বুধবার, ৩০ মার্চ, ২০২২

পাঠকের হাট ।। অরুণ পাঠক


 চাঁদের জমানো জলে মেঘ রঙ ছায়ার ফড়িং



যে কবিতা পার হতে গেলে মেঘের প্রতিরোধ এসে যায় সেরকম কবিতার মুখোমুখি বসে আমি বড় হয়েছি। বীজনের নেশায় তীব্র অশরীরী এক ঘোর আমার কবিতাশৈশবে যে সব কবিতার সামনে আমাকে দাঁড়াতে দিয়েছিল, যেসব কবিতার প্রত্যেকটি শব্দ তসবিহের দানার মতো এককালে আমি জপ করতাম তাদেরই স্রষ্টাদের একজন যখন দেশের মানচিত্র টপকে পার্শ্ববর্তী আরেক দেশের অপর একটি দেওয়াল এনে জুড়ে দেন নিজের মেঝেতে তখন বিস্ময়ের চেয়েও বেশি জাগে  সমৃদ্ধির প্রশ্ন। প্রসঙ্গত জানাই পার্শ্ববর্তী দেশ নিয়ে মাতোয়ারা আমার দেশের কিছু কবিবন্ধু যখন আহ্লাদের সঙ্গে নিজের দেশের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার সীমা লঙ্ঘন করেন তখন তাঁদের সেইসব আচরণকে নিতান্ত ফেক এবং অসভ্যতা বলে মনে হয়। কিন্তু সেসবের বিপরীতে যখন পড়ি:

'সকাল থেকে অন্ধকারে হাত ডুবিয়ে বসে আছে শাহীন। তার চোখের ভেতর ভেসে চলেছে নৌকো অথবা পালতোলা সোনার জাহাজ।'
                               (কব্জি কেঁদে ওঠে শাহীনের)
কিংবা

'কিছু মেঘ রোদ চুরি করে পালাচ্ছে, আর কিছু নক্ষত্র পুলিশ হয়ে ধাওয়া করছে তার পিছু। চোর পুলিশের এই 'খেলায় আমার ভূমিকা নিতান্তই দর্শকের, কিন্তু যখন ক্যাসিনোকে হটিয়ে পেঁয়াজের কিছু ঝাঁজ এসে গ্রাস করে নিলো চোখের করোটি, ঠিক তখনই ঘুম ভাঙল রাখালের, শষ্যের শেষ রক্ষায় মাঠে নেমে এলো কবি।'
                                                              (কবি)

উল্লিখিত দুই কবিতাংশের প্রথম কবি সৌমিত বসু এবং দ্বিতীয় কবি শাহীন রেজা । প্রথমজন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আর দ্বিতীয়জন বাংলাদেশের আটের দশকের খ্যাতিমান দুই কবি। একই উপমহাদেশের দুই বিচ্ছিন্ন বঙ্গ প্রদেশের একই সময়ের এই দুই কবির এক মলাটের ভেতর দুটি দুফর্মার কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা ২০২২-এ।
১। চাঁদের জমানো জলে মুখ দেখা যায়— সৌমিত বসু
২৷ মেঘরঙ ছায়ার ফড়িং—  শাহীন রেজা

দুজনেই বহুপ্রজ কবি। দুজনেরই প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ সংখ্যা ছাব্বিশ।
সৌমিত বসুর সুদীর্ঘ কবিতাযাত্রার ইতিবৃত্ত ইতিপূর্বে আমি লিখেছি। আটের দশকের প্রতিভাবান এই কবি নিজেকে বহুবার ভেঙেছেন। প্রশ্ন করেছেন নিজের কবিসত্তাকে। চ্যালেঞ্জ করেছেন, ঝুঁকি নিয়েছেন। নিজের স্বতন্ত্র কাব্যভাষা খুঁজে পেতে একজন কবিকে কতটা পথ হাঁটতে হয় কবি সৌমিত বসু তার প্রমাণ। অথচ তার পথের আনন্দ, যা আমরা কুড়িয়ে পেয়েছি, অমূল্য সে সব।

'তোমার নখ থেকে কাঠবেড়ালি বেরিয়ে
অসহায়ভাবে আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে
উপমাটি কি অবাস্তব হয়ে গেল খুব?'
                            (তরঙ্গ ছুঁয়ে যায় কবিতার পাতা)

বহুদিন পর কবিকে স্বমেজাজে পেলাম মনে হচ্ছে। নখ থেকে কাঠবেড়ালি বেরিয়ে আকাশে উড়ছে— এই অসামান্য দৃশ্য তো একজন কবিই দেখতে পান! যদিও কবি এই দৃশ্যটিকে খুব অবাস্তব কিনা প্রশ্ন করেছেন তার পাঠকদের। যদিও সেই অবাস্তবতার অনর্থ নিয়েই তিনি সারাজীবন বাঁচতে চান।




'আমি এই কাঠবেড়ালি, মেঘ আর আকাশ নিয়েই বেঁচে থাকতে চাই। সারাটাজীবন।' প্রাত্যহিকতার সব প্রয়োজনের বাইরে দাঁড়িয়ে একজন কবিকে মোকাবিলা করতে হয় একঘেয়ে সমস্ত প্রণালীর। আর এগিয়ে দিতে হয় এক অকৃত্রিম সাধুস্বভাব।

'সম্পর্কগুলো থমকে রয়েছে ভেবে কাঁধে হাত রাখি
লাউডগার মতো কাঁধ, মাখনের ভেতরকার ছুরির মতো
আমার হাত বসে যায় তার কাঁধের ভেতর।
তখন সামনের গলি ওয়াক করে উগরে দিচ্ছে চাঁদ।'
                                                                        (ঝড়)
সৌমিত বসুর কবিতার মধ্যে এক অন্ধকার আর্তি থাকে।
তা একদিকে মেটাফিজিক্যাল ডার্কনেস হতে পারে, হতে পারে ডাডাইজমের ঝোড়োপ্রকল্পোত্তর সব তছনছ। স্পষ্টবাদিতা, বৈপ্লবিক সমাজশাসনের বিরুদ্ধাচরণ তাঁর মধ্যে কি দেখতে সাহায্য করে না নতুন কোনও চারু মজুমদার কিংবা শৈলেশ্বর ঘোষকে!
'একটি ফনিমনসা দু-হাতে আতঙ্ক মেখে নিচুমুখে এসে দাড়াচ্ছে/ গ্যারেজের পেছনে।' (ঝড়)

এই দু-হাতে আতঙ্কমাখা ফনিমনসাই সৌমিত বসুর কবিতা। বেশ কিছু কবিতা তিনি এখানে লিখেছেন বর্তমান বিশ্বে আলোচিত ওয়ার্ড পেন্টিং-এর মতো। শব্দে ছবি সেখানে বেজে যায় সংগীতের মতো।

'ঝড় জঙ্গলের ভেতর থেকে নেমে আসে লালটিপ।
নেমে আসে। আর দু-হাতে সাবান মেখে উড়িয়ে দিয়েছে যারা
তাদের নাভির ওপর চেরা দাগ। ঘুড়ি উড়ছে পতঙ্গ মতো।'
                                                  (গৃহ)

বেশ দীর্ঘ টানা কবিতা। শব্দ—ছবি—সংগীত।

বাংলাদেশের কবি শাহীন রেজাকে প্রথম দর্শনেই ভালবেসে ফেলা যায়। কাকদ্বীপে তিনি একবার এসেছিলেন। সেখানেই আলাপ। ভালোবাসা যার সম্পদ তিনি অনির্বান। কবি শাহীন রেজার কবিতাও জলের স্পর্শের মতো সহজ, আনমিতা। বাংলাদেশের কবিতায় যে আবেগ মাতৃভাষা ও মাতৃদেশকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে তা সত্তর দশক পর্যন্ত বহমান ছিল। আশির দশক থেকে তা কিছুটা বাঁকবদল করে। জীবন ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে যে লড়াই তার পৌনপুনিকতা থেকে বাংলা কবিতার উচ্চারণকে স্বতন্ত্র পথে নিয়ে এসেছেন কবি শাহীন রেজা।

'চোয়ালের কাটা দাগটাকে গোলাপ ভেবে যেদিন তুমি ছুঁয়ে দিয়েছিলে,/ সেইদিন বুঝেছিলাম/ আমার মৃত্যু সে তোমার হাতে।/ লালের জলসায় সারারাত ডাহুকীর গল্প শোনার পর ভোরের আলো/ ফুটে উঠতেই/ ইথারে ইথারে 'আচ্ছালাতু খয়রুম মিনান নউম'।/ জেগে ওঠার মন্ত্রে পুনর্জন্ম আমার; আমাদের।'
                                                            (বিস্মরণ)

শাহীন রেজা প্রেমিক কবি। সে প্রেম হৃদয় নিঙরানো। ইতিহাস দোহন করা।

'বেদনা রেখেছি এঁকে দু'ঠোঁটের ফাঁকে
মনে পড়ে আজ, খুব মনে পড়ে তাঁকে
জানালার গ্রীলে কত পাখি আসে
কত চেনা মুখ আলোজলে ভাসে
সেই আশালতা তবু খোঁজে চোখ
ইকারুসে কি নিপুন করোটির শোক।'
                                    (শামসুর রাহমান)





একটি ছোট্ট এলিজি। সুনিপুন সংহতিতে গড়া। আ মরি বাংলা ভাষায় গড়ে ওঠা কবির মননে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ থেকে শক্তি-শামসুর হয়ে একালের তরুণ কবিরাও এসে যান।
'এখন আকাশে জমে উঠলে ধূসর, মনের বীণায় আহা রবীন্দ্রনাথ; শুধু ভালোবাসাবাসি।' (নিবেদন)

'ক্লাস নাইনের সিঁড়ি পেরুতে না পেরুতেই আমার মগজে ঢুকে যায় বনলতা সেন।'     (বনলতা সিনড্রোম)

'কবি যায়, ট্রামের জানালা দিয়ে ঘুম ঘুম তারাগুলো
ডাকে তাকে; ডাকে ইশারায়।'   (শক্তির জন্মদিনে)

কবি শাহীন রেজা, আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আপনার মেঘমেদুর কবিতা আপনার সরল হৃদয়ের একান্তে আমাদের প্রিয়তম একটি দেশকে চিহ্নিত করে যা একদা আপন মেয়ের মতো নিজের ছিল, এখন আত্মীয় হয়ে গেছে।

চাঁদের জমানো জলে মুখ দেখা যায়— সৌমিত বসু
মেঘরঙ ছায়ার ফড়িং—  শাহীন রেজা
দি সী বুক এজেন্সি ।। কলকাতা ।। ১০০ টাকা ।। প্রচ্ছদ: চারু পিন্টু

ছবি : বিধান দেব 

অরুণ পাঠক ।। জন্ম: ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ কাঁজিয়াখালি, হাওড়ার মাতুলালয়ে। পিতৃভূমি দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সোনাকোপা গ্রাম। সেখানেই আবাল্য বসবাস। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  বঙ্গভাষা ও সাহিত্য-এ  স্নাতকোত্তর।
শিক্ষক শিক্ষণ ডিগ্রিপ্রাপ্ত। পেশা শিক্ষকতা। এই শতাব্দীর সূচনা (শূন্য) দশকের কবি। কবিতা ও কবিতা বিষয়ক  সাহিত্যপত্র 'সাহিত্যের বেলাভূমি ' পত্রিকার সম্পাদক। স্যাক সাহিত্য সম্মাননা, বনানী পুরস্কার, সামসুল হক স্মৃতি পুরস্কার প্রভৃতি একাধিক পুরস্কারে সম্মানিত। কবিতা পড়তে একাধিকবার বাংলাদেশে গিয়েছেন। বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়েছে কাব্যগ্রন্থ 'দ্বিতীয় বার একা'। কবিতাই তাঁর প্রথম এবং একমাত্র আশ্রয়।

1 টি মন্তব্য:

  1. যথার্থ আলোচনা হয়েছে। বইদুটি পরিক্রমা করতে পারলে আমারও ভালো লাগবে। কারণ, উক্ত দুজনই আমার প্রিয় কবি।

    উত্তরমুছুন

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...