আমরা যখন আমাদের কৈশোর অথবা যৌবনের শুরুতে লিখতে শুরু করি তখন আমাদের মধ্যে থাকে শুধু লেখার আনন্দ আর প্রকাশের তীব্র বাসনা। কিন্তু লিখতে লিখতে যখন কবি বা লেখক সমাজের মধ্যে প্রবেশ করে তখনই আমাদের মধ্যে যুক্ত হয় অপরকে অতিক্রম করে প্রতিষ্ঠার চাহিদা। অর্থাৎ লেখালেখিও আমাদের জীবন চক্রের সঙ্গে এক হয়ে যায়। সদ্য কৈশোরের নিষ্পাপ বিকশিত হয়ে ওঠার মানসিকতা রূপ নেয় সমাজ, রাষ্ট্র, দেশপ্রেম, ধর্ম প্রভৃতি বহুবিধ বিষয়ের ব্যক্তিগত ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে। শিল্পের জন্য শিল্প তখন দায়বদ্ধতায় পরিণত হয়। নিতান্ত ব্যক্তিগত প্রেমও তখন মাত্রায়িত হয়ে যায় অন্য কোনও বৃহৎ প্রেমের সরোবরে। সেই সরোবরে কী কী ফুল ফুটবে তাও আমরা নিজেরাই ঠিক করে নিই। আমরা নিজেরাই হয়ে উঠি এক একটি শিল্পবৃক্ষ। চেতনার সমুদ্রের পাড়ে সুদীর্ঘ অতীত থেকে এইরূপ বহু বৃক্ষ জন্ম নিয়েছে। পৃথিবীর বাতাসে তাদের দেহগন্ধ আর মনের কথাগুলি মিশে আছে। মতাদর্শগত পার্থক্য, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও রুচি নিশ্চয়ই বৈচিত্র্য এনেছে মানব এষণায়। চার্বাক না সাংখ্য, সার্ত্র না দেরিদা---- তা হয়তো আমরা বেছে নিতে পারি; কিন্তু চরম বিপরীত অবস্থানে আমরা তখনই থাকতে পারি যখন আমরা উভয় দিক সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল। ধ্বন্যাত্মক ও ঋণাত্মক এই দুটি দিক নিয়েই এই জগৎ। অশুভর বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে শুভচিন্তাবাদী মানুষ যতদূর এগিয়েছে প্রায় ততদূর মানব সমাজ। ততদূর শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি। এই পৃথিবীকে চিরকাল যারা ভালোবেসেছে তারা কিছুই পায়নি। "রক্ত করবী"-তে নন্দিনী যেমন বিশু পাগলকে বলেছিল, "পাগল, যখন তুমি গান কর তখন কেবল আমার মনে হয় অনেক তোমার পাওনা ছিল, কিন্তু কিছু তোমাকে দিতে পারিনি।" বিশু কিছু পায়নি। কারণ, সে ভালোবেসেছে। কারণ, সে নিজের সুন্দর দিয়ে সুন্দর করতে চেয়েছে মানব জাতির ইতিহাসকে। আমাদের সকলের মধ্যেই আছে কম-বেশি শিল্পসত্তা। আমাদের উচিত সেই শিল্পসত্তাকে জাগিয়ে তোলা। কাজেই মতান্তর যদি শিল্প -দর্শন -সাহিত্যের মধ্যে থাকেও তার সবটাই আমাদের গ্রহণীয়। নিছক অভিসন্ধিগত শিল্প ক্রমশই তার উদ্দেশ্য হারায়। বাদবাকি অভিমানহীন, ঔদাস্যহীন বিশুপাগলেরা চিরকালই পৃথিবীকে ভালোবেসে পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধ চালিয়েই যাবে।
চিত্র গ্রাহক: অনিরুদ্ধ মান্না

বিশুপাগলদের জন্যই পৃথিবী বাসযোগ্য। সুন্দর সম্পাদকীয়।
উত্তরমুছুনসুন্দরভাবে এগিয়ে চলুক ই-সাহিত্যের বেলাভূমি।
নন্দিনী এবং বিশু পাগলা হয়েই আমাদের জীবনের উপলব্ধিগুলি সঞ্চারিত হতে থাকে। পৃথিবীকে সেই কারণেই তো ভালবাসতে শিখি।
উত্তরমুছুনখুব ভালো লাগা ছড়িয়ে থাকল পাতায় পাতায়। ততোধিক সুন্দর সম্পাদকীয়।
উত্তরমুছুন