শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

গদ্য।। রাজীব ঘোষাল


 মহালয়া তর্পণ ও অন্যান্য 


বর্ষা প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। ইতিউতি কোদালকোপানো শাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। দিগন্তজুড়ে কাশের চামর দোলাচ্ছে কেউ। খালবিলগুলিতে খলবল করছে মাছেরা। জেলেদের ফেলে দেওয়া ডালে ধ্যানমগ্ন বক। এসবই দেখে উদাসীন নিরতিশয়ানন্দ। তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন ছোট এক নদীর কাছে।মনে পড়ছে তার অতীত জীবনের কথা। নাম ছিল নিরঞ্জন। স্কুলে নাম ছিল অতীশ। আর মামাবাড়ির দাদু নাম দিয়েছিলেন আনন্দ। শরৎ বরাবরই তার প্রিয় ঋতু। কেমন ভাদ্রের শেষদিনে ছাতাপরবের কথা মনে পড়ে তার মনে পড়ে বিশ্বকর্মার আবহজুড়ে আশ্বিনের শারদপ্রাতের অপেক্ষা। বড় আনন্দ জাগে মনে যখন কোনো গৃহস্থ, বাড়িতে আমন্ত্রণ জানান। কখনো কোনো পাড়ার ক্লাবের যুবারাও তাকে খাইয়ে দাইয়ে উপঢৌকন সঙ্গে দিয়ে ডেরায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা পর্যন্ত করে দেয়। সনাতনী রীতিতে গভীর আস্থা তার কখনো কাউকে বিমুখ করতে পারেননি। একটা সময় ছিল মহালয়ার ভোরে দাদুর আমলের রেডিওর সামনে ভোর চারটেয় বসে পড়তেন তিনি। শোনা যেত বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলায় মহিষাসুরমর্দিনী। দেবী বন্দনা। এখন কাঁচাপাকা দাড়ি। প্যান্টশার্ট ছেড়ে গায়ে জড়িয়ে নিয়েছেন গেরুয়া বসন। নাম নিয়েছেন নিরতিশয়ানন্দ। তবুও মাঝেমধ্যে সদ্য যৌবনে পা দেওয়া দিনগুলির কথা মনে পড়ে যায়।মনে পড়ে যায় কাব্য প্রয়াসের দিনগুলি। কাব্য পাঠ ও কাব্যচর্চায় কত রাত জেগে কাটিয়েছেন তিনি!  কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের "উত্তর কোলকাতার কবিতা" পড়তে গিয়ে বারবার নতুন নতুন দৃশ্যকল্প গড়ে উঠত মনে। সেই যে প্রবেশক কবিতাটি "অতিকাল যাও... আমার অপর এই গঙ্গাধ্ধারে/ বটবৃক্ষমূলে দ্যাখো গামছা পেতেছে... বাঁকুড়ার/ গোলাপী গামছা... আহা কী শীতল... অতিকাল/ যাও...ওকে একটু শুতে দাও বিরক্ত কোরোনা...  " এই কবিতাটি পড়ে একবার কেবলই মহালয়ার কথা মনে পড়ছিল নিরতিশয়ানন্দের। মহালয়ায় এক পা পাথরে এক পা জলে অথবা নাভি পর্যন্ত জলে নেমে সেই স্বর্গীয় উচ্চারণ! "ওঁ দেবা যক্ষাস্তুথা নাগা গন্ধর্ব্বাপ সরসোহসুরাঃ।ত্রুরা সর্পা সুপর্ণাশ্চ তরবো জিহ্মাগা খগাঃ।" অথবা রামতর্পণের সেই অংশটি "ওঁ অগ্নিদগ্ধাশ্চ যে জীবা যেহপ্যদগ্ধাঃ " এইসবই মামাবাড়ির দাদুর সৌজন্যে শোনা এবং জানা।যেমন জেনেছিল পিতৃপক্ষে তর্পণ শুরু হয়েছিল মহাভারতের চরিত্র কর্ণের কারণে, কর্ণ স্বর্গবাসী হবার পর তাকে সোনা রুপো ধনরত্ন খেতে দেওয়া হয়।তিনি একথা যমলোকে অভিযোগের আকারে জানালে তাকে বলা হয় তিনি সারা জীবন ধনরত্ন দান করলেও পূর্বপুরুষদের খাদ্য জল ইত্যাদি দেন নি তাই তাকে খেতে খাদ্য দেওয়া সম্ভব নয়। কথপোকথন শেষে দেখা যায় কর্ণ ছিলেন নির্দোষ তাই তাকে  পৃথিবীতে ১৫ দিনের জন্য ফিরে গিয়ে পিতৃপুরুষদের জল দানের অনুমতি দেওয়া হয়। এই ১৫ দিনই পরে পিতৃপক্ষ হয়ে ওঠে। এই প্রসঙ্গেই তার জানা হয়েছিল সুপর্ণা শব্দের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ।  মোহিত হয়ে সেদিন জেনেছিল এই মন্ত্রের ভেতর দিয়ে দেব দানব রক্ষ যক্ষ পাখি সাপ অপুত্রক ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ পাহাড় নদী সাতসমুদ্র পারের দ্বীপবাসী সমস্ত পূর্বপুরুষ এবং পিতৃপুরুষদের জল দান করা হয়ে থাকে। তার মুখে ফুটে উঠেছিল অসামান্য আলোকদীপ্তি। প্রসন্ন মুখে জমে উঠেছিল তৃপ্তি।আজ আবারো এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠা মুখে যেন ধ্বনিত হতে থাকে "ইয়া দেবী সর্ব্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা"।কানে বেজে ওঠে " বাজলো তোমার আলোর বেণু "। নিরতিশয়ানন্দ হারিয়ে যেতে থাকেন শৈশবে। নদীসাঁতারে। কলাবউয়ের স্মৃতি ঘিরে ধরে তাকে। কলা কচু মান ধান হলুদ জয়ন্তী ডালিম বেল অশোক একসঙ্গে অপরাজিতা দিয়ে বেঁধে নতুন বস্ত্রে ঢাকা দেওয়া। এঁকে রাখা দুর্গার রূপ।পুজো তো হবেই কিন্তু বাচ্চারা কই! কোথায় সেই উন্মুক্ত প্রকৃতি! পাহাড় ঠেলে ঢাকিরাই বা ঢাকের শব্দ তুলছে কোথায়! দেবীপক্ষের মঙ্গলালোক তিনি তো জ্বালিয়ে রাখবেন আজীবন। মনে মনে বলতে থাকেন মাঠে মাঠে ধান্যগরবিনী হোক ধানগাছ। শরতের বেলের মতই ঢলে উঠুক দশদিক। সুজলা সুফলা ধরিত্রীর বুকে সমস্ত গ্লানি মুছে গিয়ে সমৃদ্ধ হোক চরাচর... মালিনীর জলে ছায়া পড়ুক বেনেবউয়ের। নিরতিশয়ানন্দ আর নিরঞ্জনে ফিরতে চান না। এক আঁজলা জল তুলে নিয়ে যুবা সন্ন্যাসী দেখতে থাকেন নিজের মুখ আর ভাবতে থাকেন নিরতিশয়ানন্দ ও নিরঞ্জন আসলে একই মানুষ...  অথচ নিরঞ্জন তো অমোঘ!  অবধারিত। কেমন যেন নির্ভার লাগে তার!


ছবি: বিধান দেব 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...