সাধনপর্বের নির্জনতা
২১.
বেচারা
কতদূর গেছি আমি ... কতদূর ... তা-ও বলতে হবে? সেন্সর করা ঊরু, ঊরুসন্ধি, হালকা ঝোপঝাড় ... সেসব জ্যান্ত নয়, স্টিল কিংবা ভিডিও বা সিডি ... এতটা বয়সে মাত্র এইটুকু যৌন অভিজ্ঞতা?
তাহলে কি চাকরি নট্? অভিজ্ঞতা কিচ্ছু নেই বলে ? যে কোনও পোস্টেই রাজি --- দারোয়ান, বাজার
ড্রাইভিং জানি না ঠিকই, শিখে নিতে ক'দিন বলুন? কিংবা ভাঙা সাইকেলে, হ্যা গো ম্যাম, পৌঁছে দিতে
এসব চাকরির জন্য এই অভিজ্ঞতা লাগে না কি? অসভ্যতা করব কি না আসলে বিবেচ্য সে কথাই? করলে কতদূর করব? কিচ্ছু নয়? গল্প মুখোমুখি? স্যালারি এসপেক্ট করি, কত? বলছি ...
অভিজ্ঞতা নেই তবু এ বাজারে চাকরি হয়ে গেল!
পিনাকী ঠাকুরের কবিতা 'বেচারা '। কি আছে কবিতাটিতে ? এমন কিছু শব্দ, নিরুদ্দেশ বাক্য, নির্দিষ্ট ইমেজ --- যা আমাদের সান্ত্বনা দেয়। শোক-তাপের অতিরিক্ত কিছু বলে । বাইরের পৃথিবী আর নিজের ভেতরের জগৎটাকে এক করে দেখা যতটা দুঃখজনক, ঠিক ততোখানি উপায়হীন।
বিষয় হিসেবে সাধারণ , অথচ পিনাকিজাত শব্দে তারা শুদ্ধির সর্বোচ্চ স্তর ছুঁয়ে আছে । আমাদের বেশির ভাগের জীবনেই কবিতার প্রথম স্তবকের অভিজ্ঞতাটুকু গড়ে ওঠে কৈশোর থেকে তারুণ্যের সীমান্ত রেখায় । 'দেবদাস ' থেকে ' চরিত্রহীন',
' ললিটা ' থেকে 'লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার'। মনে পড়ছে শেষোক্ত গ্রন্থের চলচ্চিত্ররূপ দেখতে গিয়ে আমি ও পলাশ অভিভূত । জার্মানির নারী পরিচালক
তাঁর অনুভূতির কাব্যিক প্রকাশ তুলে ধরেছিলেন পরতে পরতে । সেদিন নীল ছায়াপথ ধরে নতুন এক দর্শনে স্নাত হই আমরা। অথচ কবির ওই " সেন্সর করা ঊরু, ঊরুসন্ধি, হালকা ঝোপঝাড় ... / সেসব জ্যান্ত নয় , স্টিল কিংবা ভিডিও বা সিডি ..." । হ্যাঁ তাই তো হবার কথা । আর্থ-সামাজিক অবস্থায় একজন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলের এটুকুই যথেষ্ট । তাই বলে দেগে দিয়েছে । সেটুকুই 'যৌন অভিজ্ঞতা '। যৌন শিক্ষা নিয়ে একসময় দেশে-বিদেশে অনেক কথা হয়েছে । আমাদের দেশ প্রাচীন ধাত্রী ভূমি , এখানে সবই ছুৎমার্গ।
'ষোলকলা পূর্ণ ' বলে একটা কথা আছে । প্রাণ -চক্ষু -কর্ণ -নাসিকা -জিহ্বা -ত্বক , বাক -পানি -পায়ু-উপস্থ- অহংকার ইত্যাদি । এইসব নিয়ে কেউ যদি সৎ পথের পথিক হয় তখন সে হয়ে যায় ঈশ্বর । আর বিপরীত হলে! সেখানে মানুষের অসম্পূর্ণতাই আজকের খবরের কাগজের খবরগুলোর রসদ হয়ে ওঠে । এইতো খোলা পড়ে আছে কাগজ । আমি পড়ছি নানা হেডিং । আপত্তিকর ছবি পোস্ট , গণধর্ষণ , সোশ্যাল মিডিয়া হেনস্তা করছে অভিনেত্রীদের অথবা ... । আরো আরো আরো। হেডিং পড়তে পড়তে একসময় বিরক্তি আসে। বিবমিষা । আসলে ভাবছি আমরা পাল্টে যাচ্ছি ।
জগৎ দেখছি আর ভাবছি...। সূক্ষ্মতা নয় , স্থূলতাই কাম্য এখন। গরল আর অমৃত মিলেমিশে তৈরি হচ্ছে সিম্ফোনি । কি ভাবনায় ডুবে যাচ্ছি । অসম্পূর্ণ! সম্পূর্ণ রূপটি যখন-ই ধরতে চাই , বিবেক সামনে এসে দাঁড়ায় । চার - সাড়ে চার হাজার বছরের বিবেক । যে বিবেক একই সঙ্গে প্রথম চাকরি আর তার জন্য অভিজ্ঞতাকে দাবি করে।
দ্বিতীয় তৃতীয় স্তবকের বাস্তবতা যদি ধরি , তবে সে অভিজ্ঞতা নিজেকেই প্রকাশ করে। সবকিছুর পরেও চাকরি হয় । একটা নয় , দুটো । প্রথমটা আর্থিক, দ্বিতীয়টা মানসিক। পরেরটার ক্ষেত্রে 'অভিজ্ঞতা লাগে না ' বলছেন কবি । সত্যি! এই অনভিজ্ঞতা নিয়েই কত হৃদয়হীনতার ঘটনা ঘটে , যা প্রতিদিনের সংবাদ হয়ে ফেরিওলার ঝাঁকায় ঘুরে ঘুরে শহর- মফসসল দেখে।
সাত পয়জার স্যালারি । অর্থাৎ চটি জুতা । চাওয়া সামান্য হতে হতে পায়ে নেমেছে । আবার ওই পা থেকেই শুরু হয় যত ক্ষুধার্ত অভিযান ।
ক্ষেত্রাধিকারী হবার জন্য ক্ষেত্র অধিকার বাঞ্ছনীয়।
' হ্যাঁ গো ', ' যে কোনও ' ইত্যাদি বলে চাকরিটুকু জুটে গেলেই ব্যাস। ' কাজ ' করি বা না করি, পারিশ্রমিক চাই ।
কবিতাটি কি কবির যৌন দর্শনের প্রতীক । কবিতার একটা জায়গায় পিনাকী ঠাকুর সেই কঠিন প্রশ্নটি তুলে ধরেছেন , যা আমরা বিপদে পড়ার আগে পর্যন্ত ভুলে থাকি।---
'অসভ্যতা করব কি না আসলে বিবেচ্য সে কথাই ?'
এ কবিতা পুরুষের সামাজিক থেকে মানবিক হয়ে ওঠার কবিতা।
২২.
অনাক্রমণ চুক্তি
আমাদের দেশের শস্য লুটে নিচ্ছে খরা, মানুষের হাত— যুদ্ধ শুরু এইবার। এই অস্থিরতায় ফুলের শীর্ষ কিছু চেয়ে থাকে,
থাক এই আবাস, জলধি ব্যাসার্ধ জুড়ে অন্নের বেদিপদ :
স্ত্রী-প্রিয়ের মতো আমরাও আয়ুষ্মান হবো এই যুদ্ধে। স্তুতিভাজনেরা মাতে সাধ্যমত কলহে—আমরা সামাজিক মক্ষী,
বেঘোরে মাতি না কলকল বোধিচিত্তে—
প্রকাশ্যে উল্লাস ঘোরতর অপরাধ ; তাই ভেবে ফুলেরা নিশ্চুপ।
লংমার্চ করে মানুষ ও পতঙ্গ হাঁটছে এই প্রজ্জ্বলিত ভূমে
এদিকে সাপুড়ে বাঁশির মলনে কী অশোক ঘোর এক এল
মাঠে মাঠে সব শস্য ঢলে পড়লো বাষ্পীয় বাতাসে। কিছু আগে চরাচর ফাটছিলো হাতে হাতে, রোষে; তাও এখন হয়েছে শান্ত, চুপ! লোভনীয় এই সুরে। হাহাকারে গভীর অরণ্যে শিকারি কুকুর ঢুকলো উদ্যোগী,
মৃত্যুর আগে তার মনে পড়ছে রাষ্ট্রের মঙ্গল আভাস, সে শুয়েছে এই সোমসিক্ত ঘাসে, ওপরে গড়াচ্ছে
"কতটা অপচয়ের পর মানুষ চেনা যায় ..."
"কত বছর মানুষ বাঁচে পায়ে শিকল পরে..."
"কতটা কান পাতলে তবে কান্না শোনা যাবে..."
" কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে
বড্ড বেশি মানুষ গেছে বানের জলে ভেসে... "
অন্ধ সেজে থাকার অনুরাগে না দেখার অজুহাত সহজলভ্য ! আলোক সোমের 'অনাক্রমণ চুক্তি' পড়তে পড়তে সংগীতের এই কথাগুলি মনে পড়ে গেল । কবিতার শুরুতেই প্রকৃতি আর মানুষ---- দুইকেই দোষী সাব্যস্ত করেছেন কবি । তারপরেই যুদ্ধ শুরু । এই যুদ্ধ খরা এবং মানুষের হাতের বিরুদ্ধে ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো ভবিতব্য ! তাকে পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা এখনও মানুষ আয়ত্ত করে নি। সে বন্যা বা খরা বা ভূমিকম্প । তার ক্ষতিকে ধরেই মানুষ এ জীবন এগিয়ে নিয়ে চলেছে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ।
কিন্তু ' মানুষের হাত ' । যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মানুষ শুধু দেখে 'মহাজন' কিভাবে লুট করে নেয় দেশ , দেশের নাগরিক অধিকার , আর তা থেকে ছিমছাম গার্হস্থ্য । কবিতায় শব্দের ব্যঞ্জনা দেখলে অবাক হতে হয় । 'লংমার্চ ' শব্দটি এক লহমায় আমাদের পৌঁছে দেয় ঐতিহাসিক একটি ঘটনার কাছে । আবার একই সঙ্গে সে জানান দেয় ---- এই দীর্ঘ যাত্রা ; এক দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রত্যাশা নিয়ে তীব্র থেকে তীব্রতর বাষ্পীয় বাতাস হয়ে ওঠার কাহিনীকেও। সমর সেন 'ভগ্নস্তূপে বন্ধুর বিষণ্ণ কালের পথ' দেখেছিলেন। ----
" আমরা ইতিহাস মানি,
সংঘাতে সভ্যতা ওঠে আর পড়ে,
জানি, ব্যবসা বাণিজ্য যুদ্ধের চক্রান্তে
এ সভ্যতা চলে শ্মশান যাত্রায়,
অগণন লোক শবযাত্রী আজ।
তাই সমুদ্র ঢেউ ছোঁড়ে, মৃত নাবিকের গন্ধ
মাটি খুঁড়ে তাই মেলে হাড়ের ফসল,
অনেক স্বপ্নের ভগ্নস্তূপে বন্ধুর বিষণ্ণ কালের পথ। "
' স্তুতিভাজনেরা মাতে সাধ্যমত কলহে ' । এই পংক্তিটির জন্য আমাদের দীর্ঘ অপেক্ষা চাই । কবি পৃথক করে দিয়েছেন স্তুতিভাজনদের ক্যাটাগরি । তাই কেউ বেশি , কেউ কম । আর তা নিয়ে বিবাদ। আমাদের অদ্ভুত প্রত্যয় রয়েছে নিজেকে নিয়ে ।
শুধু বেঁচে থাকা টুকুই যেন সব , সবকিছু । নিরোর মতো সম্রাট বেহালা বাজাবেন , সেটাই তো স্বাভাবিক । এমন স্তুতিভাজনেরা থাকলে বেহালা বাজানোর লোকের অভাব হয় না । তবু ' প্রকাশ্যে উল্লাস ঘোরতর অপরাধ ; তাই ভেবে ফুলেরা নিশ্চুপ।'
একটা লোভের আবরণে ঢাকা পড়ে গেছি সবাই । তাই ' এখন হয়েছে শান্ত , চুপ '। যুগে যুগে মানুষের অরণ্যে রোদন , এককথায় ' সোমসিক্ত ঘাসে ' শুয়ে থাকার মতই স্বাভাবিক । চুপ থাকাটাও আজ আর
ব্যাস্ত করে না আমাদের। শুধু সমর সেনের সেই শ্লেষোক্তি, ' মধ্যবিত্তের দৌড় সুবিদিত ', ভুলে থাকতে চাইলেও মধ্যরাতের অন্ধকারে মস্তিষ্কে এসে
হানা দেয় কিছু একটা । ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করুক।
ছবি : বিধান দেব
ক্রমশ...

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন