শনিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২১

মুক্ত গদ্য ।। সায়ন রায়


 

এলোমেলো বায়ু বয়, ছন্নছাড়া সমুদ্র উত্তাল


After great pain, a formal feeling comes—

The Nerves sit ceremonious, like Tombs—

The stiff Heart questions was it He, that bore,

And, Yesterday,  or Centuries before ? 


The Feet, mechanical, go round—

Of Ground, or Air, or Ought—

A Wooden way

Regardless grown,

A Quartz contentment, like a stone—


This is the Hour of Lead—

Remembered, if outlived,

As Freezing persons, recollect the Snow—

First—Chill—then Stupor—then the letting go—

[After Great Pain, a Formal Feeling Comes—Emily Dickinson ]



একটা অসম্ভব আর অবাস্তব তাড়া করে ফিরছে।তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে চিন্তার জগৎ। বেদনার গাছ হতে ফুল ঝরে পড়ছে টুপটাপ।আমি শিশিরের শব্দ একটা একটা করে তুলে রাখছি সুদৃশ্য  বয়ামে।ভাবছি কার্যকারণ সূত্র।নাকি সবটাই মনের ভুল।এক উদভ্রান্ত এলোমেলো দুর্বার খামখেয়াল। দারুণ কাব্যিক, কিছুটা দার্শনিকও।ঝড় উঠেছে পশ্চিমাকাশে।পাগলপারা এই মরুঝড়ে সব ঝাপসা। আঁধিয়ার। আধঘন্টাটাক এই ঝড়ের পর আশ্চর্য বদলে গেল দৃশ্যপট।বালিপাহাড়ের নতুন রূপ, নতুন গঠনে জগৎ নতুন করে আবিষ্কৃত হচ্ছে।হারিয়ে যাচ্ছে স্মৃতি।চেতনার নব নব বিস্ফার। আশ্চর্য ! আগের আমি আর নতুন আমি দুটো আলাদা মানুষ।ভিন্ন দুই সত্তা। 

~~

যোসেফ থিওদোর কনরাড করজেনিওস্কি,জন্ম ১৮৫৭,ইউক্রেনে এক পোলিশ পরিবারে,যিনি পরবর্তীকালে ইংরেজিতে গল্প,উপন্যাস লিখে আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যকে মারাত্মক ভাবে প্রভাবিত করবেন,যার একটি নমুনা : সম্পাদক-কবি এজরা পাউন্ড এলিয়ট-এর যুগান্তকারী 'দ্য ওয়েস্টল্যান্ড'(১৯২২) কবিতাটির প্রায় অর্ধেক বাদ দিয়ে দেন।তিনি জানিয়েছিলেন তিনি সেই ধাই-মা যে কনরাডের 'হার্ট অফ ডার্কনেস'(১৯০২) থেকে 'দ্য ওয়েস্টল্যান্ড'-এর নাটাল কর্ডটিকে ছিন্ন করেন।আরেকটি গল্প : জাহাজে করে যাচ্ছিলেন ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক উইলিয়াম গোল্ডিং,যার বিখ্যাত উপন্যাস 'লর্ড অফ দ্য ফ্লাইস' (১৯৫৪), নোবেল পুরস্কার পান ১৯৮৩ সালে, একটি বই বারবার পড়তে পড়তে একসময় তিনি সেটি জলে ফেলে দিলেন।বইটি ছিল কনরাডের 'হার্ট অফ ডার্কনেস'।পরে জানিয়েছিলেন বইটি তাকে এতটাই আচ্ছন্ন করে ফেলছিল যে তার মনে হয়েছিল যে তিনি নিজে আর কিছু লিখতে পারবেন না।কুড়ি বছর বয়সে নিজের বুকে রিভালবার ঠেকিয়ে যোসেফ কনরাড আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।অদ্ভুতভাবে গুলিটি শরীরের অভ্যন্তরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে আহত না করেই বেরিয়ে যায়। বেঁচে যান তিনি।তার মনে হয়, হয়তো তার কিছু করার আছে। একুশ বছর বয়সে ইংরেজি শেখা শুরু করেন।ইংরেজি সাহিত্যপ্রীতির কারণ  সম্ভবত ছোটবেলায় পড়া শেক্সপিয়রের অনুবাদ।

~~

কোথায় যাব ? কোথায় কোথায় খুঁজবো আমার হারিয়ে যাওয়া সাইকেল। একটা তপ্ত দুপুর কাটিয়েছি একা।এই অস্থিরতা আমায় কোথায় নিয়ে ফেলবে ? বিকেলের দিকে কিছু প্রশমণ। ঠান্ডা হাওয়া নেমে আসছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে।অল্প অল্প শীত।আষ্টেপৃষ্টে চাদরটাকে জড়িয়ে নিই। ওটুকুই ওম। ভালবাসা। কিছুপরই কুয়াশা জড়িয়ে অন্ধকার নেমে আসবে পৃথিবীর বুকে। নিজেরই পদক্ষেপ হয়ে যাবে অস্পষ্ট, অচেনা। ঠাহর করে করে পাকদণ্ডি বেয়ে কীভাবে ফিরবো,কখন ফিরবো নিজের ঘর ? নিজেরই কি ঘর ? প্রশ্ন জাগে, প্রশ্ন জাগে আজীবন। আর কিছু থাক বা না থাক, আর কিছু পাই বা না পাই ওই প্রশ্ন কটি থেকে যাবে। কখনও দুরন্ত দুর্বার পাগল ঝাপট।কখনও মৃদু মৃদু উষ্ণ ওম। থেকে যাবে আমৃত্যু। মৃত্যুর পরও। থেকে যাবে আমাকে ঘিরে। আবছা ছায়ার মত, জালের মত। দূরপ্রসারী। 

~~

মৃত্যুর পর স্বীকৃতি পেলেন পল গগ্যা(১৮৪৮-১৯০৩)। এ ব্যাপারে সহায়ক হয়েছিল প্রখ্যাত আর্ট ডিলার অ্যামবোয়েজ ভোলা (Ambroise Vollard)-র উদ্যোগে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দুটি মৃত্যু পরবর্তী প্রদর্শনী। জীবনের শেষ দশবছর কাটিয়েছিলেন তাহিতি সহ ফ্রান্স অধিকৃত প্রশান্ত মহাসাগরের বুকের ছোট দ্বীপগুলিতে।প্যারিসে ফেরেননি।মারা যান অ্যাটুয়ানায়। এখানেই তাকে সমাধিস্থ করা হয়।  পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট গগ্যা তার সমসাময়িক ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীদের সীমাবদ্ধতাকে পেরিয়ে দৃপ্ত রঙের ব্যবহার, চড়া বৈপরীত্য, অতিরিক্ত শরীরি ভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে গেলেন সিম্বলিসমের দিকে।যা প্রভাবিত করলো পরবর্তী শিল্পীদের। আক্রান্ত হলেন পাবলো পিকাসো, হেনরি মাতিস।প্যারিস শহরে একজন সফল ও ধনী স্টকব্রোকার, পাঁচ সন্তানের জনক গগ্যা পঁচিশ বছর বয়সে ছবি আঁকা শুরু করলেন।বন্ধুশিল্পী পিসারোর তত্ত্বাবধানে চলতে থাকলো তার আঁকাআঁকি।পরবর্তীতে এই বন্ধুর সাথেও বিচ্ছেদ হয়ে যায়। স্বশিক্ষিত এই শিল্পী ছত্রিশ বছর বয়সে ঠিক করলেন ব্যবসা,পরিবার সব কিছু ছেড়ে পূর্ণসময়ের শিল্পী হবেন। বেঁচেছিলেন মাত্র পঞ্চান্ন বছর।

~~

এই গ্রহ তার রূপ রস গন্ধ স্পর্শ দিয়ে বেঁধেছে আমাকে।তবু..তবু..। এলোমেলো হয়ে যায় বাগিচার ফুল। ঝরা পাতা। অচেনা অজানা কোনও মহাজাগতিক রশ্মি যেন। কোনও এক সুর। সহস্র আলোকবর্ষ দূরে কোনও ক্ষুদ্র গ্রহে বসে  ক্ল্যারিওনেট বাজাচ্ছে কেউ। তার সুর ঢেউ হয়ে, আলো হয়ে, জোছনার ঘ্রাণ হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দিগবিদিক। সেইসব মধু। কী লাবণ্য! সাধ হয় স্বাদ নিতে। পাথর চুঁয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় জমা হচ্ছে জল পাহাড়ের খাঁজে।কত প্রাচীন সময়ের আলো মিশে আছে ওই জলে। নৈর্ব্যক্তিক। মুক্তোর কণা চোখে মুখে গলায় মাথায়। জলের রশিতে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে কেউ। সূর্য উঠছে ! সূর্য উঠছে ! 

~~

১৯২৭ সালে জার্মান পদার্থ বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ প্রকাশ করলেন তার যুগান্তকারী 'অনিশ্চয়তা সূত্র' (theory of uncertainty)। ভেঙে পড়লো এতদিনকার সযত্নলালিত ইমারত। বিজ্ঞানের জগতে।দর্শনের জগতেও। বদলে গেল ভাবনাচিন্তার দুনিয়া। নিউটনের গতিসূত্রে আস্থা রেখে এতদিন পর্যন্ত আমাদের বিশ্বাস অটুট ছিল কার্যকারণতত্ত্বে।এই মহাবিশ্বে সকল বস্তুর অবস্থান ও গতিবেগ নির্ধারিত হচ্ছে তার পূর্বের অবস্থান ও গতিবেগ দ্বারা।শুধু জড় বস্তু নয় জীবের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। কারণ জীবদেহও তো বস্তুকণা দিয়ে তৈরি। আর সেই বস্তুকণাও একই নিয়মের অধীন।এই মহাবিশ্ব কাজ করে চলেছে একটি যন্ত্রের মত, তার আচরণে স্বাধীন ইচ্ছের কোনও স্থান নেই। এ এক অমোঘ নিয়তিবাদ। সবকিছুই পূর্বনির্ধারিত। হাইজেনবার্গ তার 'অনিশ্চয়তা সূত্র'-এ দেখালেন অস্তিত্বের সূক্ষ্মতম উপাদান ইলেকট্রনের প্রকৃতি চরিত্রগতভাবে এলোপাথাড়ি/খামখেয়ালি ।সেখানে কার্যকারণসূত্র খাটে না। একটা পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে ঘিরে ঘূর্ণায়মান ইলেকট্রন কখন কোন অরবিটে থাকবে, তার অবস্থান অনির্ণেয়। শুধু সম্ভাবনাটুকুই ব্যক্ত করা যেতে পারে। 

~~

কী সেই গূঢ় সম্ভাবনা ?  কী সেই আশ্চর্য উদ্ধার ? আজ সারারাত ধরে উল্কাপাত। আজ সারারাত বিষাদ প্লাবন।কোন সে জ্ঞান ? কী সেই মধু ? আজ হাওয়ার নাচন।দুরুদুরু বক্ষে পথ চাওয়া...


ছবি : বিধান দেব 





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন