শনিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২১

আবহবিকার ।। রাজদীপ রায়

                                    
                               দ্বিতীয় পর্ব

 এই মন সেই মন ও রেলগাড়ি ঠাকুর



--তোর ঘরে কে থাকে?

--আমি আর আমার মন থাকে। 


রতন পাগলাকে পাড়ার লোকে এই একটা কথা বললে সে ওই একটিই উত্তর দিত। বাকি অন্য কথা বলে রাগানোর চেষ্টা করলেও সে কোনও রা-কাড়ত না। এই রতন তোর প্যান্ট ছেঁড়া! রতন চুপ। এই রতন তোর মাথায় উকুন! রতন চুপ। এমনকি কাগজ ছুঁড়ে মারলেও কোনো প্রতিধ্বনি হত না। তাই উপায় না-দেখে তারা সেই প্রশ্নই করতে বাধ্য হত, যা-করলে উত্তর আসে। রতন কথা বলে। একটাও কথা না-বলে সবাইকে এক পথে নিয়ে এসেছিল ওই পাগল। মাঝেমধ্যে গান গাইত: তোমার ভুবনে মা গো এত পাপ...। মোড়ের জটলা তাকিয়ে দেখত উসখোখুসকো চুলের মাথা এগিয়ে যাচ্ছে। উত্তর থেকে দক্ষিণে। এই রতন কোথা থেকে এসেছিল কেউ জানত না। ওর সম্পর্কে কতরকম জনশ্রুতি! কে বলল ওর বউ অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে চলে গেছে, তারপর থেকেই ওর মাথা খারাপ। আর একজন বলে ব্রিলিয়াণ্ট ছাত্র ছিল রতন, হাওড়া জেলা স্কুলে স্ট্যান্ড করত; বেশি পড়াশুনোর জন্যেই এটা হয়েছে। এ-কারণেই বেশি পড়তে নেই। মাথার স্ক্রু ঢিলে হয়ে যায়। পাশের পাড়া থেকে চা-খেতে আসা ব্রজবাবু বললেন ওসব কিছু নয়, রতন খুব বড় ষড়যন্ত্রের শিকার। ওর সত্‍-মা আর তার ছেলে মিলে নাকি ওকে বাড়ি থেকে তাড়িয়েছে। ভাল বংশের ছেলে তো, সহ্য করতে পারেনি। কারোর থেকে কোনদিনও পয়সা চাইত না-বলেই যেন কেউ-কেউ কারুণ্যবসত কিছু ফেলে দিত তার ঝোলায়। কপাল ভাল থাকলে জুটে যেত এক-ভাঁড় চা, দুটো বিস্কুট। এই ঘটনা ঘটত সেইদিনই, যেদিন বাবলুদা থাকত। একমাত্র বাবলুদাই ওর সঙ্গে কথা বলবার চেষ্টা করে যেত। একদিন সেই নানাবিধ প্রশ্নের মধ্যে ‘তোর ঘরে কে থাকে?’ শুনে ঘাড় ফেরায় রতন। চোখে যেন কিসের ব্যাকুলতা। ‘আমি আর আমার মন’ সেই প্রথম বলা হয়েছিল কি? সে তথ্য কেউ যত্নে তুলে রাখেনি। শুধু এই তথ্য রয়ে গেছে উত্তর-পশ্চিম পাড়ায়—স্মৃতিকণ্ঠ কোনও কোনও পুরুষের গোপন খেয়ালে।  বাবলুদাও পাগল হয়ে গিয়েছিল। ছাঁট মাংস কিনে এনে ছাদে ছড়িয়ে রাখত। আর আকাশে কালশিটে ফেলে নেমে আসত অতিকায় সব চিল। পাশের গেরস্ত দেখত তাদের বাড়িতে তাদের ডানার ছায়া যেন কোন অনির্দিষ্টপূর্ব, অশনি-সংকেতকে বিশেষিত করে। এই নিয়ে অনেকবার অভিযোগ জানানো হয়, কিন্তু পিতৃমাতৃহীন বাবলুদার ওসব কথা বোঝবার মতো চেতনা অবশিষ্ট ছিল না। সেই বাবলুদা একদিন বিষ খেয়ে ছাদেই আত্মহত্যা করেছিল। সেদিন একটু বেশিই চিল নেমে এসেছিল ছাদে। সঙ্গে অগুনতি কাক। বাবলুদার মাংস চিল-কাকের ঠোঁট থেকে ছিটকে পড়েছিল কারোর-কারোর বাড়িতে। তুমুল হৈ-চৈ বেঁধে যায় তাই নিয়ে। পুলিশ এসে ছাদে মৃতদেহ সনাক্ত করে। সে প্রায় বছর তিরিশের আগের কথা। কী আশ্চর্য! এখনো যদি চিল আসে আমাদের পাড়ায়, চক্কর কাটে উত্তর-পশ্চিম পাড়ার লোহাচুর-আকীর্ণ-আকাশে, তাহলে ওই ছাদেই তারা জিরোতে বসে। আজও কি তাদের নাকে কোনো অকালমৃত যুবকের থেমে যাওয়া মেরুদণ্ডের গন্ধ ভেসে আসে? এই ভূতের বাড়ির পাশ দিয়ে কিছুটা জোরে হেঁটে দোকানে যাওয়া লোক সেই খবর রাখে না। তার মাথায় আরেকটি তথ্য কাজ করে—এই বাবলুর মৃত্যুর কুড়ি-বাইশ বছর আগে তার বাবাও আত্মহত্যা করেছিল। পাখা থেকে ঝুলে। অনেক দেনা হয়ে গিয়েছিল বাজারে।  সবচেয়ে দুঃখের কথা এই সমস্ত ঘটনা যিনি সামনে থেকে দেখেছিলেন, তিনি জেঠিমা। তাকে একা থাকতে হয়েছিল আরো কিছুদিন। জোত্‍স্নায় আপ্লুত কোনো নিস্তব্ধ রাতে মানুষজন যখন খেয়ে-দেয়ে ঘুমোতে যায় বা ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে পুরাণজগতে ফিরে যায়, সেইসময়ে ছাদে উঠে কেউ পায়েচারি করে। একমাথা চুল ওড়ে অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের দিকে। রূপোলি চিল-শকুনেরা নেমে আসে হিম-পড়ার গন্ধে।


ভূতের আবহ ছিল এখানে-সেখানে। ছোটবেলায় বাড়ির মধ্যে যে ছোট্ট বাগান ছিল, তা যে নেহাত্‍ই ছোট, পরে সেই নিয়ে সন্দেহ থাকেনি। জবাগাছ, টগরগাছ, শিউলিগাছ, ফলসাগাছ, আরো কত গাছ। একটা পেয়ারাগাছ ছিল, লম্বাটে পেয়ারা দিত। পরে ঘর-দোর বাড়াতে গিয়ে কাটা পড়ে যায়। সেই শোক দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। এখনো সেই গাছের কথা অবচেতনে ঘুরে-ফিরে আসে। এখনো আমি বিশ্বাস করি তার দীর্ঘশ্বাস শোনা যায় কান পাতলে। এই পেয়ারাগাছটাই ছিল ওই ছোট্ট বাগানের মুখোপাত। একেবারে শেষ মাথায় ছিল শিউলিগাছটা। খুবই শুয়োপোকা হত। ওর তলায় দাঁড়ানো নিষেধ ছিল। আর একটা কারণ, শিউলি গাছটাই আমাদের বাড়ির সীমানা, আর তার ওপারের রহস্যময় বাড়ি। ওখানে নাকি জলাজমি ছিল, ডাকাতি করে টেনে নিয়ে গিয়ে খুন করা হত। তাই ও জায়গাটা ভাল নয়। হাওয়া-বাতাস লাগে। এরকম আরো বেশ কিছু রাস্তা ছিল পাড়ায়। আমরা খেলতে যেতাম এ-পাড়া থেকে অন্য পাড়ায়। বড় রাস্তায় ভিড় বেশি বলে গলি ব্যবহার করেই কত দূর পর্যন্ত চলে যেতাম। যারা ঘুড়ি ওড়াত, তাদের সমস্ত গলিপথ মুখস্থ ছিল। তারা গাইড করে দিত কখনো-কখনো। কিন্তু কোনো-কোনো পথে অঘোষিত ভয় ছিল। আমার সঙ্গে কে থাকে? আমার মন থাকে। সেই মন দেখত, কলকারখানার আওয়াজ ঝিমিয়ে-আসা দুপুরে এখানে-ওখানে অন্ধকার জমেছে। অদৃশ্য বিপদ দাঁড়িয়ে। তাকে কিছুতেই এড়ানো যাবে না। যখন এই পাড়াটাই জলাজমি ছিল, পানবরজ। শেয়াল ঘুরে বেড়াত। একবার রাস্তায় অহিনমামা দেখেছিল শেয়াল মুখে করে কী একটা নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। কাটা মুন্ডু! সাত দিন মামা কিছু খায়নি। খেলেই বমি আসত। এর কয়েক মাস পর শিরোসিস অফ লিভারে আক্রান্ত হয়ে মামা মারা যায়। হাওড়ার শিল্পাঞ্চলে পাঁচশো টাকার জন্যেও কখনো খুন হয়। লাশ গুম হয়ে যায় মাটির ভেতরে। অতৃপ্ত মন নিয়ে আত্মারা ঘুরে বেড়ায়, লোহাচুরের ঘ্রাণে, ইছাপুরের রোস্টেড-বাতাসে। 


পানবরজ ভর্তি একটা জলাজমি ক্রমশ তার জৌলুস হারিয়ে বদলে গেল সাধারণ বসতিপূর্ণ অঞ্চলে। সেই পান ফিরে এসেছিল যৌথ পরিবারের অংশীদার হয়ে। আমাদের বাড়িতেও ডাবর থাকত। তার মধ্যে ঠাকুমা তার সাত ছেলের জন্যে দু-বেলা পান সেজে রাখত। কখনোই ডাবর ফাঁকা হত না। এই ডাবর যেন একটি বাড়ির ভরকেন্দ্র, এক অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডস্বরূপ। আর ঠাকুমা অতিকায় হাত দিয়ে সেই ব্রহ্মাণ্ড থেকে পান তুলে, তার সাত ছেলের মুখে গুঁজে দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছেন--এই দৃশ্য আমি মনে-মনে কতবার কল্পনা করেছি।  ঠাকুমার প্রয়াণের বেশ কিছুদিন পরেও এই রেওয়াজ প্রচলিত ছিল। শুধু ওই ঘরে পান খেতে যাওয়া নয়, পান খাবার অছিলায় বৃদ্ধা মায়ের সঙ্গে গল্প করা, তার আবদার মেটানো। একসময় মনে হয়, ঠাকুমার মৃত্যুর পর ওই ঘরে ঢুকে ডাবর থেকে পান তুলে খাবার সময় বাবা কার সঙ্গে কথা বলত? কার সঙ্গে আবার, নিজের মনের সঙ্গে। ছোটবেলায় আমি জগন্নাথদেবকে প্রায়ই দেখতে পেতাম। বিশেষত সন্ধের সময় এবং অবশ্যই ঘরে একা থাকলে। তখনও পুরী যাইনি কিন্তু জগন্নাথদেবকে চিনতাম ঠাকুমার ঘরেই টাঙানো ছবি দেখে। জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলরাম। সবচেয়ে আকর্ষণ করত দেবতার চোখ। আমি ছোটবেলায় নাম দিয়েছিলাম রেলগাড়ি ঠাকুর। এখন, দেবতাকে প্রায়ই দেখতে পাওয়া বাড়ির বড়দের কাছে অন্য অর্থ নিয়ে আসে। তারা মনে করলেন ঠাকুর আমাকে তার কাছে ডাকছেন! ঠাকুমা মা-কে বলল বৌমা, তোমরা দেরি কোরো না। ঘুরে এসো শ্রীক্ষেত্রে। আমার তখন এসব বোঝবার বয়স ছিল না। পুরীর টিকিট কাটা হল এবং শুধু বাবা-মা-আমি নই, তিন পিসিমা, ঠাকুমাও আমাদের সঙ্গে গেল। পুরীতে গিয়ে প্রথম চাক্ষুস করি জগন্নাথদেবের মূর্তি। সেখান থেকে ফিরে আসবার পর নাকি আমি আর কোনোদিন ওই সন্ধের মুহূর্তে তাকে দেখার কথা কাউকে বলিনি। বাড়িতে সবাই এটাই বোঝান ঠাকুরের আমাকে দেখার ইচ্ছে হয়েছিল। পরে যখন এই ঘটনা কাউকে-কাউকে বলেছি, যুক্তিবাদী ঈশ্বর-সত্তায় অবিশ্বাসীরা বলেছেন ওটা তোমার হ্যালুসিনেশন। জগন্নাথদেবের মূর্তি, তার রূপ আমার মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, সেই থেকেই এই ঘটনা। এর মধ্যে কোনো অলৌকিকতা নেই। সেই সুদূরপরাহত কোনো বিকেলে কী ঘটেছিল, সময়ের সঙ্গে স্তরীভূত হয়ে যায়। তবে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী এই দু-ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিই আমার সঙ্গে হওয়া এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে ব্যবহৃত হয়। দুটি পথ খুলে যায়, তাদের নিজস্ব আমন্ত্রণে। কিন্তু আমার মন ঠিক কী চেয়েছিল? কী দেখেছিল? সন্ধে হব-হব, আবছা জানলার ধুসর আলোয় জগন্নাথদেব দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে। বিশ্বাসের সত্য না মনের মিথ্যে? তারপর থেকে অনেকবার পুরী গেছি। তাকে দেখতে পাইনি। দেখেছি রতন পাগলাকে। কীভাবে কোন জাদুবলে সে এইখানে এসে পড়ল, ভেবে অবাক হয়েছি। বিস্তীর্ণ বালিয়াড়িতে পা-ফেলে হাঁটতে-হাঁটতে সে গাইছে: তোমার ভুবনে মা গো এত পাপ...। আমি অবশ্য তাকে ডাকিনি। কেননা তার সঙ্গে কথা বলবার মন আমি অর্জন করতে পারিনি। তার সঙ্গে কথা একমাত্র বাবলুদাই বলতে পারত। কিই বা প্রশ্ন করতাম তাকে? তোমার ঘরে কে থাকে? সে-উত্তর কি আমি নিজে জানতে পেরেছি? এবার যদি কখনো রেলগাড়ি ঠাকুরের সঙ্গে দেখা হয়, তাহলে তাকেই জিজ্ঞেস করব। বলব আসুন, সমুদ্রের মুখোমুখি বসে দুটো মনকেমনের কথা বলি। 

                                                           ( ক্রমশ)

ছবি : বিধান দেব 







কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন