বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০

ইসমাইল হোসেন।। অনুবাদ: বাসুদেব দাস

 






 বিজ্ঞাপণ


আমার একজন পাত্রীর প্রয়োজন

বয়স আমার পঁচিশ,গায়ের রঙ বাদামি,

উচ্চতা পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি।

আমার পরিচয় এমনিতেই সহজঃ

সমস্ত জাতি-উপজাতি আমার স্ব-জাতি ,

পৃ্থিবীর মানুষের অস্ফুট কথা আমার নিজের ভাষা,

আমার ঠিকানা কয়াকুচি,জেলা বরপেটা,

নদীর তীরে আমার ছোট একটি ঘর।



পাত্রী হতে পারে ফর্সা,বাদামি অথবা কালো,

সে কোন ধর্মের প্রার্থনাকারী,তার জিভের ভাষা কী,

কোথায় ফেলে এসেছে তার তার বাড়ি,কী তার জাত 

এই সমস্ত কিছুর সংজ্ঞা আমার বিবেকের কাছে  তুচ্ছ হতে পারে।


তার সঙ্গে সহবাসের রাতে জিজ্ঞেস করব না তার সতীত্বের কথা,

তার সঙ্গে ফুলশয্যার রাতে তীক্ষ্ণ চোখে দেখব না তার কায়া,

কারণ এখানে জাতি-ধর্মের নামে ধর্ষিত হয় আমার মা

হিংসার আগুনে পোড়ে তার সমস্ত মুখ,বিবস্ত্র হয় গা।


আমার একজন মননশীল পাত্রীর বড় প্রয়োজন-

যার জীবন-পঞ্জীতে লেখা আছে পৃথিবীর ধর্ষিতা নারীর ঠিকানা,

যে হাতে হাতে তুলে দিতে পারে বিক্ষোভের আগুন শিখা,

মোটের ওপর নির্ভয়ে উড়াতে পারে বিদ্রোহের পতাকা।



আমি এমনিতেই একজন দরিদ্র যুবক ,বুকে অযুত আঘাতের ঘা,

আমার অরণ্যের চারপাশে এখন মৃত্যুর জরুরি পরোয়ানা।


আমার একজন বিশ্বস্ত পাত্রীর একান্ত প্রয়োজন-

যার মুক্ত বুকের মাঠেও শস্যের উল্লাস,

উইনি মেণ্ডেলার বুকের মতো যার বুক গভীর,

সাতাশটা বসন্তের অপেক্ষারত একটি সুগন্ধি গোলাপ।


আরও দুটি বসন্তের শেষে আমার বয়স হবে সাতাশ,

ঋতুর ভেজা পলিতে বুকে অনুভব করছি চরম উত্তাপ,

আমার ঘরের চারপাশে জান্তব  

অবক্ষয়ী উৎসব।


আমার একজন আদর্শ পাত্রীর প্রয়োজন-

যে মানুষের কঠিন যাত্রাতেও আমার সঙ্গে হতে পারে 

দুর্গম পথের বিশ্বাসী সহচর।           





একটি ভয়ঙ্কর দৈত্যের বিরুদ্ধে




একটি ভয়ঙ্কর দৈত্য আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে 

দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দৈত্যটির বিচরণ।

দৈত্যটির নির্দিষ্ট আকার নেই বর্ণ নেই 

কখনও কাজল রঙের কখনও কালো কখনো লাল 

কখন ও বিচিত্র বর্ণের কখন ও ধোঁয়া বর্ণের কিন্তু সাদা নয়।

তার নির্দিষ্ট হাত নেই চোখ নেই পা নেই কান নেই

সে কখনও বোবা কখন ও কখনও কালো কখনও অন্ধ।

দৈত্যটির হাতে থাকে আগুন অথবা আগ্নেয়াস্ত্র 

চোখে থাকে ঘৃণা অথবা হিংসা 

শিলসম হৃদয়ে তার ছাই রঙের বর্বরতা।

দৈত্যটাকে আপনি জিজ্ঞেস করবেন না মানুষকে ভালোবাসার ঠিকানা

কারণ এর নিজেরই কোনো ঠিকানা নাই 

এ কখনও লুকিয়ে থাকে মসজিদে কখনও মন্দিরে 

কখনও গির্জায় কখনও বা গুরুদ্বারে।


দৈত্যটার খোঁজে কোথাও যেতে হয় না

শিকারের সন্ধানে সে নিজেই চলে আসবে-

মানুষের ঘর ফসলে ভরা মাঠ শান্তির শোভাযাত্রা 

আর উগড়ে রেখে যেতে পারে সমস্ত ঘৃণা।

সে ক্ষণিকের মধ্যে লাল করে দিতে পারে শান্তির জলাধার

ফসলে ভরা মাঠে নামিয়ে আনতে পারে খরার কারুণ্য।

নির্জন রাতে আপনার দরজায় টোকা দিয়ে 

দৈত্যটা ছিনিয়ে আনতে পারে আপনার প্রেম

মুছে দিতে পারে প্রিয়ার শিরের সিঁদূর চোখের রং

কেড়ে নিতে পারে সন্তানের মুখের ভাত আত্মীয়ের মুখের কথা। 

গভীর রাতে আপনি ঘুমিয়ে থাকলেও দৈত্যটা ঘুমিয়ে থাকে না 

আপনি জ্যোৎস্না দেখতে চাইলে সে অন্ধকার নামিয়ে আনে

তার হাতের মুঠিতে থাকে চারটে বিষের পুঁটলি।

মন্দিরের মঙ্গল ধ্বনিকে সে মৃত্যুধ্বনিতে রূপান্তরিত করতে পারে 

মসজিদের আজানের সুরগুলি কে সে বেসুরো করে দিতে পারে

গির্জা-গুরুদ্বারে নামিয়ে আনতে পারে শীতল নীরবতা।

এই দৈত্যটার বিরুদ্ধে আপনার দেশ আমার দেশ আর সংসদ

এই দৈত্যটার বিরুদ্ধে আপনি আমি আর আমাদের সংবিধান

এই দৈত্যটার বিরুদ্ধে ধর্ম বিবেক বিজ্ঞান আর সমাজ 

এই দৈত্যটার বিরুদ্ধে আপনার প্রতিবেশী আর আত্মীয়-স্বজন।


কী হতে পারে দৈত্যটার নাম 

বিচ্ছিন্নতাবাদ না সন্ত্রাসবাদ

সাম্প্রদায়িকতা না গোষ্ঠীবাদ

অথবা অন্য কোনো সর্বনাম?



আসুন আমরা আরম্ভ করি দৈত্যটার হত্যার অভিযান

হাতে হাত ধরে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ ইহুদি খ্রিস্টান 

সবাই মিলে তৈরি করি একটি কফিন দৈত্যের কফিন।।


ইসমাইল হোসেন : ১৯৬৫ সনে অসমের বরপেটে জেলার কয়াকুছিতে জন্মগ্রহণ করেন ইসমাাইল হোসেন। পেশায় ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারের অধ্যাপক।অসমিয়া সাহিত্য সংস্কৃতির একজন গবেষ্ক।‘জীবন আরু মানুহ বিষয়ক’,’বিজ্ঞাপন’,’নৈপরীয়া’বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ।



ছবি বিধান দেব।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...