মঙ্গলবার, ৩০ মার্চ, ২০২১

সম্পাদকের কথা


 রং যেন মোর মর্মে লাগে আমার সকল কর্মে লাগে



হয়তো আজকের পরিস্থিতিতে অস্বাভাবিক এই উচ্চারণ। যদিও জ্ঞান হওয়া ইস্তক এত উজ্জ্বল রং খেলা কোনোদিনই আমার হয়নি। তবে রং লেগেছে মনে। লেখায়। যদিও সময়ের প্রেক্ষাপটে শব্দের অর্থ বদলায়। সেই হিসেবে রং আর খেলা দুটি শব্দই বর্তমানে অন্য চেহারায়। ভাষা বিবর্তনের এই অববাহিকায় দোলের শেষে আমরা আর তাদের আত্মীয় অথবা স্বজন হিসেবে চিনতে পারি না। কিন্ত আনন্দ হয় এই ভেবে যে আমাদের বাংলা ভাষা এখনও জীবন্ত, প্রবাহিত। তা কোনোভাবেই মর্মঘাতি নয়। বরং তা আমাদের ব্যবহারিক কর্মযোগকে আশ্রয় করেছে।

আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে ।। শর্বরী চৌধুরী


 


বসন্ত ঋতু প্রাণময়তার উদযাপন, উদযাপন উচ্ছ্বলতার, প্রেমের। সব আগল ভেঙে ঘর ছাড়ার ডাক দেয় বসন্ত ; প্রকৃতিকে রাঙিয়ে তোলে, মানবমনকেও। ফাগুন তার রঙের ছটায় ভরিয়ে তোলে আমাদের। আমাদের কবিতায়, গানে আমরা পাই বসন্ত ঋতু র অবারিত উন্মোচন। রবীন্দ্রনাথের অন্যতম প্রিয় ঋতু বসন্ত। বসন্ত ঋতু তার রূপ রস গন্ধ নিয়ে বিচিত্ররুপে পেখম মেলেছে তাঁর রচনায়। "ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান"। বসন্তকে পথভোলা পথিকের রূপে কল্পনা করেছেন কবি। বসন্ত ঋতু র  স্বভাব সৌন্দর্য কে ধারণ করে ধরার চিত্ত যেন উতলা হয়ে ওঠে। 
                   বসন্ত প্রেমের ঋতু। " প্রহরশেষে রাঙা আলোয় সেদিন চৈত্রমাস/ তোমার চোখে দেখেছিলেম আমার সর্বনাশ"। কবির রচিত গীতিনাট্য 'শাপমোচন'এ ফাগুন মাসের ই এক রাতে রাণী কমলিকা আবিষ্কার করেছিলেন রাজা অরুণেশ্বরকে; অনুভব করেছিলেন রূপাতীত প্রেমের ঐশ্বর্য। বসন্ত নানা বিভংগে উপস্থিত কবির রচনায়। কখনো বা নীল দিগন্তে পলাশের বন্যা কবিকে মুগ্ধ করে, কখনো বা জ্যোৎস্নারাতে দয়িতা থাকে অনাগত প্রেমিকের অপেক্ষায়। বসন্ত ঋতু প্রাণের উচ্ছ্বাসে মহিমান্বিত। কবির চিত্তও সবসময় প্রাণশক্তির উদযাপন কেই ধ্রুব মনে করেছে। তাই বসন্তের প্রাণময়তা কবির রচনায় বহু বৈচিত্র‍্যে আকীর্ণ। 
বসন্ত ঋতু মানুষকে অন্য এক জীবনবোধে উত্তীর্ণ  করে। রবীন্দ্রনাথের লেখায় সেই বোধ ই প্রস্ফুটিত। ফাগুন তার রঙে রসে উজ্জীবিত করে পৃথিবীকে। এই উজ্জীবনের মন্ত্র কবির রচনায় চিরায়ত মহিমায় উদ্ভাসিত। তাই কবি বসন্তকে আবাহন করেছেন "আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে"-এই বলে। চৈত্রের হাওয়া কবির চিত্তে জাগিয়ে তোলে বাণীমঞ্জরী। , কবির রচনায় আমরা পাই বসন্তের এক প্রাণময় রূপ। এই প্রাণময়তাই শাশ্বত সত্য। 
                                   বসন্ত ঋতু কে বলা হয় ঋতুরাজ। বসন্তকাল হোলিখেলার কাল। রাধা কৃষ্ণের চিরায়ত প্রেমের মহিমা ব্যক্ত হয় এই হোলিখেলায়। হোলি রঙের উৎসব। এই উৎসব আপামর ভারতবাসী কে রঙের মাধুর্যে ভরিয়ে তোলে। 
                 বসন্ত ঋতু দেবী দূর্গার আবাহনেরও ঋতু। রাজা সুরথ বসন্তকালেই দেবী দূর্গার বোধন করেন, যে পুজো বাসন্তীপুজো নামে পরিচিত। 
               বসন্ত ঋতু বাগদেবীর আরাধনারও ঋতু। 'মহাশ্বেতা'কে মানুষ অর্ঘ্য দেন পরম শ্রদ্ধায় ও প্রেমে। 
                 বসন্ত প্রেমের ঋতু। সবার অলক্ষ্যে প্রকৃতির রঙ মানুষের হৃদয়কেও রাঙিয়ে তোলে । সে আকুল হয় কোনো এক বিশেষ মানুষের জন্য। প্রেম এক শাশ্বত অনুভূতি। তা মানুষকে উত্তীর্ণ করে, বাঁচতে শেখায়। বসন্ত তাই দেশে দেশে যুগে যুগে মানুষের উজ্জীবনী মন্ত্র। " হৃদয় বসন্তবনে যে মাধুরী বিকশিল"-এই অনুভব শুধু বজ্রসেনের নয়, আপামর পৃথিবীর মানুষের। 


ছবি : বিধান দেব 

ধারাবাহিক গদ্য ।। দীপক হালদার



ডায়মন্ড হারবারের সাহিত্যচর্চার ইতিবৃত্ত 

 
সাত.
প্রশাসনিক পদে বৃত হয়ে বিগত সাতের আটের দশকে ডায়মন্ডহারবারে বহু সাহিত্য মনস্ক ব্যক্তিত্ব তথা সাহিত্যসেবী, কবি , নিজেদের চর্চার  সাথে সাথে এলাকার উৎসাহী মানুষদের  যেমন কাছাকাছি হয়েছেন তেমনই আন্তরিক সহৃদয়তায় কাছে টেনেছেন এলাকাবাসীকে।
                      সাতের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ডায়মন্ডহারবারে নেহরু যুব কেন্দ্রের অধিকর্তা হয়ে এলেন কবি বাসুদেব দেব ।কিছুদিনের মধ্যেই তিনি তাঁর বিভিন্ন কার্যক্রমে পরিচিত ও আপনজন হয়ে উঠলেন সকলের।তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত কালপ্রতিমা ঘিরে গড়ে উঠলো এক অনাস্বাদিত উন্মাদনা । বাসুদেব দেব এর প্রথম কাব্যগ্রন্থ রৌদ্রের ভিতরে চিঠি।পরবর্তীকালে  তাঁর আরও বহু কাব্যগ্রন্থ, উপন্যাস, ছোটগল্প,নির্বাচিত কবিতা,কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধগ্রন্থ 'কবিতা কালপ্রতিমা '  প্রকাশিত হয়েছে ।এলাকার  কবি- সাহিত্যিকগণ তো বটেই, সাহিত্য মনস্ক বিভিন্ন মানুষের সমাগম ঘটত তাঁর দরবারে । তাঁর আন্তরিক আহ্বান উপেক্ষা করতে পারতনা কেউই।ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্য চর্চার ইতিহাসে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য ।
              একই সাথে স্থানীয় বাসিন্দাএবং সর্বজন শ্রদ্ধেয়  চিকিৎসক অরুণ  বসুর নামও  অবশ্যই  উল্লেখযোগ্য ।চিকিৎসা তাঁর পেশা হলেও আপাদমস্তক সাহিত্য নেশায় ভরপুর থাকতেন সবসময় । ডাক্তার  অরুণ বসুর সম্পাদনায় এবং  অনিল দত্ত প্রমুখের সহযোগিতায় 'ঋত্বিক' নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয় । পত্রিকার বন্দিমুক্তি সংখ্যা বিশেষ উল্লেখযোগ্য  সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল ।তাঁর বাড়ির     বৈঠকখানাও সাহিত্য আলোচনার জন্য সর্বদা উন্মুখ হয়ে থাকত যেন ।বৈঠকখানার দরজা  উন্মুক্ত থাকত বরাবরই কবি ,সাহিত্যিক ,সঙ্গীত শিল্পী , বিদ্বৎজনদের সঙ্গ লিপ্সায়।কখনো কখনো  সন্ধ্যায় চেম্বার সেরে তিনি উপস্থিত হতেন কবি বাসুদেব দেব এর বাসায়,কখনোবা নিজের বৈঠকখানায় আহ্বান করতেন ইচ্ছুক উৎসাহীজনদের সাহিত্য আলোচনার আসরে ।তাঁর মেধার মননঋদ্ধ স্বরূপ অনায়াসে ঝরে পড়ত সভাস্থলে। কি অপরূপ ,পরিশীলিত  শব্দ চয়ন এবং বাক্যবন্ধ তৈরির মুন্সিয়ানা তাঁর বক্তব্যে প্রতিফলিত হতো তা ব'লে বোঝানো যায় না ।এরকম সাহিত্য রসিক,কবিতাপ্রেমী মানুষ বিরল।অরুণ বসু নিজে কবিতা লিখতেন, অনুবাদ করতেন বিদেশি কবিতা ।কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধও লিখতেন।
                   তাঁর কাকা বিভুপ্রসাদ বসু এক পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব।তিনি সরিষা রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমের সাথে যুক্ত ছিলেন । বিভুপ্রসাদ কবিতা রচনাসহ  সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ লিখতেন।তাঁর বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ আছে।তাঁর       সান্নিধ্য যেমন সুখদায়ক তেমনই শিক্ষাপ্রদ।তাঁর সুখ সন্নিধ্য  এক অপার্থিব অর্জন মনে করতেন কেউ কেউ ।সদা হাস্যমুখ এই মানুষটির সঙ্গ পেয়ে সমৃদ্ধ হওয়া যেত।বিদেশি সাহিত্যে সবিশেষ জ্ঞান সম্পন্ন বিভুপ্রসাদ একবার ইংরেজ  কবি টি এস এলিয়ট নিয়ে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় ডাক্তার অরুণ বসুর বৈঠকখানায় প্রজ্ঞামুখর এক বক্তব্যে মুগ্ধ করেছিলেন মনে পড়ে ।আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন অরুণ বসুও। ডাক্তার বসুর প্রাজ্ঞ শ্বশুর মশাইও সেই আসরে তাঁর অসাধারণ বক্তব্যে মুগ্ধ করেছিলেন ।
                  সঙ্গীত শিল্পী ছন্দা বসু পরিচয়ে ডাক্তার অরুণ বসুর সহধর্মিণী ।শান্তি নিকেতন কন্যা ছন্দা বসু প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী শান্তিদেব ঘোষের ছাত্রী।তাঁর অসাধারণ মাদকতাভরা খালি গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত অনুষ্ঠানের উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে তুলত।
              বিভুপ্রসাদ বসু বাস করতেন ডায়মন্ডহারবারের নিকটবর্তী সরিষায় ।সরিষা রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমের সাথে যুক্ত  অকৃতদার এই মানুষটি অত্যন্ত যত্ন নিয়ে সম্পাদনা করতেন 'বসুধারা 'নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা ।মেদবহুল ওই পত্রিকার প্রত্যেক সংখ্যায় কবি লেখকদের রচনার মুখবন্ধে সংক্ষিপ্ত এবং ঋদ্ধ আলোচনায় ভরা থাকত ।পত্রিকায় স্থানীয় লেখক কবিদের সাথে বাংলা সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত প্রথিতযশা  কবি সাহিত্যিকদের রচনাও যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রকাশিত হতো ।
     ডাক্তার অরুণ বসু সাহিত্য রসিক অত্যন্ত সজ্জন মানুষ ।তাঁর মনের কোণে সর্বদা জিইয়ে রাখতেন সাহিত্যের রসধারা।সেই রস রসদ হিসেবে সঞ্চারিত হতো উৎসুক জনের হৃদয়ে।অরুণ বসুর সম্পাদনায় বসুধারার বিভুপ্রসাদ বসু সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল বিভুপ্রসাদ এর প্রয়াণের পর ।সম্পাদনায় সহযোগিতা করেছিলেন দীপক হালদার এবং রফিক উল ইসলাম ।
                             একবার তো ডাক্তার অরুণ বসু তাঁর বাড়ির পাশের মাঠে সম্পূর্ণ নিজের খরচে দুদিন ধরে রবীন্দ্র স্মরণ ,তৎসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সাহিত্য আলোচনার ব্যবস্থা করলেন।যা সেসময় বিশেষ উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল। সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে এইসব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অক্সিজেন জোগায় ।মনে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে ।পথের রেখা তৈরি হয় নিত্য নতুন ।
                            কবি বাসুদেব দেব যতদিন ডায়মন্ডহারবারে ছিলেন ততদিন ডায়মন্ডহারবারে সাহিত্যচর্চার উন্মাদনা লক্ষ্য করার মতো ।প্রত্যহ সন্ধ্যায় তাঁর বাসায় যে সাহিত্যবাসর বসত সেখানে উপস্থিতি ঘটত আরও বিশেষ এক মানুষের ।তিনি অনিল দত্ত ।রাজনৈতিক কর্মী এই মানুষটির কন্ঠসম্পদ অসাধারণ ।সুন্দর আবৃত্তিতে একেকদিন ভরিয়ে তুলতেন সান্ধ্য সাহিত্য বাসর।সাহিত্য আলোচনাসভা অন্য এক মাত্রায় মাত্রায়িত হতো সেসময় ।ওই সভায় মাঝে মাঝে আসতেন অধ্যাপক সুনীলরঞ্জন বশিষ্ঠ ।রসায়ন তাঁর বিষয় হলেও সাহিত্যের রসাস্বাদনে সমান উৎসাহী ছিলেন তিনি ।কখনও কখনও ডাক্তার অরবিন্দ দাশ ।ডাক্তার দাশ রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন নিজের মতো ক'রে আন্তরিক স্বরে  ।স্বভাবতই ওই সমস্ত ঘটনাপ্রবাহ সাহিত্য পিপাসু মনে বিশেষ রেখাপাত করত,কল্পনার জগতে জাদু ছোঁয়ায় দোল লাগাত নবীন স্পন্দনের ।
                বাসুদেব দেব ডায়মন্ডহারবারে থাকাকালীন ডায়মন্ডহারবারে ম্যাজিসেট্রট হয়ে এলেন কবি তপন বন্দ্যোপাধ্যায় ।'বাংলার মুখ' নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন তিনি ।যতদূর মনে পড়ে  তাঁর 'ভাবনায় সাম্প্রতিক শব্দাবলী 'নামেএকটি কাব্যগ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে তখন ।প্রকাশ পেয়েছে আরও একটি কবিতা গ্রন্থ 'বাবা দক্ষিণ রায়ের গুলগুলি চোখ '।কাব্যগ্রন্থের নামটি তাঁকে অনেকটা পরিচিতির আলোয় নিয়ে এলো।তাঁর প্রথম উপন্যাস 'সাইবেরিয়ার হাঁস' কাকদ্বীপে কর্মরত অবস্থায় লেখা ।উপন্যাসটি গীতা মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত রূপসা পত্রিকায়  প্রকাশিত হয়েছিল ।সে সংবাদ আমরা পেয়েছিলাম ডায়মন্ডহারবারেই,দেখেছিলাম পত্রিকাটি ,যেহেতু ডায়মন্ডহারবারে ছিলেন তিনি । তাঁর বসার ঘরে মাঝে মাঝে সন্ধ্যায় আড্ডা বসত আমাদের ।কবিতা পাঠ এবং আলোচনাও হতো ।বর্তমানে অবশ্য তাঁর উপন্যাসের সংখ্যা শতাধিক ।কাব্যগ্রন্থ,  উপন্যাস,রহস্য উপন্যাস,  গোয়েন্দা গল্পও গোয়েন্দা উপন্যাস,  রম্যরচনা, ভ্রমণকাহিনী,ছোটদের উপন্যাস ও গল্প, অনুবাদ সাহিত্য সমস্ত দিকেই তাঁর অবাধ বিচরণ ।এককথায় সব্যসাচী লেখক বলা যায় তাঁকে ।তপনদা অত্যন্ত সদাশয় মানুষ বলে পরিচিত ছিলেন ।তাঁর বাসায় আলোচনা সভায় স্থানীয়  কবি,গল্পকার ,ঔপন্যাসিকও থাকতেন ।তপনদা ডায়মন্ডহারবারে থাকাকালীন এসেছেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়,কবি অমিতাভ  দাশগুপ্ত। অমিতাভদার সাথে স্থানীয় কবি- সাহিত্যিকদের নুরপুরে যাওয়া, লঞ্চ ভ্রমণ এবং লঞ্চে কবিতা  পাঠ, অমিতাভদার গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত ও কবিতা পাঠ এক দারুণ অভিজ্ঞতা ।এসেছেন কবি শম্ভু রক্ষিত ।বড়ো স্মৃতিময় সেইসব দিন, দিনের ঘটনাপ্রবাহ ।
                           একবার এক সকাল বেলাতেই তপনদার বাসায় এসে হাজির হলেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় ।স্থানীয় ফৌজদারি কোর্টে ঢোকার মুখে জিলা পরিষদের বাংলোতে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করলেন তপনদা ।তপনদা স্থানীয় কবি- গল্পকারদের ডেকে পাঠালেন সেখানে ।দুপুরে হাজির হলাম আমরা ।বিকেলে কলকাতায় ফেরার পথে স্টেশন বাজারে একটি ষাঁড়ের লেজ ধরে টানাটানি করতেই ষাঁড়টি ক্ষেপে গিয়ে বাজারের দোকানদারদের দোকানে ঢুকে পড়তেই তাঁরা শক্তিদার দিকে তেড়ে আসেন।কোনোক্রমে স্থানীয় দোকানদারদের থেকে রেহাই করে তাঁকে ট্রেনে যাবার কথা বলায় এবং তিনি সম্মতি জানানোয়  টিকিট  কাটা হ'লেও তিনি রাজি হলেন না ট্রেনে যেতে ।শেষে অনেক কর্মকাণ্ডের পর তাঁকে ছিয়াত্তর নম্বর বাসে তুলে দেওয়া হয় ।ভারী মজার সেইসব ঘটনা।
             এইসব ঘটনাপ্রবাহের প্রায় সম সময়ে ফুটফুটে এক তরুণ ডায়মন্ডহারবারে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ- এ অফিসার হিসেবে কাজে যোগ দিলেন ।নুনগোলাস্থিত ওই অফিসের কাছাকাছি ডায়মন্ড ক্লাবের উজ্জ্বলমুখ প্রণব রায় ওরফে বাবলু তাঁর সাথে আমাদের আলাপ করিয়ে দিলেন ।তরুণ অফিসারটির নাম গৌরীশংকর দে,কবিতা লেখা তাঁর নেশা ।ফলে তাঁর সাথে আমাদের ভাব জমে উঠতে দেরী হলনা ।গৌরীশংকর ডায়মন্ডহারবার থেকে প্রকাশ করলেন একটি অণু কবিতা পত্রিকা ।নাম 'অ্যাপোলো '।কয়েকটি সংখ্যার পরে বন্ধ হয়ে যায় অ্যাপোলো ।যতদূর মনে হয় গৌরীশংকর বদলি হয়ে গিয়েছিলেন অন্যত্র তাই পত্রিকা প্রকাশে বিরতি।
আটের দশকে ডায়মন্ডহারবারে পোস্টমাস্টার হয়ে এলেন আরেকজন সাহিত্য মনস্ক মানুষ, নাম পার্থ দাস।বামপন্থী পার্থ কবিতা এবং সাহিত্যপ্রেমী হওয়ায় তাঁর মধুর সঙ্গ পেতে থাকলাম আমরা ।প্রায়শই জুটতে থাকল তা।একবার পার্থর আয়োজনে ডায়মন্ডহারবার পোস্ট অফিসের ওপরে রিক্রিয়েশন ক্লাবঘরে সারারাত ধরে এক কবি সম্মেলন ও সাহিত্য আলোচনার ব্যবস্থা হয়।
ডায়মন্ডহারবারে ছিলেন আরও এক বয়োজ্যেষ্ঠ কবি ব্যক্তিত্ব, নাম রবি চক্রবর্তী ।বাম আদর্শে বিশ্বাসী এই মানুষটির সরল সহজ জীবনযাপন এবং ব্যবহারে আমরা অনুজরা মুগ্ধ ও খুশি হতাম ।ওইসময়ে বোধকরি ডায়মন্ডহারবারে গণতান্ত্রিক লেখক কলাকুশলী সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়।পার্থ দাস সহ আমরা অনেকেই ওই সংস্থার সাথে যুক্ত হই।পরে কেন সে যোগাযোগ ছিন্ন হলো মনে পড়েনা।তবে ওসময়ে একটা অনাস্বাদিত উত্তেজনা কাজ করত ভিতরে ভিতরে ।
                      কখনও কখনও কলকাতা থেকে আসতেন কবি মানস রায়চৌধুরী,  কাকদ্বীপ থেকে আসতেন কবি সামসুল হক,  কাকদ্বীপে বি ডি ও থাকাকালীন কখনও কখনও আসতেন কবি তপন বন্দ্যোপাধ্যায়, কখনো বা মেদিনীপুর থেকে কবি সম্পাদক  মদনমোহন বৈতালিক,কবি শ্যামলকান্তি দাশ, কবি রতনতনু ঘাটি,কবি শোভন মহাপাত্র,   অনুরাধা মহাপাত্র প্রমুখ বিশিষ্টজন ।আসতেন কবি  ওয়াজেদ আলি, কবি পূর্ণচন্দ্র মুনিয়ান, কবি ইন্দ্রনীল দাস,কবি পূর্ণেন্দু ভরদ্বাজ । আর আমরা  ডায়মন্ডহারবারের কয়েকজন তাঁদের সঙ্গসুধা পান করতাম গভীর আনন্দে,  সুগভীর একাত্মতায়। সে এক অভিনব আনন্দদায়ক সম্মিলন, এক আশ্চর্য সময় ।মনে পড়লে মন রোমাঞ্চিত হয়,কত সুন্দর স্মৃতিবহ ঘটনা জড়ো হয় চোখের সামনে । আশ্চর্য এই, আজ এতো বছর পরেও সেসব ঘটনা  সমান প্রাণবন্ত, সমান উজ্জ্বল ।সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে এসবের মূল্য অসামান্য ।


ছবি  : বিধান দেব 

ধারাবাহিক গদ্য ।। অভিজিৎ দাশগুপ্ত



সাধনপর্বের নির্জনতা



১৩.

ব্যক্তিগত ধাঁধা
লােলচর্মা এক বৃদ্ধাকে একবার আমি
শিয়ালদার ভয়ঙ্কর রাস্তা পার করে দিয়েছিলুম। অসাবধানে উঁচু থেকে পড়ে যাওয়া একবার এক
চড়ুই-বাচ্চাকে তার কাতর মায়ের কাছে
              পৌঁছে দিয়েছিলুম ।
বহুদিন আগে আমাদের ক্লাসের এক গুণ্ডা ছেলে স্ট্রাইকে না যাওয়াতে আমাকে ঘুসি মেরেছিল পরদিন শিক্ষকের প্রশ্নেও তার নাম বলিনি
টিফিনে তাকে ঘুগনি খাইয়েছিলুম।
নেংটি ইঁদুররা আমার নারক শত্রু ইদানীং
আমার রাতজাগা সঙ্গী বই কেটে তছনছ করে, তাই খাঁচায় ফাঁদ পেতে তাদের ধরি
   হত্যার মুহূর্তে তাদের ছেড়ে দিই
আমি যে কেন এরকম বুঝতে পারি না
বয়েস হয়েছে বলে কি রাগ কমে গেল
আমি তাে সব সময়ই মারপিট ভয় করি
     মৃত্যু ভয় করি
কেন যে এই ধরনের চরিত্র আমার
                            বুঝতে পারি না ।

সুনীল বসুর ' নক্ষত্রের সাইকেলে অনন্ত ব্রহ্মে ' কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতা এটি । সহজ স্বীকারোক্তি। ব্যক্তিগত এই ধাঁধা প্রতিটি মানুষের মধ্যে কম বেশি আছে ।  ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক । এখানে কবির  ব্যক্তিগত ধাঁধা ইতিবাচক ।  ঠিক এর
বিপরীত হত, যদি সেটা নেতিবাচক রূপ ধারণ করতো ।  অর্থাৎ শিয়ালদার ভয়ঙ্কর রাস্তা পার করে দিতে অরাজি কবি বৃদ্ধার অনুরোধ উপেক্ষা করলেন। অথবা চড়ুই বাচ্চাকে তার পাখি মাতার কোলে ফিরিয়ে দিলেন না । হত্যার মুহূর্ত দীর্ঘায়িত করে ইঁদুরগুলোকে নরকযন্ত্রণা দিতেন তিনি। অর্থাৎ ভালো - খারাপের দ্বন্দ্ব । যে উদ্দীপনা জীবন  চালিত করে তাকে মান্যতা দেয়।

আসলে আমরা তো অল্পে খুশি , অল্পেই আবেগপ্রবণ, সামান্য কারণেই রেগে যাই । কিন্তু আত্মবিস্মৃতির এই সময়ে দাঁড়িয়ে কবি সুনীল বসু যেন আমাদের ভারত আত্মার সন্ধান দিয়েছেন । যে আত্মা একদিন জলধি মন্থন শেষে ঘোষণা করেছিল 'বসুধৈব কুটুম্বকম' । পৃথিবী একটি পরিবার  । আজ যখন নিজেদের দিকে এতদিন পর তাকাবার সময় এসেছে , তখন সেই 'আত্মীয়তা ' আর খুঁজে পাচ্ছি না কেউ । সকাল-বিকাল হত্যা হিংসা ক্রোধের আগ্নেয়  ফাঁদ । ' বিশ্বাস'  শব্দটি উঠে যেতে বসেছে। ঘুষি মারা বন্ধুকে ঘুগনি খাওয়ানো বা  শিক্ষকের কাছে তার নাম না বলার মধ্যে এক ধরনের সাহস আছে ।  এই শক্তি বা সাহস নৈতিক ।  যাকে আমরা 'নৈতিক বল ' বলে থাকি।

বয়স হলে আমরা নিজেদের খোঁজে নামি ।  সে অতলান্ত পথ ।  একাকী সেখানে যেতে হয় ।  ক্ষুদ্র আমিকে নিয়ে বৃহৎ আমির ভেতর প্রবেশ করার নামই নিজেকে জানা বা নিরন্তর খুঁজে যাওয়া ।  কিন্তু এই কবিতায় সমস্ত জীবনের কথা বলা হলো । নিরন্তর এক চলা -ধর্ম । স্কুল থেকে বার্ধক্য ।  'মৃত্যু ভয়' তাকে পেরে ফেলে ।  তিনি প্রতিবাদ করতে ভুলে যান । কিন্তু এটুকু বলে থেমে গেলে অর্থের
একদেশীকরণ হয়ে যাবে ।  আসলে , মৃত্যু ভয় আছে।  কিন্তু তা শুধুমাত্র কবির একার নয়।  তা ওই লোলচর্ম  বৃদ্ধা  বা  চড়ুই পাখির বাচ্চাটিরও। কারণ জনবহুল শিয়ালদার ভয়ঙ্কর রাস্তা পার হতে গিয়ে বৃদ্ধার যদি কিছু একটা হয়ে যায় ।  আবার একই কথা চড়ুই- বাচ্চাটার ক্ষেত্রেও খাটে ।  মা হারা হলে সে যে মারা যাবে ।  তাকে তখন কে করবে দেখাশোনা ।  নেংটি ইঁদুরের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা, তা আমরা বুঝতে পারি।

তাহলে কি হলো ।  কবি শুধু নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে চান না এই জল -মাটি -বাতাসের সবুজ জগতে । বরং মানবের সংস্কৃতি ধারণ করে তিনি ফিরে যেতে চান সেই অতীত সময়ে , যখন তপোবনের ঋষি আত্মদীপ প্রজ্বলিত করে গ্রহণ করে নিতে পারেন গোত্রহীন পিতৃপরিচয়হীন জবালার পুত্রকে । এখানেই মনুষ্যত্ব , এখানেই প্রাণের ধর্ম ।  তাকে অস্বীকারের অর্থ নেতিবাচক দিকগুলোকে উন্মোচনের রাস্তা তৈরি করে দেওয়া ।  তা হয় না কখনোই।


১৪.

স্পর্শ
অন্য কারো স্পর্শের আশায়
   শূন্যে অন্ধের মতো হাত বাড়িয়েছিল
কিন্তু নিজেকে স্পর্শ করে সেই হাত ফিরে এসে   
                 হতাশায় ভেঙে পড়ে ।
স্বপ্নের মধ্যে এভাবেই প্রথম রজস্বলা হয়ে ওঠে 
                                               হেনরি ।

একজন মানুষের ইন্দ্রিয়পরতন্ত্র হয়ে থাকার কথাই বলা হচ্ছে যেন । অন্তত পাঁচটা পংক্তি পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মত কবির  কামনা- বাসনাকে উস্কে দিয়েছে সযত্নে। কিন্তু কেন এই স্পর্শ ? কেন এই অন্ধের  হতাশা? উপনিষদ বলছে , অভেদজ্ঞানে যিনি  দ্বৈতসত্ত্বাকে জানতে পারেন , তিনি সবসময় আনন্দের মধ্যেই অবস্থান করেন ।  অসৎ  অবস্থা থেকে  সৎ  অবস্থায় জগৎ  একদিন উপনীত হলো ।  নাম এবং রূপকে আশ্রয় করেই জগতের সেই নির্বিশেষ থেকে সবিশেষে যাত্রা।

আমরা প্রতিটি পলে এমন কাউকে চাই যে আমাকে ছুঁয়ে থাকবে । তার স্পর্শের আশায় একটা গোটা জীবন কেটে যায় কারো কারো ।  এই স্পর্শ কি শুধুই বাহ্যিক ? নাকি স্পর্শের আন্তরিকতাটুকুকে কবি পেতে চেয়েছেন প্রিয়জনের কাছ থেকে ।  অমিতাভ মৈত্র বাংলা কবিতার সেই সমস্ত স্বরের  প্রতিনিধিত্ব করেন , যাঁরা মেধাবী এবং একই সঙ্গে শব্দের অন্তর্গত সৌন্দর্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ।  এখানে প্রকরণ বা প্রকাশের শৈলী থেকে বড় হয়ে উঠেছে 'হেনরি' নামে এক যুবকের প্রতি কবির  গভীর আকর্ষণ ।  তিনি হেনরীকে জানেন ।  হেনরি তাঁকে জানেন । এবং চেনেন ! হয়তো !

নিজেরাই নিজেদেরকে কষ্ট দিয়ে , যন্ত্রণা দিয়ে আনন্দ পায় ---- এমন মানুষ এই সমাজে রয়েছে। তাতেই তাদের আনন্দ ।  আবার এমনটাও দেখা
যায় , সেই আনন্দ গ্রহণ করতে করতে অথবা নিজেকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দিতে দিতে ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়ে ।  তার কাছে ইহজগৎ বলে কিছু থাকেনা। মনের আকাঙ্ক্ষাকে পথ দেখাতে দেখাতে ওই অন্ধের মতোই একসময় সে 'হতাশায় ভেঙে পড়ে'। আসলে সে তো মর্ষকামী নয় ।  সে নিজেকে ভালোবাসে ।  আবার একই সঙ্গে ভালোবাসে অন্য কোন জীবনকে।

স্বপ্ন এমন এক মানসিক অবস্থা যা চেতন-অবচেতনের ব্যবধান ঘুচিয়ে দেয় ।  বলা হয়, স্বপ্ন হলো মানুষের গোপন আকাঙ্ক্ষা ।  যে ইচ্ছাগুলির বহিঃপ্রকাশ ঘটে চূড়ান্ত এক আবেগ মুহূর্তে ।  সেই আবেগ তখন নারী-পুরুষের ভেদ বুঝতে সক্ষম হয় না ।  তা না হলে , কবি কেন বলবেন , ' স্বপ্নের মধ্যে এভাবেই প্রথম রজস্বলা হয়ে ওঠে হেনরি। '

'রজস্বলা ' শব্দটি নারী থেকে প্রতীক রূপ গ্রহণ করে কৃষিকাজে অনুপ্রবেশ করে সেই অতীতে । বৃষ্টির প্রথম স্পর্শে জেগে ওঠে জমি ।  নারীও তৈরি হয় রজস্বলা পরবর্তী  সময়ের  জন্য। তাই কৃষক লাঙ্গল দিতে দিতে আজও বলে ওঠে ----
"নাগর কোথায় রইলা রে
জল লেগেছে তোমার বাকুড়িতে। "

ধরিত্রীর মতো নারীও রজস্বলা হয়। আর তা অতীতের ঘটত পতিগৃহে ( গওনা ---- বিবাহিত নারী
দ্বিতীয় বার স্বামীর কাছে যাওয়া)। বর্তমানে সমাজ পাল্টেছে ।  আজ  আর নারীর পতিগৃহে যেতে হয়
না ।  বরং পিতৃগৃহে তার কুসুমের মাস উদযাপিত
হয় ।  কিন্তু হেনরি ? সে কিভাবে রজস্বলা হবে। একজন পুরুষের (যদি হেনরি পুরুষের নাম হয়) পক্ষে তা সম্ভব নয় ।  তবে কি , বৈষ্ণব দর্শনের সেই কথা আমাদের আজ মানতে হবে । যেখানে বলা হচ্ছে , এই জগতে কৃষ্ণই একমাত্র পুরুষ , আর সকলেই নারী ।  রাধা ভাবে তন্ময় চৈতন্যদেব যার সার্থক রূপ ।  বৈষ্ণব কবি পাতায় পাতায় লিখে গেছেন অনুরূপ প্রেম -ভক্তি কথা।

আমাদের অবচেতনে যে স্পর্শ , তার মধ্যে
'হেনরি'-র মতোই রজস্বলা হয়ে ওঠা এক শূন্য সময়ও  রয়েছে।
        

ছবি : বিধান দেব 

ধারাবাহিক গদ্য ।। অরিন্দম রায়


 ভিনদেশি  তারা



জর্জ কে

ছিল রুমাল হয়ে গেল বিড়াল! হতে চেয়েছিলেন আইনজীবী হয়ে গেলেন কবি । স্কটল্যান্ডের উত্তর-পূর্বের বাসিন্দা এই কবি ২০০২ সালে পেয়েছেন পোয়েট্রি স্লাম পুরস্কার। তাঁর একটি দীর্ঘ কবিতার অনুবাদ থাকল বেলাভূমির পাঠকের জন্য।

 

কে বানিয়েছিল?

 

কে বানিয়েছিল আগুন, কে বানিয়েছিল চাকা?

কে বানিয়েছিল মাটির পাত্র, কে বানিয়েছিল স্টিল?

 

কে গাছের ডালপালা দিয়ে বর্শা বানিয়েছিল?

এ সব কিছু আমাদের ভয় কমানোর জন্য?

 

কে বানিয়েছিল আশ্রয় , কে বানিয়েছিল ঘড়ি?

কে বানিয়েছিল ক্যালেন্ডার আর কে কথা বলতে শিখিয়েছিল?

 

কে বানিয়েছিল ভাষা , কে বানিয়েছিল গান?

কে আমাদের দেখতে শিখিয়েছিল ন্যায়ের থেকে অন্যায়?

 

কে বানিয়েছিল সাম্রাজ্যগুলো , কে বানিয়েছিল রাজাদের?

কে বানিয়েছিল তরবারি একে ওকে মারতে ?

 

কে বানিয়েছিল শহরগুলো , কে বানিয়েছিল আইন?

কে বানিয়েছিল নিখুঁত , কে বানিয়েছিল ত্রুটি?

 

কে বানিয়েছিল লিরিকস আর পাঠ্যবইয়ের লাইন?

কে বানিয়েছিল কামতাড়িত নিম্ফোম্যানিয়াকদের?

কে বানিয়েছিল অনাহার , কে বানিয়েছিল ফসল?

কে বানিয়েছিল কর্পোরেট সেই ফসলের মাথা কেটে নিতে?

 

কে বানিয়েছিল যন্ত্রপাতি , শিকল আর দাস ?

কে বানিয়েছিল নিয়ন্ত্রণের যত নিয়মকানুন?

 

কে বানিয়েছিল?

তুমি বানিয়েছিলে

আমি বানিয়েছিলাম

কারন আমরা মানুষ …

 

কে বানিয়েছিল ওয়াইল্ড-ওয়েস্ট , কোল্ট ফরটি ফাইভ?

কে বানিয়েছিল এমন নিয়মে যাতে শুধু শক্তিশালীই বাঁচে?

 

কে বানিয়েছিল কামান , কে বানিয়েছিল বন্দুক?

কে বানিয়েছিল ‘বড়ো , আরও ভালো একটা’

 

কে বানিয়েছিল স্মার্ট বোমা, কে বানিয়েছিল আবোদা?

দেশের পরে দেশ , কে রাখল বুড়ো আঙুলের নিচে?

 

কে বানিয়েছিল নিউকস , পারমানবিক বই?

কে বানিয়েছিল গজ , ঘোড়া আর নৌকোগুলো ?

 

কে বানিয়েছিল ট্যাঙ্ক আর নিউক্লিয়ার সাবমেরিন?

কে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল যত পাবলিক বার?

 

কে বানিয়েছিল ভি.আর. টিভি সেট ?

কে বানিয়েছিল জবড়জং হুমকি ?

 

কে লাখ লাখ টাকা বানিয়েছিল খনিজ তেল বেচে?

কে পৃথিবীকে বসিয়ে ছিল তপ্ত কড়ার উপর?

 

কে বাধ্য করেছিল আরমাগেডনকে যাতে সে ওৎ পেতে থাকে

কে বানিয়েছিল ক্যাপ্টেন কার্কের হাড়গোড়?

 

কে মহাকাশের বুকে বানিয়েছিল ক্যাপসুল?

কে বানিয়েছিল?

 

বানিয়েছিল মানুষ ।

 

কে বানিয়েছিল?

তুমি বানিয়েছিলে

আমি বানিয়েছিলাম

আমরা বানিয়েছিলাম

কারন আমরা ছিলাম মানুষ …


ছবি : বিধান দেব 

ধারাবাহিক গদ্য ।। চন্দন মিত্র


জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন গল্পের অমায়িক                   ভুবন

                                           


দ্বিতীয় আচার্য হুইকে : এক নাছোড়বান্দা                             সন্ধিৎসু  

হুলিয়া দেখলে আর যা জন্মাক, ভক্তি-শ্রদ্ধা যে জন্মাবে না সে বিষয়ে সংশয় না-রাখাই ভালো। দশাসই চেহারা, যেমন লম্বা তেমন চওড়া ; মাথার সামনের দিকে চুল নেই প্রশস্ত ললাট, মুখময় গোঁফদাড়ির জঙ্গল ; লাটিমের মতো অক্ষিগোলক— সবমিলিয়ে একেবারে বীভৎস রসের সমাহার। এহেন মূর্তিমান বিভীষিকাকে কেই বা ঘাঁটাতে চাইবে! এমন চেহারার সুবিধা এই যে, কখনও হাতাহাতির প্রয়োজন পড়ে না, খুব বেশি হলে একটা হুংকারই যথেষ্ট। শাওলিন মঠের সন্ন্যাসীরা প্রথমে ভেবেছিল নিছক খ্যাপাটে ভবঘুরে হবে বোধহয় ; কিন্তু পরে বুঝল এই উদ্ভট-হুলিয়ার আগন্তুককে মাপার মতো পর্যাপ্ত ফিতে তাদের নেই। কয়েক মুহূর্তেই তাদের মুখগুলি অশালীন মুখরতা হারিয়ে ম্লান ও জবুথবু হয়ে পড়ে। এক অভূতপূর্ব সমীহের ভারে তারা ন্যুব্জতার আড়াল নিতে বাধ্য হয়। আগন্তুক আর কেউ নয় বোধিধর্ম, পাঠক আপনি তা ইতোমধ্যে বুঝে গেছেন। বোধিধর্ম, শাওলিন মঠে গিয়েছিলেন বুদ্ধভদ্রের স্মৃতিকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য।  অতঃপর মঠ থেকে বেরিয়ে কিছু দূরে পেলেন একটি মনোমতো গুহা। ব্যাস, ধ্যানে বসে গেলেন , তবে একটু অদ্ভুতভাবে  গুহার দেয়ালের দিকে মুখ করে। অচিরেই সেই অত্যাশ্চর্য ধ্যানের কথা বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। অত্যুৎসাহী কেউ কেউ বিরক্ত করতে বা আলাপ জমাতে গিয়ে যারপরনাই ব্যর্থ হল। আসলে তাঁর মুখ কেউ দেখতে পাচ্ছে না। তিনি তো গুহার দরজার দিকে পিছন ফিরে বসে আছেন! তিনি ধ্যানাসীন না এমনি বসে আছেন, বিরস বদনে না প্রসন্ন বদনে আছেন, বোঝার কোনও উপায় নেই।  দর্শনার্থীদের ভিড় কমতে কমতে প্রায় বিরল হয়ে যায়। বোধিধর্ম কি কারও জন্য অপেক্ষা করছিলেন! কোনও নথি এর কোনও উত্তর দেয় না। তবে আমাদের মনে হয়, তিনি অবশ্যই যোগ্য উত্তরসূরির সন্ধানে ছিলেন। কারণ গুরুবাদী ধারায় উপযুক্ত উত্তরসূরির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কথায় বলে— গুরু মিলে লাখে লাখ, শিষ্য মিলে এক । সেই অলোকসামান্য শিষ্যের সন্ধানে সদগুরু তো জীবনপাত করবেন, যার   হাত ধরে গুরুর কাছ থেকে পাওয়া ধারাটি অনন্তকালের দিকে এগিয়ে যাবে। এক-দু বছর নয় বোধিধর্মকে নয় বছর অতিবাহিত করতে হয়েছে উপযুক্ত আধারের সন্ধানে। 



          বয়স চল্লিশ ছুঁইছুঁই। কিন্তু বয়সকে নিছক বয়ে যেতে দেননি শেন কুয়াং। জ্ঞান হওয়ার পর  থেকেই জ্ঞানানুসন্ধানকেই জীবনের ব্রত হিসাবে বেছে নিয়েছেন তিনি। একদিনও হেলায় না-হারিয়ে প্রকৃত গুরুর সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন মঠে-মঠে।হেনান প্রদেশের হুলাও নগরের এক সাধারণ পরিবারে ৪৮৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জন্ম। অধিকাংশ ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের মতো কুয়াং-এর জন্মবৃত্তান্তও অলৌকিকতামণ্ডিত। তাঁর বাবা-মা সন্তানলাভের কামনায় বুদ্ধের কাছে প্রার্থনা শুরু করেন। একদিন রাতে তাঁরা শয়নকক্ষে এক অপার্থিব জ্যোতি লক্ষ করেন। আর কয়েকদিন পরে বুঝতে পারেন তাঁদের পরিবারে এক নতুন অতিথির আগমন ঘটতে চলেছে। পুত্রসন্তান জন্ম নিলে তাঁরা নাম রাখলেন— কুয়াং অর্থাৎ আলো। বাল্যকাল থেকেই কুয়াং আপনভোলা প্রকৃতির। কৈশোরে পৌঁছে সে গান গাওয়া, কবিতা লেখায় দক্ষ হয়ে ওঠে। গৃহস্থালির কাজকর্মের থেকে তার কাছে বেশি প্রাধান্য পায় ভ্রমণ ও পুথিপাঠ। পাহাড়-পর্বত ও নদীর সান্নিধ্যে  থাকতে তার ভালো লাগে। প্রকৃতির পরতে পরতে সে যেন কীসের অনুসন্ধানে ব্যাপৃত থাকে। পারিবারিক এমন কোনও ঐতিহ্য বা আভিজাত্য তার উপর বর্তায়নি যা তাকে অসাধারণ করে তুলতে পারে। কেবল সুতীব্র এক জীবনজিজ্ঞাসার তাড়নায় বেদম ছুটতে ছুটতে সেই কিশোর যৌবনের সীমায় পৌঁছে, কখন যে অসাধারণত্বের মহিমায় উন্নীত হয়েছিলেন তা নিজেও বুঝতে পারেননি। সমকালীন চিনের প্রায় সমস্ত ধর্মীয় ধ্যানধারণা যাচাই করে বেড়িয়েছেন কুয়াং। তাওবাদ, কনফুসিয়সবাদ, পরম্পরিত বৌদ্ধ মতবাদ  সবকিছু তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখেছেন কোথায় লুকিয়ে আছে পরমসত্য। কথায় বলে— যে খায় চিনি/ তাকে যোগায় চিন্তামণি ।  খোঁজ আন্তরিক হলে অধরও ধরা দেন। আর আলোকাভিসারী গুরু তো দেহ-বর্তিকা জ্বালিয়ে বসে থাকবেন! তাঁর দায় তো আর ন্যালাখ্যাপা গুরুদের মতো নাম,কাম বা অর্থের নয়, তাঁর দায় জগৎ ও জীবনের প্রতি। এই মহৎ পারমার্থিক দায় থেকে নিস্তার পাওয়ার এক এবং অদ্বিতীয় পথ হল, একটি যথার্থ বর্তিকা যথাসময়ে প্রজ্বলন করে দেওয়া। শিষ্যও যেমন যথার্থ গুরুকে খুঁজে চলেন, গুরুও  তেমন যথার্থ শিষ্যকে খুঁজে চলেন— গুরুবাদের এ এক মরমী লীলা! তাহলে কী বোধিধর্ম এত পথ পাড়ি দিয়ে কুয়াং-এর জন্যই চিনে পৌঁছেছিলেন এবং কুয়াংও অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে বোধিধর্মের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন! বিষয়টা এমনভাবে দেখে ফেলতে পারেন নিয়তিবাদীরা। বস্তুনিষ্ঠ দিক থেকে দেখলে ঘটনা কিন্তু এইটুকু বোধিধর্ম ও কুয়াং-এর দেখা হওয়া। যতটা  সহজে দেখা হওয়া  লিখে ফেললাম বিষয়টা কিন্তু ততটা সহজ ছিল না। 

         বোধিধর্মের দেয়ালমুখো ধ্যানের খবর পেয়ে কুয়াং আর দেরি করেননি। ভেবেছিলেন সেই আশ্চর্য  সন্ন্যাসীর সঙ্গে বাক্যালাপ করে পথশ্রমের ক্লান্তি দূর করবেন। বাক্যালাপ তো দূরের কথা মুখদর্শনই করতে পারছেন না। তাহলে কী তাঁর এত ব্যাকুলতা, এত আকুতি সব বিফলে যাবে ! কুয়াং, এত সহজে হাল    ছাড়ার পাত্র নন। বোধিধর্মের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য টুকরো টুকরো কথা হাওয়ায় ভাসিয়ে দেন,  যেগুলি আসলে তাঁর অকৈতব হৃদয়ের প্রতিভাস ছাড়া অন্য কিছু নয়। কিন্তু কথাগুলি আদৌ উদ্দিষ্ট ব্যক্তির কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হচ্ছে কিনা বা হলেও তাঁর মনে প্রভাব ফেলছে কিনা তা বোঝার উপায় নেই। মুখ দেখার উপায় বন্ধ, তিনি তো দেয়ালমুখো ধ্যানে বসেছেন! এদিকে ঋতুচক্রে হেমন্তের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে, শুরু থেকেই শীত তার শানিত দাঁতের কামড় বসাতে শুরু করেছে। দিনের বেলাটা তবু সহ্যসীমায় থাকে, কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় তুষার-পতন। এক-কোমর তুষারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকেন কুয়াং। মন্ত্রের মতো উচ্চারণ করেন প্রাণের আকুতি। শেষমেশ চূড়ান্ত এক সিন্ধান্ত গ্রহণ করেন কুয়াং। কোমর  থেকে তলোয়ারখানা খুলে ডান হাতের বজ্রমুষ্টিতে তা ধারণ করেন। তারপর এক কোপে কেটে ফেলেন নিজের বামহাতখানা। অতঃপর কাটাহাতটি বোধিধর্মের মাথার উপর দিয়ে তাঁর সামনে ছুড়ে দেন। দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে হাতটি গিয়ে পড়ে ধ্যানমগ্ন বোধিধর্মের কোলের উপর। তিনি বুঝতে পারেন তাঁর পিছনে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি নিছক উপেক্ষার পাত্র নন। বোধিধর্ম ধ্যান ছেড়ে উঠলেন। কুয়াংকে  বললেন—

বলুন, আপনি কেন আমার সঙ্গে বাক্যালাপের জন্য এতটা ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন ?   

কুয়াং— আমার মনটাকে কিছুতে শান্ত করতে পারছি না প্রভু ! আপনি দয়া করে আমার মনটাকে শান্ত করে  দিন।

বোধিধর্ম— দিন তো দেখি আপনার অশান্ত মনটাকে, আমি এখনই তাকে শান্ত করে দিচ্ছি।   

কুয়াং— প্রভু আমি তো তাকে খুঁজেই পাচ্ছি না।  

বোধিধর্ম— আরে পাবেন কী করে আমি তো তাকে শান্ত করে দিয়েছি।  

কুয়াং, এই প্রথম এক অপার শান্তির রাজ্যে প্রবেশ করেন। তাঁর যাবতীয় অনুসন্ধিৎসা এই অদ্ভুত-দর্শন আগন্তুকের সামনে এসে থমকে দাঁড়ায়, সমূহ জিজ্ঞাসার উত্তর নিয়ে যেন বসে আছেন এই মহাজন। বোধিধর্ম কুয়াংকে দিলেন এক নতুন নাম—– হুইকে, যার অর্থ চৈতন্য।         

       হুইকের এই তলোয়ার দিয়ে হাত কেটে গুরুকে নিবেদন করার প্রসঙ্গ রোমাঞ্চকর বলে বহুচর্চিত।  তবে ভিন্ন একটি তথ্যও পাওয়া যায়, তথ্যটি সাধুজীবনী (Hagiography)-র সঙ্গে সংগতি রাখতে না-পারায় তাকে বেমালুম গায়েব করার প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। বস্তুনিষ্ঠ সেই তথ্যটি হল, বোধিধর্মের সঙ্গে সাক্ষাতের অনেক আগেই ডাকাতদের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে কুয়াং তথা হুইকে তাঁর বামহাতটি হারিয়েছিলেন। সম্ভবত, হুইকের বামহাত না-থাকাকে মহিমান্বিত করে তোলার জন্য অত্যুৎসাহী কোনও রচয়িতা এমন রোমহর্ষক আখ্যান বুনে থাকবেন। আর সাধুজীবনী লিখতে বা পড়তে গিয়ে কে আর যুক্তিনিষ্ঠ থাকতে চায়!  

              বোধিধর্ম, চিনতে ভুল করেননি। হুইকে ছিলেন প্রকৃত অর্থে পণ্ডিত ও পরিশীলিত মনের মানুষ। তবে পাণ্ডিত্যের বোধ থেকে পুরোপুরি মুক্ত। হুইকে বোধিধর্মের সঙ্গে প্রায় ছয় বছর ছিলেন।এইসময় তিনি গুরুর কাছে লঙ্কাবতার সূত্রের পাঠ নিয়েছেন, শিখেছেন ধ্যানের খুঁটিনাটি ; একটি হাত নিয়ে গুরুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে কুং ফু চর্চাও করেছেন নিয়মিত। একদা বোধিধর্ম, উত্তরসূরি বেছে নেওয়ার  তাগিদ   অনুভব করেন। তিনি প্রিয় শিষ্যদের বোধ ও বোধি বিচার করে শেষমেশ হুইকের হাতেই চীবর ও ভিক্ষাভাণ্ড তুলে দেন। বোধিধর্মের ভারতে ফেরার পরে বা তাঁর মৃত্যুর পর হুইকে মতাদর্শ প্রচারে মন দেন।  নথি অনুযায়ী হুইকে বোধিধর্মের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ৫২৮ খ্রিস্টাব্দের হেমন্তকালে। আর ৫৩৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে তিনি উত্তরের ওয়েই রাজ্যের এদু (Yedu) নগরে বসবাস শুরু করেন। এইসময় উত্তরের ওয়েই রাজ্য ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দাঙ্গাহাঙ্গামায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। হুইকে তাঁর প্রথাবিরুদ্ধ মতবাদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বৌদ্ধদের চক্ষুশূল হয়ে পড়েছিলেন। আক্রান্তও হয়েছেন কয়েকবার। সুতরাং এদুতে থাকা যে  আত্মহননের সামিল তা আর বুঝতে বাকি থাকে না। হুইকে, এদু  ত্যাগ করে ইয়াংসি নদীবিধৌত দক্ষিণ আনহুই (Unhui) প্রদেশের এক গোপনডেরায় থেকে মতাদর্শ প্রচার করে যান। সেখানেও তাঁর অনুসারী জুটে যায়। একদা এখানেই তাঁর সঙ্গে পরিচিত হন জনৈক ভবঘুরে ব্যক্তি পরবর্তীকালে যিনি সেং সান (Seng Tsan) নাম নিয়ে তৃতীয় আচার্যের পদে অভিষিক্ত হবেন।

            দীর্ঘদিন অজ্ঞাতবাসের পর ৫৭৯ খ্রিস্টাব্দে হুইকে এদুতে ফিরে আসেন।এবার তাঁর অনুসারীও অনুগামীদের সংখ্যা এমন দাঁড়ায় যে, তা দেখে ধর্মজীবীরা ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। তাও হেং (Tao heng) নামের জনৈক ধর্মগুরু হুইকেকে হত্যার জন্য পেশাদার খুনি নিয়োগ করেন, কিন্তু হুইকের কথাবার্তায় সে এমন মোহিত হয়ে পড়ে যে, শেষে ক্ষমা চেয়ে ফিরে আসে। আসলে হুইকে তাঁর অকপট বক্তব্য ও  অকৈতব জীবনচর্যার জন্য সাধারণ মানুষের আপনার জন হয়ে উঠেছিলেন। তিনি পানশালা, কসাইখানা সর্বত্রই যাতায়াত করতেন।কখনও মজুরদের সঙ্গে বসেও আড্ডা দিতেন। কোনও ছুতমার্গের ধার ধারতেন  না। একবার কোনও এক উৎসবের সময় হুইকে কুয়াংকিউ(Kuangqiu) মঠের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখছিলেন। মঠের ভিতরে সেইসময় অধ্যক্ষ বিয়ানহে (Bianhe) নির্বাণসূত্র নিয়ে ভাষণ দিচ্ছিলেন।উপস্থিত শ্রোতৃমণ্ডলী যখন বুঝতে পারল, মঠের বাইরে হুইকে বক্তব্য রাখছেন, তখন তারা দল বেঁধে হুইকের চারদিকে ভিড় জমাল। বিয়ানহে নগরপালের কাছে হুইকের নামে ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ জানালেন।৫৯৩ খ্রিস্টাব্দে একজন একশ ছয় বছরের নিরপরাধ মানুষের মুণ্ডচ্ছেদ করা হল। চ্যানধারার তিনিই প্রথম শহিদ।                         

  তথ্যসূত্র : 

১. ZEN MASTERS OF CHINA : THE FIRST STEP EAST

BY RECHARD BRYAN MC DANIEL; TUTTLE PUBLICATION, TOKYO/ VERMONT/ SINGAPORE.

 ২. TRANSMISSION AND ENLIGHTENMENT IN CHAN BUDDHISM SEEN THROUGH THE PLATFORM SUTRA BY MORTEN SCHLUTTER ; TAIPEI CHUNG – HWA INSTITUTE OF BUDDHIST  STUDIES

৩. ZENS CHINESE HERITAGE BY ANDY FERGUSON ; WISDOM PUBLICATION, BOSTON

৪.   THE ILLUSTRATED ENCYCLOPEDIA OF ZEN BUDDHISM BY HELEN J. BARONI ; THE ROSEN PUBLICATION GROUP , NEW YORK    

৫. ZEN BUDDHISM : A HISTORY VOLUME 1 INDIA AND CHINA BY HEINRICH DUMOULIN ( TRANSLATED BY J.W. HEISIG AND P. KNITTER ) MACMILAN PUBLISHING COMPANY


৬. ZEN AND ZEN CLASSICS ( VOLOUME-1) BY R.H.BLYTH, THE LIOKUSEIDO PRESS. TOKYO. 



ছবি : বিধান দেব 

                 

                  


            

           

                     

        


সোমবার, ২৯ মার্চ, ২০২১

গুচ্ছ কবিতা : স্বপন শর্মা


 

অর্জুন উবাচ--১৩

সৌহার্দ্যস্থাপনে পর্যটক পথ থেমে যায় অশ্বখুরের ধ্বনিতে। স্তম্ভিত চোখ অশ্বপৃষ্ঠে দেখে স্নিগ্ধ আগুন ।এক ঈপ্সিতা আগুনের পাশে দূরাগত ঈপ্সিত। পরিচয়পর্ব শেষে এক অমোঘ মোহের কাছে  দাসখত। সব শর্ত নিঃশর্তে মেনে মণিপুরে  ডানা মেলে ওড়ে তিনটি প্রেমার্ত বছর। 

 কিন্তু রক্তচক্ষু জিজ্ঞাসা তর্জনী উঁচিয়ে সামনে বলে, তৃতীয়-পান্ডব তবে প্রবৃত্তির  দাস ? কৃষ্ণা ও উলূপীর অসাক্ষাতে এক শিকারী মনস্ক কামনা ? হে নির্লজ্জ বহুগামী, যে প্রেম আর তার থেকে অংকুরিত কুঁড়ি ইন্দ্রপ্রস্থে নিয়ে ফেরা অসম্ভব, কেন দু'টি নিস্পাপ ভবিষ্যৎ জ্বালালে লিপ্সার লকলকে আগুনে ?  তোমার  ভোগের সামগ্রীর দৃপ্ত উচ্চারণঃ চিত্রাঙ্গদার স্বামী এক ও অদ্বিতীয় অর্জুন, কিন্তু বহুগামী স্বামীর প্রেয়সীমাত্র তিনি। ''এই শুনে শুরু হয় না কি হৃদয়ের অন্তহীন  দাহ ?  

প্রশ্নবাণে বিদ্ধ পার্থ কি তবে সেই সারস্বত সুশীল, নিজস্ব প্রজ্ঞায় অদ্বিতীয়, কিন্তু অসংযমী লাম্পট্যে লাগামহীন ? দক্ষতা দায়হীন যথেচ্ছাচারে ? শরীরের সুখের জন্য, ইন্দ্রিয়ের সুখের জন্য নির্দ্বিধায়  বেপথু ডুবে থাকতে চায় কর্দমাক্ত গোপনে? তবে কি অস্ত্রবিদ্যায় অদ্বিতীয় মন  অসংযমী ঘুড়ি , লাটাই অন্যের হাতে ? এ ও কি তবে দেব শক্তির প্রভাব?


অর্জুন উবাচ  - ১৬

বিচ্ছিন্ন বারোটা বছর উড়ে গেল মিশ্র আনন্দে  
ভারত দর্শনে বর্ণিল আলোয় আলোকপ্রাপ্ত 
তোমার সামনে আবার হাজির
এদেশের বিচিত্র বৈচিত্র্য আবিষ্কার
সে তো তোমারই নির্দেশ ও অশেষ করুণায়, 
তা ছাড়া উলূপী কিংবা চিত্রাঙ্গদা উপাখ্যান  
তোমার মতো ত্রিকালদর্শীর তো অজানা নয়
কেন তবে অধমের অকারণ সংবর্ধনা ?
 
আমি তবে বহুখ্যাত বাহুবলী ? 
যাকে রক্তক্ষয়ী রাজনীতির  নির্লজ্জ তোষণ ? 
ভার লাঘব করতে প্রয়োজনে ছুড়ে ফেলা নর্দমায় ?   
 কিংবা সাজানো সংঘাতে  নিকেশ  অলিখিত নিয়ম ? 

বাহুবলীর আলোকপ্রাপ্তি যুদ্ধজয় সমতুল্য ?
তাই বুঝি সংবর্ধনা ?
লজ্জিত সংবর্ধনা মাথা নীচু তোমার শ্রীচরণে  

প্রেমের বিচিত্র লাবণ্যে স্নাত 
আবিষ্কার অচেনা আমাকেই
সে তো তোমারই হিসেবি করুণায়
হে কৃষ্ণ, লজ্জিত সংবর্ধনা মাথা নীচু তোমার শ্রীচরণে। 


অর্জুন উবাচ--১৭
 
রৈবতকে কিশোরী চাঁদ সামনে
এক নির্বাক শিলাখণ্ড তাকিয়ে আছি 
সময় থেমে যায়
ফের শুরু  হৃদয়ের খরা
নির্বাক কৌতূহল দেখে
চাঁদেরও দৃষ্টি নিবদ্ধ আমার দিকে ! 

দ্রৌপদী, উলূপী ও চিত্রাঙ্গদার ছবি 
তখন কিছুটা ম্লান এক সম্ভাবনাহীন সম্ভাবনায় 
তুমি বললে এ চাঁদ তোমার সহোদরা 
আর আশ্বাসী পরামর্শ একে হরণ করা। 

হে কৃষ্ণ, এটা সত্যি ভূ-ভারতে অপ্রতিরোধ্য পার্থ
 স্নিগ্ধ দৃষ্টির কাছে পরাজিত
 তাই আমাকে অপরাজেয় দেখতে চন্দ্রহরণের উপদেশ ? 
না কি অত্মীয়তার বন্ধনে  জড়িয়ে
 এক বাহুবলী হাতের মুঠোয় রাখা ?

জানি তোমার অগ্রজের অজান্তে হরণ করলে
যুদ্ধ অনিবার্য, বাইরের এ যুদ্ধ সামলে নিলেও
ভিতরের যুদ্ধে   নির্ঘাত পরাজিত হব,
কী করে সামনে দাঁড়াব 
 ইন্দ্রপ্রস্থে ব্যাকুল বারোটা বছরের ভার বুকে বয়ে  
 যিনি নির্বাক অপেক্ষায় ? 

আমার অবাধ্য আবেগ কোনদিন লাগাম পরেনি
শোধরাতে সুযোগও তুমি দাওনি 
উসকে দিয়েছ বীরত্বের আগুন 
অপ্রতিরোধ্য পার্থ নিজের আবেগের কাছে বশীভূত জেনেও
 তিন-তিনটি নারীর পাণি গ্রহণ করা জেনেও 
উপদেশ সুভদ্রা হরণ ?






ছবি : বিধান দেব 









গুচ্ছ কবিতা : মাসুদুল হক


 

কবি ও পরকীয়া

কবি অন্ধকারের আয়নায় 
বেরিয়ে আসে  

প্রগাঢ় শীতে রাত জমে এলে 
তেজপাতা 
মেলে ধরে মন ও স্মৃতি 
 
কুয়াশার চাদর মাথায় টেনে 
কবি চাঁদ ও গুহা খোঁজে!


কবির জীবন 


দরোজা ভাঙা। কবি বাড়ি নেই 

সামগ্রী বলতে কিছু গ্রন্থ;
আর পুরনো স্মৃতি ও গার্হস্থ্য খাতা 

গণিতের মতো পড়ে আছে বিছানা 

আয়না ও পারদে কবির জীবন 



কবির দরজা


কবির দরজায় এসে 
মহৎ হয়ে ওঠে
 কারো কারো ভাঙা হৃদয় 

চোরের মুখোশে সান্টাক্লজ 
রাত ঘেটে কিছু ভাগ রেখে যায়
                         কবির দরজায়। 



কবির ঘর


প্রগাঢ় শীতে 
বাগানে গাছের নিচে 
স্থবির হয়ে আছে কামিনী পাতা 

কবির ঘর শূন্য 
তাতে 
কম্বলে শরীর জড়িয়ে 
ঘুমিয়ে থাকে প্রেমিক-প্রেমিকা!



বৃক্ষ ও গন্ধ 



বৃক্ষ তো বসন্তের অরণ্যে 
পাতার জামা খুলে
 ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ  হয়ে ওঠে 

আমি তার গন্ধ পাই 
অরণ্যের প্রান্তরে প্রান্তরে...



পুরুষ ও ভ্রমর



অনেক ফুলের কাছে গিয়ে 
আমি জেনেছি 
পুরুষের সঙ্গে ভ্রমরের 
তুলনা হতে পারে না 

ভ্রমর শুধু প্রয়োজনের 
মধুটুকু নেয় 
ফুল কিংবা পাপড়ির
ধ্বংস করে না 

নারী কিন্তু ফুলের মতই
ভ্রমর কিংবা পুরুষ চেনে না!



নারী ও ফুল



নারী কেবল আলিঙ্গনের সময়
ফুল হয়ে ওঠে 
কামনিশিন্দা গন্ধ ছড়ায় 

ফুল সবসময়ই নারী 
সৌন্দর্যে সে অপরূপ!


ছবি : বিধান দেব 



গুচ্ছ কবিতা : অরুণ পাঠক


 আকাশ


আকাশ কি উদ্দেশ্যহীন? প্রাণের উদ্দেশ্য?
কখনোই সব কথা বলে না জীবন
জীবনের খিদে থাকে, প্রাণ ও পরিত্রাণ থাকে
তার সদ্ ব্যবহার বিক্রি করে করে মানুষ
প্রাচীন হয়ে গেছে। পুনর্লিখিত সব কথা
মুখে মুখে বলছে মানুষ। বলছে সব
ঘাসে ঘাসে রক্তমাখা স্বপ্নদের বেঁচে থাকা
চুরি করছে কিছু কিছু উল্লসিত ধ্বনি
আমার জন্মই ছিল অধীত মুক্তিতে
তার বেশি দায়ভার আমি তো জানি না
আস্ত একটা আকাশের নাব্যতা শরীরে বয়ে বয়ে
ক্লান্ত অহংকারে কালো হয়ে যাচ্ছে মন, তবু
যা-এঁকেছি বিস্ময়, যা বলেছি আশ্চর্য
যা পেয়েছি---- সবটাই সুন্দর নয়, টেনে ধরা জিভে
একই কথা লিখতে হয়েছে আমায়
যা আমার পূর্ব পক্ষে সঞ্চিত সাগর
যেন নরকের স্তম্ভিত আগ্রাসে জন্মের কৃতজ্ঞ ধ্বনি
আঙুলে আঙুলে দাসত্ব , মনোবীজে খেতাবের লোভ
দূরে দূরে বাঈঘর, ঘোড়াশাল, চোখের শিকার
অবুঝ জঙ্গলে ঢাকা এসব সুপ্ত বাসনা থেকে
যে বালক ঘুড়িটি ওড়ায় আকাশ তাকে কী লেখে?
মেঘের অনেক নীচে আমরা তার কিচ্ছু বুঝি না!

উৎসব

বড় এক জানালার চৌদিকে উৎসব শুরু হয়ে গেছে
নকল সম্ভার ভরা একফালি আকাশের নিমজ্জিত কোণে
হৃদপিণ্ড দখল করে আছে মানুষেরা। মৃত্যুর রং নীল
তাই অতিক্রান্ত দিবসের পর এই সামান্য মায়াবিনী আলো
দুচোখ ভরে নিতে চাইছে মানুষ-পাহাড়।
তমোঘ্ন শান্তির আস্কারা নিয়ে ওই যারা নাচছে
তাদের পেখম ঢাকা পোশাকে ঘোমটা খুলছে বাংলা
সত্যের এ হেন বিভ্রম চমৎকারিত্বের পথে খুব ভালো
তবু একাকী নৈঃশব্দে আমি আজ আলো
না-জ্বালিয়ে
নিজের ভেতরে জ্বলে উঠি।

আলো

বিভিন্ন যন্ত্রণা থেকে আমি কিছু হাফটোন জল তুলে রাখি
কাজে লেগে যায়। দুহাতের অবসরে কখনও বা কালিঝুলিমাখা
সেই জলের অবতার মুখোমুখি হয়। আমি তাকে শান্ত করি
আরেকটু হৃদয় দিয়ে, অথবা আলোর জঞ্জালে জোনাকি ফেলার মতো মেখে নিই তীব্রতর জ্বালা।
আয়ুষ্মান চোখের কী হয়, সহ্যসম্ভব ফাল্গুনে দাঁড়াতে পারে না, তখন সে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটে, উপমার লাশ বয়ে বয়ে, সন্দিগ্ধ কপালে রাখে চুমোর পর্বত। তারপর স্নিগ্ধ হতাশায় সফল মিলন শেষে কাঁদে। যত গান এই পাওয়া, পেয়ে হেরে যাওয়া
সময় দুহিত অন্ন সৎকার প্রবণ, ভেঙে যাওয়া আগুনে হঠাৎ জেগে ওঠে, দাঁড়িয়ে যায়, শোকার্ত সঙ্গীরা ভুলে যায় হাততালি দিতে। শিস দেয় সুরশ্রী তারা আর ঠাণ্ডা কীট,
আমি নম্র আবদারে প্রার্থনা করি হাওয়ায় সামান্য কিছু রাখো, কৃতজ্ঞ করো, আগুন জ্বালাতে যদি হয় আগে জ্বালো।
সীমানা পাথর করে বিস্ময়মুখর সব চোখ পরাজয় কাঁধে তুলে নেয়, এবার যে যার ঘরে শব্দ নামাবে, তারপর মৃত কিছু হাড়গোড় অক্ষয় পূর্ণিমায় চাঁদের পায়ে বাঁধবে বীরের ঘুঙুর। সমুদ্র চাইবে কলরোল বেঁধে দেওয়া গানের কঙ্কাল।
আমি গলাতে দুহাত রেখে ভাবি, সুরেতে পূর্ণ আছে তো?
নইলে আলোকে কী দিয়ে সরাব পাথর থেকে, যদি সে ভেঙে যায়!

বিনত পুষ্প ও সান্ধ্য নির্জনতা

গা-ঘেঁষে থাকা বিকেল যেন একটি পরিবার। কম কথা তার
যেন এক্ষুনি ফুরিয়ে যাবে দিবসের মতো, যেন সে প্রণত পক্ষী
মৃত্যুর আগেই জেনেছে মৃত্যুকে। অতএব থামতে হয়
আকাশে কলঙ্কঢাকা ব্যাধ দুঃস্বপ্নের সাগর মাথায় নিয়ে যায়
তার অনুসরণের পথ পদ্ম-পলাশে মোড়া, সে ভ্রমণে সময় এমনভাবে ছোটে তাকে গতিশীল কাক মনে হয়
তোমার নিভে যাওয়া দরজার চোখ খুলে গেছে, মাথায় বিশ্বস্ত দাস-দাসী। তারাই তাতিয়ে দিচ্ছে,
জিহ্বা সুন্দর কোনও শোকে পড়িয়ে নিচ্ছে শুদ্ধ পুরাণ। কত না-জানা দিয়ে ব্যাখ্যা হচ্ছে তাদের।
ভূবৃত্তের হাওয়ায় হাওয়ায় জড়ো হচ্ছে বিনীত পুষ্প ও সান্ধ্য নির্জনতা। আমি হাত বাড়িয়ে রাখি
কিছু কিছু সাহাস্য পাথর তাদের আত্মসম্মান রেখে যায়।
সেটুকুই সম্পদ আমার। সমর্পণ করি। তুমি একটি নিবেদিত রঙে ডুবে আছ। অপেক্ষা করি রাত্রির সুবিদীর্ণ কোলাহলে। যেন স্রোতাচ্ছন্ন আত্মারা পরম শান্তিতে ঘিরে আছে আমায়। আর একটু পরেই প্রত্যক্ষ হয়ে যাবে সব ততটুকু দৃষ্টির সমত্ব নিয়ে, যা দিয়ে আবার আমি সবার অলক্ষে চলে যাব


ছবি : বিধান দেব 

গুচ্ছ কবিতা : মামুন রশীদ

 


যা কিছু লিখেছি সব সব প্রেমের কবিতা




১.


কিছুটা স্মৃতি, কিছুটা কল্পনা আর কিছু রৌদ্রের ঝিলিক

সারাদিন খুচরো পয়সার মতো গুণতে থাকি।

জান্তেপিকে মনে পড়ে।

জটিল নিদ্রা ভেঙ্গে তাকে কেউ না ভাবলেও

আমি জানি জ্যোৎস্নার আঙুলে জড়ানো লাজুক মুখে

তুমি স্থির হয়ে আছো।



২.


তুমি বড়ো এলোমেলো, আলস্যে মোড়ানো,

বলতে বলতে নীলে, দম আটকায় বিষাদে।

ক্ষণিক মাধুরী বয়ে আনা প্রণয়ের বিকেল

উসকায় স্মৃতি, অন্যপ্রান্তে প্রলয়ের ক্ষুধা,

ধূমায়িত চায়ে নিরবধি কার পদধ্বনি?


৩.


লুপ্ত অতীতের স্তব্ধ গল্পখণ্ড বেদনার ছায়া থেকে অল্প আলাদা

হয়ে পরিণয়সূত্রে মেলায় অস্পষ্ট জগৎ। ব্যর্থ লোকপুরাণ,

রূপকথা, হারিয়ে ফেলা শাশ্বত অন্ধকার, আষাঢ়ী পূর্ণিমায়

ছড়িয়ে দেয় খুলির অট্টহাসি, পায়রার জলরাশি।

 

তোমার হাড় হিম করা ফটোগ্রাফি, কতোরকম পাগলামী, রূপালি

ঝিলিক, স্মৃতির হাত ধরে জমা হয় লুতুপুত ভাবনার ভেতর। 


৪.


শান্তাহার স্টেশনে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম। এক কম্পার্টমেন্ট

থেকে অন্য কম্পার্টমেন্টের ভূগোলে ঘুরতে ঘুরতে থেমে যায়

বুনো টাট্টু। আমিও হারিয়ে যাই। 

কতো দূরে, কোথায় এসেছি চলে, উথাল ভাবনার মাঝে খুঁজে

দেখি নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে শিয়ালদহ স্টেশনের প্লাটফর্মে। 


একে একে নর্থ ও সাউথের চৌহদ্দির মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে বিদ্বৎসমাজ।


আমাকে কে নেবে? সহস্র মাইলের ব্যবধান ভেঙ্গে অদ্ভুতভাবে

লেপ্টে যেতে থাকে বুনো বকুলের গন্ধ। পড়ার টেবিল, পোষা বাগান,

কুড়ানো বিড়ালছানা, গানের স্কুল, অভিজ্ঞানের শনপাপড়ি পথ দেখায়।

ধাপে ধাপে ইমামবাড়ার সুদীর্ঘ সিঁড়ি পেরিয়ে জড়িয়ে বসি সূর্যঘড়ির কাছে।


আমি তো পথ হারাইনি। 


৫.


এলোমেলো হতে হতে দিনফুরানো পাতার মতো

গলা টিপে ধরা নদীর মতো

রোদ ঝলসে যাওয়া মুখের মতো

এত

বৃষ্টি 

হলো

ভারী অন্ধকার পেপার ওয়েটের মতো

আমাকে ভাঙতে ভাঙতে ওর সব ডালপালা

আনন্দে ঠাসা পাখির বাসার ভেতর

পুঞ্জীভূত হলো।

তুমি দ্যাখো, তোমার জন্যই হাহাকার।



৬.


তুমি আমার, এর বেশি লিখতে থেমে যায় কলম

পাতার ফাঁক গলে, পথ করে দিচ্ছে সবুজ আলো।


আমি লিখতে পারছি না, আমি ঘুমাতে পারছি না।

মুখে লেগে থাকা উচ্ছিষ্ট, এঁটো-

জড়িয়ে যাচ্ছে চিন্তা, গলা শুকিয়ে-

ছাতিম ফুল, ছাতিম ফুল, সারা রাত তোমার ছায়া,

এলোমেলো গন্ধ, গলা শুকিয়ে আসছে, আমাকেও 

স্পর্শ করছে পিপাসা। 


৭.


মেঠো পথ, যেখানে কালো পিচের আঁচড় পড়েনি কখনো

তার বাঁক ধরে হঠাৎ দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন ডুমুর গাছ

জানে না, সামনে কীরকম নীরবতা

কোন ভূমিকা নিয়ে পথ তার দিক নির্দেশক

মোরগ ঝুঁলিয়ে রেখেছে।


যতোই হন্যে হয়ে খোঁজো, হারিয়ে যাওয়া মার্বেল

যেনো মায়াহরিণ, তোমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে

রোজ লোভ দেখাবে, সারারাত পাশে বসে

জোৎস্না মাখাবে, টেনে নিয়ে যাবে রহস্যের

দেবদারু বনে। যেনো ভুলে যাও 

মানবজীবন, জন্মদিন, নিঃসঙ্গতা।


৮.


ঢেউহীন স্তব্ধ জলের অতলে, বকুল, তোমাকে মেলাতে পারিনা।


৯.


তোমার সঙ্গে কথা বলার জন্য কয়েক যুবক আমাকে শাসালে

ভয়ের পিরান পরে ঢুকে যাই গর্তে।


পড়ার টেবিলে মরে যাওয়া এক পোকাকে ঘিরে লাল পিঁপড়েদের

ভোজ উৎসবে কি মনে করে পোকাটিকে নাড়িয়ে দেই। মুহূর্তেই

ভেঙ্গে যাওয়া ভোজসভা থেকে হা হা করে ছুটে আসে পিঁপড়েরা,

শাসাতে থাকে। অতি সাহসী একজন কামড়ে দেয় হাতে। বিষের

তীব্র জ¦লুনি সয়েও কিছু বলিনি।


বাসা থেকে পড়ে যাওয়া এক শালিখ ছানাকে মায়ের কাছে

ফিরিয়ে দেবার মুহূর্তে কা কা করে উড়ে আসে অজস্র কাক। 

ধারালো ঠোঁটের আঘাতে বিক্ষত আমি যন্ত্রণায় চেপে ধরি মাথা। 


মানুষ, কাক, পিঁপড়ে কাউকেই কিছু বলিনি। বলবো না।

যেমন তোমাকে বলবো না, আদিগন্ত হলদু সর্ষে ফুলের মাঝে

ঘুরে বেড়ানো মৌমাছির কথা। মাটিতে আকাশের মিলে যাবার কথা। 


১০.


মৃত্যুকে দূরে রেখে ছায়াকে আদর করি,

চুমো খাই।

তন্দ্রামগ্ন চোখ আচমকা দেখি

ছায়া-মৃত্যু একাকার, দুজনে দুজনার

জড়াজড়ি, হুটোপুটি।

আমি সরে যাই দূরে, অচেনা রাজপথে

পড়ে রয় শুধু খুনসুঁটি।


১১.


প্রহর চলে গেলে, চুপচাপ মহিষের ঘাড়ের চিহ্ন আাঁকা পথে

আগামীর সম্ভাবনায় ক্রমশ নম্র হয়ে আসে উৎসবমুখর পাখিরা।


১২.


মনে তো কতোজনই আছে, মনে পড়ে তুমুল বাক্যেচ্ছ্বাসে উড়ে যায় 

দ্রুতগামী ইসকুল বেলা, স্মৃতির পাঠশালা, অনিঃশেষ সন্ধ্যা ও ছায়াকালে।


১৩.


এই ধুলো ওড়া, রুক্ষ, কাঁটাময় পথে প্রতিবিম্বের মতো তুমিও 

ফুটে ওঠো অনন্ত সৌন্দর্র্যে। 


তোমাতে আমাতে প্রভেদ, জাতকুলশীলে দ্বন্দ্ব, মুগ্ধতা জাগানিয়া বিষ্ময়।

দীর্ঘশ্বাস, আমাদের সরলরেখা অবস্থানে। 



১৪.


ঝিরিঝিরি বাতাস আমার ভালোলাগে। ঝমঝম বৃষ্টি আমার ভালোলাগে। রোদেলা আকাশ আমার ভালোলাগে। পূর্ণিমারাত আমার ভালোলাগে। সবুজ পাতাদের আমার ভালোলাগে। শান্ত নদী আমার ভালোলাগে। শিউলি ফুলে ছেয়ে থাকা উঠোন আমার ভালোলাগে। বকুল, তোমাকে ভালোলাগে। 


এইসব ভালোলাগাকে ভালোবাসতে বাসতে দেখি নোংরা ফুটপাতে, ডাস্টবিনের পাশে সূর্যমুখীর মতো ভাতের থালা হাতে এক শিশু বসে আছে সকল ভালোলাগা উপেক্ষা করে।


ছবি : বিধান দেব 


গুচ্ছ কবিতা : উজ্জ্বল ঘোষ


 


অপূর্ব


অপূর্বর দিকে চেয়ে আছে অপূর্ব


বহুফসলি মাটির আলা নেই

বৃদ্ধের অশ্রু প'রে নেয় জমির খালি গা

অপেক্ষা করে থাকে চির সোমত্ত দোআঁশ 

অপূর্ব চাকরি খোঁজে

অপূর্ব ঘুস দেয়

অপূর্ব ঠকে


অপূর্বর দিকে চেয়ে থাকে অপূর্ব



চন্দ্রশেখর


মাদুরে শুয়ে থাকে চন্দ্রশেখর 

রেডিও শোনে

শুনতে শুনতে তার মনে হয়, সে-ও শুয়ে আছে

হাজার কৃষকের মাঠে রাস্তায়, ঠাণ্ডায় শীতে

ভাবে, সমর্থন নয়, সরকারের কাছে চেয়ে নেবে ন্যূনতম সম্মান মূল্য

যা সে পায়নি বাড়িতে, রাস্তায়, বাজারে 


বৃদ্ধ স্বপ্নের দাবিতে ঘুম ভাঙে মিতার

সূর্য তখনও ওঠেনি



মিতা


পিতা হাল ছেড়ে দিয়েছে 

হালে পানি পাচ্ছে না পুত্র 

শুধু হাতা-খুন্তি ছাড়তে পারেনি মিতা


ওইতো ভাত ফোটে, রুটি ফোটে রাত্রিবেলা 


মিতা হাল ধরে থাকে

মিতা মাটি হয়ে যায় 

মাটি মিতা হয়ে চেয়ে থাকে আমাদের মুখ


ঋষি মিডিয়ার অভিশাপ


ঋষি মিডিয়ার অভিশাপে

সুরেরা পাথর হয়ে আছে সব। 

ঘরে ঘরে জ্বলে আছে শুধু 

ঋষির কল্পিত আলো।

কে যে তপস্যায় ব'সে 

ঘটাবে শাপমোচন, ভাবছে মানুষ! 


ছবি: বিধান দেব