ছাতা পরব
পুরুলিয়ার জনজাতীয় উৎসবগুলির মধ্যে জনপ্রিয় একটি লোকউৎসব হল ছাতা পরব। সমগ্র মানভূমের বিভিন্ন জায়গায় ভাদ্র সংক্রান্তির দিন এই উৎসব হয়ে থাকে।এই উৎসবের বয়স আনুমানিক পাঁচশ বছর,হাজার বছর,দু-হাজার বছরও হতে পারে। প্রাচীন রেওয়াজ মেনে পঞ্চকোট রাজপরিবারের সদস্যদের হাতে পুরুলিয়া শহরের কাছে চাকোলতোড় গ্রামে ছাতা খোলার মধ্য দিয়ে এই উৎসবের সূচনা হয়।সারা রাত ধরে চলে নাচ গান হুল্লোড়। বিকেলে সূর্যাস্তের মুখে ছাতা তোলার মধ্যে দিয়ে প্রতীকী বর্ষা শেষের ঘোষণা করা হয় বলে বিশেষজ্ঞদের মত। তবে আদিবাসী মতে বর্ষার দেবতাকে তুষ্ট করতেই এই ছাতা পরব করা হয়ে থাকে। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও পড়শি বিহার ওড়িশা ঝাড়খণ্ড থেকেও অনেকে এসে এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে থাকেন। কারোর কারোর মতে এটা অবিবাহিত আদিবাসী যুবক যুবতীদের কাছে জীবনসঙ্গী বেছে নেবার পরব। সে কারণেই ছাতাপরবকে সামাজিক স্বয়ম্বর সভাও বলা চলে। বিশাল শালগাছের খুঁটির উপর তুলে দেওয়া ছাতার নিচে জড়ো হয় কয়েক হাজার মানুষ।
সমগ্র ছোটনাগপুর এলাকা জুড়ে ভাদ্রমাসে অনুষ্ঠিত প্রধান দুটি পরব হল ইঁদ পরব আর ছাতা পরব। ঠিক এই সময়েই উদযাপন হয় করম পরবও। করমের উদযাপনের দিনে হয় ইঁদ পরব। ইঁদ পরব শব্দটি সম্ভবত ইন্দ্রদেবতাকে তুষ্ট করার পরব ধারণা থেকেই এসেছে। কারোর কারোর মতে পঞ্চকোট রাজা পার্শ্ববর্তী রাজ্য ছত্রিণানগর বা ছাতনার রাজাকে যুদ্ধে পরাজিত করার ঘটনাটি স্মরণে রাখার জন্যই ছাতা পরবের সূচনা করেছিলেন। তবে আদিবাসীদের মতে এই পরব অনেক অনেক প্রাচীন এবং এটি করমের ইঁদ পরবের সঙ্গে সম্পর্কিত। করমের জাওয়ার নতুন শস্য নিবেদনের মধ্যে দিয়ে এখানে নিজেকে প্রকৃতির দেবতার কাছে মতান্তরে ইন্দ্র দেবতার কাছে সমর্পণের একটা রেখাচিত্র ফুটে ওঠে। ছাতা পরবে কেবল ছাতা ওঠার দিনটি পৃথক ভাবে নির্ধারিত হয়েছে এই যা। অনেকেই এই ছাতাডাঙ বা শালের খুঁটিকে প্রণাম করে শ্রদ্ধা জানায়।
ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যায় প্রায় সমস্ত ছাতা পরবগুলিই জমিদার বা রাজাদের অধীনস্ত এলাকায় তাদের তত্ত্বাবধানেই হয়ে থাকে। এর মধ্যে দিয়ে হয়ত বা প্রজাদের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিও সুদৃঢ় করার কাজটিও সম্পন্ন হত।প্রজারা রাজাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন আর রাজারা প্রজা হিতৈষী হবার সংকল্প নিতেন। এখনো মেলাগুলিতে সাঁওতাল কুড়মি সম্প্রদায়ের উপস্থিতির আধিক্য লক্ষ করা যায়। তবে যেহেতু দীর্ঘকাল ধরেই ভারতবর্ষ তথা মানভূম অঞ্চলের লিখিত ইতিহাস নেই তাই এই উৎসবের প্রাচীনত্ব বিষয়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা খুবই জটিল। তবু এরই মধ্যে চেষ্টা জারি থাকবে। মানুষে মানুষে সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত হবে এই আশা রয়ে যায়। রয়ে যায় শস্য নির্ভর সভ্যতার কোনো যোগসূত্র উঠে আসার ক্ষীণ আশা।
আর মানুষ অবাক হয়ে দেখে পঞ্চকোট রাজপরিবারের বর্তমান প্রতিনিধি অমিত সিং দেও হাতির চেপে পুরুলিয়া শহরের কাছে চাকোলতোড়ের মাঠে হাজির হচ্ছেন ছাতা তোলার জন্য। চলছে শস্য ফলনের আরাধনা...
ছবি: লেখক

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন