সাধনপর্বের নির্জনতা
১৩.
ব্যক্তিগত ধাঁধা
লােলচর্মা এক বৃদ্ধাকে একবার আমি
শিয়ালদার ভয়ঙ্কর রাস্তা পার করে দিয়েছিলুম। অসাবধানে উঁচু থেকে পড়ে যাওয়া একবার এক
চড়ুই-বাচ্চাকে তার কাতর মায়ের কাছে
পৌঁছে দিয়েছিলুম ।
বহুদিন আগে আমাদের ক্লাসের এক গুণ্ডা ছেলে স্ট্রাইকে না যাওয়াতে আমাকে ঘুসি মেরেছিল পরদিন শিক্ষকের প্রশ্নেও তার নাম বলিনি
টিফিনে তাকে ঘুগনি খাইয়েছিলুম।
নেংটি ইঁদুররা আমার নারক শত্রু ইদানীং
আমার রাতজাগা সঙ্গী বই কেটে তছনছ করে, তাই খাঁচায় ফাঁদ পেতে তাদের ধরি
হত্যার মুহূর্তে তাদের ছেড়ে দিই
আমি যে কেন এরকম বুঝতে পারি না
বয়েস হয়েছে বলে কি রাগ কমে গেল
আমি তাে সব সময়ই মারপিট ভয় করি
মৃত্যু ভয় করি
কেন যে এই ধরনের চরিত্র আমার
বুঝতে পারি না ।
সুনীল বসুর ' নক্ষত্রের সাইকেলে অনন্ত ব্রহ্মে ' কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতা এটি । সহজ স্বীকারোক্তি। ব্যক্তিগত এই ধাঁধা প্রতিটি মানুষের মধ্যে কম বেশি আছে । ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক । এখানে কবির ব্যক্তিগত ধাঁধা ইতিবাচক । ঠিক এর
বিপরীত হত, যদি সেটা নেতিবাচক রূপ ধারণ করতো । অর্থাৎ শিয়ালদার ভয়ঙ্কর রাস্তা পার করে দিতে অরাজি কবি বৃদ্ধার অনুরোধ উপেক্ষা করলেন। অথবা চড়ুই বাচ্চাকে তার পাখি মাতার কোলে ফিরিয়ে দিলেন না । হত্যার মুহূর্ত দীর্ঘায়িত করে ইঁদুরগুলোকে নরকযন্ত্রণা দিতেন তিনি। অর্থাৎ ভালো - খারাপের দ্বন্দ্ব । যে উদ্দীপনা জীবন চালিত করে তাকে মান্যতা দেয়।
আসলে আমরা তো অল্পে খুশি , অল্পেই আবেগপ্রবণ, সামান্য কারণেই রেগে যাই । কিন্তু আত্মবিস্মৃতির এই সময়ে দাঁড়িয়ে কবি সুনীল বসু যেন আমাদের ভারত আত্মার সন্ধান দিয়েছেন । যে আত্মা একদিন জলধি মন্থন শেষে ঘোষণা করেছিল 'বসুধৈব কুটুম্বকম' । পৃথিবী একটি পরিবার । আজ যখন নিজেদের দিকে এতদিন পর তাকাবার সময় এসেছে , তখন সেই 'আত্মীয়তা ' আর খুঁজে পাচ্ছি না কেউ । সকাল-বিকাল হত্যা হিংসা ক্রোধের আগ্নেয় ফাঁদ । ' বিশ্বাস' শব্দটি উঠে যেতে বসেছে। ঘুষি মারা বন্ধুকে ঘুগনি খাওয়ানো বা শিক্ষকের কাছে তার নাম না বলার মধ্যে এক ধরনের সাহস আছে । এই শক্তি বা সাহস নৈতিক । যাকে আমরা 'নৈতিক বল ' বলে থাকি।
বয়স হলে আমরা নিজেদের খোঁজে নামি । সে অতলান্ত পথ । একাকী সেখানে যেতে হয় । ক্ষুদ্র আমিকে নিয়ে বৃহৎ আমির ভেতর প্রবেশ করার নামই নিজেকে জানা বা নিরন্তর খুঁজে যাওয়া । কিন্তু এই কবিতায় সমস্ত জীবনের কথা বলা হলো । নিরন্তর এক চলা -ধর্ম । স্কুল থেকে বার্ধক্য । 'মৃত্যু ভয়' তাকে পেরে ফেলে । তিনি প্রতিবাদ করতে ভুলে যান । কিন্তু এটুকু বলে থেমে গেলে অর্থের
একদেশীকরণ হয়ে যাবে । আসলে , মৃত্যু ভয় আছে। কিন্তু তা শুধুমাত্র কবির একার নয়। তা ওই লোলচর্ম বৃদ্ধা বা চড়ুই পাখির বাচ্চাটিরও। কারণ জনবহুল শিয়ালদার ভয়ঙ্কর রাস্তা পার হতে গিয়ে বৃদ্ধার যদি কিছু একটা হয়ে যায় । আবার একই কথা চড়ুই- বাচ্চাটার ক্ষেত্রেও খাটে । মা হারা হলে সে যে মারা যাবে । তাকে তখন কে করবে দেখাশোনা । নেংটি ইঁদুরের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা, তা আমরা বুঝতে পারি।
তাহলে কি হলো । কবি শুধু নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে চান না এই জল -মাটি -বাতাসের সবুজ জগতে । বরং মানবের সংস্কৃতি ধারণ করে তিনি ফিরে যেতে চান সেই অতীত সময়ে , যখন তপোবনের ঋষি আত্মদীপ প্রজ্বলিত করে গ্রহণ করে নিতে পারেন গোত্রহীন পিতৃপরিচয়হীন জবালার পুত্রকে । এখানেই মনুষ্যত্ব , এখানেই প্রাণের ধর্ম । তাকে অস্বীকারের অর্থ নেতিবাচক দিকগুলোকে উন্মোচনের রাস্তা তৈরি করে দেওয়া । তা হয় না কখনোই।
১৪.
স্পর্শ
অন্য কারো স্পর্শের আশায়
শূন্যে অন্ধের মতো হাত বাড়িয়েছিল
কিন্তু নিজেকে স্পর্শ করে সেই হাত ফিরে এসে
হতাশায় ভেঙে পড়ে ।
স্বপ্নের মধ্যে এভাবেই প্রথম রজস্বলা হয়ে ওঠে
হেনরি ।
একজন মানুষের ইন্দ্রিয়পরতন্ত্র হয়ে থাকার কথাই বলা হচ্ছে যেন । অন্তত পাঁচটা পংক্তি পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মত কবির কামনা- বাসনাকে উস্কে দিয়েছে সযত্নে। কিন্তু কেন এই স্পর্শ ? কেন এই অন্ধের হতাশা? উপনিষদ বলছে , অভেদজ্ঞানে যিনি দ্বৈতসত্ত্বাকে জানতে পারেন , তিনি সবসময় আনন্দের মধ্যেই অবস্থান করেন । অসৎ অবস্থা থেকে সৎ অবস্থায় জগৎ একদিন উপনীত হলো । নাম এবং রূপকে আশ্রয় করেই জগতের সেই নির্বিশেষ থেকে সবিশেষে যাত্রা।
আমরা প্রতিটি পলে এমন কাউকে চাই যে আমাকে ছুঁয়ে থাকবে । তার স্পর্শের আশায় একটা গোটা জীবন কেটে যায় কারো কারো । এই স্পর্শ কি শুধুই বাহ্যিক ? নাকি স্পর্শের আন্তরিকতাটুকুকে কবি পেতে চেয়েছেন প্রিয়জনের কাছ থেকে । অমিতাভ মৈত্র বাংলা কবিতার সেই সমস্ত স্বরের প্রতিনিধিত্ব করেন , যাঁরা মেধাবী এবং একই সঙ্গে শব্দের অন্তর্গত সৌন্দর্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল । এখানে প্রকরণ বা প্রকাশের শৈলী থেকে বড় হয়ে উঠেছে 'হেনরি' নামে এক যুবকের প্রতি কবির গভীর আকর্ষণ । তিনি হেনরীকে জানেন । হেনরি তাঁকে জানেন । এবং চেনেন ! হয়তো !
নিজেরাই নিজেদেরকে কষ্ট দিয়ে , যন্ত্রণা দিয়ে আনন্দ পায় ---- এমন মানুষ এই সমাজে রয়েছে। তাতেই তাদের আনন্দ । আবার এমনটাও দেখা
যায় , সেই আনন্দ গ্রহণ করতে করতে অথবা নিজেকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দিতে দিতে ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়ে । তার কাছে ইহজগৎ বলে কিছু থাকেনা। মনের আকাঙ্ক্ষাকে পথ দেখাতে দেখাতে ওই অন্ধের মতোই একসময় সে 'হতাশায় ভেঙে পড়ে'। আসলে সে তো মর্ষকামী নয় । সে নিজেকে ভালোবাসে । আবার একই সঙ্গে ভালোবাসে অন্য কোন জীবনকে।
স্বপ্ন এমন এক মানসিক অবস্থা যা চেতন-অবচেতনের ব্যবধান ঘুচিয়ে দেয় । বলা হয়, স্বপ্ন হলো মানুষের গোপন আকাঙ্ক্ষা । যে ইচ্ছাগুলির বহিঃপ্রকাশ ঘটে চূড়ান্ত এক আবেগ মুহূর্তে । সেই আবেগ তখন নারী-পুরুষের ভেদ বুঝতে সক্ষম হয় না । তা না হলে , কবি কেন বলবেন , ' স্বপ্নের মধ্যে এভাবেই প্রথম রজস্বলা হয়ে ওঠে হেনরি। '
'রজস্বলা ' শব্দটি নারী থেকে প্রতীক রূপ গ্রহণ করে কৃষিকাজে অনুপ্রবেশ করে সেই অতীতে । বৃষ্টির প্রথম স্পর্শে জেগে ওঠে জমি । নারীও তৈরি হয় রজস্বলা পরবর্তী সময়ের জন্য। তাই কৃষক লাঙ্গল দিতে দিতে আজও বলে ওঠে ----
"নাগর কোথায় রইলা রে
জল লেগেছে তোমার বাকুড়িতে। "
ধরিত্রীর মতো নারীও রজস্বলা হয়। আর তা অতীতের ঘটত পতিগৃহে ( গওনা ---- বিবাহিত নারী
দ্বিতীয় বার স্বামীর কাছে যাওয়া)। বর্তমানে সমাজ পাল্টেছে । আজ আর নারীর পতিগৃহে যেতে হয়
না । বরং পিতৃগৃহে তার কুসুমের মাস উদযাপিত
হয় । কিন্তু হেনরি ? সে কিভাবে রজস্বলা হবে। একজন পুরুষের (যদি হেনরি পুরুষের নাম হয়) পক্ষে তা সম্ভব নয় । তবে কি , বৈষ্ণব দর্শনের সেই কথা আমাদের আজ মানতে হবে । যেখানে বলা হচ্ছে , এই জগতে কৃষ্ণই একমাত্র পুরুষ , আর সকলেই নারী । রাধা ভাবে তন্ময় চৈতন্যদেব যার সার্থক রূপ । বৈষ্ণব কবি পাতায় পাতায় লিখে গেছেন অনুরূপ প্রেম -ভক্তি কথা।
আমাদের অবচেতনে যে স্পর্শ , তার মধ্যে
'হেনরি'-র মতোই রজস্বলা হয়ে ওঠা এক শূন্য সময়ও রয়েছে।
১৩.
ব্যক্তিগত ধাঁধা
লােলচর্মা এক বৃদ্ধাকে একবার আমি
শিয়ালদার ভয়ঙ্কর রাস্তা পার করে দিয়েছিলুম। অসাবধানে উঁচু থেকে পড়ে যাওয়া একবার এক
চড়ুই-বাচ্চাকে তার কাতর মায়ের কাছে
পৌঁছে দিয়েছিলুম ।
বহুদিন আগে আমাদের ক্লাসের এক গুণ্ডা ছেলে স্ট্রাইকে না যাওয়াতে আমাকে ঘুসি মেরেছিল পরদিন শিক্ষকের প্রশ্নেও তার নাম বলিনি
টিফিনে তাকে ঘুগনি খাইয়েছিলুম।
নেংটি ইঁদুররা আমার নারক শত্রু ইদানীং
আমার রাতজাগা সঙ্গী বই কেটে তছনছ করে, তাই খাঁচায় ফাঁদ পেতে তাদের ধরি
হত্যার মুহূর্তে তাদের ছেড়ে দিই
আমি যে কেন এরকম বুঝতে পারি না
বয়েস হয়েছে বলে কি রাগ কমে গেল
আমি তাে সব সময়ই মারপিট ভয় করি
মৃত্যু ভয় করি
কেন যে এই ধরনের চরিত্র আমার
বুঝতে পারি না ।
সুনীল বসুর ' নক্ষত্রের সাইকেলে অনন্ত ব্রহ্মে ' কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতা এটি । সহজ স্বীকারোক্তি। ব্যক্তিগত এই ধাঁধা প্রতিটি মানুষের মধ্যে কম বেশি আছে । ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক । এখানে কবির ব্যক্তিগত ধাঁধা ইতিবাচক । ঠিক এর
বিপরীত হত, যদি সেটা নেতিবাচক রূপ ধারণ করতো । অর্থাৎ শিয়ালদার ভয়ঙ্কর রাস্তা পার করে দিতে অরাজি কবি বৃদ্ধার অনুরোধ উপেক্ষা করলেন। অথবা চড়ুই বাচ্চাকে তার পাখি মাতার কোলে ফিরিয়ে দিলেন না । হত্যার মুহূর্ত দীর্ঘায়িত করে ইঁদুরগুলোকে নরকযন্ত্রণা দিতেন তিনি। অর্থাৎ ভালো - খারাপের দ্বন্দ্ব । যে উদ্দীপনা জীবন চালিত করে তাকে মান্যতা দেয়।
আসলে আমরা তো অল্পে খুশি , অল্পেই আবেগপ্রবণ, সামান্য কারণেই রেগে যাই । কিন্তু আত্মবিস্মৃতির এই সময়ে দাঁড়িয়ে কবি সুনীল বসু যেন আমাদের ভারত আত্মার সন্ধান দিয়েছেন । যে আত্মা একদিন জলধি মন্থন শেষে ঘোষণা করেছিল 'বসুধৈব কুটুম্বকম' । পৃথিবী একটি পরিবার । আজ যখন নিজেদের দিকে এতদিন পর তাকাবার সময় এসেছে , তখন সেই 'আত্মীয়তা ' আর খুঁজে পাচ্ছি না কেউ । সকাল-বিকাল হত্যা হিংসা ক্রোধের আগ্নেয় ফাঁদ । ' বিশ্বাস' শব্দটি উঠে যেতে বসেছে। ঘুষি মারা বন্ধুকে ঘুগনি খাওয়ানো বা শিক্ষকের কাছে তার নাম না বলার মধ্যে এক ধরনের সাহস আছে । এই শক্তি বা সাহস নৈতিক । যাকে আমরা 'নৈতিক বল ' বলে থাকি।
বয়স হলে আমরা নিজেদের খোঁজে নামি । সে অতলান্ত পথ । একাকী সেখানে যেতে হয় । ক্ষুদ্র আমিকে নিয়ে বৃহৎ আমির ভেতর প্রবেশ করার নামই নিজেকে জানা বা নিরন্তর খুঁজে যাওয়া । কিন্তু এই কবিতায় সমস্ত জীবনের কথা বলা হলো । নিরন্তর এক চলা -ধর্ম । স্কুল থেকে বার্ধক্য । 'মৃত্যু ভয়' তাকে পেরে ফেলে । তিনি প্রতিবাদ করতে ভুলে যান । কিন্তু এটুকু বলে থেমে গেলে অর্থের
একদেশীকরণ হয়ে যাবে । আসলে , মৃত্যু ভয় আছে। কিন্তু তা শুধুমাত্র কবির একার নয়। তা ওই লোলচর্ম বৃদ্ধা বা চড়ুই পাখির বাচ্চাটিরও। কারণ জনবহুল শিয়ালদার ভয়ঙ্কর রাস্তা পার হতে গিয়ে বৃদ্ধার যদি কিছু একটা হয়ে যায় । আবার একই কথা চড়ুই- বাচ্চাটার ক্ষেত্রেও খাটে । মা হারা হলে সে যে মারা যাবে । তাকে তখন কে করবে দেখাশোনা । নেংটি ইঁদুরের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা, তা আমরা বুঝতে পারি।
তাহলে কি হলো । কবি শুধু নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে চান না এই জল -মাটি -বাতাসের সবুজ জগতে । বরং মানবের সংস্কৃতি ধারণ করে তিনি ফিরে যেতে চান সেই অতীত সময়ে , যখন তপোবনের ঋষি আত্মদীপ প্রজ্বলিত করে গ্রহণ করে নিতে পারেন গোত্রহীন পিতৃপরিচয়হীন জবালার পুত্রকে । এখানেই মনুষ্যত্ব , এখানেই প্রাণের ধর্ম । তাকে অস্বীকারের অর্থ নেতিবাচক দিকগুলোকে উন্মোচনের রাস্তা তৈরি করে দেওয়া । তা হয় না কখনোই।
১৪.
স্পর্শ
অন্য কারো স্পর্শের আশায়
শূন্যে অন্ধের মতো হাত বাড়িয়েছিল
কিন্তু নিজেকে স্পর্শ করে সেই হাত ফিরে এসে
হতাশায় ভেঙে পড়ে ।
স্বপ্নের মধ্যে এভাবেই প্রথম রজস্বলা হয়ে ওঠে
একজন মানুষের ইন্দ্রিয়পরতন্ত্র হয়ে থাকার কথাই বলা হচ্ছে যেন । অন্তত পাঁচটা পংক্তি পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মত কবির কামনা- বাসনাকে উস্কে দিয়েছে সযত্নে। কিন্তু কেন এই স্পর্শ ? কেন এই অন্ধের হতাশা? উপনিষদ বলছে , অভেদজ্ঞানে যিনি দ্বৈতসত্ত্বাকে জানতে পারেন , তিনি সবসময় আনন্দের মধ্যেই অবস্থান করেন । অসৎ অবস্থা থেকে সৎ অবস্থায় জগৎ একদিন উপনীত হলো । নাম এবং রূপকে আশ্রয় করেই জগতের সেই নির্বিশেষ থেকে সবিশেষে যাত্রা।
আমরা প্রতিটি পলে এমন কাউকে চাই যে আমাকে ছুঁয়ে থাকবে । তার স্পর্শের আশায় একটা গোটা জীবন কেটে যায় কারো কারো । এই স্পর্শ কি শুধুই বাহ্যিক ? নাকি স্পর্শের আন্তরিকতাটুকুকে কবি পেতে চেয়েছেন প্রিয়জনের কাছ থেকে । অমিতাভ মৈত্র বাংলা কবিতার সেই সমস্ত স্বরের প্রতিনিধিত্ব করেন , যাঁরা মেধাবী এবং একই সঙ্গে শব্দের অন্তর্গত সৌন্দর্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল । এখানে প্রকরণ বা প্রকাশের শৈলী থেকে বড় হয়ে উঠেছে 'হেনরি' নামে এক যুবকের প্রতি কবির গভীর আকর্ষণ । তিনি হেনরীকে জানেন । হেনরি তাঁকে জানেন । এবং চেনেন ! হয়তো !
নিজেরাই নিজেদেরকে কষ্ট দিয়ে , যন্ত্রণা দিয়ে আনন্দ পায় ---- এমন মানুষ এই সমাজে রয়েছে। তাতেই তাদের আনন্দ । আবার এমনটাও দেখা
যায় , সেই আনন্দ গ্রহণ করতে করতে অথবা নিজেকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দিতে দিতে ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়ে । তার কাছে ইহজগৎ বলে কিছু থাকেনা। মনের আকাঙ্ক্ষাকে পথ দেখাতে দেখাতে ওই অন্ধের মতোই একসময় সে 'হতাশায় ভেঙে পড়ে'। আসলে সে তো মর্ষকামী নয় । সে নিজেকে ভালোবাসে । আবার একই সঙ্গে ভালোবাসে অন্য কোন জীবনকে।
স্বপ্ন এমন এক মানসিক অবস্থা যা চেতন-অবচেতনের ব্যবধান ঘুচিয়ে দেয় । বলা হয়, স্বপ্ন হলো মানুষের গোপন আকাঙ্ক্ষা । যে ইচ্ছাগুলির বহিঃপ্রকাশ ঘটে চূড়ান্ত এক আবেগ মুহূর্তে । সেই আবেগ তখন নারী-পুরুষের ভেদ বুঝতে সক্ষম হয় না । তা না হলে , কবি কেন বলবেন , ' স্বপ্নের মধ্যে এভাবেই প্রথম রজস্বলা হয়ে ওঠে হেনরি। '
'রজস্বলা ' শব্দটি নারী থেকে প্রতীক রূপ গ্রহণ করে কৃষিকাজে অনুপ্রবেশ করে সেই অতীতে । বৃষ্টির প্রথম স্পর্শে জেগে ওঠে জমি । নারীও তৈরি হয় রজস্বলা পরবর্তী সময়ের জন্য। তাই কৃষক লাঙ্গল দিতে দিতে আজও বলে ওঠে ----
"নাগর কোথায় রইলা রে
জল লেগেছে তোমার বাকুড়িতে। "
ধরিত্রীর মতো নারীও রজস্বলা হয়। আর তা অতীতের ঘটত পতিগৃহে ( গওনা ---- বিবাহিত নারী
দ্বিতীয় বার স্বামীর কাছে যাওয়া)। বর্তমানে সমাজ পাল্টেছে । আজ আর নারীর পতিগৃহে যেতে হয়
না । বরং পিতৃগৃহে তার কুসুমের মাস উদযাপিত
হয় । কিন্তু হেনরি ? সে কিভাবে রজস্বলা হবে। একজন পুরুষের (যদি হেনরি পুরুষের নাম হয়) পক্ষে তা সম্ভব নয় । তবে কি , বৈষ্ণব দর্শনের সেই কথা আমাদের আজ মানতে হবে । যেখানে বলা হচ্ছে , এই জগতে কৃষ্ণই একমাত্র পুরুষ , আর সকলেই নারী । রাধা ভাবে তন্ময় চৈতন্যদেব যার সার্থক রূপ । বৈষ্ণব কবি পাতায় পাতায় লিখে গেছেন অনুরূপ প্রেম -ভক্তি কথা।
আমাদের অবচেতনে যে স্পর্শ , তার মধ্যে
'হেনরি'-র মতোই রজস্বলা হয়ে ওঠা এক শূন্য সময়ও রয়েছে।
ছবি : বিধান দেব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন