতে চলছে ৫৩৬ অব্দ ; তার বয়স তখন চল্লিশ পেরিয়েছে। সে ধরেই নিয়েছে দুর্বহ জীবন থেকে তার আর মুক্তি নেই, এখন কেবল নিভৃতে বসে সর্বরোগহর মৃত্যুর প্রতীক্ষা করা ছাড়া তার অন্য কোনও উপায় নেই। একদিন আপনমনে ঘুরতে ঘুরতে সে জঙ্গলের গভীরে ঢুকে পড়ে। আর আশ্চর্য হয়ে দেখে একটি প্রাচীন গাছের তলায় পাথরের উপর বসে আছেন একজন সন্ন্যাসী। তাঁর বাম হাতখানা কনুইয়ের নীচ থেকে কাটা। সন্ন্যাসীর সামনে বসে আছেন কয়েকজন মানুষ। গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে সে। একসময় সে সন্ন্যাসীকে একা পেয়ে যায়। সন্ন্যাসীর বেদীর সামনে সে নতজানু হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে —
প্রভু, আমি এক ভয়ানক রোগে আক্রান্ত। আমি জানি এ আমার পাপের ফল। আপনি পাপ থেকে মুক্ত করে আমাকে বাঁচান।
সন্ন্যাসী— দাও, তোমার পাপটুকু আমার হাতে তুলে দাও।
ভবঘুরে যুবকটি তখন ডুবুরির মতো মনের অথই গভীরে ডুব দিয়ে পাপের পাঁক তুলে আনতে যারপরনাই সচেষ্ট হয়। তার আশা এইবার সে পাপের দুর্বহ ভার মাথা থেকে নামিয়ে ফেলতে পারবে। সন্ন্যাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতায় তার চোখে জল চিকচিক করে ওঠে। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন অনুসন্ধান শেষে কোথাও সে পাপের লেশমাত্র খুঁজে পায় না। হতাশ হয়ে সে জানায় —
আমি তো কোথাও পাপের খোঁজ পেলাম না।
সন্ন্যাসী — আমি তোমার পাপ দূর করে দিয়েছি। তুমি নতুন জীবন লাভ করলে। এখন থেকে তুমি বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘের অনুসারী হলে।
ভবঘুরে — এটা বুঝেছি যে, আপনার মতো আরও অনেককে নিয়ে সংঘ গড়ে ওঠে। কিন্তু বুদ্ধ ও ধর্ম কী তা তো আমি জানি না !
সন্ন্যাসী — মনই বুদ্ধ, মনই ধর্ম ; ধর্ম ও বুদ্ধ একই , সংঘও আসলে তাই।
ভবঘুরে — এখন বুঝলাম যে, পাপ আমার ভিতরে নেই বাইরেও নেই; আবার এই দুইয়ের মাঝেও নেই। মনই সব, যা বুদ্ধ তাইই ধর্ম।
পাঠক, আপনি নিশ্চয় এতক্ষণে বুঝে গেছেন, এই হাতকাটা সন্ন্যাসী আসলে দ্বিতীয় আচার্য হুই-কে। তিনি প্রতিষ্ঠান বিরোধী মতাদর্শ প্রচারের জন্য রাজন্যবর্গ ও ধর্মজীবীদের চক্রান্তের শিকার হয়ে আত্মরক্ষার জন্য এদু নগর ত্যাগ করে হুয়ানগং পর্বতের গোপন ডেরায় অবস্থান করছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, হুই-কে এতদিন নাগরিক জীবনে থেকেও এমন কাউকে পাননি যার হাতে গুরু বোধিধর্ম প্রদত্ত অমূল্য জ্ঞানবর্তিকাটি ভরসা করে তুলে দেওয়া যায়। আর আজ তিনি পেলেন এমন এক অজ্ঞাতকুলশীল রোগজর্জর ব্যক্তিকে যার বোধের গভীরতা তাঁকে মুগ্ধ করেছে। এক উজ্জ্বল সম্ভাবনার আভাস তিনি পাচ্ছেন। তাঁর মনে হচ্ছে এতদিন যে আধারের অন্বেষণে তিনি হন্যে হয়ে ঘুরেছেন মানুষের ভিড়ে, আজ বুঝি সেই অলোকসামান্য নিজেই তাঁর নিকটে এসে মুক্তি-যাচঞা করছে। তিনি নিজের হাতে যত্ন করে তার মস্তকমুণ্ডন করলেন। তারপর তার উদ্দেশ্যে বললেন, আমার কাছে তুমি রত্নস্বরূপ, আমি তোমার নাম দিলাম — সেং ৎসান। নামটির বাংলা করলে দাঁড়াবে, সংঘরত্ন। যে রোগ সেং ৎসান-এর জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিল, সেই রোগের অভিশাপ থেকে সে মুক্ত হয়। এমনটা ভাববেন না যেন, হুই-কে গায়ে হাত বুলিয়ে দিতেই সেং ৎসান-এর রোগটা গায়েব হয়ে গিয়েছিল। সিংহভাগ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের শাস্ত্রসমূহের মতো চ্যানপুথি অশ্লীলভাবে অলৌকিকতা ফেরি করেনি। কারণ পয়সা ও প্রতিপত্তি হাসিলের জন্য তাঁরা মতাদর্শ প্রচারে নামেননি। তাঁদের এক ও অদ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল মানবহিত। মুসা-ইশা এমনকি আমাদের চৈতন্যদেবও অলৌকিক উপায়ে রোগ সারিয়ে জগতে কীর্তি রেখে গেছেন। আসলে ধর্মপ্রভুদের জীবনীতে রোগনিরাময়ের অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শিত না-হলে ভক্তরা সেই নির্গুণ প্রভুকে দুয়ো দিয়ে অন্য ধর্ম-দোকানে অন্য সগুণ প্রভুর খোঁজ করবে। তাই পাল্লা দিয়ে প্রত্যেক ধর্মই প্রভুর অলৌকিক কেরামতিতে রোগ-সারানোর বেশ কয়েকটি উপাখ্যান রাখতে ভুল করেনি। তবে আমরা এটাও মনে করি না যে, ধর্মপ্রভুদের রোগনিরাময় ক্ষমতা সম্পর্কে যেসব গল্প ছড়ানো রয়েছে সেগুলির সবই মিথ্যা। আমরা বরং বিপরীত মতটাই পোষণ করি। আমরা মনে করি তাঁরা মানবদেহ সম্পর্কে, দেহের বিভিন্ন ব্যবস্থা সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখতেন। শুধু তাই নয়, বিবিধ রোগ উপশম ও নিরাময়ের নিদানও তাঁরা ভালোমতো জানতেন। ফলে মৃৎবৎ দেহে প্রাণসঞ্চার, মানসিক ও শারীরিক ব্যাধি থেকে নিষ্কৃতিদানের ঘটনা তাঁদের হাত ধরে ঘটা মোটেও অসম্ভব ছিল না। এই পদ্ধতিতে অনেক ধর্মগুরুই রোগনিরাময়ের মাধ্যমে খ্যাতি অর্জন তথা অলৌকিক শক্তির প্রচারের দৌলতে ভক্ত সংখ্যা বাড়িয়ে নিয়ে ধর্ম-সম্প্রদায় গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। ধর্মান্তরিত হওয়ার পিছনে এই রোগনিরাময় বিষয়টা একটা গুরুতর ভূমিকা রাখে। মানুষ রোগজর্জর হয়ে পড়লে রোগমুক্তির চিন্তা ছাড়া অন্যান্য চিন্তাগুলি তার কাছে গৌণ তথা মূল্যহীন হয়ে পড়ে। সেই বিপন্নতার সময় তাকে যে আশ্বস্ত করে, নিরাময় দান করে, তাকে তো সে দেবতা জ্ঞান করবেই। এই মানসিক বৈশিষ্ট্য থেকেই ডাক্তারকে ভগবান ভাবার রেওয়াজ তৈরি হয়েছে। আর তাই লোকনিরুক্তিতে ডাক্তার হয়ে উঠেছেন ঈশ্বরগোত্রীয় — ডাক তার অর্থাৎ তাকে ডাক। কেবল সুদূর-অদূর অতীতে নয় বর্তমান সময়েও মানুষের মনের এই ধরণ বদলায়নি। লোকধর্মগুলিতেও আমরা লোকচিকিৎসার প্রসার লক্ষ করি। ভারতবর্ষে সুফিদের প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পিছনেও অন্যতম প্রধান ভূমিকা রয়েছে এই রোগনিরাময়ের ঘটনার। ইদানীং বাংলার গ্রামেগঞ্জে গৃহস্থের বাড়িতে বাড়িতে কোথাও পিতা-পরমেশ্বরের নামে, কোথাও জিশুদাদার নামে আসর বসানো হচ্ছে। এইসব আসরে চতুরতার সঙ্গে জিশুকে ব্যবহার করছে একদল স্বার্থান্বেষী। তারা লোকসমাজকে বোঝাচ্ছে, জিশুদাদার ভজনা করলে নিঃসন্তান সন্তান লাভ করবে, যে-কোনো রোগ সেরে যাবে বিনা ওষুধে। সব থেকে ভয়ংকর বিষয় হল পিতা-পরমেশ্বর বা জিশুদাদার এইসব প্রচারকরা তাদের অনুসারীদের ডাক্তারি চিকিৎসা নিতে তথা ঔষধ সেবন করা থেকে বিরত হওয়ার প্রাণঘাতী উপদেশও দিয়ে যাচ্ছে অবলীলায়। মানুষ তাদের উপদেশ মেনে চলতে গিয়ে মৃত্যুমুখে পড়েও আস্থা হারাচ্ছে না। একুশ শতকের জ্ঞানবিজ্ঞানচালিত দুনিয়ায় যদি এমনটা ঘটে, তাহলে আমাদের অতীতের অন্ধকার কতটা নিকষ ছিল তা অনুমান করার জন্য আমরা এই সাম্প্রতিক বিষয়টা উত্থাপন করলাম মাত্র। অন্যান্য ধর্মমতগুলি যেখানে মানুষের অসহায়তাকে পুঁজি করে তাকে সাম্প্রদায়িক নির্বোধে পর্যবসিত করেছে, সেখানে চ্যান তথা জেন মতাদর্শ তার সীমিত পরিসরে মানুষকে আত্মবিশ্বাসী ও আত্মজ্ঞানী হয়ে ওঠার পথ দেখিয়েছে।
বোধিধর্ম নিজে ছিলেন বিশিষ্ট ভিষক। তাঁর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে হুইকেও চিকিৎসাবিদ্যায় হাত পাকিয়েছিলেন। সেং ৎসান তাঁর চিকিৎসায় ক্রমশ সুস্থ হয়ে ওঠেন। দুবছর হুই-কের ছায়াসঙ্গী হয়ে থেকে যান তিনি। একদিন হুই-কে তাঁকে ডেকে বলেন —
বোধিধর্ম ভারতবর্ষ থেকে আমাদের দেশে এসেছিলেন। আমাকে তিনি দীক্ষিত করে তাঁর ভিক্ষাভাণ্ড ও চীবর আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। আমি প্রতিশ্রুত ছিলাম যথাসময়ে কোনও যোগ্য ব্যক্তির হাতে আমি তাঁর ভিক্ষাভাণ্ড ও চীবর এবং মতাদর্শ তুলে দেব। আজ আমি তোমার হাতেই সেই গুরুভার অর্পণ করছি।
হুই-কে, নতজানু সেং ৎসান-এর হাতে তুলে দেন সযত্নে রাখা ভিক্ষাভাণ্ড ও চীবর। পুনরায় বলতে শুরু করেন —
তুমিও যথাসময়ে যোগ্য ব্যাক্তির হাতে এই ভার ন্যস্ত কোরো। আপাতত কয়েক বছর তুমি নগরে যাবে না; গহন পার্বত্য অরণ্যই তোমার আদর্শ স্থান। কাউকে শিক্ষা বা উপদেশ দিতে যেয়ো না। আসন্ন বিপর্যয় থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখাই তোমার কাজ।
সেং ৎসান বলেন — আপনি দয়া করে আসন্ন বিপর্যয় সম্পর্কে আমাকে ধারণা দিন।
হুইকে বলেন — আমি তোমাকে সে বিষয়ে অনুমানভিত্তিক কিছুই বলব না। তোমাকেই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে সম্যক বিচারের মাধ্যমে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
হুইকে নিজেই এদুতে এই রাষ্ট্রিক বিশৃঙ্খলার শিকার হয়ে হুয়ানগং পর্বতের অরণ্যে আত্মগোপন করেছিলেন। চিনে এই বৌদ্ধ-পীড়ন শুরু হয়েছিল অনেক আগে ৪৪৬ খ্রিস্টাব্দে। ওই বছর উত্তর ওয়েই রাজবংশে (Northern Wei)-র তাওবাদী সম্রাট তাইয়ু (Taiwu) জিওংনু ( Xiongnu) গোষ্ঠীর বিদ্রোহী নেতা গাই-উ(Gai Wu)-কে দমন করতে গিয়ে এক বৌদ্ধ মঠে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্রের সন্ধান পান। বৌদ্ধমত ও প্রতিষ্ঠান তাঁর শাসনের অন্তরায় হয়ে উঠেছে ভেবে তিনি বিদ্রোহের উৎপত্তিস্থল গুয়ানঝং অঞ্চলের বৌদ্ধমঠ ও স্থাপত্য ধ্বংসের এবং বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের হত্যার নির্দেশ দেন। তাঁর এই নির্দেশের পিছনে বৌদ্ধবিদ্বেষী তাওবাদী অমাত্য কুই হাও (Cui Hao)-এর জোরদার ইন্ধন ছিল। তাইয়ু-র পরে অবশ্য বৌদ্ধধর্মের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হতে থাকে। শেষমেশ ৪৫২ খ্রিস্টাব্দে তাইয়ু-র পৌত্র ওয়েনচেং ( Wencheng) সিংহাসনে বসার পরে তা উঠে যায়। দক্ষিণ চিনে বৌদ্ধ-পীড়ন শুরু হয়েছিল বুদ্ধ-অনুরাগী সম্রাট উ(WU)-র মৃত্যুর পর। এই মহানুভব সম্রাটের সঙ্গে ৫২০ খ্রিস্টাব্দে বোধিধর্মের সাক্ষাৎ হয়েছিল, তা আমরা জানি। লিয়াং বংশের এই সম্রাট ৫৪৯ খ্রিস্টাব্দে গৃহবন্দি অবস্থায় অনাহারে প্রাণ হারান। উ-র পরে সিংহাসনে বসেন তাঁর অন্যতম পুত্র জিয়ানয়েন (Jianwen)। তিনি চিন থেকে তাওবাদ ও বৌদ্ধবাদ দূরীকরণে তৎপর হয়ে ওঠেন। তাঁর নির্দেশে বৌদ্ধ মঠ-সংঘারাম, স্থাপত্য, চিত্রকলা, পুথিপত্র ধ্বংস করে ফেলা হয়। উত্তর ওয়েই রাজবংশের পরে উত্তর চিনের শাসক হয়ে বসে উত্তর ঝউ রাজবংশ (Northern Jhou Dynasty)। এই বংশের সম্রাট উ-দি (Wu Di) জনৈক প্রাক্তন বৌদ্ধ ভদন্তের প্ররোচনায় তাওবাদ ও বৌদ্ধবাদকে মুছে ফেলার জন্য এক আপোষহীন সংগ্রামে নামেন। তিনি বেশ কৌশলী ছিলেন। ৫৭৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি কনফুসীয়, তাওবাদী ও বৌদ্ধ পণ্ডিতদের এক বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। উ-দি ছিলেন ঘোরতরভাবে কনফুসীয় আদর্শে বিশ্বাসী। স্বাভাবিকভাবে তাঁর নিযুক্ত বিচারকমণ্ডলীর বিচারে প্রথম স্থান অধিকার করেন কনফুসীয় মতের পণ্ডিতেরা, দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন তাওবাদী পণ্ডিতেরা। আমাদের মনে রাখতে হবে এই দুটি মতেরই উৎপত্তিস্থল চিন। আর বৌদ্ধবাদ সে তো বিদেশাগত মতাদর্শ তাকে তো তিনজনের মধ্যে তৃতীয় হতেই হবে। প্রথমে বদনাম দাও তারপর মারো —এক্ষেত্রে উ-দি এই কূটনীতি কাজে লাগিয়েছিলেন। ঠিক এক বছর পরে ৫৭৪-এ রাষ্ট্রীয়ভাবে কনফুসীয় মতবাদ ছাড়া অন্যদুটি মতবাদকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এছাড়াও বলা হয়, সরকারি দপ্তরে নথিভুক্ত না-করে জনগণের মধ্যে কোনও মতাদর্শ প্রচার করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। মঠ ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হিসাবে আত্মসাৎ করা হয়। ঐতিহ্যবাহী শাওলিন মঠেও বন্ধের হুকুমনামা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। কনফুসীয় আদর্শে সাংসারিক জীবনকেই শ্রেষ্ঠত্বের তকমা দেওয়া হয়েছে। সে নীতি অনুসরণ করে সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীদের সামাজিক আগাছা হিসাবে চিহ্নিত করে বলপূর্বক সাংসারিক জীবনে ঠেলে দেওয়ার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়। সেং ৎসান, হুইকে-র নিকট দীক্ষিত হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ সময় জুড়ে চিন দেশে বৌদ্ধ-নিপীড়নের ঘটনার সাক্ষী থেকেছেন। বুঝতে পেরেছে্ন গুরু হুই-কে কোন বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
দীক্ষান্তে প্রায় দশ বছর সেং ৎসান পার্বত্য অরণ্যে বাস করেছেন। ফুলের সৌন্দর্য ও সুবাস যেমন গোপন থাকে না, যার হৃদয়ে সমাজশুদ্ধির আগুন থাকে তাঁর পক্ষে আত্মগোপন অসম্ভব। তবুও সেং ৎসান যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন, নিজেকে আড়ালে রাখতে। সন্ন্যাসীর পোশাক ছেড়ে সাধারণ পোশাকে আত্মপরিচয় গোপন করে ঘুরে বেড়িয়েছেন। মাঝেমধ্যে ডেরা পালটাতে হয়েছে। তবুও তিনি সংগোপনে উপযুক্ত পাত্র খুঁজে তাতে আদর্শের বীজ বুনে দিয়েছেন। এইভাবে তাঁকে ঘিরে এক গোপন সংঘ গড়ে উঠেছে। তবুও তাঁর খোঁজ এখনও সার্থকতা পায়নি। তাঁকে তো খুঁজে নিতে হবে ঘাতসহ এক অদ্বিতীয় আধার যার উপর ভরসা করে তুলে দেওয়া যায় পরম্পরিত আলোকবর্তিকা। একদা সেং ৎসান লিখে ফেলেন নির্মেদ এক তত্ত্বকাব্য — সিন-সিন-মিং (Hsing-hsin Ming) যার বাংলা হবে এইরকম, হৃদয়-উৎসারিত-প্রত্যয়। এই কাব্যের ছত্রে ছত্রে বর্ণিত হয়েছে সহজ পথের চলন-রেখা। চ্যান তথা জেন ধারার অনুসারীদের কাছে এই কাব্যটি রেডবুক হিসাবে চর্চিত হয়ে আসছে। যদিও কাব্যটি সেং ৎসান-এর লেখা কিনা এবিষয়ে গবেষকদের মতভেদ লক্ষ করা যায়। ৬০৬ খ্রিস্টাব্দে এই অকৈতব ভবঘুরে একটি মহাদ্রুমের ছায়ায় বসে অম্লান বদনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তখনও তাঁর হাতে ধরা ছিল দীর্ঘদিনের সঙ্গী একটি বৃক্ষশাখা, যে ছিল তাঁর আত্মরক্ষার আয়ুধ ও পাকদণ্ডি-পদচারণার বিঘ্নবিনাশক। বোধিধর্মের হাতেও তো থাকত এমন এক বৃক্ষশাখা।
তথ্যসূত্র :
১. DENKOROKU; THE RECORD OF THE TRANSMISSION OF THE LIGHT BY KEIZAN JOKIN ; TRANSLATED BY HUBART NEARMAN, OBC SHOSTA ABBEY PRESS , CALIFORNIA .
২. HISTORY OF ZEN BY YU-HISIU KU; SPRINGER, SINGAPORE.
৩. THE ILLUSTRATED ENCYCLOPEDIA OF CONFUCIANISM BY RODNE L. TAYLOR AND HOWARD Y. F. CHOY, THE ROSEN PUBLICATION GROUP , NEW YORK
৪. THE A TO Z OF BUDDHISM BY CARL OLSON, THE SCARECROW PRESS , UK.
৫. ZENS CHINESE HERITAGE BY ANDY FERGUSON ; WISDOM PUBLICATION, BOSTON.
৬. THE ILLUSTRATED ENCYCLOPEDIA OF ZEN BUDDHISM BY HELEN J. BARONI ; THE ROSEN PUBLICATION GROUP , NEW YORK
৭. THE ILLUSTRATED ENCYCLOPEDIA OF ZEN BUDDHISM BY HELEN J. BARONI ; THE ROSEN PUBLICATION GROUP , NEW YORK
৮. ZEN MASTERS OF CHINA : THE FIRST STEP EAST BY RECHARD BRYAN MC DANIEL; TUTTLE PUBLICATION, TOKYO/ VERMONT/ SINGAPORE.

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন