বুধবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১
সম্পাদকের কথা
আমাদের যাবতীয় অসহায়তার মধ্যে আবারও শারদীয় উৎসব এসে গেল। যাকে কেন্দ্র করে এই উৎসব সেই দেবী দুর্গা আমাদের মধ্যে সাহসিকতা ও আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেন। অশুভ শক্তি আপাত দৃষ্টিতে ভয়ঙ্কর হলেও তা কিন্তু সত্য, শিব ও সুন্দরকে ভয় পায়। মানব সভ্যতার কোনও এক ক্ষণে এই চেতনার দ্বারা ঋদ্ধ হয়েছিলেন আমাদের পূর্বজরা। প্রকৃতিতে ভালো-মন্দ, সৎ-অসৎ সব মিলেমিশে থাকে। আলোর অভাব-ই অন্ধকার, সৎ-এর অভাব-ই অসৎ এটুকু বুঝতে হবে। বিভেদ কোনও কিছুতেই দেখি না। প্রতি- প্রত্যেকের মধ্যে মিলনের আকুতিই দেখি। অবস্থানগত সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেই আমাদের উন্নত হতে হয়। আবার অবস্থানে অটুট থেকে উন্নতিকে সেখানে আহ্বান করলে সভ্যতা পেছনে হাঁটে। আমাদের বেশিরভাগ উৎসব-ই ধর্মকেন্দ্রিক। আমাদের সৃজনসত্তাও মূলতঃ ধর্মাশ্রয়ী। মানব সংস্কৃতির এই জীবনবৃদ্ধিগত কৌশল আমরা পূর্বজদের কাছ থেকে পেয়েছি। তাই এই উৎসবে আমরা আমাদের সেরাটা দিতে চাই। চেষ্টা করি। আর করি বলেই কিছুটা এগোই। সাহিত্যের বেলাভূমির সমস্ত লেখক-পাঠক-শুভানুধ্যায়ীদের উৎসবের আগাম শুভেচ্ছা জানাই। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা সবাই হয়তো সেভাবে ভালো নেই। কিন্তু পরিস্থিতিকে স্বীকার করে বেঁচে থাকাটাই এখন আমাদের কাছে ধর্ম। প্রতিবেশীদের সুখ-দুঃখের সামান্যতম অংশভাগী হলেও তা আমাদের অন্তরকে শুদ্ধ করবে। ভালো সাহিত্য পাঠ, ভালো গান শোনা, ভালো পোশাক পরা বা খাওয়া-দাওয়ার সঙ্গে প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনও এই উৎসবের অঙ্গ হয়ে উঠুক। মানুষ আমাদের সম্পদ। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও আত্মগরিমাকে অধিক প্রাধান্য দিতে গিয়ে নিজের প্রতিচ্ছায়াকে যেন ভুলে না যাই।
সমস্ত শরীর জড়িয়ে একটি মানসিক সৌরভ ।। দীপক হালদার
কবি সুব্রত চক্রবর্তী ।। অনিমেষ মণ্ডল
স্তব্ধ বাড়ি, জবাগাছ ,ঘুমন্ত কবর:কবি সুব্রত চক্রবর্তীর কবিতা
ঘরে ঢোকার ঠিক আগে,সহসা মনে হয়েছে, এমন ভঙ্গিতে
পর্দার আড়ালে তুমি সরে গেলে;
সামান্য আনতমুখে দ্রুতহাতে মুছে নিলে ঠোঁট।
বাজে ঝরনা, চীনাংশুক ওড়ে ।
চৈত্রের জ্বলন্ত রাত্রি একা বাড়ে, একা পুড়ে যায়।
ঘুমন্ত চোখের পাশে জাগে স্বপ্ন, প্রহরিণী, দেখো মধ্যযাম!
নিভন্ত চুল্লির বুকে ধিকিধিকি আমার হৃদয়
দহন সহিছে একা, চৈত্রের জ্বলন্ত রাত একা পোড়ে।
ঘরে ঢোকার ঠিক আগে তোমার নিবিড় ছায়া
পর্দার আড়ালে ডুবে যায়--
দ্রুত হাতে মুছে নিলে ঠোঁট
হঠাৎ মনে হয়েছে এমনই ভঙ্গিতে
ঈষৎ রাতুল মুখে ।সে কি স্বপ্ন!
সদাভ্রাম্যমাণ
চৈত্রের বাঘিনী রাত,অন্ধকারে কোন ঝরনা বাজে!
(রোগশয্যায়, বিবিজান ও অন্যান্য কবিতা)
'যা কিছু অভিনব নয় তা কবিতাও নয়' ....কবিতা সম্পর্কে ঠিক এরকমই ভাবনা ছিল কবি সুব্রত চক্রবর্তীর।তিনি বিশ্বাস করতেন কবিতা হলো কিছু পাচার করা সত্য খবর এবং তা মানুষের জন্যই।কবিতার প্রতি এক অসম্ভব আত্মিক ভালোবাসা ছিল পেশায় পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক এই কবির।তাঁর বাড়ি ভর্তি হয়ে ছিল বাংলা সাহিত্যের অসংখ্য গ্রন্থরাজিতে।এক নিষ্ঠাবান পড়ুয়া ছিলেন তিনি।ফলত যা বলতেন তা খুব গভীর থেকে বলতে পারতেন।কারণ তাঁর কবিতার পরিধি জুড়ে ছিল এক গভীর অনুভূতিময়তার প্রকাশ ।
কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর কথায় তাঁর "কবিতার ভাষা, যাকে সে অনবরত আক্রমণ আক্রমণ আর আক্রমণ করতে শিখছিল তার উৎস ছিল তো সুব্রতর অবিশ্বাস্য কবিতাপ্রীতিই,আর তার দেশ কাল আর মানুষজন সম্পর্কে এক মতলবহীন অনুভূতিময় সচেতনতা ।"
সমুদ্রের ওপারে প্রবাস, আমি তার লবণাক্ত বুকে।
জলস্রোত, জেলেডিঙি, পূর্বদিকে ব্যাপক আঁধার---
ঝাউবন, সাইরেন, বালি,
ম্লান জোনাকির ছিন্নমালা ।
বাতাসে শাঁখের শব্দ, আর ঐ শব্দের আড়ালে
অপঘাত ,মৃত্যুদণ্ড, আজীবন নত মস্তকের
কুর্নিশ, পিপাসা, ভয়--নীল কোন পূর্ণিমা--রজনী ।
ব্রেকারের দৃপ্তশীর্ষে উজ্জ্বল মাছের চোখ, কুহকের দেশ;
আর নীচে-আঁধার জলের গর্ভে মৃত পশুপালকের গান--
দূর ও নিকটে কোনো ব্যাবধান নেই।
যে-কোনো দিকেই আমি চলে যেতে পারি,চলে যাব
তুমি ডেকো।প্রিয়তম, তোমার ইঙ্গিতে
যে-কোনো প্রবাস যেন বসবাসযোগ্য বলে মনে হবে।আমি
যে-কোনো দিগন্তে ঠিক চলে যাব,তোমার নিশান
দূর কোনো প্রান্তে যদি ঝলসে ওঠে ভোরের আলোয়।
(দীঘায় বহুদূরে কন্যাকুমারিকায়)
বর্ধমানের বাঁকা নদীর উপর এক নড়বড়ে কাঠের সাঁকোর পাশে তাঁর বাড়ি।সেই সাঁকো হয়ত এখন আর নেই ।কিন্তু সেই সাঁকোর উপর দাঁড়িয়ে তিনি বহুবার প্রত্যক্ষ করেছেন নীচে বহমান ঘোলা জল আর মাথার উপর ক্রমঘনায়মান অন্ধকারের বুক চিরে চিরজাগ্রত নক্ষত্রের অতন্দ্র লীলা।কবিতা নিয়ে, ব্যাক্তিজীবন নিয়ে, এই বহমান পৃথিবী নিয়ে কত কথা তিনি বলে যেতেন অবলীলায় তা প্রত্যক্ষদর্শীরা সকলেই জানেন।তরুণ কবিদের উৎসাহ দেওয়া ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম এক ব্রত।যেকোনো ছোট পত্রিকা খুব যত্ন করে পড়তেন ।আর ছিলেন সংসার জীবনের প্রতি ভীষণ দায়িত্ববান।তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ তথা জীবদ্দশায় প্রকাশিত শেষ কাব্যগ্রন্থে কবির ঘর গেরস্থালি'র প্রায় প্রতিটি বিষয়ই উঠে আসে কবিতার ছত্রে ছত্রে যা তাঁর রক্ত থেকে উঠে আসা নিজস্ব যাপনের তন্নিষ্ঠ চিত্রমালা।
ঐ দেখো কবির বাড়ি--কবি তো সন্ন্যাসী নয়,
ওর ঘর-গেরস্থালি আছে ।
আছে ন্যুব্জ বাবা তার;বারান্দার সামান্য রোদ্দুরে
ওই দেখো উনি বসে,
চোখে ঘুম,
হাত -থেকে- খসে-পড়া গুড়গুড়ির নলে লাল-পিঁপড়ে ঘুরে যায়,বারান্দায় ঐ তো রোদ্দুরে
শালিখ পাখিরা আসে,
তাই দেখে তালি দেয় ,হাসে
কবির প্রথম মেয়ে
কাল রাত্রে পরী দেখেছিল।
(কবির ঘর গেরস্থালি,বালক জানে না)
সুব্রত চক্রবর্তী সেই কবি যিনি সন্ন্যাসী নন।ঘর গৃহস্থালি করেন পরিপাটি করে।সাংসারিক কাজে তাঁর কোনও আলস্য নেই।থরে থরে সাজানো অজস্র বই।অথচ একটিও এলোমেলো নয়।পড়ার ঘর সুন্দর ভাবে গোছানো। স্ত্রী মালা চক্রবর্তী, এক কন্যা রুমনি ও এক পুত্র রুদ্রকে নিয়ে তাঁর সাজানো সংসার।
বৃষ্টির ভেতরে ওই ধবল পোশাক পরে বালিকার ছুটে যাওয়া
আমাকে এমন
নিঃসঙ্গ করেছে।...চেয়ে দেখি তুমুল বৃষ্টিতে
স্তব্ধ বাড়ি, জবাগাছ,ঘুমন্ত কবর---
অনন্ত বৃষ্টিতে ভেজে দিগ্ বলয়,লাল পথ,প্রসারিত হাত;
একটি মহিষ ভেজে, সমাধিফলক ভেজে।...আর ওই বৃষ্টির ভেতরে
চকিত পাখির মতো--দূর থেকে আরো দূরে--
উড়ে যায় শৈশবের ধবল পোশাক ।
(বালিকা)
একদিন সত্যি সত্যিই তাঁর বাড়ি তুমুল বৃষ্টিতে ভেজা স্তব্ধ জবাগাছের মতো ঘুমন্ত কবর হয়ে গেল।সব কিছু এলোমেলো করে 1980 সালের 10ই জানুয়ারি মাত্র ঊনচল্লিশ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে চলে গেলেন কবি সুব্রত চক্রবর্তী তাঁর সাজানো গৃহস্থালি ফেলে।
কবি অরণি বসু স্মৃতিচারণা করেছেন---
"কথা বন্ধ করে আমরা অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়েছিলাম।অন্ধকার ঘন হয়ে এলে আমরা রওনা হয়েছিলাম বাড়ির পথে।ফেরার সময় সুব্রতদা খুব শান্ত গলায় আবৃত্তি করেছিলেন তাঁর প্রিয় কবিদের কবিতা।তুচ্ছ মানুষ আমরা, বুঝতেও পারিনি সেই আমাদের শেষ সাক্ষাৎকার।সময় 1979 সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর,....."
বিকেলবেলার দুঃখী আলো এসে আমাকে বলেছে, দেখা হবে ।
নৈশ রাজপথে এক আধপাগলা যুবতী ভিখিরি
অকারণে হাত নেড়েছিল।
একটি হলুদ পাখি, একদিন আমাদের মৃত জবা গাছে
বসেছিল কিছুক্ষণ--তারপর উড়ে গিয়েছিল ...
একটি পালক শুধু ঝরে পড়েছিল তার।কেন আমি কুড়িয়ে রাখিনি।
বিকেলের আলো আজ দুঃখহীন, মায়াহীন, উদ্ভাবনহীন.
নৈশ রাজপথে এক চাঁদভোলা কুকুর শুধু অকারণে কেঁদে কেঁদে ওঠে;
আজ কোনো পাখি নেই---একটি পালক শুধু মৃত জবা গাছে
বারবার কাঁপে---কেন আজো তাকে ভুলতে পারিনি!
(একটি পালক শুধু, নীল অপেরা)
39 বছরের স্বল্প জীবনে তাঁর মোট কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা মাত্র তিনটি।নীল অপেরা তাঁর মৃত্যুর পর 1990 সালে কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় উলুখড় থেকে।কবি ভাস্কর চক্রবর্তী বলেছেন---
" আজ এই জলরাশি ভেদ করে 'নীল অপেরা'য় --আমরা হয়ত দেখতে পাব সুব্রতর কবিতার এক নতুনতর আভাস, হয়ত শুনতে পাব নতুন এক সুর যা ফিসফিসিয়ে আমরাও বলতে চাই : মানুষই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে,আর সেখান থেকেই হয়ত ভোরবেলার শুরু।"
আজ তাঁর কবিতাগুচ্ছ আবার নতুন প্রজন্মের হাতে উঠে আসছে এতে প্রমাণিত হয় যে কবি সুব্রত চক্রবর্তীর কবিতা কালোত্তীর্ণ হয়েছে।তাঁর মৃত্যুর এত বছর পরেও তাঁর কবিতা পুনর্মুদ্রিত হচ্ছে বাংলা কবিতার পক্ষে এ বড় আশার কথা।এই চল্লিশ বছরে পৃথিবী অনেক বদলে গেলেও পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেওয়া এক প্রায় অখ্যাত কবির কবিতা ফিরে দেখার এই প্রচেষ্টা আমাদের ভীষণ রকম উদ্বেল করে।এভাবেই বাংলা কবিতার জয় হোক একদিন।
জন্ম 10ই অক্টোবর 1941 ,আসামের তেজপুরে।যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় এম এস সি।কর্মজীবন শুরু মহিষাদল রাজ কলেজে।তারপর কলকাতা সাউথ পয়েন্ট স্কুল হয়ে রামপুরহাট কলেজ ও সবশেষে 1966 সাল থেকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বর্ধমান রাজ কলেজে অধ্যাপনা।1967 সালে বিবাহ শ্রীহট্টের মালা বিশ্বাসের সঙ্গে।দুই সন্তান, কন্যা সাবর্ণি ও পুত্র রুদ্র।
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ বিবিজান ও অন্যান্য কবিতা (1969,সখী সংবাদ প্রকাশনী)
বালক জানে না (1976,আনন্দ পাবলিশার্স)
নীল অপেরা (1990,উলুখড় প্রকাশনী)
প্রিয় পঁচিশ (2013,শব্দ হরিণ)।
পত্র পত্রিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রবন্ধগুলি নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশের পথে।
এছাড়াও লিখেছেন অনেক ছোটগল্প,বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ, কল্পবিজ্ঞানের গল্প,বেতার নাটক ও একটি উপন্যাস যার নাম 'রুদ্রর দুপুর'।
কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর কথায়...
" সুব্রত যখন প্রধানত প্রথাবাহিত ভাষাকে সরিয়ে, মৃত্যুকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলছিল, তখনই নেমে এল এমনই এক স্তব্ধতা, যে স্তব্ধতার শব্দ আমাদের কাছে এখনও কর্কশ আর সত্যিই অসহনীয়।"
কবি অরণি বসুও বলেছেন ....
"আজ এতদিন পরেও তাঁর মৃত্যু কেন জানি না আমার কাছে মিথ্যে মনে হয়।এখনও তাঁর কথা বলার ভঙ্গি, হাঁটার ছাঁদ, কৃষ্ণকায় হাসি, গভীর দৃষ্টিপাত স্পষ্ট মনে পড়ে।এমনও হয়েছে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে পেছন থেকে কাউকে সুব্রতদা ভেবে এগিয়ে গিয়ে ভুল ভেঙেছে।মনে হয় সুব্রতদা প্রবাসে আছেন,একদিন ফিরে এসে জড়িয়ে ধরবেন।"
আলো ও রঙের মনোভূমি ।। দেবাশিস দাশ
আলো ও রঙের মনোভূমি
১. বিজ্ঞানের আলো, আলোর বিজ্ঞান
যা কিছু আমরা দেখি, যা কিছু দেখি না, সমস্ত জুড়ে আলোর খেলা। শক্তির অভাবনীয় প্রকাশ এই আলো। কোয়ান্টাম বিজ্ঞানী জানেন, মানুষের মতোই আলোও আসলে দ্বিচারী। যা চোখে দেখছি, তা-ই বাস্তব নয়। অন্য এক জগৎ আছে, যা আমাদের ভাল-লাগা, আমাদের আকাঙ্ক্ষা-পূরণের স্বপ্নময়তা দিয়ে তৈরি। এক ঔপনিষদিক কোয়ান্টাম বিশ্ব। সমান্তরাল মায়া-ব্রহ্মাণ্ড।
আলোর কথায় ফিরে আসা যাক। ব্রহ্মাণ্ডের সফ্টওয়্যার-গেম আলোর গতির সীমা দিয়েই বাঁধা রয়েছে। এর চেয়ে জোরে ছুটতে পারলেই টাইম-মেশিন আবিষ্কৃত হবে। কিন্তু সে আরেক আজব তত্ত্ব। বিজ্ঞানী বলেন, মানুষের মন যেরকম, আলোও অনেকটা তেমনই। বড্ড শেয়ানা সে। তার চরিত্রের ঠিক নেই। কখনও সে ঢেউ, কখনও আবার থোকা-থোকা সূক্ষ্মতম (অথচ ভরবিশিষ্ট) বস্তুকণা। ঢেউও কি সহজ-সরল? আসলে সেও দু'দুটো শক্তির প্রবাহ— পরস্পর ৯০° কোণে একটাই অক্ষের দড়ি বেয়ে একসঙ্গে ছুটে চলা তড়িৎ আর চুম্বকের তরঙ্গ মিলেমিশে গড়ে তুলেছে আলোর সেই ঢেউ-সত্তা। সে যখন কোনও জিনিসের ওপর আছড়ে পড়ে, তখন প্রতিফলিত হতে পারলে জিনিসটার আকৃতি বুঝে প্রতিবিম্ব গড়ে তোলে আমাদের চোখের লেন্সে। এই বিম্বিত রশ্মির প্রভাবে রেটিনা-লাগোয়া স্নায়ুদের প্রান্তগুলো উত্তেজিত হয়। উত্তেজনার স্পন্দন তড়িদ্বেগে মস্তিষ্কে দৌড়ে গিয়ে দেখার বোধ তৈরি করে আমাদের চেতনায়।
আলো নিজে অদৃশ্য থাকে; সত্যিকারের কবিতার মতো, নিরাময়দায়ী। আমাদের চোখে ধরা পড়ে কেবল আলোকিত বস্তু, যার ওপর আপতিত আলোকরশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিস্তার দর্শকের দৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ। অবলোহিত অতল অন্ধকারের গভীরে থাকা আলো তাই আমরা দেখতে বা বুঝতে পারি না। ভৌতিক গল্পে ভূতেদের অস্তিত্ব অবলোহিত-টর্চে ধর্তব্য হতে পারে, ঠিক যেমনটা সমুদ্রগর্ভেও পারে; কিংবা নাইট-ভিশন বাইনোকুলারে। অন্যদিকে আমরা কিন্তু অতিবেগুনি ও তার ওপারে থাকা বিভিন্ন রশ্মিজালকেও টের পেতে পারি না। দৃশ্যবর্ণালি ছাপিয়ে, একদিকে তেজস্ক্রিয় অদেখা বিভাবিশ্ব, অন্যদিকে বেতার শ্রুতির কিনারা পর্যন্ত কাঁপতে থাকে অধরা জগৎ। আমরা মূর্খের মতো, সবজান্তার মতো, কিছু না দেখেও, সর্বজ্ঞানে প্রচারিত হতে চাই!
২. শুশ্রূষার জন্য চাই রং
রঙের ধারণা বলা যায় অনেকটাই ব্যক্তিগত। ভাল লাগা, না-লাগা দিয়ে গঠিত চিন্তা ও অনুভূতির রং। তবু, সর্বজনীন কিছু বোধ, কিছু আবেগ বের করা গিয়েছে বই-কী। লাল, কমলা ও হলুদ এক-রকম গরম অনুভূতি জোগান দেয়, যা তেজ, রাগারাগি অথবা বিদ্বেষের চেতাবনি হতে পারে। অন্যদিকে, নীল, বেগুনি ও সবুজ হল শীতল রং। শান্ত প্রকৃতির দরুন মনে বিষাদ অথবা ঔদাস্যের ধারণা জাগাতে পারে এরা। মনোবিদ্যার জন্য প্রাচীনকাল থেকে মানুষ তাই বর্ণ-চিকিৎসার বিভিন্ন আয়োজন করে এসেছে। মিশর, চিন ইত্যাদি দেশের পুরনো সংস্কৃতিতে নিজস্ব বর্ণ-চিকিৎসার পদ্ধতি দেখা যেত। হয়তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রংয়ের প্রভাব আর ক্ষমতাকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল। আসলে মনোভাব বা আবেগের ওপর রংয়ের কাজ অস্থায়ী এবং অনেকটাই পরিবেশ-নির্ভর। যেমন, আকাশি নীল রঙের ঘরে চুপচাপ বসে থাকতে-থাকতে শান্ত ভাব আসে, খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও। তার পর, জেদি মানুষের বিক্ষিপ্ত বহুগামী মন সেই প্রশান্তিটুকুকে নিজের অভ্যাসেই হয়তো-বা অস্বীকার শুরু করে। পরিপাটি সাদা বেডকভার-ঢাকা বিছানায় বসে কবিতা লেখার আরামই আলাদা। জ্ঞানে বোঝাই পৃথিবী থেকে নিমেষে কখন একলা পরম শান্তির দেশে পৌঁছে যাওয়া যায়! পাগল স্রষ্টার জন্য সাদা রং তাই নার্সিংহোমের বেডকভার।
বিভিন্ন রঙের প্রকৃতি, তাদের (চিকিৎসার কাজে) ব্যবহারযোগ্যতা আর ক্ষতিকর দিকগুলো টেবিলভুক্ত করে তালিকায় সাজিয়ে ধরা যায়। এখানে লেখাকে অযথা ভারী করে তুলতে চাই না। কোনও পাঠকের সত্যিই যদি আগ্রহ জাগে, তবে কোভিড-উত্তীর্ণ দিনে সহৃদয় আমন্ত্রণ থাকল আমার নিজস্ব বর্ণালি দিয়ে গড়া ছোটখাটো কবিতা-কুটিরে। ভালবাসার রং, রস ও বিজ্ঞানের তথ্য ভাগ করে নিতে পারব হয়তো। আপাতত দু'একটা রঙিন নমুনা পেশ করা যাক। ঘন নীল বর্ণাভা'র প্রকৃতি বেশ ঠান্ডা। আকাশি নীলের মতো অতখানা কর্মদক্ষ করে তোলার ক্ষমতা কিম্বা প্রশমনবিদ্যা শ্রাবণঘন নীলের আয়ত্তে নেই বটে, কিন্তু এই রং চামড়ার রোগের সমস্যা বেশ কম রাখতে পারে। তবে, শীতল-শান্ত স্বভাবের সামান্য ক্ষতিকর দিকও তো আছে। নাড়ির বেগ, দেহের উষ্ণতা কমিয়ে মনে বিষাদবোধ জাগাতে পারে। তাই, ওষুধ হিসেবে রংকেও মাপ-মতো গ্রহণ করা জরুরি মনে হয়। অন্য আরেকটি রং হল গোলাপি। শান্ত। প্রেম ও রোমান্সের প্রতীক। জেলখানার কক্ষের দেয়ালে ড্রাংক পিঙ্ক রং ব্যবহার করা হয় কারাবন্দীদের মনকে শান্ত, নির্জীব রাখার জন্য। তবে ক্ষতির ব্যাপারটা হল প্রথম দিকে স্থির ও শান্ত করতে পারলেও খুব বেশিক্ষণ এই রঙের পাল্লায় পড়লে অতিরিক্ত এক উত্তেজনা আসবে— এক নরম মাতাল হাওয়া। আসলে রং হলেও তার মধ্যেও দোষ আর গুণ দুইই রয়েছে কি-না!
এ-বারের মতো এখানেই ক্ষান্ত হলাম। পরে কোনওদিন সুযোগ বুঝে, সুরের সঙ্গে রঙের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করব। স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ শক্তির বিচ্ছুরণজনিত কম্পনের কথা কিছুটা লিখেছেন তাঁর 'রাগ ও রূপ' বইটিতে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাংগীতিক সাত স্বরের বর্ণাভাও উল্লেখ করা হয় তুলনামূলক সারণির মাধ্যমে। সে এক অন্য গহন চিকিৎসা-পদ্ধতি, যা সুর আর রঙের যৌথ শুশ্রূষাধর্মের প্রতি আস্থা বাড়ায়।
ছবি : বিধান দেব
ভারতবর্ষে সমাজতন্ত্র : শতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি ।। অভিজিৎ দাশগুপ্ত
ভারতবর্ষে সমাজতন্ত্র : শতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি
ভিনদেশি তারা ।। অরিন্দম রায়
উইসলাওয়া সিম্বোর্স্কা : নোবেল বক্তৃতা, ৭ ডিসেম্বর, ১৯৯৬
বলা হয় যে যেকোনো বক্তৃতায় প্রথম বাক্যটিই সবচেয়ে কঠিন। তাহলে, ঐ বাক্যটি যেভাবেই হোক না কেন আমার পিছু নিয়েছে। কিন্তু আমার এটা মনে হচ্ছে যে আরও বাক্য আসতে চলেছে যেগুলো আমার পিছু নেবে___ তৃতীয়, ষষ্ঠ, দশম , এভাবে চলতেই থাকবে, শেষ লাইন পর্যন্ত ___ সেটিও একইরকমের কঠিন হবে, যেহেতু আমাকে কবিতা নিয়ে কথা বলতে হবে। এই বিষয়ে আমি খুব কমই বলেছি, বলা যেতে পারে কিছুই বলিনি। আর যখনই কিছু বলেছি, আমার সবসময় সন্দেহ হয়েছে যে আমি এই ব্যাপারে মোটেই ভালো নই। এই কারণেই আমার বক্তৃতাটি সংক্ষিপ্ত হতে চলেছে। সমস্ত ত্রুটিই সহ্য করা সহজ হয় যদি সেটা কম পরিমাণে পরিবেশন করা যায়।
সমকালীন কবিরা সন্দিহান এবং সন্দেহপ্রবণ , সম্ভবত নিজেদের সম্পর্কে। তাঁরা জনসমক্ষে নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে স্বীকার করে থাকেন যে তাঁরা কবি, মনে হয় যেন তাঁরা এই ব্যাপারটি নিয়ে বেশ লজ্জিত। কিন্তু আমাদের এই কোলাহলপূর্ণ সময়ে নিজের যোগ্যতা উপলব্ধি করার চেয়ে নিজের ভুল স্বীকার করে নেওয়া বেশ সহজ ব্যাপার, অন্তত যদি সেগুলো আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা যায়, যেহেতু এগুলো অনেক গভীরে লুকোনো থাকে আর আপনি নিজে কখনই এগুলো বিশ্বাস করেননি… প্রশ্নাবলীর উত্তর দেওয়ার সময় অথবা অচেনা ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলার সময় , যখন তারা নিজেদের পেশা কী সেটা না বলে এড়িয়ে যেতে পারেন না, কবিরা ‘লেখক’ এই সাধারণ নামটিই পছন্দ করেন অথবা ‘কবি’ এই পরিচয় দেওয়ার বদলে লেখালেখি ছাড়াও অন্য যে পেশার সঙ্গে তিনি যুক্ত সেই পরিচয় দিয়ে থাকেন। আমলারা এবং বাস প্যাসেঞ্জাররা কিছুটা অবিশ্বাস ও শঙ্কিত হয়ে সাড়া দেন যখন তারা জানতে পারেন যে তারা একজন কবির সঙ্গে কথা বলছেন। আমার অনুমান দার্শনিকরাও একইরকম প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হন। তবুও , তাদের অবস্থা অনেক ভালো, যেহেতু তাঁরা পাণ্ডিত্যসুলভ কোনো উপাধি দিয়ে নিজেদের পেশাগত পরিচিতিকে অলঙ্কৃত করতে পারেন। দর্শনের অধ্যাপক , ___ এটা অনেক বেশি সম্মানজনক শুনতে লাগে।
কিন্তু কবিতার অধ্যাপক বলে কিছু হয় না। সর্বোপরি, এর মানে দাঁড়ায়, যে কবিতা এমন একটা পেশা যার জন্য বিশেষ পড়াশোনা, নিয়মিত পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা, গ্রন্থপঞ্জী এবং পাদটীকাযুক্ত তাত্ত্বিক প্রবন্ধ , এবং সবশেষে, সাড়ম্বরে ডিপ্লোমা প্রদানের বন্দোবস্ত থাকা উচিত। পরিবর্তে, এটাও মানে দাঁড়ায় যে, কবি হওয়ার জন্য পাতা ভর্তি সূক্ষ্ম কবিতা লেখাও যথেষ্ট নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল অফিশিয়াল স্ট্যাম্প মারা একটা কাগজের টুকরো। একবার মনে করে দেখুন যে রাশিয়ান কবিতার গর্ব, ভবিষ্যতের নোবেল লরিয়েট জোসেফ ব্রডস্কিকে ঠিক এই যুক্তিতে স্বদেশে নির্বাসনের সাজা দেওয়া হয়েছিল। তারা ব্রডস্কিকে ‘‘একটা পরজীবী’’, বলে অভিহিত করেছিলেন কারণ তাঁর কাছে কোনো সরকারি সার্টিফিকেট ছিল না যেটা তাঁকে কবি হওয়ার অধিকার দেবে…
বেশ কয়েক বছর আগে , আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ব্রডস্কির সঙ্গে দেখা করার। আমি সম্মানিত বোধ করেছিলাম। আমি লক্ষ্য করেছিলাম যে, যতজন কবিকে আমি চিনি, তাঁদের মধ্যে তিনিই ছিলেন এমন একজন যিনি নিজেকে কবি বলাটা উপভোগ করতেন। তিনি এই শব্দটি কোনরকম সঙ্কোচ ছাড়াই উচ্চারণ করতেন।
বরং ঠিক এর বিপরীত ___ তিনি ‘কবি’ এই শব্দটিকে স্পর্ধিত স্বাধীনতার সঙ্গে উচ্চারণ করতেন। আমার মনে হয়েছে ব্রডস্কি এরকম করতেন কারণ যুবক বয়সে লাঞ্ছিত, অপমানিত হওয়ার কথা তাঁর মনে পড়ে যেত।
আরও সৌভাগ্যবান দেশে, যেখানে মানুষের মর্যাদার উপর চট করে আক্রমণ নেমে আসে না, কবিরা আকাঙ্ক্ষা করেন, অবশ্যই প্রকাশিত হওয়ার, পঠিত হওয়ার, এবং চান পাঠক যেন তাঁদের লেখাগুলি উপলব্ধি করেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের থেকে, প্রাত্যহিক সংঘর্ষের থেকে নিজেদের আলাদা করার জন্য তাঁরা খুব একটা কিছু করেন না। অথচ খুব বেশিদিন আগেও নয়, এই শতাব্দীর প্রথম দশকে, কবিরা তাঁদের অদ্ভুত পোশাক আর খামখেয়ালি আচরণের মাধ্যমে আমাদের ধাক্কা দিতে চাইতেন। কিন্তু এসবই ছিল নিছক জনগণকে দেখানোর জন্য। সেই মুহূর্ত সবসময় আসে যখন কবিকে দরজা বন্ধ করে দিতে হয়, খুলে ফেলতে হয় পরনের আঙরাখা, জবড়জং গয়নাগাটি, আর যত কাব্যিক সাজসজ্জা আর মুখোমুখি হতে হয় ___ নীরবে, ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করতে হয় নিজের মুখোমুখি হওয়ার __ স্থির সাদা পাতার জন্য। কারণ শেষ পর্যন্ত এটাই সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এটা কোনো আকস্মিক ব্যাপার নয় যে বিজ্ঞানী এবং শিল্পীদের জীবন নিয়ে প্রচুর পরিমাণে ছায়াছবি নির্মিত হয়। আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিচালকেরা বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে যে সৃজনশীল প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার ফলে একজন বিজ্ঞানী তাঁর গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি করেন বা একজন শিল্পী জন্ম দেন একটি মাস্টারপিসের সেই প্রক্রিয়াটিকে পুনর্গঠনের চেষ্টা করেন। পর্দায় যখন নানারকম যন্ত্রপাতি, গবেষণাগারের দৃশ্য, সেই বিজ্ঞানীর পরীক্ষা নিরীক্ষার মুহুর্তগুলি বিশদভাবে ফুটিয়ে তোলা হয় তখন তা স্বাভাবিকভাবেই দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করে। এবং সেইসব অনিশ্চয়তার মুহূর্তগুলি ___ হাজারবার ধরে করা পরীক্ষায় সামান্য পরিবর্তন করে পাওয়া যাবে কি সেই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল?__ নিঃসন্দেহে নাটকীয় মুহূর্তের জন্ম দেয়। চিত্রশিল্পীর জীবন নিয়ে সৃষ্ট চলচ্চিত্রগুলি খুবই আকর্ষণীয়, চিত্তাকর্ষক হতে পারে, কারণ সেখানে বিখ্যাত ছবিগুলির সৃষ্টির মুহূর্তগুলোকে, সেই ছবিগুলোর অভিযোজনের প্রক্রিয়াগুলো ধাপে ধাপে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করার সু্যোগ থাকে, পেনসিলের প্রথম রেখা টানা থেকে ব্রাশের শেষ স্ট্রোক অবধি। সুরকারদের নিয়ে তৈরি ছায়াছবিতে সুরই মুখ্য হয়ে ওঠে। তাঁর কানে প্রথম যে সুরের অনুরণন বেজে উঠেছিল সেখান থেকে সিম্ফনির মতো পরিণত কাজ অব্দি। অবশ্যই এই জাতীয় সিনেমাগুলি অতীব সরল হয়ে থাকে এবং সেই জটিল মানসিক অবস্থা যা সাধারণভাবে অনুপ্রেরণা নামেই পরিচিত তার ব্যাখা দিতে ব্যর্থ হয়, তবুও অন্ততপক্ষে কিছু একটা দেখার এবং শোনার মতো থাকে।
কিন্তু কবিরা হচ্ছে সবচেয়ে খারাপ। তাঁদের কাজগুলি মারাত্মকরকমের আনফটোজেনিক। কেউ একজন টেবিলে বসে আছে বা সোফায় শুয়ে একদৃষ্টিতে দেয়াল বা সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে আছে। পনেরো মিনিট বাদে সেই ব্যক্তি সাত লাইন লেখেন তার মধ্যে কেউ হয়ত সেখান দিয়ে একবার হেঁটে যায়, তারপরে আরও একঘণ্টা কেটে যায় , যার মাঝখানে কিছুই ঘটে না… কে এইসব দেখার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে?
আমি এর আগে অনুপ্রেরণার উল্লেখ করেছিলাম।
সমসাময়িক কবিরা অনুপ্রেরণা কি এবং আদৌ এর অস্তিত্ব আছে কিনা এই প্রশ্নের উত্তরে কিছুটা চাতুরীর আশ্রয় নেন। এমন নয় যে তাঁরা কোনদিন তাঁদের অন্তরে এর মঙ্গলময় অভিঘাত অনুভব করেননি। যা আপনি নিজে বোঝেন না সেটি অন্য কাউকে ব্যাখ্যা করা খুব একটা সহজ নয়।
যখন আমাকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়, আমিও এড়িয়ে যাই। কিন্তু আমার উত্তর হল এই যে: অনুপ্রেরণা কবি বা শিল্পীর একচেটিয়া ব্যাপার নয়। বেশ কিছু মানুষ যারা আছেন ,আগেও ছিলেন, যাঁদের কাছে অনুপ্রেরণা ধরা দেয়। সেই সব মানুষ যাঁরা সচেতনভাবে নিজেদের কাজকে বেছে নিয়েছেন এবং যাঁরা ভালোবেসে, কল্পনাশক্তির সাহায্যে সেই কাজটি করেন তাঁরা সকলেই এই শ্রেণির মধ্যে পড়বেন। এঁদের মধ্যে ডাক্তাররা থাকতে পারেন , শিক্ষকরা থাকতে পারেন, মালীরা থাকতে পারেন ___ এরকম আরও একশোটা পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তির নাম আমি এই প্রসঙ্গে করতে পারি। তাঁদের কাজ একটা ধারাবাহিক রোমাঞ্চকর অভিযানে পরিণত হয় যতদিন পর্যন্ত তাঁরা এর মধ্যে নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। প্রতিবন্ধকতা এবং বাধা কখনোই তাঁদের কৌতূহলকে দমিয়ে দিতে পারে না। প্রত্যেক সমস্যা যা তাঁরা সমাধান করেছেন তাঁদের সামনে একঝাঁক নতুন প্রশ্ন নিয়ে আসে। অনুপ্রেরণা যাই হোক না কেন, এর জন্ম ধারাবাহিক ‘আমি জানি না’ -এর থেকে।
কিন্তু এরকম লোক খুব বেশি পাওয়া যাবে না। এই পৃথিবীর বেশিরভাগ বাসিন্দা কোনরকমে প্রয়োজন মেটানোর জন্য কাজ করে থাকেন। করতে হয় বলেই তাঁরা কাজ করেন। কাজ বেছে নেওয়ার পিছনে তাঁদের কোনো আবেগ কাজ করে না; তাঁদের জীবনের পরিস্থিতি তাঁদের হয়ে কাজটি বেছে দেয়। ভালোবাসাহীন কাজ, একঘেয়ে কাজ, কাজের মূল্যায়ন হয় এইভাবে যে যতই ভালোবাসাহীন বা একঘেয়ে হোক না কেন অন্যেরা সেই কাজটি পায়নি ___ এটা মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড়ো যন্ত্রণা। আর তেমন কোনও ইঙ্গিত বা সম্ভাবনা নেই যে আগামী শতাব্দীতে এই অবস্থার কোন পরিবর্তন ঘটবে অন্তত যা চলছে তার থেকে ভালো কোনো পরিস্থিতির জন্ম হবে।
সুতরাং আমি, যদিও অনুপ্রেরণার উপর কবিদের একচেটিয়া অধিকারের বিষয়টি অস্বীকার করি, আমি তাঁদের বিশেষভাবে সৌভাগ্যবান বলে মনে করি।
এই মুহূর্তে, যদিও, আমার শ্রোতাদের মনে কয়েকটি সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে। সবধরনের অত্যাচারী, স্বৈরাচারী, ধর্মান্ধ এবং বাক্যবাগীশ নেতারা যারা ক্ষমতায় আসার জন্য গরম গরম শ্লোগান দেন তারাও নিজেদের কাজকে উপভোগ করেন, এবং বেশ উৎসাহের সঙ্গেই করেন আর উদ্ভাবনী শক্তিরও পরিচয় দিয়ে থাকেন। হ্যাঁ, কিন্তু তারা ‘জানেন’। তারা জানেন, যা-ই তারা জানেন তাদের জন্য সেই জানাটাই যথেষ্ট। তারা আর অন্য কোনো কিছু সম্পর্কে জানতে চান না, কারণ এরকম করলে সম্ভবত তাদের তর্কের জোর কমে যায়। আর যেকোন জ্ঞান যা নতুন প্রশ্নের দিকে আমাদের চালনা করে না দ্রুত হারিয়ে যায়: জীবন ধারণের জন্য যে উত্তাপের প্রয়োজন হয় তা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। শুধু তাই নয় সমাজের জন্য অনেকসময় মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। প্রাচীন এবং আধুনিক ইতিহাসের এমন অনেক ঘটনা আমাদের জানা আছে।
যে কারণে, ‘আমি জানি না’ এই ছোটো শব্দবন্ধটিকে আমি এত গুরুত্ব দিয়ে থাকি। এটা ছোটো, কিন্তু শক্তিশালী ডানায় ভর করে ওড়ে। এটি আমাদের জীবনকে আরও প্রসারিত করে যাতে আমাদের ভিতরে আরও একটু জায়গার সংকুলান হতে পারে সেই সঙ্গে আমাদের বাহ্যিক জীবনেরও সম্প্রসারণ ঘটাতে সাহায্য করে যে জীবন নানা পার্থিব কারণে আটকা পড়ে যায়। যদি আইজ্যাক নিউটন কোনোদিন নিজেকে না বলতেন “আমি জানি না,” তাহলে তাঁর বাগানে আপেলের বৃষ্টি হয়ে যেত আর তিনি সবথেকে বেশি যা করতেন তা হল নীচু হয়ে আপেলগুলি কুড়িয়ে নিতেন আর তৃপ্তি সহকারে সেগুলি খেতেন। আমার স্বদেশনিবাসী মারি ক্যুরি যদি কোনোদিন নিজেকে না বলতেন “আমি জানি না”, হয়ত সারাজীবন তিনি কোনো প্রাইভেট কলেজে ধনীর দুলালীদের কেমিস্ট্রি পড়াতেন, এবং একটা সম্মানজনক পেশায় নিযুক্ত থেকেই তাঁর জীবন কাটিয়ে দিতেন। কিন্তু তিনি নিজেকে বারবার বলে গেছেন “আমি জানি না” এবং এই শব্দবন্ধ তাঁকে একবার নয় দু-দুবার, স্টকহোম-এ নিয়ে এসেছে, যেখানে অস্থির, অনুসন্ধিৎসু মানসিকতাকে কখনও কখনও নোবেল পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হয়ে থাকে।
কবিরা, যদি তাঁরা প্রকৃত কবি হন, নিজেদের বারবার বলে যেতে হবে “আমি জানি না।” প্রতিটি কবিতা এই বিবৃতির উত্তর দেওয়ার একটা প্রচেষ্টাকে চিহ্নিত করে, কিন্তু যখনই সাদা পাতার উপর চূড়ান্ত পর্যায় এসে উপনীত হয়, কবি তখন দ্বিধা করতে আরম্ভ করেন, তিনি বুঝতে শুরু করেন যে তাঁর নির্দিষ্ট উত্তরটি একেবারেই কাজ চালানো গোছের যা কিনা সম্পূর্ণভাবে অনপুযুক্ত। তাই কবিরা চেষ্টা চালিয়ে যান, আর তার ফলাফল হিসেবে আজ হোক কাল হোক কবিদের উপর্যুপরি আত্ম-অসন্তুষ্টিকে একটা প্রকাণ্ড পেপারক্লিপ দিয়ে জুড়ে সাহিত্যের ঐতিহাসিকরা তার নাম দেন “সাহিত্যসম্ভার”।
আমি মাঝেমধ্যে এমন সব পরিস্থিতির স্বপ্ন দেখি যা সম্ভবত কখনই বাস্তবায়িত হতে পারে না। আমি দুঃসাহসের সঙ্গে কল্পনা করি, যেমন ধরুন, যে আমার সুযোগ হল সমগ্র মানবজাতির অহমিকা নিয়ে শোকগাথা লেখা এক্লেসিয়াসটেস এর সঙ্গে কথা বলার। আমি তাঁর সামনে নতজানু হবো, কারণ তিনি, অন্তত আমার মতে মহান কবিদের মধ্যে একজন। এইসব হয়ে গেলে, আমি তাঁর হাত আঁকড়ে ধরব। ‘“পৃথিবীতে নতুন কিছুই নেই’: এটাই আপনি লিখেছিলেন, এক্লেসিয়াসটেস । কিন্তু আপনি নিজেই জন্মেছিলেন নতুন হয়ে, এই পৃথিবীতে এবং যে কবিতাগুলি আপনি সৃষ্টি করেছিলেন, সেগুলোও ছিল একেবারে আনকোরা, যেহেতু পৃথিবীতে, আপনার আগে কেউ এগুলো লেখেনি। এবং আপনার সমস্ত পাঠক তারাও নতুনই ছিলেন এই পৃথিবীতে , কারণ আপনার জন্মের আগে যারা বেঁচে ছিলেন তাদের আপনার লেখা পড়ার কোনো সুযোগ ছিল না। এবং যে সাইপ্রেস গাছের তলায় আপনি বসে আছেন সৃষ্টির আগেই তার জন্ম হয়নি। এক্লেসিয়াসটেস, আমি আপনাকে জিগ্যেস করতে চাই নতুন কী নিয়ে আপনি এখন কাজ করার পরিকল্পনা করছেন? যা কিছু ভাবনাচিন্তা আপনি ইতিমধ্যেই ব্যক্ত করেছেন তার সঙ্গেই কিছু যোগ করার কথা ভাবছেন? নাকি সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি খণ্ডন করতে লোভ হচ্ছে আপনার এখন? আপনার পূর্বের কাজগুলিতে আপনি আনন্দের উল্লেখ করেছিলেন ___ কী হবে যদি তা দ্রুত ফুরিয়ে যেতে থাকে? হয়ত আপনার নতুন লেখা কবিতাগুলো হবে আনন্দ নিয়ে? আপনি কি নোটস নিয়েছেন, খসড়া তৈরি করেছেন কিছু? আমার সন্দেহ আছে যে আপনি বলবেন, “আমার সমস্তকিছু লেখা হয়ে গেছে, আমার আর নতুন করে যোগ করার মতো কিছু নেই।’ পৃথিবীর কোনও কবি এমনটা বলতে পারেন না, আর আপনার মতো মহান কবি তো কখনই নয়।”
এই বিশ্ব __ আমরা যাই ভাবি না কেন এর বিশালত্ব আর আমাদের অক্ষমতার কারণে ভীত হয়ে, অথবা তিক্ত মনোভাব পোষণ করে থাকি ব্যক্তিগত যন্ত্রণার প্রতি এর উদাসীনতার কারণে, মানুষের, পশুর, এবং সম্ভবত গাছপালার, কীভাবে আমরা এত নিশ্চিত হয়ে যাই যে গাছেরা কোনও যন্ত্রণা অনুভব করে না, যা কিছুই আমরা ভাবি না কেন এর বিস্তৃতি যা নক্ষত্রের আলোয় এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যায় একে ঘিরে থাকা গ্রহরা যাদের আমরা সবেমাত্র আবিষ্কার করতে শুরু করেছি, গ্রহগুলি যারা কিনা ইতিমধ্যেই মৃত? এখনও মৃত? আমরা স্রেফ জানি না; যা-ই আমরা ভাবি না কেন এই অসীম থিয়েটার সম্পর্কে যেখানে আমরা রিজার্ভ টিকিট পেয়ে গেছি, কিন্তু সেই রিজার্ভ টিকিটের মেয়াদ হাস্যকরভাবে সংক্ষিপ্ত, দুটো খামখেয়ালি তারিখের দ্বারা যা সীমাবদ্ধ; আর যা কিছু আমরা এই বিশ্ব সম্পর্কে ভাবি না কেন ___ এটি বিস্ময়কর।
কিন্তু ‘বিস্ময়কর’ এই বিশেষণটির মধ্যে একটি যৌক্তিক ফাঁদ লুকোনো আছে। আমরা বিস্মিত হই, মোটের উপর, যা কিনা সুপরিচিত এবং বিশ্বজনীনভাবে স্বীকৃত, আমরা যাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি সেইসমস্ত ঘটনার থেকে আলাদা এমন ঘটনা ঘটলে। এখন কথা হচ্ছে, এরকম কোনো সংশয়াতীত নিশ্চিত জগৎ নেই। আমাদের বিস্মিত হওয়ার বোধ সহজাত এবং সেটি অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনার উপর নির্ভর করে না।
আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তায়, যেখানে আমরা প্রতিটি শব্দ থেমে থেমে ভেবে ভেবে বলি না, সেখানে আমরা সকলেই “ সাধারণ পৃথিবী”, “ সাধারণ জীবন” “ সাধারণ ঘটনাস্রোত” … এই জাতীয় শব্দবন্ধ ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু কবিতার ভাষায়, যেখানে প্রতিটি শব্দ নিক্তিতে মাপা হয়, সেখানে কিছুই সাধারণ বা স্বাভাবিক নয়। একটা পাথরও না আর তার উপরে একটা মেঘও না। একটা দিনও না আর তার পরে একটা রাত্রিও না। আর সর্বোপরি, একটা অস্তিত্বও না, এই পৃথিবীতে আর কারুর অস্তিস্ত্ব না।
মনে হয় কবিরা চিরকাল নিজেদের পথ নিজেরাই তৈরি করে নেবেন।
উইসলাওয়া সিম্বোর্স্কা-র জন্ম ১৯২৩ খ্রীস্টাব্দের ২রা জুলাই , পোল্যান্ডে। পরিবারের দুই কন্যাসন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন কনিষ্ঠতম। শৈশবেই ছোটগল্প এবং গান রচনার মধ্যে দিয়ে লেখায় হাতেখড়ি। কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ ১৯৪৫ সালে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হল Calling Out To Yeti , Salt, No End of Fun , Could Have , A Lare Number , The People On The Bridge , The End and The Beginning , Here ইত্যাদি। লিখেছেন পোলিশ ভাষায়।তাঁর কবিতাগুলি অনূদিত হয়েছে ইংরেজিসহ অন্যান্য ভাষাতে। কবিতা লেখার পাশাপাশি বিভিন্ন লিটারারি জার্নালে তিনি সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। যার মধ্যে Zycie Literackie এবং Pismo উল্লেযোগ্য। ১৯৯৬ সালে সিম্বোর্স্কা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। ২০২১ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি তাঁর প্রয়াণ ঘটে।
• ঋণ : nobelprize.org