শনিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২১

জন্মের আগের মুখ ।। চন্দন মিত্র




জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন কোয়ানের অমায়িক ভুবন     

 

 

একাদশ পর্ব

লিন-চি/রিনজাই সম্প্রদায়

লিন-চি (জাপানি উচ্চারণে রিনজাই) সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা লিন-চি ই-শিউয়েন। তিনি ছিলেন বর্তমান চিনের শ্যানতং প্রদেশের তোংমিং অঞ্চলের বাসিন্দা। তিনি ৮৮৬ খ্রিস্টাব্দ বা তার পরের বছর মারা যান। তাঁর জন্মসাল নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে অনুমান  করা হয়, তিনি নবম শতাব্দীর প্রথম দশকেই জন্মগ্রহণ করেন। কৈশোরেই তিনি গৃহত্যাগ করে মঠে মঠে ঘুরে  বেড়ান। সূত্র মুখস্থ ও শাস্ত্র পাঠ করে করে বৌদ্ধমঠের বুদ্ধিবৃত্তিক শিক্ষার প্রতি তিনি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন। একঘেয়ে জীবন থেকে মুক্তির আশায় তিনি এমন এক গুরুর সন্ধান  করতে থাকেন, যিনি নিতান্ত সূত্র ও শাস্ত্র কেন্দ্রিকতায় আবদ্ধ না-থেকে মুক্তির স্বচ্ছন্দ কোনও পথ বাতলে দেবেন। ঘুরতে ঘুরতে তিনি কুড়ি বছর বয়সে চিয়াংশি প্রদেশের নানচান অঞ্চলের হুয়াংপো পর্বতে পৌঁছান। সেখানে তিনি আচার্য শি-ইউয়েন-এর মঠে উপনীত হন। শি-ইউয়েন দীর্ঘদিন হুয়াংপো পর্বতে অবস্থান করার জন্য হুয়াংপো নামে খ্যাত হয়ে পড়েন, জাপানি উচ্চারণে ওবাকু। আমরা তাঁকে এই ওবাকু নামেই ডাকব। ওবাকু-র গুরু ছিলেন বাইজাং হুয়াইহাই (জাপানি উচ্চারণে হিয়াকুজো)। আবার হিয়াকুজো-র গুরু ছিলেন মাৎ-সু দাও-ই (জাপানি উচ্চারণে বাসো )।   

    ওবাকু-র মঠে লিন-চি তিনবছর কাটিয়ে দিলেন। মঠের কাজ ও মাঝেমধ্যে ধ্যান করা ছাড়া লিন-চি-র করার মতো আর কিছুই ছিল না। পড়াশোনা করা বা মুখস্থ করার প্রতি মোহ তাঁর  আগেই ঘুচে গেছিল। এই তিন বছরের মধ্যে একদিনের জন্যও তিনি আচার্যের মুখোমুখি হননি। বিষয়টা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন মঠের মুখ্য সন্ন্যাসী মুচো তাওমিং। তিনি একদিন লিন- চি-কে ডেকে কথাবার্তা শুরু করলেন।

মুচো— তোমার এই মঠে কতবছর হল ?

লিন-চি— তিন বছর।

মুচো— তুমি কি আমাদের আচার্যের কাছে কোনোদিন কিছু জানতে চেয়েছ ?

লিন-চি— তাঁর কাছে আমার কোনো জিজ্ঞাসা নিবেদন করা উচিত কিনা, তা নিয়ে আজও আমি মনস্থির করে উঠতে পারিনি।

মুচো— ঠিক আছে। তুমি তাঁর কাছে গিয়ে জানতে চাও বৌদ্ধধর্মের মূল শিক্ষাটি কী ?

    মুখ্য সন্ন্যাসীর কথামতো সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর করে লিন-চি চললেন, আচার্য ওবাকু-র কক্ষে। যথাবিহিত শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে লিন-চি বললেন, আচার্য আপনি দয়া করে আমাকে বলুন বৌদ্ধধর্মের মূল শিক্ষাটি কী? জিজ্ঞাসাবাক্যটি শেষ হতে না-হতে ওবাকু-র হাতের ছড়িটি সবেগে এসে পড়ল লিন-চি-র পিঠে। বিস্ময়ে হতবাক হলেও লিন-চি আচার্যের কাছে বিদায় নিতে ভুললেন না। থতমত অবস্থায় লিন-চি-কে ফিরে আসতে দেখে মুখ্য সন্ন্যাসী মুচো তাঁর কাছে জানতে চাইলেন— কী উত্তর পেলে? লিন-চি সবই বললেন। মুচো, আবার তাঁকে আচার্যের কাছে গিয়ে ওই জিজ্ঞাসাটিই  করতে বললেন। লিন-চি পুনরায় আচার্যের কাছে একই জিজ্ঞাসা উত্থাপন করে একই ফল লাভ করলেন। মুচো, ব্যর্থ মনোরথ লিন-চি-কে আবারও পাঠালেন আচার্যের কাছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও  লিন-চি গেলেন, জিজ্ঞাসা রাখলেন এবং প্রহৃত হয়ে ফিরে এলেন। মুচো আর কী বলবেন! তিনিও বিস্ময়বিমূঢ় হয়ে পড়লেন। লিন-চি, তাঁকে সাফ সাফ জানিয়ে দিলেন, এমন অপমান সহ্য করে  তিনি আর থাকবেন না, কাল সকালেই তিনি মঠ ত্যাগ করবেন। মুচো বললেন, তা সে করতেই   পারে, তবে মঠ ছাড়ার আগে যেন সে আচার্যের কাছে দেখা করে অনুমতি নিয়ে যায়। মুচো এবার   স্বয়ং চললেন আচার্যের সঙ্গে দেখা করতে। তিনি গিয়ে আচার্যকে বললেন, আচার্যদেব, আজ আপনার কাছে তিনবার একই জিজ্ঞাসা করে যে নবীন সন্ন্যাসীটি তিনবারই প্রহৃত হয়েছে, সে    আপনার কাছে বিদায় নিতে আসবে। আমি তাকে দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ করেছি সে সৎ, আন্তরিক, নির্ভীক ও অনিসন্ধিৎসু। আমার মনে হয় একদিন সে মহাদ্রুম হয়ে জগতের বহু তাপিতকে প্রাণদায়ী ছায়া দান করবে। আপনি তার প্রতি একটু যত্নবান হোন। এটাই আমার নিবেদন। পরের দিন সকালে লিন-চি আচার্যের কক্ষে উপস্থিত হলে, আচার্য বললেন, তুমি যদি এই মঠ ত্যাগ করতে চাও, তা করতেই পারো। তবে তোমার জিজ্ঞাসার যথাযথ উত্তর জানার জন্য তোমাকে  কাও-আন নদীর তীরে আচার্য তা-য়ু-র মঠে যেতে হবে।

    লিন-চি খুঁজে খুঁজে কাও-আন-নদী-তীরবর্তী এক মঠে তা-য়ু-কে পেয়ে গেলেন। নতুন কাউকে  দেখলে যেমনটা রীতি তা-য়ু ঠিক তেমনই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন।

তা-য়ু— কোথা থেকে আসা হচ্ছে শুনি ?

লিন-চি— আচার্য ওবাকুর মঠ থেকে। সেখানে আমি তিন বছর কাটিয়ে আসছি।

তা-য়ু— তা ওই মঠ থেকে তুমি কী শিক্ষা নিয়ে এসেছ ?

লিন-চি— না, না, আমি ওই মঠে তেমন কোনও শিক্ষা লাভ করিনি। আমি আচার্যের কাছে বৌদ্ধধর্মের মূলনীতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম। তিন তিন বার জিজ্ঞাসাটি করে যারপরনাই প্রহৃত হয়ে আমি এখানে এসেছি। আমি এখনও বুঝতে পারছি না আমার দোষটা ঠিক কোথায়!

তা-য়ু— অকৃতজ্ঞের মতো কথা। ওবাকুর হৃদয় অপার করুণার আধার, ঠিক যেমনটা হয় আমাদের মা-ঠাকুরমাদের অন্তর। তিনি আপনাকে অতিরিক্ত প্রযত্ন দিতে গিয়ে নিজেকেও বিধ্বস্ত করেছেন।  আর তুমি এসে বলছ তোমার দোষ কোথায়! আশ্চর্য তো!

তা-য়ু-র এই কথায় লিন-চি আমূল কম্পিত হন। তাঁরর মনোজগতে সত্তা-টলানো আলোড়ন সৃষ্টি  হয়। এই অভূতপূর্ব আলোড়নেই তাঁর আলোকপ্রাপ্তি ঘটে, তিনি বোধিপ্রাপ্ত হন। আচ্ছন্নের মতো তিনি উচ্চারণ করেন— আমারই বোঝার ভুল। ওবাকু-র বৌদ্ধধর্মে জটিলতার ছিটেফোঁটাই নেই।  

তা-য়ু, লিন-চি-র কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলেন— বিছানা-ভেজানো শিশুর মতো কথা বলছ। প্রথমে বললে, তোমার দোষ কোথায় তা তুমি বুঝতে পারনি। আবার এখন বলছ, ওবাকু-র বৌদ্ধধর্মে জটিলতার ছিটেফোঁটাই নেই।

আচমকা লিন-চি, তা-য়ু-র পাঁজরে তিনবার মুষ্ট্যাঘাত করেন। তা-য়ু, তাঁকে দূরে ঠেলে দিয়ে বলেন— এই ছোকরা, তোমার আচার্য ওবাকু। এসব আমার বিষয় নয়।

    লিন-চি ফিরলেন হুয়াংপো পর্বতের মঠে। গিয়ে দাঁড়ালেন একেবারে প্রবৃদ্ধ ওবাকুর মুখোমুখি।

ওবাকু— দ্যাখো কাণ্ড, আবার সেই খ্যাপা ছেলেটি ফিরে এসেছে ! এতো দেখছি গিয়েও যায় না। যায় আবার আসে, আসে আবার যায় ! এই বালখিল্যপনা এবার শেষ করো, বুঝলে!

লিন-চি— আপনার অপার স্নেহই তো আমাকে ফেরাল।

ওবাকু— তাহলে কে গেল আর কে ফিরল ?

লিন-চি— গতকাল আমি আচার্যের স্নেহময় নির্দেশ পেয়েছিলাম। আজ ফিরেছি আচার্য তা-য়ু-র কাছে শিক্ষা নিয়ে।

ওবাকু— তা, বুড়ো তা-য়ু কী শেখাল তোমাকে ?

লিন-চি— তেমন কিছুই না ! আপনার আপাত কাঠিন্যের ভিতরে প্রবহমান অপার স্নেহধারার রহস্য তিনিই তো আমার কাছে উন্মোচন করে দিয়েছেন। 

ওবাকু— বুড়ো হচ্ছে তো! তাই ভুলভাল বকা শুরু করেছে। আমার সঙ্গে দেখা হোক একবার। আচ্ছা করে বেশ কয়েক ঘা দিতে হবে।

লিন-চি— সে তো আপনি তা-য়ু-র সঙ্গে দেখা হলে দেবেন। এখন আমারটা নিন।

কথা শেষ করেই আচমকা লিন-চি ওবাকু-র গালে ঠাস করে একটা চড় কশিয়ে দেন। ওবাকু  সিংহের মতো গর্জন করে উঠলেন— এই খ্যাপাটা বাঘের গোঁফে টান মেরেছে।   

এবার লিন-চি উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন— কাৎজ !

তাঁর এই মঠ-কাঁপানো  হুংকার শুনে সন্ন্যাসীরা ছুটে এলেন। ওবাকু তাঁদের বললেন— এই খ্যাপাটাকে এখান থেকে বের করে ধ্যানকক্ষে নিক্ষেপ করো। ওটাই ওর যথার্থ জায়গা।       লিন-চি ওবাকু-কে শ্রদ্ধা নিবেদন করে সন্ন্যাসীদের পিছু নিলেন।   

      লিন-চি ও ওবাকু-র এই অদ্ভুত আচরণ চ্যান-ধারায় বহুল-চর্চিত একটি বিষয়। এই প্রসঙ্গে কুয়েই-শান ও ইয়াং-শান-এর একটি সংলাপখণ্ড পাওয়া যায়।

কুয়েই-শান— দুজনের এমন কথাবার্তা ও অদ্ভুত আচরণের রহস্যটা কী ?

ইয়াং-শান— এ সম্বন্ধে আপনার মত কী ?

কুয়েই-শান সন্তানকে বড়ো করে তোলার জন্য বাবাকে অপার স্নেহশীল হয়ে উঠতে হয়।

ইয়াং-শান— এই মন্তব্যটা আমার মনঃপূত হল না।            

কুয়েই-শান— আপনার মত কী ?

ইয়াং-শান— আমার মনে হয় এটা চোরকে বাড়ি ধ্বংস করতে উসকে দেওয়ার মতো ঘটনা।

কুয়েই-শান— লিন-চি কি তা-য়ু বা ওবাকু-র কাছ থেকে কোনোরকম সহায়তা পেয়েছিলেন বলে মনে হয় ?

ইয়াং-শান— লিন-চি যে কেবল বাঘের মাথায় চাপতে সক্ষম হয়েছিলেন তা নয়, তিনি বাঘের লেজেও মোচড় দিয়েছিলেন।

ইয়াং-শান শেষোক্ত সংলাপের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন, লিন-চি, তা-য়ু এবং ওবাকু-র শিক্ষাকে  যথাযথভাবে উপলব্ধির মাধ্যমে নিজে যেমন আলোকিত হয়েছেন, তেমন দুই আচার্যকেও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের ক্ষেত্রে আলোকপ্রাপ্তির স্বাক্ষর রেখেছেন; যা অবশ্যই প্রথাসিদ্ধ নয়, হৃদয়সিদ্ধ!   প্রখ্যাত জাপানি জেন আচার্য ওমোরি সোগেন (১৯০৪-১৯৯৪) এই ঘটনায় আচার্য তা-য়ু-র ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি মনে করেছেন তা-য়ু, লিন-চি-র মতো একজন সুযোগ্য শিক্ষার্থীকে ত্যাগ  করে মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন; তিনি লিন-চি-র আচার্য হিসাবে ওবাকুকে মেনে নিয়েছেন। তা-য়ু যদি নাম সর্বস্ব আচার্য হতেন, তা হলে বোধিপ্রাপ্ত লিন-চি-কে প্রত্যাখ্যান না-করে নিজের মঠে স্থান দিতেন এবং নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধির জন্য তাঁকে ব্যবহার করতেন।

    রেকর্ড অব লিন-চি (চৈনিক, লিন-চি লু) থেকে লিন-চি-র জীবনের অনেক কথাই জানা যায়। লিন-চি, তা-য়ু ও ওবাকু দুজনের মঠেই থাকতেন। সম্রাট উ-চোঙ ৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে চিনে বৌদ্ধধর্ম নিষিদ্ধ করলে লিন-চি সেই সময় তা-য়ু-র মঠে গা-ঢাকা দেন। যদিও এই নিষেধাজ্ঞা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি, ৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে তা রদ হয়। এই সংক্ষিপ্ত সময়সীমায় বহু মঠ-বিহার মাটিতে মিশে যায়, বৌদ্ধ ধর্মানুসারীরা হেনস্থার শিকার হন। নিষেধাজ্ঞা রদ হওয়ার অব্যবহিত পরে তা-য়ু-র মৃত্যু হয়। অতঃপর লিন-চি চলে আসেন ওবাকু-র মঠে। ৮৪৯-৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে তিনি পাকাপাকিভাবে ওবাকু-র কাছ থেকে বিদায় নেন। বিদায়ের প্রাক্কালে আচার্য ওবাকু তাঁকে বলেন—  লিন-চি, ভবিষ্যতে তুমি বহু মানুষের জিহ্বা কর্তন করবে ! ওবাকু-র এই ভবিষ্যদবাণী বিফল  হয়নি। ওবাকুর মঠ ছেড়ে হাঁটতে হাঁটতে লিন-চি, চেন-চউ নগরের হু-তাও নদী তীরবর্তী লিন-চি   ইউয়েন নামের একটি অখ্যাত ছোটোখাটো মঠে পৌঁছান। সেখানেই তিনি বসবাস করতে থাকেন। কালক্রমে অখ্যাত মঠটির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দূরদূরান্তে। বহু সন্ন্যাসী মঠে এসে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকেন লিন-চি-র মুখনিঃসৃত বাণী শ্রবণের জন্য। মঠের লিন-চি নামটি স্থায়ীভাবে মুদ্রিত হয়ে যায় ই-শিউয়েন নামের উপর। একদা যে সন্ন্যাসী ই-শিউয়েন নামে পরিচিতি পেতেন এখন তিনি লিন-চি নামেই চিহ্নিত হতে থাকেন। কেবল সাধারণ লোকজন নয়, চেন-চউ নগরের শাসক ওয়াং ও ছিলেন লিন-চি-র একজন অনুরাগী। লিন-চি-র ধর্মসূরী হিসাবে জনৈক চিন হুয়া চিং চুয়াং (৮৩০-৮৮৮ খ্রিঃ)-এর নাম পাওয়া যায়। চিন হুয়া, লিন-চি মঠে এসেছিলেন ৮৬১ খ্রিস্টাব্দে। তারপর তীর্থযাত্রায় বেড়িয়ে পড়েছিলেন। পরে ফিরে আসেন লিন-চিকে দেখভাল করার জন্য। লিন-চি-র অন্য এক শিষ্য সান-শেং-এর কথা জানা যায়। লিন-চি-র মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্ববর্তী সময়ে অন্যান্যদের সঙ্গে তিনিও উপস্থিত ছিলেন। তাঁর সঙ্গে লিন-চি-র শেষ কথোপকথনটুকু দেখে নেওয়া যাক।

লিন-চি— আমি চলে যাওয়ার পরও কী আমার ধর্মদৃষ্টি অক্ষুণ্ণ থাকবে বলেই মনে হয় ?

সান-শেং— আমরা কেউই আপনার সত্যদৃষ্টিকে ক্ষুণ্ণ করার মতো সাহসই পাব না।

লিন-চি— ভবিষ্যতে আমার শিক্ষা সম্পর্কে কেউ জানতে চাইলে তাকে তুমি কী বলবে ?

সান-শেং তখন লিন-চি-র মতো অবিকল চিৎকার করে উঠলেন ‘কাৎজ’

লিন-চি— এমন অন্ধ গাধা থাকতে কে বলে আমার ধর্মদৃষ্টি অক্ষুণ্ণ থাকবে না ?

এই কথোপকথনের শেষে উপবিষ্ট অবস্থাতে লিন-চি বিদায় নেন। আর তাঁর ধর্মদৃষ্টি প্রচারের দায় স্বেচ্ছায় মাথায় তুলে নেন তার অনুগত ‘অন্ধ গাধা’-র দল।

   লিন-চি জন্মেছেন উত্তর চিনে। তাঁর আমৃত্যু বিচরণের ভূমিও উত্তর চিন। আন লু শান বিদ্রোহ ( ৭৫৫-৭৬২খ্রিঃ) থেকে শুরু করে তাং আমলের শেষ পর্যন্ত উত্তর চিন বারবার অরাজকতার শিকার হয়েছে। সামাজিক মাৎস্যন্যায় তো ছিল, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বহিরাগত বর্বরদের হামলা। এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠার ফলে লিন-চি সহজ-স্বাভাবিক আচরণের পরিবর্তে এক রূঢ় অথচ অকৈতব আচরণ আত্মস্থ করেছিলেন। অকস্মাৎ বজ্রকণ্ঠে চিৎকার অথবা মুষ্ট্যাঘাতের মাধ্যমে আবেগের বহিঃপ্রকাশ ইত্যাদি আসলে প্রচলিত দানবিক সমাজব্যবস্থাকে প্রতিহত করতে না-পারার প্রতিক্রিয়া ছাড়া অন্য কিছু নয়। লিন-চি মানেই বিতর্কিত আচরণ ও মন্তব্যের এক অলোকসামান্য আধার। একদা তিনি বোধিধর্মের স্তূপ পরিদর্শন করতে গিয়ে তত্ত্বাবধায়কের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন।              

তত্ত্বাবধায়ক— আপনি প্রথমে কাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন, বুদ্ধকে না বোধিধর্মকে ?

লিন-চি— আমি দুজনের কাউকেই শ্রদ্ধা নিবেদন করব না।

তত্ত্বাবধায়ক— বুদ্ধদেবকে বা বোধিধর্মকে আপনি শ্রদ্ধেয় মনে করেন না ?

লিন-চি আর কথা না-বাড়িয়ে হাত নাড়তে নাড়তে সেখান থেকে অন্তর্হিত হন।

এই হল দেখনদারি সংস্কৃতির এক মারাত্মক বৈশিষ্ট্য। মহাপুরুষের মূর্তির সামনে মাথা ঝোঁকাও, শ্রদ্ধা প্রদর্শন করো ব্যাস তুমি উতরে গেলে। তুমি জীবনে উক্ত মহাপুরুষের দেখানো পথে এক পাও হাঁটলে না। বরং জীবনযাপনে তুমি বিপরীত পথটাকেই আঁকড়ে ধরলে। তবুও তুমি যেহেতু সেই মহাপুরুষের মূর্তির সামনে নতজানু হলে তোমার সাতখুন মাফ হয়ে গেল। আর তুমি যদি সেই মহাপুরুষের আদর্শকে বাস্তবায়নের পথে হাঁটো তাহলে তুমি হয়ে গেলে গণশত্রু। আসলে এ হল মহাপুরুষদের মেরে ফেলার এক অদ্ভুত চক্রান্ত। লিন-চি এই চক্রান্তের অন্ত দেখতে চেয়েছিলেন। তিনি হাঁটছিলেন বুদ্ধ-বোধিধর্মের পথে তাই তাঁদের প্রতি বাহ্যিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন ছিল তাঁর কাছে অর্থহীন। লিন-চি মঠের পাশ দিয়ে তীর্থযাত্রীরা যেতেন উ-তাই পর্বতে বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রী-র মন্দির দর্শনে। লিন-চি এ বিষয়ে তাঁর শিষ্যদের বলতেন— একধরণের শিক্ষার্থী আছে, যারা বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রীকে খুঁজতে উ-তাই পর্বতে ছোটে। তাদের চিন্তার গোড়াতেই গলদ থেকে গেছে। উ-তাই পর্বতে আদৌ মঞ্জুশ্রী নেই। তোমরা কি মঞ্জুশ্রীকে জানতে চাও ? তোমাদের চোখের সামনেই আছে মঞ্জুশ্রী। এটা আসলে আর কিছুই নয়, তুমি যেখানেই যাও না কেন সবকিছুকেই সন্দেহ করবে, তাহলেই তোমাদের মধ্যে মঞ্জুশ্রী জীবিত হয়ে উঠবেন।  

     লিন-চি তাঁর শিষ্যদের বোধিপ্রাপ্তির জন্য আকস্মিক চিৎকার ও মুষ্ট্যাঘাতকে ব্যবহার করতেন। আসলে এই চরম পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে তিনি তাদের ভিতরে জেঁকে বসা পরম্পরিত স্থবিরত্বকে উৎখাত করতে চাইতেন। এই কাজে তিনি অভূতপূর্ব সাফল্যও পেয়েছিলেন। লিন-চি-র শিক্ষার অন্য এক উল্লেখযোগ্য দিক হল, রক্তমাংসের মানুষের ভিতরে লুকিয়ে থাকা জাত-গোত্র ও   পদমর্যাদা বা উপাধিবিহীন এক আসল মানুষকে খুঁজে বের করা। তিনি এই মানুষকে সত্য মানুষ  বা  প্রকৃত মানুষ নামাঙ্কিত করেছেন। তাঁর মতে প্রত্যেক মানুষের ভিতরেই আছে এমন একজন সত্য মানুষ যাকে খুঁজে বের করতে পারলেই সিদ্ধিগঞ্জের মোকামে পৌঁছানো যাবে। লিন-চি-র তিরোধানের পর মূলত নান-উয়া হুই ইয়ুং (মৃত্যু ৯৩০ খ্রিঃ), ফেং শুয়ে ইয়েন চাও (৮৯৬-৯৭৩ খ্রিঃ), শো শান শেং নিয়েন (৯২৬-৯৯৩ খ্রিঃ), ফেং ইয়াং শেন  চাও (৯৪৭-১০২৪ খ্রিঃ) প্রমুখের নিরলস প্রচেষ্টায় লিন-চি-র শিক্ষা সমগ্রে উত্তর চিনে বিস্তৃতি পায়। দক্ষিণ চিনে লিন-চি-র শিক্ষাকে প্রচারের আলোয় নিয়ে যান শি-শং চুয়ি (৯৪৭-১০৩৯ খ্রিঃ)। তিনি লিন-চি ধারাকে অপ্রতিহত করে তোলেন। অন্যান্য চ্যানধারাগুলি ক্রমশ এই ধারার অঙ্গীভূত হয়ে পড়ে। সং আমলে (৯৬০-১২৭৯ খ্রিঃ) লিন-চি ধারা এক পৃথক সম্প্রদায়ের রূপ পায়। এই সম্প্রদায়ের উদ্যোগে গুরু-শিষ্যের হেয়ালিপূর্ণ গূঢ় কথোপকথন তথা “কোয়ান” সংগ্রহ শুরু হয়। ১০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে লিন-চি সম্প্রদায় ইয়াং চি ও হুয়া লুং এই দুই শাখায় ভাগ হয়ে যায়। জাপানে লিন-চি সম্প্রদায় প্রবিষ্ট হয়  দ্বাদশ শতাব্দীতে। তখন জাপানে চলছে কামাকুরা যুগ। জাপানি উচ্চারণে লিন-চি হয়ে যায়  রিনজাই। এখনও পর্যন্ত সে দেশে এই সম্প্রদায় বহালতবিয়তে টিকে আছে।                             

 

তথ্যসূত্র :

1.THE ZEN TEACHING OF MASTER LIN-CHI ; A TRANSLATION OF THE LIN-CHI LU BY BURTON WATSON, SHAMBHALA PUBLICATION 1993.

2. THE RECORD OF LINJI; TRANSLATION AND COMMENTARY BY RUTH FULLER SASKI, UNIVERSITY OF HAWAII PRESS 2009.

3. DHANA BUDDHISM IN CHINA: ITS HISTORY AND TEACHING BY CHOU HSIANG-KUANG, INDO-CHINESE LITERATURE PUBLICATION INDIA, 1960.

4. ZEN BUDDHISM : A HISTORY INDIA AND CHINA BY HEINRICH DUMOULIN TRANSLATED BY J.W. HEISIG AND PAUL KNITTER ; MACMILAN PUBLISHERS 2003.

                                               ( ক্রমশ)

ছবি : বিধান দেব 

 

  

 

         


 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা

সম্পাদকের কথা

দ্বিতীয় বর্ষ  ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২   খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...