শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

সম্পাদকের কথা

 


          আ মরি বাংলা ভাষা

ভাষা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান ভাসা ভাসা। আমি অবশ্য ভাষাবিদদের কথা বলছি না। সাধারণ মানুষ নিজের মাতৃভাষাকে নিতান্ত একটি পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। জন্মের পর দাঁত যেমন মানুষের আপনা আপনি গজায় মাতৃভাষাও তেমনই মাতৃদুগ্ধ পান করতে করতে আমাদের জিভের ডগায় এসে যায়। আর সে জন্যই দাঁত থাকতে আমরা যেমন দাঁতের মর্যাদা বুঝি না তেমনই মাতৃভাষাও আমাদের কাছে হেলাফেলার বিষয় হয়ে ওঠে। কিন্তু মাতৃভাষাই একটা জনগোষ্ঠীকে জাতির মর্যাদা দিয়ে থাকে। আমরা যে বাঙালি জাতি তার কারণ আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। যখন প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষার স্তর পার হয়ে মধ্য ভারতীয় আর্যভাষার পূর্ব ভারতীয় শাখা মাগধী প্রাকৃত বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা-আসাম এই বিরাট ভূখণ্ডের ভাষারূপ ছিল তখন আমরা কেউ নিশ্চিতরূপে বাঙালি-বিহারী-ওড়িয়া-অসমিয়া ছিলাম না।তখন নিশ্চয়ই আমরা প্রত্যেকে নিজের নিজের মতো করে একটা ভবিষ্যত আইডেনটিটি খুঁজে চলেছিলাম। ভৌগোলিক পরিবেশ, ঐতিহাসিক বিষয় আশয়, খাদ্যাভ্যাসের ভিন্নতা, পৃথক জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্য, ভিন্ন সাংস্কৃতিক আচার আচরণ, রাজনৈতিক অবস্থার ভিন্নতা, ধর্মীয় বোধের ভিন্নতা ধীরে ধীরে একেকটা জনগোষ্ঠীকে পৃথক করে তুললেও শুধুমাত্র ভাষার পৃথকত্বের জন্য পৃথক পৃথক জাতি হিসেবে চিহ্নিত হতে আরও বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। মাগধী প্রাকৃত মাগধী অপভ্রংশ ও অবহটঠের স্তর পেরিয়ে যতদিন না পূর্বী ও পশ্চিমা এই দুটি শাখারূপ নিল এবং তার পর আরও বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হবার পর পশ্চিমা ভেঙে ওড়িয়া ও ভোজপুরী এবং পূর্বী ভেঙে বাংলা ও অসমিয়া শাখা জন্ম নিল ততদিন বাঙালি কোথায়? অর্থাৎ একসূত্রে একটা জনগোষ্ঠীকে বেঁধে একটা জাতির জন্ম দেয় ভাষা। একটা জাতিকে আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে তার ভাষাকে পঙ্গু করে দেওয়ার চক্রান্ত রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। যখন যে জাতি অন্য জাতির ওপর রাজত্ব করে তখন রাজা হিসেবে তার নিজের ভাষাকেই চাপিয়ে দেয় বিজিত জাতির ওপর। সরকারী যে কোনও কাজে অংশগ্রহণের জন্য মাতৃভাষাকে দূরে ঠেলে তখন রাজভাষাকে আপন করতে বাধ্য হয় মানুষ। ভাষার আগ্রাসন একটা জাতিকে অধঃপতিত করার জন্য সবচেয়ে সাধারণ ও সামান্যতম কৌশল। বাহুবলের মতো ভাষাকেও আত্মগৌরবের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পৃথিবীর এমন কিছু মানুষ আছে যারা মাতৃভাষাহীন। কারণ তাদের মাতৃভূমি অন্য ভাষাগোষ্ঠীর মানুষের দখলে চলে গেছে। মাতৃভাষাহীন একজন মানুষ আত্মপরিচয়হীন। ইংরেজ একসময় প্রায় সমগ্র বিশ্বে প্রভুত্ব করেছে বলে ইংরাজী ভাষার কাছে আমরা আজও পরাধীন। আমরা যতই নিজেদের স্বাধীন মনে করি না কেন ভাষার শাসনে ইংরাজীর দাসত্ব করে যেতে হচ্ছে এখনও। ইংরাজী ভাষা প্রভুর ভাষা। গোটা বিশ্বকে তা মাথা নত করিয়েছে। কারণ আমরা মনে করি মুখের গ্রাস অর্জন করতে হলে ইংরাজী ভাষা শিখতে হবে। ইংরাজী ও হিন্দী ভাষার আগ্রাসন বর্তমান বাঙালিকে দিশেহারা করে দিচ্ছে। আমরা যারা বাংলা ভাষার সপক্ষে গলা ফোলাই তাদের অধিকাংশের সন্তানই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে এবং তাদের বেশিরভাগেরই দ্বিতীয় ভাষার স্থান আলোকিত করে থাকে হিন্দী। আমরা আগে ভারতীয় তারপর বাঙালি নাকি আগে বাঙালি তারপর ভারতীয় এই জাতীয় দুর্বলতাবোধের অন্ধ গোলকধাঁধায় না ঘুরে বরং কিছুটা স্বাজাত্যাভিমান পুনরুদ্ধার করতে পারলে মন্দ হয় না। ভাষার জন্য মানুষ যেমন শহীদ হয়েছেন তেমনই ভাষাকে টিকিয়ে রাখতেও মানুষকে সবসময় লড়ে যেতে হচ্ছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার যে মর্যাদা আমরা পশ্চিমবঙ্গবাসীরা কি আমাদের মাতৃভাষাকে সেই মর্যাদা দিতে সদা প্রস্তুত? আমাদের সংস্কৃতির সত্যের সঙ্গে আমাদের ভাষার সত্য আজ একইভাবে বিপদগ্রস্ত নয় কি?

ফেব্রুয়ারির গদ্য : শিমুল আজাদ

 

বাংলা ভাষার বর্তমান প্রেক্ষাপট ও তার                              ভবিষ্যৎ




ফেব্রæয়ারি এলেই আমরা জাতিগত জেগে ওঠার যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাই। মাতৃভাষার ভাবনাকে কেন্দ্র করে এর পূর্বে আমাদের সত্তার কোনো নড়ন-চড়ন নেই। অথচ যে চেতনার পথে ভাষার অধিকার স্বীকৃতি পেয়েছিল, সে চেতনা থেকে ফিরে আসার কোনো সুযোগ মাতৃভ‚মির সন্তানদের নেই; থাকার অবকাশও নেই। সভ্যতার এই প্রবল বিকাশলগ্নে ভাষার অধিকার, পরিচর্যা নিয়ে যে পরিমাণ সময়, কর্ম সঞ্চালনের প্রয়োজন ছিল, আজ তা অনুপস্থিত।স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন’Ñ প্রবাদ বাক্যটি এমন চিরন্তন সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছে যে, তার না উল্লেখ অবিবেচকের পরিচয় প্রমাণ করে। প্রথমত ভাষার অধিকার রক্ষার সংগ্রামে যাঁদের অবদান শিখরস্পর্শী, তাদেরকে মনে রাখার আত্মিক অবস্থান আজ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে তাঁদের মহানতর চেতনার পথ। সেই চেতনার উজ্জীবনের পথ ধরে যে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম তারও ভুলণ্ঠিতরূপ আজ আমাদের রাষ্ট্রযজ্ঞের প্রতি ক্ষেত্রে বিদ্যমান। 

জাতির চেতনাধারণকারী অনেক সন্তান আজ এসব ভয়ংকর পরিণতি মর্মে মর্মে বুঝতে পারছে, কিন্ত পরিত্রাণের পথ তারা কেউ খুঁজে পাচ্ছে না। বুদ্ধি-বিবেক, চৈতন্য দিয়ে তারা এই বীভৎস পরিণতি থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে জাতির অধিকাংশ সন্তান হেলায়-ফেলায় প্রহরকে পার করছে। এক শ্রেণির সমাজ-দেশমাতৃকাকে শকুন ও হায়েনার মতো ছিবড়ে-খুঁবড়ে খাচ্ছে। যারা দেখার তারা দেখছে, যারা বোঝার তারা বুঝছে। কোথাও কেউ নেই যে, এই ধবংসযজ্ঞতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে দেশমাতৃকাকে রক্ষার উপায় বের করবে। দেশের যেকোনো স্থান, পর্যায় ও অবস্থান থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করলে হয়তো বা দেশমাতৃকার পরিত্রাণের পথ বা উপায় সম্ভব। আর সেই উপায়ের উৎকৃষ্ট সময় এখন যে যাচ্ছে বয়ে তাতে কোনো সংশয় নেই। অতীতে না হয় ঔপনেবেশিকতার জোয়াল ছিল জাতির ঘাড়ে। তখন না হয় অত্যচার আর শোষণের চাকা ছিল নিত্যপ্রবাহিত, কিন্তু আজ তো স্বরাজত্বের সময়, নিজেদের হাতেই ঘুরছে রাষ্ট্রযজ্ঞ। তারপরও কেন উত্তরণের পথ, সমৃদ্ধির ছোঁয়া ঘটছে না দেশমাতৃকার শরীরে! কেন দুর্নীতির কালো থাবা, অন্যায় আর অত্যচারের খড়গ নিত্য প্রবাহিত হচ্ছে জাতির সমগ্র অবয়বে? জানা নেই এই সব প্রশ্নের সদুত্তর। বোঝা যাচ্ছে না কে জাতির মিত্র! আর কে বা তার শত্রæ! এ এক বীভৎসকাল! বীভৎস সময়।

ভাষা সভ্যতার অমূল্য সম্পদ। সেই সম্পদের পরিচর্যার অর্থ হচ্ছে সভ্যতার পরিচর্যা, প্রয়োজনের তৃষ্ণার নিবারণ। ভাষার ভ‚মিকাকে ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। জাতির দীর্ঘদিনের পথ চলায় সে যেমন সঙ্গী, তেমনি সে অবলম্বনও বটে। ভাষার সমগ্র অবয়বে রয়েছে তার প্রকৌশলী, বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টার, গবেষণার নানা চিহ্ন। অতীত থেকে বর্তমান আর বর্তমানকে নিংড়ে গড়ে তোলা ভবিষ্যতের জগৎ। ভাষাকে পৌঁছাতে হয় জাতির অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত। যা তার জন্য একটা চ্যালেঞ্জও বটে। 


অস্তিত্ব রক্ষায় মাতৃভাষার নানা সংগ্রাম


ভাষার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখব যে তা একদিনের, একজন মানুষের গড়ে তোলা কোনো বিষয় ও ঘটনা নয়। তা জাতির হাজার হাজার বছরের, কোটি কোটি সন্তানের নানা অবস্থানের, নানা প্রচেষ্টার দ্বারা বৃত্তাবদ্ধ একটি প্রধান ঘটনা। সেই ঘটনার রয়েছে নানা নাটকীয়তা, উষ্ণতা, আবেগ, প্রেম ও ক্রোধের নানা উচ্ছ¡াস। কাজেই স্বল্প সময়ের হীনবুদ্ধিতা, কোনো ব্যক্তি বা গোত্রের নঞর্থক ভ‚মিকা তাকে পারে না নিশ্চিহ্ন করতে। যদি বা ভাষার শত্রæরা নানা সময়ে, নানারূপে তার শরীরের উপর বসবাস করে তাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করার পরিকল্পনা শানিয়ে যায়, কার্যক্রম গ্রহণ করে। কিন্তু আমাদের মাতৃভাষা বাংলা এমন এক সংগ্রামশীল ভাষা কাঠামো যে তাতে তারা কোনো ক্রমেই সফল হতে পারেনি। দমন, নিপীড়ন দ্বারা তাকে তার সচ্ছল সমৃদ্ধ প্রবাহন থেকে কোনক্রমেই যায়নি ফেরানো। ভাষার ইতিহাস ঘেটে আমরা দেখতে পাই যে, জাতির সেই প্রাচীন ইতিহাসে ভাষা সৃষ্টির কাল থেকেই তার শত্রæর অভাব ছিল না। ব্রাহ্মণ, ফতোয়া বাজরা ঘোষণা করেছিল, ‘বাংলা ভাষায় যারা চর্চা করবে, –কথা ও সাহিত্য রচনা করবে তারা রৌরব নরকে পতিত হবে।’Ñ আমাদের সহজেই অনুমিত হয় যে, মাতৃভাষা বাংলার বিরুদ্ধে শত্রæদের দৃঢ় অবস্থান কোন পর্যায়ে উচ্চকিত ছিল! মধ্যযুগেও নানা বাধা, ষড়যন্ত্র ছিল বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে। যা প্রাচীন যুগের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের রূপ ও রীতি দ্বারা বৃত্তাবদ্ধ হয়ে আধুনিক যুগেও ত্বরান্বিত হয়েছে! সেকালে বাংলা ভাষাকে একদল বঙ্গবাসী, স্তন্যপায়ী জীব বাংলা ভাষাকে হিন্দুর অক্ষর বা হিন্দুর ভাষা বলে নিধন করতে চেয়েছিল। তাদের অন্তঃকরণজুড়ে ছিল বাংলা ভাষার প্রতি প্রচÐ ঘৃণা আর তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য। অন্যদিকে মোগলদের শাসনামলে ভারতে ফারসি ভাষা রাজভাষা হিসেবে প্রচলন পায়। ফলে মাতৃভাষা বাংলা অনেকটা আক্রান্ত হয়। ভাষার বিকাশের পথ হয় রুদ্ধ। অঞ্চলভিত্তিক জাতিসত্তার সাধারণ মানুষ তাকে বহন করে নিয়ে চলে নিজেদের স্কন্ধে, বুকে। ফলে ভাষা তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। আর আশ্চর্য এই যে, এত সব ষড়যন্ত্র, উৎপীড়নকে ছাড়িয়ে, মাড়িয়ে মাতৃভাষা বাংলা স্বরূপে, স্বমহিমায় বেঁচে থাকার অমর গান শোনাতে পেরেছে জাতির সন্তানদের। 





ঔপনেবেশিক যুগে ইংরেজদের শাসনামলেও বাংলা ভাষার প্রতি দমন-পীড়ন সামান্য ছিল কিন্তু তা অনায়াসে খণ্ডিত  হয়। ইংরেজরা বুঝতে পারে যে, নেটিভদের ভাষার মধ্যেই তাদেরকে নিবিষ্ট রাখতে হবে। নতুন একটি ভাষা শিক্ষার কাজটি প্রকৃতই কঠিন। শিক্ষা- দীক্ষায় উন্নতি না ঘটলে ইংরেজি ভাষার প্রসার, প্রচার ঘটবে না। কাজেই নেটিভদের ভাষার মাধ্যমে নিজেদের ধর্ম খ্রিষ্টানত্বকে ছড়িয়ে দিতে হবে। 

রাজধর্ম রক্ষার জন্য এ পথ অবলম্বনই ছিল তাদের জন্য উৎকৃষ্ট পন্থা। ফলে প্রথমেই শ্রীরামপুর মিশন পরবর্র্তীকালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা ভাষার বিকাশের সুযোগ ঘটে। ইতিহাসের এই সময়টাতেই বাংলা গদ্যের বিকাশের পথ সৃষ্টি হয়। 

এই ক্ষেত্রে ইংরেজদের অবদান অনস্বীকার্য। যদিও তাদের মূল লক্ষ্য ছিল রাজত্ব ও ধর্মের প্রসার, প্রচার এবং তার স্থায়িত্ব। 

অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতেই বাংলা ভাষা, গদ্য ভাষার পথ খুঁজে পেল। মনীষী রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, উইলিয়াম কেরী, রামরাম বসু, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার প্রমুখের শ্রম, মেধা ও আন্তরিকতারগুণে বাংলা ভাষা অনন্যতর পথ খুঁজে পেল। দীর্ঘদিনের চর্চিত কাব্যভাষা তার মসৃণ, পেলব পথ থেকে ঘুরে দাঁড়াল কর্কশ, বন্ধুর পথে। সেখান থেকে যাত্রা পেল  বিস্তৃত এক ভ‚মিস্তরে। আমরা জানি যে, বাহ্যত ইংরেজ ঔপনেবেশিক কাল নানা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণে শেষ হয়। ভারতবর্ষকে ভেঙে ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে সে সময় দুটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি একটি অনাকাক্সিক্ষত চিরন্তন দ্ব›দ্বকে প্রতিষ্ঠিত করে। সেই দ্ব›েদ্বর ধারা এখনও প্রবল প্রবাহিত। এতে বাংলাদেশও খÐিত হয়। বাংলাদেশের পূর্বাংশ পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিমাংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ নামে পরিচিতি লাভ করে। এক জাতি ও তার ভাষা, কৃষ্টি-সংস্কৃতি দ্বিখণ্ডিত হওয়ায় নানা সংকট সৃষ্টি হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই চলতে থাকে নানা নিষ্পেষণ, নির্যাতন এবং অন্যায়। বাংলাদেশের মানুষ সেদিন সচেতনতার সাথে রুখে দাঁড়িয়েছিল। মাতৃভাষাকে রক্ষার্থে গড়ে উঠল রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। সমগ্র পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ মানুষের মুখের ভাষা বাংলাকে অযৌক্তিক ভাবে হঠাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছিল হীন পাকিস্তানিরা কিন্তু বাংলার দুর্বার গণ-আন্দোলন রক্ত ও মৃত্যুর রাজপথ পেরিয়ে এল ভাষার অধিকার। বাংলা ভাষা স্বীকৃতি পেল মহান ৮ ফাল্গুনের ত্যাগ ও তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে। মাতৃভাষা বাংলা প্রোজ্জ্বল হয়ে জ্বলল জাতির ভাগ্যকাশে। ইতিহাসে গৌরবময় স্থান দখল করল মাতৃভাষার বীর সৈনিকেরা। 


বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা


ফেব্রæয়ারি মাস, অমর শহীদের আত্মাহুতি ও চেতনার মাস। একদিকে যা বেদনার চিহ্ন বহনে সক্ষম, অন্যদিকে তা তেমন জাতির গৌরবদীপ্ত সাহসের পরিচয় প্রমাণ করে চৈতন্যের চূঁড়ায় পৌঁছায়। সেই বেদনার চিহ্নকে খোঁড়ার মধ্যে দিয়ে চৈতন্যের স্পর্শ লাভ এবং ভাষাসংগ্রামীদের মহৎ প্রবণতার খোঁজ পাওয়ার মধ্য দিয়ে জাতির গৌরবের পথ ভাস্বর হয়ে ওঠে। আর একথা তো আমরা জানি যে, ভাষার চর্চার মধ্য দিয়েই তার বেঁচে থাকার গান, জেগে থাকার মূল সূত্রj করে চলি! না গ্রহণে, চর্চায় তাকে প্রধানতর ভ‚মিকায় রাখি! 

ভাষার প্রধান সম্পদ তার শব্দভাণ্ডারের। বর্তমান কালে সেই শব্দ ভাÐারের দ্বারস্থ আমরা ঠিক-ঠাক হচ্ছি না! শব্দসমূহের ব্যবহারে যতœবান না হওয়াতে বাংলা ভাষার অনেক শব্দই আজ অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। তাদেরকে আলো-বাতাসে নিয়ে আসা জরুরি। মূলত সেই শব্দসমূহ আজ মুমূর্ষুর পথে। আকাশসং¯ৃ‹তির প্রভাব, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় ষড়যন্ত্রের নিত্য-নতুন ফাঁদে জাতির সন্তানেরা। তারা অবুঝ ও আহাম্মক। কিসে তাঁদের মঙ্গল আর কিসে বা তাদের অমঙ্গল বা দায়-দায়িত্ব তা আজ কারও মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই কবি শামসুর রাহমানের কবিতায় মাতৃভাষা বাংলার বর্ণমালাসমূহ ‘দুঃখিনী বর্ণমালা’ হিসেবে ক্রন্দনরত। 


ভাষা নদীর  মত চলতে ভালোবাসে। তা মানুষের মুখে মুখে, অন্তরে অন্তরে লেখায়-লেখাতে বেঁচে থাকে। তাকে ভুলে গেলে, বিস্মিত হলে ধীরে ধীরে সে বিলুপ্তির পথ খুঁজে নেয়। ভাষার প্রধান সম্পদ যে শব্দভাÐার তার সঠিক ব্যবহার প্রয়োজন। তাকে ঘষে-মেজে রাখাটা জরুরি। এতে ভাষার স্বরূপটি ফুটে ওঠার পাশাপাশি তার সমৃদ্ধি, শিহরণ, ঔজ্জ্বল্য প্রকাশ পায়। প্রকাশ পায় তার সম্ভাবনার উজ্জ্বলতর নানা দিক। শব্দে, শব্দে ধ্বনিতে ধ্বনিতে নতুন শব্দের সৃষ্টির পথও কোনো কোনো সময় ওঠে জেগে। কাজেই ভাষার পরিচর্যার প্রয়োজন তার বর্তমান ও ভবিষ্যতের কথা ভেবে। 

জাতির  সন্তানদেরও উচিত সচেতনভাবে ভাষার গৌবর ও অর্জিত সম্পদের সার্বিকভাবে সদ্ব্যবহার করা। কারণ আগামী দিনের সন্তানগণ এই যুগের পানে চেয়ে রয়েছেন। আমাদের নিত্য-নতুন উদ্ভাবন ক্রিয়ার উপর, পরিচর্যার উপর ভর করছে ভবিষ্যতের জাতির সুখ-শান্তি। আমরা যদি পূর্বসূরিদের মতো নিজেদের জাতি ভাবনার নানা দিক নিয়ে সোচ্চার না হই, তাহলে জাতির ভবিষ্যতের সন্তানেরা নানা দুঃখ-কষ্টে পতিত হবে। 


আমরা যদি নিজেদের মঙ্গল চাই তাহলে তাদের কথা ভেবে, ভবিষ্যতের কথা ভেবে বর্তমানকে সেইভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। নিজেদেরকে ত্যাগে, শ্রমে, মহত্বে উন্নত করতে হবে। এসব চেতনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মহান ভাষা শহিদ ও সংগ্রামীদের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের বীরসেনানীদের আত্মত্যাগের উজ্জ্বল গৌবর। 

আজ স্বাধীন বাংলাদেশের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যেমন সৃজনশীল চর্চা অব্যাহত রয়েছে, তেমনি অব্যাহত রয়েছে ভাষাকে আক্রান্ত করার নানা অভিসন্ধি। জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে ভাষার দুশমনেরা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলা ভাষা ও তার কৃষ্টি-সংস্কৃতির বুকে কুঠারাঘাত হানছে অজ্ঞদের হাত। বাংলা ভাষার মর্যাদা অন্তর থেকে অনেক পূর্বেই নির্বাসিত। এ ব্যাপারে সুশীল সমাজের উদ্বিগ্নতা সামান্য হলেও কার্যকরী পদক্ষেপের অভাব সর্বস্থানে পরিলক্ষিত। ভিন্ন ভাষার প্রতি আগ্রহ দোষের নয় কিন্ত আমাদের বর্তমান কালের আগ্রহ দোষের অবস্থানকে ছাড়িয়ে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতির ভ‚মিকায় পৌঁছেছে। যাকে প্রতিহত করা আজকের জাতির সন্তানদের অনিবার্য কর্তব্য। 


বাংলিশ চর্চা ও ভাষার বিবমিষা


আমাদের দেশে বেসরকারি রেডিও সেন্টারগুলোয় কিছুকাল পূর্বে শুরু হয়েছে বাংলিশ নামে এক অদ্ভুত ভাষা ধ্বংসের খেলা। কিছু অন্তঃসারশূন্য মনন-মেধাবীরা অসচেতনভাবে এই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে প্রবল প্রতিপত্তিতে। এতে না হয় বাংলা, না হয় ইংরেজি। অন্যদিকে জনজীবনে এর প্রভাব পড়ছে নানান মাত্রায়। ভাষার এই বেহাল দশা থেকে মুক্ত প্রচেষ্টা যদিও কম নেই, তবু আশ্চর্য যে তারা কোন ভাবনা-চিন্তা থেকে এই হীন কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েছে! আধুনিকতার নামে যুগ বৈচিত্র্যে জেগে যারা এই রকমভাবে গা ভাসিয়ে দিয়ে ভাষার মতো এক মহান সত্য ও শক্তিকে কলুষিত করতে চেয়েছে, চেয়েছে অত্যাচার করতে; তাদেরকে শিক্ষা দেবার প্রয়োজন। প্রয়োজন হাজার বছর ধরে চলে আসা ভাষার ধারাবাহিক দিকগুলো সর্ম্পকে জ্ঞানদান। প্রয়োজনে ভাষার ইতিহাসকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো। 

এছাড়া বর্তমানে কবিতায়, গল্পে, প্রবন্ধে, উপন্যাসে এবং নাটকে তথা সাহিত্যের সমগ্র শরীরে বিদেশি ভাষার সুকৌশলী পদচারণা আমাদের অবাক করে তুলছে! হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, বাংলা ভাষার ধারণক্ষমতা বিদেশি অন্যান্য ভাষার চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি। বাঙালি জাতির মতোই তার ভাষা বাংলাও শংকর। এতে সন্নিবেশিত হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রকার ভাষার শব্দ ও গঠনরীতি। হয়তো আজও বাংলা ভাষায় বিদেশি ভাষার সংমিশ্রণের প্রয়োজন কিন্ত ইতোমধ্যে তার শরীরে যা অধিকার পেয়েছে, হাজার হাজার বছরের ক্রিয়া-বিক্রিয়ায় সেসবের প্রয়োগে বৈজ্ঞানিক ভাবনা-চিন্তার অবকাশের মধ্যে দিয়েই আমাদের এগোতে হবে। তাতে আমাদের প্রয়োজন মিটলে তবেই না আমরা নতুন বিষয় ও শব্দের কাছে পৌঁছাব এবং সেটিই হবে যুক্তিসংগত ও মঙ্গলময়। আমরা চাই না ঠুনকো বোধোদয়ের জয় এবং উল্লাস! আমরা চাই, ভাষার সংগঠিত রূপ ও সমৃদ্ধি। অতীতের নানা অর্জনকে সম্পূর্ণভাবে ব্যবহারে নৈপুণ্যেই যখন আমরা বর্তমানে ব্যর্থ, সেখানে নতুন নতুন বিদেশি শব্দের প্রয়োগ আমাদের জন্য কী মঙ্গল বয়ে আনতে পারে? কীভাবে পারে মাতৃভাষা বাংলাকে পরিশোধিত করতে?

বর্তমানে যাঁরা বাংলা ভাষার উপর এই রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদের উদ্দেশ্যে আমাদের বক্তব্য পরিষ্কার। আমরা পরিষ্কারভাবে বলতে চাই যে, ভাষার বর্তমান অবস্থান ও পরিস্থিতির বিচার-বিশ্লেষণ ও গবেষণা করেই আপনারা তার শরীর নিয়ে নাড়া-চাড়া করুন। খুঁজুন প্রয়োজনীয় শব্দ, ঐশ্বর্য। ভাষার প্রয়োগের ক্ষেত্রে মনের ভাব ঠিক প্রকাশ করতে না পারেন, অথবা শব্দভাণ্ডারের শব্দসমূহ পছন্দ না হয়! সে ক্ষেত্রে বিদেশি শব্দের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন। 

তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু নিজ ভাষার প্রতি প্রেমহীনতার এমন প্রমাণ, প্রয়োগ না করুন। এতে অন্তিমে নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবেন, করবেন প্রভাবিত। এতে করে আপনি জাতির কুলাঙ্গার সন্তান হিসেবে চিহ্নিত হবেন। ব্যক্তিজীবনেও হবেন প্রবল অসুখী।

মাতৃভাষা বাংলাকে প্রাচীন যুগ থেকে আধুনিক যুগে পৌঁছে দিয়েছেন এ ভাষার মহান প্রকৌশলীগণ, বিজ্ঞানী এবং কবি-সাহিত্যিকগণ। এদের সাথে ভ‚মিকা রেখেছেন জাতির সাধারণ সন্তানগণ। নানা পরীক্ষা, নানা ভাষার মিশ্রণ, শব্দে শব্দে প্রেম, বিরহ সংগঠিত করে ভাষাকে সংগঠিত করে ভাষাসংগঠকেরা তাকে গড়েছেন নানা মাধুর্যে, নানা রঙে। হঠাৎ করে খুব সংক্ষিপ্ত সময়ে ভাষা নিয়ে উন্নাসিকতা আমরা আজ মানব কেন? বিশেষ করে যখন আমরা বুঝতে ও দেখতে পারছি এসবের মূলে কাজ করছে নানারকম অজ্ঞতা, অপরিপক্বতা এবং অবশ্যই উন্নাসিকতা।

তাই আসুন, আমরা প্রত্যেকে ফিরে আসি অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে, প্রজ্ঞার পথে ভাষা ও তার জাতিপ্রেমে, ইতিহাস-ঐতিহ্যের পথ ধরে বর্তমানকে করে তুলি অর্থময়। ভবিষ্যতকে গড়ে তুলি ঋদ্ধ ও বলিষ্ঠ। জাতির আগামী সন্তানদের জন্য মা, মাটি ও মাতৃভাষাকে রাখি সুরক্ষিত, চর্চিত এবং নন্দিত।



ছবি : বিধান দেব 



ফেব্রুয়ারির গদ্য : অভিজিৎ দাশগুপ্ত

 


বাংলা ভাষা ও বাঙালির কৃষ্টি



সংস্কৃত ভাষা থেকে স্বাভাবিক বিবর্তনের পথ ধরে পালি , প্রাকৃত , অপভ্রংশ , দেশীয় ভাষার  উৎপত্তি হয়। তাই বাংলার প্রাচীন ভাষা- নিদর্শন চর্যাপদ এর সঙ্গে পাওয়া গেছে সরহ ও কাহ্নের ' দোঁহা ' এবং ' ডাকার্ণব ' , যেগুলি শৌরসেনী অপভ্রংশ ভাষায় রচিত । অর্থাৎ একই কবি দুই ভাষায় কবিতা রচনা করেছেন।
ভাষার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা লিপির কথা বলা উচিত। মৌর্য সম্রাট অশোকের ব্রাহ্মী লিপি থেকে  ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের নানা বর্ণমালার জন্ম ।  এ প্রসঙ্গে রমেশচন্দ্র মজুমদার জানাচ্ছেন , ---
   " পূর্ব ভারতীয় বর্ণমালায় বাংলা বর্ণমালার পূর্বাভাস পাওয়া যায় । প্রথম মহীপালের বাণগড় লিপিতে ব্যবহৃত অ,উ,ক, খ ,গ, ধ,ন,ম,ল এবং ক্ষ অনেকটা  বাংলা অক্ষরের আকার ধারণ করিয়াছে। জ একেবারে সম্পূর্ণ বাংলা ' জ ' য়ের অনুরূপ।    দ্বাদশ শতাব্দীতে উৎকীর্ণ বিজয়সেনের দেওপাড়া প্রশস্তিতে যে বর্ণমালা ব্যবহৃত হইয়াছে , তাহার মধ্যে ২২টি পুরাপুরি অথবা প্রায় বাংলা অক্ষরের মত। "
প্রাচীন বাংলার তাম্রশাসন ও পুঁথি প্রচলিত বাংলা অক্ষরে লেখা হত। কিন্তু সহস্রাব্দ প্রাচীন সেই ভাষাকেও একদিন সংকটের মুখোমুখি পড়তে হয়।
১৯৫২ সালে তদানীন্তন পূর্ব বাংলায় গণআন্দোলনের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হয় । পরবর্তীতে (১৯৬১ ও ১৯৭২) আসামের বরাক উপত্যকার শিলচর ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায়  ওই একই দাবিতে আন্দোলন সংগঠিত  হয় ।  রফিক , বরকত, জব্বার, শফিউর থেকে কানাইলাল , চণ্ডীচরণ , হিতেশ , বীরেন্দ্র , বিজন , কমলা প্রমুখের শহীদ হওয়ার মধ্যেই  প্রকাশ পায় বাংলা ভাষার গুরুত্ব ।
কিন্তু ভাষা তো প্রতিটি জাতির সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্র , তাতে সন্দেহ নেই । একটা ব্যপার ভুলে গেলে চলবে না , এই ভাষার সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে সেই মানুষগুলির কৃষ্টি-সংস্কৃতি। এরা একে অপরের সঙ্গে ঘনসন্নিবদ্ধ । বাংলা ভাষার সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির কৃষ্টি নিয়ে সচেতন হবার সময় এসেছে।
গঙ্গা-পদ্মা বিধৌত এই বাংলার মাটি । ভূমি উর্বর।
' বীজমাত্রই এখানে সজীব হয়ে ওঠে । ' এই সজীবতা প্রাণ ধর্মের ক্ষেত্রেও  প্রযোজ্য । ভূমি কঠিন নয় বলেই গুরুভার এই দেশে সহ্য হয়না ।  মানুষ গড়ে উঠেছে তার স্বাভাবিক সাধনা নিয়ে । ' সুকুমার
সূক্ষ্মতাবোধ ' এখানকার একটি বিশেষত্ব। তাই হিংসা বিদ্বেষ  এই অঞ্চলের মানুষ বর্জন করেছেন ' সবার উপরে মানুষ সত্য ' নীতিকে আঁকড়ে ধরে । ' বাংলার সাধনা ' গ্রন্থে  ক্ষিতিমোহন সেন জানাচ্ছেন বাঙালির অন্তর্লোকের  সেই মুক্তিস্বরূপিণী  চিন্তাকে । ----
      "এইজন্যই এই যুগেও বাংলাদেশে একে একে রামমোহন , মহর্ষি , পরমহংসদেব , বিবেকানন্দ, অরবিন্দ প্রভৃতি সেই একই সত্যকে বারবার  ঘোষণা করে গেছেন , সে সাধনা এখনো চলেছে। হিংসাবিদ্বেষ- জর্জরিত এই যুগে  তাই বিধাতা একের পর এক সাধককে এই বাংলাদেশ পাঠিয়েছেন। সমস্ত বিশ্বের জন্য তাঁদের প্রয়োজন । রবীন্দ্রনাথও এইজন্যই এসেছিলেন । রবীন্দ্রনাথ চলে গেলেন, কিন্তু তাঁর সাধনা দেশের বুকে চিরকালের জন্য রেখে গেলেন। "
বাঙালির ভাষা -কৃষ্টি তার ধর্ম ও দর্শনকে গ্রহণ করে গড়ে উঠেছে একে একে ।  " এখানকার উপযুক্ত সাধনা হল ব্যাহৃতি-মন্ত্র ' ভূর্ভুবঃ স্বঃ '।  অর্থাৎ  স্বর্গ- মর্ত্য -অন্তরীক্ষ-বিশ্বচরাচরে বিস্তৃত হোক আমাদের ধ্যান। "--- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । ধর্ম থেকে ভক্তি, সুর থেকে বাণী সর্বত্র এই সাধনাই আমরা লক্ষ্য করি ।তাই উত্তর ভারতের রামচন্দ্র ভাগীরথী তীরে এসে হয়েছেন ' রঘুকুলগুরু'। ধোয়ীর এই কথার সমর্থন পাই কৃত্তিবাস রচিত ' শ্রীরামের পাঁচালী '- তে। মূল রামায়ণের বীর  রামচন্দ্র কৃত্তিবাসে ভক্তের ভগবানে পরিণত হন । অন্যান্য চরিত্রগুলিও ' বাঙালি সংস্কৃতিরই পরিচায়ক '  হয়ে ওঠে । " ভক্ত তুলসীদাস যেমন পরবর্তী কালে উত্তর -ভারতে রামকথার  এক নূতন রূপ দিয়েছিলেন , তাঁর আগে কৃত্তিবাস বাংলাদেশে তারই সূচনা করেছেন । বস্তুতঃ কৃত্তিবাসী রামায়ণ ভক্তিগ্রন্থেই পরিণত হয়েছে ,  এতে যে রামনামতত্ত্ব  প্রচারিত হয়েছে, তাই চৈতন্যযুগে নতুন রূপে ও পরিবেশে অভিনব তাৎপর্য লাভ করেছে। "--- অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়।
বাঙালির এই  কৃষ্টির সঙ্গেই আজ আমাদের সাধন পথকে উন্মুক্ত রাখার সময় এসেছে।
 


ছবি : বিধান দেব 



 

ফেব্রুয়ারির গদ্য : কাওসার আহমেদ

 


কোন একটি দিন, কোন একটি জাতীর যুগান্তরের সম্ভাবনা নিয়ে আসে। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতীর জন্য তেমনই মহৎ একটি দিন। দিনটি শুধুমাত্র একটি তারিখ নয়, দিনটি বাঙালির অস্তিত্বের জানান দেয়। 

এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে একুশের চেতনার সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলাকে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানের সাথে। তৎকালীন পাকিস্তানের শতকরা ৫৬ জন মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা।  কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শতকরা ৭ জনের ভাষা উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেয়৷ প্রতিবাদ করে পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষ। রাজনৈতিক আন্দোলনের মূল ইস্যু হয়ে ওঠে মাতৃভাষা বাংলার দাবি। 

১৯৫২ সালের শুরুর দিকে আন্দোলন জোড়ালো রুপ ধারণ করে। শাসকগোষ্ঠী পুনরায় উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা করে। তার প্রতিবাদে একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ ( ৮ ফাল্গুন, ১৩৫৮) রোজ বৃহস্পতিবার  "রাষ্ট্রভাষা দিবস" ও হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত হয়। পাকিস্তান সরকার আন্দোলন প্রতিহত করতে ১৪৪ ধারা জারি করে। সকল প্রকার জনসভা ও মিছিল নিষিদ্ধ করে দেয়। ছাত্ররা ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণ হতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করে। মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। শহীদ হন রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার সহ নাম না জানা আরও অনেকে।

একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি সারাদেশ বিক্ষোভে ও হরতালের ডাক দেওয়া হয়। ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক সহ আপামর জনগণ একযোগে সারাদেশে হরতাল পালন করে ও বিক্ষোভ মিছিল বের করে। সেদিনও পুলিশ মিছিলে গুলি চালায়। শহীদ হন শফিক, রিক্সাচালক আউয়াল ও এক কিশোর। শহীদদের স্মরণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে রাত জেগে তৈরি করা হয় শহীদ মিনার। কিন্তু পুলিশ তা ভেঙে দেয়। পুনরায় আবারও তা তৈরি করা হয়। 

প্রবল আন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার ১৯৫৪ সালের ৭ মে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের ১ম সংবিধান হলে বাংলা এবং উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। 

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তায় একুশের চেতনার সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রতিটি আন্দোলনের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল ভাষা আন্দোলন। এরপর একুশের পথ ধরেই বাঙালি পেরিয়ে এসেছে নানা সংকট। 

একুশের চেতনার তাৎপর্য বহুমুখী। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালির উপর যে অত্যাচার, জাতিগত নিপীড়ন চালিয়েছেল তার বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে একুশ উদ্ভুদ্ধ করেছে। আমাদের সচেতন করে গনতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চেতনায়। বাঙালির জাতিসত্তার স্বরুপ আবিষ্কারে একুশের চেতনা অসামান্য ভুমিকা রেখেছিল। ধর্মান্ধতাকে পেছনে ফেলে জাতিগত চেতনা জেগে উঠেছিল। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এবং শিল্প সংস্কৃতিতে একুশের চেতনার তাৎপর্য অসামান্য। আব্দুল গাফফার চৌধুরীর অনন্য গান," আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?" একুশের ফসল নামে খ্যাত। একুশের চেতনার ধারায় আমরা অর্জন করেছি দেশাত্মবোধক গানের সমৃদ্ধ সম্পদ।

১৯৫৩ সালে শহীদ দিবস পালনের সময় প্রগতিশীল কর্মীরা কালো পতাকা উত্তোলন, নগ্নপদে প্রভাতফেরি, শহীদদের কবরে ও শহীদ মিনারে পুষ্পমালা অর্পণ ও একুশের গান গাওয়ার কর্মসূচি পালন করে।  

একুশের চেতনা সাহিত্যে সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছে। কবি মাহবুবুল আলম রচনা করেছেন অমর কবিতা,"কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।" মুনীর চৌধুরী লিখেছিলেন কালজয়ী নাটক,"কবর"। যা প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকা রাজবন্দিদের দ্বারা। হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনার একুশের সংকলন "একুশে ফেব্রুয়ারি", আরেকটি অমর সৃষ্টি। 

একুশের চেতনায় প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা একাডেমি বই মেলার আয়োজন করে। একমাস ব্যাপি চলে বইমেলা। লেখক পাঠকের সমারোহে এক আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এছাড়াও একুশে পদক সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক হিসেবে স্বীকৃতি প্রাপ্ত। 

এতো অগ্রগতি স্বত্তেও একুশের চেতনার স্বপ্নভঙ্গের দিকগুলোও কম নয়। আমাদের সমাজে এখনো অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল চেতনার আশানুরূপ বিস্তার লাভ করেনি। মৌলবাদ, ধর্মীয় জঙ্গিবাদ ক্রমশই সমাজকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। 

একুশের চেতনার অন্যতম দিক হচ্ছে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার বিস্তার।  এর অর্থ শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ বাংলা ভাষায় দক্ষতা অর্জন করবে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষায় বাংলা ব্যবহৃত হবে। উচ্চ আদালতেও বাংলা ভাষার প্রচলন হবে। বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রভাষা বাংলা। কিন্তু সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে বাঙালির দ্বারাই বাংলা ভাষা অবহেলিত। শিক্ষাক্ষেত্র, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য, গণমাধ্যম ও বিজ্ঞাপনে ইংরেজি ভাষার আধিপত্য। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিস্তার, সাধারণ শিক্ষায় ইংরেজি পাঠ চালু করার ফলে বাংলার গুরুত্ব কমছে। তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণে বিদেশি ভাষার ব্যাবহার। বিয়ে বা জন্মদিনের আমন্ত্রণপত্রে বিদেশি ভাষার ব্যবহার। দৈনন্দিন কার্যক্রমে বাংলা ভাষার সাথে  বিদেশি ভাষার মিশ্রণ।

কার্যত আমরা অনেকেই ভুলে যেতে বসেছি যে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে মাতৃভাষার উন্নয়ন অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভবত সেই  জন্যই এ জায়গাটিতে আমাদের পিছুটান ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। আমরা অনেকেই ভুলে যাচ্ছি, বাঙালির পরিচয়ের মূলভিত্তি হচ্ছে তার মাতৃভাষা।  ভুলে যেতে বসেছি আর্থ-সামাজিক জীবনে বাংলা ভাষার ব্যাবহার যথাযথ গুরুত্ব না পেলে তার শক্তি ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাবে।

এসব সত্ত্বেও আমাদের ভুললে চলবে না , একুশের চেতনাই আমাদের নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করার প্রেরণা জাগিয়েছে। ভাষা আন্দোলনের অমর স্মৃতি বিজড়িত মহান একুশে ফেব্রুয়ারি শুধুমাত্র আর আমাদের ইতিহাসের একটি দিন নয়। এ দিন এখন পেয়েছে বিশ্বস্বীকৃতি। পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা। আমাদের এ অর্জন এক অসামান্য গৌরব।

একুশ আমাদের অহংকার। একুশ আমাদের প্রেরণার উৎস। অমর একুশ একাধারে ইতিহাস, ঐতিহ্য, গৌরবগাথা। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ একুশের চেতনারই অর্জন। তাই একুশের চেতনা প্রতিনিয়ত  আমাদের উজ্জীবিত করে। এই চেতনা সমুন্নত রেখে বাঙালির সকল ধরনের কল্যাণ ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে যেতে হবে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার বিস্তার ঘটাতে হবে।

ছবি : বিধান দেব 

ধারাবাহিক গদ্য : দীপক হালদার

 


ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্য চর্চার ইতিবৃত্ত



ছয়.

ডায়মন্ডহারবারের শিশুসাহিত্য রচয়িতাদের মধ্যে রয়েছে অনিবার্য আরও একজনের নাম ।তিনি সেকেন্দার আলি ।সেকেন্দার প্রথম থেকেই শিশুসাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন ।পরবর্তীকালে দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর সম্প্রতি তাঁর লেখা চোখে পড়ছে ।ইয়ার নবী গায়েনের লেখাও নজরে আসত একসময় ।বর্তমানে আর চোখে পড়েনা। আরও একজন শিশু সাহিত্য রচয়িতার নাম মনে পড়ছে, তাঁর নাম প্রভাসচন্দ্র বর্মণ। মনে পড়ছেনা তিনি প্রভাস বর্মণ নামে নাকি প্রভাসচন্দ্র বর্মণ নামে লিখতেন।যাই হোক  তাঁর লেখা এখন আর দেখা যায় না।শিশুসাহিত্য রচনায় ডায়মন্ডহারবারে এক শ্রদ্ধা উদ্রেককারী নাম শৈলেশ্বর মিত্র ।বিভিন্ন বিষয়ের উপর রচিত তাঁর শিশুদের উপযোগী নাটক, কাব্যনাট্য, ছড়া কবিতা শিশুদের মনোরঞ্জনে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিল ।তাঁর রচনাবলী যদিও স্থানীয় একটি নার্সারি স্কুলের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বেশি প্রচারিত ছিল তবুও একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে সেইসব আলেখ্যগাথা, ছড়ার সর্বজনীন একটা আবেদন ছিল।

সম সময়ে অচ্যুত হালদারের সম্পাদিত  বন্দর পত্রিকাকে কেন্দ্র করে যেসব সাহিত্যসেবীগণ  নিষ্ঠার সঙ্গে সাহিত্য চর্চা চালিয়েছিলেন তাঁরা সেসময়ে বন্দরগোষ্ঠীর ব'লে পরিচিত ছিলেন ।
অচ্যুত হালদার নিজে তো ছিলেনই,সাথে হরেন্দ্রনাথ বসুমল্লিক, অমিট রে ছদ্মনামে অজিত মন্ডল এবং আরো কয়েকজন বিপুল উদ্যমে খুবই আন্তরিকতার সাথে বন্দরের সমৃদ্ধির জন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন ।অচ্যুত হালদার, হরেন্দ্রনাথ বসুমল্লিক ছোটগল্প রচনায় ব্রতী ছিলেন ।অমিট রে প্রবন্ধ রচনার চেষ্টা করতেন ।গল্প, প্রবন্ধ ছাড়া বহু কবিতাও ছাপা হতো বন্দর- এ।কলকাতা থেকে অনেক বিশিষ্ট সাহিত্যিক লিখতেন বন্দর পত্রিকায়।নির্মলেন্দু গৌতম নামে এক সাহিত্যিকের নাম মনে পড়ছে ।কবিতা থাকত প্রখ্যাত কবিদের সাথে স্থানীয় কবিদেরও ।
             ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্যচর্চা জগতে প্রবন্ধ রচনার আকাল বর্তমানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় ।অথচ ছয়ের দশকে, সাতের-আটের দশকে অধ্যাপক শিবপ্রসাদ হালদার, অধ্যাপক দুলাল চৌধুরী,অধ্যাপক গোপাল বন্দ্যোপাধ্যায়,ডাঃ অরুণ বসু, শিক্ষাব্রতী শিশির দাস প্রমুখ ব্যক্তিত্বগণের নিবিড় ঐকান্তিকতা ও মেধাবী প্রকাশে প্রবন্ধ সাহিত্য বেশ লালিত হয়েছিল।বর্তমানে তরুণ সাহিত্যসেবী চন্দন মিত্র খুবই আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছেন প্রবন্ধ সাহিত্য চর্চাকে সচল রাখতে।চন্দন মিত্র ছাড়া অন্য কারো মধ্যে সেই চেষ্টা দেখা যাচ্ছে না ।
                     ডায়মন্ডহারবারের নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসও উল্লেখযোগ্যতার দাবিদার ।নাটক রচনা, কবিতাকে,গল্পকে নাট্যরূপ দিয়ে অভিনয় করা হয়েছে একসময় বারংবার ।রবীন্দ্রনাথের কাব্যনাট্য, গীতিনাট্য মঞ্চস্থ হয়েছে অনেকবার ।এটাও অনস্বীকার্য ডায়মন্ডহারবারের সংস্কৃতিপ্রাণ মানুষ ওইসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের রুচি এবং সংস্কৃতির পরিচয় রেখেছেন দীর্ঘদিন ধরে ।ছয়ের দশকে ডায়মন্ডহারবার থানার ধনবেড়িয়া গ্রামের কৃতী সন্তান কবি,গল্পকার,নাট্যকার সরোজ  কুমার দাসের ঐকান্তিক ইচ্ছা ও প্রচেষ্টায়  রবীন্দ্রনাথের গল্প কবিতার নাট্যরূপ  অভিনয় করাতে দেখা গেছে বহুবার।তিনি নিজে নাট্যরূপ দিতেন এবং ওইসব নাটকে  অভিনয় ও করতেন ।কবিতা 'পুরাতন ভৃত্য ', 'দুই বিঘা জমি' ,ছোটগল্প  'ছুটি ','শাস্তি 'সহ  বহু গল্প কবিতার নাট্যরূপ অভিনীত হয়েছে ডায়মন্ডহারবার থানার ধনবেড়িয়া গ্রামে । সরোজ কুমার দাস পেশায় জেলা জজ,কিন্তু নেশায় সাহিত্য সেবী এবং সংস্কৃতি মনস্ক ।এগুলো নিশ্চয়ই আশাব্যঞ্জক ,কিন্তু  হতাশার এই যে, বর্তমানে এরকম কোনো প্রচেষ্টা চোখে পড়ছে না ।ওই ধরনের চর্চা আর হতে দেখা যাচ্ছে না ।
                                        যদিও ডায়মন্ড হারবারে নাট্যচর্চার ইতিহাস বহু পুরনো।ঊনিশ শ পনের খ্রিস্টাব্দে ডায়মন্ডহারবারে ডায়মন্ড ক্লাবের জন্ম। ক্লাবের নাট্যমঞ্চসহ ক্লাবভবন নির্মিত হয় ঊনিশ শ ঊনত্রিশ সালে।যতদূর সম্ভব ওই নাট্যমঞ্চটি ডায়মন্ডহারবার মহকুমায় প্রথম। নাট্যচর্চার কেন্দ্র হিসেবে একসময় ডায়মন্ড ক্লাবের সুনাম ছিল। তাছাড়া বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের উপযোগী নাটক প্রযোজনা ও পরিবেশনের মধ্য দিয়ে ডায়মন্ড ক্লাব নিজেদেরকে সাধারণের কাছের ক্লাব হয়ে উঠেছিল। ওই মঞ্চে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও জনসংযোগ বিভাগের পরিবেশিত রবীন্দ্র গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য মঞ্চস্থ হতে দেখা যেত একসময় প্রায় নিয়মিত। স্থানীয় শিল্পী শ্রাবণী মাইতি এবং বসুধা মাইতি উৎকৃষ্ট নৃত্যশৈলী ও নৃত্য পরিচালনার ফলে একদা ডায়মন্ডহারবারের নুনগোলা সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। 
                            ঊনিশ শ পঞ্চান্ন সাল থেকে ঊনিশ শ ষাট সাল পর্যন্ত নাট্যচর্চার গতি বেশ স্থিমিত ছিল।ঊনিশ শ ঊনসত্তর- সত্তর সালে ডায়মন্ড টকীজ হলে প্রায় নাট্য প্রতিযোগিতার সূচনা হয়।ছয়ের দশক থেকে ডায়মন্ডহারবারের নানা জায়গায় নাট্যচর্চার উন্মাদনা লক্ষ্য করা যায়।ডায়মন্ডহারবারে কিশোর সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠিত হয়,যা ঊনিশ শ বৃষ্টি সালে যাযাবর গোষ্ঠীতে রূপান্তরিত হয়।এঁদের পরিচালনায় বহু নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল সেসময়।অভিনেত্রী সঙ্ঘ, চলতরঙ্গ নাট্যসংস্থা,ডায়মন্ডহারবার ষ্টেট ব্যাঙ্ক রিক্রিয়েশন ক্লাব, ডায়মন্ডহারবারের কো অপরেটিভ ব্যাঙ্ক কর্মচারী সমিতি ও বহু নাটক উপহার দিয়েছে।
         যখন প্রাচীন অভিনেতাদের অনেকেই অন্তরালে তখন নতুন রক্তের টগবগে আদল নিয়ে জন্ম নিল দর্পণ নাট্যসংস্থা।কর্ণধার দেবপ্রসাদ মন্ডলের সুচিন্তিত অনুধ্যানে এবং ঐকান্তিক নিষ্ঠার ফলে দর্পণ অচিরেই নাট্যমোদী মানুষের মন জয় করে নিল।দর্পণ সংস্থা নাটক নিয়ে নিয়মিত পরীক্ষা- নিরীক্ষায় বিশ্বাসী ছিল।বহু উল্লেখযোগ্য নাটক উপস্থাপন করার নজির স্থাপন করেছিল দর্পণ। এভাবেই ঊনিশ শ পঁচাত্তর-ছিয়াত্তর  সাল পর্যন্ত ডায়মন্ডহারবারের নাট্যজগৎ বেশ রমরমিয়ে চলেছিল। 
                                          এইসব চর্চা ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে অক্সিজেন যোগান দিয়েছিল। উন্মাদক অনুপ্রেরণা আর কল্পনার উদ্দীপক হিসেবে কাজও করেছিল রন্ধ্রে রন্ধ্রে ।
               ডায়মন্ডহারবারে বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে কিংবা প্রশাসনের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণকাজে যোগদান করেছেন কবি সন্তোষ চক্রবর্তী, কবি সুধেন্দু মল্লিক, কবি অলোক মুখোপাধ্যায় প্রমুখ ব্যক্তিত্ব।তাঁদের প্রত্যক্ষ সাহচর্যে, আনুকূল্যে ও সহযোগিতায় লালিত হয়েছে ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্যের পরিমণ্ডল ।মহকুমাশাসক তারাপদ ঘোষ ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্য সাধকদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যোগাযোগ রেখে চলতেন ।তিনি হলদিয়ায় বদলির পরেও ওই যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন ।হলদিয়া উৎসবে তিনি উদ্যোগী হয়ে ডায়মন্ডহারবারের কবি- সাহিত্যিকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ।সাহিত্য অনুষ্ঠান,কবিতাপাঠের পর রাতে ডায়মন্ডহারবারে ফেরার জন্য সুসজ্জিত সরকারি লঞ্চের ব্যবস্থা করে আমাদেরকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন ।মহকুমাশাসক স্বরাজরঞ্জণ চক্রবর্তী ডায়মন্ডহারবারে কর্মরত অবস্থায় অকস্মাৎ অকাল প্রয়াত হন।তিনিও তাঁর জীবিতাবস্থায় মহকুমাশাসকের পাশের মাঠে প্যান্ডেল বেঁধে সাহিত্য অনুষ্ঠান,কবিতা পাঠ, সঙ্গীতানুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেছিলেন সানন্দ সহযোগিতার মধ্য দিয়ে ।


ছবি : বিধান দেব 

ধারাবাহিক গদ্য : অভিজিৎ দাশগুপ্ত


 

সাধনপর্বের নির্জনতা


১১.

জলে হস্মিন সন্নিধিং কুরু
তারপর গর্ভগৃহে দক্ষিণের মুর্গেশ  বললেন :
' উত্তরের গঙ্গাজল ঢেলে দিন গোদাবরী জলে ।
গঙ্গা-গোদাবরী ধারা কালো পাথরের মূর্তি বেয়ে ভাসায় ভারত তথা কন্যাকুমারিকা নামে মেয়ে ।
#
তত সন্নিহিত হই যতই জলের কাছাকাছি
ব্রহ্মপুত্র যমুনা ও সরস্বতী নর্মদা কাবেরী।
হিমালয় থেকে মেঘ ভারতসমুদ্রে গলে মেশে আমাদের তোমাদের তাহাদের পরিচয় এসে।

গীতা চট্টোপাধ্যায়ের এ কবিতা প্রকৃত কবিতা- পাঠকের কাছে অপরিচিত নয় । কবিতাটি প্রথম পড়ার পর খুব যে বোধগম্য হয়েছিল , বলতে পারব না । কিন্তু দিন যত এগিয়েছে , বোধ ও বুদ্ধির গোড়া যত পরিপক্ক (?) হয়েছে , কবিতাটির ভাব রস গ্রহণে সমর্থ হয়েছি যেন । হ্যাঁ , এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এই ভাবরস সম্পূর্ণভাবে আমার নিজস্ব । কোন পুস্তক কেন্দ্রিক জ্ঞান নয় ।

কবিতাটি পড়া ছিল । বাবার মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণে ' জলে হস্মিন সন্নিধিং কুরু ' শোনা মাত্র  স্নায়ুতন্ত্রে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল । ঠিক বলছি । শিহরণ । জল দিতে দিতে কোথাও যেন মনে হল --- '  হিমালয় থেকে মেঘ ভারতসমুদ্রে গলে মেশে । ' পুরাণের সংকল্প বিধিতে  বলা আছে, --- ' ওঁ গঙ্গে চ  যমুনে চৈব গোদাবরি সরস্বতি । নর্ম্মদে সিন্ধু কাবেরি জলেহস্মিন সন্নিধিং কুরু।।'  বলা হচ্ছে , এই মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে স্বীয় হৃদয় থেকে দেবতাকে সেই জলে আবাহন করে তা মাথায় ও পূজার উপকরণে ছিটিয়ে দিতে হবে ।

ছিটিয়ে দিলাম । সেই মুহূর্তে আমার পরলোকগত পিতাকে স্মরণ করেছি । কিন্তু ... । কাজ শেষ করে একটু ফাঁকায় খুলে বসেছি কবিতার বই । এবং সেই বিশেষ কবিতাটি । এবার যেন কিছু প্রশ্ন জেগে উঠল মনে । এই  ভারতবর্ষের প্রতিটি গৃহকন্দরে যে প্রশ্ন অস্ফুটে চির জাগরুক থাকে । উত্তর-দক্ষিণ- পূর্ব- পশ্চিম সব  সমস্ত মিলেমিশে একাকার ।

' হিন্দু সংস্কৃতির স্বরূপ ' গ্রন্থে ক্ষিতিমোহন সেন বলছেন , " এখনো আমরা যেখানেই স্নান করি সেখানেই ভারতের সর্ব তীর্থকে আবাহন না করিয়া পারি না। সকল নদী সকল তীর্থ স্নানকালে উপস্থিত হউক ইহাই প্রার্থনীয়।
   ওঁ কুরুক্ষেত্রগয়াগঙ্গাপ্রভাসপুষ্করাণি চ ।
   তীর্থান্যেতানি পুণ্যানি স্নানকালে ভবন্ত্বিহ।। "
আসলে মানুষের একাত্মতাও কবির অভীষ্ট। তিনিও চান সব মিশে যাক ' মহামানবের সাগরতীরে ' । হিমালয় থেকে মেঘ ভারতসমুদ্রে যেমন গলে মেশে, পক্ষান্তরে ভারত সমুদ্রের জলরাশি বাষ্প হয়েই জন্ম দেয় কালো মেঘপুঞ্জের।

তাহলে কি পেলাম ? একটি বন্ধনের বার্তা। উত্তর দক্ষিণ এক বাষ্প রূপে প্রায় পৃথিবী সৃষ্টির সময় থেকে নিজেদের বেঁধে রেখেছে অনাগত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে।

সম্প্রতি আরও একবার একটি লেখার জন্য গীতা চট্টোপাধ্যায়ের এই বইটি পড়ার সুযোগ হল। আর কী আশ্চর্য , বর্তমান সময়কেই  যেন ধারণ করছে সে । এখন পড়তে পড়তে অন্য একটি ভাবনা  চিন্তার কক্ষ অধিকার করে বসল । রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে লেখা এ কবিতা । আমি এমনটাই বলব। এখানে বিভেদের কথা নেই। নেই ধর্ম নিয়ে 'গেল গেল ' রব । আছে মিলিয়ে দেবার সুমহান  অতীত অভীপ্সা। কবির কথায়  ' মেলাবেন , তিনি
মেলাবেন ' । সত্যি তো , কবি যদি না মেলানোর কথা  বলেন , তাহলে কে বলবেন । তাই আমরাও চাই     'ব্রহ্মপুত্র যমুনা ও সরস্বতী নর্মদা কাবেরী ' পাশাপাশি অবস্থান করুক । অন্তত ' দক্ষিণের মুর্গেশ '- এর দিকে তাকিয়ে । আমাদের তোমাদের তাহাদের পরিচয় যে আত্মগোপন করে আছে ওই অগণিত সাধারণ  মানুষগুলির  মধ্যেই।


১২.

মরু
তোমার স্নিগ্ধ চুলের অরণ্যে
সিঁদুর বুঝি সূর্যোদয় হত ,
উন্মাদিনী , ভাগ্যে জ্বলল না
আয়ুষ্মতী সিঁথির সেই ব্রত !
#
কারা তোমায় দস্যুতায় ছিঁড়ে
বর্বরতা হেনেছে ; উল্কিতে
নিলাজ বুক নীরস মরুভূমি ----
জানল না তো  জননী জাহ্নবী!

'অবন ছবি লেখে ', বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাস্তবিকই অবনীন্দ্রনাথের লেখা পড়ার সময় পরপর দৃশ্যের উপস্থাপনা মনটাকে মেধার জটিলতা থেকে  কোনো  এক ঊর্ধ্বলোকে নিয়ে যায়। 'এক ঋতু'  কাব্যগ্রন্থের এই কবিতাটিতে প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত একই সঙ্গে দুটি  বিষয়কে ধরেছেন । প্রথম স্তবকে দৃশ্যকল্প, শেষ স্তবকে স্বকীয় বক্তব্য । দুইয়ে মিলে ' মরু '  কবিতাটি আমার মত অন্তর্মুখী পাঠককেও  না-দেখা শহরের গল্প বলে । বলে প্রতিদিন কাগজে পড়া  বিষয়ের  সত্যাসত্যকে ।

নারীর দেহ ও মনের সৌন্দর্য নিয়ে হাজার হাজার কবিতা লেখা হয়েছে । কত সাহিত্য শিল্পে তাকে চির জাগরুক করে রাখা হয়েছে সময়ের হাত ধরে। কিন্তু আমাদের বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের কবি সে সব দিক দিয়েই গেলেন না । তিনি তুলে আনলেন সময়কে। যে সময় দিনের পর দিন ধর্ষণ করে চলেছে সহনাগরিককে । আজকের সমাজের দিকে তাকিয়ে থাকলে দেখি , সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতে ২০১৬  সালে প্রায় কুড়ি হাজার শিশু ধর্ষিত হয়েছে। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে আরও প্রায় ১২ হাজার শিশু। আবার ২০১৮ সালে ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর রিপোর্টে  বলা হচ্ছে , ভারতে প্রতিদিন ৯১ টি ধর্ষণ , ৮০ টি খুন  আর ২৮৯ টি অপহরণের ঘটনা ঘটে । ২০১২  দিল্লির নির্ভয়া কান্ড যেমন একটি সামাজিক হিংসার ঘটনা , পাশাপাশি কোনো কোনো অঞ্চলে মেয়ে ভ্রুণ হত্যাও  আজ সামাজিক- রাষ্ট্রিক  অক্ষয়ের ছবি তুলে ধরে।

যাক অনেক কথা হল । আয়ুষ্মতী নারীর ' নিলাজ বুক নীরস  মরুভূমি ' এখন । দেশও কি ধীরে ধীরে
' জননী জাহ্নবী 'কে হারিয়ে ফেলছে ।  এ প্রসঙ্গে ক্ষিতিমোহন সেন প্রণিধানযোগ্য একটি কথা বলেছেন, ---
     " লোকে সেকালে ফাঁদ দিয়ে শিকার ধরত। এখনও  লোকে  সেই আদিম মনোবৃত্তি ছাড়তে পারে নি ।  তাই প্রেম দিয়ে বাঁধবার বদলে আমরা ভগবানকে মন্ত্রে তন্ত্রে আচারে বাঁধতে যাই । রূপে প্রসাধনে  প্রিয়তমকে বাঁধবার চেষ্টার মধ্যেও সেই  আদিম মনোবৃত্তিই  ধরা দিচ্ছে ।"
(' বাংলার সাধনা ') ।

সমস্ত আকাশ জুড়ে দেখি কুয়াশা । হালকা ধোঁয়াও হতে পারে । কাছে- দূরের গাছপালা আজ আবছা। সোঁদা গন্ধে কাঁপছে পৃথিবীর মাটি । ফুটি ফুটি করেও পাপড়ি মেলতে পারছে না ভবিষ্যতের পুষ্পোদ্যান। প্রণবেন্দুর এই কবিতায় কুয়াশা সরিয়ে ফুল ফোটানোর চেষ্টা চোখে পড়ছে। আমাদের এগিয়ে আসতে হবে সময়মতো ।
   

ছবি : বিধান দেব 
 

ধারাবাহিক গদ্য : চন্দন মিত্র


 

জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন                 গল্পের অমায়িক ভুবন 
                               
                                


ধ্যান > ঝান > চ্যান > জেন এবং প্রথম আচার্য বোধিধর্ম  

ভণই লুই আমহে ঝাণে দিঠা।
ধমণ চমণ বেণি পাণ্ডি বইঠা।। 

বাংলাভাষার আদি নিদর্শন চর্যা-সংকলনের সূচনা-পদে সিদ্ধাচার্য লুইপাদ এমন কথা বলেছেন । এখানে ঝাণে শব্দটির অর্থ ধ্যানে। সংস্কৃত ধ্যান শব্দটি ধ্বনিতাত্ত্বিক বিবর্তনের পথ ধরে পালি ভাষায় পৌছে হয়েছে ঝাণ । প্রাচীনবাংলায়ও ঝাণ শব্দের প্রচলন লক্ষ করা যায়। উদ্ধৃত চর্যাংশটি তার সাক্ষবাহী। শব্দের এই ধ্বনিগত বিবর্তন বেশ মজাদার। অনেকসময় পরিচিত শব্দ এমনভাবে বিবর্তিত হয় যে, চেনার উপায় থাকে না। চ্যান (Chan) একটি চিনা শব্দ। শব্দটি শুনে আমাদের কখনওই মনে হয় না যে, এমন বিজাতীয় শব্দের সঙ্গে আমাদের নাড়ির যোগ আছে। কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্যি এই চিনা শব্দটির সঙ্গে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক নিবিড় । চ্যান শব্দটির শিকড় আমাদের দেশের মাটিতেই প্রোথিত। সংস্কৃত ধ্যান শব্দটির পালি-রূপ ঝান যখন প্রতিবেশী দেশ চিনে পোঁছায় তখন সে দেশের মানুষের উচ্চারণে তা হয়ে যায় —চ্যান (Chan)। আবার জাপানিরা তাদের উচ্চারণ প্রবণতা অনুযায়ী এই চ্যান শব্দটিকেই জেন (Zen) রূপে প্রতিধ্বনিত করে।   
 
        খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকের কথা। বোধিধর্ম, নামের এক অদম্য সন্ন্যাসী ঝান শব্দটি কায়মনোবাক্যে বহন করে পৌঁছে গেলেন চিনদেশে। তাঁর সেই যাত্রাপথ মোটেও সুগম ছিল না। নদনদী, পাহাড়-পর্বত অতিক্রম করেই তাঁকে পৌঁছাতে হয়েছিল পীতদানবের দেশে। মহাযান পথের সাধককে এককসিদ্ধির মোহ উপেক্ষা করে এভাবেই জগদ্ধিতায় প্রব্রজ্যা বেছে নিতে হয়। হীনযানীদের মতো কেবল আত্মসিদ্ধি অর্জনের আয়োজন নয় ; মহাযানীদের জগতের সকল মানুষের সিদ্ধির কথা ভাবতে হয়। কিন্তু কে এই বোধিধর্ম, যিনি ভিক্ষাভাণ্ড, চীবর ও সিংহল থেকে সংগৃহীত " লঙ্কাবতার সূত্র " ঝোলায় ভরে পৌছে গেলেন এক অচিন ভূখণ্ডে ! চৈনিক নথি থেকে বোধিধর্মের পূর্বাশ্রম সম্পর্কে কিছু কথা জানা যায়। খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের শেষার্ধে তামিলনাড়ুর কাঞ্চিপুরমে এক রাজপরিবারে বোধিধর্মের জন্ম। ইতিহাস বলছে এইসময়ে কাঞ্চিপুরম ছিল পল্লবদের রাজধানী। বোধিধর্মের পারিবারিক নাম ছিল বোধিতারা। আচার্য প্রজ্ঞাতারার কাছে দীক্ষা নেওয়ার পর তাঁর নতুন নাম হয় বোধিধর্ম। দীক্ষা গ্রহণের পর দুই অগ্রজের উপর রাজ্যভার  অর্পণ করে বোধিধর্ম বেছে নেন প্রব্রজ্যার পথ। ৫২০ খ্রিস্টাব্দে তিনি দক্ষিণ চিনের গুয়াং ঝউ-তে পৌঁছান। তখন সেখানে লিয়াং বংশের (৫০২ - ৫৫৭ খ্রিস্টাব্দ) রাজত্ব চলছে। বৌদ্ধধর্মাবলম্বী রাজা উ (Wu) বোধিধর্মকে আমন্ত্রণ জানালেন রাজধানী জিয়াং কাং (Jian-Kang)-এ। বোধিধর্ম আমন্ত্রণ রক্ষা করলেন। বুদ্ধের দেশের এক সন্ন্যাসীকে দেখে রাজা উ আপ্লুত হয়ে জানতে চাইলেন — 

মান্যবর ! পশ্চিম দেশ (ভারত চিনের পশ্চিম দিকে অবস্থিত) থেকে আপনি আমাদের জন্য কোন সূত্র বহন করে এনেছেন ?

— শিক্ষণীয় একটি শব্দও আমি বহন করে আনিনি। বোধিধর্ম উত্তর দিলেন ।

সম্রাট উ বললেন —আমি অনেক মঠ নির্মাণ করেছি। অজস্র সূত্রের তর্জমা করিয়েছি, অনেক শ্রমণকে সহায়তা দিয়েছি। এসব কাজের জন্য আমার কতটা পুণ্য অর্জিত হয়েছে ?

বোধিধর্ম বললেন —এসব মনগড়া জাগতিক ধারণা । বস্তুর ছায়া যেমন সত্য নয়, এই পুণ্য-সংক্রান্ত ধারণাও সত্য নয়।

উ এবার প্রসঙ্গ ঘোরালেন —মহান-সত্য প্রকাশক প্রথম সূত্রটি কী ?

বোধিধর্ম —মহান-সত্য বলে কিছু নেই।

 উ —কে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ?

বোধিধর্ম —আমি জানি না ।

           রাজা উ আগন্তুকের মুখে এমন অদ্ভুত কথাবার্তা শুনে ভাবলেন, লোকটির মাথা একেবারেই গেছে ! আসলে এমনই হয়। এমনই হওয়ার কথা। আমাদের সংস্কার, আমাদের চেনা-চৌহদ্দির মধ্যে পাওয়া অভিজ্ঞতা, আমাদের জন্মসূত্রে পাওয়া ধর্ম, শেখা-শাস্ত্র ইত্যাদির বাইরেও যে সত্য থাকতে পারে এমনটা আমরা ভাবতেই পারি না। ভাবতে গেলে আমরা বিপন্ন বোধ করি ; খেই হারিয়ে ফেলি । রাজা উ-র ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। হলেও তিনি রাজা। তাঁর রক্তের ভিতরেও তো আমাদের মতো বিপন্নতার বোধ খেলা করে।


 শাওলিন কুং ফু ও ওস্তাদ সন্ন্যাসী 


বোধিধর্ম, রাজা উ-র সভা ছেড়ে, দক্ষিণ চিন ছেড়ে চললেন উত্তর চিনের দিকে। দুরন্ত ইয়াং সি (Yang-tse) নদী পার হয়ে পৌঁছে গেলেন উত্তর চিনে। হেনান প্রদেশের ইয়ং নিং মঠ তখন খ্যাতির তুঙ্গে অবস্থান করছে। তার স্বর্ণশীর্ষ প্যাগোডা সূর্যালোক মেখে  চোখধাঁধানো মায়া তৈরি করে। বোধিধর্ম বেশ কয়েকদিন কাটিয়ে দিলেন সেই মঠে। অতঃপর এগিয়ে চললেন শাওলিন মঠ অভিমুখে। শাওশি (Shaoshi) পর্বতের জঙ্গলাকীর্ণ এই মঠটির একটি ইতিহাস আছে। এই মঠের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন বুদ্ধভদ্র নামের এক ভারতীয় শ্রমণ। বলা ভালো বুদ্ধভদ্রকে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য উত্তরের ওয়েই বংশের রাজা জিয়াওয়েন (Xiaowen) নির্জন পার্বত্য অরণ্যে ৪৭৭ খ্রিস্টাব্দে এই আশ্চর্য সুন্দর মঠটি নির্মাণ করান। বোধিধর্ম ৫২৫ খ্রিস্টাব্দে শাওলিন মঠে পৌছান। কিন্তু পৌছালে কী হবে চেহারার যা বাহার! মস্তকের অগ্রভাগ কেশশূন্য, লাটিমের মতো বিশালাকার দুই চোখ, মুখে অগোছালো দাড়ির জঙ্গল,পালোয়ানের মতো যুতসই চেহারা —এমন বিদঘুটে দর্শন বিদেশি সন্ন্যাসীকে কী মঠে স্বাগত জানানো সম্ভব ! এতদিনের সঞ্চিত পুণ্য উবে যাবে না ; আরোপিত পবিত্রতার নিদাগ প্রলেপে চিড় ধরবে না ! বোধিধর্ম মঠের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করে সব বুঝলেন। আর সবাইকে আশ্চর্য করে অদূরের একটি গুহায় দেয়ালের দিকে মুখ করে ধ্যানে বসলেন। আহাম্মক সন্ন্যাসীর কাণ্ডকারখানা দেখে মঠের লোকজন তো অবাক । এমন হতচ্ছাড়া ধ্যান তাঁরা চোখে দেখা তো দূরের কথা, কস্মিনকালে কানেও শোনেননি। আহাম্মক আসলে বোধিধর্ম নন, মঠের লোকজন। কারণ চক্ষু মুদে যখন কেউ ধ্যানে বসে তখন সামনে ফাঁকা মাঠ থাক বা দেয়াল থাক তাতে কীই বা আসে যায় ! তবে ধ্যানের অভিনয় হলে অন্য কথা। বোধিধর্মের এই দেয়ালমুখো ধ্যানের একটি সুবিধাও আছে , হঠাৎ করে অবাঞ্ছিত কেউ সামনে এসে বিরক্ত করতে পারবে না। বোধিধর্মের এই অদ্ভূত ধ্যান নিয়ে একটি জনশ্রুতি প্রচলিত। প্রথম প্রথম তিনি নাকি ধ্যানে বসেই ঘুমিয়ে পড়তেন! অনেক চেষ্টা করেও তিনি চোখের পাতা খুলে রাখতে পারতেন না। শেষমেশ তিনি নিতান্ত ক্রুদ্ধ হয়ে ছুরি দিয়ে দুচোখের পাতা কেটে ফেলেন। আর আশ্চর্যের বিষয় এই যে, তাঁর চোখের পাতা মাটিতে পড়তেই মুহূর্তে তা থেকে জন্ম নেয় চা-গাছ। এই মিথ থেকে আমরা অনুমান করতে পারি বোধিধর্মের হাত ধরেই চিন দেশে চা-এর প্রচলন শুরু হয়। তবে এই অনুমান হবে কালানৌচিত্য দোষে দুষ্ট। কারণ চা-এর ইতিহাস বলছে, বোধিধর্মের চিন দেশে পৌঁছানোর বহু আগে থেকেই সে দেশে চা-পান প্রচলিত ছিল। হান যুগের প্রখ্যাত ধ্রুপদী কবি ওয়াং বাও ( খ্রিস্টপূর্ব ৮৪ - ৫৩ অব্দ) রচিত একটি পুথিতে চা-পানের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে একথা বলা যায়, বোধিধর্ম হয়তো ভারত বা সিংহল থেকে চা-গাছ নিয়ে গেছিলেন। আর তিনি যেহেতু একজন ভেষজবিদ ছিলেন সেহেতু শিষ্যদের এই ঘুমতাড়ানিয়া পানীয় গ্রহণে উৎসাহিত করেও থাকবেন। বোধিধর্মের সঙ্গে চা-এর একটা ওতোপ্রোত সম্পর্ক থাকাটা অসম্ভব কিছু নয়। কারণ চ্যান তথা জেন-সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ চা-পান। সম্ভবত বোধিধর্মের প্রত্যক্ষ প্রভাবে চ্যান মঠে চা-পান প্রথা প্রচলিত হয়ে থাকবে। আর চোখের পাতা কেটে ফেলার মিথের পিছনে হয়তো বোধিধর্মের বিশালাকার অক্ষিগোলকই দায়ী l হঠাৎ করে দেখলে মনে হতেই পারে, চোখে বোধহয় পাতাই নেই । আবার চিনা তথা মঙ্গোলিয়ান আধবোজা চোখের সঙ্গে তুলনা করে এমনটা মনে হওয়াই স্বাভাবিক। যাইহোক, বোধিধর্ম সেই গুহায় দীর্ঘদিন ধ্যানে কাটান, নথি বলছে নয় বছর। এই অদ্ভূত দর্শন উদ্ভট সন্ন্যাসীর কাছেও একদা এসে পৌছায় এক নাছোড়বান্দা ভক্ত, হুইকে (Huike)। দিনরাত সে বোধিধর্মকে ছায়ার মতো ছুঁয়ে থাকে। ডিসেম্বারে ভয়ংকর শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়। প্রাণান্তকর তুষারপাত অবজ্ঞা করে তবুও দাঁড়িয়ে থাকে সে। কোমর সমান বরফ জমে যায়। তবুও নির্বিকার থাকে হুইকে ।

বোধিধর্ম জিজ্ঞেস করেন —কী চান ? 

—আমাকে আপনি সার্বজনীন সত্য ও করুণার জগতে প্রবেশের দুয়ারটি খুলে দিন প্রভু !

—আপনি সামান্য জ্ঞান, অগভীর ও অহংকারী মন নিয়ে যে চেষ্টা করে যাচ্ছেন , তা ব্যর্থ হতে বাধ্য । আপনি ফিরে যান ।

হুইকে ফেরার জন্য আসেনি। দিনের পর দিন কেন পড়ে থেকেছে, ফিরে যাওয়ার জন্য ! বামহাতটি কেটে গুরুকে দক্ষিণা দেয়। বোধিধর্ম এই সমর্পণ এড়াতে পারেন না। এইভাবে ঝাণ বা চ্যান-এর জগতে  প্রবেশাধিকার লাভ করল হুইকে। অন্য এক নথি বলছে হুইকে হাত কাটেনি; ডাকাতদের সঙ্গে লড়াইয়ে আগেই সে বামহাতখানা খুইয়েছিল।
                              
          শেষমেশ বোধিধর্ম শাওলিন মঠে সাদরে গৃহীত হলেন। মঠের সন্ন্যাসীদের চেহারা দেখে বোধিধর্ম আঁতকে উঠলেন। নিছক ধ্যান করে করে তাঁরা সব এক-একটা জড়ভরত হয়ে উঠেছেন। হাতপা তাঁদের অসাড় হয়ে গেছে, ভালো করে হাঁটাচলা করতে পারেন না l এমন রুগ্ন বেঢপ চেহারা নিয়ে সাধনভজন কী, সাধারণ কোনো কাজ করাই সম্ভব নয়। তিনি সন্ন্যাসীদের জন্য বাধ্যতামূলক শারীরিক কসরত চালু করলেন । চৈনিক কুস্তির সঙ্গে মিশিয়ে দিলেন দক্ষিণ ভারতীয় যুদ্ধকৌশল এবং নিজস্ব পর্যবেক্ষণলব্ধ বিভিন্ন পশুপাখির আক্রমণ-প্রণালী।তৈরি হল আত্মরক্ষামূলক এক অসাধারণ সামরিক-শিল্প —কুং ফু। সঙ্গে দিলেন শ্বাসপ্রশ্বাস-সংক্রান্ত নিয়ম ও পরিমিত ধ্যান। সমকালীন চিনে প্রচলিত লাও ৎ সে (Lao Tse)-এর তাও (Tao) দর্শন দ্বারাও বোধিধর্ম প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাওবাদীদের মতো তিনিও সাধনপথে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা ও জীবনের ওঠাপড়াকে সহজভাবে গ্রহণ করার উপর জোর দিয়েছিলেন ।   


               
বাকপথাতীত কাহিব কীস


বোধিধর্ম চিনদেশ ত্যাগ করে ভারতে প্রত্যাবর্তনের আগে (কোনো কোনো নথি অনুযায়ী মৃত্যুর অব্যবহিত আগে) প্রিয় শিষ্যদের একত্রিত করে বললেন তোমরা প্রত্যেকে অর্জিত প্রজ্ঞা বিষয়ে দু-একটা কথা বলো।

প্রথমে মুখ খুললেন দাও ফু (Dao Fu) —এই বিষয়টা শব্দ বা বাক্যাংশ দিয়ে বোঝানো যাবে না। আবার শব্দ বা বাক্যাংশ বহির্ভূত বিষয়ও নয় এটা । 

বোধিধর্ম বললেন —তুমি আমার চর্মের অধিকারী হলে।

এবার এগিয়ে এলেন নান জং চি ( Nun Zong Chi ) —এটা অক্ষোভ বুদ্ধের জ্যোতির্ময় আভাসের মতো, একবার দেখা যায় , দ্বিতীয়বার দেখা যায় না ।

বোধিধর্ম বললেন — তুমি আমার মাংসের অধিকারী হলে।

শিষ্য দাও য়ু বললেন ( Dao Yu ) —জগত সৃষ্টির চারটি উপাদানই (মাটি, জল, আলো ও বায়ু) ফাঁপা। পঞ্চস্কন্দ (রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান বা চৈতন্য) অস্তিত্বহীন।

বোধিধর্ম বললেন —তুমি আমার অস্থির অধিকারী হলে।

হুইকে ( Huike ) এগিয়ে এসে গুরুর সামনে মাথা নত করে দাঁড়ালেন। কোনও শব্দই উচ্চারণ করলেন না ।

বোধিধর্ম বললেন —তুমি আমার মজ্জার অধিকারী হলে। 

এই যে বোধিধর্ম তাঁর চর্ম-অস্থি-মাংসও মজ্জার অধিকারী করলেন এর তাৎপর্য কী ?
আমরা দীক্ষিত নই ফলে আমরা জানি না । আবার এ এক এমন হেঁয়ালি যে, দীক্ষিতরাও এর অর্থ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে অপারগ। সেই যে চর্যার ৪০ সংখ্যক পদে কাহ্নপাদ বলেছেন —  

ভণ কইসে সহজ বোল বা জাঅ ।
কাঅ বাক্ চিঅ জসু ন সমায় ।। 
আলে গুরু উএসই সীস ।
বাকপথাতীত কাহিব কীস ।।
জে তই বোলী তে ত বিটাল ।
গুরু বোব সে সীসা কাল ।।

          সত্যিই তো সহজ-কে ব্যক্ত করা অত সহজ ব্যাপার নয় । কায়াবাকচিত্ত সেখানে প্রবেশ করে না। অকারণেই গুরু শিষ্যকে উপদেশ দেন । বাকপথাতীতকে কী ভাষায় বাঁধা যায় ! সুতরাং যতই বলা যায় ততই জটিলতায় জড়িয়ে পড়তে হয় । তাই গুরু এখানে বোবা এবং শিষ্য বধির। মনে রাখতে হবে চর্যাকাররা ছিলেন মহাযানশাখার বজ্রযান উপশাখার সহজিয়া সাধক এবং জেনবাদীরাও মহাযানী । তত্ত্বগত সাদৃশ্য তো কিছুটা থাকবেই । হুইকে জানতেন বাকপথাতীতকে ভাষায় বাঁধার চেষ্টা বৃথা । তাই তিনি বোধিধর্মের সামনে নিরুত্তর ছিলেন। গুরুও মেপে নিয়েছিলেন শিষ্যের গভীরতা । তাই প্রিয়তম শিষ্যের হাতে ভিক্ষাপাত্র, চীবর ও লঙ্কাবতার সূত্রের পুথি তুলে দিয়ে তাঁকে উত্তরাধিকারী নির্বাচন করলেন । হুইকে হলেন বোধিধর্ম-উত্তর সময়ের চ্যান-আচার্য ।

 

                           

                                       

                  

    

তথ্যসূত্র : 

১. ZEN MASTERS OF CHINA : THE FIRST STEP EAST

BY RECHARD BRYAN MC DANIEL; TUTTLE PUBLICATION, TOKYO/ VERMONT/ SINGAPORE.

 ২. THE PLATFORM SUTRA OF THE SIXTH PATRIARCH BY JOHN R. MC RAE; NUMATA CENTER FOR BUDDHIST TRANSLATION AND REASEARCH, BARKELY, CALIFORNIA, AMERICA.

৩. THE PLATFORM SUTRA : THE ZEN TEACHING OF HUINENG BY RED PINE ; COUNTERPOINT, BARKELY, CALIFORNIA, AMERICA.

৪. TRANSMISSION AND ENLIGHTENMENT IN CHAN BUDDHISM SEEN THROUGH THE PLATFORM SUTRA BY MORTEN SCHLUTTER ; TAIPEI CHUNG – HWA INSTITUTE OF BUDDHIST  STUDIES.      

৫. ZENS CHINESE HERITAGE BY ANDY FERGUSON ; WISDOM PUBLICATION, BOSTON.

৬. THE ILLUSTRATED ENCYCLOPEDIA OF ZEN BUDDHISM BY HELEN J. BARONI ; THE ROSEN PUBLICATION GROUP , NEW YORK.

                 

ছবি : বিধান দেব 

গুচ্ছ কবিতা : বিশ্বজিৎ মাইতি

 


 একটি কবিতার ভূত ,ভবিষ্যৎ ও বর্তমান

এই কবিতাটি প্রথমে লিখেছিল আমার এক 'ছাত্র কাম কবি'।
রাজপ্রাসাদের সামনের রাজপথে
শীতের কুয়াশায় দাঁড়িয়ে আছে কতকগুলো ট্রাক্টর:
এই রকম একটি দৃশ্যের কল্পনা করেছিল সে।
কিন্তু মানুষ-বিহীন কোনো শিল্পই হতে পারে না,
এইরকম একটি কপিবুক স্টাইলের চিন্তা থেকে,
চাষবাস ফেলে কয়েকজন কৃষক দাঁড়িয়ে আছে  ফ্যামিলি-সুদ্ধ,
রাজামশাই তখন এক ধামা মুড়িতে এক বালতি দুধ ঢেলে খাচ্ছেন!
এই রকম একটি কাল্পনিক দৃশ্যও জুড়ে দিলাম আমি,'অধ্যাপক কাম কবি'।

লিখিত কবিতাটি  'প্রুফরিডার কাম কবি'র হাতে ধরা পড়ল,
ছাত্রের লোক-প্রচলিত বানানবিধি বদলে ,
আমি যে বাজার-অনুমোদিত বানান বসিয়েছিলাম,তা চলবে না,
লিখতে হবে রাজপরিষদ অনুমোদিত বানানবিধিতে;
তবেই লেখাটি 'কবিতা' হিসাবে 'গণ্য' হবে।


স্বাভাবিক কবিতা

আকাশ থেকেই পড়ে;
তাই তার গায়ে জল মাটি লেগে থাকাই স্বাভাবিক।

মাটি ফুঁড়েই ওঠে;
তাই তার গায়ে আলো হাওয়া লেগে থাকাই স্বাভাবিক।

স্থির

কোনো ক্ষেত ছোট ছোট হলুদ সরষের ফুলে ভরা থাকবে,
কোনো ক্ষেতে আকাশছোঁয়া বনস্পতি–
সবকিছু স্থির আছে,জমিও তৈরি আছে সেইভাবে।

কোনো ফুল গুপ্ত থেকে যাবে চিরকাল,
কোনো ফুল মুক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়বে চরাচরে–
সবকিছু  স্থির আছে,হাওয়াও তৈরি আছে সেইভাবে।

সসাগরা পৃথিবীর অধীশ্বর তাই
জলকেলী করেন কন্যাসমাদের সাথে।

আপনি ও আমি

আপনি জানেন আমি এড়িগেড়ি,
আপনি বোঝেন আমি বোকাহাঁদা;
আপনার মতামত বেশ জমকালো,ভারী-
আপনার কাছ থেকে  পিছলে গিয়ে তাই,
স্বপ্নে মাছ হয়ে সাঁতার কাটি,
কল্পনায় পাখি হয়ে আকাশে উড়ি,
ভয়ে কর্পূরের মতো উবে যেতে চাই আমি।

এপিফ্যানি

তিনি আমাকে অনুপ্রাণিত করেন  'অপরিমেয় পথ' নিয়ে লিখতে ,
তিনি আমাকে স্বপ্নাদেশ দেন 'শীতল বাতাস' নিয়ে লিখতে।
কিন্তু আমি ওইসব লেখার মুডেই নেই তখন;
আমি  তখন একমনে  কল্পনা করি,
বুকে জলের মতো সহজে আগুন চেপে রেখে
তিনি নেমে যাচ্ছেন সিঁড়ি বেয়ে কুয়াশাচ্ছন্ন মাঠের দিকে!


সন্ধ্যেবেলার কবিতা

সন্ধ্যেবেলা চায়ের দোকানে
বন্ধুর জিভ টেনে ছিঁড়ে নিচ্ছে প্রতিশোধে উন্মত্ত যুবক,
অসহায় যুবতীটি বুকে টেনে নিচ্ছে লোকটিকে।

এইসব যুবক যুবতী
হতে পারে আমার বন্ধু ,ভাই, বোন,
এমনকী হতেও পারে
আমি এঁদের মাস্টারমশাই।

পাপিয়ার গান

ঝাউবন নিয়ে আমার এমন কোনো কল্পনা নেই যে
ঝাউবনের শোঁ শোঁ শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যাবে।
আমার কোনো পোষা ইঁদুরও নেই
যার দৌড়ানোর পথে জলের কুঁজো উল্টে পড়বে,
টেবিলে ঢাকা দেওয়া খাওয়ার ছিটকে পড়বে মেঝেতে!

আমি শুধু চুপচাপ বসে থাকি রাত্রির কল্পনায়,
খয়েরি ডানার পাপিয়ার গান শোনার আকাঙ্ক্ষায়।




ছবি : বিধান দেব 

গুচ্ছ কবিতা : মারুফ আহমেদ


 

উদ্ভিদ জন্মের শেকড়

হেরে যাচ্ছি ধ্রুপদী আলোয়, অস্পষ্ট বেদনার কাছে মেলে ধরছি জাগতিক সকল মোহ, সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ ও গাছের শাখা প্রশাখায় পুষে রাখছি সেই সুখ, কচ্ছপের আয়ুর সমান তা দীর্ঘ হলো না, সমুদ্র সাক্ষাৎ পেলো না নদী মোহনার, আমি তোমার, জোয়ার - ভাটায় ভেসে থাকা এক পদ্ম ফুল জানে, একদিন মাটির গভীরে তার জন্যে ছড়িয়েছি উদ্ভিদ জন্মের শেকড়, হয়ত টের পাবে সে মানুষ জন্মে তার নির্যাসে।


একটা ভবঘুরে জীবন

আমার একটা ভবঘুরে জীবন, নদী বন্দর ও জাহাজের মায়ার কাটিয়ে দিলে খুব সামান্য ঋণ জমে যাবে তোমার হৃদয়ের কাছে,  এই যে ফিরতে চেয়ে ফিরিনি, হাতে হাত রাখবো বলে রাখিনি, চাঁদ রাতে সমস্ত আলো পান করে চারদিকে এতো গ্রহন লাগিয়েছি, পৃথিবী ঘুরছে, গ্রহ নক্ষত্ররা ঘুরছে, আমাকে দেখে উপহাস করছে তোমার নারী জন্মের ব্যর্থতা, এসব কখনো পরোয়া করি না, চিরকালই তো শূন্য থাকে মধু ও মদের বোতল...


পাপ করছি, কালি মাখছি

পাপ করছি, দু-হাতে সমস্ত মুখে মাখছি কালি, যেনো সাকার্সের সঙ, পূণ্য কেবল তুমিই করো, আমার মৃত্যুতে করো শোক যেহেতু তুমি ছাড়া প্রিয় ফুল কেউ বাসেনি ভালো, কেউ জানেনি এতোটা গোপন, ভেতরে ভেতরে তুমুল খরা, দূরে ফুঁসে উঠেছে ঢেউ, নদীর ঋতুস্রাব ব্যাথা, পাখির ডানার ঝটপটানি, তোমার কথা পড়ছে মনে, না দেখে ফিরে আসছি তিতুমীর এক্সপ্রেসে, ধূলি উড়ছে ঘোড়ার খুরের আঘাত, তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না, নদী ও নারী জন্মে কি ঢেউয়ে ঢেউয়ে শুকাতে দিয়েছো দীঘল কালো চুল।


তুমি এবং গাছ

তোমাকে ডাকছি শুনতে পাচ্ছো না, তোমার বদলে সাড়া দিচ্ছে গাছ, গেওয়া ও গরানের পাতা, চিত্রা হরিণীদের সর্তক পায়ের ছাপ, গাছেরা কি এমন মানুষ, লুকিয়ে আছে গাছের ভেতরে, কথা বলছে মানুষের ভাষায়, যেনো কোন অগ্ন্যুৎপাতের রাতে তোমার থেকে দূরে আগুনের নদীতে ডুব দিয়েছিলাম, আর ফিরতে পারিনি, মানুষ জন্মের শরীর গিলে খেয়েছে তোমার ঐ দুই আগুন পাহাড়, দু-হাতে ঠেলেছি এতো ঢেউ, জলের শাড়ীর গোপন ভাঁজ, তবুও নিঃশ্বাসে বিশ্বাসের ফকিরী জুড়ে খুন হয়েছি তোমার বাহু ডোরে...


ছবি : বিধান দেব 

গুচ্ছ কবিতা : শীলা বিশ্বাস


 

সুতলি


হাত ক্রমশ লম্বা হতে হতে সুতলি হয়ে যাচ্ছে আর অনায়াসে ছুঁয়ে ফেলছি হরপ্পা ও হলিউড। লাহোর-মূলতানের রেলপথ থেকে ইঁট তুলে হরপ্পা সভ্যতা পুনর্নির্মাণ করছি। সময়কে ওয়ার্প করে উলটে পালটে দেখে নিচ্ছি বিবর্তন। চ্যাপলিনকে রেখে এসেছি গল্প হলেও সত্যির স্ক্রিপ্টে আর রবি ঘোষ অনায়াসে চলে গেলেন সিটি লাইটস -এ। একটি জন্ম আরো একটি জন্মের ভিতরে ফুঁ দিয়ে দিয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে আঁচ।

 

শৈশব থেকে আমৃত্যু কসমেটিক অস্ত্রে আমরা বদলে নিচ্ছি মুখ। শেকড় উপড়ে নিতে চেয়ে গোড়া থেকে ছিঁড়ে ফেলছি আমাদের সংগ্রামের ইতিহাস ও যৌথ খামার। বন কেটে বনেটে এঁকেছি বিসমিল্লাহ্‌। গুটিয়ে নিচ্ছি আস্তিন আর ধরা পড়ে যাচ্ছে ভোজবাজী। বিটুমিনে ঢেকে দিচ্ছি শুঁড়িপথ । খালি জলসত্রের পাশে ঝোড়ো কাকের মতো দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখছি ইরাবতীর জলধারা ।

 

অসময়ের জন্য জমানো দানা মুখে কিলবিল করে মানুষ বেরিয়ে আসছে পিঁপড়ের মতো মাটির গর্ভ থেকে। একটা সময় আরও একটা সময়ের ভিতরে খাপ খাইয়ে নিতে পারলেই আয়ুরেখা বরাবর জন্মান্তরবাদ লিখে দিচ্ছে অবিন্যস্ত আঙুল। বিদুরের খুদ নাকি কুবেরের ক্যাপুচিনো তর্কে মেতেছি। স্বর শুনে বুঝিনি রাম না মারীচ কন্ঠ। পাকিয়ে যাওয়া নিজেকে খুলতে খুলতে এক দুর্যোগের রাত্রি পার হয়ে যাচ্ছি সময় তোমার সঙ্গে…। 


ছবি : বিধান দেব 


গুচ্ছ কবিতা : অনিমেষ মণ্ডল


 


দেবতাদের লাবণ্যের কাছে 


এইখানে কবির সমাধি 
তুমি কিছুটা নম্র হয়ে পাদমূলে বসো 
সভা ও সমিতি অনেক হলো
এইবার কিছুক্ষণ স্তব্ধ হও 
আর কোনো বক্তৃতা দিও না
বক্তৃতা খুব অসভ্য লাগে এখন 
চোখ বন্ধ করলে দেশ দেখতে পাবে 
অগণন মানুষের মাথা দেখতে পাবে 
চাঁদের আলো তাদের শীর্ণ শরীর বেয়ে 
                             গড়িয়ে পড়তেই 
দেবদূতের মতো লাবণ্যে ভরে উঠল 
                            তাদের ধ্বস্ত মুখমণ্ডল 

দেবতাদের  সামনে তখন 
বড্ড অসহায় লাগছে তোমার যাবতীয় আস্ফালন 




জীবন আমাকে যেটুকু দিয়েছে 

একদিন আমাদের দেখা হবে ঠিক 
পথে বা প্রান্তরে 
ভাবতে ভাবতে দীর্ঘশ্বাস ঘন হয়ে আসে 
কার যেন ছায়া পড়ে জ্যোৎস্নায় 
মেঘলোক ক্রমাগত নিচু হয়ে এলে 
অপ্সরাদের পায়ের নুপূর দেখা যায় 
আকাশ তখন মৃত্তিকার সাথে 
                            মিলনে উন্মুখ 
আমি একা নিখিলের দুয়ার খুলে 
অবিরাম ডাকাডাকি করি 
চারিদিকে প্রতিধ্বনি ফিরে ফিরে আসে 

জীবন আমাকে যেটুকু দিয়েছে 
                   সেটুকুই পাই শুধু 
        তার বেশি পাই না কখনো 



স্মৃতিরা যখন চিরপ্রবাহিত 

আমাদের সমস্ত কথা
নদীর ধারার মতো চিরপ্রবাহিত 
মাঝে মাঝে দু একটি ঘূর্ণি কেবল
                               রহস্যজটিল 
দূরের জনপদগুলি এসবের 
                   খবর রাখে না 
তারা শুধু প্রতিদিন সূর্যোদয় 
         আর সূর্যাস্তে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে 

শুধু প্রথম চুম্বন ভোলা যায় না কখনো 



জন্মপরিচয় 

আকাশে অগণন নক্ষত্রের মাঝে 
কেউ কেউ মৃত কি না 
             সে খবর আমি জানি না 
কেন না যাদের আলো 
          এখনও পৃথিবীতে পৌঁছাইনি 
তারাও অবিকল জীবিতের মতোই দেখায়
তাদের অখণ্ড নীরবতার ভিতর দিয়ে 
                আমি বুঝতে পারি
কীভাবে একটি তারার দেহ ছিঁড়ে 
ভূমিষ্ঠ হচ্ছিল আমাদের বিস্তীর্ণ জনপদ 


ধুলোজীবন 

মাঝে মাঝে কথা বলতে 
একদমই ভালো লাগে না 
চুপচাপ বসে উপলব্ধি করি 
                  অনন্তের চিররহস্য
তখন অন্তরীক্ষ নীচু হয়ে আসে 
ইশারায় পাশে বসে 
         হাত রাখে কপালে ও চুলে
দুঃখ তখন বইতে বইতে 
অশ্রু হয়ে, নদী হয়ে, নুড়ি হয়ে 
নির্বাক পাথর হয়ে ধুলোয় গড়ায় 

কিন্তু একটা পাথর একজীবনে 
ধুলো হতে পারে না কোনোদিন 


ছবি : বিধান দেব 










শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

গুচ্ছ কবিতা : শর্বরী চৌধুরী




    



ঠোঁট

মেধাবী কুয়াশারা আনে অক্ষরের ঝড়   । 
স্তম্ভিত সম্পর্কের মাঝে কথারা যখন অস্পষ্ট, 
অক্ষর কি পারে তাকে জীবন্ত করতে? কপাট
বন্ধ হলে খোলা দায় বড়। ঝিকিমিকি বেলায়
উদবাস্তু পাখির ডাকে ঘর ছাড়ে  মন, মনে হয়
নিজে হাতে তুলে আনি প্রেমিকের ঠোঁট, চুম্বনে
মাতাল হই বেলাশেষের অনুমেয় অস্ত -অনুরাগে 




    


                              

 শূন্য               


আয়ুস্রোতে আর্তনাদের সুর
একটা শূণ্য খাঁচা যেন দুলছে। 
এক লহমায় পূর্ণ থেকে শূণ্য। 
টের পায়নি নিষ্পত্র গাছ ও। 
শুরুর শেষ কিংবা শেষের শুরু
জানেনা দখিনা বাতাস বা আগ্নেয়গিরি। 





                       


                   
ভোর

অতিক্রান্ত পাপ বড় নির্মম। 
ঘুমে জাগরণে তার কপট যাপন। 
কিশোরীর স্নিগ্ধ চোখ ঘৃণা করে তাকে। 
ঘৃণা করে জ্যোৎস্নার কবিতারা। যূথচারী
হরিণের দল পার হয় পঙ্কসাগর,তবু্ও কী
নিষ্পাপ তারা!  শ্বাপদের ক্রুরতা তাকে অসহায়
করে,তবু্ও সে জাগে অন্তিম নিষ্কলুষতায়। 
মানুষেরও থাক এই প্রণয়! পৃথিবীর প্রতি কোণে
ছড়িয়ে পড়ুক অপাবৃত হাত, তবেই শুশ্রুষা, 
তবেই জেগে উঠবে চিন্ময়ী ভোর।     




ছবি: বিধান দেব 

গুচ্ছ কবিতা : শান্তনু ভট্টাচার্য


 

ভ্রুপল্লব

আমার স্মৃতির দস্তাবেজে
উড়ে এসে বসেছে
একখানা এজমালি রোদ।

দেখতে পাচ্ছি --বুকে বই চাপা দিয়ে 
এক ত্রস্ত হরিণীর মুগ্ধ চলন..

লিখতে বসে কলমের ডগায় 
ফুটে ওঠে তাঁর ভ্রুপল্লব।



রূপান্তর

সামনের ক‍্যানভাসে 
সব রঙ নীল

উত্তুরে বাতাসে কাগজের আড়ালে 
মুখ ঢাকছে সব ফুল 

একমাত্র তোমার ছুঁড়ে দেওয়া 
ঘৃণাগুলো --
হৃদয়ের লিটমাস ছুঁয়ে 
বিলিয়ে যাচ্ছে...প্রেম।



মিথ্যে 

এখন মিথ্যেই আমার 
আলোয়ান হয়ে গেছে।

রান্নাঘর থেকে 
তোমার অলৌকিক গুনগুন 
শুধু দেখতে পায়-

আমার জ‍োৎস্না শরীর।



বোধদয়

একটা সাদা ঘোড়া
সারা জীবন পাহাড়  অরণ‍্য মরুভূমি 
তন্নতন্ন করেও পেলাম  না।

অথচ পিছন ফিরলেই দেখতাম
আমারই মুখোশ পড়ে সে চলেছে 
আমারই পিছুপিছু।



মৃত্যু 

আসন সংরক্ষিত আছে
সাতরঙা ময়ূরপঙ্খিতে।

তবুও,
পা-ধোয়ার জল,গামছা আসনপিঁড়ি রেখে 
দূয়ারে দাঁড়িয়ে থাকি সন্ধ্যাপ্রদীপ হাতে।


ছবি : বিধান দেব 


গুচ্ছ কবিতা : রনি অধিকারী






কবিতার প্রথা ভাঙি



রাত্রি শুরু। -এই চোখে নীল নীল ক্ষত

অভিসারী নিশাজল অকারণ ছোঁয়।

শায়িত শরীর ক্লান্ত। ক্লান্তি, ঘুম, স্বপ্ন...

স্বপ্নের স্রোতেই লিখি হাজার কবিতা

অতিশয় অনুগত প্রথা ভাঙি প্রথা।

চিত্রকল্প নিমেষেই মিশে যায় দেহে

ইতিহাস খোঁড়াখুঁড়ি প্রেম-প্রবণতা

শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা চলে স্বপ্নের আধার

অন্ধকারে জড়াজড়ি শোকার্ত সময়ে

মধ্যরাতে কবিতার প্রথা ভাঙি প্রথা।





অচেনা অধিবাসী



ধূসর ধোঁয়া একটি নারী

আজন্ম আকাঙ্ক্ষায় লালিত জন্ম

অচেনা অধিবাসী।

রাতের গুহায় বনচর থামে

হৃদয় মুচড়ে স্বপ্নকে ভাঙে।

ক্রমশ উষ্ণতা আলোকে ছোঁয়

ওমের প্রেরণায় রোদ্দুরকে ছোঁয়।





বিলাসী বসন্ত



সভ্যতার সীমারেখা হয়ে যায় অনায়াসে পার

স্তব্ধ অসাড় শরীর সেলুলার বেজে ওঠে অঝোর অবিরাম

আজ আর কোনো জীবনানন্দ দেখবে না ঐ যুবকের সাথে

সুরঞ্জনা-নিলাঞ্জনা কিংবা মাধবীলতার গোপন অভিসার

ঐ অভিলাষী মানবের সাথে সভ্যতার সেলুলার ফোনে

হাজার কথোপকথন ধ্র“পদী সংলাপে অঢেল সময় যাবে

রক্তচক্ষু অথবা ঈষান্বিত হৃদয়ে আজ আর কোনো জীবনানন্দ দেখবে না

সুরঞ্জানা-নিলাঞ্জনা কিংবা মাধবীলতার গোপন অভিসার

ত’বে স্পন্দিত হৃদয় আর এক হৃদয়ে

ছুঁয়ে যাবে শাদা শাদা বৃষ্টির পরসা

প্রাণবন্ত শূন্যতায় রঙিন বাটনে আঙুলের দ্রুত স্পর্শ

হতে পারে মুঠোফোন ডায়াল প্রক্রিয়া

যেখান থেকে শুরু সেখানেই শেষ শেষের শুরু আবার শুরুর শেষ

ক্রমশ মিটে যায় আশা প্রয়োজনের সব গোপন অভিসার

মূলত ‘নাম্বার ভাঙার মধ্যেই শুরু হয় অনন্ত রাত্রির সংলাপ

অঝোর শ্রাবণ থেকে আরেক শ্রাবণ’


চেতনার চূড়ায় বাস্তব আজ বিলাসী বসন্ত

হয়তো এখনই আসবে প্রেমের দলিলপত্র




অভিশাপের মহাকাল



কত সুখী হ’বে তুমি যদি চেনা ভাষায় প্রকট

নক্ষত্র কিরণে রাত্রি লুপ্ত ক’রে দিও একেবারে

সতত আমি যে খুঁজি শাদা আর নগ্ন শূন্যতারে!


ত’বে ঘোর অন্ধকার সে নিজেই হ’য়ে ওঠে পট

যেখানে আমার চোখ জন্ম দেয় হাজার সংখ্যায়

সে-সব অতীত সেই চেনা চোখ এখনো তাকায়।


খুঁজি না আর কোথাও বাসা কোনো ক্ষুদ্র অন্তরাল

নে ত’বে নে আমায় টেনে অভিশাপের মহাকাল।


ছবি : বিধান দেব