ভাষা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান ভাসা ভাসা। আমি অবশ্য ভাষাবিদদের কথা বলছি না। সাধারণ মানুষ নিজের মাতৃভাষাকে নিতান্ত একটি পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। জন্মের পর দাঁত যেমন মানুষের আপনা আপনি গজায় মাতৃভাষাও তেমনই মাতৃদুগ্ধ পান করতে করতে আমাদের জিভের ডগায় এসে যায়। আর সে জন্যই দাঁত থাকতে আমরা যেমন দাঁতের মর্যাদা বুঝি না তেমনই মাতৃভাষাও আমাদের কাছে হেলাফেলার বিষয় হয়ে ওঠে। কিন্তু মাতৃভাষাই একটা জনগোষ্ঠীকে জাতির মর্যাদা দিয়ে থাকে। আমরা যে বাঙালি জাতি তার কারণ আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। যখন প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষার স্তর পার হয়ে মধ্য ভারতীয় আর্যভাষার পূর্ব ভারতীয় শাখা মাগধী প্রাকৃত বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা-আসাম এই বিরাট ভূখণ্ডের ভাষারূপ ছিল তখন আমরা কেউ নিশ্চিতরূপে বাঙালি-বিহারী-ওড়িয়া-অসমিয়া ছিলাম না।তখন নিশ্চয়ই আমরা প্রত্যেকে নিজের নিজের মতো করে একটা ভবিষ্যত আইডেনটিটি খুঁজে চলেছিলাম। ভৌগোলিক পরিবেশ, ঐতিহাসিক বিষয় আশয়, খাদ্যাভ্যাসের ভিন্নতা, পৃথক জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্য, ভিন্ন সাংস্কৃতিক আচার আচরণ, রাজনৈতিক অবস্থার ভিন্নতা, ধর্মীয় বোধের ভিন্নতা ধীরে ধীরে একেকটা জনগোষ্ঠীকে পৃথক করে তুললেও শুধুমাত্র ভাষার পৃথকত্বের জন্য পৃথক পৃথক জাতি হিসেবে চিহ্নিত হতে আরও বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। মাগধী প্রাকৃত মাগধী অপভ্রংশ ও অবহটঠের স্তর পেরিয়ে যতদিন না পূর্বী ও পশ্চিমা এই দুটি শাখারূপ নিল এবং তার পর আরও বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হবার পর পশ্চিমা ভেঙে ওড়িয়া ও ভোজপুরী এবং পূর্বী ভেঙে বাংলা ও অসমিয়া শাখা জন্ম নিল ততদিন বাঙালি কোথায়? অর্থাৎ একসূত্রে একটা জনগোষ্ঠীকে বেঁধে একটা জাতির জন্ম দেয় ভাষা। একটা জাতিকে আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে তার ভাষাকে পঙ্গু করে দেওয়ার চক্রান্ত রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। যখন যে জাতি অন্য জাতির ওপর রাজত্ব করে তখন রাজা হিসেবে তার নিজের ভাষাকেই চাপিয়ে দেয় বিজিত জাতির ওপর। সরকারী যে কোনও কাজে অংশগ্রহণের জন্য মাতৃভাষাকে দূরে ঠেলে তখন রাজভাষাকে আপন করতে বাধ্য হয় মানুষ। ভাষার আগ্রাসন একটা জাতিকে অধঃপতিত করার জন্য সবচেয়ে সাধারণ ও সামান্যতম কৌশল। বাহুবলের মতো ভাষাকেও আত্মগৌরবের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পৃথিবীর এমন কিছু মানুষ আছে যারা মাতৃভাষাহীন। কারণ তাদের মাতৃভূমি অন্য ভাষাগোষ্ঠীর মানুষের দখলে চলে গেছে। মাতৃভাষাহীন একজন মানুষ আত্মপরিচয়হীন। ইংরেজ একসময় প্রায় সমগ্র বিশ্বে প্রভুত্ব করেছে বলে ইংরাজী ভাষার কাছে আমরা আজও পরাধীন। আমরা যতই নিজেদের স্বাধীন মনে করি না কেন ভাষার শাসনে ইংরাজীর দাসত্ব করে যেতে হচ্ছে এখনও। ইংরাজী ভাষা প্রভুর ভাষা। গোটা বিশ্বকে তা মাথা নত করিয়েছে। কারণ আমরা মনে করি মুখের গ্রাস অর্জন করতে হলে ইংরাজী ভাষা শিখতে হবে। ইংরাজী ও হিন্দী ভাষার আগ্রাসন বর্তমান বাঙালিকে দিশেহারা করে দিচ্ছে। আমরা যারা বাংলা ভাষার সপক্ষে গলা ফোলাই তাদের অধিকাংশের সন্তানই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে এবং তাদের বেশিরভাগেরই দ্বিতীয় ভাষার স্থান আলোকিত করে থাকে হিন্দী। আমরা আগে ভারতীয় তারপর বাঙালি নাকি আগে বাঙালি তারপর ভারতীয় এই জাতীয় দুর্বলতাবোধের অন্ধ গোলকধাঁধায় না ঘুরে বরং কিছুটা স্বাজাত্যাভিমান পুনরুদ্ধার করতে পারলে মন্দ হয় না। ভাষার জন্য মানুষ যেমন শহীদ হয়েছেন তেমনই ভাষাকে টিকিয়ে রাখতেও মানুষকে সবসময় লড়ে যেতে হচ্ছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার যে মর্যাদা আমরা পশ্চিমবঙ্গবাসীরা কি আমাদের মাতৃভাষাকে সেই মর্যাদা দিতে সদা প্রস্তুত? আমাদের সংস্কৃতির সত্যের সঙ্গে আমাদের ভাষার সত্য আজ একইভাবে বিপদগ্রস্ত নয় কি?

অত্যন্ত সুলিখিত সম্পাদকীয়। বাংলা ভাষার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে দায়িত্ব নিতে হবে শিক্ষিত বাঙালীকেই। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মাতৃভাষার গুরুত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে আমাদের এখন থেকেই সচেতন হতে হ।।
উত্তরমুছুন