সোমবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২১

পাঠকের হাট ।। অরুণ পাঠক


 
[আমার কাব্যজ্ঞানের প্রারম্ভিক পর্যায় থেকেই দেখে আসছি অগ্রজ কবিরা তাঁদের বই অকাতরে উপহার দিচ্ছেন। মুখে তৃপ্তির হাসি দাতা ও গ্রহীতার। চার চোখে সমান আগ্রহ। আশে পাশে কৌতুহল। বয়সে অনেক ছোট হলেও বহু প্রতিষ্ঠিত বিদ্বান কবি অল্পবয়সী আমাকেও তাঁদের কাব্যগ্রন্থ উপহার দিয়েছেন। আমিও আমার কাব্যগ্রন্থ ঝোলা থেকে বের করে কাঁপা কাঁপা হাতে কোনও শ্রদ্ধেয় অথবা স্নেহভাজন কবিকে উপহার দিয়ে স্বর্গীয় তৃপ্তি উপলব্ধি করি। আজও কোনও অনুষ্ঠানে গেলে এই কাব্যগ্রন্থ দেওয়া-নেওয়ার একটি বিশেষ পর্ব অলিখিতভাবে সূচিভুক্ত থাকে। তার বাইরে ডাক বিভাগের মাধ্যমেও অনেক কবি তাঁদের কাব্যগ্রন্থ আমার ঠিকানায় পাঠান।
নবীন-প্রবীণ, পরিচিত-অপরিচিত সেইসব কবিদের কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আমি এবার আমার অনুভবের দু-চার কথা বলতে চাইছি এখানে। তবে শুধু উপহার পাওয়া কাব্যগ্রন্থ নয় সেইসঙ্গে গাঁটের কড়ি খরচ করে যে অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ আমি এযাবৎ কিনেছি সেইসব কাব্যগ্রন্থেরও কোনও কোনওটি এই আলোচনার উপলক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।]


বহুকাল পরে এই ধর্মসমন্বয়



ভেঙে পড়া পাহাড়ি কোনও সেতুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে যখন গভীর খাদের দিকে তলিয়ে যেতে থাকি তখন ইহজন্মের শেষ আশ্রয় হিসেবে আঁকড়ে ধরি কোনও না কোনও কাব্যগ্রন্থ-কে। আর খুব অলৌকিকভাবে আটকে যাই  পাহাড়ের সানুদেশে বেড়ে ওঠা কোনও গাছের শেকড়ে। মনে হয়, বেঁচে আছি এখনও নাকি কোনও পূর্বজন্মের স্মৃতি আমাকে মন্থন করাচ্ছে সুদূর জীবনের কোনও কবিতা-জীবন :

'জাতিস্মর জেগে ওঠে শারদ প্রভাতে

জেগে ওঠে পুরনো ক্রন্দন, আঁধি-ডিঙোনো সন্ধ্যার
তোমার চাঁদের মতো মুখ
চাঁদমালা হয়ে আছে দেবীর দক্ষিণ হাতে--
                                                     দেখে
কৃতাঞ্জলিপুটে আসি স্মৃতিগাছ
তোমার শিকড়ে
নিভৃতে প্রণাম রাখি...'

হ্যাঁ, এই সেই স্মৃতিগাছ যা আমাকে অনিবার্য পতন থেকে বারবার বাঁচিয়ে তোলে আর আমি কৃতজ্ঞতাবশতঃ যার শিকড়ে কৃতাঞ্জলিপুটে  নিভৃতে প্রণাম রেখে আসি। আজ আমি যে স্মৃতিগাছ-এর আশ্রয় নিয়েছি তিনি কবি সুদীপ্ত মাজি। গত শতাব্দীর ন'য়ের দশকের অন্তিম কালে যার সঙ্গে আমার পরিচয় আর ততদিনে যিনি ওই দশকের একজন সুচিহ্নিত কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। যখন আমার কোনও জীবনই ছিল না তখন জীবনের ওই মহীরুহ একই বেঞ্চে আমার পাশে বসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক কবিতার ক্লাস করছেন। বয়সে জ্যেষ্ঠদের আমি সাধারণত দাদা বলে থাকি। সেক্ষেত্রে সুদীপ্ত আমার থেকে বয়সে বড় হলেও আমি তাকে সুদীপ্ত ও তুমি সম্বোধন করে বন্ধুত্বের উত্তাপ নিয়েছি। আমার সংজ্ঞাহীন শ্রমকল্পে সে এক উন্নত বিষাদ। তার কবিতার নাম, প্রতিটি পঙক্তি কমা ড্যাস সেমিকোলন আমার ছবির মতো মনে থাকে। আর সেগুলো আঁকড়ে ধরে আমি প্রতিটি মুহূর্ত নতুন নতুন করে বেঁচে উঠি। আমাদের ব্যক্তিগত যাপনের ইতিহাস অন্তরিন থাকুক। কিন্তু কৌতুকপ্রিয়, সংগ্রামী, চূড়ান্তভাবে নাগরিক এই এই কবি সময়স্পৃষ্ট চতুরতার চিহ্নগুলোকে কীভাবে শুধু মোমের রেখায় এঁকে দেন আর অপেক্ষা করেন পাঠকের অন্তর্গত জলে ভিজে ওঠার জন্য তা আমি জানি। কিন্তু কৃতঘ্ন সময় তাকে হতাশ করে :

'আত্মপরিচয়ের দিকে হাঁটতে গিয়ে দেখা গেল বেদনার পাতা উড়তে পরিপার্শ্বে/ আর/ অবনমিত হয়ে রয়েছে তোমাদের বিশ্বাসের পতাকা' ( হারিয়ে যাওয়া ময়ূর)।




২০১১  সালে প্রকাশিত 'বাড়ির নাম চৈত্রপবন' প্রকাশের পর ২০১৮ সালে 'রঙিন চশমা হারিয়ে ফেলার পর' প্রকাশিত হয়েছিল। তারপর এই ২০২১-এ একসঙ্গে পরপর তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ। যার মধ্যমণি 'ফুরোনো বনের ময়ূর'।এ বইটি আমি সংগ্রহ করলাম দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা বইমেলা-য় দি সী বুক এজেন্সি থেকে। এ এক রাজকীয় পুনরুত্থান। হ্যাঁ বয়স বেড়েছে। আমরা কালপ্রবাহকে কেউ অস্বীকার করতে পারি না। আমরা মনে মনে একান্তে পিছোই । সুদীপ্ত লেখেন: 

'ফুরোনো মনের বনে ঘুরিফিরি আজ' ( মোহর)।

কিন্তু কী ফুরিয়েছে আমাদের?

'ফুরিয়েছে যত গান, সুর, স্বরলিপি
স্মরণিকা ভরে থাকা কথার সরিৎ
জেগে ওঠে, জ্যান্ত হয়-- অবিশ্বাস্য একার সমাজে!'
                                                              ( মোহর)

সুদীপ্তর কবিতা বরাবরই বেদনানিটোল। চোখের জল মুক্তোর দানা হয়ে ঝলমলিয়ে ওঠে তার কবিতায়। বেপরোয়া শব্দবান্ধবের আলেয়ায় সহজে তা ধরা দেয় না। কিন্তু আন্তরিক অভিনিবেশের শব্দসজ্জা যথাযথ বেদনার অলিন্দে এনে ফেলে আমাকে। এই তো এখানেই 'উৎসব' নামাঙ্কিত একটি কবিতা পড়ছি। তুলে দিচ্ছি আপনাদের জন্য :

'যে কোনও আতসবাজি শেষ অবধি বিরহসম্ভব

শ্রমিকের ক্ষয়ে যাওয়া অস্থি-র সমগ্র আর
দীর্ঘশ্বাসের চাপা করুণ বিষাদ দিয়ে বানানো,/ জলজ'

সামান্য তিন পঙক্তির এই কবিতা ধরে আছে শ্রেণিচেতনা, ব্যাষ্টির উল্লাসের অধোগতে বিরহের জলজ বিষাদ। মনে পড়ে একদিন আমাদের 'রাত্রির তপস্যা' ছিল। এখন স্বভাবতই জীবনে সুদিন এসেছে। কিন্তু ভোলা কি যাচ্ছে :
'মৃণালের খুব নিচে, জলজ ঘুমন্ত সাপ' ( পদ্ম)

না। ওই জলজ ঘুমন্ত সাপের সঙ্গেই আমাদের সহবাস ছিল। এখন পদ্মের ঘ্রাণ যারা নিচ্ছে নিক। কিন্তু ইউনিভার্সিটির করিডোরে বসে পড়া আমাদের কলমের ডগায় থাকা লাইটার জ্বেলে সিগারেট ধরানোর আত্মমশাল অনেক আগে থেকেই জ্বালানো ছিল সুদীপ্তর। জীবনকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে সদ্য সে উঠে এসেছে। আর এখনও তাই :

'জীবনমৃত্যুর এক জলভরা ছায়া নিয়ে
নবীন শিশির নিয়ে
টলমল করে ওঠে পদ্মপাতা,দূরে'     ( পদ্ম)

অর্থাৎ, জীবনের অনিশ্চয়তাকে এখনও কাটানো গেল না। বরং তা আরও পেঁচিয়ে ধরছে গলা। পার্থিব বৈষয়িক সুখ কখনও এই অনিশ্চয়তাকে দূর করতে পারে না। তাই কৈশোর কিংবা যৌবনের প্রিয় বিচরণভূমিকেও অচেনা লাগে এক সময়:

'বেড়াতে এসেছি দূরে, বিষণ্ণ মলিন দেশে, দূষিত ধুলোর দেশে/ চৈত্রশেষে, একা'  ( আঁধি)

নিরাসক্তি, উদাসীনতা তখনই আসে যখন আমরা নির্বিকল্প চৈতন্যের সন্ধান পাই। শ্রীমদ্ভাগবদ্- গীতার দ্বিতীয় অধ্যায় সাংখ্যযোগ অংশের ৫৬ সংখ্যক শ্লোক বলছে :
'দুঃখেষ্বনুদ্বিগ্নমনা সুখেষু বিগতস্পৃহঃ।
বীতরাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীর্মুনিরুচ্যতে।।'

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি দুঃখে উদ্বিগ্ন নয়, সুখেও স্পৃহাহীন-- যাঁর আসক্তি নাই, ভয় নাই, ক্রোধ নাই তাঁকেই স্থিতপ্রজ্ঞ মুনি বলে। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি পড়তে পড়তে সুদীপ্তকে আমার স্থিতপ্রজ্ঞ বলেই মনে হচ্ছে। কারণ সুদীপ্ত লিখেছেন:

'দুপুর অনন্ত লাগে, এ শহরে
যুদ্ধে বিজিত, যেন অল্প সংখ্যক প্রাণী
                              বিষণ্ণ, আতুর
আচ্ছন্ন হয়ে থাকে নির্বিকল্প ঘুমে' ( আঁধি)

কবি কথিত এই 'নির্বিকল্প ঘুম' কি নির্বিকল্প সমাধি-র সমার্থক? আর তাই কি : 'ঘুম থেকে উঠে এসে আবার ঘুমের দিকের পথ' ( গান)?  আরও, আরও:
'আঙ্গিকবিহীন এই প্রণিপাত
যে বোঝে সে বোঝে'  ( প্রণিপাত বিষয়ক)

'অল্প সংখ্যক প্রাণী', 'যে বোঝে সে বোঝে'--- এই যে একা হয়ে যাওয়ার খেলায় কবি মেতেছেন ক্রমশ তা কি এক অসীম সত্যের মুখোমুখি করছে না আমাদের? জানি, আমরা কঠিন সত্যকে ভয় পাই। কিন্তু মেনে তো নিতে হবেই :

'তমসার বুকে ছিলে
আত্মলীন, অবরুদ্ধ, একা--'  ( অভিজ্ঞান)

এখানে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দের সম্মোহন একজন অনুভবীকে গ্রস্ত করবেই। এই সুদীপ্তকে এবার কিন্তু আমার একটু অচেনাই লাগছে। কেন না ধর্মীয় লোকাচার, সংস্কারকে তিনি এতদিন পাশে পাশেই রেখেছিলেন।  আজ এত বেদনাভার কেন তার রচিত কবিতার শব্দগুলোকে তীর্থস্নান করাচ্ছে? তা কি বয়স? অভিজ্ঞতা? একাকীত্ব? সে যাই হোক। আমরা দেখতে পাচ্ছি :

'পরবাসের ভেতর থেকে বটের ঝুরি নেমে এসেছে। জমা হয়েছে প্রাচীন বল্কল।'  ( পুরোনো জার্নাল থেকে)

পরবাস-ই তো বটে। পৃথিবীর নিয়মতান্ত্রিক পরিবেশে, সংখ্যাচিহ্নিত মানবতাহীন, নির্মমতায় বাধিত, নষ্ট হুতাশনে পীড়িত কবি লেখেন :

'অনন্তের ঘরবাড়ি কুয়াশাশাসিত। নীরবতা
                                                 তার মাতৃভাষা।
সংখ্যার শাসন থেকে দূরে বহুদূরে...' 
                                   ( জন্মদিনের লেখা : ২)

বাড়ি সুদীপ্তর খুব প্রিয় বিষয়। তার একাধিক কাব্যগ্রন্থনামে বাড়ি শব্দটি আছে। তবে চৈত্রপবন কিংবা গান বাঁধানো বাড়ি থেকে এ বাড়ি অনেক দূরবর্তী।  সে বাড়ি কি লালন কথিত বাড়ি ( ঘর) ?
এই বাড়িতে কে বাস করে? সেই বাড়িতেই বা কে? এরা দুঃখ ও সুখ নামে চিহ্নিত? কিন্তু কবি জানেন :

'দুঃখ ও সুখের মধ্যে উড়ে চলা পাখিগুলি চির-যাযাবর/ --এই স্থির সত্য, এই আলো'   (১৮৬১)।

সুখ-দুঃখহীন এই যাযাবরবৃত্তির মাঝখানে ভুল করে এই যে ক্ষণিক বিশ্রাম তাতেই জানা গেল সেইসব অধরা উন্মোচনখনি। ভালো লাগল :

'বহুকাল পরে এই ধর্মসমন্বয়'  ( বসুন্ধরা রোড)।

বহুকাল পরে এক অজানা সুদীপ্তকে আবিষ্কার করলাম। বিষয়বিষহীন নির্লিপ্ত সুদীপ্ত। তবুও :

'গল্পের গেরুয়া থেকে গানের গহনে যেতে একটু সমুদ্রনীল/ মিলে মিশে গেলে / একটি আসক্তিরেখা জন্মালো গোপনে'  ( দোয়েল) ।

মনে পড়ে জীবনের সব আলো যখন সহজ সত্য হয়ে ধরা দিয়েছিল, আনন্দে অবগাহনের সেই পুণ্য ক্ষণে সমুদ্র অন্তর্বর্তী একটি দ্বীপে একাকী আমাদের সেই নিভৃত যাপনের কয়েকটি দিন। সস্ত্রীক সুদীপ্তর সেই যাওয়া আর 'ফুরোনো বনের ময়ূর' নিয়ে ফিরে আসার মধ্যে যে দিনগুলি নিঃশেষ হয়ে গেল সে দিনগুলি খুঁজে ফিরি তারই কবিতায়।
সুদীপ্ত, তুমি আমাদের তরঙ্গের পাশে ভোরবেলা। তুমি আমাদের তরঙ্গের মাঝে ভোরবেলা হয়ে উঠেছ।

ফুরোনো বনের ময়ূর : সুদীপ্ত মাজি ।। দি সী বুক এজেন্সি ।। দাম : ১৫০ টাকা


ছবি : বিধান দেব 


অরুণ পাঠক:  এই শতাব্দীর সূচনালগ্নের কবি। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ বারোটি। প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'প্রশস্তির ভিন্ন রূপ' ২০০২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। এখনও পর্যন্ত শেষ কাব্যগ্রন্থ ' হাসি হাসি কান্নার বরফ' প্রকাশিত হয় ২০২০ সালে কলকাতা বইমেলায়। সম্পাদিত পত্রিকা : সাহিত্যের বেলাভূমি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গভাষা ও সাহিত্য-এ স্নাতকোত্তর ও শিক্ষক শিক্ষণ ডিগ্রীপ্রাপ্ত।
পেশা : শিক্ষকতা। কবিতা লেখা ও পত্রিকা সম্পাদনার জন্য বেশ কয়েকটি পুরস্কারে ভূষিত।

৪টি মন্তব্য:

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...