বুধবার, ৩০ মার্চ, ২০২২

এ মাসের কবি ।। মাধবী দাস

 

 সন্ধ্যার সিলিকন


শ্রীহীন নক্ষত্র দেখে ধূসর পাণ্ডুলিপির কথা 

মনে পড়েছিল

যে রশ্মি জানার জন্য ইশারায় জল-বিভাজিকা

গোলাপি আঙুলে আংটি পরা পূর্ণিমার রাত দেখা

সে রশ্মি সন্ধ্যার স্তব্ধ সিলিকন ভ্যালি


আমি তো আয়নার চারদিকে ঘুরে ঘুরে 

আলো হাতে জ্বলে উঠতে পারি

কৃত্রিম আবেশে তারা গোনার নাটকও করতে পারি

চূড়ান্ত দুঃখেও সুখী সুখী অভিনয় করতে পারি

হাসিতে ছড়িয়ে দিতে পারি মোহজাল

আমার উজ্জ্বলতায় ম্লান হতে পারে 

হাজার তুষারশুভ্র হৃদয়ের চূড়া


দিন শেষে জালুকবাড়ির 

না-বলা কথারা তবু মাথাচাড়া দিলে

সমস্ত অহংকারের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়


বৈদুর্যমণির তীব্র আকর্ষণ আজও

জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে 

নৈঃশব্দ্যের একক মুহূর্তে


দেখার ইচ্ছে


গতিজাড্যে ধুলো হয়ে ওড়ে

অস্বীকৃত সম্পর্কের ছাদ

অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে

মাধুকরী তৃষ্ণা মিটছে বলে

অস্বীকার করছো আলোকেই


চোখের দেখাটা দেখতে চাইলে

প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিয়ে শোনাও আসন্ন যুদ্ধকথা 

আমিতো দুচোখে জ্যোৎস্না মেখে

একটু ভালো থাকতেই চেয়েছি

লতানো গাছের মতো মায়াজালে তো জড়াতে চাইনি 


ছুঁতে চাওয়া মানুষের মতো

দেখতে চাওয়া অনুভূতিগুলো

এভাবে ক্রমশ অহংকারে

পতিত হয়েই যুদ্ধে হেরে যাবে

সেদিন আয়নার সামনে নিজেকে দেখতেই

মানুষ হাঁফিয়ে উঠবে দেখো


'হে মহাজীবন' 

স্পর্শ কেড়ে নিয়েছ তা নাও !

দেখার ইচ্ছেটা তো থাকুক!



উত্তরের গান



এখানে সবুজ মাঠে কত পাখি দানা খুঁটে খায়

লক্ষ্যহীন পথ বেয়ে উদ্ভ্রান্ত চলেছে পরিযায়ী 

ঈশ্বর বিরোধী মন আত্মদীপ জ্বেলে দিয়ে যায়

পোয়াতি ধানের ক্ষেতে হেমন্ত দুপুর আততায়ী 

জীবনে মৃত্যুতে তুমি অধিকার নিয়ে ফিরে এসো

সংসারে কল্যাণ হোক শান্ত সহ-অবস্থান রেখে

উত্তর বাংলার পথে আমাদের গান ভালোবেসো

চাঁদের শরীর থেকে নিখাদ কলঙ্ক মেখে মেখে


ছায়াকে ছাপিয়ে ওঠো চুপ-রাত্রি তোর্ষার আদরে

পাথরের আরশিতে চুমু খেয়ে শীত খোঁজে চাঁদ

অন্ধকার আলো হবে বছর খানেক আরও পরে

ক্যালেন্ডার বাজি রাখি, সব যেন জোনাকির ফাঁদ। 

আকাশ পিয়ানো বাজে সহজিয়া বাউলের সুরে

পুরনো নভেল ফেলে প্রেম খুঁজি বালুচর খুঁড়ে।


 পতনের শব্দ


বৃষ্টির মতন যদি ব্যর্থ মানুষের

পতনের শব্দ শোনা যেত

রক্তের ফোয়ারা থেকে আপশোসের মতো 

পুরনো গ্রহের দোষ বের হয়ে আসত

আমি দক্ষিণের জানলা খুলে

দু'চারফোঁটা শান্তিজল ছিটিয়ে দিতাম

সবাইকে বুঝিয়ে দিতাম 

চোখের জলের তাপ ফুটন্ত লোহাকে

কীভাবে হারিয়ে দেয়


প্রতিবার বর্ষা এলে হাড়ে হাড়ে বুঝি

আগুনের থেকে এই বৃষ্টিই 

আমাকে পোড়ায় বেশি


শূন্য দিয়ে মৃত্যু আঁকি


ব্যথাকে ব্যথিত করে এগিয়ে চলেছি 

এক- দুই- একশো -দুশো হাজার ছাড়িয়ে লক্ষ 

এভাবে শূন্যের পিঠে শূন্য বসে বসে 

গুণিতক সংখ্যা রোজ শুধু বিয়োগান্ত 

নির্বাক অঙ্কের ছবি ঘিরে

শূন্যের মহিমা নাটকীয় ...


অশনি চানক্য টুঁটি চেপে ধরে আছে

কান্নায় ফুঁপিয়ে উঠছে হাজার হাজার 

নদী উপত্যকা

বরফ গলে না তবু ধূর্ত কৌশলের...


কত শবদেহ গন্ধ পেল না ফুলের 

পেল না রুপোলি অশ্রুধারা 

বুকের উপর নুয়ে পড়ল না লালন


গাছের মগডালে ঝুলে থাকা

নিম- তেতো বিশ্ব থেকে কুয়াশার মতো 

গড়িয়ে গড়িয়ে নামছে নীল পরাভব 

মিথ্যে বিস্ফোরকে 

পাল্টে যাচ্ছে বিপদ সংকেত


এভাবে মুখোশ পরে আমরা 

বীতনিদ্র জনস্রোতে বেঁচে

শূন্য দিয়ে মৃত্যু আঁকছি ভাতের থালায়...


ছবি : বিধান দেব 

মাধবী দাস। জন্ম কর্ম  কোচবিহার। শিক্ষক বাবা মায়ের সন্তান । কর্মজীবন শুরু কোচবিহারের আচার্য ব্রজেন্দ্র নাথ শীল মহাবিদ্যালয়ের আংশিক সময়ের শিক্ষক হিসেবে। বর্তমানে মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ছাত্রাবস্থায় লেখালেখি শুরু। বাংলার বহু বানিজ্যিক ও লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত কবিতা ,গল্প,প্রতিবেদন,বুকরিভিউ,উত্তর সম্পাদকীয় লিখে বিশেষ পরিচিত কলম।রয়েছে পাঁচটি টি কাব্যগ্রন্থ - অযোগবাহ বর্ণ, আদিধর্মকথা,ঋতুজন্ম ,মৃত্যুর ব্যাকরণ, সন্ধ্যার সিলিকন। সম্পাদনা করছেন পত্রিকা গোল্লাছুট। অযোগবাহ বর্ণ এর জন্য পেয়েছেন বহু সম্মাননা । তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কবিতাপাক্ষিক সম্মাননা, সৈয়দ আহাসন আলী সম্মাননা,‌ বিবর্তন সম্মান ইত্যাদি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন