বুধবার, ৩০ মার্চ, ২০২২

জন্মের আগের মুখ ।। চন্দন মিত্র


 

জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন কোয়ানের অমায়িক ভুবন     


 ষোড়শ পর্ব

সামন্ততান্ত্রিক জাপান :

দাইমিয়ো, সামুরাই, শোগুন, শোগুনশোকু ও জোদো শু-র উত্থান   

 

হেইয়ান যুগের সময়সীমা ৭৯৪-১১৮৫ খ্রিস্টাব্দ। এই যুগের শেষের দিকে ফুজিওয়ারা, মিনামোতা, তাইরা, তাচিবানা প্রভৃতি পরিবারকেন্দ্রিক কিছু শক্তিশালীগোষ্ঠী মাথা চাড়া  দেয়। তারা সরাসরি রাজ-সিংহাসনের দাবি না-করলেও শাসনক্ষমতার নিয়ামক হয়ে  ওঠার জন্য নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে থাকে। বিভিন্ন প্রদেশের জমিজমা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা করে নেয়। সরকার তাদের এই সামন্তপ্রভু তথা জমিদার হয়ে ওঠাকে আটকাতে না-পেরে প্রকারান্তরে তাদের এই অনৈতিক দখলদারিত্বকে স্বীকৃতি দেয়। এই সামন্তপ্রভুরা জাপানে দাইমিয়ো নামে চিহ্নিত হয়ে আছে। সরকার তাদের তুষ্ট করার জন্য তাদের সম্পত্তির কর মকুব করলেও তারা কিন্তু নিজেদের দখলীকৃত অঞ্চলে বসবাসকারী কৃষকদের কাছ থেকে  চড়া হারে কর আদায় করত। দুর্ভিক্ষ বা মহামারী কবলিত সময়েও তারা প্রজাদের অব্যাহতি দিত না। এই দাইমিয়ো সামন্তপ্রভুরা নিজেদের বাহিনী গড়তে গিয়ে সামুরাই নামক ভয়ংকর যোদ্ধাদের জন্ম দেয়। জাপানি সামুরাই শব্দের অর্থ পরিষেবা দান। এই যোদ্ধারা ঘোড়ার পিঠে চেপে তলোয়ার ও তীরধনুক নিয়ে লড়াই করত। মাথায় থাকত শিং-শোভিত শিরস্ত্রাণ, বুকে থাকত চামড়ার বা ধাতুর বর্ম। সামুরাইরা কঠোরভাবে মেনে চলত তাদের নিজস্ব যুদ্ধনীতি বুশিদো (বাংলা অর্থ, যোদ্ধার পথ)। এই নির্ভীক যোদ্ধারা সামন্তপ্রভুদের সম্মান রক্ষার জন্য নিজেদের জীবন দিতেও পিছপা হত না। পরাজিত হয়ে বন্দি জীবন যাপনের থেকে আত্মহননকে তারা শ্রেয় বলে মনে করত। আত্মসম্মান রক্ষার জন্য তারা তলোয়ার বা ছুরি দিয়ে নিজেদের পেট চিরে আত্মহত্যা করত। আত্মহননের এই পদ্ধতি হারাকিরি নামে প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে

    ১১৮০ খ্রিস্টাব্দে জাপানের প্রভাবশালী দুই গোষ্ঠী তাইরা ও মিনামোতো নিজেদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী এক ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ে। এই যুদ্ধ গেনমেই কাসসেল নামে জাপানের ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। ১১৮৫ খ্রিস্টাব্দে তাইরা গোষ্ঠীর পরাজয়ের মাধ্যমে এই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। মিনামোতো গোষ্ঠীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন মিনামোতো নো ইয়োরিতোমো। সে সময় গো-তোবা (শাসনকাল, ১১৮০-১২৩৯ খ্রিঃ) ছিলেন জাপানের সম্রাট। তিনি এই ভেবে আশঙ্কিত হন যে, এবার  বোধহয় ইয়োরিতোমো সিংহাসনের দাবিদার হয়ে উঠবেন। তিনি তড়িঘড়ি করে তাঁকে শোগুন উপাধিতে ভূষিত করেন। শব্দটি ‘সেএইতাই শোগুন’ শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ ;   যার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায়, বর্বরবিরোধী বাহিনীর অধিনায়ক। এই উপাধি দানের  মাধ্যমে তিনি ইয়োরিতোমোকে সেনাপতিত্বে বরণ করে নেন। এই ঘটনা জাপানের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করে। সেনাপতির পদ পেয়ে ইয়োরিতোমো রাজধানী হেইয়ান (বর্তমান, কিয়োতো) ত্যাগ করে তিনশো চল্লিশ কিমি দূরে কামাকুরা নগরে চলে যান। সে সময় কামাকুরা ছিল হনশু দ্বীপের এক অখ্যাত উপকূলীয় অঞ্চল। রাজধানী থেকে নিরাপদ দূরত্বে বসে ইয়োরিতোমো, তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবায়নের পথে পা-রাখেন। ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে তিনি কামাকুরাতে সামরিক রাজধানী স্থাপন করেন। এই ঘটনার মাধ্যমে জাপানে সূচিত হয় দীর্ঘস্থায়ী কামাকুরা যুগ (১১৯২-১৩৩৩ খ্রিঃ)। সামুরাই যোদ্ধাদের সহায়তা তখন তাঁকে প্রায় অজেয় করে তুলেছে। সম্রাট গো-তোবা সব জেনেও নীরব থাকলেন। ফলত, জাপানে শুরু হল  দ্বৈত-শাসন-ব্যবস্থা। সম্রাট থাকলেন নামসর্বস্ব, প্রকৃত ক্ষমতা থাকল শোগুন তথা সামরিক প্রধানের হাতে। এই ব্যবস্থা জাপানে শোগুনশোকু নামে পরিচিত। ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে মেইজি যুগ সূচিত হওয়ার আগে পর্যন্ত শোগুনশোকু জাপানে বহালতবিয়তে টিকে ছিল।

    হেইয়ান যুগের শেষের দিকে তেন্দাই ও শিঙ্গন বৌদ্ধ সম্প্রদায় যথেষ্ট প্রভাব ও প্রতিপত্তি লাভ করেছিল। এই দুই সম্প্রদায় রাজপুরুষ ও অভিজাতদের সমর্থন পেয়ে পল্লবিত হয়ে ওঠে। কামাকুরা যুগের সূচনায় হোনেন শোনিন (১১৩৩-১২১২ খ্রিঃ)  জোদো শু নামের পৃথক এক বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রবর্তন করেন। হোনেন, প্রথম জীবনে  ছিলেন তেন্দাই সম্প্রদায়ের একনিষ্ঠ কর্মী। কিন্তু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল কার্যকলাপে বীতশ্রদ্ধ হয়ে তিনি নতুন পথের সন্ধান করতে থাকেন। বিভিন্ন মঠ ও  গ্রন্থাগারে ঘুরতে ঘুরতে একদা তাঁর হস্তগত হয় চিনা বৌদ্ধ সন্ন্যাসী শানতাও (৬১৩- ৬৮১ খ্রিঃ)-এর ভাষ্য সমন্বিত ‘অমিতায়ুরধ্যান সূত্র’ গ্রন্থটি। এই গ্রন্থের একটা অংশে তাঁর চোখ আটকে যায় “কেবল অমিতাভ বুদ্ধের নাম জপ করুন। হাঁটুন, দাঁড়ান, বসুন  বা শয়ন করুন একবারের জন্যও জপ বন্ধ করবেন না। সমস্ত সংকট কেটে যাবে ; এটাই বুদ্ধের প্রকৃত পথ।” চিনদেশে প্রচলিত ‘জিং থং জোঙ’ (ইংরেজিতে ‘পিওর ল্যান্ড’ ; বাংলাতে ‘বিশুদ্ধ ভূমি’) নামের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপাস্য এই অমিতাভ বুদ্ধ। চিনে তৃতীয় খ্রিস্টাব্দে এই সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল। শানতাও ছিলেন উক্ত সম্প্রদায়ের প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে উত্তর-পশ্চিম ভারতের এক সন্ন্যাসী রাজপুত্র ধর্মকর বা ধর্মকারা একটি পুথি লেখেন ‘সুখবতীব্যূহ সূত্র’। এই সূত্রে তিনি পাঠকদের আশ্বস্ত করেছিলেন যারা তাঁর নির্দেশিত পথে চলবেন তিনি নিজের তপোবলে তাদের জন্য এক জগৎ বানাবেন। তিনি তাঁর নির্মিত সেই জগতে অমিতাভ  বুদ্ধ হয়ে অনুগামীদের প্রতীক্ষায় থাকবেন। ‘সুখবতীব্যূহ সূত্র’ চিনে পৌঁছায় খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকে। মূলত এই সূত্রের প্রভাবেই চিনদেশে ‘জিং থং জোঙ’ সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল। ভারতীয় অমিতাভ চিনা উচ্চারণে হয়েছিল এইমিতোফু, এবার জাপানি উচ্চারণে তা হল, অমিদা। হোনেন ১১৯৮ খ্রিস্টাব্দে লিখে ফেললেন ‘সেনচাকু হোঙগান নেমবুৎসু শু’ নামের এক পুস্তক। সেখানে তিনি অমিদা বুদ্ধের নাম জপের মন্ত্রটি  এইভাবে উল্লেখ করেন, ‘নামু অমিদা বুৎসু’ (বাংলা, আমি অমিতাভ বুদ্ধের শরণ নিলাম)। এই জপমন্ত্রের সংক্ষিপ্ত রূপ ‘নেমবুৎসু’ অচিরেই মুখে মুখে ফিরতে থাকে। হোনেন আসলে নতুন কোনো বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সূত্রপাত করেননি। তিনি চিনে  প্রচলিত ‘জিং থং জোঙ’-এর জাপানি-সংস্করণ করেছিলেন মাত্র। ‘সুখবতীব্যূহ সূত্র’ অনুযায়ী অমিতাভ বুদ্ধ ‘পশ্চিম স্বর্গ’ নির্মাণ করে তাঁর অনুচর বোধিসত্ত্বদের নিয়ে অপেক্ষমাণ। শরণাগতদের তিনি তাঁর নির্মিত সেই অক্ষয় স্বর্গে স্থান দিতে বদ্ধপরিকর। কেবল তাঁর নামজপ করলেই অনুগামীরা পুনর্জন্ম পাবে। পশ্চিম স্বর্গে তারা পাবে পদ্মসম্ভব জীবন, অর্থাৎ তারা মাতৃগর্ভ নয় পদ্ম থেকে জন্ম নেবে। সেই স্বর্গে ব্যাধি, বার্ধক্য বা মৃত্যু নেই, আছে অপার শান্তি ও সৌন্দর্য। সেখানে আছে সুন্দর পোশাক ও সুখাদ্যের বন্দোবস্ত। কোনো রিপুর তাড়না নেই সেই স্বর্গে। সেখানে সুদৃশ্য প্রাসাদগুলি মূল্যবান রত্নমণ্ডিত, ভূমি আচ্ছাদিত সোনার পাতে। অতিকায় পদ্মের দল সেখানে সুবাস ছড়াচ্ছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে স্বর্গীয় সুর ও সুবাস। এই একবিংশ শতাব্দীতেও মানুষ যুক্তিবুদ্ধি বন্ধক দিয়ে স্বর্গের লোভে নিজেকে বা অন্যকে ধ্বংস করতে পিছপা হচ্ছে না, আর সামন্ততান্ত্রিক মাৎস্যন্যায়পীড়িত সাধারণ জাপানিদের  কাছে এই লোভনীয় আশ্বাস যে মৃতসঞ্জীবনীর মতো সুপেয় হয়ে উঠবে তাতে আর আশ্চর্য কী ! এমন স্বর্গ নাগালে এনে দেওয়ার জন্য হোনেন রীতিমতো প্রণম্য হয়ে উঠলেন। ক্রমশ তাঁর অনুগামীদের সংখ্যা বাড়তে লাগল। দারিদ্র্য, মহামারী, দুর্ভিক্ষ, ক্ষমতাশালীদের অত্যাচার বিড়ম্বিত করে তুলেছিল সাধারণ মানুষের জীবন। তারা হোনেন-এর দেখানো পথে হাতে যেন স্বর্গ পেল। জীবনের দিনগত পাপক্ষয় থেকে পলায়নের এক প্রশস্ত পথ পেল তারা। নাম জপের মাধ্যমে তারা মনের বিবিধ বিকার থেকেও মুক্তি পেল। হোনেন-এর এই উত্থানে তেন্দাই ও শিঙ্গন সম্প্রদায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাল। তারা ‘সেনচাকু হোঙগান নেমবুৎসু শু’ পুস্তকটি যেখানে পেল পোড়াতে শুরু করল। তাদের মন্ত্রণায় সম্রাট ৎসুচিমিকাদো (১১৯৮-১২১০ খ্রিঃ) ১২০৭ খ্রিস্টাব্দে হোনেনকে রাজধানী শহর হেইয়ান থেকে দূরবর্তী তোশো নামক স্থানে নির্বাসিত করেন। কেবল তাই নয় হোনেন-এর অনুগামীদের কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়, এমনকি প্রাণদণ্ডও দেওয়া হয়। জনমতের চাপে ১২১১ খ্রিস্টাব্দে হোনেনকে আবার হেইয়ানে ফিরিয়ে আনা হয়। কালক্রমে হোনেন কর্তৃক প্রচারিত জোদো শু জাপানের অন্যতম জনপ্রিয় বৌদ্ধ সম্প্রদায় হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিককালেও জাপানে এই সম্প্রদায়ের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি।  

 

তথ্যঋণ       



A Guide to Japanese Buddhism Published by Japan Buddhist Fedaration, 2004.

A New History of Shinto by John Been and Mark T. Ueen ; Wiley –Blackwell 2010.

Studies in Japanese Buddhism by A. K. Reischuer ; The Macmillan Company 1917.

A Brief History of Japan : Samurai, Shogun and Zen by : Tuttle Publication 2017.

A History of Japan by K. G. Henshall : Palgrave macmillan 1999.   

Pure Land Pure Mind : The Buddhism of Master Chu-hung and Tsung-pen ; Translated by J. C. Cleary. The Corporate Body of the Buddha Educational Foundation 1994.  

ছবি :বিধান দেব 


  চন্দন মিত্র। ।    জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৬, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ডায়মন্ড হারবার মহকুমার ভগবানপুর (হরিণডাঙা) গ্রামে। বাংলা ভাষা-সাহিত্যের শিক্ষক। কবিতা লেখার সূত্রে লেখালেখির জগতে প্রবেশ। লেখেন প্রবন্ধ ও গল্প । 

প্রকাশিত পুস্তক   : 

কাব্য পুস্তক : আমার আত্মার পায়ে বাঁধার ঘুঙুর, যাপনচিত্র, ২০১৯; সরলতা ক্রমশ গায়েব হইতেছে, সাহিত্যের বেলাভূমি ২০২০

প্রবন্ধ পুস্তক : জেন : রিপুতাড়িত মানবের নিকট সুসমাচার ও অন্যান্য প্রবন্ধ, কলিকাতা লেটার প্রেস, ২০১৯ 

সম্পাদিত পত্রিকা : পাড়ি





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন