শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

ধারাবাহিক গদ্য : দীপক হালদার

 


ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্য চর্চার ইতিবৃত্ত



ছয়.

ডায়মন্ডহারবারের শিশুসাহিত্য রচয়িতাদের মধ্যে রয়েছে অনিবার্য আরও একজনের নাম ।তিনি সেকেন্দার আলি ।সেকেন্দার প্রথম থেকেই শিশুসাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন ।পরবর্তীকালে দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর সম্প্রতি তাঁর লেখা চোখে পড়ছে ।ইয়ার নবী গায়েনের লেখাও নজরে আসত একসময় ।বর্তমানে আর চোখে পড়েনা। আরও একজন শিশু সাহিত্য রচয়িতার নাম মনে পড়ছে, তাঁর নাম প্রভাসচন্দ্র বর্মণ। মনে পড়ছেনা তিনি প্রভাস বর্মণ নামে নাকি প্রভাসচন্দ্র বর্মণ নামে লিখতেন।যাই হোক  তাঁর লেখা এখন আর দেখা যায় না।শিশুসাহিত্য রচনায় ডায়মন্ডহারবারে এক শ্রদ্ধা উদ্রেককারী নাম শৈলেশ্বর মিত্র ।বিভিন্ন বিষয়ের উপর রচিত তাঁর শিশুদের উপযোগী নাটক, কাব্যনাট্য, ছড়া কবিতা শিশুদের মনোরঞ্জনে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিল ।তাঁর রচনাবলী যদিও স্থানীয় একটি নার্সারি স্কুলের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বেশি প্রচারিত ছিল তবুও একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে সেইসব আলেখ্যগাথা, ছড়ার সর্বজনীন একটা আবেদন ছিল।

সম সময়ে অচ্যুত হালদারের সম্পাদিত  বন্দর পত্রিকাকে কেন্দ্র করে যেসব সাহিত্যসেবীগণ  নিষ্ঠার সঙ্গে সাহিত্য চর্চা চালিয়েছিলেন তাঁরা সেসময়ে বন্দরগোষ্ঠীর ব'লে পরিচিত ছিলেন ।
অচ্যুত হালদার নিজে তো ছিলেনই,সাথে হরেন্দ্রনাথ বসুমল্লিক, অমিট রে ছদ্মনামে অজিত মন্ডল এবং আরো কয়েকজন বিপুল উদ্যমে খুবই আন্তরিকতার সাথে বন্দরের সমৃদ্ধির জন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন ।অচ্যুত হালদার, হরেন্দ্রনাথ বসুমল্লিক ছোটগল্প রচনায় ব্রতী ছিলেন ।অমিট রে প্রবন্ধ রচনার চেষ্টা করতেন ।গল্প, প্রবন্ধ ছাড়া বহু কবিতাও ছাপা হতো বন্দর- এ।কলকাতা থেকে অনেক বিশিষ্ট সাহিত্যিক লিখতেন বন্দর পত্রিকায়।নির্মলেন্দু গৌতম নামে এক সাহিত্যিকের নাম মনে পড়ছে ।কবিতা থাকত প্রখ্যাত কবিদের সাথে স্থানীয় কবিদেরও ।
             ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্যচর্চা জগতে প্রবন্ধ রচনার আকাল বর্তমানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় ।অথচ ছয়ের দশকে, সাতের-আটের দশকে অধ্যাপক শিবপ্রসাদ হালদার, অধ্যাপক দুলাল চৌধুরী,অধ্যাপক গোপাল বন্দ্যোপাধ্যায়,ডাঃ অরুণ বসু, শিক্ষাব্রতী শিশির দাস প্রমুখ ব্যক্তিত্বগণের নিবিড় ঐকান্তিকতা ও মেধাবী প্রকাশে প্রবন্ধ সাহিত্য বেশ লালিত হয়েছিল।বর্তমানে তরুণ সাহিত্যসেবী চন্দন মিত্র খুবই আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছেন প্রবন্ধ সাহিত্য চর্চাকে সচল রাখতে।চন্দন মিত্র ছাড়া অন্য কারো মধ্যে সেই চেষ্টা দেখা যাচ্ছে না ।
                     ডায়মন্ডহারবারের নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসও উল্লেখযোগ্যতার দাবিদার ।নাটক রচনা, কবিতাকে,গল্পকে নাট্যরূপ দিয়ে অভিনয় করা হয়েছে একসময় বারংবার ।রবীন্দ্রনাথের কাব্যনাট্য, গীতিনাট্য মঞ্চস্থ হয়েছে অনেকবার ।এটাও অনস্বীকার্য ডায়মন্ডহারবারের সংস্কৃতিপ্রাণ মানুষ ওইসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের রুচি এবং সংস্কৃতির পরিচয় রেখেছেন দীর্ঘদিন ধরে ।ছয়ের দশকে ডায়মন্ডহারবার থানার ধনবেড়িয়া গ্রামের কৃতী সন্তান কবি,গল্পকার,নাট্যকার সরোজ  কুমার দাসের ঐকান্তিক ইচ্ছা ও প্রচেষ্টায়  রবীন্দ্রনাথের গল্প কবিতার নাট্যরূপ  অভিনয় করাতে দেখা গেছে বহুবার।তিনি নিজে নাট্যরূপ দিতেন এবং ওইসব নাটকে  অভিনয় ও করতেন ।কবিতা 'পুরাতন ভৃত্য ', 'দুই বিঘা জমি' ,ছোটগল্প  'ছুটি ','শাস্তি 'সহ  বহু গল্প কবিতার নাট্যরূপ অভিনীত হয়েছে ডায়মন্ডহারবার থানার ধনবেড়িয়া গ্রামে । সরোজ কুমার দাস পেশায় জেলা জজ,কিন্তু নেশায় সাহিত্য সেবী এবং সংস্কৃতি মনস্ক ।এগুলো নিশ্চয়ই আশাব্যঞ্জক ,কিন্তু  হতাশার এই যে, বর্তমানে এরকম কোনো প্রচেষ্টা চোখে পড়ছে না ।ওই ধরনের চর্চা আর হতে দেখা যাচ্ছে না ।
                                        যদিও ডায়মন্ড হারবারে নাট্যচর্চার ইতিহাস বহু পুরনো।ঊনিশ শ পনের খ্রিস্টাব্দে ডায়মন্ডহারবারে ডায়মন্ড ক্লাবের জন্ম। ক্লাবের নাট্যমঞ্চসহ ক্লাবভবন নির্মিত হয় ঊনিশ শ ঊনত্রিশ সালে।যতদূর সম্ভব ওই নাট্যমঞ্চটি ডায়মন্ডহারবার মহকুমায় প্রথম। নাট্যচর্চার কেন্দ্র হিসেবে একসময় ডায়মন্ড ক্লাবের সুনাম ছিল। তাছাড়া বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের উপযোগী নাটক প্রযোজনা ও পরিবেশনের মধ্য দিয়ে ডায়মন্ড ক্লাব নিজেদেরকে সাধারণের কাছের ক্লাব হয়ে উঠেছিল। ওই মঞ্চে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও জনসংযোগ বিভাগের পরিবেশিত রবীন্দ্র গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য মঞ্চস্থ হতে দেখা যেত একসময় প্রায় নিয়মিত। স্থানীয় শিল্পী শ্রাবণী মাইতি এবং বসুধা মাইতি উৎকৃষ্ট নৃত্যশৈলী ও নৃত্য পরিচালনার ফলে একদা ডায়মন্ডহারবারের নুনগোলা সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। 
                            ঊনিশ শ পঞ্চান্ন সাল থেকে ঊনিশ শ ষাট সাল পর্যন্ত নাট্যচর্চার গতি বেশ স্থিমিত ছিল।ঊনিশ শ ঊনসত্তর- সত্তর সালে ডায়মন্ড টকীজ হলে প্রায় নাট্য প্রতিযোগিতার সূচনা হয়।ছয়ের দশক থেকে ডায়মন্ডহারবারের নানা জায়গায় নাট্যচর্চার উন্মাদনা লক্ষ্য করা যায়।ডায়মন্ডহারবারে কিশোর সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠিত হয়,যা ঊনিশ শ বৃষ্টি সালে যাযাবর গোষ্ঠীতে রূপান্তরিত হয়।এঁদের পরিচালনায় বহু নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল সেসময়।অভিনেত্রী সঙ্ঘ, চলতরঙ্গ নাট্যসংস্থা,ডায়মন্ডহারবার ষ্টেট ব্যাঙ্ক রিক্রিয়েশন ক্লাব, ডায়মন্ডহারবারের কো অপরেটিভ ব্যাঙ্ক কর্মচারী সমিতি ও বহু নাটক উপহার দিয়েছে।
         যখন প্রাচীন অভিনেতাদের অনেকেই অন্তরালে তখন নতুন রক্তের টগবগে আদল নিয়ে জন্ম নিল দর্পণ নাট্যসংস্থা।কর্ণধার দেবপ্রসাদ মন্ডলের সুচিন্তিত অনুধ্যানে এবং ঐকান্তিক নিষ্ঠার ফলে দর্পণ অচিরেই নাট্যমোদী মানুষের মন জয় করে নিল।দর্পণ সংস্থা নাটক নিয়ে নিয়মিত পরীক্ষা- নিরীক্ষায় বিশ্বাসী ছিল।বহু উল্লেখযোগ্য নাটক উপস্থাপন করার নজির স্থাপন করেছিল দর্পণ। এভাবেই ঊনিশ শ পঁচাত্তর-ছিয়াত্তর  সাল পর্যন্ত ডায়মন্ডহারবারের নাট্যজগৎ বেশ রমরমিয়ে চলেছিল। 
                                          এইসব চর্চা ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে অক্সিজেন যোগান দিয়েছিল। উন্মাদক অনুপ্রেরণা আর কল্পনার উদ্দীপক হিসেবে কাজও করেছিল রন্ধ্রে রন্ধ্রে ।
               ডায়মন্ডহারবারে বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে কিংবা প্রশাসনের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণকাজে যোগদান করেছেন কবি সন্তোষ চক্রবর্তী, কবি সুধেন্দু মল্লিক, কবি অলোক মুখোপাধ্যায় প্রমুখ ব্যক্তিত্ব।তাঁদের প্রত্যক্ষ সাহচর্যে, আনুকূল্যে ও সহযোগিতায় লালিত হয়েছে ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্যের পরিমণ্ডল ।মহকুমাশাসক তারাপদ ঘোষ ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্য সাধকদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যোগাযোগ রেখে চলতেন ।তিনি হলদিয়ায় বদলির পরেও ওই যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন ।হলদিয়া উৎসবে তিনি উদ্যোগী হয়ে ডায়মন্ডহারবারের কবি- সাহিত্যিকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ।সাহিত্য অনুষ্ঠান,কবিতাপাঠের পর রাতে ডায়মন্ডহারবারে ফেরার জন্য সুসজ্জিত সরকারি লঞ্চের ব্যবস্থা করে আমাদেরকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন ।মহকুমাশাসক স্বরাজরঞ্জণ চক্রবর্তী ডায়মন্ডহারবারে কর্মরত অবস্থায় অকস্মাৎ অকাল প্রয়াত হন।তিনিও তাঁর জীবিতাবস্থায় মহকুমাশাসকের পাশের মাঠে প্যান্ডেল বেঁধে সাহিত্য অনুষ্ঠান,কবিতা পাঠ, সঙ্গীতানুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেছিলেন সানন্দ সহযোগিতার মধ্য দিয়ে ।


ছবি : বিধান দেব 

1 টি মন্তব্য:

  1. খুবই মনোরম স্মৃতিচারণ এবং সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। অনেক অনেক স্মৃতি ভেসে ওঠে।

    উত্তরমুছুন