শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২০
সম্পাদকের কথা
দীপক হালদার
হে অনাগত
কোলাজগন্ধী কাটাছেঁড়া দিনের চাঁদোয়ায় পথ ঢাকা
ভাঙা হাড়গোড় মেরুদণ্ডে
বানানো যে আঙরাখা
তোমার জন্যে এপথে সাজানো আর্ত মুখের সারি
হে অনাগত এখানে তোমার
ঝলসাও তরবারি
নারী
এ সেই যন্ত্রণা
যাকে অন্যনামে ডাকা যায় না
তোমাকে বলব বলে কতবার
ছুটে গেছি
মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ও শর
ফিরিয়ে নিয়েছি তূণে
প্রবোধের আশ্রয়ে থেকেছি
বহুক্ষণ
একসময় যন্ত্রণাকে ওই
অস্ত্র করেছি ফের
মন্ত্রোচ্চারণের মতো মনে মনে
বলেছি
সুসময় এলে একদিন
অস্ত্র প্রয়োগে পারঙ্গম হব ঠিক
তূণ থেকে শরে সেদিন গভীর
জানাব তখনি
ওই যন্ত্রণাকথা মুখে বলতে নেই অতশত
দেখে বুঝে নিতে হয়
জেনে পড়ে নিতে হয়
ওর ভিতরের ক্ষত
অনিভান
পথদের নিজস্ব আলো থাকে
হাঁটলেই জ্বলে সাড়া দেয়
চোরাস্রোত ভাষা তার
কখনো অদম্য টান
গোপনে আড়ালে
অনিভান সারাক্ষণ
ছবি: বিধান দেব
রফিক উল ইসলাম
পোষা মোরগের মতন এক একটা দিন
উদ্ধত ছুরির নীচে গলা দেয়!
ছুরি তাকে আড়াই-পোঁচে হালাল করে।
গভীর রাতে ঘুমন্ত চোখ রগড়াতে রগড়াতে
আমরা, ভাইবোনেরা, উজ্জ্বল পাতের পাশে
গোল হয়ে বসি,
বহুকাল পরে পাতে মাংস পড়বে আজ।
সেই-ই আমাদের আমিষবাহিত রাত!
সজনেডাঁটার গন্ধ-সুরভিত তুমি, তুমিই ছিলে
আমার অধিষ্ঠাত্রী, অর্চনা করতে গিয়ে
আগুন লেগেছে গায়। এবার উন্মুক্ত করো
গভীর বনপথ তোমার। দাবানল হয়ে ঢুকে পড়ি
যতটা খননে যাওয়া যায়। একসাথে পুড়ি,
আর নিভে যাই সব জাতিভেদ প্রথা
নির্মুল করে।
আমাদের আমিষবাহিত রাত্রিগুলি যেন
সহসা সমাপ্ত না হয়।
উদ্বাস্তু
এক পশলা বৃষ্টির পর, তোমাদের দিঘি
শান্ত হয়ে যেত। দিঘিতে ফুটে ওঠা লাল শালুক
আরও ঝলমলে। ঘোষিত নাস্তিকজনও
কীভাবে যেন ঠিক
ঈশ্বরের দিকেই এগোয়! আমার কোনও
ঈশ্বর ছিল না, দিঘির জলে প্রতিবিম্ব
খুঁজতে গিয়ে
লাল শালুককেই ঈশ্বর মেনে এসেছি।
কখনও কেউ একজন তর্জনী তুলে প্রশ্ন করবে
নির্মীয়মাণ বহুতল, নাকি একফালি নদীতীর?
আমি শুধু জানি---
বহুকাল হল লাল শালুকেরা উদ্বাস্তু হয়ে আছে।
অস্তিত্বের ক্ষত
ভেঙেচুরে প্রসারিত করেছি,
সেটুকুই উপহার দিয়ে যাব। অস্তিত্বের ক্ষত থেকে
জাগ্রত যে প্রদীপ
ঝড়কে শাসনে রাখে, তাকেও বলেছি---
প্রস্তুত হয়ে থাকো। কথা বলো, কথা বলো
লুপ্ত জনপদ। ভাসতে ভাসতে এই
আমরাই একদিন
দাঙ্গাহীন সারিসারি শহর গড়ে দেব।
ছবি: বিধান দেব
বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২০
তাজিমুর রহমান
সরগম
আমাদেরও ফেরা ছিল! নিরাভরণ সে গমনের
কোন প্রক্ষেপণ ছিল না, একটা নিবিড় চঞ্চলতা
জলের মতো ছুঁয়ে থাকত ধ্বনিময়
প্রিয় বৃক্ষের দল তার প্রতীতি তুলে রাখলে
মেঘের মতো জড়িয়ে ধরে জ্বর,তখন স্বরহীন
অনুভূতিগুলো লক্ষ্যহীন ব্যারোমিটারে ওঠানামা করে
পথ হারিয়ে যায়। পড়ে থাকে চিহ্নবিহীন আলস্যরেখা
প্রতিগমনের পুনঃপ্রস্তুতি সেরে নেবার কথা ভাবলেই
নিখিলের মতো দুহাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসে
সজল বিকেল,পর্ণমোচী সম্পর্কগুলো
একটা নতুন ভ্রমণের অপেক্ষায় সেজে ওঠে চরাচর
তখন সমস্ত শূন্যতার ভরকেন্দ্র জুড়ে নিঃশব্দে
ধ্বনিত হয় অন্তরার কোমল সরগম
স্বপ্ন
আমারও তো নিজস্ব বাতিঘর আছে যেখানে আজো অতন্দ্র থাকে বিবেকের বোধিবৃক্ষ
আর অক্ষ থেকে নেমে আসা ঝুরিগুলো জীবনের কথা বলে
অথচ ভুয়ো কথনে যে মায়া লেগে থাকে তার ভেতরে
বর্ণহীন অক্ষরেরা জায়মান থাকে বলে
কালান্তরে ঝরে গিয়ে জেগে ওঠে প্রকৃত সারস
অতলান্ত স্রোতে যে কালধ্বনি নিবিড় সঙ্গমের মতো
বিনীত আবেশে বিন্যস্ত
তার ভেতরে বেজে ওঠে লোকায়ত সুর
কেবল রাত্রি চঞ্চল হলে নখর ধ্বনিগুলো নির্বাসনে যায়
একটা নিবিড় স্বপ্ন তবু ছন্দময় পাড়ি দিয়ে যায় চরাচর
ধারাপাত
নিবিড় শূন্যতার উপর ভেসে আছে সত্ত্বার অংশবিশেষ
দৃষ্টির ভেতরেও গহন বিষন্নতা
নিদ্রাহীন রাত্রি ক্রমে দীর্ঘতর শ্বাসের মত ছমছমে
বাঁশপাতার ফাঁক গলে এইমাত্র নেমে এলো যে চাঁদ
তার ডানায় পরীদের পরম্পরা খেলা করে
বৃষ্টি এলেই লিখে দিই কচুপাতার জলতরঙ্গ
হে আমার প্রতিপক্ষ প্রতিপালক একবার দেখো
এই মাতৃভূমি
কেমন করে উতল কাঁচের মত দেখিয়ে দিচ্ছে
স্তন্যপায়ী মানুষের ধবল বিষাদ আর সবুজ সংসদ!
জেগে থাকে একা গ্রাম, কৃষানীর কন্ঠে ভাসে অরণ্যগীতি
আর নিভৃতে লালিত হয় প্রীতিময় ক্যানভাস
অথচ মেদহীন ছায়ায় কারা যেন লিখে রাখে
যোগবিয়োগের ধারাপাত আর
রাখালগোপাল-এর অনলস পরিভ্রমণের কারুভাষ
ছবি : বিধান দেব
অভিজিৎ দাশগুপ্ত
অবিনীত
তোমার উম্মুখর দিন আমাকে দাও---
কথা না - কথার মাঝখানে সারাদিন।
ফিরে যাব বলে আসিনি এখানে
উপলব্ধ
বাতাস সংসারময়।
চারিদিক কালো করে এল নির্দেশ---
ভোর হবে , এই আশায় রাত্রি কেটে যায়।
অভিশাপ
দূরে দূরে থাকি।
আমি তার জনরোষের শিকার...
আর তোমরাও ধরে বেঁধে নিয়ে যাও তবে।
নির্জ্ঞান
দুপুরেই কথা হতো। সকাল সন্ধ্যা...
নির্জ্ঞান তপস্যায় বসে
কেটে যাচ্ছে মন্ত্রের সাধন
ছবি: বিধান দেব
সায়ন রায়
মেরুযাত্রীর ডায়েরি
বিশুদ্ধ কোনো ফুল নেই।এই কথা জেনে আত্মহত্যার পথে এগিয়ে গেল যুবকের মায়া।
তোমার সূর্যঘড়িতে তুমি দেখে নাও সময়ের পদছাপ। থমকে যাওয়া আলো। আত্মার
ভারটুকু ছাই হয়ে উড়ে যায় রেণুতে রেণুতে। বৃথা বাক্যালাপ।
একটা সাইরেনের শব্দ চমকে উঠছে সকাল বিকাল। নাম না-জানা কত ভয় তোমার
জামার সুতো আর মোজার উল হয়ে জেগে আছে। মিশকালো অন্ধকারে প্রেতের মত
এক ছায়া আধিভৌতিক। বিশ্বাস ও ভ্রম একই ছাদের নীচে সহজ হয়েছে।
এবার দূরের পথে। বাস থেকে নেমে হেঁটে গা-গঞ্জে। নির্জন এক চায়ের দোকান কতযুগ
ধরে তোমার প্রতীক্ষায় ঠিক ওইখানে হাঁটুমুড়ে বসে।
ভালবাসা ভাল। তার চেয়ে ভাল অভিমান। গুমোট আর অসহ্য এক হাওয়া থেকে খসে
পড়ছে ছাল একটু একটু করে। জন্ম নিচ্ছে শিল্পের ভোর।
২.
এই যে এতবড় হাঁ। গিলে নিচ্ছে দিন রাত্রি সকল সবুজ। তুমি পোশাক বদলে নিয়ে হেঁটে যাও
তারাভরা খেতটির পাশে। দিনশেষে গান ভেসে আসে। নিদারুণ কান্নাগুলো ঝুরোঝুরো বরফের
খই। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসে একা পর্বতারোহী।
নিঃস্ব এক সময় থেকে উপচে উঠছে আগুনের স্রোত।বানভাসি মানুষেরা বিশ্রাম নেবে বলে
গুটিগুটি জড়ো হয় মন্দির চাতালে। অনন্ত এই অবসরে ভেজাকাক সুর করে পাঠ করে
কথাসরিতসাগর।
ছিন্ন এক গ্রন্থি থেকে যাত্রা শুরু হয়ে গনগনি খোয়াইয়ের ধার। পাঁজরের দাঁড়গুলো সোনার
শেকলে আঁটোসাঁটো। ফুটিফাটা রোদ। ক্লান্ত পথিকের এলিজি রচিত হয় ধূর্ত কোনো
শেয়ালের হাতে।
কাব্য ও ব্যক্তির সত্য। মাঝখানে একফালি মাঠ। জোৎস্না এসে পড়ে। একগুচ্ছ জুঁইফুল
সারারাত সুগন্ধ বিলোয় নিষ্পাপ।
৩.
ব্যথাদের দল হাঁস হয়ে উড়ে যাচ্ছে দূরের আকাশে। তুমি প্রশ্ন কর।প্রশ্ন ছুড়ে দাও। প্রতিটি
প্রশ্নের কাঁটা থেকে রক্ত ঝরে পড়ে। অসহায় সমুদ্রবেলায়।
সেবারে জঙ্গলে গিয়ে মজা হল খুব। বুনো মোষ আর বাইসনের সাথে সখ্য রটে যায়। গভীর
রাতে উড়ন্ত নরকের সেই রক্তমেদুর স্বাদ আজও আমার জ্বর হয়ে আসে।
ভাবনারা গুটিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে।স্মৃতিও অপস্রিয়মাণ। আর স্বপ্ন ভোররাতে উঠে
পুকুরের জলে নিজেরই মুখের দিকে অপলক চেয়ে থাকে। বাক্যহারা জল।
তুলে নাও রুকস্যাক। টুকিটাকি এতোলবেতোল। তাঁবু গুটিয়ে নিয়ে আরও দূর হেঁটে যেতে
হবে। বর্ষায় পাহাড়ি পথ। ভীষণ পিছল।
ছবি: বিধান দেব
রনি অধিকারী
জীবন যেখানে যেমন
অভিনয়ের আড়ালে ঢাকা এ আমার বন্দি জীবন!
মূলত আমি কোথাও যেতে পারি না, কিছুই করতে পারি না
হাত-পা শেকলে বাঁধা, ভাব করি যেন এক মুক্তবিহঙ্গ...
এমন ফুরফুরে মেজাজে হাঁটি, যেন কোনো শেকল নেই পায়ে।
দু’চোখ থেকেও আমি অন্ধ! কিছুই দেখি না
এমনভাবে চোখের পলক ফেলি, সবাই ভাবে- দেখছি সবকিছু,
আমি কিছুই বলতে পারিনা, যা কিছু উচ্চারণ করি
তা সবই শেখানো বুলি, যাত্রাপালার অভিনয়ের মতো
আসলে কেনো বাক্যরচনা করবার ক্ষমতাই আমার নেই!
অভিনয়ে বড় বেশি পাকা আমি! একটা লাশ হয়ে হেঁটে বেড়াই
বোঝে না কেউ, চিমটি কেটে দেখে না কেউ,
বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি!
আমি দুঃখ পাই না, কোনো সুখানুভূতিও আমার নেই
কেননা মরা লাশের বন্দি জীবন আমার...
শুধুই ঘুরপাক খাই সাড়ে তিন হাত বন্দি পরিখায়!
কবির ক্যানভাস
কবির হাত যেন জলের অক্টোপাস, নক্ষত্রের নৃত্যকলা
সে রহস্যের চোখ জানালায় ভিড় করে...
বাতাসে অজস্র পেপিরাস ওড়ে,
কালির প্রলেপ পড়ে ধূসর খাতায়-
আজ কলমের অন্তরালে কবির অস্তিত্ব , হৃয়ের হাত
অতঃপর কবির ক্যানভাস ।
আমার বিভ্রম
মাঝে মাঝে বড়ো ভুল হয়ে যায়
জল ভেবে আমি কাচ হাতে ছুঁই।
হাত কেটে যায় বুক কেটে যায়, রক্ত ঝরে
তবু যেন চেয়ে থাকি অবিনাশী চোখে।
চারিদিকে শুধু রক্ত হাত-বুক-দেহে
অনিন্দ্রায় দিন যায় আমার বিভ্রমে।
ছবি: বিধান দেব
অভিজিৎ দত্ত
বৃষ্টিকে লেখা পত্রগুচ্ছ
১.
আজ আর কোথাও যাওয়া হয়ে উঠল না
এই যে সন্ধ্যা-ছুঁই-ছুঁই বিকেল---
এসময় কাদামাখা পারা-ঘাস গিনি-
ঘাসেদের সঙ্গে
চিনির বন্ধুত্ব হল, ঘাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে।
ঘাসের পরম রয়ে গেল দেখি
এই দুই হাতে।
অরুণ, আপনিও কি খুঁজছিলেন
বর্ষার এমন অতুল---
কল্পনার প্রভাতে প্রভাতে?
২.
সবজি-বাগান থেকে তুলে এনে
উঠোনে শুইয়ে রেখেছ ঝিঙে চিচিঙ্গে ঢ্যাঁড়শ
বেগুন বরবটি উচ্ছে লাউ কুঁদরি, আর
কয়েকটি নিরীহ কুমড়োফুল
যেভাবে মাস্তানরা টাটকা খুনের পর
প্রকাশ্যে সাজায় লাশ!
একে কি ফলন বলো? নাকি স্বপ্নে ঢুকে
অচানক ভেঙে দেওয়া সপ্তম আবাস!
৩.
রসচাপে মরে যাচ্ছে মুক্তোকেশী বেগুনের চারা
যেমনটি ঘটেছিল প্রপিতামহীর বেলায়, গত শতাব্দীতে
বোঝনি, সারের প্রভাব না কি রসচাপ!
ছবি: বিধান দেব
সুবীর সরকার
ছবি
সম্বল বলতে জেনুইন শরৎকাল
নদীতে বেড়াল নামছে
পা ডুবে যাচ্ছে আমাদের
মুখ ফিরিয়ে চলে যেও না প্লিজ
নির্বাসন
এক শরীর নির্বাসন নিয়ে এই যে হেঁটে যাওয়া
বাতাসে পুলক থাকে আর পাখির পালক
ফাঁকা চেম্বার থেকে পাশ ফেরার শব্দ
ফিরে আসছি তাই রানওয়েতে বিমান
নামছে
মায়া
অহংকারের উল্টোপিঠে পাঠ কিংবা পতনের
মত শুয়ে থাকে আমাদের সাদা পৃষ্ঠার দিনগুলি
তখন স্বপ্নে ভরা নদীর বাঁক চলে আসতেই পারে
না শোনা গানগুলি উৎসর্গ করি মরা ইঁদুর দের
সরষেখেতে রেডিও বাজলে আগলে রাখি পূর্ণ
চাঁদের মায়া
ছবি: বিধান দেব
বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০
শান্তনু প্রধান
ঝাপসা চশমার কাঁচ
আমি সেই দ্বিপ্রহরের জ্বর
আমি সেই থেঁতলানো জড়িবুটি ছিপছিপে সরল
আমি সেই তোমার আঁচল সরিয়ে
নোনা বালিতে ছড়িয়ে থাকা হিমোগ্লোবিন
কখনো বলিনি কোনও দিন
পরিত্যক্ত পোশাকের উপর সংরক্ষিত ছিল প্রাথমিক পাঠ
আমার ক্ষতবিক্ষত আত্মদীপ থেকে যারা সরে গিয়ে
বেনি বাঁধতে বাঁধতে গুঁজেছ কৃষ্ণচূড়া
তাদের কি কোন সংশোধনাগার বলে কিছু আছে
নাকি সবটাই আইবুড়ো ত্বকের পান্ডুলিপি
এইসব দেখা এবং না দেখা মেহনত
কাদের আর্তনদী বাঁকে স্নাত
নির্বিকার ফুটোর ভেতরে বহুবার ঢিল ছুড়েছি
একবারও না বেজে শুরু হয়েছে অজাত উৎপাত
ঢিলেঢালা পাঞ্জাবির ফাইনাল প্রুফ দেখতে দেখতে
ফিরে যাচ্ছি প্রাগৈতিহাসিক ঘুমের বর্ণমালায়
এই বেশ আছি
আমার বৃষ্টির ভেতর জন্ম
নিয়েছিল একটি চাঁদ
আমার কষ্টের ভেতর জন্ম দিয়েছিলাম একটি সূর্যের
চাঁদটি যে কখন ফাঁকি দিয়ে উড়ে গেল কেউ টের পাইনি
শুধু তার ছায়াটুকু চিলেকোঠা জুড়ে ফুটে আছে
অথচ সূর্যের শরীর থেকে খসে পড়া পারদ
ধীরে ধীরে পুড়িয়ে দিচ্ছে চিলেকোঠার নিভৃত ছায়ার ব্যাকুলতা
এই উভয়ের মাঝখানে বেড়ে ওঠা জলে গ্রাম্যসংঘাত
উবু হয়ে বসার আগেই নৌকোর একটি দাঁড়ে টিপ দিয়ে
ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছি
ততখানি ভেসে উঠছে আমার বাল্যকাল
আসলে ছেলেবেলায় আমার মা শিখিয়েছিলেন পূর্ণচ্ছেদ
খানিক পরে বাবা দেখিয়েছিলেন কমা কাকে বলে
তারপর অনেক সাঁকো পেরিয়ে আশা আমার বউ
বুঝিয়েছিলেন এই পূর্ণচ্ছেদ ও কমার মাঝখানে বসে থাকা একটি দৈত্য
এখন মেয়ে আর ছেলে সেই দৈত্যকে প্রতিদিন ভেঙে ভেঙে
সানফ্লাওয়ার দিয়ে ভেজে জলে ভাসিয়ে দেয়
নিঃসঙ্গ যাপনের স্বরলিপি
এপারে গান ভেঙে এলে
ওপারে তুমি খুঁজে পাও বৃষ্টির স্বরলিপি
হয়তো তাই সুদীর্ঘ নির্জনতা খুঁটে আনে
ঘনীভূত মেঘপড়শীর নিখুঁত সম্ভ্রম
গান ভেঙে যাওয়ার খানিক পরে
নক্ষত্রদের পায়ে নুড়ি হয়ে ঝুলে পড়ি
ঝুলতে ঝুলতে কুয়াশার সমীকরণে রাখি
ভ্রমণবৃত্তের ছায়া ও কিছু শ্রাবণের ধারাপাত
তুমি চাইলে পারো খানিকটা জিরিয়ে নিতে
কিংবা চাইলেই পারো দ্যুতিময় বর্ণের পাজরে
বিঁধে দিতে তীক্ষ্ণ নখ
অথচ দেখো মাঞ্জা করা ঘুড়িটি তার লেজ হারিয়ে
লাট খেতে খেতে পেরিয়ে যাচ্ছে ধান জলা
আর সেই ধান জলাময় ছড়িয়ে পড়ে আছে
আমাদের নিঃসঙ্গ যাপনের অবিভক্ত স্বরলিপি
উত্তরণের ক্রুশকাঠ
চোখের আলিঙ্গনে স্লোগানসিক্ত সূর্য ওঠা
ঘাসে ঘাসে ছড়িয়ে রাখে মৃদু সকালের মরচে পড়া তর্জনী
সময় মত ভেঙে যায় অযৌন আহ্লাদ
সার্বভৌম চোখ চিরে জলের বারুদ
প্রতিধ্বনিত পুরুষ ফড়িং-এর ডানায় দেখতে পেল উত্তরণের ক্রুশ
হেমন্তের লতিতে লেগে আছে ব্যথাহীন নিঃশ্বাসের হলুদ তরল
নিষেধ অন্ধকারের ফুটোয় বেজে উঠছে কাদের জীবন
ভারাক্রান্ত স্মৃতি বিবাহযোগ্য ঘাসফুলেও সুখী নয়
অত্যাচারীদের ভগ্ন রামধনু রাংতায় মোড়া কুয়াশা ভেদ করে
উড়ে যাবে বলেই এলো চুলে বিঁধে আছে আজীবনের বিষন্ন বাতাস
সেই অসুখ নদীটির ফুলশয্যার স্বরলিপি আমি জানি না
পাহাড়ের মগডালে বেজে উঠছে তারই অবিক্রিত অন্ধকার
সেই সরলমতি অন্ধকারে শিউরে ওঠা স্পন্দন
অতীত ঐতিহ্যের সিঁড়ি বেয়ে ভাঙা আয়নায় লেগে থাকা
চাঁদের কুমকুম টিপ নিয়ে যায় আরো উপরের সমাবেশে
কেন নিয়ে যায়
শেষ অবধি ক্লাউনের চোখের আলিঙ্গনে স্লোগানসিক্ত সূর্য ওঠা
দখিনের খোলা জানালা দিয়ে ডুবে যাবে স্বাস্থ্যবতী
অরিন্দম রায়
ফেরা
গাছের তলায় পড়ে গাছ
বাড়ির উপর পড়ে বাড়ি
জলের উপরে ভাসে দেহ
এভাবেও সাঁতরাতে পারি
সাঁতরাতে সাঁতরাতে ঠিক
ফেরা যাবে নিজেদের ঘরে
তুমি শুধু জ্বেলে রেখো আলো
আগলিয়ে রেখো তাকে ঝড়ে
ঝড়ের প্রবল মুখে যদি
ঠিকঠাক দাঁড়াতে না পারি
ভাসতে ভাসতে তবু জেনো
ফিরবই নিজেদের বাড়ি
দৃশ্য
সান্ধ্য গলিতে বুঝি হাওয়া এসে হারিয়েছে পথ
বৃষ্টি থেমেছে সদ্য
গাছের পাতায় আকাশের আলো যেন থমকিয়ে আছে
পৃথিবী শান্ত অতি,অকারণ হুল্লোড় নেই
মা-বিড়ালের পাশে মনোরম শুয়ে আছে ছোট তার ছানা
জলের শব্দটুকু রাস্তার কল থেকে ঝরে ঝরে পড়ে
রাহু
মাঝে মাঝে ফুঁসে ওঠে তোমার দু'স্তন
আদরের ছলে কেউ সমুদ্র মন্থন
করেছে অমৃত পাবে এই অভিপ্রায়ে
তোমার উত্তুঙ্গ স্তন স্বাগত জানায়!
দেবতারা ষড়যন্ত্রী ভীষণ চালাক
চেয়েছে অসুরদল বিষ শুধু পাক
অসুর তনয় আমি দেবতার রূপে
বসিয়েছি ভাগ ওই অমৃতের কূপে!
ছিন্ন হয়েছে গলা শাস্তি স্বরূপ
অনার্য প্রেম তবু করেনি তো চুপ
তোমার দু'খানি স্তন চাঁদ হয়ে ভাসে
মুণ্ডহীন আমি তাকে খেয়েছি গরাসে!
ছবি: বিধান দেব
আফরোজা সোমা
পরমের সাথে কথোপকথন: সাধু ও শয়তান
-সাধু কে?
-যিনি জানেন পৃথিবীতে পাপ-পূণ্য বলে কিছু নেই।
-শয়তান কে?
-যিনি জানেন পৃথিবীতে পাপ-পূণ্য বলে কিছু নেই।
-সাধু ও শয়তানে তবে ফারাক কোথায়?!
-ফারাক কি হয় জানায়? না। তা নয়।
ফারাক রচিত হয় কর্ম-চিন্তায়।
পাপ-পূণ্য নেই জেনেও যিনি ন্যায় মনে চলেন তিনিই সাধু
আর পাপ-পূণ্য নেই জেনে যিনি ক্রুর হেসে
ধুন্দুমার উড়িয়ে চলেন বিজয় কেতন তিনিই শয়তান।
আমাদের হিয়ার ভেতর আমরা যখন গান হয়ে যাই
আমরা খরচ হয়ে যাচ্ছি রোজ;
হিসেবের খাতায় ভাংতি পয়সার মতন
সেই খরচ তুলতে ভুলে যাচ্ছেন গিন্নি মা।
জীবন-জীবন করে আমরা ছুটছি
আর জীবন আমাদের নাম ধরে
ডাকতে-ডাকতে ছুটছে আমাদেরই পিছু।
আমরা একটা সার্কেলে ঘুরছি
এই ঘূর্ণনে কোনো বিরতি-বিন্দু নেই;
দৌড়ের নিয়মে চলতে থাকলে এইখানে
কোনোদিন আমাদের হবে না দেখা।
তবে, কেউ-কেউ দেখা পেয়ে যায়;
তারা নিয়ম ভাঙে
তারা দৌড় থামিয়ে দেয়;
তাদের দেখে লুথা মনে হতে পারে
তাদের দেখে বোকা মনে হতে পারে
তাদের দেখে ঋষি মনে হতে পারে
তাদের দেখে মনে হতে পারে
ফুটো পকেট গলে পড়ে যাওয়া ভাংতি পয়সা
কিন্তু তারা জীবনের দেখা পায়
চলতে-চলতে জীবন এসে একদিন
হুমড়ি খেয়ে পড়ে তাদের বুকের উপর
সেদিন তাদের দেখা হয়ে যায়;
দৌড় থেমে গেলে।
আমিও অপেক্ষায় আছি
একদিন আমাদের দেখা হয়ে যাবে;
জীবন মিলিয়ে দেবে
তোমাকে ও আমাকে ঠিক;
সেদিন ভাদ্র মাসের রোদ্দুরে
ভরদুপুরে ঘামতে-ঘামতে হাসতে-হাসতে
দূর গাঁয়ের মেঠো পথে আমরা
বাশঁঝাড়ের নিচে এসে জিরোব;
বাঁশপাতার শন শন শব্দে
আমার শরীরে জাগবে শিহরণ
তাই দেখে তুমি বুঁজবে চোখ
শুনবে শনশন শব্দের ভেতর
কেমন গান বয়ে যায়।
এমন দিন আমাদের সত্যিই আসবে;
এমন প্রেমের দিন না এলে
আমরা মরব না;
পৃথিবীতে কেউ মরে না
প্রেমের দিন না দেখে;
বাস্তবে না হোক,
অন্তত কল্পনায়
বেঢপ দেখতে
ভুঁড়িওয়ালা
কুৎসিত যুবকটির ঠোঁটেও
ভালোবেসে চুমু খায় এক পরী;
আর চির জন্ম দুঃখে থাকা
ডানা খসে যাওয়া পরীটিও
কল্পনায় একদিন
ডানা খুঁজে পেয়ে দেয় উড়াল;
উড়াল রচিত না হলে
মৃত্যুর শর্ত হয় না পূরণ।
তাই, জেনে রেখো, প্রিয়
এই ঘূর্ণন চাকায় আমাদের দেখা হবেই;
সেই আশায় আমি দৌড় থামিয়ে
বসে আছি পথের ধারে;
তুমি এলে আমরা রোদের মধ্যে
ঘামতে-ঘামতে মেঠো পথে হাঁটব
আর শুনব বাঁশের পাতার সঙ্গে
পাতার স্পর্শে কেমন হচ্ছে সঙ্গীত;
শুনব, আমাদের হিয়ার ভেতর
আমরা কেমন গান হয়ে যাচ্ছি।
ছবি: বিধান দেব
রাজীব ঘোষাল
দরগাহ
জ্যোৎস্নার সঙ্গে ছায়া রিফু করে
অন্যরকম একটা চাদর তৈরী হলে
দরগায় কার যেন পবিত্র কণ্ঠস্বর
ঘুরে ঘুরে ছড়াতে থাকে ফুলের সৌরভ।
অদৃশ্য ফুলের পরাগে
যেন বা প্রজাপতিরা ঘুমিয়ে পড়ে তখন...
তাদের গুম্ফা বেয়ে পার হয় রাত্রির প্রহর।
ভোরের কুয়াশা মোহিত চোখ মেলে
দেখে প্রজাপতির ডানা বেয়ে অজস্র প্রেমের চিহ্ন
উড়ে চলেছে...
গোপন অভিসারিকা
গোপন অভিসারিকা তার কপালে অভিনব কুঙ্কুম...
ভুরুতে ঘন কালো মেঘ।
চোখের মণিতে আঁকা যুগল প্রেমালাপী,
ক্রমশ উজাড় করে দেওয়া ঠোঁট
কামনার বাহুডোরে সঁপে, নিজেকে খুলতে থাকে...
শুকনো পাতায় বেজে ওঠে বেদনাযাপন।
ভাবতে থাকে গাধার দুধে প্রসাধনের দিনগুলি
গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো জলে ডুব দিয়ে
কীভাবে যেন চির বিরহিণী হয়েছে!
জিরাফ
আকাশগঙ্গার দুইপাড় জুড়ে বিচিত্র সাজানো
গাওয়া ঘিয়ে জ্বলতে থাকা বিষ্ণুপুরী চৌকো লণ্ঠন।
লণ্ঠন ঘিরে অজস্র সোনালি পোকার
তা তা থৈ নাচ মেনকাকে হার মানায়...
আকুল তৃষ্ণা নিয়ে একটি জিরাফ
গলা বাড়ায় আকাশগঙ্গার দিকে।
পেট ভরে ওঠার পরেও তার তৃষ্ণা
যেন ফুরোয় না...
ক্রমশ নিজের গলা আরো আরো লম্বা করে তোলে...
ছবি: বিধান দেব
শরৎ চট্টোপাধ্যায়
ইচ্ছে
অনেকটা দূর মানে অনেকটা পথ নয়
দীর্ঘ সে দূরত্বের ফুলগুলো
যা চেনায়,তার নাম ভালোবাসা
তিনিও হেঁটেছেন এইভাবে
আমাদের সন্তর্পন অভাব ও সঙ্গম
ইচ্ছেগুলোর দিকে যেভাবে এগুতে থাকে
লাল
দর্শন এর ভুবনবালিকা
মনের ঐশ্বর্য ভেঙে
এখনও স্থির শরীর নির্মাণ
আমিই একমাত্র চিনি আমার প্রেম
গাঢ়,অবিনশ্বর ও লাল
কৌটো
সে থাকে আমার ভিতর
জরুরী বিভাগে
কোনো পাসওয়ার্ড সাহায্যে নেই
ছবি: বিধান দেব
সৈকত ঝরনাপুত্র
ভাঙনপর্ব
১
ঠুকে দিয়ে মাথা, অবনত হই রোজ
কারণ বাতলে দিলে হয়ে যাবে চুরি
তবুও নদীর কাছে তুমি
চরে বসে চেয়ে গেছ শত জোয়ারের ধ্বনি।
২
চুরি চুরি হয় ধনী, (ঘরবাড়ি মনের প্রাসাদে)
আমাদের নতুন অভিধা শীতের বাতাস
ছুঁয়ে খেলাহীন জল খোঁজা
দেখে শিখে নাও পথে পথে রাহাজানি
কাঁটাশেল আকালির মরণ কামড়।
৩
জলাঘাতে ভেঙ্গে যাক যেটুকু নির্মাণ
তোমার ওই অভিমুখ জুড়ে
দিনদিন ক্লান্তি আসে হেসে
বসবাস জুড়েছে নতুন বাজারে।
৪
কল্পনা মুছে দিক আমাদের তরুণ যুবক
গ্রামে গ্রামে ঝাড় ভরা বাঁশে
আগুনে জোয়ারে মাচায় গান বাজে
শস্যের অবিরত বাঁশি
নিঝুম আকাশের দিকে লেখে নাম
হাওয়া আর শূন্যের ক্যানভাসে।
আরগ্য থেকে দূরে
ফেলে যাওয়া হচ্ছে চটকের পুঁজি
নারকীয় ঘাত এখন প্রচ্ছন্ন করে
সেঁজুতির আলো উঠে গেছে ধুয়ে-মুছে
চুলকানি শুদ্ধ ক্ষতে নিজেকে ছড়িয়ে
বেচে দিই খুচরো দামে পাইকার দোকানে।
মিছে বটগাছ, নিয়ে গোপন আরোগ
চুলে ধরে জট,
ভেসে যায় শহরের অথৈজলে।
দূরে ধানচষা ক্ষেত, পুরোনো ছবি বাঁধাই হত আগে
এখন শলাকার নিচে কেবল পুঞ্জিভূত আলো
যতদূর শোনা যায় তোমাদের গান,
ততদূরই নেচে যান গ্রামীণ ঈশ্বর
আমিতো পরকালে শ্রোতা, কোথায় পাঠাবে আমাকে!
পরকাল মুছে দেয় যারা
চালা ঘরে নির্লিপ্ত যাপন
পেট, ঘরে জ্বলল আগুন
টিন টিন কেরোসিন
তার উপর আগুন সকল।
এক গ্রাসে ডুবে গেল তলাতল, অচীন শহর
তোলপাড় বুকে এখনও বেজে চলে--
গোপন ডেরায় লেখা আছে
'আদপে ভালো থাকা যায় না বোধায়।'
জয়দেব মেলা
শুকনো প্রস্তর আর সামান্য ছাই দেখে
ওরা আমায় বলেছিল গড়ে নেব জমি নিশ্চয়।
এত ধোঁয়াটে পরিবেশে কষ্ট হয় অনেক বেশি
কয়লার স্তূপ আর জ্বলন্ত আগুনেও।
তবু, প্রেমিকার হাত ধরে নিশ্চিন্তে তমালতলায়...
দূর থেকে দূরে সংযমহীন কেঁদে ফেলে অপরিণতের মত।
কষ্টের এই ইটভাটায় শোকের পোশাক পরে
উপরে তাকিয়ে, মেগেছে জল, বায়ুর কাছে।
এভাবেই কোন এক মিশরীয় ঘুম!
ফুলের পাপড়ি ছড়ানো রাস্তায় বসেছে দরজা,
এ রাস্তায় আসা হবে বছরে একবার মত।
চাতক পাখির মত বসে আছে কলেজ ছাত্রী
উল্টো ফুটে গাড়ির কাঁচে ওর মুখ
ফুটে আছে লালমাটির অজয় হয়ে।
যেদিকে তাকাই শুধু বালি
বালির উপর দামাল পৃথিবীর হামাগুড়ি
দেখতে চাওয়া ছেলেটির মত
টেমস পাড়ে খুঁজে চলে লজ্জা পোশাক।
চুলের কাঁটা খুঁজে ক্লান্ত বংশীবাদক এভাবে দাঁড়ায় বৃন্দাবনে।
বিনুনির মত বয়ে চলে যমুনা
রাধার মনের মত পারাপার ভেঙে।
ভাঙা চুল্লি আঁচের মত জেগে আছে অগ্নিকুণ্ড বেঁধে
তীব্র জ্বরে, কাঁপা কাঁপা শরীরে
বেশকিছু কার্যকলাপ বেঁচে আছে আমার আর তোমার অজুহাতে।
ছবি: বিধান দেব
অরুণ পাঠক
ভুল
ভুল হয়ে পড়ে আছি। আরেক আশ্চর্য এসে তুলে নেবে ঠিক। গহীনে তো সবই সমান। ওপরের তুচ্ছ কম-বেশি, সাধু ও ডাকাত--- এক ক্ষমাসনে বসে। তাই এই বাক্যের শরীরে পুঞ্জীভূত স্তিমিত তারায় ভরে আছি জোনাকির মতো। এই এক মাতৃদেশ, অতুলন ধরিত্রীর যেটুকু বিস্ময় ধরে রাখি, সেটুকু সঞ্চয়। স্পৃহা কি গর্বের মতো? আলোতে-বাতাসে আর বেড়ে ওঠা ধ্বংসের কিনারে সমর্পণ? জমিয়ে রাখার নেশা সাধুগিরি নয়। শাসন তো ভোলা ময়রাও পারে। আমার অর্জন শুধু আশ্চর্যকে বলা। আমার জীবন শুধু সংগীতের বিধি, আমার জীবন শুধু ছবির রেখারা। বার বার সেধে তোলো সুর বার বার সেরে তোলো রং। ওই বিদ্যুৎচমকে সিদ্ধ পরিযায়ী বিন্দু আমি আকাশের। ওই আত্মগোপনের পরিভাষা আপেক্ষিক সামাজিক আলো মুছে দেয়। তাই দড়ি হয়ে পড়ে আছি সাপ, জ্ঞান হয়ে নিজের ছোবলে।
দূরে
তোমার প্রকাশ থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করো। গতির দুঃস্বপ্নে আমি একা নই পথের রাবণ। দানবসুখের রাজ্য পড়ে থাক। আমি চক্রে বিদিত উন্মুখ নিয়ে বসতে চাই জলসজ্জার বিস্তারে। কথা মুখ পার হয়ে নতুন ঊষায়। চিরকালই আকাঙ্ক্ষায় নেমে আসা তোমার খেলায় পরাঙ্মুখ দেবতারা তুলে ধরে সবুজ আশিস। পূর্ণ হতে থাকি। স্বাতন্ত্র জাগে। দিগন্তের কল্পতরু হাত নাড়ে। আমি প্রকাশিত আকাশ-শাবক থেকে আমার পা-দুটি তুলে নিই। সামাজিক তৃষ্ণার অভয় থেকে দূরে স্বেচ্ছাচারী মেঘের বিছানায়।
মানুষ যতটা উঁচু
আনন্দ পাঠানো স্রোত পেঁচিয়ে ধরেছে। কান্না ও হাসির গাছ পরস্পর দাঁড়িয়ে আমার উঠোনে। সব ফুল আমার মাথায় রেখে যাবে। বেঁচে থাকা বিষাদ গলানো মোম। জ্বলে ওঠে। ফুঁ দিয়ে নেভাই। জ্বলে ওঠে। আপন ভায়ের মতো বিগলিত নদীর স্বভাবে কেউ রেখে গেছে মানপত্রখানি। সব সাধুকথা পৃথিবীর ভরের সমান। তা কখনও আমার হবে না। আমি শুধু পুলকিত গাছের পাতায় যে হাওয়া এসে লাগে, তার একটা নিগূঢ় নয়ন খুঁজে পেয়ে মনে মনে শের হয়ে আছি। নেচে ওঠা মন দুচোখ সহানুভূতি নিয়ে বেশ খানিকটা ঘুরে এল। তরঙ্গ-নিস্ফল আমি অপেক্ষারত। এতটা নির্দয় আমি প্রভাত রক্তিম করে দিবস পাথর হয়ে আছি। শস্ত্রের বিশদ মালায় এত মায়ামেঘ তবু দিগন্ত পেরোতে গিয়ে দেখি বৃষ্টি আটকে আছে সীমান্তের পারে। মানুষ যতটা উঁচু ততখানি।
ছবি: বিধান দেব















