ল্যারি জেফ
নিউইয়র্কের ব্রংক্স -এ ইয়াংকি স্টেডিয়ামের পিছনে ছিল ছেলেটার বাড়ি। ছেলেটার বাবা ফ্যাক্টরির শ্রমিক থেকে ফোরম্যান তারপর সেই ফ্যাক্টরির মালিক হন কেবলমাত্র নিজের পরিশ্রমের সুবাদে। হাইস্কুলে পড়ার সময়েও ছেলেটা তেমন লম্বা ছিল না। মেরেকেটে পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি হবে। কী আশ্চর্য, কলেজের ফার্স্ট ইয়ারেই ছেলেটা যেন তালগাছের মতো বাড়তে লাগল! শেষমেশ ছ’ফুট তিন ইঞ্চিতে পৌঁছে তবেই থামল সে। তখনই সে সিদ্ধান্ত নিল – কবিই হতে হবে তাকে। যদিও দশ বছর বয়স থেকেই কবিতা লেখায় হাতেখড়ি।কবিতা নিয়ে কথা বলার চাইতে লিখতেই বেশি পছন্দ করেন তিনি। নিজেকে তিনি ক্ষুধার্ত পাঠক বলে মনে করেন। প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যেও সপ্তাহে দুটো থেকে তিনটে বই পড়ে ফেলেন তিনি। তবে শুধু কবিতার বই নয় ,ক্ষুরধার গোয়েন্দাকাহিনি পড়তেও ভীষণ পছন্দ করেন। ছেলেবেলায় দেখেছিলেন কোম্পানির মালিক হয়ে গেলেও তাঁর বাবার জামার হাতাদুটো সবসময় গোটানো থাকত ,মাঠে নেমে কাজ করতে কখনও তাঁর বাবা পিছুপা হতেন না। কবিতা লেখার তাঁর যে দৃষ্টিভঙ্গী সেটাও তিনি পেয়েছেন এখান থেকেই …জামার হাতা গুটিয়ে কাজে নেমে পড়া আর জীবনের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা।
প্রাথমিকভাবে ইচ্ছে ছিল সাংবাদিক হওয়ার। ষাট এবং সত্তরের দশকে তিনি বিভিন্ন অলটারনেটিভ মিডিয়াতে লেখালেখিও করতেন। এগুলোকে বলা হত আন্ডারগ্রাউন্ড পেপার। কিন্তু যখন তাঁর বছর কুড়ি বয়স ,এক বান্ধবী মারফত পরিচয় ঘটল বাশো-র কবিতার সঙ্গে। ব্যাস! সেই যে কবিতার পোকায় কামড়াল আর ছাড়ল না! তাঁর নিজের কথায় হাইকু লেখার জন্য প্রায় দাসের মতো খাটতে শুরু করলেন তিনি। নিজের চিন্তাভাবনাগুলোকে সতের সিলেবলের মধ্যে নিয়ে আসা আরম্ভ করলেন। এর আগে অব্দি তাঁর কাছে কবিতা লেখা ছিল একটা শখের মতো , কিন্তু এরপর সেটা পরিণত হল গভীর প্রণয়ে।
তবে কেবলমাত্র বাশোর হাইকুই নয় তাঁর কবিতা লেখার পিছনে কাজ করেছে ভিয়েতনামের যুদ্ধের প্রভাব। তাঁকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে লিওনার্ড কোহেন আর বব ডিলানের গান, ল্যাংস্টন হিউজের কবিতা। তাঁর কবিতায় আমরা পাবো সন্নিবদ্ধ শব্দ, প্রচুর পরিমাণে মেটাফর , চিত্রকল্প আর সংযত আবেগের উপস্থিতি। খুব বেশি সাজগোজ করা কবিতা তাঁর পছন্দ নয়।
একটা সময় ছিল যখন তিনি আন্ডারগ্রাউন্ড প্রেসে কাজ করেছেন , নিজের হাতে নিজের কবিতারবই ছেপেছেন। কবিতা লেখার সঙ্গে বই বেরনোর কোনও সম্পর্ক ছিল না তখন। তাঁর কাছে কবিতা ছিল অভিব্যক্তি প্রকাশের একটা জায়গা ,অভিঘাত তৈরির একটা মাধ্যম। এখনও তাঁর কাছে কবিতার মানে এটাই।
তিনি ল্যারি জেফ। ইউনাইটেড নেশনস এর Dialouge Among Civilizations Through Poetry প্রোগ্রামের তিনি কোঅর্ডিনেটর। বিশ্বশান্তির লক্ষে তিনি এবং তাঁর সংগঠন Poets for Peace নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। তাঁর প্রকাশিত বইগুলির মধ্যে অন্যতম হল Jewish Soulfood ,Unprotected Poetry Lying Half-Naked in the Doorway ইত্যাদি। প্রতি মাসে জেফ Musletter নামে একটি ধারাবাহিক কলাম লেখেন। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ওয়েব ডেল সোল । কবিতাকে আরও বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ইন্টারনেট অসাধারণ ভূমিকা পালন করছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর কাছে কবিতা একটা নির্যাস। কখনও জটিল , কখনও সরল, কখনও তার মধ্যে থাকতে পারে অনেকগুলো স্তর __ পাঠককে যা ধীরে ধীরে পার হতে হয়। সামাজিক ইস্যুকে কবিতায় আনতে ল্যারি দ্বিধা করেন না। তিনি লেখেন গৃহহীন মানুষদের জন্য , তিনি লেখেন যুদ্ধের বিরুদ্ধে। তিনি মনে করেন আজকের পৃথিবীতে একজন সাংবাদিককে বিশ্বাস করার চাইতে একজন কবিকে অনেক সহজে বিশ্বাস করা যায়। সাহিত্যের বেলাভূমির পাঠক ,আসুন আজ আমরা ল্যারি জেফের কবিতা পড়ে দেখি।
গতিবেগ
১.
একটি বুলেটের গতিবেগ
হিসেব কষে বের করা যায়
শ্রদ্ধা সহকারে
যে দূরত্ব বুলেটটি অতিক্রম করেছে
যা কিনা ব্যবধান নামেও পরিচিত
সময় দিয়ে তাকে ভাগ দিলে।
উপরে উক্ত বুলেটটির
সামনাসামনি হওয়ার যে গতিবেগ
সেটাও বের করা যেতে পারে
কিন্তু একবার
বুলেটের মুখোমুখি হওয়ার পরে
এত হিসেবনিকেশের
কোনও মূল্য থাকে না।
তাছাড়া,
এইসব তর্ক বিতর্ক
যে আমার বুলেট
তোমার বুলেটের থেকে
বেশি জোরে ছোটে
এসবের গুরুত্বই থাকে না
যদি আপনি সেই ব্যক্তি হন
যার গায়ে গুলিটা লেগেছে।
২.
একটি রামধনুর
গতিবেগের মধ্যে
অন্তর্ভুক্ত থাকে তাঁর রঙ
সেই সঙ্গে সোনা ভর্তি একটি পাত্র
যা কিনা রামধনুটির শেষে
থাকার কথা
আর থাকে গভীরতার অসামান্য
ধারণা।
যদিও বুলেটের
একটা অভীষ্ট লক্ষ থাকে
যদি না দৈবাৎ সেটা ছোঁড়া হয়ে থাকে,
রামধনু দেখে সবসময় মনে হয়
এটা প্রকৃতির একটা দুর্ঘটনা।
সাধারণত কখনও এর পুনরাবৃত্তি ঘটে না
একমাত্র যখন আমরা পাম স্প্রিং থেকে
গাড়ি চালিয়ে ফিরছিলাম
সেইদিনটা ছাড়া
যেদিন আমরা
একসঙ্গে তিন-তিনটে রামধনু
জাদুর মতো
আকাশ থেকে অঙ্কুরিত হতে দেখেছিলাম।
বিস্ময়াভিভূত (জাতি হিসেবে)
আমরা রামধনুর ধাক্কা খেতে পছন্দ করি
তারা আহত করে না অথবা
বিদ্ধ করে না এবং
সবসময় আপনি নিজেকে
সৌভাগ্যবান অথবা আশীর্বাদধন্য বলে মনে করবেন
তার উপর , রামধনুদের মধ্যে
হতাশাব্যঞ্জক কিছু নেই
এবং
তারা ঘাতক হিসেবে সুপরিচিত নয়।
৩.
ব্লোজবের
গতিবেগ
অবশ্যই মাপা উচিত
কতটা শোভনভাবে কতটা সমৃদ্ধির সঙ্গে
শিল্পী সেটা অনুশীলন করেছেন
তার নিক্তিতে।
এইভাবে মৌখিক অনুবাদ
এবং তার বিকল্পগুলি
কাঙ্ক্ষিত অর্গাজমের লক্ষে
গতিবেগ বাড়ায়
কয়েকটা জিনিস যেমন
দৈর্ঘ্য আর পরিধিকে
কাঙ্ক্ষিত অর্গাজমের চূড়ান্ত মুহূর্তে পৌঁছনোর
সময় দিয়ে ভাগ দিলে
তাছাড়া আগে বলা বিষয়গুলো মাথায় রাখলেই
উক্ত ব্লোজবের দ্রুতি কতটা ছিল
বের করা যাবে।
পরিশেষে, আরও কিছু
কারণ অথবা গুণাবলি
যখন সমীকরণটায় ঢোকানো হবে
যেমন ঠোঁট কতটা পুরু
জিভের পারদর্শিতা
কর্মতৎপরতার গভীরতা , ইত্যাদি ইত্যাদি।
এগুলোই গতির সঠিক অনুপাত
নির্ধারণ করতে সাহায্য করবে।
অবশ্য যার লিঙ্গটি চোষা হচ্ছে
তার অবস্থা
ঐ বুকে বুলেট বিঁধে যাওয়া লোকটার মতোই
তখন তার ভারী বয়েই গেছে
গতিবেগ নিয়ে ভাবতে।
৪.
বন্ধুত্বের
গতিবেগ
খুব সহজে
অনায়াসেই বের করে ফেলা সম্ভব
আবহাওয়া ,প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতো কারণগুলোকে
বিরক্ত না করেই।
বন্ধুত্বের দ্রুততা
সহজেই নির্ধারণ করা যায়
বন্ধুত্বের গভীরতা
বন্ধুত্বের ধারাবাহিকতা
যেগুলো ভাগ দিতে হবে
বন্ধুত্বের নির্ভরযোগ্যতা দিয়ে
তবে সবচেয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ
তা হল তোমার সম্মতি
তুমি কতটা রাজি আছো
বন্ধুর দিকে ধেয়ে আসা
সেই বুলেটটার সামনে বুক পেতে দিতে

Bhalo laglo arindam
উত্তরমুছুনখুব ভালো লাগলো। ঋদ্ধ হলাম
উত্তরমুছুনভালো লাগলো
উত্তরমুছুন