বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই, ২০২১

নয়া বৃহদারণ্যক ।। দেবাশিস দাশ


 


নয়া বৃহদারণ্যক


পাঠকের জন্য, অভিভাষণ: 

প্রাচীন ও চিরন্তনের মেলবন্ধনেই সভ্যতার বিকাশ, ভাষার চলনশীলতা। ব্রহ্মজ্ঞান অর্থাৎ বিশাল মহাব্রহ্মাণ্ডের উৎপাদক-সত্তার বোধ ভারতীয় সংস্কৃতির সনাতন শিক্ষা। সাহিত্য ও বিজ্ঞানের ভেদ ছিল না তখন। রেনেসাঁ-ইউরোপের লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি অথবা বাংলার জগদীশচন্দ্র বসুর চেতনার মতোই জ্ঞান ছিল সর্বস্তরে উন্মুক্ত। প্রতিটি শিক্ষাই ছিল মনন গড়ে তোলার সম্পূরক। কিন্তু প্রাচীনতাদোষ ও ধার্মিক বিধিজনিত দূরত্বের দরুন আধুনিকোত্তর সময়ের উপযোগী হিসেবে সেই বোধ উপস্থাপন করতে দেখা যায় না। তাছাড়া, এখন জ্ঞানচর্চায় অনেক সূক্ষ্ম উন্নতি এসেছে, বিষয়গত উপবিভাগগুলো সমুদ্রের মতো ফুলেফেঁপে উঠেছে, যাদের সহজে বৈদিক তত্ত্বের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার মতো সময় বা সুযোগ সাধারণ মানুষের মনের নাগালে থাকে না বললেই চলে। সে-কথা ভেবেই এই নতুন কাব্যিক উদ্যোগ। সবচেয়ে বড় দুটো উপনিষদের মধ্যে থেকে একটিকে বেছে নিয়ে, নতুন ঘরানায় ও ভাষায় ধারণ করতে চেষ্টা করলাম, যদিও মূলের প্রায় প্রত্যেক বিভাগ, এমনকী পরিচ্ছেদ ধরে-ধরে এগোনো হয়েছে, যাতে মূলপাঠ থেকে পাঠককে বিন্দুমাত্র বঞ্চিত না হতে হয়। সঙ্গে জায়গা ও পরিবেশ অনুসারে রসালো কিছু প্রেক্ষিতকোণ সংযোজিত হয়েছে ছন্দের আবেগে। সমস্ত সূত্র ও ব্যাখ্যার কেন্দ্র-নির্ণায়ক হিসেবে ডঃ মহানামব্রত ব্রহ্মচারীর বিচারকেই এখানে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রাধান্য দেওয়া গিয়েছে, যা সত্যমিথ্যা, ভেদ-অভেদবাদী অন্যান্য সমস্ত বিচারবুদ্ধির পরবর্তী নিরপেক্ষতম আকর বলা যায়।

'উপনিষদ' শব্দের মূলে আছে 'নিষণ্ণ' থাকার পরিবেশ, অর্থাৎ মূলের প্রান্তে অবস্থান করার কথা। একদিকে বেদের শেষভাগ, অন্যদিকে বৃক্ষতলে গুরুর বেদির সামনে উপবেশন করে জ্ঞানবিজ্ঞানের শ্রুতিশিক্ষা। বেদের জ্ঞানকাণ্ড থেকে বহু রকমের উপনিষদ গ্রন্থিত হয়েছিল এবং সেসব সংকলন করে গিয়েছিলেন মহর্ষি বেদব্যাস। বলা হয়, তাঁর লাইব্রেরিতে আদি ভারতের সমস্ত বই মজুদ ছিল। মহাভারত এবং মদ্ভাগবৎ-কৃষ্ণচরিত লেখার আগে তামাম পুরাণ ও বেদ গুছিয়ে একত্র করে পড়াশোনা করতে হয়েছিল তাঁকে। অনন্ত মহাবিশ্বের আবহে মানুষের অবস্থান এবং ঈশ্বর নামক অধরা অস্তিত্বের গূঢ় ভাবনা নিজের-নিজের উপলব্ধি এবং বিশ্লেষণের মারফৎ তুলে ধরেছিলেন যাঁরা, তাঁদেরই উত্তরসূরী হিসেবে আমরা আধুনিক সমাজে পেয়েছি তাবড় সব গবেষক ও বিজ্ঞানসাধকদের। এক অর্থে, গুরুরা ছিলেন একেকজন মহাজ্ঞানী অধ্যাপক। 'নয়া বৃহদারণ্যক' কাব্যের দ্বিতীয় অধ্যায়ে অজাতশত্রু আমাদের আধুনিক চৈতন্যবিজ্ঞান-বিশেষজ্ঞের সমতুল্য, গার্গ্যবালাকি দর্শন ও শাস্ত্রের নামী অ্যাকাডেমিশিয়ান। পরবর্তী অধ্যায়ের মূল চরিত্র প্রোফেসর যাজ্ঞবল্ক্য— দূর প্রদেশের অধিবেশনে যোগদানকারী গবেষকেরই ছায়া। মৈত্রেয়ী ভারতীয় প্রজ্ঞাশীলা নারী, যাঁর সন্ধান হৃদয়-অমৃত (মধু)। সমাজের নানা স্তরে ব্যবহৃত হত প্রাণীর প্রতীকী মুখোশ, কখনও গণেশ, কখনও-বা অশ্বিনীকুমারের প্রতিচিত্রণে। শল্যচিকিৎসক, জ্যোতিষ্কতাত্ত্বিক, দলগত নেতা বা দেবতাদের উপস্থিতির বাস্তবিক ভিত্তি চিন্তা করতে হয়েছে অনেক সময়, যা মূল রস বা তত্ত্বের সঙ্গে অভিন্নভাবেই মিলিয়ে নেওয়া গিয়েছে।

বৃহদারণ্যক-শ্রুতির পরিচয়: শুক্ল-যজুর্বেদের কাণ্বশাখার শতপথ-ব্রাহ্মণের চরম অংশ। প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায়: মধুকাণ্ড। তৃতীয় ও চতুর্থ অধ্যায়: যাজ্ঞবল্ক্যকাণ্ড। পঞ্চম ও ষষ্ঠ অধ্যায়: খিলকাণ্ড বা পরিশিষ্ট। সংকলয়িতার নাম: ব্রহ্মর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য।




নয়া বৃহদারণ্যক


||১||

সমস্ত বস্তুতে আছ, প্রাণীতেও প্রভু 

তোমাকেই খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হই তবু।


১. অশ্বব্রাহ্মণ

বিশাল ঘোড়ার কথা ভাবা যাক, ধ্যানে। 

ব্রহ্মাণ্ডের মেটাফোর আছে কি বিজ্ঞানে?


অশ্বই বিশ্বের রূপ। একটি ঘোড়ার 

শরীরে তলিয়ে আছে নক্ষত্র-সংসার। 


কালো ঘোড়া— যেন মেঘ, চোখে অর্ক জ্বলে 

লেজে বিদ্যুতের ছটা, তড়িদ্বেগে চলে।

পেট সাদা, সবুজ পা, দু'কান রক্তিম

অগ্নিজিহ্ব এ-ঘোড়ার বর্ণনা অসীম। 

মহীন দ্যাখেনি তাকে, পোষেনি মনসুর 

মেধযজ্ঞে দেবতারা তাড়াত অসুর।


সামনে সোনার পাত্র— দিনের প্রতীক 

পেছনে রুপোর বাটি— রাত্রি যেন ঠিক।

যজ্ঞের এ-দুটি পাত্র পার্থিব মহিমা 

খুরে ধৃত এ-পৃথিবী, শরীরে নীলিমা। 

সমুদ্র বান্ধব তার, সমুদ্রই যোনি

খোলা মুখে অগ্নি জ্বলে, জৃম্ভনে অশনি।


অশ্বই হিরণ্যগর্ভ, সামনে ও পেছনে 

যথাক্রমে দিন-রাত্রি। শরীরের কোণে

বিস্তৃত বিভিন্ন দিক। বৃহদন্ত্র নদী,

পেট থেকে পিঠ মহা-আকাশ অবধি 

প্ল্যানেট্যারিয়াম যেন, চোখে সূর্য জ্বলে।

ভোরের মতন মাথা, হাড়ের আদলে

তারাগুলো দৃশ্য গড়ে, মাংস যেন মেঘ। 

সারা গা কাঁপিয়ে ঘোড়া গর্জায় বারেক। 

বৃষ্টি কি পেচ্ছাপ তার? শব্দ হ্রেষারব?

ঝড়-ঝঞ্ঝা পার করে কারা করে স্তব? 

দেবতা-গন্ধর্ব-নর-অসুর সক্কলে 

ঘোড়া চড়ে ঘোরে। কেউ তাকে 'হর্স' বলে। 

কেউ ডাকে 'বাজী' নামে, 'অর্বা' বলে কেউ।

ঘোড়া কি এসব বোঝে?— প্রজাপতি সে-ও?! 


অশ্বই বিশ্বের রূপ। তাগড়া ঘোড়ার 

সিম্বলে তলিয়ে আছে চুলবুলে সংসার।









২. অগ্নিব্রাহ্মণ

আদিতে ছিলেন মৃত্যু। তাঁরই ইচ্ছায় 

সৃষ্টি হল মহাকাল— গ্রহে ও তারায় 

আত্মবান হয়ে তিনি নিজেকে ভাঙলেন— 

বীজকণা, ভর-শক্তি, আদি হাইড্রোজেন 

পজ়িট্রনে-ইলেকট্রনে সত্তার বিদ্যুতে, 

অরূপ গডড্যাম কণা, পরম-অণুতে। 

পঞ্চভূতে ব্রহ্ম-অণ্ড, কল্পনায় ভ্রুণ 

তিনি যৌগে রূপবান আয়ন-মিথুন।


কী ছিল সৃষ্টির আগে?— নাম? রূপ? কায়া? 

কিছুই ছিল না? ছিল— মৃত্যু অশনায়া।

ছিল সৃষ্টি 'অব্যাকৃত'— জড়িয়ে মড়িয়ে 

অবিচ্ছিন্ন সব, ঢাকা ছিল মৃত্যু দিয়ে। 

অশনায়া-রূপী মৃত্যু! 'অশনায়া' মানে?—

ভোজনেচ্ছা। কী ভোজন? বাঁচার সন্ধানে? 

এ যে-সে ভোজন নয়, মৃত্যুময় ভোগ

এ-বিশ্বের সৃষ্টিকথা আশ্চর্য, অমোঘ।

অব্যাকৃত অবিচ্ছিন্ন যে ছিল ছায়ায় 

ধরা যাক সে 'ইদং'। মৃত্যুর ইচ্ছায়

সে হল 'ব্যাকৃত', মানে আকৃতি-বিশেষ— 

সে-ই বীজ, যাকে নিয়ে মৃত্যু অনিঃশেষ 

চাইলেন 'আত্মন্বী' হতে, অর্থাৎ শরীরী।

আত্মা আর দেহ— সে-কী মিলনের ছিরি!


তাহলে, আদিতে 'মৃত্যু' শরীরের স্বাদ 

নিতে চেয়ে গড়লেন অভিব্যক্তিবাদ।

নিজেকেই নিজে তিনি করলেন অর্চনা 

সে-সময় সৃষ্টি হল জল কণা কণা।

আগে কি আকাশ ছিল? বায়ু? অগ্নি? জল? 

প্রথমত, 'অর্ক' অর্থে 'অর্চনার ফল'। 

'অর্ক্ক' মানে 'অর্চনায় সুখ হল যার'! 

এ-সবই ভাষার আদিস্তরের ব্যাপার। 


আদিতে 'আত্মা'ই 'দেহ'— বৈদিক শ্রুতিতে 

পৃথিবী গঠিত হল তরলে-অগ্নিতে। 

যেন পৃথিবীর সঙ্গে পরিশ্রম করে 

মৃত্যুর শরীর হল উত্তপ্ত, তারপরে 

আগুন উৎপন্ন হল ঘর্ষণে-রমণে— 

প্রজাপতি তেজোরস ফেললেন গোপনে। 

মুরগি, নাকি আণ্ডা আগে?— এ-তত্ত্ব জানে কে?

অর্ক বা অগ্নির জন্ম রস-জল থেকে।


ত্রিভঙ্গে ভাঙলেন তিনি নিজেকে এরপর—

দ্যৌ পিঠ, পৃথিবী বুক, আকাশ উদর। 

অগ্নি ও ঈশান— দুটি কোণ তাঁর হাত 

নৈর্ঋত ও বায়ুকোণ তাঁর পা নির্ঘাত। 

পুবদিকে মাথা তাঁর, পুচ্ছটি পশ্চিমে 

বিশ্বের অদ্ভুত দৃশ্য জাগল অসীমে।

অর্করূপী মৃত্যু, জলে প্রতিষ্ঠিত হন। 

দেবের আশিস করে ইমেজ-বর্ণন।


কামনা করলেন তিনি অযৌন জনন: 

নিজেরই দ্বিতীয় দেহ— কোষ বিভাজন।

অশনায়ারূপী মৃত্যু কবির মতন 

মন দ্বারা বাক্যে হন অদ্বৈত মিথুন। 

যে-বীজ উৎপন্ন হল বাক্যের জঠরে 

সম্বৎসর কাল শুরু হল তাকে ধরে। 

এ সেই সময়, যার সূচনা বিগ ব্যাং— 

ভগ্নাংশ-সেকেন্ডে সৃষ্টি খুঁজেছে বিজ্ঞান।


সে-বীজ খাওয়ার জন্য 'মৃত্যু' মুখ তাঁর 

হাঁ করলেন— অমনি 'ভাণ' শব্দে চারিধার 

ভরে উঠল— আদি শিশু কেঁদে উঠল ভয়ে! 

সেই আর্তনাদ থেকে 'বাক্' সৃষ্টি হয়। 

যৎসামান্য বীজে খিদে মরবে না, তাই 

মৃত্যুর ইচ্ছায় সৃষ্ট হয়েছি সব্বাই।

বাক্ আর সম্বৎসররূপী দেহ মিলে 

বীজ থেকে জীব আর শাস্ত্র জন্ম নিল। 

সাহিত্য, কবিতা সবই অত্যন্ত আদিম

জীবকূল যেরকম, সংখ্যায় অসীম। 

সমস্ত সৃষ্টিই ভক্ষ্য হয় একদিন 

অদন-ভক্ষণ তত্ত্বে অমরত্ব লীন। 

সকলেরই বাঁধা আয়ু, মৃত্যু করে গ্রাস 

ডায়েট রহস্য জানে অদিতির দাস।


আদিম পৃথিবী ছিল গরম আগুন 

ফুলে-ওঠা সৌরপ্রাণ— যজ্ঞ নিদারুণ।

মৃত্যু কি ভোগের ইচ্ছা? তপস্যায় শ্রমে

মৃত্যু থেকে জন্ম নিল যশ-বীর্য ক্রমে।

যশ ও বীর্যই প্রাণ— মৃত্যুর কামনা 

প্রাণশূন্য স্ফীত দেহে মনের যোজনা। 

'শ্বি' ধাতুর অর্থ স্ফীতি, অশ্বৎ শরীরে

যজ্ঞযোগ্য হতে চান মৃত্যু ধীরে-ধীরে। 

তাই তিনি মেধ্য অশ্ব— তত্ত্বে অশ্বমেধ।

অশ্ব ও অাদিত্যে কিন্তু নেই কোনও প্রভেদ।

যজ্ঞের উত্তাপ তিনি— আগ। অর্কদেব। 

সংবৎসর 'আত্মা' তাঁরই,— মৃত্যু অতএব। 

বাঁধনবিহীন পশু তাঁরই চিন্তায়

সংবছর পরে নিজ নিবেদনে যায়।

তাহলে মৃত্যুই আত্মা?— অগ্নি-মহেশ্বর? 

যারা এ-বিজ্ঞান জানে, তারাই অমর।

বিজ্ঞানী ও কবি দুই অমৃত-সন্ধানী 

অগ্নি-রহস্যের বাণী করে কানাকানি। 

মরেও অমর তাঁরা— ব্যাস বা হোমার!

রবি তাঁর কবিতার উত্তরাধিকার 

দিয়েছেন কাকে?... পদ অর্থের মহিমা

খোঁড়েন পদার্থবিদ ! ভাঙেন কালসীমা।


কে কোথায় লিওনার্দো? আর্দ্র কেন চোখ? 

বুদ্ধ কি তোমাকে করে যাননি অশোক? 

তোমার দৃষ্টির সত্য তোমাকেই সাজে 

তাই তুমি গ্যালিলেও মানব সমাজে। 

তুমি তাই আর্যভট্ট, আইনস্টাইন 

প্রাণ-পদার্থের সূত্রে গেঁথেছ আইন।







-------------------------

[প্রথম অধ্যায় দ্বিতীয় ব্রাহ্মণ শেষ। তৃতীয় ব্রাহ্মণ ]

                                                                  ক্রমশ...

ছবি : বিধান দেব 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...