রবিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২২

গুচ্ছ কবিতা ।। রফিক উল ইসলাম


 


রুগ্ন দোতারা


নগরবাউল জানে, আমি কার রুগ্ন দোতারা। ভাঙা মেলা থেকে সস্তায় কেউ কিনে এনেছিল, অতঃপর 

ফেলে গেছে কোলাহলের পারে। কোলাহল 

সমুদ্রের মতন, ঢেউ ভেঙে এগোতে পারিনা। যে হাত 

বাজাবে ভেবে উন্মুখ হয়ে থাকি, সেই হাতও 

নানাবিধ অহংকারে চূর্ণ হয়ে আছে!


অগত্যা সবটুকু রুগ্নতা নিয়ে সসংকোচে 

দীক্ষার কাছে যাই। যদি কিছু ভাঙা হাড় 

জোড়া লাগে, যদি কোনো আলোকিত ঝরনা মুক্ত অবসরে  সিক্ত করে তোলে। হায়, রুগ্নতা নিয়ে কোনো 

প্রশ্নই ওঠে না, যাবতীয় প্রশ্ন-পরিক্রমা, বাঁকা চোখ 

আজও সেই জাতি-ধর্ম ঘিরে! অথচ আমার দেহে তো 

মাত্রই আধখানা চাঁদ। বাকি অর্ধেক খুঁজে বেড়াবার ছলে        এই ভেসে থাকা                   

এই ডুবে যাওয়া 

আবার জেগে ওঠা পদদলিত জলে।


অগত্যা আবারও সেই কোলাহল-তীরে সুদূরগামী 

পথ চেয়ে থাকা। ভাঙা মেলা ফিরে গেছে, ফিরে গেছে  নগরবাউল। আমি কার রুগ্ন দোতারা, সেটুকুও তো 

জানিনা সঠিক। শুধু জানি, প্রকৃত শূন্যের পথে ভেসে ভেসে     অহংকারহীন কোনো হাত 

একদা তুমুল বাজিয়ে তুলবে আমাকে।


জেগে থাকা


জলভরা মেঘের ফাঁকে ঘুমিয়ে আছো তুমি 

বিদ্যুতের বেশে। আর আমার সব পাখিরাও একে একে 

উড়ে গেছে তারাভরা বনের ছায়ায়! আমি শুধু জেগে আছি,  জেগে থাকি গরম ভাতের থালার মতন 

রাত্রির সুরভিটুকু বুকে নিয়ে।


ক্লান্ত পথের শেষে নির্জন অশথ কোল পেতে 

ডেকেছিল সেই কবে। জ্যোৎস্নার অভিমান দূরে ঠেলে 

একটুও এগোতে পারিনি। আমি জানি, একদিন তোমার সব বিদ্যুৎ 

আর আলো নিয়ে এই পৃথিবীতে ঠিক ফিরে আসবে তুমি, 

শুধু আমারই জন্যে! তাই রাত্রির সুরভিটুকু বুকে নিয়ে 

সহস্র রজনী জুড়ে অফুরন্ত এই জেগে থাকা, 

ঘুমিয়ে পড়া পাখিদের করুণ ডানায়!



চরমোহনা


বৃষ্টির সাথে মিলেমিশে চোখের জলও উড়ে উড়ে 

লালন-সমাধির দিকেই যাচ্ছে। ছেঁউড়িয়ার জলে 

তাই লবণস্বাদ, যাঁরা জানেন, 

তাঁরাই শুধু জানেন! যে নদী ভাসিয়ে নিয়ে যায় 

ঘরদুয়ার, যে নদী ফিরিয়ে আনে অর্ধমৃতের ভেলা, 

সে-ও একদিন পথ হারিয়ে  ফেলে। আমি ওই                                                                     হারানো পথের ধুলোয়

দোতারা-জীবন নিয়ে আছি।


শব্দের আঁস্তাকুড় থেকে উত্থিত করে                

 সুর আর বৈরাগ্যের অভিমুখে 

এবার বাজাও আমাকে। 

চরমোহনায় অনভিপ্রেত চিতা জ্বলে উঠেছে!


ছবি : বিধান দেব 


রফিক উল ইসলাম ।। জন্ম  ২ আগস্ট ১৯৫৪ দক্ষিণ ২৪ পরগনার বসন্তপুরে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। কর্মজীবন ছিলেন একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কর্মী। গত শতাব্দীর আশির দশকের সুপরিচিত কবি। উভয় বাংলাতেই সমান খ্যাতিসম্পন্ন। শব আর শব্দ ভৈরবী, মৈত্রেয় রাত্রির পথে, অবসরের পর সেলফি প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে শ্রেষ্ঠ কবিতা ও কবিতা সংগ্রহ। গবেষণামূলক বেশকিছু গ্রন্থের স্রষ্টা। পেয়েছেন বেশকিছু উল্লেখযোগ্য পুরস্কার।





















কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন