রবিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২২
সম্পাদকের কথা
আবহবিকার ।। রাজদীপ রায়
চতুর্থ পর্ব
বানিয়ে তুলতে পারো? নিজেকে বানিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছ কখনো?—এই প্রশ্ন আমাকে করেছিল এক সন্ন্যাসী, কলকাতার পথে। কী বানিয়ে তোলার কথা বলছেন?—কেন, আমরা তো সবাই নিজেদের জীবনকে বানিয়ে তুলি অন্যের কাছে। নইলে নিজেকে দেখাবি কী করে, জানাবি কী করে?—দেখাবো কেন? আমি নিজেকে দেখাতে-জানাতে চাই না কখনো।–ওরে বোকা, নিজেকে দেখাবি কেন? নিজেকে তৈরি করবি মিথ্যে দিয়ে। তবেই দেখবি তুই সত্যের রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিস।-- এইরকম স্বপ্ন দেখে ভোরবেলা ঘুম ভেঙেছিল। আজকের শীতভাব আশ্চর্য বেড়ে গেছে। চোখের সামনে থেকে সত্যি ও মিথ্যের পর্দা সরে যেতে মনে পড়ল গত-পরশু বাবার অপারেশন হয়েছে। ওপেন সার্জারি। আড়াআড়ি পেটটা কেটে ফেলা হয়েছে। আজ এই শীতের সকালে যখন আমার ঘুম ভাঙল, তখন বাবা কী করছিল? নিশ্চয়ই সারারাত জেগে, ঘুমোতে পারেনি যন্ত্রণায়। সেই হিমশীতল, নেই-বান্ধব নার্সিংহোমে নিজেকে ভীষণ একা মনে হয়েছে তার। তবু আমি জানি আজ বিকেলে যখন আমি তার সামনে গিয়ে দাঁড়াব, তার মুখ থেকে মিলিয়ে যাবে সমস্ত কষ্টের চিহ্ন। জিজ্ঞেস করলেই বলবে, ধুর, আমার কিচ্ছু হয়নি, আমি ভালো আছি! পৃথিবী সত্যিই অনুপম মিথ্যে দিয়ে তৈরি। শুধু তার সংস্পর্শে আসতে পারলে জীবন ধন্য হয়ে যায়।
সেইবার ইছাপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল-জুড়ে অজানা জ্বরের প্রকোপ হয়েছিল। নব্বই-একানব্বই সাল হবে। অতএব তথ্যের সত্যি ঢাকা পড়ে গেছে অনিচ্ছুক মিথ্যায়। ইছাপুরের বাইরেও কি জ্বর ছড়িয়ে পড়েনি? নিশ্চয়ই পড়েছিল। কিন্তু আমার ভাবনা, আমার স্মৃতি ইছাপুরের বাইরে তাকে নিয়ে যেতে পারেনি। সংশয় একপ্রকার অসত্যজ্ঞান। কী নিয়ে সংশয়? কী ঘটেছিল? ঠিক কোন-কোন সত্য দ্বারা ঘিরেছিল আমার অতীত? আজ তাকে মিথ্যে মনে হয়। ফিরে যাই সত্যের খোঁজে সেই ১৯৮৯ সালে হয়তো, স্বপ্নে বুঝতে পারি না তেমন--ঠিক কোন বিকেলে বাবার সঙ্গে বসেছিলাম স্টেডিয়ামে। বাবা দিগন্ত থেকে ডেকে নিয়েছিল ঘটিগরমওয়ালাকে। তখন তো ঘটিগরম জানতাম না, ভাবতাম একজন মানুষ আগুন সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে। যে তাকে কাছে ডাকে, কাগজের শঙ্কু পাকিয়ে তার মধ্যে আগুন ঢেলে দেয়। ১৯৮৯-র কোনো এক অখ্যাত হারিয়ে যাওয়া বিকেলে বাবার হাতে আগুন এসেছিল শঙ্কুর আকারে। আমিও সেদিন ঘটনাচক্রে তার পাশে ছিলাম। বাবার হাতের শঙ্কু থেকে আগুন এসে পড়ছিল ভিক্ষার আকারে আমার হাতের তালুতে। সেই আগুন আমি মুখে দিয়েছিলাম। আজ সেই বিকেলের মুখে ধোঁয়া। অপরিচ্ছন্ন, অপরিজ্ঞাত কোনো সময়ের গহ্বর কাউকেই মনে রাখতে পারে না। মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্ট এইখানেই। এভাবেই কেউ জন্ম-বিষণ্ণ, কেউ ফুর্তিবাজ। সময়ের কড়াইয়ে ভাসতে ভাসতে এগিয়ে যাই দেশপ্রিয় পার্কের দিকে। চৌমাথায় নামলেই মনে হয় বাবার কাছে ফিরে এলাম। নার্সিংহোমের ভেতরে ঢুকে আমি তো অবাক! বাবা একটা সাইকেল নিয়ে আমার জন্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে স্কুলে পৌঁছে দেবে বলে। সাইকেলের সামনে ছোট্ট নীল সিট। আমি বলছি, তুমি এই অবস্থায় সাইকেল চালাতে পারবে না, দয়া করে নেমে পড়ো--, পেটে লেগে যাবে! এই শরীর নিয়ে এভাবে কেউ সাইকেল চালায়? বাবা অবাক হয়ে তাকিয়ে বলছে কীসের কী? আমি তো ফিট! আমার তো কিছুই হয়নি। চল, তোকে স্কুলে দিয়ে আসি।–স্কুল এখানে কোথায়? স্কুল তো হাওড়ায়! সাঁতরাগাছি কেদারনাথ ইনস্টিটিউশন। -- হাইস্কুলে নয় বোকা! হাইস্কুলে তো নিজেই যেতে পারবি। আমি তোকে পুষ্পবিতানে দিয়ে আসব। নার্সিংহোমের বাইরে থেকে সাইকেল উড়ল। আগে উড়ত না অবশ্য। আজ অনায়াসে উড়তে পারল। শৈশবে কোনোদিন যেতে চাইনি স্কুলে। আজ কত সহজেই যেতে চাইছি। আকাশের রঙ নীল প্যান্ট-সাদা জামার মতোই বাস্তবিক। এইভাবেই উড়ে যাওয়া যেত। কিন্তু বাস্তব যে স্বপ্নানুগ নয় কখনো। তাই বাস্তবে বাবা দেখায় তার পেটে দীর্ঘ সেলাইদাগ, ক্লান্ত সেতুর মতোই ঝুলে আছে অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি বেরিয়ে গেছে। নাক থেকে নল খুলে দেয়নি এখনো, এখনো শরীরে যায়নি একফোঁটা জল। হাত তুলে ঈশ্বর-বিশ্বাসী সেই মানুষটি বলছে—আমি ভালো আছি।
হাওড়া শহর কেমন, সেটা আজো বুঝে উঠতে পারি না। এমনও হয়, অন্যের লেখায় কখনো দেখতে পাই হাওড়া শহরকে। ভাবি, কীভাবে এটা সম্ভব? নবারুণ ভট্টাচার্য লিখছেন: “বাড়িগুলোর জানলা সুন্দর কাচ দিয়ে ঢাকা, তা না হলে ভেতরে সমস্ত কালো হয়ে যেত। কালো ধোঁয়াটা হাওয়া না থাকায় ইচ্ছেমতো ছড়াচ্ছে, তারপর হইহই করে বাড়িগুলোর গা বেয়ে লুটোপুটি খেতে খেতে উঠে যাচ্ছে। ওপর দিকে তাকালে বাড়ির ছাদের সীমানাঘেরা অংশটুকুতে পৌঁছে গেলেই মনে হচ্ছে কারখানার অঞ্চলের আকাশ। সেইরকম ময়লা, গুম-খুনের ভয় আর রোজকার কষ্টের বিষণ্ণতা”। বাবার এই না-পড়া গল্পের ভেতর দিয়ে আমি ক্রমশ নিজের বেঁচে থাকা পালটে ফেলছি। আমি জানি আরো কত না-পড়া গল্পের মধ্যে চিরকালীন হয়ে থাকা কাহিনির ভেতর আমাদের যাওয়া হবে না কোনোদিন। ‘সেইরকম ময়লা, গুম-খুনের ভয় আর রোজকার বিষণ্ণতা’ নিয়ে বয়ে চলা হাওড়া শহরের নিয়তি। ময়লা তো পুরু আস্তরণ ফেলে দেয় পথে-বিপথে, সর্বত্র। একের-পর-এক মিলিয়ে যাওয়া পানবরজের প্রেতাত্মা ঘুরে বেড়ায়। এইসব প্রেতাত্মার মধ্যে কত যুবকের শৈশব-কৈশোর প্রোথিত হয়ে আছে, আর কোনো হিসেব নেই। ঘুম-খুন শোভিত এই শহর কিংবা শহরতলির উন্নতি কোথায় হঠাত্ থমকে গেল? রাত বাড়ে। স্টিমরোলারের অতর্কিত শব্দে কম্পিত রাস্তা দিয়ে পূর্বজন্মের সন্ধ্যা ফিরিয়ে আনে। বাবার বাইসাইকেল নেমে আসে আকাশ থেকে মাটিতে। আমি তাকে সকলের চোখের আড়ালে দানাপানি দিই। উড়ে যাবার আগে চুপটি করে ধরে রাখি। কষ্ট এই, সেই উড়ে যাওয়া সাইকেল আমার নাম পর্যন্ত মনে রাখে না। এভাবেই স্মৃতি থমকে যায়। যে যে ঘটনাসমূহ স্মৃতির জন্ম দিতে পারত, তারা তলিয়ে যায় মহাকাশের চৈতন্যে। একদিন আমি না-থাকবার সময়েই লুপ্ত হয়ে যাবে এইসব লঘু-গুরু চিন্তাস্রোত। ব্যাক্তি বা সমষ্টির চেতনায় এইসব স্রোতের অভিঘাত কতটা? পৃথিবীর বয়সের ইতিহাস দেখলে মনে হয়, মানুষের গড়-রুচি স্মৃতিকে ভুলে থাকতে চায়। যে-ব্যক্তিক স্মৃতি সমবায়িক হয়ে উঠতে চায়, তার মধ্যে সত্যের নাশকতা আছে। সেই নাশকতাকে ভয় পায় সমাজ, আর সমাজ-নির্মিত রাষ্ট্রীয় অপশাসন। তুমি সব ভুলে গেলে রাষ্ট্রের স্বস্তি, সমষ্টির স্বস্তি। বাবার সঙ্গে কোনোদিন আমার এইসব নিয়ে আলোচনা হয়নি। আমি জানি, বাবার পেটে যে অতিকায় সেতু তৈরি হয়েছে, যার তলা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে রক্তস্রোত, সেই আঘাতের, রোজকার কষ্টের এই বিষণ্ণতা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। একজন মানুষ অন্য মানুষের মাংস-মেদ-মজ্জা পেরিয়ে তার বুদ্ধি ও হৃদয়ের সংসর্গ নিতে পারে না আজকাল। যদি কেউ পারে, সেই নিজেকে বানিয়ে তুলতে পারে সত্যের আলোকে।
বাড়ি ফিরে এসেছে বাবা। কোন বাড়ি? যে বাড়ির মাথায় লতিয়ে উঠত লাউডগা, উচ্ছেগাছের রোমাঞ্চে ধরা পড়ে যেত কিছু গেরস্ত সূর্যালোক? সেই বাড়ি তো আর ফিরবে না। শুধু তার পর্যুদস্ত সন্তান বিস্তর বিভ্রান্তি মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াবে এ-কাল, সে-কাল। তার অকারণ রাগে পুড়ে যায় আঞ্চলিকতা। তার অকারণ প্রেমে চন্দ্রালোকের ক্ষয়ে যাওয়া জীবাশ্ম জুতোর ভেতরে বাড়ি ফেরে। আত্মগোপন করা সেই দুঃখবোধ, সমস্ত অশ্লীল ফুর্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পৃথিবীকে ঘুম পাড়াচ্ছে। তার বিস্মৃত অতীত দেখছে—বাড়ি থেকে কিছু মুখে না দিয়ে খালি পেটেই ফুটবল নিয়ে মাঠে চলে যাচ্ছে একটি তরুণ। বাড়িতে বলা যাবে না, বললেই মার খেতে হবে। মাঠে গিয়ে, খিদের যন্ত্রণা চেপে দাসনগর বি.ডি.এফ.সি মাঠ-কাঁপানো ছেলেটি দুর্দান্ত পাস দেবে। শাণিত পায়ের কাজে বল গলিয়ে দেবে বিপক্ষের জালে। এক নয়, একাধিকবার। পরিশেষে কত মানুষের শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নিয়ে বাড়ি ফেরা সেই তরুণ তার রাগি দাদার কাছে খাবে বেধড়ক মার। না খেয়ে খেলতে যাওয়া! অথচ বাড়ির লোকগুলো যদি জানতো, এইমাত্র যে-ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে ঘরে গেল-- সে আসলে নক্ষত্র। শুধু আকাশ থেকে নেমে এসেছে বলে তাকে কেউ চিনে উঠতে পারছে না। আমিও কি চিনতে পেরেছি? আমি তাকে নিয়ে একটা কবিতা লেখার চেষ্টা করেছিলাম স্বার্থপরের মতো। কবে সেই কবিতা লিখতে পারলাম? যখন আর তার সাইকেলে চেপে স্কুলে যেতে পারি না, যখন আর স্টেডিয়ামে গিয়ে পাশাপাশি বসে কাটে না কোনো বিকেল, যখন তার ঘরের সঙ্গে আমার ঘরের দূরত্ব খানিক বেড়ে গেছে। তৈরি হয়েছে সেতু। ঠিক সেইসময়। আমি অবশ্য বাবাকে চিরকালই একটু আদর মিশিয়ে ‘বাপী’ বলেই ডেকে এসেছি। কিন্তু যখন তাকে নিয়ে লেখবার সময় এলো, তখন সেই কবিতার নাম হয়ে পড়ল: ‘বাবা’। এই লেখার মধ্যে শুধু আমার বাবা তো নয়, তামাম ইছাপুর-কদমতলা-রামতলা বাজারে যে-সমস্ত অবসরপ্রাপ্ত সন্তানেরা মাথাভর্তি কাশফুল নিয়ে ঝুঁকে বাজার করে, তাদের সবার জন্যেই এই লেখা হয়েছিল। আমি বুঝতে পারি সেই সাধুর কথা, যিনি আমাকে বানিয়ে তুলতে বলেছিলেন। কী লিখেছিলাম সেদিনের কবিতায়:
“দুঃখ ও বিষাদের মাঝখানে তাকে মাথা নীচু করে বাজার করতে দেখা যায়। ছেলের জন্যে/ চারাপোনা কিনছেন, স্ত্রীর জন্যে ওষুধ। বারবার / পয়সা বের করতে গিয়ে থতমত খাচ্ছেন বলে/ ধমক দিচ্ছে দোকানি। ঘামে নেয়ে, রোদে পুড়ে/ এই মানুষটি যখন বাসায় ফেরে, তখন মাথায়/ ছাতা ধরবার কথা আর মনেই থাকে না। পায়ের/ কাছে মীনাদিদি ঘুরঘুর করে, মাথা ঘষে ঘষে/ সমস্ত অপমানের মুহূর্তগুলো ভুলিয়ে দেয়। .... ... দুপুরে খাবার পর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তিনি হাসেন।/ নাল গড়িয়ে পড়ে ছেলেবেলার কাঁথায়। ঠাকুমা/ এখনো স্বপ্নে রোজ কাঁথা পালটে দেন।“
এইসব লেখাটেখা বস্তুত আত্ম-প্রতারণা। প্রকৃত মিথ্যে। তাকে সত্যের আগুনে ঝলসাতে ঝলসাতে দেখি বাবার পেটের সেলাইদাগ ক্রমশ সহজ হয়ে আসছে। এখন যন্ত্রণার পরিবর্তে সাময়িক স্বস্তি। উত্তুরে হাওয়া বইছে। ভেতরে মাংস-মেদ-রক্ত পুনরায় নিজেদের সংস্থাপিত করতে চাইছে নতুনতর সত্যে। এখন যদি ২০২২ না-হয়ে ১৯৭০ সাল হত, বাবা একটা ফুটবল নিয়ে কাউকে কিছু না বলে আবার মাঠে হারিয়ে যেত।
ছবি : বিধান দেব
জন্মের আগের মুখ ।। চন্দন মিত্র
ভিনদেশি তারা ।। অরিন্দম রায়
এই কবি ‘জনগণের কবি’ নামে পরিচিত। তাঁর রক্তে বহমান কবিতা। তাঁর কাকা আল রবলস, তিনিও ফিলিপিনো-আমেরিকান কবি, ঐতিহাসিক এবং বিশিষ্ট সোশ্যাল রাইট অ্যাক্টিভিস্ট। কবিতার পাশাপাশি লিখে থাকেন ছোট গল্প। ২০১৭ সালে তাঁর নাম উঠে এসেছিল সান ফ্রান্সিসকোর সম্ভাব্য পোয়েট লরিয়েট হিসেবে। প্রকাশিত হয়েছে দুটি কবিতার বই, যথাক্রমে ‘Cool Don’t Live Here No More- A Letter to San Fransisco’ এবং ‘Fingerprints of a Hunger Strike’ এই নামে। ছোটদের জন্যেও তাঁর দুটি বই আছে। একটির নাম ‘Lakas and the Manilatown Fish’ আরেকটি ‘Lakas and the Makibaka Hotel’। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংকলনে তাঁর কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে যার মধ্যে ‘Growing Up Filipino VolumeII’, Of Color:Poet’s ways of Making’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তিনি টনি রবলস। তাঁর কবিতায় উঠে আসে উচ্ছেদ, পুলিশি হিংস্রতার কথা, উঠে আসে বাস্তুচ্যুত মানুষ আর বর্ণবিদ্বেষের মতো বিষয়।
টনি রবলস
লাঠির ডগায় একটি পতাকা
কয়েকটা পয়সা
আর কিছুটা স্বাদবদলের জন্য
দেশাত্মবোধ
লাল সাদা এবং নীল
কোণের দোকানে
লাঠির গায়ে,
সুপারমার্কেট,
মদের দোকান
অন্য কোনো দেশে
সেনাবাহিনী
খারাপ লোকেদের উপর
বোমা বর্ষণ করছে
ক্যাডবেরি রাখার তাকের পাশেই
লাঠির গায়ে জড়ানো পতাকাগুলো
আমি পতাকা রেখে
সিধে ক্যাডবেরির দিকে
হাত বাড়াই
চকোলেট
গলে
গলে
গলে
পড়ে
আমার হাতে
আমার হাতের তালুতে
দাগ হয়ে যায়
দূর কোনো দেশে, একজন পিতা
মুঠোভর্তি মাটি তুলে নেয় আর
জিজ্ঞেস করে:
আমার জন্মভূমির কী হয়েছে?
আরও বোমা নেমে আসে
একটা দাঁড়কাক
তারের উপরে
এসে বসে
আর হাসে
একখানা মস্ত পতাকা
আমার পাশে উড়ছে,
কারুর ডাঁই করে রাখা
জিনিসপত্রের পিছন থেকে
হাওয়ায়
পতপত করে
আমি দেখি
আর গাছপালাহীন ঘাসজমি
এবং অবশিষ্ট চিহ্নের কথা ভাবি
আমার বাদামি রঙের
চামড়ার দিকে তাকাও
আর ভাবো
নেটিভদের ভাবনাগুলো
একজন নেটিভের মতো অনুভব করি,
অনুভব করি একজন আরবজাতির লোকের মতো,
বাদামি চামড়ার একজন লোকের মতো অনুভব করি
যখন চকোলেট
দাগ রেখে যায়
আমার
আঙুলেপাঠকের হাট ।। অরুণ পাঠক
[আমার কাব্যজ্ঞানের প্রারম্ভিক পর্যায় থেকেই দেখে আসছি অগ্রজ কবিরা তাঁদের বই অকাতরে উপহার দিচ্ছেন। মুখে তৃপ্তির হাসি দাতা ও গ্রহীতার। চার চোখে সমান আগ্রহ। আশে পাশে কৌতুহল। বয়সে অনেক ছোট হলেও বহু প্রতিষ্ঠিত বিদ্বান কবি অল্পবয়সী আমাকেও তাঁদের কাব্যগ্রন্থ উপহার দিয়েছেন। আমিও আমার কাব্যগ্রন্থ ঝোলা থেকে বের করে কাঁপা কাঁপা হাতে কোনও শ্রদ্ধেয় অথবা স্নেহভাজন কবিকে উপহার দিয়ে স্বর্গীয় তৃপ্তি উপলব্ধি করি। আজও কোনও অনুষ্ঠানে গেলে এই কাব্যগ্রন্থ দেওয়া-নেওয়ার একটি বিশেষ পর্ব অলিখিতভাবে সূচিভুক্ত থাকে। তার বাইরে ডাক বিভাগের মাধ্যমেও অনেক কবি তাঁদের কাব্যগ্রন্থ আমার ঠিকানায় পাঠান।
নবীন-প্রবীণ, পরিচিত-অপরিচিত সেইসব কবিদের কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আমি এবার আমার অনুভবের দু-চার কথা বলতে চাইছি এখানে। তবে শুধু উপহার পাওয়া কাব্যগ্রন্থ নয় সেইসঙ্গে গাঁটের কড়ি খরচ করে যে অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ আমি এযাবৎ কিনেছি সেইসব কাব্যগ্রন্থেরও কোনও কোনওটি এই আলোচনার উপলক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।]
কবিতার সমুদ্রে যত ঢেউ ওঠে তার প্রত্যেকটিই পূর্ণ করতে পারে অমৃতকলস। মুহূর্তে রেঙে ওঠা মুখের সঙ্গে অন্বিষ্ঠ চোখের চিকচিক যত ক্ষণমুহূর্তকে বিধৃত করে মর্মের ঘরে ততই বেড়ে যায় অন্বেষণ। কবিতাভিক্ষুকের তৃষ্ণা আর মেটে না। কিন্তু কবিতা কী দেয় আমাদের? তা কি কেবল ভাববাদী চেতনার স্তরে অমুক অমুক হয়েই থেকে যাবে? তা কি আমাদের বাস্তবে বেঁচে থাকার সঙ্গে কোনোভাবেই সহায়তা করে না? ইরানের কবি আব্বাস কিয়ারোস্তামি লিখেছেন—"কবিতা আমাদেরকে হাজার ফুট উচ্চতায় তুলে ধরে আর সেখান থেকে নীচে সারা জগতকে একত্রে দেখার ক্ষমতা প্রদান করে। কবিতা আর কিছু নয়। শিল্প না থাকলে, কবিতা না থাকলে আসে দারিদ্র্য, রিক্ততা।"(ইন দ্য শ্যাডো অফ ট্রিজ— বইয়ের শেষ প্রচ্ছদে লেখা কবির বক্তব্য/ কথাচিত্রকণা— সংকলন ও তর্জমা: আব্দুল কাফি)। দারিদ্র্য ও রিক্ততায় অভ্যস্ত মানুষ তাই কবিতা থেকে দূরে থাকলেও কবিতাই বারবার তাদের দ্বারা, তাদের জন্য ও তাদের হয়ে উঠতে চায়। যেমন:
আনাগোনা নির্বান্ধব হয়ে ওঠে
দুঃখ খুলে যায় আমাদের সড়ককুজন
ওখানে গল্পের আবহাওয়া... সুরঞ্জনা
কী কথা তাহার মোবাইলে!
থলি নাও, খুচরো, খাদ্যের হও আজ
দরদাম করো... গায়ে হাত দাও সকল আনাজ
ককিয়ে শিউরে ওঠে, উঠছে ছোঁয়ায়
(বাজার)
এই কবিতার রচয়িতা পলাশ দে। শূন্য দশকের অন্যতম একজন কবি। যে বইয়ে এই কবিতাটি আছে তার নাম 'একা মফসসল'। ২০১০ সালে রাখালিয়া থেকে বইটি প্রকাশিত হয়। তার অনেক আগে থেকেই আমি তার কবিতার সঙ্গে পরিচিত। 'আমি কিন্তু পারি স্বপ্ন', 'ফুঁ' কাব্যপুস্তিকাদুটি এর আগেই প্রকাশিত। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত পলাশের কবিতা পড়ছিলাম। বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত অরণি-র পঞ্চাশ বছরের বাংলা কবিতা সংখ্যায় পশ্চিমবঙ্গের শূন্য দশক সম্পাদনাকালে তার কবিতা রেখেছিলাম। কিন্তু সম্মুখ সাক্ষাৎ ? না, মনে নেই।
একজন কবি মূলত একক পথের যাত্রী। তার চলার ট্রাক তাকেই তৈরী করে নিতে হয়। পলাশ দে তার প্রথম কবিতাটি থেকেই সেই দুর্লভ একাকী চলার পথটি তৈরী করে নিতে পেরেছেন। কবিতা নির্মাণে বাংলা ভাষার কোনও উত্তরাধিকার তার নেই। চূড়ান্ত সামাজিক, অবক্ষয় সচেতন, নীতিভ্রষ্টতায় ক্রুদ্ধ এই কবি কি কিছুটা মরমী?
অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ার আগের মুহূর্তেই তবে
কী ভাবছিল ছেলেটি?
ভাবছিল, দ্যাখো হবে
রাজি হয়ে যাবে ঠিক
(তুমি যা ভাবছ)
নৈর্ব্যক্তিক। ক্ষুদ্র স্ববাচন। তলিয়ে যাবার আগে খড়কুটো আঁকড়ে ধরার প্রত্যাশা।
কিংবা,
ভালো লাগা শব্দটির আগে-পিছে
কোনো অজুহাত নেই
শুধু এক বিকেলের অপেক্ষা
আর এক অপেক্ষার বিকেল
(প্রেম)
যে কবিতাপাঠকেরা কবিতায় কাহিনি চান, নাটক চান, একশো পঁচিশ পঙক্তির কবিতায় সুরেলা কণ্ঠ চান তারা হতাশ হবেন হয়ত। কিন্তু জীবনের সুবৃহৎ গল্পের এমন সূক্ষ্ম আয়োজনই যে একজন কবির কাজ তা তার কবিতায় পুরোদস্তুর দেখিয়ে দেন পলাশ। কবিতা যে শুধু কথার আলেখ্য নয়, তা যে অনেকখানি উদ্ভাবনের ইশারামাত্র, তা যে সত্যেরই অনূর্ধ্ব বাস্তব পলাশের কবিতা পড়লে তা অনুভব করা যায়।
জানলার পিছনে একটি নিস্তব্ধতা
নিস্তব্ধতার পাশে একটি নদী
নদীর দু-পাশে একটি হাওয়া
হাওয়ার গুনগুনে একটি বাসস্ট্যান্ড
বাসস্ট্যান্ডের ফিশফাশে একটি অপেক্ষা
অপেক্ষার গল্পে কেউ গুমখুন
এবার, কে কার আগে পিছে
তদন্ত শুরু করার ভূমিকায়
তুমি
সানাই এবং বিসমিল্লা খানের মাঝখানে
ফাঁকা
(সুর)
আমরা জানি যেকোনও সুর উৎক্ষেপনের জন্য যে সব যন্ত্র আছে তার ভেতরে বেশ কিছুটা ফাঁকা থাকে। বাধাপ্রাপ্ত সচল বাতাসকে একমুখী গতিতে একজন শিল্পী স্বরে পরিণত করেন। সুর একপ্রকার স্বরই। এই স্বর যখন আমাদের জীবনের প্রাতিস্বিকতায় তার উৎস খোঁজে তখন চালক আর চালিকাশক্তি, যন্ত্র আর যন্ত্রীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে জীবন। যা সর্বার্থেই ফাঁকা। যাকে আশ্রয় করে পরিপার্শ্ব, যাকে আশ্রয় করে স্বর বা সুর। পলাশের কবিতা বেজে ওঠে না। পাঠ শেষে তা দাবি করে নীরবতা। সমাজের নানাবিধ অসুখ ও অসুদ্ধতাকে এমন নিস্পৃহতায় পলাশ তুলে ধরেন যাতে আমাদের উচ্ছ্বাস, উল্লাস জন্মায় না। আমরা থেমে যাই। আমাদের চিন্তাশক্তি সাময়িক বিরতি চায়। কবি শঙ্খ ঘোষ 'কবিতার মুহূর্ত' গ্রন্থে এরকম পরিস্থিতিকেই 'ভাষাকে ভেঙে দিয়ে ভাষার সত্যে পৌঁছবার কোনও লড়াই' বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও লিখেছেন —'Nova Express-এর মধ্যে বারো দেখিয়েছিলেন যে নীরবতাই হলো আমাদের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষণীয় অবস্থা, কিন্তু শব্দেরই কোনো বিশেষ প্রয়োগরীতির মধ্য দিয়ে আমরা পৌঁছতে পারি সেই নীরবতায়।' (কবিতার মুহূর্ত)। পলাশ তার কবিতায় শব্দের সেই বিশেষ প্রয়োগরীতি আয়ত্ব করতে পেরেছেন বলে আমার মনে হয়।
দেখলেই আকাশ...না ভাবলেও
চিলেকোঠায় জোছনা হতে পারে
কল্পনা মাখিয়ে এরপর তুমি যা খুশি উদাহরণ
যে কোনও বর্ণবৈষম্য আহা গল্প মাখামাখি
চলছে তো চলছেই
ওই যে ছাদের নীচে ফেরিওলা
নিঃসঙ্গ, কিছুটা ঝুঁকে... সেই ফিরে ফিরে যাচ্ছে
না না এইসব নয়
বরং অন্যরকম, কিছু ফিরিয়া বলা যাক—
জোনাকিরা সেই কবে থেকে শ্বাসকষ্ট পাচ্ছে তো পাচ্ছেই
(ছাদ)
পলাশ শুধু একজন কবি নন, তিনি একজন চিত্রপরিচালকও। তাই দৃশ্যগত সহাবস্থানের শিল্পবোধ তার যথেষ্ট। বর্তমান বিশ্বে নন্দিত সিনে কবিতার সচল আবহ পলাশের কবিতায় খুঁজে পাওয়া অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু সেই সঙ্গে কবিতার বাক্যের রীতিতে যে ধরণের কারুকাজ পলাশ করেছেন সমসাময়িক বাংলা কবিতায় তা আর কোথাও পাওয়া যায় না। কবিতায় সিনট্যাক্স নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এর আগে করেছেন উৎপলকুমার বসু। তারপর পলাশ। এতে ঝুঁকি আছে। পলাশ সে ঝুঁকি নিয়েছেন। তার কবিতার শুরু হচ্ছে এভাবে—
একলা বাড়ন্ত হয়ে যাচ্ছে
জানলা খোলা, ছাদে ওঠা ভাগ হয়ে যাচ্ছে এখন
হ্যাঙারের ফাঁকা ঢেকে যাচ্ছে অন্যরকম পোশাকে
গন্ধ ছড়াচ্ছে বাড়িময় দেয়ালের কান সমেত
(স্ত্রী বউ ওয়াইফ)
কবিতার বিষয় বলার মতো মূর্খতা আর কাল কবিতাআলোচকের না থাকাই ভালো। আমারও তা নেই। জীবনের বাচনিক সজ্জার অন্দরমহলে ঢুকে পড়তে পারলে কবিতার রূপের অন্ধকারকে উপভোগ করা যায়। এইটুকুই শুধু আমার অধিকার ও অর্জন। পলাশের কবিতা প্রাত্যহিক দিনের শুরুতে ঝেঁপে আসা রোদ্দুরে নিজেকে নতুন করে মেপে নেওয়ার মতো। যার কোনও চিহ্ন গায়ে লেগে থাকে না পুনরায় পরদিন আবার নিজেকে মেপে নিতে।
সবুর গাছের নীচে এই আমরা যে কজন
একলা সামলে আছি
ফল হব হব করেও আলিঙ্গন পারছে না নিজেকে
আর আমাদের সব সহ্যের আগে 'অ' বসে যাচ্ছে
প্লাস-মাইনাস করে দেখেছি অনেকবার কিন্তু জাঁহাপনা
সে চলে গেল এবং বলেও গেল
( পলাশনামা)
গ্রন্থের শেষ কবিতায় আপন সমানুবর্তন রেখেও পলাশ যেভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটি ভাবমোক্ষণকে মুচড়ে দিলেন তাতে কি প্রমাণ হল না যে বেলা অনেক বয়ে গেছে। বাংলা কবিতার জেনারেশন গ্যাপ রবীন্দ্রনাথ পেরিয়ে দু'দুটো শতাব্দী পেরিয়ে যে একবিংশে এসে পড়েছে তারও এক নিবিষ্ট প্রমাণ এখানে পাওয়া যায়। যদিও আগেও অনেক কবিই সদর্থক ও নঞর্থক অর্থে রবীন্দ্রপঙক্তি ইতিপূর্বে তাদের কবিতায় ব্যবহার করেছেন।
আর সেই ঐতিহ্যই বাংলা কবিতার চিরঐতিহ্যে জুড়ে দিল পলাশের কবিতাকে।
একা মফসসল ।। পলাশ দে ।। রাখালিয়া ।। চল্লিশ টাকা
শিক্ষক শিক্ষণ ডিগ্রিপ্রাপ্ত। পেশা শিক্ষকতা। এই শতাব্দীর সূচনা (শূন্য) দশকের কবি। কবিতা ও কবিতা বিষয়ক সাহিত্যপত্র 'সাহিত্যের বেলাভূমি ' পত্রিকার সম্পাদক। স্যাক সাহিত্য সম্মাননা, বনানী পুরস্কার, সামসুল হক স্মৃতি পুরস্কার প্রভৃতি একাধিক পুরস্কারে সম্মানিত। কবিতা পড়তে একাধিকবার বাংলাদেশে গিয়েছেন। বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়েছে কাব্যগ্রন্থ 'দ্বিতীয় বার একা'। কবিতাই তাঁর প্রথম এবং একমাত্র আশ্রয়।
নয়া বৃহদারণ্যক ।। দেবাশিস দাশ
৫.
প্রাণতত্ত্ব
প্রাণবিদ্যা-খাদ্যশাস্ত্র আশ্চর্য বিষয়
জীবনবিজ্ঞান জানা জরুরি নিশ্চয়।
খাদক ও খাদ্যে স্রষ্টা চাহিদা জোগান
অন্ন, দুধ, যাগযজ্ঞ, বাক্, মন, প্রাণ।
অন্ন মানে সাত খাদ্য— কার্বোহাইড্রেট
ছাড়াও প্রোটিন, ফ্যাট, সুষম ভরপেট
খাবারে থাকেই খাদ্যপ্রাণ ভিটামিন,
খনিজ উৎসেচক, তাছাড়া মর্ফিন,
ক্যাফেন ইত্যাদি উপকারী উপক্ষার
প্রাণিজ-উদ্ভিজ্জ যৌগ পৌষ্টিক আহার।
স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শিশুখাদ্য দুধ
দেবতার উপশম সুরা ও ওষুধ।
কীভাবে প্রাণের সৃষ্টি? বাঁচার কী প্রথা?
মানবজগতে শ্রেষ্ঠ বিদ্বান দেবতা
সঠিক ডায়েট আর দুর্মূল্য ওষুধ
করায়ত্ত করে তারা অমৃতের দূত—
অকালমৃত্যুকে জয় করার ডাক্তারি
জানা ছিল, আর ছিল মাল কাঁড়ি-কাঁড়ি।
তাই এ-জগতে শ্রেষ্ঠ দেবলোক জয়
করা যায় বিদ্যা দিয়ে, জীবন অক্ষয়
সুস্থ রাখা যায় প্রায় একশো বছর—
জনন-প্রথায় জিন-কণিকা অমর।
সমস্ত ইন্দ্রিয়, যারা মৃত্যুর অধীন
তাদের অমর করে একমাত্র জিন।
বাক, মন, প্রাণ— এই তিন খাদ্য নিয়ে
দর্শন উঠেছে গড়ে জিনতত্ত্ব দিয়ে।
পৃথিবী, আকাশ, জল— তিন অবস্থান
ঋক, যজুঃ, সাম— তিন বেদ-পরিমাণ
ব্যঞ্জনা এদের, যেন মা-বাবা-সন্তান—
এভাবে ত্রিমূর্ত এরা— বাক-মন-প্রাণ।
বিজ্ঞাত জবাব বাক, বিজিজ্ঞাস্য মন
যেন-বা বিস্ময় প্রশ্ন, অথচ গহন
অবিজ্ঞাত হল প্রাণ। জল থেকে জাত
প্রাণের শরীর জল, স্বর্গে প্রতিভাত
রাতের সৌন্দর্য দীপ্তি চিরায়ত চাঁদ।
পৃথিবী বাকের দেহ, অগ্নি তার জ্যোতি,
মনের শরীর দ্যৌ— মহাবিশ্ব-মতি
যেখানে আদিত্য জ্বলে বিরতিবিহীন
অনন্তে সকলে যেন হয়ে আছে লীন।
আত্মার সুখাদ্য প্রাণ— অধিদৈব বায়ু
অশ্রান্ত অজড় প্রাণ সুধা-পরমায়ু।
আত্মার বাকি যা খাদ্য— মন আর বাক
মরে গেলে ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি খাক।
ইন্দ্রিয় পাপের ভোগী, হাঁফায় সহজে
অনন্ত প্রাণের কাব্য আস্থাবান বোঝে।
বাঁচার জন্যেই খাওয়া,— যতটা দরকার
তার বেশি নিলে হবে পাপ, পেটভার।
যেরকম সূর্য ওঠে, ফের অস্ত যায়
প্রাণতত্ত্ব সেরকম শৃঙ্খলা শেখায়।
প্রাণশক্তি চিরন্তন— দেবব্রতকথা:
পাপরূপ মৃত্যু থেকে বাঁচুক সভ্যতা।
এরস ও থ্যানাটস রয়েছে ফ্রয়েডে
প্রাণ ও মৃত্যুর দ্বন্দ্ব ধরা আছে বেদে।
ছবি : বিধান দেব
সুপুরি বনের ছায়ায় ছায়ায় ।। সুবীর সরকার
গুচ্ছ কবিতা ।। রফিক উল ইসলাম
রুগ্ন দোতারা
নগরবাউল জানে, আমি কার রুগ্ন দোতারা। ভাঙা মেলা থেকে সস্তায় কেউ কিনে এনেছিল, অতঃপর
ফেলে গেছে কোলাহলের পারে। কোলাহল
সমুদ্রের মতন, ঢেউ ভেঙে এগোতে পারিনা। যে হাত
বাজাবে ভেবে উন্মুখ হয়ে থাকি, সেই হাতও
নানাবিধ অহংকারে চূর্ণ হয়ে আছে!
অগত্যা সবটুকু রুগ্নতা নিয়ে সসংকোচে
দীক্ষার কাছে যাই। যদি কিছু ভাঙা হাড়
জোড়া লাগে, যদি কোনো আলোকিত ঝরনা মুক্ত অবসরে সিক্ত করে তোলে। হায়, রুগ্নতা নিয়ে কোনো
প্রশ্নই ওঠে না, যাবতীয় প্রশ্ন-পরিক্রমা, বাঁকা চোখ
আজও সেই জাতি-ধর্ম ঘিরে! অথচ আমার দেহে তো
মাত্রই আধখানা চাঁদ। বাকি অর্ধেক খুঁজে বেড়াবার ছলে এই ভেসে থাকা
এই ডুবে যাওয়া
আবার জেগে ওঠা পদদলিত জলে।
অগত্যা আবারও সেই কোলাহল-তীরে সুদূরগামী
পথ চেয়ে থাকা। ভাঙা মেলা ফিরে গেছে, ফিরে গেছে নগরবাউল। আমি কার রুগ্ন দোতারা, সেটুকুও তো
জানিনা সঠিক। শুধু জানি, প্রকৃত শূন্যের পথে ভেসে ভেসে অহংকারহীন কোনো হাত
একদা তুমুল বাজিয়ে তুলবে আমাকে।
জেগে থাকা
জলভরা মেঘের ফাঁকে ঘুমিয়ে আছো তুমি
বিদ্যুতের বেশে। আর আমার সব পাখিরাও একে একে
উড়ে গেছে তারাভরা বনের ছায়ায়! আমি শুধু জেগে আছি, জেগে থাকি গরম ভাতের থালার মতন
রাত্রির সুরভিটুকু বুকে নিয়ে।
ক্লান্ত পথের শেষে নির্জন অশথ কোল পেতে
ডেকেছিল সেই কবে। জ্যোৎস্নার অভিমান দূরে ঠেলে
একটুও এগোতে পারিনি। আমি জানি, একদিন তোমার সব বিদ্যুৎ
আর আলো নিয়ে এই পৃথিবীতে ঠিক ফিরে আসবে তুমি,
শুধু আমারই জন্যে! তাই রাত্রির সুরভিটুকু বুকে নিয়ে
সহস্র রজনী জুড়ে অফুরন্ত এই জেগে থাকা,
ঘুমিয়ে পড়া পাখিদের করুণ ডানায়!
চরমোহনা
বৃষ্টির সাথে মিলেমিশে চোখের জলও উড়ে উড়ে
লালন-সমাধির দিকেই যাচ্ছে। ছেঁউড়িয়ার জলে
তাই লবণস্বাদ, যাঁরা জানেন,
তাঁরাই শুধু জানেন! যে নদী ভাসিয়ে নিয়ে যায়
ঘরদুয়ার, যে নদী ফিরিয়ে আনে অর্ধমৃতের ভেলা,
সে-ও একদিন পথ হারিয়ে ফেলে। আমি ওই হারানো পথের ধুলোয়
দোতারা-জীবন নিয়ে আছি।
শব্দের আঁস্তাকুড় থেকে উত্থিত করে
সুর আর বৈরাগ্যের অভিমুখে
এবার বাজাও আমাকে।
চরমোহনায় অনভিপ্রেত চিতা জ্বলে উঠেছে!
ছবি : বিধান দেব
গুচ্ছ কবিতা ।। অনিমেষ মণ্ডল
অনিমেষ মণ্ডল
গুচ্ছ কবিতা ।। শোভন মণ্ডল
রাজা-সাজা
নিতান্তই পাকেচক্রে এভাবে গলিয়েছি মাথা
মাথা নয়, মাথাব্যথা, মুকুটের ভার
সে তো সহজ নয়, জানা কথা
তবুও কাঁপাতে হবে স্টেজ, যে ভাবেই হোক
অজস্র রোশনাই, শত শত চোখ
আমাকেই দেখছে, না হয় অভিনয়ে মন দি
এ তো কঠিন কাজ, নজরবন্দি
কাহিনী শেষ হয়ে গেলে
গ্রীনরুমে মেকআপ তুলি
রাজা-সাজা সারা, ফিরিয়ে দাও তবে
ভিক্ষের ঝুলি
রাত গভীর হলে
আমাদের সব চোখ জুড়িয়ে আসে দূরবীনে
খোলা জানালায় অবিরাম পর্দা ওড়ে
কুকুরের ডাকাডাকি স্তিমিতপ্রায়
লাইটপোস্টের ছায়া পড়ে আছে রাস্তার একপাশে
যাদের ফেরার ছিল তারা ফিরে গেছে কখন
সামনের কলেজের ঘড়িতে ঘন্টা বাজে ঢংঢং
চুমুকে চুমুকে নিভে আসে গ্লাস
গলে যাওয়া কিউবে ছুঁয়ে যায় আঙুল
প্রগাঢ় নিশীথে আজ
সব আলো নিভে যায় লেডিস হস্টেল
তাচ্ছিল্য
আমি অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছি
স্পর্শ করেছি দুরন্ত ঢেউ, বিমর্ষ সীমারেখা
পাথরের উদ্যানে জড়ো করে রাখা আছে বুকের আগুন
তোমাকে পৌঁছে দিতে চেয়েছি সেই সব উষ্ণতা, অনায়াসে
তাচ্ছিল্য করেছো, যে ভাবে রাত বাড়লে চায়ের দোকানে নিভে আসে উনুন
অনেকটা তেমনই গড়িয়ে যায় ধারা, নিকষ নিঝুম চুলে
অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছি পুরনো প্রেম
তুমি তখন ফুঁ দিচ্ছ
নেলপালিশ লাগানো মায়াবী আঙুলে
ছবি : বিধান দেব
পরিচিতি : শোভন মণ্ডল
জন্ম- ২৫/১০/১৯৮০
শিক্ষাগত যোগ্যতা - বি এস সি ( কেমিস্ট্রি)
বাসস্থান - ডায়মন্ড হারবার
বই- ৩টি , চুম্বনে অচেনা ভাস্কর্য (পাঠক) , দরজার ওপারে... (ধানসিড়ি)এবং লাস্টবেঞ্চ, পাশে জানালা(শুধু বিঘে দুই)
সম্মান-
আত্মদ্রোহ সাহিত্য সম্মান।
কবিতা
সম্পাদকের কথা
দ্বিতীয় বর্ষ ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২ খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...
-
চণ্ডী কথা ১ সুরথ সমাধি আখ্যান রাজ্যহারা রাজা সুরথ ঘুরতে ঘুরতে মেধামুনির আশ্রমে এলেন । ভাগ্যহারা বিষণ্ণ রাজা । কিন্তু ফেলে আসা রাজ্য ...
-
দোলায় আছে ছ'পণ কড়ি এক হেমন্তের গোধূলি আর সন্ধ্যার ভেতরে তেমন তো কোনও ফারাক থাকে না। ১৭ নভেম্বর ২০২০ হির্শবার্গের সন্ধ্যা আর কলকা...
-
শমীপোকা ও অর্জুনের বিষাদযোগ লাল, রেকসিনে বাঁধাই ছিল বইটা। ঠাকুরঘরে ঢুকে নকুলদানা খেলে কেউ কিছু বলত না, কিন্তু এই বইটায় হাত দেওয়া যাবে না...