চতুর্থ পর্ব
বানিয়ে তুলতে পারো? নিজেকে বানিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছ কখনো?—এই প্রশ্ন আমাকে করেছিল এক সন্ন্যাসী, কলকাতার পথে। কী বানিয়ে তোলার কথা বলছেন?—কেন, আমরা তো সবাই নিজেদের জীবনকে বানিয়ে তুলি অন্যের কাছে। নইলে নিজেকে দেখাবি কী করে, জানাবি কী করে?—দেখাবো কেন? আমি নিজেকে দেখাতে-জানাতে চাই না কখনো।–ওরে বোকা, নিজেকে দেখাবি কেন? নিজেকে তৈরি করবি মিথ্যে দিয়ে। তবেই দেখবি তুই সত্যের রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিস।-- এইরকম স্বপ্ন দেখে ভোরবেলা ঘুম ভেঙেছিল। আজকের শীতভাব আশ্চর্য বেড়ে গেছে। চোখের সামনে থেকে সত্যি ও মিথ্যের পর্দা সরে যেতে মনে পড়ল গত-পরশু বাবার অপারেশন হয়েছে। ওপেন সার্জারি। আড়াআড়ি পেটটা কেটে ফেলা হয়েছে। আজ এই শীতের সকালে যখন আমার ঘুম ভাঙল, তখন বাবা কী করছিল? নিশ্চয়ই সারারাত জেগে, ঘুমোতে পারেনি যন্ত্রণায়। সেই হিমশীতল, নেই-বান্ধব নার্সিংহোমে নিজেকে ভীষণ একা মনে হয়েছে তার। তবু আমি জানি আজ বিকেলে যখন আমি তার সামনে গিয়ে দাঁড়াব, তার মুখ থেকে মিলিয়ে যাবে সমস্ত কষ্টের চিহ্ন। জিজ্ঞেস করলেই বলবে, ধুর, আমার কিচ্ছু হয়নি, আমি ভালো আছি! পৃথিবী সত্যিই অনুপম মিথ্যে দিয়ে তৈরি। শুধু তার সংস্পর্শে আসতে পারলে জীবন ধন্য হয়ে যায়।
সেইবার ইছাপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল-জুড়ে অজানা জ্বরের প্রকোপ হয়েছিল। নব্বই-একানব্বই সাল হবে। অতএব তথ্যের সত্যি ঢাকা পড়ে গেছে অনিচ্ছুক মিথ্যায়। ইছাপুরের বাইরেও কি জ্বর ছড়িয়ে পড়েনি? নিশ্চয়ই পড়েছিল। কিন্তু আমার ভাবনা, আমার স্মৃতি ইছাপুরের বাইরে তাকে নিয়ে যেতে পারেনি। সংশয় একপ্রকার অসত্যজ্ঞান। কী নিয়ে সংশয়? কী ঘটেছিল? ঠিক কোন-কোন সত্য দ্বারা ঘিরেছিল আমার অতীত? আজ তাকে মিথ্যে মনে হয়। ফিরে যাই সত্যের খোঁজে সেই ১৯৮৯ সালে হয়তো, স্বপ্নে বুঝতে পারি না তেমন--ঠিক কোন বিকেলে বাবার সঙ্গে বসেছিলাম স্টেডিয়ামে। বাবা দিগন্ত থেকে ডেকে নিয়েছিল ঘটিগরমওয়ালাকে। তখন তো ঘটিগরম জানতাম না, ভাবতাম একজন মানুষ আগুন সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে। যে তাকে কাছে ডাকে, কাগজের শঙ্কু পাকিয়ে তার মধ্যে আগুন ঢেলে দেয়। ১৯৮৯-র কোনো এক অখ্যাত হারিয়ে যাওয়া বিকেলে বাবার হাতে আগুন এসেছিল শঙ্কুর আকারে। আমিও সেদিন ঘটনাচক্রে তার পাশে ছিলাম। বাবার হাতের শঙ্কু থেকে আগুন এসে পড়ছিল ভিক্ষার আকারে আমার হাতের তালুতে। সেই আগুন আমি মুখে দিয়েছিলাম। আজ সেই বিকেলের মুখে ধোঁয়া। অপরিচ্ছন্ন, অপরিজ্ঞাত কোনো সময়ের গহ্বর কাউকেই মনে রাখতে পারে না। মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্ট এইখানেই। এভাবেই কেউ জন্ম-বিষণ্ণ, কেউ ফুর্তিবাজ। সময়ের কড়াইয়ে ভাসতে ভাসতে এগিয়ে যাই দেশপ্রিয় পার্কের দিকে। চৌমাথায় নামলেই মনে হয় বাবার কাছে ফিরে এলাম। নার্সিংহোমের ভেতরে ঢুকে আমি তো অবাক! বাবা একটা সাইকেল নিয়ে আমার জন্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে স্কুলে পৌঁছে দেবে বলে। সাইকেলের সামনে ছোট্ট নীল সিট। আমি বলছি, তুমি এই অবস্থায় সাইকেল চালাতে পারবে না, দয়া করে নেমে পড়ো--, পেটে লেগে যাবে! এই শরীর নিয়ে এভাবে কেউ সাইকেল চালায়? বাবা অবাক হয়ে তাকিয়ে বলছে কীসের কী? আমি তো ফিট! আমার তো কিছুই হয়নি। চল, তোকে স্কুলে দিয়ে আসি।–স্কুল এখানে কোথায়? স্কুল তো হাওড়ায়! সাঁতরাগাছি কেদারনাথ ইনস্টিটিউশন। -- হাইস্কুলে নয় বোকা! হাইস্কুলে তো নিজেই যেতে পারবি। আমি তোকে পুষ্পবিতানে দিয়ে আসব। নার্সিংহোমের বাইরে থেকে সাইকেল উড়ল। আগে উড়ত না অবশ্য। আজ অনায়াসে উড়তে পারল। শৈশবে কোনোদিন যেতে চাইনি স্কুলে। আজ কত সহজেই যেতে চাইছি। আকাশের রঙ নীল প্যান্ট-সাদা জামার মতোই বাস্তবিক। এইভাবেই উড়ে যাওয়া যেত। কিন্তু বাস্তব যে স্বপ্নানুগ নয় কখনো। তাই বাস্তবে বাবা দেখায় তার পেটে দীর্ঘ সেলাইদাগ, ক্লান্ত সেতুর মতোই ঝুলে আছে অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি বেরিয়ে গেছে। নাক থেকে নল খুলে দেয়নি এখনো, এখনো শরীরে যায়নি একফোঁটা জল। হাত তুলে ঈশ্বর-বিশ্বাসী সেই মানুষটি বলছে—আমি ভালো আছি।
হাওড়া শহর কেমন, সেটা আজো বুঝে উঠতে পারি না। এমনও হয়, অন্যের লেখায় কখনো দেখতে পাই হাওড়া শহরকে। ভাবি, কীভাবে এটা সম্ভব? নবারুণ ভট্টাচার্য লিখছেন: “বাড়িগুলোর জানলা সুন্দর কাচ দিয়ে ঢাকা, তা না হলে ভেতরে সমস্ত কালো হয়ে যেত। কালো ধোঁয়াটা হাওয়া না থাকায় ইচ্ছেমতো ছড়াচ্ছে, তারপর হইহই করে বাড়িগুলোর গা বেয়ে লুটোপুটি খেতে খেতে উঠে যাচ্ছে। ওপর দিকে তাকালে বাড়ির ছাদের সীমানাঘেরা অংশটুকুতে পৌঁছে গেলেই মনে হচ্ছে কারখানার অঞ্চলের আকাশ। সেইরকম ময়লা, গুম-খুনের ভয় আর রোজকার কষ্টের বিষণ্ণতা”। বাবার এই না-পড়া গল্পের ভেতর দিয়ে আমি ক্রমশ নিজের বেঁচে থাকা পালটে ফেলছি। আমি জানি আরো কত না-পড়া গল্পের মধ্যে চিরকালীন হয়ে থাকা কাহিনির ভেতর আমাদের যাওয়া হবে না কোনোদিন। ‘সেইরকম ময়লা, গুম-খুনের ভয় আর রোজকার বিষণ্ণতা’ নিয়ে বয়ে চলা হাওড়া শহরের নিয়তি। ময়লা তো পুরু আস্তরণ ফেলে দেয় পথে-বিপথে, সর্বত্র। একের-পর-এক মিলিয়ে যাওয়া পানবরজের প্রেতাত্মা ঘুরে বেড়ায়। এইসব প্রেতাত্মার মধ্যে কত যুবকের শৈশব-কৈশোর প্রোথিত হয়ে আছে, আর কোনো হিসেব নেই। ঘুম-খুন শোভিত এই শহর কিংবা শহরতলির উন্নতি কোথায় হঠাত্ থমকে গেল? রাত বাড়ে। স্টিমরোলারের অতর্কিত শব্দে কম্পিত রাস্তা দিয়ে পূর্বজন্মের সন্ধ্যা ফিরিয়ে আনে। বাবার বাইসাইকেল নেমে আসে আকাশ থেকে মাটিতে। আমি তাকে সকলের চোখের আড়ালে দানাপানি দিই। উড়ে যাবার আগে চুপটি করে ধরে রাখি। কষ্ট এই, সেই উড়ে যাওয়া সাইকেল আমার নাম পর্যন্ত মনে রাখে না। এভাবেই স্মৃতি থমকে যায়। যে যে ঘটনাসমূহ স্মৃতির জন্ম দিতে পারত, তারা তলিয়ে যায় মহাকাশের চৈতন্যে। একদিন আমি না-থাকবার সময়েই লুপ্ত হয়ে যাবে এইসব লঘু-গুরু চিন্তাস্রোত। ব্যাক্তি বা সমষ্টির চেতনায় এইসব স্রোতের অভিঘাত কতটা? পৃথিবীর বয়সের ইতিহাস দেখলে মনে হয়, মানুষের গড়-রুচি স্মৃতিকে ভুলে থাকতে চায়। যে-ব্যক্তিক স্মৃতি সমবায়িক হয়ে উঠতে চায়, তার মধ্যে সত্যের নাশকতা আছে। সেই নাশকতাকে ভয় পায় সমাজ, আর সমাজ-নির্মিত রাষ্ট্রীয় অপশাসন। তুমি সব ভুলে গেলে রাষ্ট্রের স্বস্তি, সমষ্টির স্বস্তি। বাবার সঙ্গে কোনোদিন আমার এইসব নিয়ে আলোচনা হয়নি। আমি জানি, বাবার পেটে যে অতিকায় সেতু তৈরি হয়েছে, যার তলা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে রক্তস্রোত, সেই আঘাতের, রোজকার কষ্টের এই বিষণ্ণতা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। একজন মানুষ অন্য মানুষের মাংস-মেদ-মজ্জা পেরিয়ে তার বুদ্ধি ও হৃদয়ের সংসর্গ নিতে পারে না আজকাল। যদি কেউ পারে, সেই নিজেকে বানিয়ে তুলতে পারে সত্যের আলোকে।
বাড়ি ফিরে এসেছে বাবা। কোন বাড়ি? যে বাড়ির মাথায় লতিয়ে উঠত লাউডগা, উচ্ছেগাছের রোমাঞ্চে ধরা পড়ে যেত কিছু গেরস্ত সূর্যালোক? সেই বাড়ি তো আর ফিরবে না। শুধু তার পর্যুদস্ত সন্তান বিস্তর বিভ্রান্তি মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াবে এ-কাল, সে-কাল। তার অকারণ রাগে পুড়ে যায় আঞ্চলিকতা। তার অকারণ প্রেমে চন্দ্রালোকের ক্ষয়ে যাওয়া জীবাশ্ম জুতোর ভেতরে বাড়ি ফেরে। আত্মগোপন করা সেই দুঃখবোধ, সমস্ত অশ্লীল ফুর্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পৃথিবীকে ঘুম পাড়াচ্ছে। তার বিস্মৃত অতীত দেখছে—বাড়ি থেকে কিছু মুখে না দিয়ে খালি পেটেই ফুটবল নিয়ে মাঠে চলে যাচ্ছে একটি তরুণ। বাড়িতে বলা যাবে না, বললেই মার খেতে হবে। মাঠে গিয়ে, খিদের যন্ত্রণা চেপে দাসনগর বি.ডি.এফ.সি মাঠ-কাঁপানো ছেলেটি দুর্দান্ত পাস দেবে। শাণিত পায়ের কাজে বল গলিয়ে দেবে বিপক্ষের জালে। এক নয়, একাধিকবার। পরিশেষে কত মানুষের শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নিয়ে বাড়ি ফেরা সেই তরুণ তার রাগি দাদার কাছে খাবে বেধড়ক মার। না খেয়ে খেলতে যাওয়া! অথচ বাড়ির লোকগুলো যদি জানতো, এইমাত্র যে-ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে ঘরে গেল-- সে আসলে নক্ষত্র। শুধু আকাশ থেকে নেমে এসেছে বলে তাকে কেউ চিনে উঠতে পারছে না। আমিও কি চিনতে পেরেছি? আমি তাকে নিয়ে একটা কবিতা লেখার চেষ্টা করেছিলাম স্বার্থপরের মতো। কবে সেই কবিতা লিখতে পারলাম? যখন আর তার সাইকেলে চেপে স্কুলে যেতে পারি না, যখন আর স্টেডিয়ামে গিয়ে পাশাপাশি বসে কাটে না কোনো বিকেল, যখন তার ঘরের সঙ্গে আমার ঘরের দূরত্ব খানিক বেড়ে গেছে। তৈরি হয়েছে সেতু। ঠিক সেইসময়। আমি অবশ্য বাবাকে চিরকালই একটু আদর মিশিয়ে ‘বাপী’ বলেই ডেকে এসেছি। কিন্তু যখন তাকে নিয়ে লেখবার সময় এলো, তখন সেই কবিতার নাম হয়ে পড়ল: ‘বাবা’। এই লেখার মধ্যে শুধু আমার বাবা তো নয়, তামাম ইছাপুর-কদমতলা-রামতলা বাজারে যে-সমস্ত অবসরপ্রাপ্ত সন্তানেরা মাথাভর্তি কাশফুল নিয়ে ঝুঁকে বাজার করে, তাদের সবার জন্যেই এই লেখা হয়েছিল। আমি বুঝতে পারি সেই সাধুর কথা, যিনি আমাকে বানিয়ে তুলতে বলেছিলেন। কী লিখেছিলাম সেদিনের কবিতায়:
“দুঃখ ও বিষাদের মাঝখানে তাকে মাথা নীচু করে বাজার করতে দেখা যায়। ছেলের জন্যে/ চারাপোনা কিনছেন, স্ত্রীর জন্যে ওষুধ। বারবার / পয়সা বের করতে গিয়ে থতমত খাচ্ছেন বলে/ ধমক দিচ্ছে দোকানি। ঘামে নেয়ে, রোদে পুড়ে/ এই মানুষটি যখন বাসায় ফেরে, তখন মাথায়/ ছাতা ধরবার কথা আর মনেই থাকে না। পায়ের/ কাছে মীনাদিদি ঘুরঘুর করে, মাথা ঘষে ঘষে/ সমস্ত অপমানের মুহূর্তগুলো ভুলিয়ে দেয়। .... ... দুপুরে খাবার পর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তিনি হাসেন।/ নাল গড়িয়ে পড়ে ছেলেবেলার কাঁথায়। ঠাকুমা/ এখনো স্বপ্নে রোজ কাঁথা পালটে দেন।“
এইসব লেখাটেখা বস্তুত আত্ম-প্রতারণা। প্রকৃত মিথ্যে। তাকে সত্যের আগুনে ঝলসাতে ঝলসাতে দেখি বাবার পেটের সেলাইদাগ ক্রমশ সহজ হয়ে আসছে। এখন যন্ত্রণার পরিবর্তে সাময়িক স্বস্তি। উত্তুরে হাওয়া বইছে। ভেতরে মাংস-মেদ-রক্ত পুনরায় নিজেদের সংস্থাপিত করতে চাইছে নতুনতর সত্যে। এখন যদি ২০২২ না-হয়ে ১৯৭০ সাল হত, বাবা একটা ফুটবল নিয়ে কাউকে কিছু না বলে আবার মাঠে হারিয়ে যেত।
ছবি : বিধান দেব
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন