শনিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২১

পাঠকের হাট ।। অরুণ পাঠক


 মহাশূন্য থেকে ধেয়ে আসা বিভূতি


[আমার কাব্যজ্ঞানের প্রারম্ভিক পর্যায় থেকেই দেখে আসছি অগ্রজ কবিরা তাঁদের বই অকাতরে উপহার দিচ্ছেন। মুখে তৃপ্তির হাসি দাতা ও গ্রহীতার। চার চোখে সমান আগ্রহ। আশে পাশে কৌতুহল। বয়সে অনেক ছোট হলেও বহু প্রতিষ্ঠিত বিদ্বান কবি অল্পবয়সী আমাকেও তাঁদের কাব্যগ্রন্থ উপহার দিয়েছেন। আমিও আমার কাব্যগ্রন্থ ঝোলা থেকে বের করে কাঁপা কাঁপা হাতে কোনও শ্রদ্ধেয় অথবা স্নেহভাজন কবিকে উপহার দিয়ে স্বর্গীয় তৃপ্তি উপলব্ধি করি। আজও কোনও অনুষ্ঠানে গেলে এই কাব্যগ্রন্থ দেওয়া-নেওয়ার একটি বিশেষ পর্ব অলিখিতভাবে সূচিভুক্ত থাকে। তার বাইরে ডাক বিভাগের মাধ্যমেও অনেক কবি তাঁদের কাব্যগ্রন্থ আমার ঠিকানায় পাঠান।
নবীন-প্রবীণ, পরিচিত-অপরিচিত সেইসব কবিদের কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আমি এবার আমার অনুভবের দু-চার কথা বলতে চাইছি এখানে। তবে শুধু উপহার পাওয়া কাব্যগ্রন্থ নয় সেইসঙ্গে গাঁটের কড়ি খরচ করে যে অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ আমি এযাবৎ কিনেছি সেইসব কাব্যগ্রন্থেরও কোনও কোনওটি এই আলোচনার উপলক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।]



প্রায় দুমাস আগে অতিমারীর সমস্ত ভয়কে জয় করে নীলোৎপল ও হরদার (কবি নীলোৎপল জানা ও কবি হরপ্রসাদ সাহু) আমন্ত্রণে মহিষাদলে আয়োজিত কাব্যগ্রন্থ মেলায় উপস্থিত হই। সেখানেই অনেক কাব্যগ্রন্থের সঙ্গে উপহার পাই কবি আনন্দরূপ নায়েক-এর " নৈঃশব্দ্য হে, হে আনন্দ !" কাব্যগ্রন্থখানি।
কাব্যগ্রন্থখানি bilingual. বাংলা এবং ইংরাজী এই দুই ভাষার মিশ্রসহাবস্থানে কবিতা, আলোচনা, কবি পরিচিতি সবই পাশাপাশি বিধৃত হয়েছে। আমি বাংলা অর্থাৎ মূল লেখাগুলিই পড়েছি এবং সেগুলি নিয়েই আমার অনুভব জানাব। এই মহাবিশ্বে প্রাণের উন্মেষ থেকে তার শেষ পরিণতি---- এই প্রবাহটুকু এই কাব্যগ্রন্থের মূল উপজীব্য বিষয়। মেধা, পাণ্ডিত্য, আত্মোপলব্ধি ও জীবন সম্পর্কে একধরনের আস্তিত্বিক উদারতা থাকলে তবেই এই বিশেষ বোধে বিচরণ করার সাহস জাগে। প্রবেশক কবিতায় আনন্দরূপ লিখেছেন---
" সিক্ত মৃত্তিকা থেকে জন্মেছে কোমল ভৈরব
এ জন্মের আনন্দরূপ,
সে কেবল আলো নয়..
করতল ভরে প্রাণ করি অমৃত।"
সত্তা সচ্চিদানন্দময়। সৎ, চিৎ ও আনন্দের এই সমূহতা আকাশ থেকে প্রাপ্ত। জগৎ ও জীবনের স্বরূপ তাই শেষাবধি আনন্দস্বরূপ। তাই প্রবেশক কবিতার শেষ স্তবকে কবি লিখেছেন---
"অক্ষর বিছিয়েছ সম্মুখে,
প্রাণিত অব্যয় জুড়ে শব্দ মায়াখেলা...
পথ হেঁটে চলেছি দূরে,
শ্মশান ছাপিয়ে উঠে আসছে আনন্দভৈরবী।"
লক্ষ্যনীয়, কবি কিন্তু প্রাণিত অব্যয় ( অপরিবর্তিত আত্মা) নিয়ে মায়াময় শব্দের সাম্রাজ্যে পথ হাঁটছেন এবং সেখান থেকে লক্ষ্য করছেন শ্মশান ছাপিয়ে উঠে আসা আনন্দভৈরবী। জগৎ ও জীবন সম্পর্কে কবির এই ইঙ্গিত আমাদের পৌঁছে দিতে চায় সেই ঔপনিষদিক সত্যে যেখান থেকে আমরা শিক্ষা পাই সুখ-দুঃখের ওপারে থাকা চৈতন্যময় এক আনন্দঘন অবস্থার। আর পৃষ্ঠা ওল্টালেই আমরা পেয়ে যাব তৈত্তিরীয় উপনিষদের তৃতীয় খণ্ড ভৃগুবল্লী-র ষষ্ঠ অধ্যায় থেকে উৎকলিত শ্লোক---
"আনন্দো ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ।
আনন্দাদ্ধেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে।
আনন্দেন জাতানি জীবন্তি।
আনন্দং প্রয়ন্ত্যভিসংবিশম্ভীতি।"
এর অর্থ :

----আনন্দই ব্রহ্ম ইহা জানিলেন। কারণ আনন্দ হইতেই এই ভূতবর্গ জাত হয়, জাত হইয়া আনন্দের দ্বারা বর্ধিত হয় এবং অবশেষে আনন্দাভিমুখে প্রতিগমন করে ও আনন্দে বিলীন হয়।
                  ---স্বামী গম্ভীরানন্দ,
                   উপনিষদ গ্রন্থাবলী--১,উদ্বোধন কার্যালয়



এবার সূচি অন্তর্ভুক্ত কবিকৃতির আসল কারুকাজে প্রবেশ করব। আমরা জানি যে কোনও সৃষ্টিও আনন্দময়। তাই যেকোনও শিল্পকর্মের মতো কবিতাপাঠেও আমরা বিদ্যা-বুদ্ধি-জ্ঞান সবকিছু পাশে রেখে পেতে চাইব আনন্দ। যেকোনও কবিতা ততখানি সার্থক যতখানি তা ঐতিহ্যকে ধারণ করেও সমকালীন। সমকালীনতা কোনও বিচ্ছিন্ন সময় নয়। বরং তা অতীতের সমূহ বর্তমান। বর্তমান ভোগবাদী সময়ে তাই ওই নৈঃশব্দ্য আর আনন্দ একটা অন্যরকম ইশারা দেয় আমাদের। 'অপেক্ষা' কবিতায় কবি লিখেছেন ---
" রোজ ভোরে হাঁটতে বেরোই। /অই আমার ঘুমঘোর-গভীরে বেজেছে যে গান, সে গান / সঙ্গেই থাকে।"
গান নামাঙ্কিত পাঁচ পর্বের একটি সিরিজ কবিতা আমরা পরেও পাব। কিন্তু এখানেই স্পষ্ট হল 'ঘুমঘোর-গভীরে' বাজা গান আমাদের সচেতন মুহূর্তের সর্বক্ষণের সঙ্গী। কিন্তু এই গানের সচেতন উপলব্ধি সবার থাকে না। কবি সেটা উপলব্ধি করছেন এবং তা বলছেন।  এবং তিনি আরও লিখেছিলেন---
" এ পথেই রোজ দেখা হয় তাঁর সাথে। প্রায়শই হেসে বলেন, কুশল তো?" আর  কবিতার শেষে আমরা দেখব কবিকথিত এই চরিত্রটি আরও পরিষ্কার----
" এখনও বুঝিনি যে, আমার চেয়ে কত ভোরে ওঠেন আমার ঈশ্বর"। কবিকে যদি আমরা সত্যবাদী বলে মনে করি তাহলে এখানেই স্পষ্ট হয়ে যায় তথাকথিত কিছু প্রগতিশীল প্রদত্ত ঈশ্বরের অবস্থান। যদিও গান। গানের ওই সুপ্ত গতিধারা যা আমাদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রবাহিত এমনকী জন্ম জন্মান্তরে প্রবাহিত সেই সাংগীতিক বিমূর্তিই আমাদের সত্তাকে সংবহ করেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন---
" যবে কাজ করি
            প্রভু মোরে দেন মান।
যবে গান করি
             ভালোবাসে ভগবান।।
                               ( লেখন ৫২)
ঈশ্বরের এই ভালোবাসাই সম্পদ আমাদের। কিন্তু কী এই গান? কীভাবেই বা গাইব? কবি আনন্দরূপ লিখেছেন---
" আমি তো শিখিনি এই সুর, তবু্ও বেজে উঠি বারংবার।" ( সুর ) আর এই বেজে ওঠা কী?
তারও সন্ধান কবি দেন----
" এই সত্য, বেজে ওঠা শব্দ হয়ে।"( সুর)
আমরা পেয়ে গেলাম আত্ম-মীমাংশার সারবস্তু সেই সত্যকে যে প্রসঙ্গে পরমপুরুষ শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণদেব বলেছিলেন--- কলিযুগের সাধনা হল সত্যের সাধনা।




উপনিষদের অতীতকে কবি এখানেই করে তোলেন সমকালীন। চূড়ান্ত ভোগবাদী এই সভ্যতায় কবির এই নিরাভরণের দিকে যাত্রা আমাদের মনে পড়ায় বৈদিক যুগের যদৃচ্ছ ভোগবাসনা থেকে মানুষকে কীভাবে ত্যাগের দিকে দৃষ্টি ফেরাতে সাহায্য করেছিল উপনিষদসমূহ। আর বেদের সুউচ্চ মর্মকে মস্তকে রেখেও কীভাবে উপনিষদ কথিত ব্রহ্মবাদকে হৃদয়ে স্থান দিয়েছিল সেকালের ভারত।
" নির্জন ঘুমঘোরে এ যাবৎ স্থাবর অস্থাবর বন্ধক রেখে ঘাটে এসে / দাঁড়ায় একজন..." ( ধ্বনি)


আর তারপরই তার পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব---
"...গানের ওপারে একটি বাড়ি ছিল। বাড়িটির নাম রূপকথা।"( গান)
তারও পর---
" মহাশূন্য থেকে ধেয়ে আসা বিভূতি খসে খসে পড়ছে দেহসমগ্রে।"( গান)
পার্থিব জড়বস্তুর মোহ ঘুচলে তবেই এই বিভূতির দেখা মেলে। কবি মণীন্দ্র গুপ্ত  তাঁর বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্মারক বক্তৃতা ১৯৯২- এ বলেছেন---
" গভীরভাবে  বাঁচতে হলে হালকা, বাহুল্যবর্জিত, উপকরণহীন হয়ে বাঁচতে হবে আজকাল এই কথাটাই  কেবল মনে হয়। প্রথম থেকেই মূল্যহীনকে না জমানো এবং শেষে মূল্যবানকে ছেড়ে চলে যাওয়া--- এই পথেই মুক্তি। কিন্তু ঘরবাড়ি অর্থাৎ ভোগ্যপণ্যে ঠাসা তার নিশ্ছিদ্র কংক্রিটের কুঠুরিটি নিয়ে আজকাল মানুষ বড় বিভোর ও বিব্রত। প্রাণের অনেকখানি ক্ষইয়ে দিয়েছে এই ঘর ও সরঞ্জাম-সভ্যতা।"( তাহারা অদ্ভুত লোক)।  'মূল্যহীনকে না জমানো এবং শেষে মূল্যবানকে ছেড়ে চলে যাওয়া'---- এই প্রকৃত মুক্তি পথের সন্ধান দেয় এই কাব্যগ্রন্থ। কবি লিখেছেন---
" যাব বলেই আজ ভীরু চোখ পশ্চাতে তাকাল। ... সামান্য তৈজসরাশি আর কিছু / অসামান্য বৈভব।"( ঐশ্বর্য )
তৈত্তিরীয় উপনিষদের শ্লোকাংশ কাব্যগ্রন্থটির মূল টিউন হলেও কাব্যে বিধৃত উনিশটি কবিতার মর্মমূলে রয়ে গেছে ঈশোপনিষদ কথিত সেই ব্রহ্মজিজ্ঞাসা। আকাশ-মৃত্তিকা ও সহউপকরণের সাহচর্যে সেই জ্যোতির্ময় পুরুষের সন্ধান, যা কবি সহস্রাব্দের ভেতর থেকে কুড়িয়ে নিয়েছেন।
এ কাব্যগ্রন্থ পাঠে আমরা বুঝতে পারি---
" ওঁ ঈশাবাস্যমিদং সর্বং
যৎকিঞ্চ জগত্যাং জগৎ।
তেন তক্তেন ভুঞ্জীথা
মা গৃধঃ কস্য স্বিদ্ধনম্।।১
অর্থাৎ,  পরিবরশীল এই জগতে সবকিছুরই ক্রমাগত পরিবর্তন হচ্ছে। তথাপি সবকিছু পরমেশ্বরের দ্বারা আবৃত। ত্যাগ অনুশীলন কর এবং সর্বভূতের চৈতন্যস্বরূপ আত্মায় দৃঢ়প্রতিষ্ঠ হও। অপরের ধনে লোভ করো না।(উপনিষদ প্রথম ভাগ, স্বামী লোকেশ্বরানন্দ, আনন্দ পাবলিশার্স)।

শুধু একটা কথাই বলব কাব্যগ্রন্থ এরূপ ভূমিকাসংবলিত পাঠক সহায়ক না হলেই কি হত না? কবির কাছে অহংকার শুধুমাত্র শব্দ-আকরিক। ব্যাখ্যা-শোধনাগার সেখানে নাই-বা থাকল। পাঠকের আত্মজ্ঞানের ওপর আরও একটু বিশ্বাস রাখা উচিত ছিল কবির। ২০১৯ সালে 'কবি বাসুদেব দেব সংসদ সম্মান' প্রাপ্ত এই কাব্যগ্রন্থের প্রত্যেকটি কবিতাই অত্যন্ত সহজ । বোধের অমন নিগূঢ় বার্তা লেখনীর গুণে সরস ও প্রাঞ্জল হয়ে উঠেছে। এরপর নৈঃশব্দ্য ও আনন্দ ছাড়া আর কোনও কথা হবে না।

নৈঃশব্দ্য হে, হে আনন্দ! ।। আনন্দরূপ নায়েক ।। ঋত প্রকাশন ।। দাম : ১২০ টাকা


ছবি : বিধান দেব 

                                                     ( ক্রমশ)


৪টি মন্তব্য: