রবিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২২

সম্পাদকের কথা


দ্বিতীয় বর্ষ  ।। ষষ্ঠ সংখ্যা ।। জানুয়ারি ২০২২

সারা মাস ধরে ব্যর্থ চিন্তা করি। নানা উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তার সঙ্গে লড়াই করতে করতে মাসের শেষ দিনটিতে পৌঁছে যাই। কেউ কেউ মনে করতে পারেন প্রিন্টেড ভার্সন নয়, তাও এত চিন্তা কেন? টাকা তো লাগে না। সত্যি বলছি, পত্রিকা প্রিন্টেড হোক বা ব্লগে সম্পাদকের দায়িত্ব ও যন্ত্রণা একই থাকে। এক একটা পত্রিকা বেঁচে থাকার এক একটা ধরন। স্বপ্নের স্বাভাবিকতাকে বাস্তব করে তোলা। শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি কেউই সমাজের বাইরের কেউ নন। যারা সমসময়ে খ্যাতিমান হন আর যারা খ্যাতিহীনভাবে একই কাজ নীরবে করে চলেন— উভয়েই সামাজিক মানুষ। যেকোনও উচ্চ-নীচতা নিয়ে কাউকে হেয় করা চলে না। কারণ সময় কখন যে কাকে ছুড়ে ফেলবে আর কাকে যে গ্রহণ করবে আমরা কেউ জানি না। সফলতাও একধরনের পরাধীনতা। আত্মবোধের চূড়ান্ত সামিয়ানার নীচে বসে থাকার ধৈর্য চাই। আপনাকে তাড়না করার শক্তি আপন স্বভাবেই থাকে। তাকে পরাহত করতে না পারলে সমত্ব ও সহমর্মিতা আসবে না। শিল্পচর্চাকে যারা প্রতিযোগিতা মনে করেন তাদের মতো আহম্মক আর কে আছে? আপনার গৌরবের ছটায় আপনি আলোকিত হবার কৌশল যদি জানা না থাকে তাহলে কী বা লিখবেন? আমি সেইসব শিল্পী-সাহিত্যিকদের আত্মীয় মনে করি যারা অনেক অনেক দূরে থেকেও আপন স্বভাবে স্নাত করাচ্ছেন তাদের চারপাশ।


আবহবিকার ।। রাজদীপ রায়



 চতুর্থ পর্ব 

বিন্দু বিন্দু ইথার   

বানিয়ে তুলতে পারো? নিজেকে বানিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছ কখনো?—এই প্রশ্ন আমাকে করেছিল এক সন্ন্যাসী, কলকাতার পথে। কী বানিয়ে তোলার কথা বলছেন?—কেন, আমরা তো সবাই নিজেদের জীবনকে বানিয়ে তুলি অন্যের কাছে। নইলে নিজেকে দেখাবি কী করে, জানাবি কী করে?—দেখাবো কেন? আমি নিজেকে দেখাতে-জানাতে চাই না কখনো।–ওরে বোকা, নিজেকে দেখাবি কেন? নিজেকে তৈরি করবি মিথ্যে দিয়ে। তবেই দেখবি তুই সত্যের রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিস।-- এইরকম স্বপ্ন দেখে ভোরবেলা ঘুম ভেঙেছিল। আজকের শীতভাব আশ্চর্য বেড়ে গেছে। চোখের সামনে থেকে সত্যি ও মিথ্যের পর্দা সরে যেতে মনে পড়ল গত-পরশু বাবার অপারেশন হয়েছে। ওপেন সার্জারি। আড়াআড়ি পেটটা কেটে ফেলা হয়েছে। আজ এই শীতের সকালে যখন আমার ঘুম ভাঙল, তখন বাবা কী করছিল? নিশ্চয়ই সারারাত জেগে, ঘুমোতে পারেনি যন্ত্রণায়। সেই হিমশীতল, নেই-বান্ধব নার্সিংহোমে নিজেকে ভীষণ একা মনে হয়েছে তার। তবু আমি জানি আজ বিকেলে যখন আমি তার সামনে গিয়ে দাঁড়াব, তার মুখ থেকে মিলিয়ে যাবে সমস্ত কষ্টের চিহ্ন। জিজ্ঞেস করলেই বলবে, ধুর, আমার কিচ্ছু হয়নি, আমি ভালো আছি! পৃথিবী সত্যিই অনুপম মিথ্যে দিয়ে তৈরি। শুধু তার সংস্পর্শে আসতে পারলে জীবন ধন্য হয়ে যায়। 


সেইবার ইছাপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল-জুড়ে অজানা জ্বরের প্রকোপ হয়েছিল।  নব্বই-একানব্বই সাল হবে। অতএব তথ্যের সত্যি ঢাকা পড়ে গেছে অনিচ্ছুক মিথ্যায়। ইছাপুরের বাইরেও কি জ্বর ছড়িয়ে পড়েনি? নিশ্চয়ই পড়েছিল। কিন্তু আমার ভাবনা, আমার স্মৃতি ইছাপুরের বাইরে তাকে নিয়ে যেতে পারেনি। সংশয় একপ্রকার অসত্যজ্ঞান। কী নিয়ে সংশয়? কী ঘটেছিল? ঠিক কোন-কোন সত্য দ্বারা ঘিরেছিল আমার অতীত? আজ তাকে মিথ্যে মনে হয়। ফিরে যাই সত্যের খোঁজে সেই ১৯৮৯ সালে হয়তো, স্বপ্নে বুঝতে পারি না তেমন--ঠিক কোন বিকেলে বাবার সঙ্গে বসেছিলাম স্টেডিয়ামে। বাবা দিগন্ত থেকে ডেকে নিয়েছিল ঘটিগরমওয়ালাকে। তখন তো ঘটিগরম জানতাম না, ভাবতাম একজন মানুষ আগুন সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে। যে তাকে কাছে ডাকে, কাগজের শঙ্কু পাকিয়ে তার মধ্যে আগুন ঢেলে দেয়।  ১৯৮৯-র কোনো এক অখ্যাত হারিয়ে যাওয়া বিকেলে বাবার হাতে আগুন এসেছিল শঙ্কুর আকারে। আমিও সেদিন ঘটনাচক্রে তার পাশে ছিলাম। বাবার হাতের শঙ্কু থেকে আগুন এসে পড়ছিল ভিক্ষার আকারে আমার হাতের তালুতে। সেই আগুন আমি মুখে দিয়েছিলাম। আজ সেই বিকেলের মুখে ধোঁয়া। অপরিচ্ছন্ন, অপরিজ্ঞাত কোনো সময়ের গহ্বর কাউকেই মনে রাখতে পারে না। মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্ট এইখানেই। এভাবেই কেউ জন্ম-বিষণ্ণ, কেউ ফুর্তিবাজ। সময়ের কড়াইয়ে ভাসতে ভাসতে এগিয়ে যাই দেশপ্রিয় পার্কের দিকে। চৌমাথায় নামলেই মনে হয় বাবার কাছে ফিরে এলাম। নার্সিংহোমের ভেতরে ঢুকে আমি তো অবাক! বাবা একটা সাইকেল নিয়ে আমার জন্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে স্কুলে পৌঁছে দেবে বলে। সাইকেলের সামনে ছোট্ট নীল সিট। আমি বলছি, তুমি এই অবস্থায় সাইকেল চালাতে পারবে না, দয়া করে নেমে পড়ো--, পেটে লেগে যাবে! এই শরীর নিয়ে এভাবে কেউ সাইকেল চালায়? বাবা অবাক হয়ে তাকিয়ে বলছে কীসের কী? আমি তো ফিট! আমার তো কিছুই হয়নি। চল, তোকে স্কুলে দিয়ে আসি।–স্কুল এখানে কোথায়? স্কুল তো হাওড়ায়! সাঁতরাগাছি কেদারনাথ ইনস্টিটিউশন। -- হাইস্কুলে নয় বোকা! হাইস্কুলে তো নিজেই যেতে পারবি। আমি তোকে পুষ্পবিতানে দিয়ে আসব। নার্সিংহোমের বাইরে থেকে সাইকেল উড়ল। আগে উড়ত না অবশ্য। আজ অনায়াসে উড়তে পারল। শৈশবে কোনোদিন যেতে চাইনি স্কুলে। আজ কত সহজেই যেতে চাইছি। আকাশের রঙ নীল প্যান্ট-সাদা জামার মতোই বাস্তবিক। এইভাবেই উড়ে যাওয়া যেত। কিন্তু বাস্তব যে স্বপ্নানুগ নয় কখনো। তাই বাস্তবে বাবা দেখায় তার পেটে দীর্ঘ সেলাইদাগ, ক্লান্ত সেতুর মতোই ঝুলে আছে অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি বেরিয়ে গেছে। নাক থেকে নল খুলে দেয়নি এখনো, এখনো শরীরে যায়নি একফোঁটা জল। হাত তুলে ঈশ্বর-বিশ্বাসী সেই মানুষটি বলছে—আমি ভালো আছি।   


হাওড়া শহর কেমন, সেটা আজো বুঝে উঠতে পারি না। এমনও হয়, অন্যের লেখায় কখনো দেখতে পাই হাওড়া শহরকে। ভাবি, কীভাবে এটা সম্ভব? নবারুণ ভট্টাচার্য লিখছেন: “বাড়িগুলোর জানলা সুন্দর কাচ দিয়ে ঢাকা, তা না হলে ভেতরে সমস্ত কালো হয়ে যেত। কালো ধোঁয়াটা হাওয়া না থাকায় ইচ্ছেমতো ছড়াচ্ছে, তারপর হইহই করে বাড়িগুলোর গা বেয়ে লুটোপুটি খেতে খেতে উঠে যাচ্ছে। ওপর দিকে তাকালে বাড়ির ছাদের সীমানাঘেরা অংশটুকুতে পৌঁছে গেলেই মনে হচ্ছে কারখানার অঞ্চলের আকাশ। সেইরকম ময়লা, গুম-খুনের ভয় আর রোজকার কষ্টের বিষণ্ণতা”। বাবার এই না-পড়া গল্পের ভেতর দিয়ে আমি ক্রমশ নিজের বেঁচে থাকা পালটে ফেলছি। আমি জানি আরো কত না-পড়া গল্পের মধ্যে চিরকালীন হয়ে থাকা কাহিনির ভেতর আমাদের যাওয়া হবে না কোনোদিন। ‘সেইরকম ময়লা, গুম-খুনের ভয় আর রোজকার বিষণ্ণতা’ নিয়ে বয়ে চলা হাওড়া শহরের নিয়তি। ময়লা তো পুরু আস্তরণ ফেলে দেয় পথে-বিপথে, সর্বত্র। একের-পর-এক মিলিয়ে যাওয়া পানবরজের প্রেতাত্মা ঘুরে বেড়ায়। এইসব প্রেতাত্মার মধ্যে কত যুবকের শৈশব-কৈশোর প্রোথিত হয়ে আছে, আর কোনো হিসেব নেই। ঘুম-খুন শোভিত এই শহর কিংবা শহরতলির উন্নতি কোথায় হঠাত্‍ থমকে গেল? রাত বাড়ে। স্টিমরোলারের অতর্কিত শব্দে কম্পিত রাস্তা দিয়ে পূর্বজন্মের সন্ধ্যা ফিরিয়ে আনে। বাবার বাইসাইকেল নেমে আসে আকাশ থেকে মাটিতে। আমি তাকে সকলের চোখের আড়ালে দানাপানি দিই। উড়ে যাবার আগে চুপটি করে ধরে রাখি। কষ্ট এই, সেই উড়ে যাওয়া সাইকেল আমার নাম পর্যন্ত মনে রাখে না। এভাবেই স্মৃতি থমকে যায়। যে যে ঘটনাসমূহ স্মৃতির জন্ম দিতে পারত, তারা তলিয়ে যায় মহাকাশের চৈতন্যে। একদিন আমি না-থাকবার সময়েই লুপ্ত হয়ে যাবে এইসব লঘু-গুরু চিন্তাস্রোত। ব্যাক্তি বা সমষ্টির চেতনায় এইসব স্রোতের অভিঘাত কতটা? পৃথিবীর বয়সের ইতিহাস দেখলে মনে হয়, মানুষের গড়-রুচি স্মৃতিকে ভুলে থাকতে চায়। যে-ব্যক্তিক স্মৃতি সমবায়িক হয়ে উঠতে চায়, তার মধ্যে সত্যের নাশকতা আছে। সেই নাশকতাকে ভয় পায় সমাজ, আর সমাজ-নির্মিত রাষ্ট্রীয় অপশাসন। তুমি সব ভুলে গেলে রাষ্ট্রের স্বস্তি, সমষ্টির স্বস্তি। বাবার সঙ্গে কোনোদিন আমার এইসব নিয়ে আলোচনা হয়নি। আমি জানি, বাবার পেটে যে অতিকায় সেতু তৈরি হয়েছে, যার তলা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে রক্তস্রোত, সেই আঘাতের, রোজকার কষ্টের এই বিষণ্ণতা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। একজন মানুষ অন্য মানুষের মাংস-মেদ-মজ্জা পেরিয়ে তার বুদ্ধি ও হৃদয়ের সংসর্গ নিতে পারে না আজকাল। যদি কেউ পারে, সেই নিজেকে বানিয়ে তুলতে পারে সত্যের আলোকে। 


বাড়ি ফিরে এসেছে বাবা। কোন বাড়ি? যে বাড়ির মাথায় লতিয়ে উঠত লাউডগা, উচ্ছেগাছের রোমাঞ্চে ধরা পড়ে যেত কিছু গেরস্ত সূর্যালোক? সেই বাড়ি তো আর ফিরবে না। শুধু তার পর্যুদস্ত সন্তান বিস্তর বিভ্রান্তি মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াবে এ-কাল, সে-কাল। তার অকারণ রাগে পুড়ে যায় আঞ্চলিকতা। তার অকারণ প্রেমে চন্দ্রালোকের ক্ষয়ে যাওয়া জীবাশ্ম জুতোর ভেতরে বাড়ি ফেরে। আত্মগোপন করা সেই দুঃখবোধ, সমস্ত অশ্লীল ফুর্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পৃথিবীকে ঘুম পাড়াচ্ছে।  তার বিস্মৃত অতীত দেখছে—বাড়ি থেকে কিছু মুখে না দিয়ে খালি পেটেই ফুটবল নিয়ে মাঠে চলে যাচ্ছে একটি তরুণ। বাড়িতে বলা যাবে না, বললেই মার খেতে হবে। মাঠে গিয়ে, খিদের যন্ত্রণা চেপে দাসনগর বি.ডি.এফ.সি মাঠ-কাঁপানো ছেলেটি দুর্দান্ত পাস দেবে। শাণিত পায়ের কাজে বল গলিয়ে দেবে বিপক্ষের জালে। এক নয়, একাধিকবার। পরিশেষে কত মানুষের শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নিয়ে বাড়ি ফেরা সেই তরুণ তার রাগি দাদার কাছে খাবে বেধড়ক মার। না খেয়ে খেলতে যাওয়া! অথচ বাড়ির লোকগুলো যদি জানতো, এইমাত্র যে-ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে ঘরে গেল-- সে আসলে নক্ষত্র। শুধু আকাশ থেকে নেমে এসেছে বলে তাকে কেউ চিনে উঠতে পারছে না। আমিও কি চিনতে পেরেছি? আমি তাকে নিয়ে একটা কবিতা লেখার চেষ্টা করেছিলাম স্বার্থপরের মতো। কবে সেই কবিতা লিখতে পারলাম? যখন আর তার সাইকেলে চেপে স্কুলে যেতে পারি না, যখন আর স্টেডিয়ামে গিয়ে পাশাপাশি বসে কাটে না কোনো বিকেল, যখন তার ঘরের সঙ্গে আমার ঘরের দূরত্ব খানিক বেড়ে গেছে। তৈরি হয়েছে সেতু। ঠিক সেইসময়। আমি অবশ্য বাবাকে চিরকালই একটু আদর মিশিয়ে ‘বাপী’ বলেই ডেকে এসেছি। কিন্তু যখন তাকে নিয়ে লেখবার সময় এলো, তখন সেই কবিতার নাম হয়ে পড়ল: ‘বাবা’। এই লেখার মধ্যে শুধু আমার বাবা তো নয়, তামাম ইছাপুর-কদমতলা-রামতলা বাজারে যে-সমস্ত অবসরপ্রাপ্ত সন্তানেরা মাথাভর্তি কাশফুল নিয়ে ঝুঁকে বাজার করে, তাদের সবার জন্যেই এই লেখা হয়েছিল। আমি বুঝতে পারি সেই সাধুর কথা, যিনি আমাকে বানিয়ে তুলতে বলেছিলেন। কী লিখেছিলাম সেদিনের কবিতায়: 


“দুঃখ ও বিষাদের মাঝখানে তাকে মাথা নীচু করে বাজার করতে দেখা যায়। ছেলের জন্যে/ চারাপোনা কিনছেন, স্ত্রীর জন্যে ওষুধ। বারবার / পয়সা বের করতে গিয়ে থতমত খাচ্ছেন বলে/ ধমক দিচ্ছে দোকানি। ঘামে নেয়ে, রোদে পুড়ে/ এই মানুষটি যখন বাসায় ফেরে, তখন মাথায়/ ছাতা ধরবার কথা আর মনেই থাকে না। পায়ের/ কাছে মীনাদিদি ঘুরঘুর করে, মাথা ঘষে ঘষে/ সমস্ত অপমানের মুহূর্তগুলো ভুলিয়ে দেয়। .... ... দুপুরে খাবার পর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তিনি হাসেন।/ নাল গড়িয়ে পড়ে ছেলেবেলার কাঁথায়। ঠাকুমা/ এখনো স্বপ্নে রোজ কাঁথা পালটে দেন।“ 


এইসব লেখাটেখা বস্তুত আত্ম-প্রতারণা। প্রকৃত মিথ্যে। তাকে সত্যের আগুনে ঝলসাতে ঝলসাতে দেখি বাবার পেটের সেলাইদাগ ক্রমশ সহজ হয়ে আসছে। এখন যন্ত্রণার পরিবর্তে সাময়িক স্বস্তি। উত্তুরে হাওয়া বইছে। ভেতরে মাংস-মেদ-রক্ত পুনরায় নিজেদের সংস্থাপিত করতে চাইছে নতুনতর সত্যে। এখন যদি ২০২২ না-হয়ে ১৯৭০ সাল হত, বাবা একটা ফুটবল নিয়ে কাউকে কিছু না বলে আবার মাঠে হারিয়ে যেত। 


ছবি : বিধান দেব 



রাজদীপ রায় ।। জন্ম: ১৯৮৪। পেশা শিক্ষকতা। কবিতা ও গদ্য প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। কবিতার বই আছে পাঁচটি। 'যদি না পুনর্জন্ম হয়', 'ধানদূর্বার দেশ', 'জন্মান্ধের আলো','সূর্যের বিষাদ', 'বিশল্যকরণী','রামকৃষ্ণের মুখে গল্প'।




জন্মের আগের মুখ ।। চন্দন মিত্র



জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন কোয়ানের অমায়িক ভুবন
     
 
 
চতুর্দশ পর্ব 

ফা-ইয়েন / হো-গেন সম্প্রদায়  

ফা-ইয়েন সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা, ফা-ইয়েন ওয়েন-ই (জাপানি, হো-গেন ৮৮৫-৯৫৮ খ্রিঃ)। তিনি ছিলেন পূর্ব চিনের জেজিয়াং প্রদেশের রাজধানী হ্যাংচউ-এর বাসিন্দা। সাত বছর বয়সে তিনি মস্তকমুণ্ডন করে স্থানীয় চিতোঙ মঠের অধ্যক্ষ চুয়াং-ওয়েই-এর তত্ত্বাবধানে বৌদ্ধ ধর্ম ও শাস্ত্র অনুশীলন শুরু করেন। কুড়ি বছর বয়সে তিনি শাওশিং-এর কাইয়ুয়ান মঠে গিয়ে ওঠেন। অতঃপর তিনি পৌঁছে যান, মিং-চউ-এর মেই পর্বতের ইউয়াং মঠে। সেখানে তখন আচার্য শি-চাও-এর ভাষ্য শোনার জন্য দূরদূরান্ত থেকে লোকজন গিয়ে ভিড় জমাচ্ছেন। অচিরেই ফা-ইয়েন, শি-চাও-এর নজরে পড়ে যান। কিন্তু মন বসাতে পারলেন না বেশিদিন। এবার তিনি দক্ষিণ দিকে যাত্রা করলেন। ফু-চউ পৌঁছে তিনি, হ্যাংচিং হুইলাং (৮৫৪-৯৩২ খ্রিঃ)-এর শিষ্যমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য হিসাবে কিছুদিন সন্ন্যাসজীবন অতিবাহিত করেন। অনুসন্ধিৎসু ফা-ইয়েন কোথাও বেশিদিন, থিতু হতে পারেননি। জ্ঞানস্পৃহা তাঁকে ছুটিয়ে নিয়ে গেছে মঠ থেকে মঠান্তরে। ফা-ইয়েন হুয়ায়েন বা কেগান বৌদ্ধগোষ্ঠীরও অনুরাগী ছিলেন। অবতংসক সূত্র ছিল তাঁর ঠোঁটস্থ। বিভিন্ন সময় তিনি কনফুসীয় পণ্ডিতদের সঙ্গেও আলোচনায় অবতীর্ণ হতেন, মিশতেন কবি ও সাহিত্য-অনুরাগীদের সঙ্গে। 

  ফু-চউ ছেড়ে তিনজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে ফা-ইয়েন তীর্থযাত্রায় বেড়িয়ে পড়েন। একদা তুষারঝড়ের কবলে পড়ে ফা-ইয়েন সপার্ষদ আশ্রয় নেন, আচার্য লুওহান কুইশেন (জাপানি, রাকান কেইজিন ৮৬৭-৯২৮ খ্রিঃ)-এর তি-শাং মঠে। মঠটি এতটাই পোড়ো ও ভাঙাচোরা ছিল যে, ঝড়বৃষ্টি থেকে আশ্রিতদের রক্ষা করার মতো পূর্ণ সামর্থ্য তার ছিল না। তবে মঠস্বামী লুওহান, অতিথিদের জন্য যথাসম্ভব স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করেছিলেন। পরের দিন লুওহান ও ফা-ইয়েন-এর কথাবার্তা শুরু হয়। তেমন গুরুতর কিছু নয়, আসলে ফা-ইয়েনকে দেখে লুওহান-এর মনে কিছু সাধারণ জিজ্ঞাসার উদয় হয়েছিল।

লুওহান— এই দুর্যোগের মধ্যে আপনারা কোথায় যাত্রা করেছিলেন ?

বস্তুত, এই জিজ্ঞাসার উত্তর ফা-ইয়েন-এর কাছে ছিল না। তিনি জানতেন না, ঠিক কোথায় গিয়ে উঠবেন। ফলে উত্তর যেমন অগোছালো হওয়ার তেমনই হল।  

ফা-ইয়েন— আমরা তীর্থযাত্রায় বেড়িয়েছি।

লুওহান— এই তীর্থযাত্রা কী ? কী ফল লাভ হয় এতে? 

ফা-ইয়েন— এটা আমি ঠিক জানি না।

না, লুওহান মোটেও বিস্মিত হলেন না বা আগন্তুকের এহেন উত্তর পেয়ে বীতশ্রদ্ধও হলেন না। দেখা যাক তিনি কী বললেন। 

লুওহান— না-জানাই তো জানার নিকটে নিয়ে যায়।

ফা-ইয়েন, এমন উত্তর আশা করেননি। তিনি চমকিত হলেন, তাঁর সঙ্গীরাও।
    
  ফা-ইয়েন-এর মনে হল বা বেশ চমৎকার মানুষ তো ! ভাবলেন, কিছুদিন থেকে গেলেই হয়। আসলে ফা-ইয়েন এতদিন এত জ্ঞানীগুণীর সঙ্গ করেছেন, কিন্তু এমন সহজ অথচ নিগূঢ় তত্ত্ব কারোর কথায় পাননি। কৈশোরে ফা-ইয়েন, হুয়ায়েন গোষ্ঠীর দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলেন। হুয়ায়েন গোষ্ঠী মনে করতেন, সবকিছুই চৈতন্যে নিহিত ; চেতনাই হল সারসত্য। হুয়ায়েন গোষ্ঠীর এই দার্শনিক প্রত্যয় গড়ে ওঠার তাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল অবতংসক সূত্র। লুওহান-এর সঙ্গে কথোপকথনের সময় ফা-ইয়ান প্রায়শ অবতংসক সূত্র থেকে উদ্ধৃতি দিতেন, হুয়ায়েন গোষ্ঠীর ‘কেবল চৈতন্য’ তত্ত্ব আওড়াতেন। লুওহান, তেমন কিছু বলতেন না। শুধু বলতেন— বুদ্ধের কথার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। একসময় অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, ফা-ইয়ান নিজেকে সমর্পণ করে জানান— আমার এতদিনের অধীত বিদ্যার আর কিছুমাত্র অবশিষ্ট নেই। আপনি আমাকে প্রজ্ঞা দান করুন। লুওহান, চেয়েছিলেন ফা-ইয়েনকে নিছক চেতনার ধাঁধা থেকে উদ্ধার করে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনতে। একদা তিনি মঠের দরজার সামনে পড়ে থাকা একটি প্রস্তরখণ্ড দেখিয়ে ফা-ইয়েন-এর মাথা থেকে চেতনা-সর্বস্বতার ভূত নামাতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। সেই স্মরণীয় কথোপকথনটি দেখে নেওয়া যাক।

লুওহান— বলুন তো পাথরটি কোথায় অবস্থান করছে, আপনার মনের ভিতরে না বাইরে ?

ফা-ইয়েন— অবতংসক সূত্র থেকে জেনেছি, সবই চেতনার ফসল। সুতরাং পাথরটি মনের মধ্যেই আছে। 
লুওহান— আপনি এতো বড়ো একখানা পাথর মনের মধ্যে বহন করে তীর্থ যাত্রাযাত্রায় চলেছেন ? খুব কষ্ট করছেন ভায়া !

লুওহান-এর এই কথায় ফা-ইয়েন-এর জাগরণ ঘটে। তিনি অন্য কোনো মঠে রওয়ানা দেওয়ার জন্য মনস্থির করে ফেলেছিলেন, ব্যাগপত্তর গুছিয়েও নিয়েছিলেন। কিন্তু পা আর উঠল না। চার বন্ধুই লুওহান-এর শিষ্য হয়ে গেলেন। ফা-ইয়েন হলেন লুওহান-এর সুযোগ্য ধর্মসূরি। 

  ফা-ইয়েন চেয়েছিলেন, কান-চে দ্বীপের নির্জনতায় একটি কুটির বানিয়ে থেকে যাবেন। কিন্তু সঙ্গী হোঙ-চিং ও অন্যান্যদের আপত্তিতে তাঁর সেই স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিতে হল। তাঁদের একান্ত ইচ্ছা ইয়াংসি নদীর দক্ষিণ দিকে যত মঠ-মন্দির আছে সবগুলি তাঁরা ঘুরে দেখবেন, ফা-ইয়েনকেও তাঁদের সঙ্গ দিতে হবে। যখন তাঁরা লিন-চুয়াং পৌঁছালেন, তখন স্থানীয় এক আধিকারিক ফা-ইয়েনকে চুং-শোউ মঠের মঠাধ্যক্ষের দায়িত্ব অর্পণ করেন। মঠাধ্যক্ষের অভিষেকের দিনে চা-পানের অনুষ্ঠান সবেমাত্র শেষ হয়েছে, এমন সময় তত্ত্বাবধায়ক ভিক্ষু এসে জানালেন— আপনার মঞ্চের চারপাশে ভিক্ষু, সন্ন্যাসী ও সাধারণ নারী, পুরুষ এসে জড়ো হয়েছেন। তাঁরা আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। 
ফা-ইয়েন শান্ত স্বরে বললেন— বুঝতে পারছি, তাঁরা সত্যিই একজন প্রাজ্ঞব্যক্তিকে দেখতে চান। 
এক মুহূর্তও সময় ব্যয় না-করে তিনি মঞ্চে উপবিষ্ট হলেন। সমবেত দর্শকমণ্ডলী তাঁকে অভিবাদন জানালেন। তিনিও সবাইকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে কথা শুরু করলেন—

আপনারা অধীর আগ্রহে আমার কথা শোনার জন্য অপেক্ষমাণ। সুতরাং আমার পক্ষে নীরবতা পালন অনুচিত। প্রাজ্ঞ পূর্বপুরুষদের মতো আমার পক্ষে কি আপনাদের জন্য সত্যের পথ নির্দেশ করা সম্ভব ? সবাই নিজের যত্ন নিন। 

এইটুকু কথা বলেই তিনি তড়িঘড়ি করে নেমে পড়লেন মঞ্চ থেকে। 
 
  ওয়েন-ই ক্রমশ খ্যাতিমান ভাষ্যকার হয়ে ওঠেন। চিয়াংশু প্রদেশের সদ্যস্বাধীন রাজ্য দক্ষিণ তাং-এর যুবরাজ লি-চিং (৯১৬- ৯৬১ খ্রিঃ) তাঁর গুণমুগ্ধ হয়ে পড়েন। লি-চিং প্রথমে তাঁকে নানকিং শহরের পাওয়েন মঠের দায়িত্ব দেন। ওয়েন-ই-র পাণ্ডিত্য ও ব্যবহারে প্রীত হয়ে পরে তাঁকে চিং-লিয়াং মঠের অধ্যক্ষের দায়িত্ব অর্পণ করেন। এই মঠের অধ্যক্ষ হিসাবে ফা-ইয়েন প্রভূত খ্যাতি পান। তাঁর প্রত্যক্ষ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় এক হাজার। তা ছাড়া বিভিন্ন জায়গা থেকে অগণিত জিজ্ঞাসু ব্যক্তি তাঁর বক্তব্য শোনার জন্য মঠে ভিড় জমাতেন। কেবল সূত্রপাঠ বা ব্যাখ্যা দান নয়, ওয়েন-ই নিজের অন্তরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসুদের সংকট নিরসনের জন্য বিভিন্ন নিদান দিতেন। ফা-ইয়েন-এর সময় এক চ্যানসাধুর গল্প মুখে মুখে ফিরত। সেই চ্যানসাধু তাঁর কুটিরের দরজায় লিখে রাখতেন মন, জানালায় লিখে রাখতেন মন, দেয়ালেও লিখে রাখতেন মন । ফা-ইয়েন, তাঁর বক্তব্যে উক্ত চ্যানসাধুর গল্পটি উল্লেখ করে বলতেন, তাঁর উচিত ছিল, দরজায় লিখে রাখা দরজা, জানালায় লিখে রাখা জানালা এবং দেয়ালে লিখে রাখা দেয়াল। তাঁর এই ভাষ্য তাঁর গুরু লুওহান-এর শিক্ষার কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনি তাঁর সুযোগ্য শিষ্যকে বুঝতে শিখিয়ে ছিলেন কেবল মন নয়, বস্তুজগৎও সত্য, তাদের সব সময় উপেক্ষা করা অনুচিত। লুওহান এই শিক্ষা পেয়েছিলেন তাঁর গুরু শুয়েন শা-র কাছ থেকে। ফা-ইয়েন এই গুরুশিষ্য পরম্পরার শিক্ষাকে ভিত্তি করে পৃথক এক চ্যান সম্প্রদায় গড়ে তোলেন , যা তাঁর তিরোধান-পরবর্তী সময়ে ফা-ইয়েন সম্প্রদায় নামে পরিচিতি পায় । ফা-ইয়েন কবিত্বশক্তিরও অধিকারী ছিলেন। তাঁর কবিতায় আমরা পাই এক মরমী কবিকে, যিনি সুবাসিত পিউনি ফুলের শোভা দেখতে দেখতে অনুভব করেন তাঁর চুলে পাক ধরেছে, আর ফুলগুলিকেও গতবছরের মতো অতটা রক্তাভ-সুন্দর দেখাচ্ছে না। অথবা নির্জন পর্বতে বসে যিনি খোবানি ফুলের ঘ্রাণ নিতে নিতে একটি নাম-না-জানা পাখির সুরেলা শিস শুনে সারাদিনটা শান্তিতে কাটিয়ে দেন ।

  ৯৫৮ খ্রিস্টাব্দের কথা, ফা-ইয়েন তখন চুয়াত্তর বছরে পা-দিয়েছেন। একদা তিনি ঘোষণা করলেন, শরীর জানান দিচ্ছে যে, তিনি আর বেশিদিন থাকবেন না। মাস খানেক পরে একদিন সকালে তিনি শিষ্যদের বিদায়বার্তা দিয়ে নিজেই সযত্নে মস্তকমুণ্ডন করে স্নান সেরে নতুন চীবর পরিধান করলেন। তারপর শান্তভাবে উপবিষ্ট হলেন। আর উঠলেন না। কেবল চিং-লিয়াং মঠে নয়, শোকের ঢেউ আছড়ে পড়ল কাছে-দূরে সর্বত্র, যেখানেই পৌঁছাল সেই মর্মন্তুদ সংবাদ। লি চিং তাঁকে মরণোত্তর খেতাব দেন, তা ফা-ইয়ে চানশি, বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়— মহান ধর্মদ্রষ্টা। সংক্ষেপে ফা-ইয়েন। 

  ফা-ইয়েন-এর শিক্ষার একটি মৌলিক পদ্ধতি ছিল জিজ্ঞাসু বা প্রশ্নকর্তার উক্তির কোনো ব্যাখ্যা না-দিয়ে বরং উক্তিটিকেই একটু মোচড় দিয়ে বা সরাসরি উত্তর হিসাবে ফিরিয়ে দেওয়া। উদাহরণে আসা যাক।

একদা জনৈক চ্যানসাধু ফা-ইয়েনকে বললেন—

আমার নাম একো। আপনি আমাকে বুঝিয়ে দিন বুদ্ধ কী ?

ফা-ইয়েন প্রায় সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন— আপনি, একো।

একদিন এক সভায় ফা-ইয়েন, ভিক্ষু শিউ-শান-চুকে বললেন— বলা হয় যে, একটি একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য স্বর্গ ও পৃথিবীকে পৃথক করেছে। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?   

শিউ-শান-চু বিন্দুমাত্র সময় ব্যয় না-করে উত্তর দিলেন— একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য স্বর্গ ও পৃথিবীকে পৃথক করেছে। 

এবার ফা-ইয়েন বললেন— আপনার এই ব্যাখ্যাটি কীভাবে যাচাই করা যেতে পারে ?

শিউ-শান-চু, ফা-ইয়েনের উদ্দেশে বললেন— তাহলে আপনার ব্যাখ্যা কী ?

ফা-ইয়েন অবলীলায় উত্তর দিলেন— একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য স্বর্গ ও পৃথিবীকে পৃথক করেছে। 

  ফা-ইয়েন-এর ধর্মসূরি তিয়েনতাই তে শাও (৮৯১-৯৭১ খিঃ)। অবশ্য তিনি বেশিদিন ফা-ইয়েন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেননি। সম্ভবত রাজ-অনুগ্রহ লাভের জন্য তিনি তিয়েনতাই বৌদ্ধঘরানায় যোগ দেন। তাঁর দুই শিষ্য ইয়ুং মিং ইয়েন শাও (৯০৪-৯৭৫ খিঃ) ও তাওয়ুন। 

  ইয়ুং মিং ইয়েন শাও, চ্যান-ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন তাঁর একশো-খণ্ড-বিশিষ্ট শাং-চিং-লু নামের মহাগ্রন্থের জন্য। এই গ্রন্থে তিনি চ্যান-সম্পর্কিত যাবতীয় নীতিমালা সংকলিত করেছেন। অবশ্য এটা করতে গিয়ে তিনি নির্মল চ্যানধারাকে সূত্রের জটিল আবর্তে আবিল করে তুলেছেন। সূচনা থেকেই চ্যানধারা সূত্রনির্ভরতা কাটিয়ে ঋজু ও মননশীল হয়ে উঠতে চেয়েছে। কিন্তু মাঝেমধ্যেই প্রতিক্রিয়াশীলতা প্রবল হয়ে উঠে চ্যানধারাকে শাস্ত্র-অনুগত করে তুলতে সচেষ্ট হয়েছে। ইয়ুং মিং ইয়েন শাও-এর এই প্রচেষ্টাও সেই প্রতিক্রিয়াশীলতার দিকেই ঝুঁকে আছে। তবে তাঁর মহাগ্রন্থটি চ্যানধারার দিগদর্শন হয়ে না-উঠলেও গ্রন্থটি যে মহাযানমতের দিগদর্শন হয়ে উঠতে পেরেছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।  

    তাওয়ুন সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। তবে তিনি যে অসাধারণ কাজটি করে গেছেন চ্যান-ইতিহাসে তার তুলনা মেলা ভার। তাঁর সংকলিত তিরিশ খণ্ডের ‘কইতোকু দেনতোরোকু’ চ্যান-ইতিহাসের অন্যতম আকরগ্রন্থ। বলা যায় এই মূল্যবান বইটির উপর নির্ভর করেই রচিত হয়েছে যাবতীয় চ্যান-ইতিহাস। এই তথ্যঋদ্ধ গ্রন্থে তাওয়ুন, সূচনা থেকে তাঁর সমকাল পর্যন্ত প্রায় সকল উল্লেখযোগ্য চ্যান ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে যতটা সম্ভব বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, যা সেই সময়ের নিরিখে রীতিমতো অসাধ্যসাধন একটি গবেষণাকর্ম। 
এই গ্রন্থটি না-থাকলে চ্যানধারার বিবর্তন রেখাটিকে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা সম্ভব হত না। তাঁর গ্রন্থে গুরু-শিষ্য পরম্পরার যে উক্তি-প্রত্যুক্তিগুলি উদ্ধৃত হয়েছে, সেগুলি সংকলন করে পরবর্তীকালে রচিত হয়েছে বিভিন্ন কোয়ানগ্রন্থ।

  ফা-ইয়েন সম্প্রদায়, খুব বেশিদিন স্থায়িত্ব লাভ করেনি। পঞ্চম প্রজন্মের পরেই এই সম্প্রদায় লোপ পায়। সম্প্রদায়ের অনেকেই লিন-চি সম্প্রদায়ে যোগ দেন। তবে ক্ষণস্থায়ী হলেও চ্যানধারা তথা চিনের সংস্কৃতিতে ফা-ইয়েন সম্প্রদায়ের অবদান অনস্বীকার্য। 


তথ্যসূত্র :  

Zen's Chinese heritage: the masters and their teachings by Andy Ferguson ; 
Boston: Wisdom Publications, 2000.

Original Teachings of Chan Buddhism by Chang Chung Yuan ; Vintage Books 1971.  

Records of the Transmission of Lamp ( Jap. Keitoku Dentōroku ) Complied by Daoyun; Translated by R. S. Whitefield, The Hokun Trust 2017. 

Zen’s Chinese Heritage by Andy Ferguson ; Wisdom Publication, 1999.

History of Zen by Yu-hsiu Ku ; Springer 2016. 

The Golden Age of Zen by John C. H. Wu ; Image Books 1996. 

ছবি : বিধান দেব 


চন্দন মিত্র ।। জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৬, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ডায়মন্ড হারবার মহকুমার ভগবানপুর (হরিণডাঙা) গ্রামে। বাংলা ভাষা-সাহিত্যের শিক্ষক। কবিতা লেখার সূত্রে লেখালেখির জগতে প্রবেশ। লেখেন প্রবন্ধ ও গল্প । 
প্রকাশিত পুস্তক   : 
কাব্য পুস্তক : আমার আত্মার পায়ে বাঁধার ঘুঙুর, যাপনচিত্র, ২০১৯; সরলতা ক্রমশ গায়েব হইতেছে, সাহিত্যের বেলাভূমি ২০২০
প্রবন্ধ পুস্তক : জেন : রিপুতাড়িত মানবের নিকট সুসমাচার ও অন্যান্য প্রবন্ধ, কলিকাতা লেটার প্রেস, ২০১৯ 
সম্পাদিত পত্রিকা : পাড়ি


 
 
        
    
  
    
         
             

            
                    


  

ভিনদেশি তারা ।। অরিন্দম রায়


 এই কবি ‘জনগণের কবি’ নামে পরিচিত। তাঁর রক্তে বহমান কবিতা। তাঁর কাকা আল রবলস, তিনিও ফিলিপিনো-আমেরিকান কবি, ঐতিহাসিক এবং বিশিষ্ট সোশ্যাল রাইট অ্যাক্টিভিস্ট। কবিতার পাশাপাশি লিখে থাকেন ছোট গল্প। ২০১৭ সালে তাঁর নাম উঠে এসেছিল সান ফ্রান্সিসকোর সম্ভাব্য পোয়েট লরিয়েট হিসেবে। প্রকাশিত হয়েছে দুটি কবিতার বই, যথাক্রমে ‘Cool Don’t Live Here No More- A Letter to San Fransisco’ এবং ‘Fingerprints of a Hunger Strike’ এই নামে। ছোটদের জন্যেও তাঁর দুটি বই আছে। একটির নাম ‘Lakas and the Manilatown Fish’ আরেকটি ‘Lakas and the Makibaka Hotel’। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংকলনে তাঁর কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে যার মধ্যে ‘Growing Up Filipino VolumeII’, Of Color:Poet’s ways of Making’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তিনি টনি রবলস। তাঁর কবিতায় উঠে আসে উচ্ছেদ, পুলিশি হিংস্রতার কথা, উঠে আসে বাস্তুচ্যুত মানুষ আর বর্ণবিদ্বেষের মতো বিষয়।

 

টনি রবলস

লাঠির ডগায় একটি পতাকা

কয়েকটা পয়সা

আর কিছুটা স্বাদবদলের জন্য

দেশাত্মবোধ

 

লাল সাদা এবং নীল

কোণের দোকানে

লাঠির গায়ে,

 

সুপারমার্কেট,

মদের দোকান

 

অন্য কোনো দেশে

সেনাবাহিনী

খারাপ লোকেদের উপর

বোমা বর্ষণ করছে

 

ক্যাডবেরি রাখার তাকের পাশেই

লাঠির গায়ে জড়ানো পতাকাগুলো

 

আমি পতাকা রেখে

সিধে ক্যাডবেরির দিকে

হাত বাড়াই

চকোলেট

গলে

গলে

গলে

পড়ে

 

আমার হাতে

 

আমার হাতের তালুতে

দাগ হয়ে যায়

 

দূর কোনো দেশে, একজন পিতা

মুঠোভর্তি মাটি তুলে নেয় আর

জিজ্ঞেস করে:

 

আমার জন্মভূমির কী হয়েছে?

 

আরও বোমা নেমে আসে

 

একটা দাঁড়কাক

তারের উপরে

এসে বসে

আর হাসে

 

একখানা মস্ত পতাকা

আমার পাশে উড়ছে,

কারুর ডাঁই করে রাখা

জিনিসপত্রের পিছন থেকে

 

হাওয়ায়

পতপত করে

 

আমি দেখি

 

আর গাছপালাহীন ঘাসজমি

এবং অবশিষ্ট চিহ্নের কথা ভাবি

 

আমার বাদামি রঙের

চামড়ার দিকে তাকাও

 

আর ভাবো

নেটিভদের ভাবনাগুলো

 

একজন নেটিভের মতো অনুভব করি,

অনুভব করি একজন আরবজাতির লোকের মতো,

বাদামি চামড়ার একজন লোকের মতো অনুভব করি

 

যখন চকোলেট

দাগ রেখে যায়

 

আমার

আঙুলে 


¤¤¤¤¤¤¤¤¤

অরিন্দম রায় : জন্ম ১৯৮০, হাওড়ার বাসিন্দা। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। শূন্য দশকের কবি। দীর্ঘ সময় ধরে সম্পাদনা করছেন 'লালন' পত্রিকা। বর্তমানে 'লালন' ওয়েবজিন হিসেবে প্রকাশ পাচ্ছে। কবিতার বই :  'রোজনামতা', 'শবসাধনা', 'নির্বাচিত শূন্য' এবং ''অষ্টধাতুর পৃথিবী'( ১৪বছর বাদে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে)। কবিতার পাশাপাশি গদ্য এবং অনুবাদেও স্বচ্ছন্দ।

পাঠকের হাট ।। অরুণ পাঠক


 

 [আমার কাব্যজ্ঞানের প্রারম্ভিক পর্যায় থেকেই দেখে আসছি অগ্রজ কবিরা তাঁদের বই অকাতরে উপহার দিচ্ছেন। মুখে তৃপ্তির হাসি দাতা ও গ্রহীতার। চার চোখে সমান আগ্রহ। আশে পাশে কৌতুহল। বয়সে অনেক ছোট হলেও বহু প্রতিষ্ঠিত বিদ্বান কবি অল্পবয়সী আমাকেও তাঁদের কাব্যগ্রন্থ উপহার দিয়েছেন। আমিও আমার কাব্যগ্রন্থ ঝোলা থেকে বের করে কাঁপা কাঁপা হাতে কোনও শ্রদ্ধেয় অথবা স্নেহভাজন কবিকে উপহার দিয়ে স্বর্গীয় তৃপ্তি উপলব্ধি করি। আজও কোনও অনুষ্ঠানে গেলে এই কাব্যগ্রন্থ দেওয়া-নেওয়ার একটি বিশেষ পর্ব অলিখিতভাবে সূচিভুক্ত থাকে। তার বাইরে ডাক বিভাগের মাধ্যমেও অনেক কবি তাঁদের কাব্যগ্রন্থ আমার ঠিকানায় পাঠান।
নবীন-প্রবীণ, পরিচিত-অপরিচিত সেইসব কবিদের কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আমি এবার আমার অনুভবের দু-চার কথা বলতে চাইছি এখানে। তবে শুধু উপহার পাওয়া কাব্যগ্রন্থ নয় সেইসঙ্গে গাঁটের কড়ি খরচ করে যে অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ আমি এযাবৎ কিনেছি সেইসব কাব্যগ্রন্থেরও কোনও কোনওটি এই আলোচনার উপলক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।]


 কল্পনা মাখিয়ে এরপর তুমি যা খুশি উদাহরণ


কবিতার সমুদ্রে যত ঢেউ ওঠে তার প্রত্যেকটিই পূর্ণ করতে পারে অমৃতকলস। মুহূর্তে রেঙে ওঠা মুখের সঙ্গে অন্বিষ্ঠ চোখের চিকচিক যত ক্ষণমুহূর্তকে বিধৃত করে মর্মের ঘরে ততই বেড়ে যায় অন্বেষণ। কবিতাভিক্ষুকের তৃষ্ণা আর মেটে না। কিন্তু কবিতা কী দেয় আমাদের? তা কি কেবল ভাববাদী চেতনার স্তরে অমুক অমুক হয়েই থেকে যাবে? তা কি আমাদের বাস্তবে বেঁচে থাকার সঙ্গে কোনোভাবেই সহায়তা করে না? ইরানের কবি আব্বাস কিয়ারোস্তামি লিখেছেন—"কবিতা আমাদেরকে হাজার ফুট উচ্চতায় তুলে ধরে আর সেখান থেকে নীচে সারা জগতকে একত্রে দেখার ক্ষমতা প্রদান করে। কবিতা আর কিছু নয়। শিল্প না থাকলে, কবিতা না থাকলে আসে দারিদ্র্য, রিক্ততা।"(ইন দ্য শ্যাডো অফ ট্রিজ— বইয়ের শেষ প্রচ্ছদে লেখা কবির বক্তব্য/ কথাচিত্রকণা— সংকলন ও তর্জমা: আব্দুল কাফি)। দারিদ্র্য ও রিক্ততায় অভ্যস্ত মানুষ তাই কবিতা থেকে দূরে থাকলেও কবিতাই বারবার তাদের দ্বারা, তাদের জন্য ও তাদের হয়ে উঠতে চায়। যেমন:

আনাগোনা নির্বান্ধব হয়ে ওঠে
দুঃখ খুলে যায় আমাদের সড়ককুজন

ওখানে গল্পের আবহাওয়া... সুরঞ্জনা
কী কথা তাহার মোবাইলে!

থলি নাও, খুচরো, খাদ্যের হও আজ
দরদাম করো... গায়ে হাত দাও সকল আনাজ
ককিয়ে শিউরে ওঠে, উঠছে ছোঁয়ায়
                                        (বাজার)

এই কবিতার রচয়িতা পলাশ দে। শূন্য দশকের অন্যতম একজন কবি। যে বইয়ে এই কবিতাটি আছে তার নাম 'একা মফসসল'। ২০১০ সালে রাখালিয়া থেকে বইটি প্রকাশিত হয়। তার অনেক আগে থেকেই আমি তার কবিতার সঙ্গে পরিচিত। 'আমি কিন্তু পারি স্বপ্ন', 'ফুঁ' কাব্যপুস্তিকাদুটি এর আগেই প্রকাশিত। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত পলাশের কবিতা পড়ছিলাম। বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত অরণি-র পঞ্চাশ বছরের বাংলা কবিতা সংখ্যায় পশ্চিমবঙ্গের শূন্য দশক সম্পাদনাকালে তার কবিতা রেখেছিলাম। কিন্তু সম্মুখ সাক্ষাৎ ? না, মনে নেই।
   একজন কবি মূলত একক পথের যাত্রী। তার চলার ট্রাক তাকেই তৈরী করে নিতে হয়। পলাশ দে তার প্রথম কবিতাটি থেকেই সেই দুর্লভ একাকী চলার পথটি তৈরী করে নিতে পেরেছেন। কবিতা নির্মাণে বাংলা ভাষার কোনও উত্তরাধিকার তার নেই। চূড়ান্ত সামাজিক, অবক্ষয় সচেতন, নীতিভ্রষ্টতায় ক্রুদ্ধ এই কবি কি কিছুটা মরমী?

অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ার আগের মুহূর্তেই তবে
কী ভাবছিল ছেলেটি?

ভাবছিল, দ্যাখো হবে

রাজি হয়ে যাবে ঠিক
                                     (তুমি যা ভাবছ)
নৈর্ব্যক্তিক। ক্ষুদ্র স্ববাচন। তলিয়ে যাবার আগে খড়কুটো আঁকড়ে ধরার প্রত্যাশা।
কিংবা,

ভালো লাগা শব্দটির আগে-পিছে
কোনো অজুহাত নেই

শুধু এক বিকেলের অপেক্ষা
আর এক অপেক্ষার বিকেল
                                              (প্রেম)

যে কবিতাপাঠকেরা কবিতায় কাহিনি চান, নাটক চান, একশো পঁচিশ পঙক্তির কবিতায় সুরেলা কণ্ঠ চান তারা হতাশ হবেন হয়ত। কিন্তু জীবনের সুবৃহৎ গল্পের এমন সূক্ষ্ম আয়োজনই যে একজন কবির কাজ তা তার কবিতায় পুরোদস্তুর দেখিয়ে দেন পলাশ। কবিতা যে শুধু কথার আলেখ্য নয়, তা যে অনেকখানি উদ্ভাবনের ইশারামাত্র,  তা যে সত্যেরই অনূর্ধ্ব বাস্তব পলাশের কবিতা পড়লে তা অনুভব করা যায়।

জানলার পিছনে একটি নিস্তব্ধতা
নিস্তব্ধতার পাশে একটি নদী
নদীর দু-পাশে একটি হাওয়া
হাওয়ার গুনগুনে একটি বাসস্ট্যান্ড
বাসস্ট্যান্ডের ফিশফাশে একটি অপেক্ষা
অপেক্ষার গল্পে কেউ গুমখুন

এবার, কে কার আগে পিছে
তদন্ত শুরু করার ভূমিকায়
তুমি
সানাই এবং বিসমিল্লা খানের মাঝখানে
ফাঁকা
                                      (সুর)

আমরা জানি যেকোনও সুর উৎক্ষেপনের জন্য যে সব যন্ত্র আছে তার ভেতরে বেশ কিছুটা ফাঁকা থাকে। বাধাপ্রাপ্ত সচল বাতাসকে একমুখী গতিতে একজন শিল্পী স্বরে পরিণত করেন। সুর একপ্রকার স্বরই। এই স্বর যখন আমাদের জীবনের প্রাতিস্বিকতায় তার উৎস খোঁজে তখন চালক আর চালিকাশক্তি, যন্ত্র আর যন্ত্রীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে জীবন। যা সর্বার্থেই ফাঁকা। যাকে আশ্রয় করে পরিপার্শ্ব,  যাকে আশ্রয় করে স্বর বা সুর। পলাশের কবিতা বেজে ওঠে না। পাঠ শেষে তা দাবি করে নীরবতা। সমাজের নানাবিধ অসুখ ও অসুদ্ধতাকে এমন নিস্পৃহতায় পলাশ তুলে ধরেন যাতে আমাদের উচ্ছ্বাস, উল্লাস জন্মায় না। আমরা থেমে যাই। আমাদের চিন্তাশক্তি সাময়িক বিরতি চায়। কবি শঙ্খ ঘোষ 'কবিতার মুহূর্ত' গ্রন্থে এরকম পরিস্থিতিকেই 'ভাষাকে ভেঙে দিয়ে ভাষার সত্যে পৌঁছবার কোনও লড়াই' বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও লিখেছেন —'Nova Express-এর মধ্যে বারো দেখিয়েছিলেন যে নীরবতাই হলো আমাদের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষণীয় অবস্থা, কিন্তু শব্দেরই কোনো বিশেষ প্রয়োগরীতির মধ্য দিয়ে আমরা পৌঁছতে পারি সেই নীরবতায়।' (কবিতার মুহূর্ত)। পলাশ তার কবিতায় শব্দের সেই বিশেষ প্রয়োগরীতি আয়ত্ব করতে পেরেছেন বলে আমার মনে হয়।
            


কিন্তু একটা কবিতায় এত এত দৃশ্যের সমাহার, পুরো একটি কোলাজের মতো, তার চারদিক থেকে হাওয়া বেরোচ্ছে, আলো বেরোচ্ছে। আত্মা? স্তম্ভিত? অনন্যোপায়? হয়ে ওঠাচ্ছে শিল্পসত্তা? হয়ে ওঠাচ্ছে একটা নতুন নামগন্ধ?  হ্যাঁ। এসব কবিতা পড়লে এরকমই অভিজ্ঞতা হয়।

দেখলেই আকাশ...না ভাবলেও
চিলেকোঠায় জোছনা হতে পারে

কল্পনা মাখিয়ে এরপর তুমি যা খুশি উদাহরণ
যে কোনও বর্ণবৈষম্য আহা গল্প মাখামাখি
চলছে তো চলছেই

ওই যে ছাদের নীচে ফেরিওলা
নিঃসঙ্গ, কিছুটা ঝুঁকে... সেই ফিরে ফিরে যাচ্ছে

না না এইসব নয়
বরং অন্যরকম, কিছু ফিরিয়া বলা যাক—

জোনাকিরা সেই কবে থেকে শ্বাসকষ্ট পাচ্ছে তো পাচ্ছেই
                                                         (ছাদ)

পলাশ শুধু একজন কবি নন, তিনি একজন চিত্রপরিচালকও। তাই দৃশ্যগত সহাবস্থানের শিল্পবোধ তার যথেষ্ট। বর্তমান বিশ্বে নন্দিত সিনে কবিতার সচল আবহ পলাশের কবিতায় খুঁজে পাওয়া অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু সেই সঙ্গে কবিতার বাক্যের রীতিতে যে ধরণের কারুকাজ পলাশ করেছেন সমসাময়িক বাংলা কবিতায় তা আর কোথাও পাওয়া যায় না। কবিতায় সিনট্যাক্স নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এর আগে করেছেন উৎপলকুমার বসু। তারপর পলাশ। এতে ঝুঁকি আছে। পলাশ সে ঝুঁকি নিয়েছেন। তার কবিতার শুরু হচ্ছে এভাবে—
একলা বাড়ন্ত হয়ে যাচ্ছে

জানলা খোলা, ছাদে ওঠা ভাগ হয়ে যাচ্ছে এখন
হ্যাঙারের ফাঁকা ঢেকে যাচ্ছে অন্যরকম পোশাকে
গন্ধ ছড়াচ্ছে বাড়িময় দেয়ালের কান সমেত
                                         (স্ত্রী বউ ওয়াইফ)


কবিতার বিষয় বলার মতো মূর্খতা আর কাল কবিতাআলোচকের না থাকাই ভালো। আমারও তা নেই। জীবনের বাচনিক সজ্জার অন্দরমহলে ঢুকে পড়তে পারলে কবিতার রূপের অন্ধকারকে উপভোগ করা যায়। এইটুকুই শুধু আমার অধিকার ও অর্জন। পলাশের কবিতা প্রাত্যহিক দিনের শুরুতে ঝেঁপে আসা রোদ্দুরে নিজেকে নতুন করে মেপে নেওয়ার মতো। যার কোনও চিহ্ন গায়ে লেগে থাকে না পুনরায় পরদিন আবার নিজেকে মেপে নিতে।

সবুর গাছের নীচে এই আমরা যে কজন
একলা সামলে আছি
ফল হব হব করেও আলিঙ্গন পারছে না নিজেকে

আর আমাদের সব সহ্যের আগে 'অ' বসে যাচ্ছে

প্লাস-মাইনাস করে দেখেছি অনেকবার কিন্তু জাঁহাপনা

সে চলে গেল এবং বলেও গেল
                                               ( পলাশনামা)

গ্রন্থের শেষ কবিতায় আপন সমানুবর্তন রেখেও পলাশ যেভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটি ভাবমোক্ষণকে মুচড়ে দিলেন তাতে কি প্রমাণ হল না যে বেলা অনেক বয়ে গেছে। বাংলা কবিতার জেনারেশন গ্যাপ রবীন্দ্রনাথ পেরিয়ে দু'দুটো শতাব্দী পেরিয়ে যে একবিংশে এসে পড়েছে তারও এক নিবিষ্ট প্রমাণ এখানে পাওয়া যায়। যদিও আগেও অনেক কবিই সদর্থক ও নঞর্থক অর্থে রবীন্দ্রপঙক্তি ইতিপূর্বে তাদের কবিতায় ব্যবহার করেছেন।
আর সেই ঐতিহ্যই বাংলা কবিতার চিরঐতিহ্যে জুড়ে দিল পলাশের কবিতাকে।

একা মফসসল ।। পলাশ দে ।। রাখালিয়া ।। চল্লিশ টাকা

ছবি : বিধান দেব 

অরুণ পাঠক ।। জন্ম: ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ কাঁজিয়াখালি, হাওড়ার মাতুলালয়ে। পিতৃভূমি দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সোনাকোপা গ্রাম। সেখানেই আবাল্য বসবাস। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  বঙ্গভাষা ও সাহিত্য-এ  স্নাতকোত্তর।
শিক্ষক শিক্ষণ ডিগ্রিপ্রাপ্ত। পেশা শিক্ষকতা। এই শতাব্দীর সূচনা (শূন্য) দশকের কবি। কবিতা ও কবিতা বিষয়ক  সাহিত্যপত্র 'সাহিত্যের বেলাভূমি ' পত্রিকার সম্পাদক। স্যাক সাহিত্য সম্মাননা, বনানী পুরস্কার, সামসুল হক স্মৃতি পুরস্কার প্রভৃতি একাধিক পুরস্কারে সম্মানিত। কবিতা পড়তে একাধিকবার বাংলাদেশে গিয়েছেন। বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়েছে কাব্যগ্রন্থ 'দ্বিতীয় বার একা'। কবিতাই তাঁর প্রথম এবং একমাত্র আশ্রয়।













নয়া বৃহদারণ্যক ।। দেবাশিস দাশ




৫.

প্রাণতত্ত্ব

প্রাণবিদ্যা-খাদ্যশাস্ত্র আশ্চর্য বিষয়

জীবনবিজ্ঞান জানা জরুরি নিশ্চয়।


খাদক ও খাদ্যে স্রষ্টা চাহিদা জোগান

অন্ন, দুধ, যাগযজ্ঞ, বাক্, মন, প্রাণ।

অন্ন মানে সাত খাদ্য— কার্বোহাইড্রেট

ছাড়াও প্রোটিন, ফ্যাট, সুষম ভরপেট

খাবারে থাকেই খাদ্যপ্রাণ ভিটামিন,

খনিজ উৎসেচক, তাছাড়া মর্ফিন,

ক্যাফেন ইত্যাদি উপকারী উপক্ষার

প্রাণিজ-উদ্ভিজ্জ যৌগ পৌষ্টিক আহার।

স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শিশুখাদ্য দুধ

দেবতার উপশম সুরা ও ওষুধ।


কীভাবে প্রাণের সৃষ্টি? বাঁচার কী প্রথা?

মানবজগতে শ্রেষ্ঠ বিদ্বান দেবতা

সঠিক ডায়েট আর দুর্মূল্য ওষুধ

করায়ত্ত করে তারা অমৃতের দূত—

অকালমৃত্যুকে জয় করার ডাক্তারি

জানা ছিল, আর ছিল মাল কাঁড়ি-কাঁড়ি।

তাই এ-জগতে শ্রেষ্ঠ দেবলোক জয়

করা যায় বিদ্যা দিয়ে, জীবন অক্ষয়

সুস্থ রাখা যায় প্রায় একশো বছর—

জনন-প্রথায় জিন-কণিকা অমর।


সমস্ত ইন্দ্রিয়, যারা মৃত্যুর অধীন 

তাদের অমর করে একমাত্র জিন। 

বাক, মন, প্রাণ— এই তিন খাদ্য নিয়ে

দর্শন উঠেছে গড়ে জিনতত্ত্ব দিয়ে। 

পৃথিবী, আকাশ, জল— তিন অবস্থান 

ঋক, যজুঃ, সাম— তিন বেদ-পরিমাণ 

ব্যঞ্জনা এদের, যেন মা-বাবা-সন্তান— 

এভাবে ত্রিমূর্ত এরা— বাক-মন-প্রাণ।

বিজ্ঞাত জবাব বাক, বিজিজ্ঞাস্য মন

যেন-বা বিস্ময় প্রশ্ন, অথচ গহন

অবিজ্ঞাত হল প্রাণ। জল থেকে জাত

প্রাণের শরীর জল, স্বর্গে প্রতিভাত

রাতের সৌন্দর্য দীপ্তি চিরায়ত চাঁদ।

পৃথিবী বাকের দেহ, অগ্নি তার জ্যোতি,

মনের শরীর দ্যৌ— মহাবিশ্ব-মতি

যেখানে আদিত্য জ্বলে বিরতিবিহীন 

অনন্তে সকলে যেন হয়ে আছে লীন। 


আত্মার সুখাদ্য প্রাণ— অধিদৈব বায়ু 

অশ্রান্ত অজড় প্রাণ সুধা-পরমায়ু।

আত্মার বাকি যা খাদ্য— মন আর বাক

মরে গেলে ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি খাক। 

ইন্দ্রিয় পাপের ভোগী, হাঁফায় সহজে 

অনন্ত প্রাণের কাব্য আস্থাবান বোঝে।


বাঁচার জন্যেই খাওয়া,— যতটা দরকার 

তার বেশি নিলে হবে পাপ, পেটভার। 

যেরকম সূর্য ওঠে, ফের অস্ত যায় 

প্রাণতত্ত্ব সেরকম শৃঙ্খলা শেখায়। 

প্রাণশক্তি চিরন্তন— দেবব্রতকথা: 

পাপরূপ মৃত্যু থেকে বাঁচুক সভ্যতা। 

এরস ও থ্যানাটস রয়েছে ফ্রয়েডে 

প্রাণ ও মৃত্যুর দ্বন্দ্ব ধরা আছে বেদে।


ছবি : বিধান দেব 


দেবাশিস দাশ। মিনিস্ট্রি অভ্ কালচার থেকে কবিতা নিয়ে জুনিয়র ফেলো নির্বাচিত হয়েছেন। শিবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন বিচ্ছিন্নভাবে। কবিতার জন্য উত্তরবঙ্গে ভ্রাম্যমাণ। স্বনামে ও ছদ্মনামে কবিতা ও গল্প লিখেছেন দেশ, আনন্দমেলা, সানন্দা, কবিতীর্থ, কৃত্তিবাস, ভাষানগর ও অন্যান্য বহু পত্রপত্রিকায়। অনুবাদ করেছেন টেড হিউস এবং জেমস জয়েসের কবিতা। 
কাব্যগ্রন্থ: পাথুরে মানুষ, মাটির মানুষ, কবিতীর্থ। জ্বলন্ত মৃত্যুর মুখে বাঁশি, কৃত্তিবাস। অণুজীবনের দীর্ঘশ্বাস, যাপনচিত্র। বিচালিঘাটের কথা, কুবোপাখি। মেঘে আঁকা ভাঙা সেতু, সিগনেট প্রেস।


সুপুরি বনের ছায়ায় ছায়ায় ।। সুবীর সরকার





৬.

".....কবি খানিকটা মানুষ আর খানিকটা মানুষ নয় ।কোন দিক থেকে সে মানুষ নয় ?মানুষ নয় সে তার সেই রহস্যময় শক্তির জন্য ।যে শক্তি তাকে উন্মাদ করে তোলে ,তাকে যূথবদ্ধতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে ।তাকে সৃষ্টি করতে বাধ্য করে ---সাধারণের মধ্যে এই শক্তি নেই বলেই কবিকে কখনও তারা মহাপুরুষ বানিয়ে দেয় ,কখনও বা ঘেন্নায় ও ক্রোধে তাকে নি:শব্দে হত্যা করে ।এই শক্তি যেমন ছিল বুদ্ধ বা যীশুর ,তেমনি এই শক্তি ছিল হিটলারেরও ।হিটলার এই পৃথিবীকে গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিল ,পৃথিবী শেষ হয় নি ,হিটলার তার স্বেচ্ছা ধ্বংস মেনে নিয়েছে ।কিন্তু তার মধ্যে দিয়েও বয়ে গেছে একই স্পিরিট ।না একজন কবি পারে না ওইভাবে পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিতে বা বদলে দিতে ।সে তার শক্তি দিয়ে যা পারে ,তা সেই নূতন একটি গ্রহ ,নূতন একটি পৃথিবী গড়ে তুলতে ।যা তার মৃত্যুর পরও থেকে যায় --আর একইরকম ভাবে আরও অজস্র গ্রহ উপগ্রহ ও গ্রহাণু পুঞ্জ-এর সঙ্গে জীবন সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে ।''

"কবির পৃথিবী" গদ্যে অরুণেশ ঘোষ  লিখেছিলেন এই অমোঘ লাইনগুলি।আসলে অরুণেশ ঘোষের যে বিশ্ববিক্ষা,গহিন জীবনবোধ,সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে থাকা চেতনাস্তর তার কাছে দ্বিধাহীন হাঁটু মুড়ে বসে পড়তেই হবে একজন সৎ ভাষাকর্মীকে।
অরুণেশ তার সমস্ত লেখক জীবন জুড়ে ভাষা দিয়েই আক্রমণ করে গেছেন আমাদের ভন্ডামি ভরা এই সময় আর সমাজকে।
তিনি আমাদের ক্রমে বিপন্ন করেছেন।বিস্মিত করেছেন।আমাদের ভেতর কেবল জাগিয়ে তুলেছেন
অগণন প্রশ্ন আর প্রতিপ্রশ্ন।
অরুণেশ ঘোষ কেবল একজন চিন্তক বা কবিই নন।
তিনি আমাদের শিক্ষক।
তিনি আমাদের কাছে মস্ত এক বিশ্ববিদ্যালয়।
আজও তার লেখা ভাবায়।শেখায়।
অরুণেশকে আমি আমার ১৬ বছর বয়স থেকে চিনি।অরুণেশকে পাঠ করা শুরু করি।তার  "শ ব ও সন্ন্যাসী", "গুহা মানুষের গান" আমাকে প্রবল বিস্মিত করলো।এমন কবিতা এমন কড়া চাবুকের মুখোমুখি তো এর আগে হইনি।আমার পাঠ ভুবনে তীব্র এক প্রদাহ শুরু হলো।যদিও পরবর্তীতে কবিতা নয়,অরুণেশ_এর গদ্য আর প্রবন্ধের ভক্ত হতে হয়েছিল আমাকে।



আর ততদিনে অরুণেশ ঘোষ আমার বন্ধু,আমার আশ্রয়,আমার প্রশ্রয়,আমার শিক্ষক হয়ে গিয়েছেন।
যতদিন বেঁচে ছিলেন,অনন্ত শিখেছি,জেনেছি তার কাছ থেকেই।
এই উত্তরের প্রান্ত থেকেই বিশ্ব সাহিত্যের সাম্প্রতিক খবর রাখতেন তিনি। এখান থেকেই তিনি বাংলা সাহিত্যের নিবিড় সাধক হতে পেরেছিলেন।
সাইকেল চালিয়ে একা একাই চলে যেতাম অরুণেশ_এর বাড়ি।তখন তিনি হাওয়ার গাড়ি গ্রাম ও মরা মানসাই নদীর ভুবন ছেড়ে পাকাপাকি চলে এসেছেন জনপদ ঘুঘুমারী।বাসায় যাবার গলির পাশে একটি নিবিড় জলাশয় ছিল।ওখানে মাঝে মাঝে স্নানে নামতেন।আমি পাড়ে বসে নানান প্রশ্ন ছুড়ে দিতাম।উনি গল্পচ্ছলে জবাব দিতেন।
কৃষ্ণ গোপাল মল্লিক,নিত্য মালাকার,সুবিমল মিশ্র, কমল চক্রবর্তীর কথা শোনাতেন।
বলতেন_"খাটি স্রষ্টা আসলে একজন অভিশপ্ত মানুষ"।
ৱ্যাবোর জীবন ও কবিতা নিয়ে একটা ঘোরের ভিতর একটানা কথা বলে যেতেন অরুণেশ।আমি শিউরে উঠতাম।রেমব্রান্ত ও গগার ছবি নিয়েও অনেক কথা শোনাতেন।
ফরাসি সাহিত্য ফরাসি কবিতা নিয়ে একদম সময় ধরে ধরে অরুণেশ আমাকে কেবল বলেই যেতেন।
বিশ শতকের ফরাসি কবিতা প্রায় মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল শুনে শুনে।
এপলিনেয়ার, অরি মিশো প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন এভাবেই।
ল্যাটিন আমেরিকার লেখালেখি নিয়ে তুমুল উচ্ছাস ছিল অরুণেশ_এর।
মার্কেজ,কর্পেন্টিয়ার,ফুয়েন্তেস আর চিলির কিছু ছোট গল্প ওনার উৎসাহেই পরবর্তীতে পড়ে ফেলতে হয়েছিলো আমাকে।
অরুণেশ এর সাথে আড্ডাটা অনেক টাই ছিল শীত ও বসন্তের ক্লাসরুমের মতন।
অরুণেশ তার জীবনের গল্প শোনাতেন।রাজনীতি,শ্রেণী সংগ্রাম,শোষণমুক্ত এক পৃথিবীর স্বপ্নের কথা ও স্বপ্নভঙ্গের কথাও বলে যেতেন অপরূপ এক কথোয়ালের মতন।
মাঝে মাঝে ডায়েরি থেকে টুকরো টুকরো অংশ পড়তেন।সেখানে অগণন চরিত্র ও ছবি থরে থরে সাজানো থাকতো।
কমরেড কেরুয়াক,খেরবারির মাঠ,কামরূপ কামাখ্যার মিথগুলি,জয়পুর থেকে না আসা ছেলের চিঠি,সুবলের চাটের দোকান আরো কত কি!
একজন অগ্রজ একজন অনুজকে জড়িয়ে ধরতে জানেন অরুণেশ নিজেই তার উদাহরণ।
জনম ভর তার থেকে কেবল শিখেছি।ব্যাক্তি অরুণেশ আর লেখক অরুণেশ_দুজনেই আমার শিক্ষক।
অরুণেশের প্রয়াণের এত বছর পরে আমি নুতন করে বারবার তার গদ্যের ভুবনজোতে প্রবেশ করি প্রস্থান অসম্ভব জেনেই।
তার জীবনানন্দ,জীবনের জার্নাল,সন্তদের রাত, নগ্ন
পরিবার,কবিতার অন্ধকার যাত্রা আমাকে নুতন এক পাঠকে রূপান্তরিত করে তোলে।
আমি দাউ দাউ এক অগ্নিবলয়ে ঝাঁপ দিই।
অরুণেশ ঘোষ,আসলে এক চুরমার সমুদ্রের নাম।
আর একমাত্র তিনিই লিখতে পারেন_
"আমাদের কোনো দুঃখ নেই আর, কোনো শোক
দুজনেই মরে পড়ে থাকব, দুজনেই
দুই দেশের দু-রকম রাস্তার পাশে
              একইরকম ভাবে।"

ছবি : বিধান দেব 



সুবীর সরকার. জন্ম 1970, 3 জানুয়ারি. নয়ের দশকে লিখতে আসা এ কবি উত্তরের লোকজীবনের সাথে জড়িয়ে আছেন তীব্র ভাবে. ত্রিশ বছরের বেশী সময় ধরে কবিতা, গদ্য সহ বিভিন্ন ধারায় অনায়াস যাতায়াত করেছেন. বাংলা ভাষার প্রায় সব কাগজে নিয়মিত লেখালিখি করেছেন, করছেন. 1996 সালে তাঁর প্রথম কবিতাবই প্রকাশিত হয় কবিতা পাক্ষিক থেকে. গুরুত্বপূর্ণ কবিতা ও গদ্যের বইগুলো- ধানবাড়ি গানবাড়ি, মাহুত বন্ধু রে, নির্বাচিত কবিতা, বিবাহ বাজনা, নাচঘর, উত্তরজনপদবৃত্তান্ত, মাতব্বর বৃত্তান্ত, ভাঙা সেতুর গান. পেশায় শিক্ষক এ কবি ভালোবাসেন রবিশস্যের খামার বাড়ি, সাদা ঘোড়া আর যৌথ যাপনে চাঁদের আলোয় কবিতা আড্ডা, লোকগানের আমেজ.

গুচ্ছ কবিতা ।। রফিক উল ইসলাম


 


রুগ্ন দোতারা


নগরবাউল জানে, আমি কার রুগ্ন দোতারা। ভাঙা মেলা থেকে সস্তায় কেউ কিনে এনেছিল, অতঃপর 

ফেলে গেছে কোলাহলের পারে। কোলাহল 

সমুদ্রের মতন, ঢেউ ভেঙে এগোতে পারিনা। যে হাত 

বাজাবে ভেবে উন্মুখ হয়ে থাকি, সেই হাতও 

নানাবিধ অহংকারে চূর্ণ হয়ে আছে!


অগত্যা সবটুকু রুগ্নতা নিয়ে সসংকোচে 

দীক্ষার কাছে যাই। যদি কিছু ভাঙা হাড় 

জোড়া লাগে, যদি কোনো আলোকিত ঝরনা মুক্ত অবসরে  সিক্ত করে তোলে। হায়, রুগ্নতা নিয়ে কোনো 

প্রশ্নই ওঠে না, যাবতীয় প্রশ্ন-পরিক্রমা, বাঁকা চোখ 

আজও সেই জাতি-ধর্ম ঘিরে! অথচ আমার দেহে তো 

মাত্রই আধখানা চাঁদ। বাকি অর্ধেক খুঁজে বেড়াবার ছলে        এই ভেসে থাকা                   

এই ডুবে যাওয়া 

আবার জেগে ওঠা পদদলিত জলে।


অগত্যা আবারও সেই কোলাহল-তীরে সুদূরগামী 

পথ চেয়ে থাকা। ভাঙা মেলা ফিরে গেছে, ফিরে গেছে  নগরবাউল। আমি কার রুগ্ন দোতারা, সেটুকুও তো 

জানিনা সঠিক। শুধু জানি, প্রকৃত শূন্যের পথে ভেসে ভেসে     অহংকারহীন কোনো হাত 

একদা তুমুল বাজিয়ে তুলবে আমাকে।


জেগে থাকা


জলভরা মেঘের ফাঁকে ঘুমিয়ে আছো তুমি 

বিদ্যুতের বেশে। আর আমার সব পাখিরাও একে একে 

উড়ে গেছে তারাভরা বনের ছায়ায়! আমি শুধু জেগে আছি,  জেগে থাকি গরম ভাতের থালার মতন 

রাত্রির সুরভিটুকু বুকে নিয়ে।


ক্লান্ত পথের শেষে নির্জন অশথ কোল পেতে 

ডেকেছিল সেই কবে। জ্যোৎস্নার অভিমান দূরে ঠেলে 

একটুও এগোতে পারিনি। আমি জানি, একদিন তোমার সব বিদ্যুৎ 

আর আলো নিয়ে এই পৃথিবীতে ঠিক ফিরে আসবে তুমি, 

শুধু আমারই জন্যে! তাই রাত্রির সুরভিটুকু বুকে নিয়ে 

সহস্র রজনী জুড়ে অফুরন্ত এই জেগে থাকা, 

ঘুমিয়ে পড়া পাখিদের করুণ ডানায়!



চরমোহনা


বৃষ্টির সাথে মিলেমিশে চোখের জলও উড়ে উড়ে 

লালন-সমাধির দিকেই যাচ্ছে। ছেঁউড়িয়ার জলে 

তাই লবণস্বাদ, যাঁরা জানেন, 

তাঁরাই শুধু জানেন! যে নদী ভাসিয়ে নিয়ে যায় 

ঘরদুয়ার, যে নদী ফিরিয়ে আনে অর্ধমৃতের ভেলা, 

সে-ও একদিন পথ হারিয়ে  ফেলে। আমি ওই                                                                     হারানো পথের ধুলোয়

দোতারা-জীবন নিয়ে আছি।


শব্দের আঁস্তাকুড় থেকে উত্থিত করে                

 সুর আর বৈরাগ্যের অভিমুখে 

এবার বাজাও আমাকে। 

চরমোহনায় অনভিপ্রেত চিতা জ্বলে উঠেছে!


ছবি : বিধান দেব 


রফিক উল ইসলাম ।। জন্ম  ২ আগস্ট ১৯৫৪ দক্ষিণ ২৪ পরগনার বসন্তপুরে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। কর্মজীবন ছিলেন একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কর্মী। গত শতাব্দীর আশির দশকের সুপরিচিত কবি। উভয় বাংলাতেই সমান খ্যাতিসম্পন্ন। শব আর শব্দ ভৈরবী, মৈত্রেয় রাত্রির পথে, অবসরের পর সেলফি প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে শ্রেষ্ঠ কবিতা ও কবিতা সংগ্রহ। গবেষণামূলক বেশকিছু গ্রন্থের স্রষ্টা। পেয়েছেন বেশকিছু উল্লেখযোগ্য পুরস্কার।





















গুচ্ছ কবিতা ।। অনিমেষ মণ্ডল


 

সম্পর্ক 

আলোর কোনো জন্মদিন নেই
 তাই আলোর বার্ধক্যও নেই 
শুধু এক চকিত হরিণীর মতো তার
                            অবিরাম ছুটে চলা
আলোর ঘুম নেই 
তাই তার জাগরণও নেই 
কোনো ক্লান্তি নেই 
তাই বিশ্রামের আয়োজনও নেই 
শুধু রাত্রির মহাছায়া নেমে এলে 
      মনে হয় 
           আঁধারের গর্ভে সে কুণ্ডলী পাকিয়ে 
            মমতায় শুয়ে আছে মাখামাখি 
যেন আঁধারের সাথে তার কোনোদিন 
                শত্রুতা ছিল না  কখনও 

   

আবহমান 

আজকাল কেবলই মনে হয় 
কিছু কিছু গানের ভিতরে 
      এক আত্মমগ্ন সমর্পণ আছে
এক একটা গানের ভিতর
           কত কত কথা থাকে
           কথার ভিতরে থাকে
           আবহমান কবিতার বীজ
সেসব লেখা হয় না কোনোদিন 
     শুধু তার যতটুকু এইজন্মে লিখি
মনে হয় তার চেয়ে রয়ে যায় 
      না লেখাই ঢের ঢের বেশি 
    যেসব লিখি না কখনো 
  শুধু তার সুর অন্তরীক্ষে বাজে বলে
     প্রতিদিন সূর্য ওঠে
                  ফুল ফোটে ডালে ডালে ...


 
 জন্মপরিচয় 

প্রতিদিন কেউ একজন আসে
আমাদের ভগ্নস্তূপ গৃহকোণে
           নীরবে প্রদীপ জ্বালায় 
আমি দূর থেকে তার
          নগ্ন শুভ্র বাহু দেখি
হয়তবা এই জন্মে সে আমার কেউ নয়
তবু তার নম্র বাহুর নীচে 
     কত কাল মনে হয় 
           মাথা রেখে ঘুমিয়েছি নিবিড় নিশ্চল

সহসা দূরে কেঁপে উঠল বিপুল আকাশ 
একটি অতিক্ষীণ আলোকরেখা 
  কবেকার মরা এক নক্ষত্র থেকে 
        এইমাত্র আমাদের ভগ্নস্তূপ ঘরে পৌঁছালো 
         অন্তরীক্ষ থেকে নেমে এলো
          অত্যুজ্জ্বল ধোঁয়ার কুণ্ডলী 
 কুণ্ডলীর ভিতরে লেখা জন্মান্তরের পরিচয়
            ঘুরপাক খেতে খেতে 
               হাওয়ায়  মিলায়...


পরিযায়ী 

     শীত এলে পাখিরাও 
     একবার ফিরে আসে 
       ফেলে যাওয়া ঘরে
সেইখানে ক্ষণস্থায়ী আত্মীয়তা ছিল
                প্রেম ছিল
     দু-একটা সন্তানও ছিল হয়তবা
তারা সব ভেসে গেছে সরযূর স্নিগ্ধ জলে
এইসব ভাবতে ভাবতে পাখিরাও একদিন দিগন্ত পেরলো

তবু মনে হয় 
বেশি দূর নয়
ঐ তো পেরিয়ে যাচ্ছি
আমাদের স্বরচিত কুরুক্ষেত্র 
পেরিয়ে যাচ্ছি মৃতপ্রায় হস্তিনানগর
শ্মশানের অনন্ত ক্রন্দন ছাপিয়ে
ভেসে আসছে লালনের গান 
জোৎস্নায় একা একা  মহানিম
কাঞ্চনধানের মাঠ অপার আশ্রয়
এইসব দেখতে দেখতে দিগন্ত যতদূর 
ততদূর আমাদের গতজন্ম নয়...


ছবি : বিধান দেব 


অনিমেষ মণ্ডল
জন্ম: ১৪/০২/১৯৭৬। মুর্শিদাবাদ।
শিক্ষা:এম এস সি (ফিজিক্স), এম এ (এডুকেশন)
পেশা: শিক্ষকতা।
প্রথম কাব্যগ্রন্থ : ভারতবর্ষ কোনোদিন জানবে না (১৯৯৬)
এযাবৎ প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ  বারোটি।
প্রবন্ধের বই একটি, অনিশ্চিত মেঘ ও বালুচরের খেলা (২০১৯)
মূলত লিটল ম্যাগাজিনে কবিতা ও প্রবন্ধ লিখে থাকেন।
স্থায়ী বসবাস রামপুরহাট, বীরভূম।










গুচ্ছ কবিতা ।। শোভন মণ্ডল

 


রাজা-সাজা

              


নিতান্তই পাকেচক্রে এভাবে গলিয়েছি মাথা

মাথা নয়, মাথাব্যথা,  মুকুটের ভার

সে তো সহজ নয়,  জানা কথা

তবুও কাঁপাতে হবে স্টেজ, যে ভাবেই হোক

অজস্র রোশনাই,   শত শত চোখ

আমাকেই দেখছে,  না হয় অভিনয়ে মন দি

এ তো কঠিন কাজ, নজরবন্দি


কাহিনী শেষ হয়ে গেলে

গ্রীনরুমে মেকআপ তুলি

রাজা-সাজা সারা, ফিরিয়ে দাও তবে

                                 ভিক্ষের ঝুলি



রাত গভীর হলে

          


আমাদের সব চোখ জুড়িয়ে আসে দূরবীনে

খোলা জানালায় অবিরাম পর্দা ওড়ে


কুকুরের ডাকাডাকি স্তিমিতপ্রায় 

লাইটপোস্টের ছায়া পড়ে আছে রাস্তার একপাশে

যাদের ফেরার ছিল তারা ফিরে গেছে কখন

সামনের কলেজের ঘড়িতে ঘন্টা বাজে ঢংঢং


চুমুকে চুমুকে নিভে আসে গ্লাস

গলে যাওয়া কিউবে ছুঁয়ে যায় আঙুল


প্রগাঢ় নিশীথে আজ

সব আলো নিভে যায় লেডিস হস্টেল


তাচ্ছিল্য

আমি অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছি 

স্পর্শ করেছি  দুরন্ত ঢেউবিমর্ষ সীমারেখা

পাথরের উদ্যানে জড়ো করে রাখা আছে বুকের আগুন

তোমাকে পৌঁছে দিতে চেয়েছি সেই সব উষ্ণতা,  অনায়াসে

তাচ্ছিল্য করেছোযে ভাবে রাত বাড়লে চায়ের দোকানে নিভে আসে উনুন

অনেকটা তেমনই গড়িয়ে যায় ধারানিকষ নিঝুম চুলে

অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছি পুরনো  প্রেম

তুমি তখন ফুঁ দিচ্ছ

 নেলপালিশ লাগানো মায়াবী আঙুলে


ছবি : বিধান দেব 

পরিচিতি : শোভন মণ্ডল

 জন্ম-  ২৫/১০/১৯৮০

শিক্ষাগত যোগ্যতা -  বি এস সি ( কেমিস্ট্রি)

বাসস্থান -  ডায়মন্ড হারবার 

বই-  টি , চুম্বনে অচেনা ভাস্কর্য (পাঠক) ,   দরজার ওপারে... (ধানসিড়ি)এবং লাস্টবেঞ্চপাশে জানালা(শুধু বিঘে দুই)

সম্মান-  

আত্মদ্রোহ সাহিত্য সম্মান







কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...