বৃহস্পতিবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২১

বিশেষ রচনা : রাজীব ঘোষাল


 সভ্যতার খাণ্ডবেচ্ছা 

  


খুব সম্প্রতি বনে জঙ্গলে মানুষের আগুন লাগানোর প্রবণতা যেন সভ্যতার জন্য একটি থ্রেট হয়ে দাঁড়িয়েছে।কিন্তু কেন এই প্রবণতা!এর উত্তর সাম্প্রতিকে নয় সুদূর অতীতে সমাহিত।একটা সময় ছিল বনে দাবানল জ্বলত। প্রকৃতির রোষে অসহায় মানুষ মনে মনে ত্রাহি ত্রাহি রবে প্রমাদ গুনত।তারপর এল সেইদিন যেদিন আগুন হয়ে উঠল মানুষের ঢাল।বিভিন্ন হিংস্র জন্তুর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য মানুষ আগুনকে কাজে লাগাল।ক্রমে সভ্যতার আয়ুধ হয়ে উঠল আগুন।আর কে না জানে আয়ুধ যেমন উপকারী তেমন মারাত্মক হয়ে ওঠাতেও তার জুড়ি নেই।

  কিছুদিন আগেই আমাজনের জঙ্গলে বিশাল অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সামনে আসে। সারা বিশ্ব স্তম্ভিত হয়ে যায়।পৃথিবীর বৃহত্তম রেন ফরেস্ট জীব বৈচিত্রের আঁতুড়ঘর যদি ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে তো পুরো মানব সভ্যতাই ধ্বংসের মুখোমুখি হবে!এর দায় কার? কার স্বার্থে এই খেলা।উত্তর সারা বিশ্বই জানে।জানে মানুষের অপরিমিত লোভ।পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় হঠাৎই লক্ষ করা গেল আগুনের লেলিহান শিখা।কে লাগালো আগুন? কেন চুপ রইল বনদপ্তর? এই প্রশ্নের উত্তরে অনেক যদি কিন্তুর হিসেব লেগে আছে। আমাদের একটি সহজ প্রশ্নের আশু সমাধান বের করতে হবে। প্রশ্নটি হল সভ্যতা কাকে বলে? বনভূমি কেটে নদীপাড় দখল করে পাহাড়ের কোলে সাতমহলা বাড়ি বানানোকে আমরা যেমন সভ্যতা বলব না তেমনই সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে মদ মাংস রুটির জীবনকেও আমরা সভ্যতা বলব না। জঙ্গল জুড়ে ভারি বুটের আওয়াজ যেমন সভ্যতা নয় তেমনই অসহায় খেটে খাওয়া উর্দি পরা লোকটির বুক বুলেটে ঝাঁঝরা করে দেওয়াও সভ্যতা নয়। সভ্যতা খুবই দীর্ঘমেয়াদি অনুশীলনের বিষয়। যেখানে কোনো চাতুরীর আশ্রয় নিতে হবে না। প্রকৃতির সঙ্গেই সহাবস্থান করবে মানুষ। যেখানে নিছক বাড়ি বানানোর প্রয়োজনে রাস্তার প্রয়োজনে বদ্ধ করা হবে না জলের গতিপথ।যেখানে গাছ কাটা হবে না বেহিসেবী। বনে আগুন দেওয়ার আগে যখন মানুষ লক্ষবার ভাবনা চিন্তা করবে তাকেই আমরা সভ্যতা বলতে পারি। 

  পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের বনাঞ্চল জুড়ে বামনি ফলস,সুকরিডোবা, আপার ড্যাম,লোয়ার ড্যাম, দোয়ারিখাল, ধসকা, মাঠা, গোর্গাবুরু, পারডি, টিকরটাঁড় আজ মানুষের পর্যটন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। আর পর্যটন বাড়লেই, বাড়বে হোটেল ব্যবসার রমরমা। এই পুরো নিসর্গ এলাকা জুড়েই কেউ বা কারা আগুন লাগিয়ে দেয়। ছুটে আসে  তরুণ মাহাত, সাধন মাহাত, বাপী মাহাত, দুর্গাদাস মাহান্তি, সুজিত মাহাত, জনার্দ্দন মাহাত, অক্ষয় ভগত, উজ্জ্বল মাহাত,প্রদীপ মাহাতর মতো প্রায় একশ জন মত স্বেচ্ছাসেবী। তিনটি দলে ভাগ হয়ে আগুন নেভানোর কাজে হাত লাগায়।পরবর্তীতে অগ্নিসঙ্গযোগের ঘটনা যাতে না ঘটে সেদিকেও নজরদারী চালানো হবে বলে শপথ নেয় এই প্রকৃতিপ্রেমী ভূমিপুত্ররা। আগুন আপাতত নিভেছে। কোনো যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই কেবল মস্তিষ্ক কাজে লাগিয়ে অসাধ্য সাধন করেছে একদল প্রকৃতিপ্রেমী যুবক। তারা জ্বলে ওঠা আগুনের পাশে ট্রেঞ্চ কেটে কখনো আগুন লাগা জঙ্গলের চারপাশে দশ ফুট পনের ফুট এলাকা শুন্য করে দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে আগামী বর্ষায় নতুন করে চারা লাগিয়ে সিড বল ছড়িয়ে আবারো বনভূমিকে আগের রূপ দেওয়া হবে। এদিকে ডি.এফ.ও পুরুলিয়া দাবী করেছেন তাদের বিভাগীয় কর্মীদের প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে। বিড়ি মাচিস ইত্যাদি নিয়ে বনে ঢোকার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে নজরদারী।যদিও  আগুন লাগানোর হাত থেকে বাঁচানো গেল না নিতুড়িয়া সাঁতুড়ি রঘুনাথপুরের ছোটো ছোটো বনবাদাড়গুলিও। মানুষের ঔদ্ধত্যের কারণেই পুড়ে মারা গেল অজস্র ছোটো ছোটো বনজ পশুপাখি। এদিকে করোনার করাল গ্রাসে মানুষের জীবন তটস্থ। অক্সিজেনের জন্য ছটফট করছে অজস্র মানুষের ফুসফুস। তবু কি মানুষের ঘুম ভাঙবে! কেন জানি না মনে হচ্ছে সেই যে অতিদীর্ঘ ঘুমে ঘুমিয়েছিলেন মহারাজ মান্ধাতা অথবা কৃষ্ণ অর্জুনকে সঙ্গে নিয়ে পুড়িয়ে ফেলছেন খাণ্ডব বন। এইসব ঘটনাগুলি কিছুকাল দ্বৈপায়ন হ্রদের নিচে বিশ্রাম নিক। শঙ্খ ঘোষের মত কোনো দরদী মানুষ এসে বলুনঃ “ সব শান্ত হোক। প্রয়োজনে পৌরহিত্যের ভার নেব আমি ” ……



ছবি : বিধান দেব 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...