৬.
".....কবি খানিকটা মানুষ আর খানিকটা মানুষ নয় ।কোন দিক থেকে সে মানুষ নয় ?মানুষ নয় সে তার সেই রহস্যময় শক্তির জন্য ।যে শক্তি তাকে উন্মাদ করে তোলে ,তাকে যূথবদ্ধতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে ।তাকে সৃষ্টি করতে বাধ্য করে ---সাধারণের মধ্যে এই শক্তি নেই বলেই কবিকে কখনও তারা মহাপুরুষ বানিয়ে দেয় ,কখনও বা ঘেন্নায় ও ক্রোধে তাকে নি:শব্দে হত্যা করে ।এই শক্তি যেমন ছিল বুদ্ধ বা যীশুর ,তেমনি এই শক্তি ছিল হিটলারেরও ।হিটলার এই পৃথিবীকে গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিল ,পৃথিবী শেষ হয় নি ,হিটলার তার স্বেচ্ছা ধ্বংস মেনে নিয়েছে ।কিন্তু তার মধ্যে দিয়েও বয়ে গেছে একই স্পিরিট ।না একজন কবি পারে না ওইভাবে পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিতে বা বদলে দিতে ।সে তার শক্তি দিয়ে যা পারে ,তা সেই নূতন একটি গ্রহ ,নূতন একটি পৃথিবী গড়ে তুলতে ।যা তার মৃত্যুর পরও থেকে যায় --আর একইরকম ভাবে আরও অজস্র গ্রহ উপগ্রহ ও গ্রহাণু পুঞ্জ-এর সঙ্গে জীবন সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে ।''
"কবির পৃথিবী" গদ্যে অরুণেশ ঘোষ লিখেছিলেন এই অমোঘ লাইনগুলি।আসলে অরুণেশ ঘোষের যে বিশ্ববিক্ষা,গহিন জীবনবোধ,সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে থাকা চেতনাস্তর তার কাছে দ্বিধাহীন হাঁটু মুড়ে বসে পড়তেই হবে একজন সৎ ভাষাকর্মীকে।
অরুণেশ তার সমস্ত লেখক জীবন জুড়ে ভাষা দিয়েই আক্রমণ করে গেছেন আমাদের ভন্ডামি ভরা এই সময় আর সমাজকে।
তিনি আমাদের ক্রমে বিপন্ন করেছেন।বিস্মিত করেছেন।আমাদের ভেতর কেবল জাগিয়ে তুলেছেন
অগণন প্রশ্ন আর প্রতিপ্রশ্ন।
অরুণেশ ঘোষ কেবল একজন চিন্তক বা কবিই নন।
তিনি আমাদের শিক্ষক।
তিনি আমাদের কাছে মস্ত এক বিশ্ববিদ্যালয়।
আজও তার লেখা ভাবায়।শেখায়।
অরুণেশকে আমি আমার ১৬ বছর বয়স থেকে চিনি।অরুণেশকে পাঠ করা শুরু করি।তার "শ ব ও সন্ন্যাসী", "গুহা মানুষের গান" আমাকে প্রবল বিস্মিত করলো।এমন কবিতা এমন কড়া চাবুকের মুখোমুখি তো এর আগে হইনি।আমার পাঠ ভুবনে তীব্র এক প্রদাহ শুরু হলো।যদিও পরবর্তীতে কবিতা নয়,অরুণেশ_এর গদ্য আর প্রবন্ধের ভক্ত হতে হয়েছিল আমাকে।
আর ততদিনে অরুণেশ ঘোষ আমার বন্ধু,আমার আশ্রয়,আমার প্রশ্রয়,আমার শিক্ষক হয়ে গিয়েছেন।
যতদিন বেঁচে ছিলেন,অনন্ত শিখেছি,জেনেছি তার কাছ থেকেই।
এই উত্তরের প্রান্ত থেকেই বিশ্ব সাহিত্যের সাম্প্রতিক খবর রাখতেন তিনি। এখান থেকেই তিনি বাংলা সাহিত্যের নিবিড় সাধক হতে পেরেছিলেন।
সাইকেল চালিয়ে একা একাই চলে যেতাম অরুণেশ_এর বাড়ি।তখন তিনি হাওয়ার গাড়ি গ্রাম ও মরা মানসাই নদীর ভুবন ছেড়ে পাকাপাকি চলে এসেছেন জনপদ ঘুঘুমারী।বাসায় যাবার গলির পাশে একটি নিবিড় জলাশয় ছিল।ওখানে মাঝে মাঝে স্নানে নামতেন।আমি পাড়ে বসে নানান প্রশ্ন ছুড়ে দিতাম।উনি গল্পচ্ছলে জবাব দিতেন।
কৃষ্ণ গোপাল মল্লিক,নিত্য মালাকার,সুবিমল মিশ্র, কমল চক্রবর্তীর কথা শোনাতেন।
বলতেন_"খাটি স্রষ্টা আসলে একজন অভিশপ্ত মানুষ"।
ৱ্যাবোর জীবন ও কবিতা নিয়ে একটা ঘোরের ভিতর একটানা কথা বলে যেতেন অরুণেশ।আমি শিউরে উঠতাম।রেমব্রান্ত ও গগার ছবি নিয়েও অনেক কথা শোনাতেন।
ফরাসি সাহিত্য ফরাসি কবিতা নিয়ে একদম সময় ধরে ধরে অরুণেশ আমাকে কেবল বলেই যেতেন।
বিশ শতকের ফরাসি কবিতা প্রায় মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল শুনে শুনে।
এপলিনেয়ার, অরি মিশো প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন এভাবেই।
ল্যাটিন আমেরিকার লেখালেখি নিয়ে তুমুল উচ্ছাস ছিল অরুণেশ_এর।
মার্কেজ,কর্পেন্টিয়ার,ফুয়েন্তেস আর চিলির কিছু ছোট গল্প ওনার উৎসাহেই পরবর্তীতে পড়ে ফেলতে হয়েছিলো আমাকে।
অরুণেশ এর সাথে আড্ডাটা অনেক টাই ছিল শীত ও বসন্তের ক্লাসরুমের মতন।
অরুণেশ তার জীবনের গল্প শোনাতেন।রাজনীতি,শ্রেণী সংগ্রাম,শোষণমুক্ত এক পৃথিবীর স্বপ্নের কথা ও স্বপ্নভঙ্গের কথাও বলে যেতেন অপরূপ এক কথোয়ালের মতন।
মাঝে মাঝে ডায়েরি থেকে টুকরো টুকরো অংশ পড়তেন।সেখানে অগণন চরিত্র ও ছবি থরে থরে সাজানো থাকতো।
কমরেড কেরুয়াক,খেরবারির মাঠ,কামরূপ কামাখ্যার মিথগুলি,জয়পুর থেকে না আসা ছেলের চিঠি,সুবলের চাটের দোকান আরো কত কি!
একজন অগ্রজ একজন অনুজকে জড়িয়ে ধরতে জানেন অরুণেশ নিজেই তার উদাহরণ।
জনম ভর তার থেকে কেবল শিখেছি।ব্যাক্তি অরুণেশ আর লেখক অরুণেশ_দুজনেই আমার শিক্ষক।
অরুণেশের প্রয়াণের এত বছর পরে আমি নুতন করে বারবার তার গদ্যের ভুবনজোতে প্রবেশ করি প্রস্থান অসম্ভব জেনেই।
তার জীবনানন্দ,জীবনের জার্নাল,সন্তদের রাত, নগ্ন
পরিবার,কবিতার অন্ধকার যাত্রা আমাকে নুতন এক পাঠকে রূপান্তরিত করে তোলে।
আমি দাউ দাউ এক অগ্নিবলয়ে ঝাঁপ দিই।
অরুণেশ ঘোষ,আসলে এক চুরমার সমুদ্রের নাম।
আর একমাত্র তিনিই লিখতে পারেন_
"আমাদের কোনো দুঃখ নেই আর, কোনো শোক
দুজনেই মরে পড়ে থাকব, দুজনেই
দুই দেশের দু-রকম রাস্তার পাশে
একইরকম ভাবে।"
ছবি : বিধান দেব
সুবীর সরকার. জন্ম 1970, 3 জানুয়ারি. নয়ের দশকে লিখতে আসা এ কবি উত্তরের লোকজীবনের সাথে জড়িয়ে আছেন তীব্র ভাবে. ত্রিশ বছরের বেশী সময় ধরে কবিতা, গদ্য সহ বিভিন্ন ধারায় অনায়াস যাতায়াত করেছেন. বাংলা ভাষার প্রায় সব কাগজে নিয়মিত লেখালিখি করেছেন, করছেন. 1996 সালে তাঁর প্রথম কবিতাবই প্রকাশিত হয় কবিতা পাক্ষিক থেকে. গুরুত্বপূর্ণ কবিতা ও গদ্যের বইগুলো- ধানবাড়ি গানবাড়ি, মাহুত বন্ধু রে, নির্বাচিত কবিতা, বিবাহ বাজনা, নাচঘর, উত্তরজনপদবৃত্তান্ত, মাতব্বর বৃত্তান্ত, ভাঙা সেতুর গান. পেশায় শিক্ষক এ কবি ভালোবাসেন রবিশস্যের খামার বাড়ি, সাদা ঘোড়া আর যৌথ যাপনে চাঁদের আলোয় কবিতা আড্ডা, লোকগানের আমেজ.
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন