সা ধ ন প র্বে র নি র্জ ন তা
৭.
ধৈর্য
একটা কালো ছাতার নীচে আমরা বসে আছি
স্ত্রীকে বলছি ঝড় এলে বিচলিত না হতে
ছেলেকে বলছি বৃষ্টি এলে ছাতার নিচে গুটিসুটি
এক শীতকালের রাত্তিরে ফুলে উঠছে মেঘ,
একটা কালো ছাতার নীচে
বেপরোয়া ধৈর্য নিয়ে বসে আছি
জীবন কবিকে যা দেয় , কবিও তাই ফিরিয়ে দেন জীবনকে । এই বোধ থেকেই দেবদাস আচার্য বলেন, ' এর বেশি শিল্প আমি পারি না , এর বেশি অঙ্গীকার আমি করিনি । '
' ধৈর্য ' কবিতাটি পড়ার পর একটা ছবি চোখের সামনে বড় বেশি ফুটে উঠতে থাকে । বাংলাদেশ থেকে চলে আসা উদ্বাস্তু পরিবার আর তাদের শূন্য দৃষ্টি । বাংলাদেশের বিরাট পরিবার থেকে উদ্বাস্তু হয়ে এদেশে আসেন তাঁরা । সেই নিঃস্ব জীবনের প্রত্যক্ষদর্শী সে। তাঁদের বেঁচে থাকার লড়াই , তাঁর কবি হয়ে ওঠার পথ---- সব যেন সময়- চিহ্নিত । মনে পড়ে , আমার বাবা-জ্যাঠার কথা। কীভাবে দুর্ভিক্ষ আর দেশভাগের যন্ত্রণাকে তাঁরা একপ্রকার চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে গেছেন পরদেশে। ধীরে ধীরে , ধীরে ধীরে এই দেশ তার স্বজন হয়েছে , আশ্বস্ত হয়েছেন জীবনের সম্বলটুকু পেয়ে। অর্থনৈতিক পুনর্বাসন , শিক্ষা আর আশ্রয় ---- এই ছিল তাদের সামান্য চাহিদা।
কবিতায় ধরা পড়েছে সেই স্মৃতি ও ভবিষ্যতের কথা। ' কালো ছাতা ' যেমন আশ্রয়ের প্রতীক , আবার তার রঙে রয়েছে এক ধরনের বিষাদ । সেই ছাতাকেই যা হোক আশ্রয় করে নিয়েছেন কবি। স্ত্রী-পুত্র নিয়ে এ কি তাহলে তাঁবু জীবন । যে জীবন রানাঘাট নৈহাটি খড়দহ রাজারহাট যাদবপুর চকপাড়ায় গড়ে উঠেছিল ।
নাকি অতীতের নিশ্চয়তার কথা মনে পড়ে এমনটা বলেছেন । যে কারণেই ' রাত্তিরে ফুলে উঠছে মেঘ ' বলে ' বিপদআপদ ' শব্দটি জুড়ে দিয়েছেন কবি। কারণ , নিশ্চিন্ত ঐ জীবন তো শীত ঋতুর মতোই শান্ত নরম ছিল । ছিল পারস্পরিক সৌহার্দ্যের। কিন্তু সেই ঋতুতেও প্রকৃতি অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে । তার উথালপাথাল শতশত পরিবারকে ছিন্নমূলে পরিণত করে । হাহাকার আর যন্ত্রণায় ডুবে যায় স্বাধীনতার আনন্দ । চারদিকে আলোর রোশনাই-এর মধ্যে এক টুকরো কালো ছাতার মতো সারি দেওয়া অস্থায়ী তাঁবু । সব হারানো মানুষগুলো শুধু জানে একটি শব্দের অর্থ ---- ধৈর্য ।
বেপরোয়া ধৈর্য নিয়ে বসে থাকতে হয় সব হারানো মানুষগুলোকে । মরে যাওয়া মানে তো জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া । পরাজয়ের গ্লানি স্মরণযোগ্য নয়। বরং ওই ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে দিতে ...
সারদা মা বলেছিলেন , যে সয় সে রয় । সত্যি , আমরা তো রয়ে গেলাম । এবং এই থাকা নিত্য দিনযাপনের কিছু বেশি । সত্তার ক্রমোন্নতি।
৮.
এই আমি চাই
রামগিরি পাহাড়ের যক্ষ নয়---- আমি
যেন সিংভূমের কৃষকের চোখে দেখি মেঘ ,
কোন বার্তা নয় ,শুধু আর্তকণ্ঠে বলি জল দাও ,
আমার কবিতা হয় যে সময়ে
সবুজ ধানেতে জমে দুধ
লক আউট প্রত্যাহারে আবার মেশিন হয় চালু
আবারো কলের ঘোরে চাকা
কুটির শিল্পে যদি লাভ হয় দুই পাঁচ টাকা ,তবে
তাহলেই গান গাইবো সকলের সুখের নবান্নে
উৎপন্ন দ্রব্যের বেচাকেনা রবি শস্যে ধান্যে,এই ---
অথচ কি যে হয়, মাঝে মাঝে ঘুলিয়ে ওঠে হাওয়া ঘুঘু কালোবাজারীরা বানচাল করে দেয় দরদাম খাবারে মিশোয় ভেজাল , এমন কি ওষুধেও
নিকটবর্তী ল্যাম্পপোস্টে ঝোলে বন্ধের নোটিশ
জমে ওঠে বিশাল জনতা ঠিক মে মাসেই।
মে-দিনের সেই বিশাল মিছিলে শামিল আমি
ওড়াতে চেয়েছি শার্ট নয় ---- আমার রক্তমাখা আত্ম।
কালিদাসের সময় আমরা পার হয়ে এসেছি। 'মেঘদূত ' - এর যক্ষ অত্যধিক পত্নীপ্রেমের কারণে নিজের কর্তব্যকর্মে অবহেলা করে। ফলস্বরূপ তাকে সমস্ত ক্ষমতা শূন্য পত্নীবিরহিত জীবন কাটাতে হয় রামগিরির আশ্রমে । অভিশপ্ত যক্ষের বিরহবেদনা শ্রাবণ মেঘের সাহায্য নেয়। নিজের কুশল বার্তা প্রেরণ করে প্রিয়াকে । সেখানে জলধর প্রেমের ইচ্ছাপূরণের সঙ্গী। কিন্তু এই কবিতায় তুষার রায় ভাবনাটাকে সম্পূর্ণ ওলট - পালট করে দিয়েছেন। সিংভূমের কৃষকের চোখ দিয়ে তিনি দেখাতে চান তার অভীষ্টকে। যে লক্ষ্য অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের সঙ্গ দাবি করে।
মে দিবসের ভাবনা এই লেখাটির গঠনকে তৈরি করেছে । কোনও রকম ফ্যান্টাসির জগতে তিনি বিচরণ করতে চান না । লক আউট , কুটির শিল্পের খরা, অনাবৃষ্টি , কালোবাজারির দৌরাত্ম্য ---- এসব দেখে দেখে ভয়ে শঙ্কায় রাগে তার কলম অগ্নিবর্ষী হয়ে ওঠে । এর প্রতিকার চাই । চাই নতুন এক সমাজ বিপ্লবের । তাই মে মাস অথবা দিবসটি ব্যঞ্জনাধর্মী এখানে।
কবিতাটি পড়তে পড়তে অনেকগুলো কথা মনে ভিড় করে আসে । তাদের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে অবশ্যই । তা না হলে হলে এমনভাবে বারে বারে অস্তিত্বের জানান দেবে কেন ! আপসকামী রাজনীতি একদিন নিজেকেই গিলে ফেলে । সে তার শক্তি পরীক্ষা করতে করতে নিজের ভেতরে প্রবৃষ্ট হয় এবং রহস্যকাহিনীর মত সত্যকে ছদ্ম- আড়ালের মধ্যে রেখে মানুষকে ' অন্য ' কথা বলে । আসলে আমরা তো এখনো বণিকশাসনে বদ্ধ ।তাকে ছিন্ন করে নতুন এক সমাজ তৈরি করব , এমন ' ইউটোপিয়া ' শুধু দেখাই হয় , কাজে-কর্মে কখনো নয় । তাই বামপন্থী দলগুলির ' ঐতিহাসিক ভুল '-এর সংখ্যা বাড়তে থাকে । বাড়তে বাড়তে সে সমস্ত ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যায় ।
হঠাৎ কেন জানি জয়দেব বসুর ' মেঘদূত '-এর কয়েকটি ভাবনা মনে এলো ----
"এগোও এগোও মেঘ, শুধু এ চূড়া নয়,
সারাটা দেশ জুড়ে বালুকাতাপ শহরে - গঞ্জে সেই শিশিরসিক্ততা কবেই অপহত,
জমাট - অন্ধ - মূক মূর্ত হয়ে ওঠে যত্নে কুঁদে তোলা
তন্বী ডোমনী তার গভীর কামরূপে লাস্যে খুলে দেয়
এ যেন সেই ভয় ধরানো সময় । যে সময়ে সবকিছু কালো এবং বিষাক্ত । সৃষ্টিকর্তা তাঁর সৃজনের মাঝে যেটুকু সুযোগ আমাদের জন্য রেখেছিলেন , তা-ও আমরা আত্মমুগ্ধতায় বশবর্তী হয়ে নষ্ট করেছি। নিজস্ব বলয় থেকে বেরিয়ে আসিনি কেউ-ই । একদল আসেনি ভয়ে । আর অন্য দল স্বার্থচিন্তায়।ফলে দুয়ে দুয়ে বাইশ হয়ে দাঁড়িয়েছে । আজ আর শ্রেণি সংগ্রামের ডাকে সমাজতন্ত্রের স্বপ্নে কেউ লাল পতাকা হাতে তুলে নিতে চায় না । ' রক্তমাখা আত্মা ' এখন শুধুই নৃশংসতার কথা বলে ।
সমাজ পাল্টে দেওয়ার স্বপ্ন একদিন দেখেছিল বামপন্থা অবলম্বনকারীরা । সেই পথকে বিস্তৃত করার জন্য আরও নিষ্ঠা আরো ধৈর্য আরো সময় মেপে কাজ করা উচিত ছিল তাদের । মানুষের মন পরিবর্তনশীল । বিশেষত ভারতবর্ষের মতো আধা গরিব আধা ধনীর দেশে । এখানে সব দলই সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে মান্যতা দিয়েছে । একই সঙ্গে বাজার অর্থনীতিও চালু করে বিশ্বের সঙ্গে নিজের পদচারণাকে এক করে নিয়েছে । ফলে ভোটের ময়দানে জয়জয়কার । আর পতাকা হাতে শতাব্দীপ্রাচীন দু-চারটি মানুষ এখনো ' পাল্টে দেবার ' স্বপ্ন দেখে পুরনো ভুলকে না শোধরানোর প্রতিজ্ঞা নিয়ে।
এ যেন আলোর কুয়াশা । আলো আছে , অথচ কুয়াশার জন্য কিছুই দেখা যাচ্ছে না । বোধের জায়গায় বুদ্ধির জায়গায় ওই কুয়াশা জমাট বেঁধে আছে । যা বিপ্লবের আলোকেও ঢেকে ফেলে গাঢ় অভিমানে।
ছবি : বিধান দেব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন