বুধবার, ৩০ মার্চ, ২০২২

সম্পাদকের কথা


দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২


 খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর বাঁধ। আমরা জানি। কিন্তু আমাদের বেঁধে বেঁধে রাখার জন্য কবিতা ছিল। কবিতা কী করে? সে প্রশ্ন বার বার মনে এসেছে। কিন্তু বিভিন্ন প্রেক্ষিতে তার জবাবও পেয়েছি। যেকোনও সামাজিক-রাষ্ট্রিক নিপীড়ন লাঞ্ছনার প্রতিবাদে কবিকে তলব করা হয়েছে শেষ পর্যন্ত। কবিতাই ধার্মিকের ঢাল অধার্মিকের তলোয়ার। নিজেকে লুকানোর গুপ্তগুহা। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন —
'এসো যুগান্তের কবি
আসন্ন সন্ধ্যার শেষ রশ্মিপাতে
দাঁড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে;
বলো, 'ক্ষমা করো'—

হ্যাঁ, সবাই এখন ব্যস্ত 'কবিরা কোথায়'?

যখন সত্যিই কারোর কিছু করার থাকে না তখনই কবির প্রকৃত প্রয়োজন হয়। এখন সেই সময়। টিমটিমে জ্যোৎস্নার আলোয় মৃদুমন্দ বসন্ত বাতাসে সুমিত কণ্ঠে ছন্দোচর্চা না করে কবির এখন সময় হয়েছে ক্ষমা চাওয়ার। ঠিক যেমন এর আগে আগেও কবি করেছেন। পৃথিবীতে দুর্দিন যখনই ঘনিয়ে এসেছে ঠিক তখনই। 

নয়া বৃহদারণ্যক ।। দেবাশিস দাশ


 


*৫. আত্মতত্ত্ব* 

আবার তিনের খেলা— কর্ম, নাম, রূপ

আলাদা আলোয় এরা তাসের তুরুপ।

'উক্থ' মন্ত্রে ত্রিবিধের উত্থান বর্ণিত।

বাক, চক্ষু ও শরীর— তিন ব্রহ্মে ধৃত—

যথাক্রমে নাম, রূপ আর কর্ম, তাই

সাম মন্ত্রে সাম্য গেঁথে ব্রহ্মত্ব শোনাই।—

বাক মানে শব্দ, সব নামের ধারক 

রূপের সমীকরণ বোঝে শুধু চোখ। 

শরীরই কর্মের ব্রহ্ম— ধারক বা সাম

তিন ব্রহ্ম মিলেমিশে গড়ে অন্তর্যাম।

বাক, চোখ, দেহী আত্মা— প্রত্যক্ষ গোচর

নাম, রূপ আর কর্ম পরোক্ষ, ধূসর। 

আলাদা হয়েও আল্লা আশ্চর্য একক— 

তিনি প্রাণশক্তি, তিনি বৃহদারণ্যক 

শ্রুতিতে দুর্জ্ঞেয় আত্মা, তিনিই অমৃত 

নাম-রূপ সত্তা তাঁকে করেছে আবৃত।


আত্মাই অমৃত, আত্মা একাকিত্ব-ভয়

অচিরে কাটিয়ে উঠে গড়েন আশ্রয়। 

আদিতে ছিলেন তিনি অব্যক্ত অরূপ 

দ্বিতীয় ইচ্ছায় হন উভলিঙ্গ-স্তূপ।

আদিতে সমস্ত ছিল ব্যাকরণহীন

আত্মবান মৃত্যু একা শান্তিতে বিলীন।

অকস্মাৎ মহাকাল স্বভাব-ঈক্ষণে

স্ফূর্ত হয়ে চতুর্লোক গড়েন বিজনে।

সেই সঙ্গে লোকপাল পুরুষ নিমেষে

পিণ্ডরূপ অণ্ড ফেটে পঞ্চেন্দ্রিয়-বেশে

আকৃতি নিলেন দেহে, এবং নিজেকে

ব্রহ্মরন্ধ্রে গুঁজে, খুলি দিয়ে নেন ঢেকে।

নাভিমূলে মৃত্যু আর হৃদিমধ্যে মন,

শিশ্নদ্বারে প্রজাপতি আবির্ভূত হন।

অন্যান্য ইন্দ্রিয় সব দেবতা-প্রতীক— 

চোখে সূর্য, নাকে বায়ু, কানে দিকপতি,

জিভে অগ্নি, ত্বক-রোমকূপে বনস্পতি।

অন্যদিকে পঞ্চভূতে ব্যাকৃত গতিক— 

প্রকৃতির ঘনীভূত রূপই অন্ন, তার 

গ্রাহক অপানবায়ু, নাভিতে আহার। 


এইসব আলবাল নানা গল্পচ্ছলে 

পরমাত্মা-জীবাত্মার ভাবরঙ্গ চলে। 

মোদ্দা কথা, টাইম-স্পেস— মানব-শরীরে

রহস্য ভাষায় ব্যক্ত হল ধীরে-ধীরে।


সৃষ্টিতে প্রবিষ্ট আত্মা অনাম-অকায়

নাম-রূপে মূর্ত হন প্রত্যেক সত্তায়।

ওঙ্কার তাঁরই নাম— বাক-রসনায়

বিকৃত আকৃতি তিনি চোখের তারায়।

তিনিই অমৃত, যিনি প্রাণের স্বরূপ

সমস্ত কর্মের মূল তিনিই কামরূপ।

মূর্ত ও অমূর্ত— দুই শিল্পে তাঁকে চিনি 

আমি গঙ্গানদী হলে মহাসিন্ধু তিনি। 

পাশ্চাত্য দর্শনে সিন্ধু ঢোঁড়ে ওল্ড ম্যান 

প্রাচ্যের চৈতন্যে তিনি ধ্যানলব্ধ জ্ঞান।


ছবি : বিধান দেব 


দেবাশিস দাশ। মিনিস্ট্রি অভ্ কালচার থেকে কবিতা নিয়ে জুনিয়র ফেলো নির্বাচিত হয়েছেন। শিবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন বিচ্ছিন্নভাবে। কবিতার জন্য উত্তরবঙ্গে ভ্রাম্যমাণ। স্বনামে ও ছদ্মনামে কবিতা ও গল্প লিখেছেন দেশ, আনন্দমেলা, সানন্দা, কবিতীর্থ, কৃত্তিবাস, ভাষানগর ও অন্যান্য বহু পত্রপত্রিকায়। অনুবাদ করেছেন টেড হিউস এবং জেমস জয়েসের কবিতা। 
কাব্যগ্রন্থ: পাথুরে মানুষ, মাটির মানুষ, কবিতীর্থ। জ্বলন্ত মৃত্যুর মুখে বাঁশি, কৃত্তিবাস। অণুজীবনের দীর্ঘশ্বাস, যাপনচিত্র। বিচালিঘাটের কথা, কুবোপাখি। মেঘে আঁকা ভাঙা সেতু, সিগনেট প্রেস।


জন্মের আগের মুখ ।। চন্দন মিত্র


 

জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন কোয়ানের অমায়িক ভুবন     


 ষোড়শ পর্ব

সামন্ততান্ত্রিক জাপান :

দাইমিয়ো, সামুরাই, শোগুন, শোগুনশোকু ও জোদো শু-র উত্থান   

 

হেইয়ান যুগের সময়সীমা ৭৯৪-১১৮৫ খ্রিস্টাব্দ। এই যুগের শেষের দিকে ফুজিওয়ারা, মিনামোতা, তাইরা, তাচিবানা প্রভৃতি পরিবারকেন্দ্রিক কিছু শক্তিশালীগোষ্ঠী মাথা চাড়া  দেয়। তারা সরাসরি রাজ-সিংহাসনের দাবি না-করলেও শাসনক্ষমতার নিয়ামক হয়ে  ওঠার জন্য নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে থাকে। বিভিন্ন প্রদেশের জমিজমা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা করে নেয়। সরকার তাদের এই সামন্তপ্রভু তথা জমিদার হয়ে ওঠাকে আটকাতে না-পেরে প্রকারান্তরে তাদের এই অনৈতিক দখলদারিত্বকে স্বীকৃতি দেয়। এই সামন্তপ্রভুরা জাপানে দাইমিয়ো নামে চিহ্নিত হয়ে আছে। সরকার তাদের তুষ্ট করার জন্য তাদের সম্পত্তির কর মকুব করলেও তারা কিন্তু নিজেদের দখলীকৃত অঞ্চলে বসবাসকারী কৃষকদের কাছ থেকে  চড়া হারে কর আদায় করত। দুর্ভিক্ষ বা মহামারী কবলিত সময়েও তারা প্রজাদের অব্যাহতি দিত না। এই দাইমিয়ো সামন্তপ্রভুরা নিজেদের বাহিনী গড়তে গিয়ে সামুরাই নামক ভয়ংকর যোদ্ধাদের জন্ম দেয়। জাপানি সামুরাই শব্দের অর্থ পরিষেবা দান। এই যোদ্ধারা ঘোড়ার পিঠে চেপে তলোয়ার ও তীরধনুক নিয়ে লড়াই করত। মাথায় থাকত শিং-শোভিত শিরস্ত্রাণ, বুকে থাকত চামড়ার বা ধাতুর বর্ম। সামুরাইরা কঠোরভাবে মেনে চলত তাদের নিজস্ব যুদ্ধনীতি বুশিদো (বাংলা অর্থ, যোদ্ধার পথ)। এই নির্ভীক যোদ্ধারা সামন্তপ্রভুদের সম্মান রক্ষার জন্য নিজেদের জীবন দিতেও পিছপা হত না। পরাজিত হয়ে বন্দি জীবন যাপনের থেকে আত্মহননকে তারা শ্রেয় বলে মনে করত। আত্মসম্মান রক্ষার জন্য তারা তলোয়ার বা ছুরি দিয়ে নিজেদের পেট চিরে আত্মহত্যা করত। আত্মহননের এই পদ্ধতি হারাকিরি নামে প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে

    ১১৮০ খ্রিস্টাব্দে জাপানের প্রভাবশালী দুই গোষ্ঠী তাইরা ও মিনামোতো নিজেদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী এক ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ে। এই যুদ্ধ গেনমেই কাসসেল নামে জাপানের ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। ১১৮৫ খ্রিস্টাব্দে তাইরা গোষ্ঠীর পরাজয়ের মাধ্যমে এই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। মিনামোতো গোষ্ঠীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন মিনামোতো নো ইয়োরিতোমো। সে সময় গো-তোবা (শাসনকাল, ১১৮০-১২৩৯ খ্রিঃ) ছিলেন জাপানের সম্রাট। তিনি এই ভেবে আশঙ্কিত হন যে, এবার  বোধহয় ইয়োরিতোমো সিংহাসনের দাবিদার হয়ে উঠবেন। তিনি তড়িঘড়ি করে তাঁকে শোগুন উপাধিতে ভূষিত করেন। শব্দটি ‘সেএইতাই শোগুন’ শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ ;   যার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায়, বর্বরবিরোধী বাহিনীর অধিনায়ক। এই উপাধি দানের  মাধ্যমে তিনি ইয়োরিতোমোকে সেনাপতিত্বে বরণ করে নেন। এই ঘটনা জাপানের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করে। সেনাপতির পদ পেয়ে ইয়োরিতোমো রাজধানী হেইয়ান (বর্তমান, কিয়োতো) ত্যাগ করে তিনশো চল্লিশ কিমি দূরে কামাকুরা নগরে চলে যান। সে সময় কামাকুরা ছিল হনশু দ্বীপের এক অখ্যাত উপকূলীয় অঞ্চল। রাজধানী থেকে নিরাপদ দূরত্বে বসে ইয়োরিতোমো, তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবায়নের পথে পা-রাখেন। ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে তিনি কামাকুরাতে সামরিক রাজধানী স্থাপন করেন। এই ঘটনার মাধ্যমে জাপানে সূচিত হয় দীর্ঘস্থায়ী কামাকুরা যুগ (১১৯২-১৩৩৩ খ্রিঃ)। সামুরাই যোদ্ধাদের সহায়তা তখন তাঁকে প্রায় অজেয় করে তুলেছে। সম্রাট গো-তোবা সব জেনেও নীরব থাকলেন। ফলত, জাপানে শুরু হল  দ্বৈত-শাসন-ব্যবস্থা। সম্রাট থাকলেন নামসর্বস্ব, প্রকৃত ক্ষমতা থাকল শোগুন তথা সামরিক প্রধানের হাতে। এই ব্যবস্থা জাপানে শোগুনশোকু নামে পরিচিত। ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে মেইজি যুগ সূচিত হওয়ার আগে পর্যন্ত শোগুনশোকু জাপানে বহালতবিয়তে টিকে ছিল।

    হেইয়ান যুগের শেষের দিকে তেন্দাই ও শিঙ্গন বৌদ্ধ সম্প্রদায় যথেষ্ট প্রভাব ও প্রতিপত্তি লাভ করেছিল। এই দুই সম্প্রদায় রাজপুরুষ ও অভিজাতদের সমর্থন পেয়ে পল্লবিত হয়ে ওঠে। কামাকুরা যুগের সূচনায় হোনেন শোনিন (১১৩৩-১২১২ খ্রিঃ)  জোদো শু নামের পৃথক এক বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রবর্তন করেন। হোনেন, প্রথম জীবনে  ছিলেন তেন্দাই সম্প্রদায়ের একনিষ্ঠ কর্মী। কিন্তু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল কার্যকলাপে বীতশ্রদ্ধ হয়ে তিনি নতুন পথের সন্ধান করতে থাকেন। বিভিন্ন মঠ ও  গ্রন্থাগারে ঘুরতে ঘুরতে একদা তাঁর হস্তগত হয় চিনা বৌদ্ধ সন্ন্যাসী শানতাও (৬১৩- ৬৮১ খ্রিঃ)-এর ভাষ্য সমন্বিত ‘অমিতায়ুরধ্যান সূত্র’ গ্রন্থটি। এই গ্রন্থের একটা অংশে তাঁর চোখ আটকে যায় “কেবল অমিতাভ বুদ্ধের নাম জপ করুন। হাঁটুন, দাঁড়ান, বসুন  বা শয়ন করুন একবারের জন্যও জপ বন্ধ করবেন না। সমস্ত সংকট কেটে যাবে ; এটাই বুদ্ধের প্রকৃত পথ।” চিনদেশে প্রচলিত ‘জিং থং জোঙ’ (ইংরেজিতে ‘পিওর ল্যান্ড’ ; বাংলাতে ‘বিশুদ্ধ ভূমি’) নামের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপাস্য এই অমিতাভ বুদ্ধ। চিনে তৃতীয় খ্রিস্টাব্দে এই সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল। শানতাও ছিলেন উক্ত সম্প্রদায়ের প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে উত্তর-পশ্চিম ভারতের এক সন্ন্যাসী রাজপুত্র ধর্মকর বা ধর্মকারা একটি পুথি লেখেন ‘সুখবতীব্যূহ সূত্র’। এই সূত্রে তিনি পাঠকদের আশ্বস্ত করেছিলেন যারা তাঁর নির্দেশিত পথে চলবেন তিনি নিজের তপোবলে তাদের জন্য এক জগৎ বানাবেন। তিনি তাঁর নির্মিত সেই জগতে অমিতাভ  বুদ্ধ হয়ে অনুগামীদের প্রতীক্ষায় থাকবেন। ‘সুখবতীব্যূহ সূত্র’ চিনে পৌঁছায় খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকে। মূলত এই সূত্রের প্রভাবেই চিনদেশে ‘জিং থং জোঙ’ সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল। ভারতীয় অমিতাভ চিনা উচ্চারণে হয়েছিল এইমিতোফু, এবার জাপানি উচ্চারণে তা হল, অমিদা। হোনেন ১১৯৮ খ্রিস্টাব্দে লিখে ফেললেন ‘সেনচাকু হোঙগান নেমবুৎসু শু’ নামের এক পুস্তক। সেখানে তিনি অমিদা বুদ্ধের নাম জপের মন্ত্রটি  এইভাবে উল্লেখ করেন, ‘নামু অমিদা বুৎসু’ (বাংলা, আমি অমিতাভ বুদ্ধের শরণ নিলাম)। এই জপমন্ত্রের সংক্ষিপ্ত রূপ ‘নেমবুৎসু’ অচিরেই মুখে মুখে ফিরতে থাকে। হোনেন আসলে নতুন কোনো বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সূত্রপাত করেননি। তিনি চিনে  প্রচলিত ‘জিং থং জোঙ’-এর জাপানি-সংস্করণ করেছিলেন মাত্র। ‘সুখবতীব্যূহ সূত্র’ অনুযায়ী অমিতাভ বুদ্ধ ‘পশ্চিম স্বর্গ’ নির্মাণ করে তাঁর অনুচর বোধিসত্ত্বদের নিয়ে অপেক্ষমাণ। শরণাগতদের তিনি তাঁর নির্মিত সেই অক্ষয় স্বর্গে স্থান দিতে বদ্ধপরিকর। কেবল তাঁর নামজপ করলেই অনুগামীরা পুনর্জন্ম পাবে। পশ্চিম স্বর্গে তারা পাবে পদ্মসম্ভব জীবন, অর্থাৎ তারা মাতৃগর্ভ নয় পদ্ম থেকে জন্ম নেবে। সেই স্বর্গে ব্যাধি, বার্ধক্য বা মৃত্যু নেই, আছে অপার শান্তি ও সৌন্দর্য। সেখানে আছে সুন্দর পোশাক ও সুখাদ্যের বন্দোবস্ত। কোনো রিপুর তাড়না নেই সেই স্বর্গে। সেখানে সুদৃশ্য প্রাসাদগুলি মূল্যবান রত্নমণ্ডিত, ভূমি আচ্ছাদিত সোনার পাতে। অতিকায় পদ্মের দল সেখানে সুবাস ছড়াচ্ছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে স্বর্গীয় সুর ও সুবাস। এই একবিংশ শতাব্দীতেও মানুষ যুক্তিবুদ্ধি বন্ধক দিয়ে স্বর্গের লোভে নিজেকে বা অন্যকে ধ্বংস করতে পিছপা হচ্ছে না, আর সামন্ততান্ত্রিক মাৎস্যন্যায়পীড়িত সাধারণ জাপানিদের  কাছে এই লোভনীয় আশ্বাস যে মৃতসঞ্জীবনীর মতো সুপেয় হয়ে উঠবে তাতে আর আশ্চর্য কী ! এমন স্বর্গ নাগালে এনে দেওয়ার জন্য হোনেন রীতিমতো প্রণম্য হয়ে উঠলেন। ক্রমশ তাঁর অনুগামীদের সংখ্যা বাড়তে লাগল। দারিদ্র্য, মহামারী, দুর্ভিক্ষ, ক্ষমতাশালীদের অত্যাচার বিড়ম্বিত করে তুলেছিল সাধারণ মানুষের জীবন। তারা হোনেন-এর দেখানো পথে হাতে যেন স্বর্গ পেল। জীবনের দিনগত পাপক্ষয় থেকে পলায়নের এক প্রশস্ত পথ পেল তারা। নাম জপের মাধ্যমে তারা মনের বিবিধ বিকার থেকেও মুক্তি পেল। হোনেন-এর এই উত্থানে তেন্দাই ও শিঙ্গন সম্প্রদায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাল। তারা ‘সেনচাকু হোঙগান নেমবুৎসু শু’ পুস্তকটি যেখানে পেল পোড়াতে শুরু করল। তাদের মন্ত্রণায় সম্রাট ৎসুচিমিকাদো (১১৯৮-১২১০ খ্রিঃ) ১২০৭ খ্রিস্টাব্দে হোনেনকে রাজধানী শহর হেইয়ান থেকে দূরবর্তী তোশো নামক স্থানে নির্বাসিত করেন। কেবল তাই নয় হোনেন-এর অনুগামীদের কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়, এমনকি প্রাণদণ্ডও দেওয়া হয়। জনমতের চাপে ১২১১ খ্রিস্টাব্দে হোনেনকে আবার হেইয়ানে ফিরিয়ে আনা হয়। কালক্রমে হোনেন কর্তৃক প্রচারিত জোদো শু জাপানের অন্যতম জনপ্রিয় বৌদ্ধ সম্প্রদায় হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিককালেও জাপানে এই সম্প্রদায়ের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি।  

 

তথ্যঋণ       



A Guide to Japanese Buddhism Published by Japan Buddhist Fedaration, 2004.

A New History of Shinto by John Been and Mark T. Ueen ; Wiley –Blackwell 2010.

Studies in Japanese Buddhism by A. K. Reischuer ; The Macmillan Company 1917.

A Brief History of Japan : Samurai, Shogun and Zen by : Tuttle Publication 2017.

A History of Japan by K. G. Henshall : Palgrave macmillan 1999.   

Pure Land Pure Mind : The Buddhism of Master Chu-hung and Tsung-pen ; Translated by J. C. Cleary. The Corporate Body of the Buddha Educational Foundation 1994.  

ছবি :বিধান দেব 


  চন্দন মিত্র। ।    জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৬, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ডায়মন্ড হারবার মহকুমার ভগবানপুর (হরিণডাঙা) গ্রামে। বাংলা ভাষা-সাহিত্যের শিক্ষক। কবিতা লেখার সূত্রে লেখালেখির জগতে প্রবেশ। লেখেন প্রবন্ধ ও গল্প । 

প্রকাশিত পুস্তক   : 

কাব্য পুস্তক : আমার আত্মার পায়ে বাঁধার ঘুঙুর, যাপনচিত্র, ২০১৯; সরলতা ক্রমশ গায়েব হইতেছে, সাহিত্যের বেলাভূমি ২০২০

প্রবন্ধ পুস্তক : জেন : রিপুতাড়িত মানবের নিকট সুসমাচার ও অন্যান্য প্রবন্ধ, কলিকাতা লেটার প্রেস, ২০১৯ 

সম্পাদিত পত্রিকা : পাড়ি





পাঠকের হাট ।। অরুণ পাঠক


 চাঁদের জমানো জলে মেঘ রঙ ছায়ার ফড়িং



যে কবিতা পার হতে গেলে মেঘের প্রতিরোধ এসে যায় সেরকম কবিতার মুখোমুখি বসে আমি বড় হয়েছি। বীজনের নেশায় তীব্র অশরীরী এক ঘোর আমার কবিতাশৈশবে যে সব কবিতার সামনে আমাকে দাঁড়াতে দিয়েছিল, যেসব কবিতার প্রত্যেকটি শব্দ তসবিহের দানার মতো এককালে আমি জপ করতাম তাদেরই স্রষ্টাদের একজন যখন দেশের মানচিত্র টপকে পার্শ্ববর্তী আরেক দেশের অপর একটি দেওয়াল এনে জুড়ে দেন নিজের মেঝেতে তখন বিস্ময়ের চেয়েও বেশি জাগে  সমৃদ্ধির প্রশ্ন। প্রসঙ্গত জানাই পার্শ্ববর্তী দেশ নিয়ে মাতোয়ারা আমার দেশের কিছু কবিবন্ধু যখন আহ্লাদের সঙ্গে নিজের দেশের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার সীমা লঙ্ঘন করেন তখন তাঁদের সেইসব আচরণকে নিতান্ত ফেক এবং অসভ্যতা বলে মনে হয়। কিন্তু সেসবের বিপরীতে যখন পড়ি:

'সকাল থেকে অন্ধকারে হাত ডুবিয়ে বসে আছে শাহীন। তার চোখের ভেতর ভেসে চলেছে নৌকো অথবা পালতোলা সোনার জাহাজ।'
                               (কব্জি কেঁদে ওঠে শাহীনের)
কিংবা

'কিছু মেঘ রোদ চুরি করে পালাচ্ছে, আর কিছু নক্ষত্র পুলিশ হয়ে ধাওয়া করছে তার পিছু। চোর পুলিশের এই 'খেলায় আমার ভূমিকা নিতান্তই দর্শকের, কিন্তু যখন ক্যাসিনোকে হটিয়ে পেঁয়াজের কিছু ঝাঁজ এসে গ্রাস করে নিলো চোখের করোটি, ঠিক তখনই ঘুম ভাঙল রাখালের, শষ্যের শেষ রক্ষায় মাঠে নেমে এলো কবি।'
                                                              (কবি)

উল্লিখিত দুই কবিতাংশের প্রথম কবি সৌমিত বসু এবং দ্বিতীয় কবি শাহীন রেজা । প্রথমজন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আর দ্বিতীয়জন বাংলাদেশের আটের দশকের খ্যাতিমান দুই কবি। একই উপমহাদেশের দুই বিচ্ছিন্ন বঙ্গ প্রদেশের একই সময়ের এই দুই কবির এক মলাটের ভেতর দুটি দুফর্মার কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা ২০২২-এ।
১। চাঁদের জমানো জলে মুখ দেখা যায়— সৌমিত বসু
২৷ মেঘরঙ ছায়ার ফড়িং—  শাহীন রেজা

দুজনেই বহুপ্রজ কবি। দুজনেরই প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ সংখ্যা ছাব্বিশ।
সৌমিত বসুর সুদীর্ঘ কবিতাযাত্রার ইতিবৃত্ত ইতিপূর্বে আমি লিখেছি। আটের দশকের প্রতিভাবান এই কবি নিজেকে বহুবার ভেঙেছেন। প্রশ্ন করেছেন নিজের কবিসত্তাকে। চ্যালেঞ্জ করেছেন, ঝুঁকি নিয়েছেন। নিজের স্বতন্ত্র কাব্যভাষা খুঁজে পেতে একজন কবিকে কতটা পথ হাঁটতে হয় কবি সৌমিত বসু তার প্রমাণ। অথচ তার পথের আনন্দ, যা আমরা কুড়িয়ে পেয়েছি, অমূল্য সে সব।

'তোমার নখ থেকে কাঠবেড়ালি বেরিয়ে
অসহায়ভাবে আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে
উপমাটি কি অবাস্তব হয়ে গেল খুব?'
                            (তরঙ্গ ছুঁয়ে যায় কবিতার পাতা)

বহুদিন পর কবিকে স্বমেজাজে পেলাম মনে হচ্ছে। নখ থেকে কাঠবেড়ালি বেরিয়ে আকাশে উড়ছে— এই অসামান্য দৃশ্য তো একজন কবিই দেখতে পান! যদিও কবি এই দৃশ্যটিকে খুব অবাস্তব কিনা প্রশ্ন করেছেন তার পাঠকদের। যদিও সেই অবাস্তবতার অনর্থ নিয়েই তিনি সারাজীবন বাঁচতে চান।




'আমি এই কাঠবেড়ালি, মেঘ আর আকাশ নিয়েই বেঁচে থাকতে চাই। সারাটাজীবন।' প্রাত্যহিকতার সব প্রয়োজনের বাইরে দাঁড়িয়ে একজন কবিকে মোকাবিলা করতে হয় একঘেয়ে সমস্ত প্রণালীর। আর এগিয়ে দিতে হয় এক অকৃত্রিম সাধুস্বভাব।

'সম্পর্কগুলো থমকে রয়েছে ভেবে কাঁধে হাত রাখি
লাউডগার মতো কাঁধ, মাখনের ভেতরকার ছুরির মতো
আমার হাত বসে যায় তার কাঁধের ভেতর।
তখন সামনের গলি ওয়াক করে উগরে দিচ্ছে চাঁদ।'
                                                                        (ঝড়)
সৌমিত বসুর কবিতার মধ্যে এক অন্ধকার আর্তি থাকে।
তা একদিকে মেটাফিজিক্যাল ডার্কনেস হতে পারে, হতে পারে ডাডাইজমের ঝোড়োপ্রকল্পোত্তর সব তছনছ। স্পষ্টবাদিতা, বৈপ্লবিক সমাজশাসনের বিরুদ্ধাচরণ তাঁর মধ্যে কি দেখতে সাহায্য করে না নতুন কোনও চারু মজুমদার কিংবা শৈলেশ্বর ঘোষকে!
'একটি ফনিমনসা দু-হাতে আতঙ্ক মেখে নিচুমুখে এসে দাড়াচ্ছে/ গ্যারেজের পেছনে।' (ঝড়)

এই দু-হাতে আতঙ্কমাখা ফনিমনসাই সৌমিত বসুর কবিতা। বেশ কিছু কবিতা তিনি এখানে লিখেছেন বর্তমান বিশ্বে আলোচিত ওয়ার্ড পেন্টিং-এর মতো। শব্দে ছবি সেখানে বেজে যায় সংগীতের মতো।

'ঝড় জঙ্গলের ভেতর থেকে নেমে আসে লালটিপ।
নেমে আসে। আর দু-হাতে সাবান মেখে উড়িয়ে দিয়েছে যারা
তাদের নাভির ওপর চেরা দাগ। ঘুড়ি উড়ছে পতঙ্গ মতো।'
                                                  (গৃহ)

বেশ দীর্ঘ টানা কবিতা। শব্দ—ছবি—সংগীত।

বাংলাদেশের কবি শাহীন রেজাকে প্রথম দর্শনেই ভালবেসে ফেলা যায়। কাকদ্বীপে তিনি একবার এসেছিলেন। সেখানেই আলাপ। ভালোবাসা যার সম্পদ তিনি অনির্বান। কবি শাহীন রেজার কবিতাও জলের স্পর্শের মতো সহজ, আনমিতা। বাংলাদেশের কবিতায় যে আবেগ মাতৃভাষা ও মাতৃদেশকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে তা সত্তর দশক পর্যন্ত বহমান ছিল। আশির দশক থেকে তা কিছুটা বাঁকবদল করে। জীবন ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে যে লড়াই তার পৌনপুনিকতা থেকে বাংলা কবিতার উচ্চারণকে স্বতন্ত্র পথে নিয়ে এসেছেন কবি শাহীন রেজা।

'চোয়ালের কাটা দাগটাকে গোলাপ ভেবে যেদিন তুমি ছুঁয়ে দিয়েছিলে,/ সেইদিন বুঝেছিলাম/ আমার মৃত্যু সে তোমার হাতে।/ লালের জলসায় সারারাত ডাহুকীর গল্প শোনার পর ভোরের আলো/ ফুটে উঠতেই/ ইথারে ইথারে 'আচ্ছালাতু খয়রুম মিনান নউম'।/ জেগে ওঠার মন্ত্রে পুনর্জন্ম আমার; আমাদের।'
                                                            (বিস্মরণ)

শাহীন রেজা প্রেমিক কবি। সে প্রেম হৃদয় নিঙরানো। ইতিহাস দোহন করা।

'বেদনা রেখেছি এঁকে দু'ঠোঁটের ফাঁকে
মনে পড়ে আজ, খুব মনে পড়ে তাঁকে
জানালার গ্রীলে কত পাখি আসে
কত চেনা মুখ আলোজলে ভাসে
সেই আশালতা তবু খোঁজে চোখ
ইকারুসে কি নিপুন করোটির শোক।'
                                    (শামসুর রাহমান)





একটি ছোট্ট এলিজি। সুনিপুন সংহতিতে গড়া। আ মরি বাংলা ভাষায় গড়ে ওঠা কবির মননে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ থেকে শক্তি-শামসুর হয়ে একালের তরুণ কবিরাও এসে যান।
'এখন আকাশে জমে উঠলে ধূসর, মনের বীণায় আহা রবীন্দ্রনাথ; শুধু ভালোবাসাবাসি।' (নিবেদন)

'ক্লাস নাইনের সিঁড়ি পেরুতে না পেরুতেই আমার মগজে ঢুকে যায় বনলতা সেন।'     (বনলতা সিনড্রোম)

'কবি যায়, ট্রামের জানালা দিয়ে ঘুম ঘুম তারাগুলো
ডাকে তাকে; ডাকে ইশারায়।'   (শক্তির জন্মদিনে)

কবি শাহীন রেজা, আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আপনার মেঘমেদুর কবিতা আপনার সরল হৃদয়ের একান্তে আমাদের প্রিয়তম একটি দেশকে চিহ্নিত করে যা একদা আপন মেয়ের মতো নিজের ছিল, এখন আত্মীয় হয়ে গেছে।

চাঁদের জমানো জলে মুখ দেখা যায়— সৌমিত বসু
মেঘরঙ ছায়ার ফড়িং—  শাহীন রেজা
দি সী বুক এজেন্সি ।। কলকাতা ।। ১০০ টাকা ।। প্রচ্ছদ: চারু পিন্টু

ছবি : বিধান দেব 

অরুণ পাঠক ।। জন্ম: ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ কাঁজিয়াখালি, হাওড়ার মাতুলালয়ে। পিতৃভূমি দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সোনাকোপা গ্রাম। সেখানেই আবাল্য বসবাস। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  বঙ্গভাষা ও সাহিত্য-এ  স্নাতকোত্তর।
শিক্ষক শিক্ষণ ডিগ্রিপ্রাপ্ত। পেশা শিক্ষকতা। এই শতাব্দীর সূচনা (শূন্য) দশকের কবি। কবিতা ও কবিতা বিষয়ক  সাহিত্যপত্র 'সাহিত্যের বেলাভূমি ' পত্রিকার সম্পাদক। স্যাক সাহিত্য সম্মাননা, বনানী পুরস্কার, সামসুল হক স্মৃতি পুরস্কার প্রভৃতি একাধিক পুরস্কারে সম্মানিত। কবিতা পড়তে একাধিকবার বাংলাদেশে গিয়েছেন। বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়েছে কাব্যগ্রন্থ 'দ্বিতীয় বার একা'। কবিতাই তাঁর প্রথম এবং একমাত্র আশ্রয়।

সুপুরিবনের ছায়ায় ছায়ায় ।। সুবীর সরকার


 


৯.
আমি আমার ১৮ বছর বয়স থেকে বাবু দার কাছে যাই।বাবু দা, মানে শ্রী দেবজ্যোতি রায়।লেখার মানুষ।মুক্তচিন্তার মানুষ।নকশালবাড়ি আন্দোলনের মানুষ।প্রখর পড়ুয়া।গভীর দুই চোখের ভেতর একজন সন্ত বুঝি।সন্ন্যাসী ও সৈনিক বুঝি।কিভাবে বাবু দার সাথে পরিচয় হয়েছিল আজ আর সেটা মনে নেই।বাবুদা তখন থাকতেন কুচবিহারের পাটাকুড়ার বাড়িতে।একটা স্কুটার ছিল বাবু দার।
তখন তিনি রাজনৈতিক সক্রিয়তা থেকে সরে এসেছেন।নিমজ্জিত হয়েছেন লেখা পড়া মানব অধিকার সংক্রান্ত কাজকর্মে।
আমি সপ্তাহে তিনদিন সাইকেল চালিয়ে বাবু দার বাসায় যেতাম।ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার সামনে বসে থাকতাম।সাহিত্য সমাজ নিয়ে বাবু দা বলে যেতেন নানা কথা।মাঝে মাঝে শোনাতেন নিজের লেখা।
তবে কবিতা নয় বাবু দার গদ্য আমাকে আকৃষ্ট করতো।এখনও করে।নিজের রাজনৈতিক জীবনের নানান অভিজ্ঞতা শোনাতেন তিনি।কত কত মানুষ।ঘটনা।অভিজ্ঞতা।আমি উদ্বেল হয়ে পড়তাম।উত্তেজিত হয়ে পড়তাম।সেই সময় নিজের রাজনীতি আর জীবন নিয়ে একটা বড় গদ্য লিখছিলেন বাবু দা।মাঝে মাঝে শোনাতেন।গণপিটুনি,ধরা পড়া,জেলযাত্রা আর চোরাবালিতে ডুবে পড়বার গল্পগুলি মন্ত্রমুগ্ধের মতন শোনা হয়ে যেত আমার।পরবর্তীতে সেই লেখা বই হয়ে বেরিয়েছিল_"নরকের থেকে একটুকরো অনির্বচনীয় মেঘ"।
আমার ভেতরে জীবন আর সৃজন নিয়ে কত প্রশ্নই তো জমতো।সেই সব প্রশ্নগুলো ছুড়ে দিতাম আর বাবু দা শান্ত ভাবে সেই সব নিয়ে কথা বলে যেতেন।আমার জীবনবোধ কেমন বুঝি বদলে বদলে যেত।ভেতরের খিদে বেড়ে যেত।
এক নুতন মানুষ হয়ে উঠতে থাকতাম আমি।
আমার সৃজন জীবনে মস্ত এক ছায়া হয়েই থাকবেন বাবু দা।
যদিও এখন আর আগের আড্ডা হয় না।
জাস্ট দেখা আর কুশল বিনিময় হয়।
শ্রী দেবজ্যোতি রায়ের কাছে অনন্ত ঋণ আমার।
১০.
প্রায় ৩৫ বছর আগে আমার সঙ্গে পরিচয় আর ক্রমে সখ্যতা জমেছিল ভানু দার সাথে।ভানু ভট্টাচার্য।তিনি নিজে কবিতা লিখতেন না।গিটার বাজাতেন।টিউশন করতেন।আর সম্পাদনা করতেন "অহংকারী অন্বেষা" নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা।আমি ডাকে লেখা পাঠাই।লেখাটি প্রকাশিত হয়।তারপর একদিন সাইকেল নিয়ে সটান হাজির সম্পাদকের ইন্দ্রজিৎ কলোনির বাড়িতে।সেটা ছিল বৈশাখের তপ্ত দুপুর।একজন হাসিখুশি মজলিসি মানুষ ছিলেন ভানু ভট্টাচার্য।প্রথম আলাপেই আমাকে কাছে টেনে নিলেন।আমার ভেতর স্বপ্ন ছড়িয়ে দিলেন ভানু দা।
আমিও যুক্ত হয়ে পড়লাম "অহংকারী অন্বেষা"_র সঙ্গে। পরে আমাকে সহ সম্পাদক করেছিলেন ভানু দা।তীব্র তেজ নিয়ে আমি ঘুরে বেড়াতে থাকলাম সমস্ত শহর।আমাকে তখন কবিতায় পেয়েছে।আমি আর ভানু দা প্রায় দিন আড্ডা দিতাম।কখনো যোগ দিতেন রমেন দাস,ভগীরথ দা,কুমার শিবেন্দ্র নারায়ণ,ঘেঘিরঘাট থেকে এসে জুটতো চন্দন কুমার চন্দ।নিজেদের লেখা,স্বপ্ন আর পত্রিকা নিয়ে নানান পরিকল্পনা নিয়ে সে এক উন্মাদনার পর্ব।সে এক উত্তাল প্রস্তুতিপর্ব আমার জীবনের।
১৯৯৭ সালে পত্রিকা চালাতে না পেরে বন্ধ করে দিলেন ভানু দা।আমিও তখন তীব্র বেকার।আর্থিক ভাবে দাড়ানো সম্ভব ছিল না পাশে।ভানু দাও আর্থিক কষ্টে সময় কাটাচ্ছেন।বিয়ে করেছেন।সেই দায় তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।
এর পর ২০০৫ সালে আমি কুচবিহার ছেড়ে মাথাভাঙ্গা চলে গেলাম।ইতিমধ্যে ভানু দার সঙ্গে যোগাযোগ কমে এসেছিল।
আমিও জীবন নিয়ে ব্যতিব্যস্ত।
অনেক পরে একদিন শুনলাম ভানু ভট্টাচার্য আর নেই।একটি চিট ফান্ডে জড়িয়ে গিয়ে তিনি তীব্র হতাশায় আত্মহনন করেছেন।
আচমকা হারিয়ে গেছে রমেন দাও।
চন্দন কবিতা ছেড়ে আশ্রম বানিয়ে সাধু হয়ে গেছে।
আমার জীবনে ভানু দা শান্ত এক সুপুরি গাছের ছায়া।গহিন মায়া।
যতদিন বাঁচবো,ভানু দাকে বহন করবো আমি।

ছবি : বিধান দেব 

সুবীর সরকার. জন্ম 1970, 3 জানুয়ারি. নয়ের দশকে লিখতে আসা এ কবি উত্তরের লোকজীবনের সাথে জড়িয়ে আছেন তীব্র ভাবে. ত্রিশ বছরের বেশী সময় ধরে কবিতা, গদ্য সহ বিভিন্ন ধারায় অনায়াস যাতায়াত করেছেন. বাংলা ভাষার প্রায় সব কাগজে নিয়মিত লেখালিখি করেছেন, করছেন. 1996 সালে তাঁর প্রথম কবিতাবই প্রকাশিত হয় কবিতা পাক্ষিক থেকে. গুরুত্বপূর্ণ কবিতা ও গদ্যের বইগুলো- ধানবাড়ি গানবাড়ি, মাহুত বন্ধু রে, নির্বাচিত কবিতা, বিবাহ বাজনা, নাচঘর, উত্তরজনপদবৃত্তান্ত, মাতব্বর বৃত্তান্ত, ভাঙা সেতুর গান. পেশায় শিক্ষক এ কবি ভালোবাসেন রবিশস্যের খামার বাড়ি, সাদা ঘোড়া আর যৌথ যাপনে চাঁদের আলোয় কবিতা আড্ডা, লোকগানের আমেজ.

এ মাসের কবি ।। মাধবী দাস

 

 সন্ধ্যার সিলিকন


শ্রীহীন নক্ষত্র দেখে ধূসর পাণ্ডুলিপির কথা 

মনে পড়েছিল

যে রশ্মি জানার জন্য ইশারায় জল-বিভাজিকা

গোলাপি আঙুলে আংটি পরা পূর্ণিমার রাত দেখা

সে রশ্মি সন্ধ্যার স্তব্ধ সিলিকন ভ্যালি


আমি তো আয়নার চারদিকে ঘুরে ঘুরে 

আলো হাতে জ্বলে উঠতে পারি

কৃত্রিম আবেশে তারা গোনার নাটকও করতে পারি

চূড়ান্ত দুঃখেও সুখী সুখী অভিনয় করতে পারি

হাসিতে ছড়িয়ে দিতে পারি মোহজাল

আমার উজ্জ্বলতায় ম্লান হতে পারে 

হাজার তুষারশুভ্র হৃদয়ের চূড়া


দিন শেষে জালুকবাড়ির 

না-বলা কথারা তবু মাথাচাড়া দিলে

সমস্ত অহংকারের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়


বৈদুর্যমণির তীব্র আকর্ষণ আজও

জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে 

নৈঃশব্দ্যের একক মুহূর্তে


দেখার ইচ্ছে


গতিজাড্যে ধুলো হয়ে ওড়ে

অস্বীকৃত সম্পর্কের ছাদ

অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে

মাধুকরী তৃষ্ণা মিটছে বলে

অস্বীকার করছো আলোকেই


চোখের দেখাটা দেখতে চাইলে

প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিয়ে শোনাও আসন্ন যুদ্ধকথা 

আমিতো দুচোখে জ্যোৎস্না মেখে

একটু ভালো থাকতেই চেয়েছি

লতানো গাছের মতো মায়াজালে তো জড়াতে চাইনি 


ছুঁতে চাওয়া মানুষের মতো

দেখতে চাওয়া অনুভূতিগুলো

এভাবে ক্রমশ অহংকারে

পতিত হয়েই যুদ্ধে হেরে যাবে

সেদিন আয়নার সামনে নিজেকে দেখতেই

মানুষ হাঁফিয়ে উঠবে দেখো


'হে মহাজীবন' 

স্পর্শ কেড়ে নিয়েছ তা নাও !

দেখার ইচ্ছেটা তো থাকুক!



উত্তরের গান



এখানে সবুজ মাঠে কত পাখি দানা খুঁটে খায়

লক্ষ্যহীন পথ বেয়ে উদ্ভ্রান্ত চলেছে পরিযায়ী 

ঈশ্বর বিরোধী মন আত্মদীপ জ্বেলে দিয়ে যায়

পোয়াতি ধানের ক্ষেতে হেমন্ত দুপুর আততায়ী 

জীবনে মৃত্যুতে তুমি অধিকার নিয়ে ফিরে এসো

সংসারে কল্যাণ হোক শান্ত সহ-অবস্থান রেখে

উত্তর বাংলার পথে আমাদের গান ভালোবেসো

চাঁদের শরীর থেকে নিখাদ কলঙ্ক মেখে মেখে


ছায়াকে ছাপিয়ে ওঠো চুপ-রাত্রি তোর্ষার আদরে

পাথরের আরশিতে চুমু খেয়ে শীত খোঁজে চাঁদ

অন্ধকার আলো হবে বছর খানেক আরও পরে

ক্যালেন্ডার বাজি রাখি, সব যেন জোনাকির ফাঁদ। 

আকাশ পিয়ানো বাজে সহজিয়া বাউলের সুরে

পুরনো নভেল ফেলে প্রেম খুঁজি বালুচর খুঁড়ে।


 পতনের শব্দ


বৃষ্টির মতন যদি ব্যর্থ মানুষের

পতনের শব্দ শোনা যেত

রক্তের ফোয়ারা থেকে আপশোসের মতো 

পুরনো গ্রহের দোষ বের হয়ে আসত

আমি দক্ষিণের জানলা খুলে

দু'চারফোঁটা শান্তিজল ছিটিয়ে দিতাম

সবাইকে বুঝিয়ে দিতাম 

চোখের জলের তাপ ফুটন্ত লোহাকে

কীভাবে হারিয়ে দেয়


প্রতিবার বর্ষা এলে হাড়ে হাড়ে বুঝি

আগুনের থেকে এই বৃষ্টিই 

আমাকে পোড়ায় বেশি


শূন্য দিয়ে মৃত্যু আঁকি


ব্যথাকে ব্যথিত করে এগিয়ে চলেছি 

এক- দুই- একশো -দুশো হাজার ছাড়িয়ে লক্ষ 

এভাবে শূন্যের পিঠে শূন্য বসে বসে 

গুণিতক সংখ্যা রোজ শুধু বিয়োগান্ত 

নির্বাক অঙ্কের ছবি ঘিরে

শূন্যের মহিমা নাটকীয় ...


অশনি চানক্য টুঁটি চেপে ধরে আছে

কান্নায় ফুঁপিয়ে উঠছে হাজার হাজার 

নদী উপত্যকা

বরফ গলে না তবু ধূর্ত কৌশলের...


কত শবদেহ গন্ধ পেল না ফুলের 

পেল না রুপোলি অশ্রুধারা 

বুকের উপর নুয়ে পড়ল না লালন


গাছের মগডালে ঝুলে থাকা

নিম- তেতো বিশ্ব থেকে কুয়াশার মতো 

গড়িয়ে গড়িয়ে নামছে নীল পরাভব 

মিথ্যে বিস্ফোরকে 

পাল্টে যাচ্ছে বিপদ সংকেত


এভাবে মুখোশ পরে আমরা 

বীতনিদ্র জনস্রোতে বেঁচে

শূন্য দিয়ে মৃত্যু আঁকছি ভাতের থালায়...


ছবি : বিধান দেব 

মাধবী দাস। জন্ম কর্ম  কোচবিহার। শিক্ষক বাবা মায়ের সন্তান । কর্মজীবন শুরু কোচবিহারের আচার্য ব্রজেন্দ্র নাথ শীল মহাবিদ্যালয়ের আংশিক সময়ের শিক্ষক হিসেবে। বর্তমানে মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ছাত্রাবস্থায় লেখালেখি শুরু। বাংলার বহু বানিজ্যিক ও লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত কবিতা ,গল্প,প্রতিবেদন,বুকরিভিউ,উত্তর সম্পাদকীয় লিখে বিশেষ পরিচিত কলম।রয়েছে পাঁচটি টি কাব্যগ্রন্থ - অযোগবাহ বর্ণ, আদিধর্মকথা,ঋতুজন্ম ,মৃত্যুর ব্যাকরণ, সন্ধ্যার সিলিকন। সম্পাদনা করছেন পত্রিকা গোল্লাছুট। অযোগবাহ বর্ণ এর জন্য পেয়েছেন বহু সম্মাননা । তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কবিতাপাক্ষিক সম্মাননা, সৈয়দ আহাসন আলী সম্মাননা,‌ বিবর্তন সম্মান ইত্যাদি।