ভিনদেশি তারা
আসল নাম জিওফ ফরেস্টার , লেখেন টাগ ডাম্বলি এই ছদ্মনামে । জন্ম ১৯৬৫ সালের ১৮জুন , অস্ট্রেলিয়ায়। তিনি সুরকার , গায়ক , কমেডিয়ান এবং কবি । তাঁকে বলা হয় “Australia’s godfather of spoken word’ । একটি গদ্যে তিনি বলেছেন কবিতা কখনই আর ‘বিশাল’ বা ‘বড়ো’ হবে না। হয়ত কোন একজন বিশেষ কবি মিডিয়ার বদান্যতায় একটু বেশি আলো পাবেন , তাঁকে মনে হবে খুব বড়ো কেউ একজন , কিন্তু ‘কবিতার ইন্ডাস্ট্রি’ জাতীয় কিছু গড়ে ওঠার সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতেও নেই। কারণ কবিতা কখনই ‘পপ’ , টিভি , অথবা ফিল্ম বা থিয়েটার এমনকি স্ট্যান্ড আপ কমেডির মতো জনপ্রিয় হবে না । সেই ৪০এর দশকে জর্জ অরওয়েল তাঁর Poetry and the Microphne প্রবন্ধে লিখেছিলেন যে , সব শিল্পের মধ্যে কবিতাকেই সবচেয়ে কম কৃতিত্ব দেওয়া হয়। টাগ আরও বলছেন , কবিতার সঙ্গে সাধারণ মানুষের সরাসরি যোগাযোগ যত কমে আসছে ততই তাঁদের কাছে কবিতা একটা ভণ্ডামি আর দুর্বোধ্য ব্যাপার হিসেবে প্রতিপন্ন হচ্ছে। আরও বেশি সংখ্যক শ্রোতার কাছে , পাঠকের কাছে কবিতাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য টাগ চাইছেন কবিরা নিজেদের লেখা নিজেরাই পড়ুন। প্রয়োজনে মঞ্চ বনাম পাঠ এর দীর্ঘকালীন লড়াই দূরে সরিয়ে মাল্টিমিডিয়ার সাহায্য নিতে বলছেন তিনি। যদিও টাগ জানেন মঞ্চের পড়ার কবিতা ( পারফরমেন্স পোয়েট্রি ) আর বইয়ে মুদ্রিত কেবলমাত্র পড়ার কবিতার মধ্যে ফারাক থেকেই যায় । কখনো কখনো তারা সমানভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠলেও দুটির ক্ষেত্র মূলত আলাদা।এমন কোনো বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত বলেও টাগ মনে করেন না । তবে পারফরমেন্স পোয়েট্রি আর সাবেক কবিতাপাঠের ধারা দুটিকে পরস্পরের মধ্যে লড়িয়ে দিলে একটা ভ্রান্ত ডাইকোটোমি তৈরি হয়। এটা অনেকটা বাস্কেটবল টিমের সঙ্গে ক্রিকেট টিমকে লড়িয়ে দেওয়ার মতো ব্যাপার হয়ে যায় । বরং তিনি বলছেন একে অপরের হাত ধরে চলার কথা। যাতে পোক্ত হয় কবিতার ভিত্তিভূমি।
গুবরে পোকা
ছোটবেলায় আমি একটা গুবরে পোকাকে ছিঁড়েছিলাম
একটু একটু করে
কোথা থেকে তার ঐ টিকটিক আওয়াজটা আসে শুধু সেটা দেখার জন্য
খুঁজে পেতে চেয়েছিলাম ঐ রহস্যময় আওয়াজের উৎসস্থল।
আমি ওর দেহের অংশগুলো আলাদা করেছিলাম একেবারে নিয়ম মেনে
গাড়ি সারাইয়ের মিস্ত্রির মতো ___
ডানাগুলো , শুঁড়গুলো , মাথাটা …
কিন্তু তারপর আমি ভুলে গেছিলাম
কিভাবে এগুলো জোড়া লাগাতে হয়।
প্রথম থেকে শেষ অব্দি ওটা নড়াচড়া থামায়নি
একখানা
পা
ঝাঁকিয়েই যাচ্ছিল।
ততক্ষণে রহস্য পালিয়ে গেছে।
হলিউডে কেরিয়ার গড়ার নিখুঁত চিত্রনাট্য
দৃশ্য ১ : শৈশব
বিবর্ণ শহরে ভাঙাচোরা বাড়ি
পাগল মা , মাতাল বাবা।
বহিরাগত , একা , পরাজিত , খাপছাড়া ,
নিগৃহীত , যাকে সবাই ভুল বোঝে
কোনো বন্ধু নেই , আত্মবিশ্বাস তলানিতে ।
বাবা-মাকে ঘৃণা করে , ভাইবোনদেরও
স্কুল এবং কতৃপক্ষকেও ।
অপরাধ করা
সংশোধনাগারে ঠাঁই
ধর্ষকামী প্রহরী , ধোলাই , অত্যাচার।
দৃশ্য ২ : প্রথম সুযোগ
সংশোধনাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার পর
কাজ খোঁজার কানাগলিতে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ানো।
দুটো বিকল্প : হয় পাগল হয়ে গিয়ে
সেমি-অটোমেটিক মেশিন গান নিয়ে শপিং মল তছনছ করা
অথবা কোনো ধূলিধূসরিত ছোট শহরের পেট্রল পাম্পে
প্রতিভার সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো ব্যক্তির চোখে পড়ে যাওয়া
তারপর ফিল্ম স্টার আর পাগল হয়ে
শপিং মলে তছনছ করা
হাতে সেমি-অটোমেটিক মেশিন গান ।
সৌভাগ্যক্রমে দ্বিতীয়টাই ঘটে ।
দৃশ্য ৩ : খ্যাতি
তোষামোদ , প্রশংসা
সমালোচকদের প্রশস্তি ।
নতুন ব্র্যান্ডো , টিনএজারদের নতুন স্বপ্নের নায়ক
লিমুজিন এ স্বপ্নদোষ ।
চকচকে পার্টি , পাপারাৎজি
অস্কারে নমিনেশান , পরিচালকের চোখের মণি।
অ্যান্টিক গাড়ির সংগ্রাহক আর সুপারমডেলের প্রেমিক
ম্যাডোনার বন্ধু।
দৃশ্য ৪ : ঘেঁটে ফেলা
মদ , অহং , কোকেন , মাথায় গণ্ডগোল
মোসাহেবের দল আর বহুমূল্য বেশ্যারা।
বদমেজাজ , সস্তার হোটেল
রেস্টুরেন্টে গোলমাল পাকানো
ফোটোগ্রাফারের মুখে ঘুঁষি মারা
সেট-এ মদ্যপ অবস্থায় পৌঁছানো।
স্ক্রিপ্ট এর বিরুদ্ধে ভেটো দেওয়া , নিজের এজেন্টকে ঘাড়ধাক্কা দেওয়া
পরিচালককে কাজ থেকে তাড়ানো।
মাতাল হয়ে গাড়ি চালানো -ড্রাগ-অ্যারেস্ট হওয়া
মারপিট , অ্যারেস্ট হওয়া
দুঃখ ভুলতে নাইটক্লাবের বাথরুমে রাত কাটানো
গসিপ কলাম , কুখ্যাতি অর্জন।
দৃশ্য ৫ : মুক্তি
নর্দমা দিয়ে গড়িয়ে যাওয়া কেরিয়ারের
নাম কাদা
কেউ তোমাকে ছোঁবে না
জীবনের সর্বনিম্ন ভাটা।
আসক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু।
নিজেকে পরিষ্কার করা
বৌদ্ধধর্মের আশ্রয় নেওয়া , ভেগানিজম ,
থেরাপিস্ট , অপমানিত হওয়া , আর
বউ আর পরিবারের প্রতি মিষ্টি ভালোবাসাকে
বুঝতে শেখা।
বিকলাঙ্গ শিশুদের জন্য দানধ্যানে মন
পারিবারিক সিনেমা তৈরি করা।
দৃশ্য ৬ : চূড়ান্ত বিজয়
পারিবারিক সিনেমাটি সুপারহিট হল।
অপরাহ-র শো এ নতুন বইয়ের প্রচারে উপস্থিত:
নেশামুক্তি এবং নিরাময়ের শুরু
নিম্নলিখিত বক্তব্যগুলি রাখলেন :
খ্যাতি একটি দুধারি তলোয়ার।
অন্যকে আঘাত করে আপনি আসলে নিজেকেই আহত করেন।
নিজের নিজেকে আরও ভালবাসতে শেখা উচিত।
অপরাহ আপনাকে নায়ক বললেন।
দর্শক আপনার সাহসের প্রশংসা করল
আপনি বিনয়ের অবতার সেজে একটা হতভম্ব ভাব ফুটিয়ে তুললেন মুখে , বোঝালেন আপনি কতটা কৃতজ্ঞ।
অপরাহ আপনাকে আলিজ্ঞন করতে উঠে দাঁড়ালেন
আপনার স্ত্রী এবং সন্তানেরা আপনাকে অবাক করে দিয়ে মঞ্চে উপস্থিত হল
দর্শক উঠে দাঁড়াল , চিৎকার , কান্নাকাটি , এবং
হাততালি।
হাততালি আপনার পুনর্জন্মের জন্ম
হাততালি আপনার নেশামুক্তির জন্য
হাততালি আপনার মনের জোর , সাহসের জন্য
হাততালি মিলনাত্মক সমাপ্তির জয়ের জন্য
হাততালি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়ের জন্য
হাততালি আরও এক নায়কের সৃষ্টির জন্য
হাততালি অপরাহ-র জন্য
হাততালি বাণিজ্যের জন্য
হাততালি নিজেদের জন্য হাততালি নিজেদের জন্য
হাততালি নিজেদের নিজেদের জন্য হাততালি।
অর্কেস্ট্রায় বেজে ওঠে নিশ্চিত জীবনের ক্রিসেন্ডো
কুশীলবদের নাম ভেসে চলে
সমাপ্ত।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন