বাংলা ভাষা ও বাঙালির কৃষ্টি
সংস্কৃত ভাষা থেকে স্বাভাবিক বিবর্তনের পথ ধরে পালি , প্রাকৃত , অপভ্রংশ , দেশীয় ভাষার উৎপত্তি হয়। তাই বাংলার প্রাচীন ভাষা- নিদর্শন চর্যাপদ এর সঙ্গে পাওয়া গেছে সরহ ও কাহ্নের ' দোঁহা ' এবং ' ডাকার্ণব ' , যেগুলি শৌরসেনী অপভ্রংশ ভাষায় রচিত । অর্থাৎ একই কবি দুই ভাষায় কবিতা রচনা করেছেন।
ভাষার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা লিপির কথা বলা উচিত। মৌর্য সম্রাট অশোকের ব্রাহ্মী লিপি থেকে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের নানা বর্ণমালার জন্ম । এ প্রসঙ্গে রমেশচন্দ্র মজুমদার জানাচ্ছেন , ---
" পূর্ব ভারতীয় বর্ণমালায় বাংলা বর্ণমালার পূর্বাভাস পাওয়া যায় । প্রথম মহীপালের বাণগড় লিপিতে ব্যবহৃত অ,উ,ক, খ ,গ, ধ,ন,ম,ল এবং ক্ষ অনেকটা বাংলা অক্ষরের আকার ধারণ করিয়াছে। জ একেবারে সম্পূর্ণ বাংলা ' জ ' য়ের অনুরূপ। দ্বাদশ শতাব্দীতে উৎকীর্ণ বিজয়সেনের দেওপাড়া প্রশস্তিতে যে বর্ণমালা ব্যবহৃত হইয়াছে , তাহার মধ্যে ২২টি পুরাপুরি অথবা প্রায় বাংলা অক্ষরের মত। "
প্রাচীন বাংলার তাম্রশাসন ও পুঁথি প্রচলিত বাংলা অক্ষরে লেখা হত। কিন্তু সহস্রাব্দ প্রাচীন সেই ভাষাকেও একদিন সংকটের মুখোমুখি পড়তে হয়।
১৯৫২ সালে তদানীন্তন পূর্ব বাংলায় গণআন্দোলনের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হয় । পরবর্তীতে (১৯৬১ ও ১৯৭২) আসামের বরাক উপত্যকার শিলচর ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় ওই একই দাবিতে আন্দোলন সংগঠিত হয় । রফিক , বরকত, জব্বার, শফিউর থেকে কানাইলাল , চণ্ডীচরণ , হিতেশ , বীরেন্দ্র , বিজন , কমলা প্রমুখের শহীদ হওয়ার মধ্যেই প্রকাশ পায় বাংলা ভাষার গুরুত্ব ।
কিন্তু ভাষা তো প্রতিটি জাতির সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্র , তাতে সন্দেহ নেই । একটা ব্যপার ভুলে গেলে চলবে না , এই ভাষার সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে সেই মানুষগুলির কৃষ্টি-সংস্কৃতি। এরা একে অপরের সঙ্গে ঘনসন্নিবদ্ধ । বাংলা ভাষার সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির কৃষ্টি নিয়ে সচেতন হবার সময় এসেছে।
গঙ্গা-পদ্মা বিধৌত এই বাংলার মাটি । ভূমি উর্বর।
' বীজমাত্রই এখানে সজীব হয়ে ওঠে । ' এই সজীবতা প্রাণ ধর্মের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য । ভূমি কঠিন নয় বলেই গুরুভার এই দেশে সহ্য হয়না । মানুষ গড়ে উঠেছে তার স্বাভাবিক সাধনা নিয়ে । ' সুকুমার
সূক্ষ্মতাবোধ ' এখানকার একটি বিশেষত্ব। তাই হিংসা বিদ্বেষ এই অঞ্চলের মানুষ বর্জন করেছেন ' সবার উপরে মানুষ সত্য ' নীতিকে আঁকড়ে ধরে । ' বাংলার সাধনা ' গ্রন্থে ক্ষিতিমোহন সেন জানাচ্ছেন বাঙালির অন্তর্লোকের সেই মুক্তিস্বরূপিণী চিন্তাকে । ----
"এইজন্যই এই যুগেও বাংলাদেশে একে একে রামমোহন , মহর্ষি , পরমহংসদেব , বিবেকানন্দ, অরবিন্দ প্রভৃতি সেই একই সত্যকে বারবার ঘোষণা করে গেছেন , সে সাধনা এখনো চলেছে। হিংসাবিদ্বেষ- জর্জরিত এই যুগে তাই বিধাতা একের পর এক সাধককে এই বাংলাদেশ পাঠিয়েছেন। সমস্ত বিশ্বের জন্য তাঁদের প্রয়োজন । রবীন্দ্রনাথও এইজন্যই এসেছিলেন । রবীন্দ্রনাথ চলে গেলেন, কিন্তু তাঁর সাধনা দেশের বুকে চিরকালের জন্য রেখে গেলেন। "
বাঙালির ভাষা -কৃষ্টি তার ধর্ম ও দর্শনকে গ্রহণ করে গড়ে উঠেছে একে একে । " এখানকার উপযুক্ত সাধনা হল ব্যাহৃতি-মন্ত্র ' ভূর্ভুবঃ স্বঃ '। অর্থাৎ স্বর্গ- মর্ত্য -অন্তরীক্ষ-বিশ্বচরাচরে বিস্তৃত হোক আমাদের ধ্যান। "--- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । ধর্ম থেকে ভক্তি, সুর থেকে বাণী সর্বত্র এই সাধনাই আমরা লক্ষ্য করি ।তাই উত্তর ভারতের রামচন্দ্র ভাগীরথী তীরে এসে হয়েছেন ' রঘুকুলগুরু'। ধোয়ীর এই কথার সমর্থন পাই কৃত্তিবাস রচিত ' শ্রীরামের পাঁচালী '- তে। মূল রামায়ণের বীর রামচন্দ্র কৃত্তিবাসে ভক্তের ভগবানে পরিণত হন । অন্যান্য চরিত্রগুলিও ' বাঙালি সংস্কৃতিরই পরিচায়ক ' হয়ে ওঠে । " ভক্ত তুলসীদাস যেমন পরবর্তী কালে উত্তর -ভারতে রামকথার এক নূতন রূপ দিয়েছিলেন , তাঁর আগে কৃত্তিবাস বাংলাদেশে তারই সূচনা করেছেন । বস্তুতঃ কৃত্তিবাসী রামায়ণ ভক্তিগ্রন্থেই পরিণত হয়েছে , এতে যে রামনামতত্ত্ব প্রচারিত হয়েছে, তাই চৈতন্যযুগে নতুন রূপে ও পরিবেশে অভিনব তাৎপর্য লাভ করেছে। "--- অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়।
বাঙালির এই কৃষ্টির সঙ্গেই আজ আমাদের সাধন পথকে উন্মুক্ত রাখার সময় এসেছে।
ছবি : বিধান দেব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন