বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই, ২০২১

সম্পাদকের কথা


সাহিত্যের বেলাভূমি ব্লগজিন এক বছর পূর্ণ করল। ভারত এবং বাংলাদেশের যে সব কবি লেখক চিত্র শিল্পী এই পত্রিকার সঙ্গে এতদিন ধরে বিভিন্নভাবে যুক্ত আছেন প্রত্যেককেই এই বর্ষপূর্তির শুভেচ্ছা জানাই। আশা করি আগামী দিনেও এভাবেই আপনারা আমাদের পাশে থাকবেন। মানুষ প্রকৃতির অংশ হলেও প্রকৃতির নানা খামখেয়ালিকেও তাকে নানাভাবে গ্রহণ করতে হয়েছে। প্রকৃতির অন্তরঙ্গতা যেমন মানুষের পাথেয় তেমনই তার বিরূপতাও মানুষকে আগামী দিনের স্বাচ্ছন্দ্য প্রয়াসে উপায় বাতলাতে বাধ্য করে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এই দ্বন্দ্বমধুর সম্পর্কই মানব সভ্যতার অগ্রগতির নির্ণায়ক।

তবে স্বচ্ছল ও স্বাভাবিক গমনের স্বাধীনতা মানুষের মনের যে মুক্তি আনে এ সময়ে তা কিছুটা রুদ্ধ। এই রুদ্ধ সময়ে আমরা আমাদের মনের মুক্তির জন্য শিল্প সাহিত্যের কাছে আশ্রয় নিয়েছি। প্রতি সংখ্যার মতো এই সংখ্যাও দুই বাংলার কবি লেখকের লেখায় সমৃদ্ধ হয়েছে। পত্রিকার শুরু থেকে আজও প্রখ্যাত চিত্র শিল্পী বিধান দেবের ছবি আমাদের মননকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। আশা করব আগামী দিনের পথ চলায় আমরা এভাবেই আমাদের এই সব প্রিয় কবি শিল্পীদের সাহচর্য পাব। শিল্প সাহিত্য কখনওই  কারও গণ্ডীবদ্ধ বিষয় নয়। সাহিত্য একপ্রকার সেবা। সেবাকার্য নিয়ে আত্ম অহংকারও বোকামি। ফলে আমাদের কাজ চোখে আঙুল দিয়ে দেখাবার মতো কিছু নয়। একেবারেই নিজ ব্যক্তিগত যাপনের মতো তা আত্মসহায় মাত্র। বাদল দিনের প্রথম কদম ফুলের মতো দানের প্রত্যাশা থেকেই তার যাত্রা। সেই যাত্রাপথে সকলের শুভকামনা ও আশীর্বাদ পেতে চাই।

মুক্ত গদ্য ।। সায়ন রায়


 কবিতার যাত্রাপথে অনাসক্ত আত্মার ঝিলমিল


Self is a sea boundless and measureless.

Say not, ‘I have found the truth,’ but rather, ‘I have 

found a truth.'

Say not, ‘I have found the path of the soul.’ Say

rather, ‘I have met the soul walking upon my path'.

For the soul walks upon all paths.

The soul walks not upon a line, neither does it grow 

like a reed.

The soul unfolds itself, like a lotus of countless 

petals. 

                    ( THE PROPHET : KAHLIL GIBRAN ) 


সবুজ গোলাপের চারাটি নার্সারি থেকে এনে যত্ন করে লাগিয়ে ছিল মা।সবুজ গোলাপ আগে কখনো দেখিনি।তাই এই গোলাপ গাছটির হয়ে ওঠা আর তার ভেতরে যে লুকিয়ে আছে ফুল, তাকে প্রত্যক্ষ করার এক তীব্র ইচ্ছে তৈরি হয়েছিল ভিতর মহলে।কিন্তু কী আশ্চর্য! গোলাপ চারাটি কিছুদিনের মধ্যেই এক অদ্ভুত অবস্থা ধারণ করলো। গায়ের পাতা ঝরিয়ে দিয়ে এক নির্জীব অবস্থায় পৌঁছে গেল।কিন্তু পুরোপুরি মারাও গেল না।কোমায় থাকার মত থেকে গেল বহুমাস।প্রচ্ছন্ন হয়ে রইলো তার ভেতরের সকল সম্ভাবনা। মা কিন্তু জল,সার দিয়েই চললেন।তার যত্নের কোনো খামতি ছিল না।

~~

গোধূলিবেলার আলো তেরছা ভাবে এসে পড়েছে জানলার কাচে।এই আলো মায়াবী ও মহৎ। আমার সমগ্র সত্তা জুড়ে তৈরি হচ্ছে আলোর ঝিলমিল।শেষ বিকেলের এই আলোয় ভেসে যাচ্ছে সকলরকম জাড্য ও জড়তা।অবগাহনের আনন্দে জেগে উঠছে সংলাপ।আত্মার গর্ভগৃহ থেকে ভেসে আসছে সুর।প্রবাদপ্রতিম এক বিশ্বাস সারা গায়ে চামর বুলিয়ে বুলিয়ে প্রশমিত করছে শিরা-উপশিরা।শান্তরস বয়ে চলেছে চরাচর জুড়ে। 

~~

সত্যজিৎ রায় একবার বলেছিলেন : In my city Calcutta, in my own house, sitting on my chair I feel creative. সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে শিকড়ের তাহলে এমত অবিচ্ছেদ্য ও গহন সম্পর্ক। শেষ বয়সে শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে যখন শান্তিনিকেতনের অতিথি অধ্যাপক করে নিয়ে যাওয়া হয়,অতিথিনিবাসের ঘরগুলিতে বারান্দা না  থাকায় প্রায় সারাদিনই বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়াতেন কবি।বিরক্তি ভরে জানিয়েছিলেন: শান্তিনিকেতনে কবিতা লেখা যায়? হায়! সৃষ্টিশীল হবার পক্রিয়াটি কেমন ব্যক্তিভেদে বদলে বদলে যায়।স্থান, কাল, পরিপ্রেক্ষিত সবই আপেক্ষিক। 

~~

আকাশে মেঘের ঘনঘটা। একেকটা প্রকাণ্ড বিদ্যুতের ছটা আকাশকে চিরে দিচ্ছে আড়াআড়ি ভাবে। আর সেই ফাটলের মধ্যে দিয়ে উঁকি দিচ্ছে গহন ও গহীন এক দূরবর্তী দ্বীপ। সারাবছর জ্যোৎস্নালোকিত সেই দ্বীপে সূক্ষ্মদেহ হাওয়ার সংসার।মৃত গ্রহের ধুলো দিয়ে তৈরি এই দ্বীপে ঝড় ওঠে কখনো সখনো। সেই ঝড় বড়ই করুণ আর বড়ই ধূসর।চোখে পানি এসে গেলে ব্যক্তি বিশেষে প্রত্যক্ষ হতে পারে সেই ঝড়। তাও সম্ভাবনা ক্ষীণ।

~~

জেন সন্ন্যাসিনী ৎসুং-চি-এর মতে সত্যকে বারবার দেখা যায় না।সত্যকে দেখলে একবারেই দেখা যায়।বোধি লাভ হঠাৎই হয়।এই কথাটির সূত্র ধরেই জেনধর্মে পরবর্তীকালে  সাধন ভজনের একটি ঘরানা তৈরি হয়েছে।তারা বলে—সত্য হঠাৎই প্রতিভাত হয়।সাধকের এই অবস্থাকে বলে সাতোরি বা সাটোরি।জেন ঋষিরা বাদামের খোলা ফাটিয়ে সত্যে পৌঁছাতে চান।তাই তাদের উচ্চারিত শব্দ,বাক্যগুলি প্রহেলিকাময়,প্যারাডক্সিকাল। জেন পরিভাষায় এগুলি হল 'কোয়ান'।জেন গুরু-শিষ্য সংলাপের একেকটা ইউনিট হল কোয়ান।জেন সাধু রিন-ঝাই যখন কোয়ানের পথে অন্তর্দৃষ্টি পাওয়ার কথা বলেন,তখন আরেক সাধু শি-তুর নির্দেশিত পথ 'সোটো' নীরব ধ্যানের কথা বলে।জেন আমাদের এই শিক্ষা দেয় : মনকে চিন্তাশূন্য করলে,ভালো-মন্দ বোধ থেকে মুক্ত করলে,যেমন আছে সবকিছু তেমন দেখলে, মহৎ ও তুচ্ছের তফাৎ করা থেকে স্বাধীন হলে—তবেই বোধিজ্ঞান লাভ হবে।

~~

আমি বোধহীন হয়ে একা একা ঘুরে বেড়াই পথে পথে।একটা শ্যাওলা ধরা দেওয়াল আমায় মোহিত করে।কত না-বলা গল্প,সঙ্কেত ও ধ্বনি মাথাকে বেড় দিয়ে মাথার চারিদিকে ঘুরতে থাকে একদল দুধসাদা হাঁসের মত।নির্ভার হয়ে আসে শরীর।ক্রমশ শূন্যে উঠে যাই।ভাসতে থাকি হাওয়ায়  হাওয়ায়। হাঁসেদের সঙ্গ নিয়ে পাড়ি দিই দূর বহুদূর। চেনা পথ,মাঠঘাট, চেনা জনপদ ছেড়ে চলে আসি অচেনা তালুকে।এইবার ভয় হতে থাকে।এতক্ষণ যা ছিল স্বপ্নের উড়ান,এইবার তাতে যোগ হল পিছুটান।ফলতঃ পতন।শূন্য থেকে সবেগে পড়তে থাকি নীচে।দমবন্ধ হয়ে আসে,ঘোর লেগে যায়, ভয় তাড়া করে ফেরে।মুখ থুবড়ে পড়ি পচা পাঁক আর পূতিগন্ধময় এক জলায়।

~~

'আলো ক্রমে আসিতেছে'—না, এই শব্দকটি আর বলতে পারি না এক নিঃশ্বাসে। ক্রমে ক্রমে নিভে আসছে সবকটি আলো।আত্মার উত্তরণ না অবতরণ—এইসব ধন্দ নিয়ে কেটে যায় জীবন।বেঁচে থাকা ও বাঁচিয়ে রাখা এইসব কূটপ্রশ্ন থেকে দৌড়ে যাই যোজন যোজন দূরে।আপাতত নিজের পোষ্যটির গায়ে মাথায় বুলিয়ে দিচ্ছি হাত। এক অপূর্ব মায়ায় ভেসে যাচ্ছে চোখ।না,এত সহজে বিদায় নিচ্ছি না।আরো কিছু ক্ষণ ও ক্ষমা দুহাতে ছড়াতে ছড়াতে উপভোগ করবো এই চিরচেনা জল,মাটি,আকাশ ও আশ্চর্য। ততদিন বৃষ্টিধারা তুলোট কাগজে ছবি এঁকে যাবে।ততদিন মহানিমগাছ ঢেউ তুলে জানান দেবে অস্তিত্বের প্রতিটি ফাঁক ও ফোকর।


ছবি : বিধান দেব 




নয়া বৃহদারণ্যক ।। দেবাশিস দাশ


 


নয়া বৃহদারণ্যক


পাঠকের জন্য, অভিভাষণ: 

প্রাচীন ও চিরন্তনের মেলবন্ধনেই সভ্যতার বিকাশ, ভাষার চলনশীলতা। ব্রহ্মজ্ঞান অর্থাৎ বিশাল মহাব্রহ্মাণ্ডের উৎপাদক-সত্তার বোধ ভারতীয় সংস্কৃতির সনাতন শিক্ষা। সাহিত্য ও বিজ্ঞানের ভেদ ছিল না তখন। রেনেসাঁ-ইউরোপের লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি অথবা বাংলার জগদীশচন্দ্র বসুর চেতনার মতোই জ্ঞান ছিল সর্বস্তরে উন্মুক্ত। প্রতিটি শিক্ষাই ছিল মনন গড়ে তোলার সম্পূরক। কিন্তু প্রাচীনতাদোষ ও ধার্মিক বিধিজনিত দূরত্বের দরুন আধুনিকোত্তর সময়ের উপযোগী হিসেবে সেই বোধ উপস্থাপন করতে দেখা যায় না। তাছাড়া, এখন জ্ঞানচর্চায় অনেক সূক্ষ্ম উন্নতি এসেছে, বিষয়গত উপবিভাগগুলো সমুদ্রের মতো ফুলেফেঁপে উঠেছে, যাদের সহজে বৈদিক তত্ত্বের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার মতো সময় বা সুযোগ সাধারণ মানুষের মনের নাগালে থাকে না বললেই চলে। সে-কথা ভেবেই এই নতুন কাব্যিক উদ্যোগ। সবচেয়ে বড় দুটো উপনিষদের মধ্যে থেকে একটিকে বেছে নিয়ে, নতুন ঘরানায় ও ভাষায় ধারণ করতে চেষ্টা করলাম, যদিও মূলের প্রায় প্রত্যেক বিভাগ, এমনকী পরিচ্ছেদ ধরে-ধরে এগোনো হয়েছে, যাতে মূলপাঠ থেকে পাঠককে বিন্দুমাত্র বঞ্চিত না হতে হয়। সঙ্গে জায়গা ও পরিবেশ অনুসারে রসালো কিছু প্রেক্ষিতকোণ সংযোজিত হয়েছে ছন্দের আবেগে। সমস্ত সূত্র ও ব্যাখ্যার কেন্দ্র-নির্ণায়ক হিসেবে ডঃ মহানামব্রত ব্রহ্মচারীর বিচারকেই এখানে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রাধান্য দেওয়া গিয়েছে, যা সত্যমিথ্যা, ভেদ-অভেদবাদী অন্যান্য সমস্ত বিচারবুদ্ধির পরবর্তী নিরপেক্ষতম আকর বলা যায়।

'উপনিষদ' শব্দের মূলে আছে 'নিষণ্ণ' থাকার পরিবেশ, অর্থাৎ মূলের প্রান্তে অবস্থান করার কথা। একদিকে বেদের শেষভাগ, অন্যদিকে বৃক্ষতলে গুরুর বেদির সামনে উপবেশন করে জ্ঞানবিজ্ঞানের শ্রুতিশিক্ষা। বেদের জ্ঞানকাণ্ড থেকে বহু রকমের উপনিষদ গ্রন্থিত হয়েছিল এবং সেসব সংকলন করে গিয়েছিলেন মহর্ষি বেদব্যাস। বলা হয়, তাঁর লাইব্রেরিতে আদি ভারতের সমস্ত বই মজুদ ছিল। মহাভারত এবং মদ্ভাগবৎ-কৃষ্ণচরিত লেখার আগে তামাম পুরাণ ও বেদ গুছিয়ে একত্র করে পড়াশোনা করতে হয়েছিল তাঁকে। অনন্ত মহাবিশ্বের আবহে মানুষের অবস্থান এবং ঈশ্বর নামক অধরা অস্তিত্বের গূঢ় ভাবনা নিজের-নিজের উপলব্ধি এবং বিশ্লেষণের মারফৎ তুলে ধরেছিলেন যাঁরা, তাঁদেরই উত্তরসূরী হিসেবে আমরা আধুনিক সমাজে পেয়েছি তাবড় সব গবেষক ও বিজ্ঞানসাধকদের। এক অর্থে, গুরুরা ছিলেন একেকজন মহাজ্ঞানী অধ্যাপক। 'নয়া বৃহদারণ্যক' কাব্যের দ্বিতীয় অধ্যায়ে অজাতশত্রু আমাদের আধুনিক চৈতন্যবিজ্ঞান-বিশেষজ্ঞের সমতুল্য, গার্গ্যবালাকি দর্শন ও শাস্ত্রের নামী অ্যাকাডেমিশিয়ান। পরবর্তী অধ্যায়ের মূল চরিত্র প্রোফেসর যাজ্ঞবল্ক্য— দূর প্রদেশের অধিবেশনে যোগদানকারী গবেষকেরই ছায়া। মৈত্রেয়ী ভারতীয় প্রজ্ঞাশীলা নারী, যাঁর সন্ধান হৃদয়-অমৃত (মধু)। সমাজের নানা স্তরে ব্যবহৃত হত প্রাণীর প্রতীকী মুখোশ, কখনও গণেশ, কখনও-বা অশ্বিনীকুমারের প্রতিচিত্রণে। শল্যচিকিৎসক, জ্যোতিষ্কতাত্ত্বিক, দলগত নেতা বা দেবতাদের উপস্থিতির বাস্তবিক ভিত্তি চিন্তা করতে হয়েছে অনেক সময়, যা মূল রস বা তত্ত্বের সঙ্গে অভিন্নভাবেই মিলিয়ে নেওয়া গিয়েছে।

বৃহদারণ্যক-শ্রুতির পরিচয়: শুক্ল-যজুর্বেদের কাণ্বশাখার শতপথ-ব্রাহ্মণের চরম অংশ। প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায়: মধুকাণ্ড। তৃতীয় ও চতুর্থ অধ্যায়: যাজ্ঞবল্ক্যকাণ্ড। পঞ্চম ও ষষ্ঠ অধ্যায়: খিলকাণ্ড বা পরিশিষ্ট। সংকলয়িতার নাম: ব্রহ্মর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য।




নয়া বৃহদারণ্যক


||১||

সমস্ত বস্তুতে আছ, প্রাণীতেও প্রভু 

তোমাকেই খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হই তবু।


১. অশ্বব্রাহ্মণ

বিশাল ঘোড়ার কথা ভাবা যাক, ধ্যানে। 

ব্রহ্মাণ্ডের মেটাফোর আছে কি বিজ্ঞানে?


অশ্বই বিশ্বের রূপ। একটি ঘোড়ার 

শরীরে তলিয়ে আছে নক্ষত্র-সংসার। 


কালো ঘোড়া— যেন মেঘ, চোখে অর্ক জ্বলে 

লেজে বিদ্যুতের ছটা, তড়িদ্বেগে চলে।

পেট সাদা, সবুজ পা, দু'কান রক্তিম

অগ্নিজিহ্ব এ-ঘোড়ার বর্ণনা অসীম। 

মহীন দ্যাখেনি তাকে, পোষেনি মনসুর 

মেধযজ্ঞে দেবতারা তাড়াত অসুর।


সামনে সোনার পাত্র— দিনের প্রতীক 

পেছনে রুপোর বাটি— রাত্রি যেন ঠিক।

যজ্ঞের এ-দুটি পাত্র পার্থিব মহিমা 

খুরে ধৃত এ-পৃথিবী, শরীরে নীলিমা। 

সমুদ্র বান্ধব তার, সমুদ্রই যোনি

খোলা মুখে অগ্নি জ্বলে, জৃম্ভনে অশনি।


অশ্বই হিরণ্যগর্ভ, সামনে ও পেছনে 

যথাক্রমে দিন-রাত্রি। শরীরের কোণে

বিস্তৃত বিভিন্ন দিক। বৃহদন্ত্র নদী,

পেট থেকে পিঠ মহা-আকাশ অবধি 

প্ল্যানেট্যারিয়াম যেন, চোখে সূর্য জ্বলে।

ভোরের মতন মাথা, হাড়ের আদলে

তারাগুলো দৃশ্য গড়ে, মাংস যেন মেঘ। 

সারা গা কাঁপিয়ে ঘোড়া গর্জায় বারেক। 

বৃষ্টি কি পেচ্ছাপ তার? শব্দ হ্রেষারব?

ঝড়-ঝঞ্ঝা পার করে কারা করে স্তব? 

দেবতা-গন্ধর্ব-নর-অসুর সক্কলে 

ঘোড়া চড়ে ঘোরে। কেউ তাকে 'হর্স' বলে। 

কেউ ডাকে 'বাজী' নামে, 'অর্বা' বলে কেউ।

ঘোড়া কি এসব বোঝে?— প্রজাপতি সে-ও?! 


অশ্বই বিশ্বের রূপ। তাগড়া ঘোড়ার 

সিম্বলে তলিয়ে আছে চুলবুলে সংসার।









২. অগ্নিব্রাহ্মণ

আদিতে ছিলেন মৃত্যু। তাঁরই ইচ্ছায় 

সৃষ্টি হল মহাকাল— গ্রহে ও তারায় 

আত্মবান হয়ে তিনি নিজেকে ভাঙলেন— 

বীজকণা, ভর-শক্তি, আদি হাইড্রোজেন 

পজ়িট্রনে-ইলেকট্রনে সত্তার বিদ্যুতে, 

অরূপ গডড্যাম কণা, পরম-অণুতে। 

পঞ্চভূতে ব্রহ্ম-অণ্ড, কল্পনায় ভ্রুণ 

তিনি যৌগে রূপবান আয়ন-মিথুন।


কী ছিল সৃষ্টির আগে?— নাম? রূপ? কায়া? 

কিছুই ছিল না? ছিল— মৃত্যু অশনায়া।

ছিল সৃষ্টি 'অব্যাকৃত'— জড়িয়ে মড়িয়ে 

অবিচ্ছিন্ন সব, ঢাকা ছিল মৃত্যু দিয়ে। 

অশনায়া-রূপী মৃত্যু! 'অশনায়া' মানে?—

ভোজনেচ্ছা। কী ভোজন? বাঁচার সন্ধানে? 

এ যে-সে ভোজন নয়, মৃত্যুময় ভোগ

এ-বিশ্বের সৃষ্টিকথা আশ্চর্য, অমোঘ।

অব্যাকৃত অবিচ্ছিন্ন যে ছিল ছায়ায় 

ধরা যাক সে 'ইদং'। মৃত্যুর ইচ্ছায়

সে হল 'ব্যাকৃত', মানে আকৃতি-বিশেষ— 

সে-ই বীজ, যাকে নিয়ে মৃত্যু অনিঃশেষ 

চাইলেন 'আত্মন্বী' হতে, অর্থাৎ শরীরী।

আত্মা আর দেহ— সে-কী মিলনের ছিরি!


তাহলে, আদিতে 'মৃত্যু' শরীরের স্বাদ 

নিতে চেয়ে গড়লেন অভিব্যক্তিবাদ।

নিজেকেই নিজে তিনি করলেন অর্চনা 

সে-সময় সৃষ্টি হল জল কণা কণা।

আগে কি আকাশ ছিল? বায়ু? অগ্নি? জল? 

প্রথমত, 'অর্ক' অর্থে 'অর্চনার ফল'। 

'অর্ক্ক' মানে 'অর্চনায় সুখ হল যার'! 

এ-সবই ভাষার আদিস্তরের ব্যাপার। 


আদিতে 'আত্মা'ই 'দেহ'— বৈদিক শ্রুতিতে 

পৃথিবী গঠিত হল তরলে-অগ্নিতে। 

যেন পৃথিবীর সঙ্গে পরিশ্রম করে 

মৃত্যুর শরীর হল উত্তপ্ত, তারপরে 

আগুন উৎপন্ন হল ঘর্ষণে-রমণে— 

প্রজাপতি তেজোরস ফেললেন গোপনে। 

মুরগি, নাকি আণ্ডা আগে?— এ-তত্ত্ব জানে কে?

অর্ক বা অগ্নির জন্ম রস-জল থেকে।


ত্রিভঙ্গে ভাঙলেন তিনি নিজেকে এরপর—

দ্যৌ পিঠ, পৃথিবী বুক, আকাশ উদর। 

অগ্নি ও ঈশান— দুটি কোণ তাঁর হাত 

নৈর্ঋত ও বায়ুকোণ তাঁর পা নির্ঘাত। 

পুবদিকে মাথা তাঁর, পুচ্ছটি পশ্চিমে 

বিশ্বের অদ্ভুত দৃশ্য জাগল অসীমে।

অর্করূপী মৃত্যু, জলে প্রতিষ্ঠিত হন। 

দেবের আশিস করে ইমেজ-বর্ণন।


কামনা করলেন তিনি অযৌন জনন: 

নিজেরই দ্বিতীয় দেহ— কোষ বিভাজন।

অশনায়ারূপী মৃত্যু কবির মতন 

মন দ্বারা বাক্যে হন অদ্বৈত মিথুন। 

যে-বীজ উৎপন্ন হল বাক্যের জঠরে 

সম্বৎসর কাল শুরু হল তাকে ধরে। 

এ সেই সময়, যার সূচনা বিগ ব্যাং— 

ভগ্নাংশ-সেকেন্ডে সৃষ্টি খুঁজেছে বিজ্ঞান।


সে-বীজ খাওয়ার জন্য 'মৃত্যু' মুখ তাঁর 

হাঁ করলেন— অমনি 'ভাণ' শব্দে চারিধার 

ভরে উঠল— আদি শিশু কেঁদে উঠল ভয়ে! 

সেই আর্তনাদ থেকে 'বাক্' সৃষ্টি হয়। 

যৎসামান্য বীজে খিদে মরবে না, তাই 

মৃত্যুর ইচ্ছায় সৃষ্ট হয়েছি সব্বাই।

বাক্ আর সম্বৎসররূপী দেহ মিলে 

বীজ থেকে জীব আর শাস্ত্র জন্ম নিল। 

সাহিত্য, কবিতা সবই অত্যন্ত আদিম

জীবকূল যেরকম, সংখ্যায় অসীম। 

সমস্ত সৃষ্টিই ভক্ষ্য হয় একদিন 

অদন-ভক্ষণ তত্ত্বে অমরত্ব লীন। 

সকলেরই বাঁধা আয়ু, মৃত্যু করে গ্রাস 

ডায়েট রহস্য জানে অদিতির দাস।


আদিম পৃথিবী ছিল গরম আগুন 

ফুলে-ওঠা সৌরপ্রাণ— যজ্ঞ নিদারুণ।

মৃত্যু কি ভোগের ইচ্ছা? তপস্যায় শ্রমে

মৃত্যু থেকে জন্ম নিল যশ-বীর্য ক্রমে।

যশ ও বীর্যই প্রাণ— মৃত্যুর কামনা 

প্রাণশূন্য স্ফীত দেহে মনের যোজনা। 

'শ্বি' ধাতুর অর্থ স্ফীতি, অশ্বৎ শরীরে

যজ্ঞযোগ্য হতে চান মৃত্যু ধীরে-ধীরে। 

তাই তিনি মেধ্য অশ্ব— তত্ত্বে অশ্বমেধ।

অশ্ব ও অাদিত্যে কিন্তু নেই কোনও প্রভেদ।

যজ্ঞের উত্তাপ তিনি— আগ। অর্কদেব। 

সংবৎসর 'আত্মা' তাঁরই,— মৃত্যু অতএব। 

বাঁধনবিহীন পশু তাঁরই চিন্তায়

সংবছর পরে নিজ নিবেদনে যায়।

তাহলে মৃত্যুই আত্মা?— অগ্নি-মহেশ্বর? 

যারা এ-বিজ্ঞান জানে, তারাই অমর।

বিজ্ঞানী ও কবি দুই অমৃত-সন্ধানী 

অগ্নি-রহস্যের বাণী করে কানাকানি। 

মরেও অমর তাঁরা— ব্যাস বা হোমার!

রবি তাঁর কবিতার উত্তরাধিকার 

দিয়েছেন কাকে?... পদ অর্থের মহিমা

খোঁড়েন পদার্থবিদ ! ভাঙেন কালসীমা।


কে কোথায় লিওনার্দো? আর্দ্র কেন চোখ? 

বুদ্ধ কি তোমাকে করে যাননি অশোক? 

তোমার দৃষ্টির সত্য তোমাকেই সাজে 

তাই তুমি গ্যালিলেও মানব সমাজে। 

তুমি তাই আর্যভট্ট, আইনস্টাইন 

প্রাণ-পদার্থের সূত্রে গেঁথেছ আইন।







-------------------------

[প্রথম অধ্যায় দ্বিতীয় ব্রাহ্মণ শেষ। তৃতীয় ব্রাহ্মণ ]

                                                                  ক্রমশ...

ছবি : বিধান দেব 


ভিনদেশি তারা ।। অরিন্দম রায়




 

ভিনদেশি তারা

ল্যারি জেফ

 

নিউইয়র্কের ব্রংক্স -এ ইয়াংকি স্টেডিয়ামের পিছনে ছিল ছেলেটার বাড়ি। ছেলেটার বাবা ফ্যাক্টরির শ্রমিক থেকে ফোরম্যান তারপর সেই ফ্যাক্টরির মালিক হন কেবলমাত্র নিজের পরিশ্রমের সুবাদে। হাইস্কুলে পড়ার সময়েও ছেলেটা তেমন লম্বা ছিল না। মেরেকেটে পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি হবে। কী আশ্চর্য, কলেজের ফার্স্ট ইয়ারেই ছেলেটা যেন তালগাছের মতো বাড়তে লাগল! শেষমেশ ছ’ফুট তিন ইঞ্চিতে পৌঁছে তবেই থামল সে। তখনই সে সিদ্ধান্ত নিল – কবিই হতে হবে তাকে। যদিও দশ বছর বয়স থেকেই কবিতা লেখায় হাতেখড়ি।কবিতা নিয়ে কথা বলার চাইতে লিখতেই বেশি পছন্দ করেন তিনি। নিজেকে তিনি ক্ষুধার্ত পাঠক বলে মনে করেন। প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যেও সপ্তাহে দুটো থেকে তিনটে বই পড়ে ফেলেন তিনি। তবে শুধু কবিতার বই নয় ,ক্ষুরধার গোয়েন্দাকাহিনি পড়তেও ভীষণ পছন্দ করেন। ছেলেবেলায় দেখেছিলেন কোম্পানির মালিক হয়ে গেলেও তাঁর বাবার জামার হাতাদুটো সবসময় গোটানো থাকত ,মাঠে নেমে কাজ করতে কখনও তাঁর বাবা পিছুপা হতেন না। কবিতা লেখার তাঁর যে দৃষ্টিভঙ্গী সেটাও তিনি পেয়েছেন এখান থেকেই …জামার হাতা গুটিয়ে কাজে নেমে পড়া আর জীবনের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা।   

প্রাথমিকভাবে ইচ্ছে ছিল সাংবাদিক হওয়ার। ষাট এবং সত্তরের দশকে তিনি বিভিন্ন অলটারনেটিভ মিডিয়াতে লেখালেখিও করতেন। এগুলোকে বলা হত আন্ডারগ্রাউন্ড পেপার। কিন্তু যখন তাঁর বছর কুড়ি বয়স ,এক  বান্ধবী মারফত পরিচয় ঘটল বাশো-র কবিতার সঙ্গে। ব্যাস! সেই যে কবিতার পোকায় কামড়াল আর ছাড়ল না! তাঁর নিজের কথায় হাইকু লেখার জন্য প্রায় দাসের মতো খাটতে শুরু করলেন তিনি। নিজের চিন্তাভাবনাগুলোকে সতের সিলেবলের মধ্যে নিয়ে আসা আরম্ভ করলেন। এর আগে অব্দি তাঁর কাছে কবিতা লেখা ছিল একটা শখের মতো , কিন্তু এরপর সেটা পরিণত হল গভীর প্রণয়ে।

তবে কেবলমাত্র বাশোর হাইকুই নয় তাঁর কবিতা লেখার পিছনে কাজ করেছে ভিয়েতনামের যুদ্ধের প্রভাব। তাঁকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে লিওনার্ড কোহেন আর বব ডিলানের গান, ল্যাংস্টন হিউজের কবিতা। তাঁর কবিতায় আমরা পাবো সন্নিবদ্ধ শব্দ, প্রচুর পরিমাণে মেটাফর , চিত্রকল্প আর সংযত আবেগের উপস্থিতি। খুব   বেশি সাজগোজ করা কবিতা তাঁর পছন্দ নয়।

একটা সময় ছিল যখন তিনি আন্ডারগ্রাউন্ড প্রেসে কাজ করেছেন , নিজের হাতে নিজের কবিতারবই ছেপেছেন। কবিতা লেখার সঙ্গে বই বেরনোর কোনও সম্পর্ক ছিল না তখন। তাঁর কাছে কবিতা ছিল অভিব্যক্তি প্রকাশের একটা জায়গা ,অভিঘাত তৈরির একটা মাধ্যম। এখনও তাঁর কাছে কবিতার মানে এটাই।

তিনি ল্যারি জেফ। ইউনাইটেড নেশনস এর Dialouge Among Civilizations Through Poetry প্রোগ্রামের তিনি কোঅর্ডিনেটর। বিশ্বশান্তির লক্ষে তিনি এবং তাঁর সংগঠন Poets for Peace নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। তাঁর প্রকাশিত বইগুলির মধ্যে অন্যতম হল Jewish Soulfood ,Unprotected Poetry Lying Half-Naked in the Doorway  ইত্যাদি। প্রতি মাসে জেফ Musletter নামে একটি ধারাবাহিক কলাম লেখেন। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ওয়েব ডেল সোল । কবিতাকে আরও বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ইন্টারনেট অসাধারণ ভূমিকা পালন করছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর কাছে কবিতা একটা নির্যাস। কখনও জটিল , কখনও সরল, কখনও তার মধ্যে থাকতে পারে অনেকগুলো স্তর __ পাঠককে যা ধীরে ধীরে পার হতে হয়। সামাজিক ইস্যুকে কবিতায় আনতে ল্যারি দ্বিধা করেন না। তিনি লেখেন গৃহহীন মানুষদের জন্য , তিনি লেখেন যুদ্ধের বিরুদ্ধে। তিনি মনে করেন আজকের পৃথিবীতে একজন সাংবাদিককে বিশ্বাস করার চাইতে একজন কবিকে অনেক সহজে বিশ্বাস করা যায়। সাহিত্যের বেলাভূমির পাঠক ,আসুন আজ আমরা ল্যারি জেফের কবিতা পড়ে দেখি।  

 

গতিবেগ

১.

একটি বুলেটের গতিবেগ

হিসেব কষে বের করা যায়

শ্রদ্ধা সহকারে

যে দূরত্ব বুলেটটি অতিক্রম করেছে

যা কিনা ব্যবধান নামেও পরিচিত

সময় দিয়ে তাকে ভাগ দিলে।

 

উপরে উক্ত বুলেটটির

সামনাসামনি হওয়ার যে গতিবেগ

সেটাও বের করা যেতে পারে

কিন্তু একবার

বুলেটের মুখোমুখি হওয়ার পরে

এত হিসেবনিকেশের

কোনও মূল্য থাকে না।

 

তাছাড়া,

এইসব তর্ক বিতর্ক

যে আমার বুলেট

তোমার বুলেটের থেকে

বেশি জোরে ছোটে

এসবের গুরুত্বই থাকে না

যদি আপনি সেই ব্যক্তি হন

যার গায়ে গুলিটা লেগেছে।

 

২.

একটি রামধনুর

গতিবেগের মধ্যে

অন্তর্ভুক্ত থাকে তাঁর রঙ 

সেই সঙ্গে সোনা ভর্তি একটি পাত্র  

যা কিনা রামধনুটির শেষে

থাকার কথা

আর থাকে গভীরতার অসামান্য

ধারণা।

 

যদিও বুলেটের

একটা অভীষ্ট লক্ষ থাকে

যদি না দৈবাৎ সেটা ছোঁড়া হয়ে থাকে,  

রামধনু দেখে সবসময় মনে হয়

এটা প্রকৃতির একটা দুর্ঘটনা।

সাধারণত কখনও এর পুনরাবৃত্তি ঘটে না

একমাত্র যখন আমরা পাম স্প্রিং থেকে

গাড়ি চালিয়ে ফিরছিলাম

সেইদিনটা ছাড়া

যেদিন আমরা

একসঙ্গে তিন-তিনটে রামধনু

জাদুর মতো

আকাশ থেকে অঙ্কুরিত হতে দেখেছিলাম।

 

বিস্ময়াভিভূত (জাতি হিসেবে)

আমরা রামধনুর ধাক্কা খেতে পছন্দ করি

তারা আহত করে না অথবা

বিদ্ধ করে না এবং

সবসময় আপনি নিজেকে

সৌভাগ্যবান অথবা আশীর্বাদধন্য বলে মনে করবেন

তার উপর , রামধনুদের মধ্যে

হতাশাব্যঞ্জক কিছু নেই

এবং

তারা ঘাতক হিসেবে সুপরিচিত নয়।   

 

৩.

ব্লোজবের

গতিবেগ

অবশ্যই মাপা উচিত

কতটা শোভনভাবে কতটা সমৃদ্ধির সঙ্গে

শিল্পী সেটা অনুশীলন করেছেন

তার নিক্তিতে।

এইভাবে মৌখিক অনুবাদ

এবং তার বিকল্পগুলি

কাঙ্ক্ষিত অর্গাজমের লক্ষে   

গতিবেগ বাড়ায়

 

কয়েকটা জিনিস যেমন

দৈর্ঘ্য আর পরিধিকে

কাঙ্ক্ষিত অর্গাজমের চূড়ান্ত মুহূর্তে পৌঁছনোর  

সময় দিয়ে ভাগ দিলে

তাছাড়া আগে বলা বিষয়গুলো মাথায় রাখলেই

উক্ত ব্লোজবের দ্রুতি কতটা ছিল

বের করা যাবে।

 

পরিশেষে, আরও কিছু

কারণ অথবা গুণাবলি 

যখন সমীকরণটায় ঢোকানো হবে

যেমন ঠোঁট কতটা পুরু

জিভের পারদর্শিতা

কর্মতৎপরতার গভীরতা , ইত্যাদি ইত্যাদি।

এগুলোই গতির সঠিক অনুপাত

নির্ধারণ করতে সাহায্য করবে।

অবশ্য যার লিঙ্গটি চোষা হচ্ছে

তার অবস্থা

ঐ বুকে বুলেট বিঁধে যাওয়া লোকটার মতোই

তখন তার ভারী বয়েই গেছে

গতিবেগ নিয়ে ভাবতে।  


৪.

বন্ধুত্বের

গতিবেগ

খুব সহজে

অনায়াসেই বের করে ফেলা সম্ভব

আবহাওয়া ,প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতো কারণগুলোকে

বিরক্ত না করেই।


বন্ধুত্বের দ্রুততা

সহজেই নির্ধারণ করা যায়

বন্ধুত্বের গভীরতা

বন্ধুত্বের ধারাবাহিকতা

যেগুলো ভাগ দিতে হবে

বন্ধুত্বের নির্ভরযোগ্যতা দিয়ে 

তবে সবচেয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ

তা হল তোমার সম্মতি

তুমি কতটা রাজি আছো

বন্ধুর দিকে ধেয়ে আসা

সেই বুলেটটার সামনে বুক পেতে দিতে

       
তা তার গতিবেগ যাই হোক না কেন। 


ছবি : লেখক 

                                                                      ক্রমশ...

সাধনপর্বের নির্জনতা ।। অভিজিৎ দাশগুপ্ত




 


সাধনপর্বের নির্জনতা


২১.

বেচারা

কতদূর গেছি আমি ... কতদূর ... তা-ও বলতে হবে? সেন্সর করা ঊরু, ঊরুসন্ধি, হালকা ঝোপঝাড় ... সেসব জ্যান্ত নয়, স্টিল কিংবা ভিডিও বা সিডি ... এতটা বয়সে মাত্র এইটুকু যৌন অভিজ্ঞতা?

তাহলে কি চাকরি নট্? অভিজ্ঞতা কিচ্ছু নেই বলে ? যে কোনও পোস্টেই রাজি --- দারোয়ান, বাজার
                                                                  সরকার,
ড্রাইভিং জানি না ঠিকই, শিখে নিতে ক'দিন বলুন? কিংবা ভাঙা সাইকেলে, হ্যা গো ম্যাম, পৌঁছে দিতে
                                                                  পারি!

এসব চাকরির জন্য এই অভিজ্ঞতা লাগে না কি? অসভ্যতা করব কি না আসলে বিবেচ্য সে কথাই? করলে কতদূর করব? কিচ্ছু নয়? গল্প মুখোমুখি? স্যালারি এসপেক্ট করি, কত? বলছি ...
                                                সাত পয়জার ...

অভিজ্ঞতা নেই তবু এ বাজারে চাকরি হয়ে গেল!

পিনাকী ঠাকুরের কবিতা 'বেচারা '। কি আছে কবিতাটিতে ? এমন কিছু শব্দ, নিরুদ্দেশ বাক্য, নির্দিষ্ট ইমেজ ---  যা আমাদের সান্ত্বনা দেয়। শোক-তাপের অতিরিক্ত কিছু বলে । বাইরের পৃথিবী আর নিজের ভেতরের জগৎটাকে এক করে দেখা যতটা দুঃখজনক, ঠিক ততোখানি উপায়হীন।

বিষয় হিসেবে সাধারণ , অথচ পিনাকিজাত শব্দে তারা শুদ্ধির সর্বোচ্চ স্তর ছুঁয়ে আছে । আমাদের বেশির ভাগের জীবনেই কবিতার প্রথম স্তবকের অভিজ্ঞতাটুকু গড়ে ওঠে কৈশোর থেকে তারুণ্যের সীমান্ত রেখায় । 'দেবদাস ' থেকে ' চরিত্রহীন',
' ললিটা ' থেকে 'লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার'। মনে পড়ছে শেষোক্ত গ্রন্থের চলচ্চিত্ররূপ দেখতে গিয়ে আমি ও পলাশ অভিভূত । জার্মানির নারী পরিচালক
তাঁর অনুভূতির কাব্যিক প্রকাশ তুলে ধরেছিলেন পরতে পরতে । সেদিন নীল ছায়াপথ ধরে নতুন এক দর্শনে স্নাত হই আমরা। অথচ কবির ওই " সেন্সর করা ঊরু, ঊরুসন্ধি, হালকা ঝোপঝাড় ... / সেসব জ্যান্ত নয় , স্টিল কিংবা ভিডিও বা সিডি ..." । হ্যাঁ তাই তো হবার কথা । আর্থ-সামাজিক অবস্থায় একজন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলের এটুকুই যথেষ্ট ।  তাই বলে দেগে দিয়েছে । সেটুকুই 'যৌন অভিজ্ঞতা '। যৌন শিক্ষা নিয়ে একসময় দেশে-বিদেশে অনেক কথা হয়েছে । আমাদের দেশ প্রাচীন ধাত্রী ভূমি , এখানে সবই ছুৎমার্গ।

'ষোলকলা পূর্ণ '  বলে একটা কথা আছে । প্রাণ -চক্ষু -কর্ণ -নাসিকা -জিহ্বা -ত্বক , বাক -পানি -পায়ু-উপস্থ- অহংকার ইত্যাদি ।  এইসব নিয়ে কেউ যদি সৎ পথের পথিক হয় তখন সে হয়ে যায় ঈশ্বর । আর বিপরীত হলে! সেখানে মানুষের অসম্পূর্ণতাই আজকের খবরের কাগজের খবরগুলোর রসদ হয়ে ওঠে । এইতো খোলা পড়ে আছে কাগজ । আমি পড়ছি নানা হেডিং । আপত্তিকর ছবি পোস্ট , গণধর্ষণ , সোশ্যাল মিডিয়া হেনস্তা করছে অভিনেত্রীদের অথবা ... । আরো আরো আরো। হেডিং পড়তে পড়তে একসময় বিরক্তি আসে। বিবমিষা । আসলে ভাবছি আমরা পাল্টে যাচ্ছি ।
জগৎ দেখছি আর ভাবছি...। সূক্ষ্মতা  নয় , স্থূলতাই কাম্য এখন। গরল আর অমৃত মিলেমিশে তৈরি হচ্ছে সিম্ফোনি ।  কি ভাবনায় ডুবে যাচ্ছি । অসম্পূর্ণ! সম্পূর্ণ রূপটি যখন-ই ধরতে চাই , বিবেক সামনে এসে দাঁড়ায় । চার - সাড়ে চার হাজার বছরের বিবেক । যে বিবেক একই সঙ্গে প্রথম চাকরি আর তার জন্য অভিজ্ঞতাকে দাবি করে।

দ্বিতীয় তৃতীয় স্তবকের বাস্তবতা যদি ধরি , তবে সে অভিজ্ঞতা নিজেকেই প্রকাশ করে। সবকিছুর পরেও চাকরি হয় । একটা নয় , দুটো ।  প্রথমটা আর্থিক, দ্বিতীয়টা মানসিক। পরেরটার ক্ষেত্রে 'অভিজ্ঞতা লাগে না ' বলছেন কবি । সত্যি! এই অনভিজ্ঞতা নিয়েই কত হৃদয়হীনতার ঘটনা ঘটে , যা প্রতিদিনের সংবাদ হয়ে ফেরিওলার ঝাঁকায় ঘুরে ঘুরে শহর- মফসসল দেখে।

সাত পয়জার স্যালারি । অর্থাৎ চটি জুতা । চাওয়া সামান্য হতে  হতে পায়ে নেমেছে ।  আবার ওই পা থেকেই শুরু হয় যত ক্ষুধার্ত অভিযান ।
ক্ষেত্রাধিকারী হবার জন্য ক্ষেত্র অধিকার বাঞ্ছনীয়।
' হ্যাঁ গো ', ' যে কোনও '  ইত্যাদি বলে চাকরিটুকু  জুটে গেলেই ব্যাস। ' কাজ ' করি বা না করি, পারিশ্রমিক চাই ।

কবিতাটি কি কবির যৌন দর্শনের প্রতীক ।  কবিতার একটা জায়গায় পিনাকী ঠাকুর সেই কঠিন প্রশ্নটি তুলে ধরেছেন , যা আমরা বিপদে পড়ার আগে পর্যন্ত ভুলে থাকি।---
'অসভ্যতা করব কি না আসলে বিবেচ্য সে কথাই ?'

এ কবিতা পুরুষের সামাজিক থেকে মানবিক হয়ে ওঠার কবিতা।


২২.

অনাক্রমণ চুক্তি

আমাদের দেশের শস্য লুটে নিচ্ছে খরা, মানুষের হাত— যুদ্ধ শুরু এইবার। এই অস্থিরতায় ফুলের শীর্ষ কিছু চেয়ে থাকে,
থাক এই আবাস, জলধি ব্যাসার্ধ জুড়ে অন্নের বেদিপদ :
স্ত্রী-প্রিয়ের মতো আমরাও আয়ুষ্মান হবো এই যুদ্ধে। স্তুতিভাজনেরা মাতে সাধ্যমত কলহে—আমরা সামাজিক মক্ষী,
বেঘোরে মাতি না কলকল বোধিচিত্তে—
প্রকাশ্যে উল্লাস ঘোরতর অপরাধ ; তাই ভেবে ফুলেরা নিশ্চুপ।

লংমার্চ করে মানুষ ও পতঙ্গ হাঁটছে এই প্রজ্জ্বলিত ভূমে

এদিকে সাপুড়ে বাঁশির মলনে কী অশোক ঘোর এক এল
মাঠে মাঠে সব শস্য ঢলে পড়লো বাষ্পীয় বাতাসে। কিছু আগে চরাচর ফাটছিলো হাতে হাতে, রোষে; তাও এখন হয়েছে শান্ত, চুপ! লোভনীয় এই সুরে। হাহাকারে গভীর অরণ্যে শিকারি কুকুর ঢুকলো উদ্যোগী,
মৃত্যুর আগে তার মনে পড়ছে রাষ্ট্রের মঙ্গল আভাস, সে শুয়েছে এই সোমসিক্ত ঘাসে, ওপরে গড়াচ্ছে
                                   শতক্রতু মানুষের স্রোত।

"কতটা অপচয়ের পর মানুষ চেনা যায় ..."
"কত বছর মানুষ বাঁচে পায়ে শিকল পরে..."
"কতটা কান পাতলে তবে কান্না শোনা যাবে..."
" কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে
      বড্ড বেশি মানুষ গেছে বানের জলে ভেসে... "

অন্ধ সেজে থাকার অনুরাগে না দেখার অজুহাত সহজলভ্য  ! আলোক সোমের 'অনাক্রমণ চুক্তি' পড়তে পড়তে  সংগীতের এই কথাগুলি মনে পড়ে গেল ।  কবিতার শুরুতেই প্রকৃতি আর মানুষ---- দুইকেই দোষী সাব্যস্ত করেছেন কবি । তারপরেই যুদ্ধ শুরু । এই যুদ্ধ খরা এবং মানুষের হাতের বিরুদ্ধে ।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো ভবিতব্য ! তাকে পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা এখনও মানুষ আয়ত্ত করে নি। সে বন্যা বা খরা বা ভূমিকম্প । তার ক্ষতিকে ধরেই মানুষ এ জীবন এগিয়ে নিয়ে চলেছে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ।

কিন্তু ' মানুষের হাত ' । যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মানুষ শুধু দেখে 'মহাজন' কিভাবে লুট করে নেয় দেশ , দেশের নাগরিক অধিকার , আর তা থেকে ছিমছাম গার্হস্থ্য ।  কবিতায় শব্দের ব্যঞ্জনা দেখলে অবাক হতে হয় ।  'লংমার্চ ' শব্দটি এক লহমায় আমাদের পৌঁছে দেয় ঐতিহাসিক একটি ঘটনার কাছে ।  আবার একই সঙ্গে সে জানান দেয় ---- এই দীর্ঘ যাত্রা ; এক দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রত্যাশা নিয়ে তীব্র থেকে তীব্রতর বাষ্পীয় বাতাস হয়ে ওঠার কাহিনীকেও। সমর সেন 'ভগ্নস্তূপে বন্ধুর বিষণ্ণ কালের পথ' দেখেছিলেন। ----
" আমরা ইতিহাস মানি,
সংঘাতে সভ্যতা ওঠে আর পড়ে,
জানি, ব্যবসা বাণিজ্য যুদ্ধের চক্রান্তে
এ সভ্যতা চলে শ্মশান যাত্রায়,
অগণন লোক শবযাত্রী আজ।
তাই সমুদ্র ঢেউ ছোঁড়ে, মৃত নাবিকের গন্ধ
                                                হাওয়ায় ছড়ায়,
মাটি খুঁড়ে তাই মেলে হাড়ের ফসল,
অনেক স্বপ্নের ভগ্নস্তূপে বন্ধুর বিষণ্ণ কালের পথ। "
                                                              ( '২' )

' স্তুতিভাজনেরা মাতে সাধ্যমত কলহে ' । এই পংক্তিটির জন্য আমাদের দীর্ঘ অপেক্ষা চাই । কবি পৃথক করে দিয়েছেন স্তুতিভাজনদের ক্যাটাগরি । তাই কেউ বেশি , কেউ কম ।  আর তা নিয়ে বিবাদ। আমাদের অদ্ভুত প্রত্যয় রয়েছে নিজেকে নিয়ে ।
শুধু বেঁচে থাকা টুকুই যেন সব , সবকিছু । নিরোর মতো  সম্রাট বেহালা বাজাবেন , সেটাই তো স্বাভাবিক ।  এমন স্তুতিভাজনেরা থাকলে বেহালা বাজানোর লোকের অভাব হয় না ।  তবু ' প্রকাশ্যে উল্লাস ঘোরতর অপরাধ ; তাই ভেবে ফুলেরা নিশ্চুপ।'

একটা লোভের আবরণে ঢাকা পড়ে গেছি সবাই । তাই ' এখন হয়েছে শান্ত , চুপ '।  যুগে যুগে মানুষের অরণ্যে রোদন , এককথায় ' সোমসিক্ত ঘাসে ' শুয়ে থাকার মতই স্বাভাবিক । চুপ থাকাটাও আজ আর
ব্যাস্ত করে না আমাদের। শুধু  সমর সেনের সেই শ্লেষোক্তি, ' মধ্যবিত্তের  দৌড়  সুবিদিত ', ভুলে থাকতে চাইলেও মধ্যরাতের অন্ধকারে মস্তিষ্কে এসে
হানা দেয় কিছু একটা । ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করুক।
        

ছবি : বিধান দেব 

                                                                  ক্রমশ...





 

জন্মের আগের মুখ ।। চন্দন মিত্র


 

 

 

জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন কোয়ানের অমায়িক ভুবন     

 

 

নবম পর্ব

ডংশান মঠ ও চ্যানধারার তিন ঘরানা  

 

চতুর্থ আচার্য তাও সিনই পৃথিবীর প্রথম চ্যান মঠের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর হাত ধরেই চ্যান মতাদর্শ প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায়। হুয়াংমেই প্রদেশের পতোউ পর্বতের দুই চূড়ার একটিতে তিনি চ্যান মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে পতোউ অর্থাৎ ভাঙাচূড়া নামের পরিবর্তে এর নাম হয়, সুয়াংফেং বাংলায় দ্বি-চূড়া। তাও সিন-এর অন্যতম শিষ্য তথা পঞ্চম আচার্য হং-জেন, গুরুর সঙ্গে প্রায় তিন  দশক এই মঠে অতিবাহিত করেছেন। ৬৫১ খ্রিস্টাব্দে তাও-সিন-এর মৃত্যুর পর হং-জেন  সুয়াংফেং পর্বতের অপর চূড়ায় ফেংমাও অঞ্চলে চলে যান। তাও-সিনের অনুসারীদের অনেকেই  তাঁকে অনুসরণ করেন। হংজেন-এর উদ্যোগে ৬৫৪ খ্রিস্টাব্দে সেখানে গড়ে ওঠে ডংশান মঠ। এখনও এই মঠটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে উজু মঠ ( Wuju Temple ) নামে। চিনা ভাষায় ডংশান শব্দের অর্থ পূর্ব দিকের পর্বত। অবস্থানগত দিক থেকে সুয়াংফেং পর্বতকে এমন নামে ডাকা হত। এজন্য  চতুর্থ আচার্য তাও সিন প্রতিষ্ঠিত প্রথম চ্যান আখড়াটিও ডংশান মঠ নামেই পরিচিত। চ্যানধারার বিবর্তনের ইতিহাসে এই দুই ডংশান মঠের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চ্যান নথিতে এই দুই মঠকে শ্রদ্ধার সঙ্গে ডংশান ফামেন (Dongshan Famen) বা পূর্ব-পর্বতের-ধর্ম- দ্বার নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। বস্তুতপক্ষে এই দুই ডংশান মঠ যে পরবর্তী চ্যানধারার যাবতীয় ধরণগুলির আঁতুড়ঘরের ভূমিকা পালন করেছিল, সে বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। ডংশান মঠ-এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে চ্যানধারার দুটি ঘরানা গড়ে ওঠে  উত্তর ও  দক্ষিণ। এই ধারা বিভাজনের কেন্দ্রে রয়েছে বোধিলাভের পন্থা নিয়ে এক বিতর্ক। এ সংক্রান্ত এক প্রবাদ চ্যান-ইতিহাসে সুপ্রচলিত  নান-তুন পেই-চিয়েন (Nan-tun pei-chiyen) অর্থাৎ দক্ষিণের হঠাৎ, উত্তরের ধীর। দক্ষিণ-ঘরানার মতে বোধি হঠাৎ করেই ধরা দেয়, তার জন্য সূত্র বা শাস্ত্রপাঠ  আবশ্যিক নয়। কলাকৌশলও অপ্রয়োজনীয়। অন্যদিকে উত্তর ঘরানা ছিল ধীর বা ক্রমবোধিতে  আস্থাশীল। তারা মনে করত সূত্র বা শাস্ত্রপাঠ এবং নিয়মনিষ্ঠার সঙ্গে ধ্যান অনুশীলনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বোধিকে পাওয়া যায়। এই দুই ঘরানা ছাড়াও ডংশান মঠ-এর আংশিক প্রভাবে গড়ে উঠেছিল ভিন্ন এক ঘরানা  ষণ্ডমুণ্ড 

 

উত্তর-ঘরানার কথা  

৬৭৪ খ্রিস্টাব্দে পঞ্চম আচার্য হং-জেন-এর মৃত্যুর পরে তাঁর শিষ্যদের অনেকেই ডংশান মঠ ছেড়ে  চাওয়ান (Changan) ও লো-ইয়াং (Lo-yang) এই দুই রাজধানী শহরে ছড়িয়ে পড়েন। অল্পদিনের মধ্যে তাঁরা চ্যান-শিক্ষক হিসাবে বিশেষ পরিচিতি পান। তাঁদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, তাঁরা ব্যক্তি-পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের ডংশান মঠের শিক্ষা-প্রচারক হিসাবে পরিচয় দিতে বেশি পছন্দ করতেন। ডংশান মঠের অবস্থান উত্তর চিনে হওয়ার কারণে তাঁরাই অচিরে  উত্তর-ঘরানার চ্যান-শিক্ষক নামে চিহ্নিত হন। ফা-জি (৬৩৮-৬৮৯ খ্রিঃ) ছিলেন এই শিষ্যমণ্ডলীর অন্যতম প্রধান মুখ। প্রথম জীবনে ফা-জি ছিলেন হুই-মিং (Hui-ming)-এর অনুসারী। ৬৫৫-৬৫৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ফা-জি, হুই-মিং-এর সাহচর্যে নাগার্জুন-এর মাধ্যমিক বা শূন্যবাদের চর্চা করেন। পরে হুই-মিং-এর অনুপ্রেরণায় ফাজি, হং-জেন-এর শিষ্যত্ব নেন। ফা-জি, প্রায় ষোলো বছর ডংশান মঠে অতিবাহিত করেন এবং বোধিপ্রাপ্ত হন। কোনও কোনও নথিতে ফা-জি-কেই ষষ্ঠ চ্যান-আচার্য হিসাবে দেখানো হয়েছে। হং-জেন-এর মৃত্যুর পরে তিনি প্রব্রজ্যায় বেড়িয়ে পড়েন। ৬৮৩ খ্রিস্টাব্দে তাং-বংশীয় সম্রাট কাও-জং (Gao-zong) এর মৃত্যু হলে রাজধানী শহরে অরাজকতা দেখা দেয়। এইসময় ফাজি, শাওলিন মঠে  আশ্রয় নিয়ে সাধারণ সন্ন্যাসীর মতোই জীবনযাপন করতেন। শাওলিন মঠের শিক্ষক হুই-তুয়ান (Hui-tuan) তাঁকে চিনতে ভুল করেননি। তাঁর দ্বারা অনুরুদ্ধ হয়েই ফাজি, ৬৮৬ থেকে মৃত্যু অবধি টানা তিনি বছর ধরে শাওলিন মঠের ধ্যানার্থীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রেখে গেছেন। তাঁকে কেন্দ্র করে শাওলিন মঠ আবার প্রাণ  ফিরে পায়। প্রথম আচার্য বোধিধর্মের স্মৃতিবিজড়িত এই মঠটিকে তিনি পুনরায় সচল করে তোলেন। ঝিমিয়ে পড়া মঠটি আবার মনন ও শরীরচর্চার পীঠস্থান হয়ে ওঠে ; সুনাম ছড়িয়ে পড়ে দেশময়। মৃত্যুর আগে তিনি শাওলিন মঠের শিক্ষার্থীদের বলে যান, তাঁরা যেন তাঁর সতীর্থ সেনশিউ-এর নিকট শিক্ষা নেন। তিনি বিশেষভাবে কাউকে দীক্ষা দিয়েও যাননি। নিঃসন্দেহে অহংজয়ী ফা-জি-ই ছিলেন উত্তর-ঘরানার শ্রেষ্ঠ সংগঠক। তাঁকে কেন্দ্রে রেখেই উত্তর ঘরানা  চ্যানধারার প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছিল। 

       উত্তর ঘরানার আরও একটি উজ্জ্বল মুখ শেন-সিউ (৬০৬-৭০৬ খ্রিঃ)। প্রখ্যাত     কনফুসিয়ান পণ্ডিত চাং-উয়ে (Chang-yueh : 667-730) লিখেছিলেন তাঁর সমাধিলিপি। সেই ঐতিহাসিক লিপি থেকে সেনশিউ-এর জীবনকথার অনেকটাই আমরা জানতে পারি। শেন-সিউ   জন্মেছিলেন হুনান প্রদেশের ওয়েই সি অঞ্চলের এক অভিজাত পরিবারে। এমনও নথি পাওয়া যায়   যেখানে তাং রাজবংশের সঙ্গে তাঁদের পরিবারের যোগাযোগের ইংগিত আছে। ৬১৮ খ্রিস্টাব্দে হুনান (Hunan) ও শ্যানতং (Shantung) প্রদেশ মন্বন্তর ও মহামারীর কবলে পড়ে। এই বিপর্যয়   যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে না-পারায় ওই বছরেই সাং রাজাদের পতন ঘটে ও চিনের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে তাং রাজাদের উদয় হয়। শেনসিউ তখন তেরো বছরের বালক। ক্ষুধার্ত   মানুষের দুর্দশায় ব্যথিত হয়ে তিনি লোকজনকে নিয়ে মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে সরকারি শস্যভাণ্ডারে পৌঁছে যান এবং নিরন্ন অসহায় মানুষের অন্নের সংস্থান করেন। ঘটনাটি বুঝিয়ে দেয়, শেনসিউ নিছক সংসার জীবন যাপনের জন্য সংসারে আসেননি। এইসময় এক বৌদ্ধ-ভিক্ষুর সঙ্গে  সাক্ষাতের পরে তিনি প্রব্রজ্যা বেছে নেন। কয়েক বছর ধরে তিনি উ (Wu), লো-ফু (Lo-fu), তুং (Tung), মেং (Meng), লু (Lu), তিয়েন-তাই (Tientai) ইত্যাদি পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম মঠে মঠে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সন্ধানে ঘুরে বেড়ান। ৬২৫ খ্রিস্টাব্দে ২০ বছর বয়সে তিনি লো-ইয়াং-এর তিয়ান-ক্যুং (Tien-kung) মঠে বসবাস শুরু করেন। এই মঠের সঙ্গে আবার সম্রাট কাও-জং-এর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। ৬৫১ খ্রিস্টাব্দে পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই বয়সে তিনি পৌঁছান হুয়াংমেই-এর ডংশান মঠে।  চিনা ধ্রুপদী সাহিত্য, তাওবাদ, কনফুসীয় মতবাদ, মহাযান সূত্র ও শাস্ত্রের জ্ঞান নিয়ে মঠে প্রবেশের অল্পদিনের মধ্যেই তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য হয়ে ওঠেন। পঞ্চম আচার্য হং- জেন-এর কাছে বছর ছয়েক ধ্যান ও শাস্ত্র শিক্ষা করে তিনি চাওয়ান শহরের তা-চুয়াং-ইয়েন (Ta-cuyang-yen) মঠে আশ্রয় নেন। সেখানে অবস্থানের সময় তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার কথা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। দূরদূরান্তর থেকে শিক্ষার্থীরা তাঁর কাছে শিক্ষা নিতে আসে। ৬৬৭-৬৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে বৌদ্ধধর্মচর্চা রাজকীয় নিষেধাজ্ঞায় পড়লে সেনশিউ প্রায় দশ বছরের মতো আত্মগোপন করেন। আত্মগোপন পর্বের শেষের দিকটা তিনি চিংচৌ (Chingchou)-এর ই-চুয়ান (Yu-chuan) মঠে কাটান। অতঃপর অনুসারী ও অনুরাগীবৃন্দ সেনশিউ-এর জন্য নির্মাণ করেন দ্যুমেন মঠ (Dumen si)

       জীবনের অন্তিম পর্বে ৭০১ খ্রিস্টাব্দে সেনশিউ ডাক পান রাজসভায়। তাং-সম্রাট কাও-জং  –এর স্ত্রী সম্রাজ্ঞী উ-জেতিয়ান (U-zetian) তাঁকে রাজসভায় আমন্ত্রণ জানান। সেনশিউ-এর বয়স তখন চুরানব্বই বছর। এই সংবর্ধনার কথা ফলাও করে লিপিবদ্ধও করা হয় সরকারি নথিতে। সম্রাজ্ঞী তাঁকে রাজকীয় বাহিনীর কুচকাওয়াজের মাধ্যমে অভিবাদন জানানোর ব্যবস্থা করেন। সন্ন্যাসী ও সাধারণ মানুষ তাঁকে ফুল ছড়িয়ে স্বাগত জানান। এক সুদৃশ্য শিবিকা তাঁকে বহন করে আনে। পথ ঢেকে দেওয়া হয়েছিল বর্ণময় চন্দ্রাতপ ও পতাকায়। শিবিকা রাজপ্রাসাদে ঢোকার পর সম্রাজ্ঞী উ সেনশিউকে নতজানু হয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। এই প্রথম কোনও প্রসিদ্ধ চ্যান-সাধু রাজসভার সঙ্গে নির্দ্বন্দ্ব সম্পর্কে জড়ালেন। প্রতিদানস্বরূপ সম্রাজ্ঞী উ, সেনশিউকে কৌ-শি (Koushi) অর্থাৎ জাতীয়শিক্ষক খেতাব দান করেন। বোধিধর্মীয় চ্যান এমন এক বেপরোয়া আদর্শ যা জন্ম থেকেই প্রতিষ্ঠানবিরোধী। সে আদর্শ শিরোধার্য করে চ্যান-আচার্যদের কেউই রাজ-আনুগত্য দেখাননি। এমনকি তাঁদের কেউ কেউ রাজসভার আমন্ত্রণ অস্বীকার করতে গিয়ে প্রাণকে পর্যন্ত বাজি রেখেছেন। তাহলে সেনশিউ কেনই বা সম্রাজ্ঞী উ-জেতিয়ান-এর আমন্ত্রণ রক্ষা করলেন ?  তিনি কী বার্ধক্যে উপনীত হয়ে আদর্শচ্যুত হয়েছিলেন ? অথবা ভেবেছিলেন রাজ-অনুগ্রহ লাভ ব্যতীত মতাদর্শ টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়! নাকি তাঁর শরীরে বহমান নীলরক্ত তাঁকে প্ররোচিত করেছিল রাজন্যবর্গের সান্ন্যিধ্যগ্রহণে ? অন্যদিকে সম্রাজ্ঞী উ কি তাঁর স্বৈরিণীভাবকে আড়াল করার জন্য এতদিনের অনুসৃত তাওবাদকে ত্যাজ্য করে হঠাৎ অহিংস মতাদর্শে বিশ্বাসী চ্যানসাধুকে রাজকীয় সংবর্ধনা দিলেন ! প্রজাবিক্ষোভকে অহিংস ধর্মাদর্শ দিয়ে মোকাবিলা করার মনস্কামনা কী এমন ধর্মপ্রীতির প্রচ্ছদে সুগুপ্ত ছিল ? ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যাবহারের দৃষ্টান্ত তো ইতিহাসে অপ্রতুল নয়, আমাদের সাম্প্রতিক সময়ের দিকে তাকালেও উদাহরণের অভাব ঘটবে না।

       সম্ভবত শেন-সিউ, চ্যান-আদর্শকে পরম্পরিত বৌদ্ধধর্মের দিকেই পিছিয়ে দিতে চেয়েছিলেন   বোধিধর্ম যে পরম্পরিত বৌদ্ধধারা অস্বীকার করে চ্যানধারার দ্রোহীপ্রবাহ অনুসারীদের সুষুম্নাকাণ্ডে  প্রবাহিত করে দিতে চেয়েছিলেন, শেন-সিউ বোধহয় তা যথার্থভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারেননি   অথবা সেই দায়ভার বহনের দায় স্বীকার করেননি। এমনটাই হয়। দুনিয়া কাঁপানো বিপ্লব-বিদ্রোহ তো শেষমেশ গ্লানিময় পরিণতিই ডেকে আনে। সম্রাজ্ঞী উ-জেতিয়ান সিংহাসন নিষ্কণ্টক করার জন্য কারাগার ও গুপ্তহত্যার যথেচ্ছ ব্যবহার করেছিলেন; সাম্রাজ্য মুড়ে ফেলেছিলেন গুপ্তচর ও গুপ্তঘাতকে পাশাপাশি তিনি ঘটা করে বৌদ্ধধর্মের প্রচার-প্রসারেও নেমেছিলেন, নির্মাণ করেছিলেন  মহার্ঘ মঠ ও বিহার। নিজেকে তিনি মৈত্রেয় বুদ্ধের অবতার হিসাবে ঘোষণা ও দিয়েছিলেন। এমনকি তাঁর এই দাবিকে বৌদ্ধ ধর্মগুরুদের দ্বারা সমর্থনও করিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁর এই প্রকল্পের উপসংহার হল শেন-সিউ-এর রাজকীয় সম্বর্ধনা। এমনিতেই শেন-সিউ ছিলেন যথেষ্ট   খ্যাতিমান। রাজকীয় সম্বর্ধনা লাভের পর তাঁর খ্যাতি আরও বৃদ্ধি পায়। চিনের বিভিন্ন স্থান থেকে তাঁর কাছে শিক্ষার্থীরা আসতে থাকে। শেন-সিউ তাঁর জীবনের শেষ পাঁচ-ছয় বছর দুই রাজধানী  শহর চাওয়ান ও লো-ইয়াং-এ অবস্থান করেন। অগণিত শিক্ষার্থী তাঁর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। মৃত্যুর আগে শেন-সিউ তাঁর পরবর্তী আচার্য হিসাবে সুংশান ফুচি (Songshan puchi)-কে  নির্বাচন করে যান। কোনও নথিতে এমনও উল্লেখ আছে শেনসিউ তাঁর অন্য এক শিষ্য ই-ফু  (Yifu 658-736)-কেও পরবর্তী আচার্য মনোনীত করে যান। ৭০৬ খ্রিস্টাব্দে শেন-সিউ-এর মৃত্যুর  পর তৎকালীন সম্রাট চোঙজং (Zhongzong) সুংশান ফুচি-কেই শেন-সিউ-এর স্থলাভিষিক্ত করেন  ও রাজকীয় সম্মান দেন। ফুচি ছিলেন জনপ্রিয় চ্যান-শিক্ষক। চিনের বিভিন্ন স্থান থেকে তাঁর কাছে শিক্ষার্থীরা আসতে থাকেন। ৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে ৮৮ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। আদর্শনিষ্ঠ উত্তরাধিকারীর অভাবে কালক্রমে উত্তরের চ্যান ঘরানাটি নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে ও কালস্রোতে ভেসে যায়।                        

 

দক্ষিণ-ঘরানার কথা

৭৩২ খ্রিস্টাব্দের ১৫ জানুয়ারি হুয়া-তাই (Hua-tai)-এর বিখ্যাত তা-ইং (Ta-yun) মঠে এক মহা   ধর্মসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় চ্যান মতাদর্শ বিষয়ে যুগান্তকারী বক্তব্য রাখেন ষষ্ঠ আচার্য  হুইনেং-এর অন্যতম প্রধান শিষ্য শেং-হুই (Shen-hui) যুক্তি ও তথ্যের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করতে সচেষ্ট হন  উত্তর-ঘরানার চ্যান-চর্চার সঙ্গে বোধিধর্ম প্রবর্তিত চ্যানধারার কোনও সম্পর্কই  নেই। এ বিষয়ে তাঁর যুক্তি ছিল, বোধিধর্ম বোধিলাভের জন্য সূত্র বা শাস্ত্র পাঠকে গুরুত্ব না-দিয়ে ধ্যানকেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি রাজসভার সংস্পর্শ এড়িয়ে চলেছেন। আমাদেরও অবশ্য তা মান্য করা উচিত। দক্ষিণ দেশের হুইনেং অভঙ্গ-আচার্য-ধারায় বোধিধর্মের চীবর ও ভিক্ষাভাণ্ড পেয়েছিলেন পঞ্চম আচার্য হং-জেন তাঁর হাতে ওই ধর্ম-প্রতীক তুলে দিয়ে তাঁকে ষষ্ঠ আচার্যের  মনোনয়ন দিয়ে গেছেন। ন্যায়ত তিনিই বোধিধর্ম-ধারার ষষ্ঠ আচার্য। তার প্রমাণ পরম্পরিত চীবর   ও ভাণ্ড। সভায় উপস্থিত উত্তর ঘরানার প্রতিনিধি চুং-ইং (Chung-yuan) প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, অকিঞ্চিৎকর চীবর ও ভিক্ষাভাণ্ড কীভাবে ধর্ম-পরম্পরার অপরিহার্য অঙ্গ হতে পারে ? শেং-হুই এর  উত্তরে গৌতমবুদ্ধ কর্তৃক শিষ্য মহাকাশ্যপকে সোনার জরিবোনা চীবর দানের প্রসঙ্গ তুলে  ধরেন এবং বলেন, বস্তুগত ভাবে এগুলো নগণ্য হলেও একটা পরম্পরা ও বিশ্বাসকে প্রবাহিত  করার মাধ্যমে এই নগণ্য জিনিসও ধর্মের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠতে পারে বই-কি ! অতঃপর শেং-হুই উত্তর-ঘরানার উপর তীব্র আক্রমণ নামিয়ে আনেন। তিনি বলেন, উত্তর-ঘরানা বোধিধর্ম-ধারার চ্যান-প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং বোধি-সংক্রান্ত ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে ভ্রমপূর্ণ সাধনপথ বেছে নিয়েছে। উত্তর ঘরানার প্রতিনিধি চুং-ইং বলেন, হুইনেং ও শেন-সিউ উভয়েই কি  পঞ্চম আচার্য হং-জেন-এর শিষ্য নয় ? এর উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে তাঁদের চ্যান-পদ্ধতি অভিন্ন নয় কী ? শেং-হুই বলেন, মোটেও না। আমাদের আচার্য হুইনেং, হঠাৎ-বোধির শিক্ষা দিয়ে গেছেন আর শেং-সিউ বলে গেছেন ক্রমবোধির কথা যা নিছক মনকে একাত্ম ও শান্ত করার মধ্যেই  সীমাবদ্ধ। এইভাবে মনকে বাইরের প্রভাব থেকে মুক্ত করার চেষ্টা হাস্য উদ্রেকের জন্য যথেষ্ট। বিমলাকৃতি সূত্র পড়ে দেখুন, এই ধরনটা কোনোভাবেই মহাযান পথের সঙ্গে মানানসই নয়। সেদিন শেং-হুই-এর অকাট্য যুক্তির কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন, উত্তর ঘরানার প্রতিনিধি চুং-ইং। ওই মহাসভায় শেং-হুই-এর বক্তব্য থেকেই চ্যান-ধারার দক্ষিণ-ঘরানার সূত্রপাত হয়।

       Biographies of Eminent Monks (Sung kao-seng chuan) পুথিতে শেং-হুই (৬৮৪-৭৫৮ খ্রিঃ)-এর জীবনের কিছু ঘটনা স্থান পেয়েছে। অন্যান্য কিছু নথিতেও শেং-হুই গুরুত্বের সঙ্গে বিদ্যমান। জন্মস্থান সিয়াং-ইয়াং (Hsiang-yang)-এর নিকটবর্তী কুউ চাং (Kuo-chang) মঠের ধর্মশিক্ষক হা-উয়ান(Hao-yuan)-এর কাছে তিনি ধর্মসংক্রান্ত প্রাথমিক পাঠ   নেন। ষষ্ঠ আচার্য হুইনেং-এর কাছে শিক্ষা গ্রহণের জন্য তিনি চোদ্দো বছর বয়সে সাও-চি (Tsao-chi)-র উদ্দেশে রওনা হন। তবে এই পর্যায়ে তিনি ঠিক কত বছর সাও-চি-তে কাটিয়েছেন তার উল্লেখ পাওয়া যায় না। ৭০৪ খ্রিস্টাব্দের দিকে তিনি চাওয়ান-এ থাকতে শুরু করেন। এই সময় তিনি উত্তর-ঘরানার শেন-শিউ-এর নিকট তিন বছর শিক্ষা নেন। ৭০৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৭০৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তাঁর সাও-চি-বাসের তথ্য পাওয়া যায়। ৭১৩ খ্রিস্টাব্দে ষষ্ঠ আচার্য হুইনেং-এর মৃত্যুর সময় তিনি তাঁর কাছে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা যায়। ৭২০ খ্রিস্টাব্দে তিনি নান-ইয়াং(Nan- yang)-এর লুং-সিং (Lung-hsing)-এ বসবাস শুরু করেন। সেখান থেকে তাঁর জন্মস্থান সিয়াং- ইয়াং এবং রাজধানী লো-ইয়াং ছিল নিকটবর্তী। আসলে তিনি রাজধানী শহরের নিকটে থেকে গুরু হুইনেং-এর শিক্ষাদীক্ষার কথা প্রচারের আলোয় আনতে চাইছিলেন, যাতে উত্তর ঘরানার সঙ্গে যুতসই লড়াই দেওয়া যায়। ৭৩২ খ্রিস্টাব্দের তা-ইং মঠে মহা ধর্মসভায় বক্তৃতা দেওয়ার পরে  শেং-হুই রীতিমতো খ্যাতনামা হয়ে ওঠেন। রাজধানী লো-ইয়াং শহরেই তিনি পাকাপাকিভাবে বসবাস শুরু করেন। এখানেই তাঁর পরিচিত লোকজনের সংখ্যা বেশি ছিল। বিভিন্ন মঠে তাঁর যাতায়াত শুরু হয়, অধ্যক্ষদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। ৭৪৫-এর দিকে তিনি লেখালেখিতে মন দেন। লিখে ফেলেন, Record of the Manifestation of the Truth (Hsien-tsung chi) এবং Defination of the Truth (Pu-ti-to-ma nan-tsungting shih-feilun)  ৭৫৩ খ্রিস্টাব্দে শেন-হুই রাজনৈতিক দুর্বিপাকের শিকার হন। জনৈক সামরিক আধিকারিক লু-আই (lu-i)-এর গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে দুই রাজ-প্রতিনিধি শেন-হুইকে আটক করে রাজদরবারে ধরে নিয়ে যান। সম্রাট সিয়েন চোয়াং-এর সঙ্গে তাঁর বাক্য বিনিময়ের তথ্য পাওয়া যায়। আসলে লো-ইয়াং-এর বিভিন্ন মঠে এবং অন্যান্য স্থানে অনুষ্ঠিত শেন-হুই-এর সভায় ব্যাপক জনসমাগম হত। সেইসব সভায় তিনি উত্তর-ঘরানার প্রতিক্রিয়ায় অনেক সময় রাজতন্ত্রবিরোধী কথাবার্তাও  বলতেন। সেই কারণেই সন্দেহ করা হয়, তিনি বোধহয় গোপনে বিদ্রোহের বীজ ছড়াচ্ছেন। শেন- হুইকে নির্বাসন দণ্ড দেওয়া হয়। প্রথমে তাঁকে পাঠানো হয়, চিয়াংশি (Kiangsi) প্রদেশের ই- ইয়াং (I-yang)-এ, পরে হুপেই (Hupeh)-এর উ-থাং(Wu-tang)-এ পরের বছরের সুচনায় আধিকারিকরা তাঁকে নিয়ে যান, সিয়াং-ইয়াং(Hsiang-yang)-এ এবং সপ্তম মাসে নিয়ে যান, চিং-চৌ (Ching-chou)-এর কাই-উয়েন (Kai-yuan) নামক স্থানে। তবে নির্বাসনের এই স্থানটি দুটি কারণে শেন-হুই-এর মনে স্বস্তি এনেছিল। প্রথমত, স্থানটি ছিল তাঁর জন্মস্থানের নিকটবর্তী এবং দ্বিতীয়ত, স্থানটি ছিল বৌদ্ধ ধর্ম-সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান।

       লু-শান (Lu-shan) বিদ্রোহ চিনের ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। ৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে শুরু হওয়া এই বিদ্রোহ তাং বংশের রাজত্বকে হুমকির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। বিদ্রোহীদের হামলার মুখে দুই রাজধানী শহরের বাড়িঘর, মঠ-বিহার তছনছ হয়ে যায়। রাজকোষে অর্থসংকট  দেখা দেয়। এইসময় সম্রাট সিয়েন-চোয়াং অর্থের ঘাটতি পূরণের জন্য নতুন বিল আনেন। এই  বিল অনুযায়ী ঘোষণা করা হয়, সমস্ত ধর্মপ্রচারকদের সরকারি নথিতে নাম লেখাতে হবে। এজন্য তাঁদের সূত্রপাঠের যোগ্যতায় উত্তীর্ণ হয়ে ১০০ চিনা মুদ্রার বিনিময়ে সরকারি শংসাপত্র সংগ্রহ করতে হবে। বার-দুয়েক এড়িয়ে যাওয়ার পরে শেষে একপ্রকার বাধ্য হয়েই শেন- হুই সেই সরকারি প্রকল্পে অংশ নেন। আর আশ্চর্যের বিষয় এই যে অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে তিনি প্রভূত  অর্থ সংগ্রহ করে রাজকোষে তুলে দেন। তাঁর প্রদত্ত অর্থ, দুই রাজধানী শহরের পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করেছিল। প্রতিদান স্বরূপ সম্রাট সিয়েন-চোয়াং শেন-হুই-এর উপর ন্যস্ত যাবতীয়  নিষেধাজ্ঞা খারিজ করে দেন। শুধু তাই নয়, তাঁকে প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানিয়ে বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করেন। যে শেন-হুই উত্তর-ঘরানাকে যারপরনাই সমালোচিত করেছেন রাজ-সভার সঙ্গে সম্পর্ক  গড়ে তোলার জন্য, সেই শেন-হুইকে-ই কিনা জীবনের অন্তিম পর্বে রাজসভার ক্লিন্ন ছায়ায় দাঁড়িয়ে শিরোধার্য করে নিতে হয় রাজকীয় স্তোকস্তুতি ! জীবন বোধহয় এমনই আশ্চর্য এক ঘটনা প্রবাহের সমাহার !  

                  

ষণ্ডমুণ্ড ঘরানার কথা

ষণ্ডমুণ্ড ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা ফারং (৫৯৪-৬৫৭ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন বর্তমান কিয়াংসু প্রদেশের চিয়াং অঞ্চলের বাসিন্দা। কৈশোরে তিনি তাওবাদ ও কনফুসীয় মতবাদের চর্চা করে হতাশ হন। আসলে তিনি চেয়েছিলেন এক সমুন্নত জীবনদর্শন যার সন্ধান, তাঁকে এই দুই দর্শন দিতে পারেনি।    অতঃপর নির্বাণসূত্র পাঠ করে তিনি জীবন সম্পর্কিত এক নতুন দিশা অর্জন করেন। তিনি উপলব্ধি করেন, প্রজ্ঞা এমন এক নৌকা যার সওয়ারি হয়ে অজ্ঞতার তীর থেকে অনজ্ঞতার তীরে উতরে যাওয়া যায়। ১৯ বছর বয়সে তিনি মাথা মুড়িয়ে মুক্তির সন্ধানে বেড়িয়ে পড়েন। বেড়াতে বেড়াতে তিনি পৌঁছান মাও (Mao) পর্বতে। সেখানে তিনি কুই-ফা-শি (Kuei-Fa-shih) নামক জনৈক ভিক্ষুর কাছে দীক্ষা নেন। কিছুকাল তিনি সান-লুন (San-lun) মঠে থেকে প্রজ্ঞাপারমিতাসূত্রও চর্চা করেন। তিয়েনতাই (Tien-tai) মঠেও তাঁর অবস্থানের কথা জানা যায় অতঃপর ৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি  পৌঁছে যান নিউতউ (Niutou) পর্বতের নির্জনতায়। সেখানে তিনি ই-শি (Yi-shi) মঠের  পিছনে একটি পাথুরে ঘর বানিয়ে বসবাস শুরু করেন। দিনের পর দিন কাটে ধ্যানমগ্নতায়। ফারং-এর প্রকৃতিনিষ্ঠ জীবনযাপনে মুগ্ধ হয়ে পাখিরা ঠোঁটে করে ফুল এনে তাঁকে উপহার দেয়। একসময় এই প্রচারবিমুখ আত্মমগ্ন মানুষটির কথাও জনপদে ছড়িয়ে পড়ে, অনুসারীও জুটে যায় চিনা ভাষায় নিউতউ শব্দের অর্থ ষণ্ডমুণ্ড অর্থাৎ ষাঁড়ের মাথা, এই শব্দের অনুষঙ্গে তাঁর নাম হয় নিউতউ ফারং বা ষণ্ডমুণ্ড ফারং।  

       একদা চতুর্থ আচার্য তাও-সিন চললেন ষণ্ডমুণ্ড ফারংকে দেখতে। তাঁকে অনেকেই নিষেধ করেছিলেন, সাবধান করে দিয়েছিলেন এই বলে যে, ফারং কারও সঙ্গে আলাপ করতে চান না; অনেকেই তাঁর কাছে পৌঁছেও ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে এসেছেন। দুর্গম পার্বত্য পথ অতিক্রম করে অবশেষে তাওসিন পৌঁছে যান ফারং-এর কাছে ; দেখেন ফারং একটি পাথরের উপর ধ্যানস্থ হয়ে  বসে আছেন। তাও-সিন-এর উদ্যোগে শুরু হয় কথোপকথন।  

আমাকে মার্জনা করবেন, আমি জানতে চাই আপনি ওইভাবে বসে কী করছেন ?                      

ফারং  আমি মনকে ধ্যানস্থ করছি।                   

তাও-সিন  আমি জানতে চাইছি কে কাকে ধ্যানস্থ করছে ? যে মনকে ধ্যানস্থ করার কথা বলা হচ্ছে, সেই মনটাই বা কী ?

ফারং বুঝলেন এ কোনও সাধারণ ভিক্ষু নয়, এ যথেষ্ট পরিশীলিত ও প্রাজ্ঞ। তিনি কী উত্তর দেবেন ভেবে পেলেন না। ফলে পুনরায় আর এক দফা কথোপকথন শুরু হল এবার উদ্যোক্তা  স্বয়ং ফারং।

আপনি কোথায় থাকেন ?

তাও-সিন  আমার নির্দিষ্ট কোনও আস্তানা নেই। আজ এখানে তো কাল ওখানে, এইভাবেই চলে।

ফারং  আপনি কি আচার্য তাও-সিন-এর নাম শুনেছেন ?

তাও-সিন  আপনি তাঁর কথা জানতে চাইছেন কেন ?

তাও-সিন  আমি তাঁর মাহাত্ম্যের কথা অনেক শুনেছি। আমি তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে চাই।

তাও-সিন  আমিই তাও-সিন।

ফারং, চমকিত হলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ পাথুরে আসন ত্যাগ করে তাওসিনকে যথাযথ অভিবাদন  জানালেন, সেই সঙ্গে চা-পানের অনুরোধ করতেও ভুললেন না। এমন সময় খুব কাছেই কোথাও  বাঘের গর্জন শুনে তাও-সিন একটু ঘাবড়ে গেলেন। ফারং মৃদু হেসে বললেন, বুঝলাম ওটা এখনও আপনার মধ্যে এখনও টিকে আছে। তাওসিন কিছুই বললেন না। ফারং চা বানাতে  গেলেন। সেই অবসরে তাওসিন, ফারং-এর পাথুরে আসনের উপর বড়ো করে লিখে দিলেন ‘বুদ্ধ’। ফারং চা নিয়ে ফিরলেন। পাথুরে আসনে বসতে গিয়ে ‘বুদ্ধ’ শব্দে তাঁর চোখ আটকে গেল, তিনি অন্য একটি পাথরের উপর বসলেন। তাও-সিন হাসি মুখে বললেন, দেখছি এটা এখনও আপনার মধ্যে বেঁচেবর্তে আছে। তাও-সিন-এর এই কথায় ফারং বোধিপ্রাপ্ত হলেন। লোকে বলে এই ঘটনার  পর থেকে পাখিরা তাঁর জন্য আর ফুল বয়ে আনত না।

       ষণ্ডমুণ্ড ঘরানা খুব বেশিদিন স্থায়িত্ব লাভ করেনি। সপ্তম শতাব্দীর শেষে সূচিত হয়ে নবম শতাব্দীর সূচনায় ঘরানাটি অবলুপ্ত হয়। নিউতউ ফারং এই ঘরানার প্রথম আচার্য এবং অষ্টম তথা শেষ আচার্য ছিলেন চিং-শান (৭১৪-৭৯২ খ্রিস্টাব্দ)। বোধিধর্মের চ্যানধারার সঙ্গে ষণ্ডমুণ্ড ঘরানার প্রত্যক্ষ কোনও যোগাযোগ ছিল না, এমনকি চতুর্থ আচার্য তাও-সিন-এর সঙ্গে ফারং-এর সাক্ষাৎ হয়েছিল কিনা এ নিয়েও বিতর্ক আছে। তবে ষণ্ডমুণ্ড ঘরানার চতুর্থ আচার্য ফা-চি (Fa-chih) ও  তাঁর প্রধান  শিষ্য চি-ওয়েই (Chih-wei) যে, বোধিধর্ম-ধারার পঞ্চম আচার্য হং-জেন-এর সঙ্গে   যোগাযোগ রেখে চলতেন এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নথি আছে। ষণ্ডমুণ্ড ঘরানা কেবল চিনের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ ছিল না। নবম শতাব্দীর প্রথম দিকে সাইচো (৭৬৭-৮২২ খ্রিঃ) নামের জনৈক জাপানি ভিক্ষু ধর্মচর্চার জন্য চিনে গিয়ে ষণ্ডমুণ্ড ঘরানাকে জাপানে পৌঁছে দিয়েছিলেন। উত্তর ও দক্ষিণ ঘরানার মাঝে দাঁড়িয়ে ষণ্ডমুণ্ড ঘরানা স্বাতন্ত্র্য-চিহ্নিত একটি নাম। উত্তর-দক্ষিণ ঘরানা যখন প্রাধান্য বিস্তারের লড়াইয়ে নেমেছে রাজধানী শহরের নাগরিক আবহে, তখন ষণ্ডমুণ্ড ঘরানার সাধকেরা নিউতউ পর্বতের নির্জনতায় বুদ্ধ-প্রকৃতি অর্জনের নিরলস সাধনায় ব্যাপৃত থেকেছেন এক অলোকসামান্য আত্মমগ্নতায় ।  

 

 

তথ্যসূত্র : 

1.SUDDEN AND GRADUAL : APPROACHES  TO  ENLIGHTENMENT  IN  CHINESE THOUGHT  EDITED  BY  N.  GREGORY, UNIVERSITY  OF  HAWAI  PRESS,  HONOLULU  1987.

2. ZEN BUDDHISM :  A  HISTORY  INDIA  AND  CHINA  BY  HEINRICH  DUMOULIN  TRANSLATED BY  J. W. HEISIG AND PAUL KNITTER ; MACMILLAN PUBLISHERS COMPANY, 1988.

3. THE NORTHERN SCHOOL AND THE FORMATION OF EARLY CHAN BUDDHISM BY JOHN R. MACRAE , UNIVERSITY OF HAWAII PRESS  HONOLULU, 1986.

4. SEEING THROUGH ZEN BY JOHN R. MACRAE UNIVERSITY OF CALIFORNIA PRESS , 2003.

5. ZEN MASTERS OF CHINA : THE FIRST STEP EASTBY RECHARD BRYAN MC DANIEL; TUTTLE PUBLICATION, TOKYO/ VERMONT/ SINGAPORE.

6. THE PLATFORM SUTRA OF THE SIXTH PATRIARCH BY JOHN R. MC RAE; NUMATA CENTER FOR BUDDHIST TRANSLATION AND REASEARCH, BARKELY, CALIFORNIA, AMERICA.

7. THE PLATFORM SUTRA : THE ZEN TEACHING OF HUINENG BY RED PINE ; COUNTERPOINT, BARKELY, CALIFORNIA, AMERICA.

. TRANSMISSION AND ENLIGHTENMENT IN CHAN BUDDHISM SEEN THROUGH THE PLATFORM SUTRA BY MORTEN SCHLUTTER ; TAIPEI CHUNG – HWA INSTITUTE OF BUDDHIST  STUDIES.      

9.. ZENS CHINESE HERITAGE BY ANDY FERGUSON ; WISDOM PUBLICATION, BOSTON.

 

10. THE ILLUSTRATED ENCYCLOPEDIA OF ZEN BUDDHISM BY HELEN J. BARONI ; THE ROSEN PUBLICATION GROUP , NEW YORK.



ছবি : বিধান দেব 

                                                                       ক্রমশ...

 

 


কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...