বুধবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

কবি সুব্রত চক্রবর্তী ।। অনিমেষ মণ্ডল


স্তব্ধ বাড়ি, জবাগাছ ,ঘুমন্ত কবর:কবি সুব্রত চক্রবর্তীর কবিতা


ঘরে ঢোকার ঠিক আগে,সহসা মনে হয়েছে, এমন ভঙ্গিতে 

পর্দার আড়ালে তুমি সরে গেলে;

সামান্য আনতমুখে দ্রুতহাতে মুছে নিলে ঠোঁট।

বাজে ঝরনা, চীনাংশুক ওড়ে ।


চৈত্রের জ্বলন্ত রাত্রি একা বাড়ে, একা পুড়ে যায়।

ঘুমন্ত চোখের পাশে জাগে স্বপ্ন, প্রহরিণী, দেখো মধ্যযাম!

নিভন্ত চুল্লির বুকে ধিকিধিকি আমার হৃদয় 

দহন সহিছে একা, চৈত্রের জ্বলন্ত রাত একা পোড়ে।


ঘরে ঢোকার ঠিক আগে তোমার নিবিড় ছায়া 

পর্দার আড়ালে ডুবে যায়--

দ্রুত হাতে মুছে নিলে ঠোঁট 

                হঠাৎ মনে হয়েছে এমনই ভঙ্গিতে 

ঈষৎ রাতুল মুখে ।সে কি স্বপ্ন!


                           সদাভ্রাম্যমাণ

চৈত্রের বাঘিনী রাত,অন্ধকারে কোন ঝরনা বাজে!

        (রোগশয্যায়, বিবিজান ও অন্যান্য কবিতা)


'যা কিছু অভিনব নয় তা কবিতাও নয়' ....কবিতা সম্পর্কে ঠিক এরকমই ভাবনা ছিল কবি সুব্রত চক্রবর্তীর।তিনি বিশ্বাস করতেন কবিতা হলো কিছু পাচার করা সত্য খবর এবং তা মানুষের জন্যই।কবিতার প্রতি এক অসম্ভব আত্মিক ভালোবাসা ছিল পেশায় পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক এই কবির।তাঁর বাড়ি ভর্তি হয়ে ছিল  বাংলা সাহিত্যের অসংখ্য গ্রন্থরাজিতে।এক নিষ্ঠাবান পড়ুয়া ছিলেন তিনি।ফলত যা বলতেন তা খুব গভীর থেকে বলতে পারতেন।কারণ তাঁর কবিতার পরিধি জুড়ে ছিল এক গভীর অনুভূতিময়তার প্রকাশ ।


কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর কথায় তাঁর "কবিতার ভাষা, যাকে সে অনবরত আক্রমণ আক্রমণ আর আক্রমণ করতে শিখছিল তার উৎস ছিল তো সুব্রতর অবিশ্বাস্য কবিতাপ্রীতিই,আর তার দেশ কাল আর মানুষজন সম্পর্কে এক মতলবহীন অনুভূতিময় সচেতনতা ।"


সমুদ্রের ওপারে প্রবাস, আমি তার লবণাক্ত বুকে।

জলস্রোত, জেলেডিঙি, পূর্বদিকে ব্যাপক আঁধার---

ঝাউবন, সাইরেন, বালি,

                            ম্লান জোনাকির ছিন্নমালা ।


বাতাসে শাঁখের শব্দ, আর ঐ শব্দের আড়ালে 

অপঘাত ,মৃত্যুদণ্ড, আজীবন নত মস্তকের 

কুর্নিশ, পিপাসা, ভয়--নীল কোন পূর্ণিমা--রজনী ।

                        

ব্রেকারের দৃপ্তশীর্ষে উজ্জ্বল মাছের চোখ, কুহকের দেশ;

আর নীচে-আঁধার জলের গর্ভে মৃত পশুপালকের গান--

দূর ও নিকটে কোনো ব্যাবধান নেই।


যে-কোনো দিকেই আমি চলে যেতে পারি,চলে যাব

তুমি ডেকো।প্রিয়তম, তোমার ইঙ্গিতে 

যে-কোনো প্রবাস যেন বসবাসযোগ্য বলে মনে হবে।আমি

যে-কোনো দিগন্তে ঠিক চলে যাব,তোমার নিশান

দূর কোনো প্রান্তে যদি ঝলসে ওঠে ভোরের আলোয়।

                  (দীঘায় বহুদূরে কন্যাকুমারিকায়)


বর্ধমানের বাঁকা নদীর উপর এক নড়বড়ে কাঠের সাঁকোর পাশে তাঁর বাড়ি।সেই সাঁকো হয়ত এখন আর নেই ।কিন্তু সেই সাঁকোর উপর দাঁড়িয়ে তিনি বহুবার প্রত্যক্ষ করেছেন নীচে বহমান ঘোলা জল আর মাথার উপর ক্রমঘনায়মান অন্ধকারের বুক চিরে চিরজাগ্রত নক্ষত্রের অতন্দ্র লীলা।কবিতা নিয়ে, ব্যাক্তিজীবন নিয়ে, এই বহমান পৃথিবী নিয়ে কত কথা তিনি বলে যেতেন অবলীলায় তা প্রত্যক্ষদর্শীরা সকলেই জানেন।তরুণ কবিদের উৎসাহ দেওয়া ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম এক ব্রত।যেকোনো ছোট পত্রিকা খুব যত্ন করে পড়তেন ।আর ছিলেন সংসার জীবনের প্রতি ভীষণ দায়িত্ববান।তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ তথা জীবদ্দশায় প্রকাশিত শেষ কাব্যগ্রন্থে কবির ঘর গেরস্থালি'র প্রায় প্রতিটি বিষয়ই উঠে আসে কবিতার ছত্রে ছত্রে যা তাঁর রক্ত থেকে উঠে আসা নিজস্ব যাপনের তন্নিষ্ঠ চিত্রমালা।


ঐ দেখো কবির বাড়ি--কবি তো সন্ন্যাসী নয়,

                           ওর ঘর-গেরস্থালি আছে ।

আছে ন্যুব্জ বাবা তার;বারান্দার সামান্য রোদ্দুরে 

                        ওই দেখো উনি বসে,

                                 চোখে ঘুম, 

       হাত -থেকে- খসে-পড়া গুড়গুড়ির নলে লাল-পিঁপড়ে ঘুরে যায়,বারান্দায় ঐ তো রোদ্দুরে

                    শালিখ পাখিরা আসে,

               তাই দেখে তালি দেয় ,হাসে

কবির প্রথম মেয়ে 

         কাল রাত্রে পরী দেখেছিল।

             (কবির ঘর গেরস্থালি,বালক জানে না)


সুব্রত চক্রবর্তী সেই কবি যিনি সন্ন্যাসী নন।ঘর গৃহস্থালি করেন পরিপাটি করে।সাংসারিক কাজে তাঁর কোনও আলস্য নেই।থরে থরে সাজানো অজস্র বই।অথচ একটিও এলোমেলো নয়।পড়ার ঘর সুন্দর ভাবে গোছানো। স্ত্রী  মালা চক্রবর্তী, এক কন্যা রুমনি ও এক পুত্র রুদ্রকে নিয়ে তাঁর সাজানো সংসার।


বৃষ্টির ভেতরে ওই ধবল পোশাক পরে বালিকার ছুটে যাওয়া 

              আমাকে এমন

নিঃসঙ্গ করেছে।...চেয়ে দেখি তুমুল বৃষ্টিতে 

স্তব্ধ বাড়ি, জবাগাছ,ঘুমন্ত কবর---


অনন্ত বৃষ্টিতে ভেজে দিগ্ বলয়,লাল পথ,প্রসারিত হাত;

একটি মহিষ ভেজে, সমাধিফলক ভেজে।...আর ওই বৃষ্টির ভেতরে 

চকিত পাখির মতো--দূর থেকে আরো দূরে--

                  উড়ে যায় শৈশবের ধবল পোশাক ।

                                                       (বালিকা)


একদিন সত্যি সত্যিই তাঁর বাড়ি তুমুল বৃষ্টিতে ভেজা স্তব্ধ জবাগাছের মতো ঘুমন্ত কবর হয়ে গেল।সব কিছু এলোমেলো করে 1980 সালের 10ই জানুয়ারি মাত্র ঊনচল্লিশ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে চলে গেলেন কবি সুব্রত চক্রবর্তী তাঁর সাজানো গৃহস্থালি ফেলে।

কবি অরণি বসু স্মৃতিচারণা করেছেন---

"কথা বন্ধ করে আমরা অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়েছিলাম।অন্ধকার ঘন হয়ে এলে আমরা রওনা হয়েছিলাম বাড়ির পথে।ফেরার সময় সুব্রতদা খুব শান্ত গলায় আবৃত্তি করেছিলেন তাঁর প্রিয় কবিদের কবিতা।তুচ্ছ মানুষ আমরা, বুঝতেও পারিনি সেই আমাদের শেষ সাক্ষাৎকার।সময় 1979 সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর,....."


বিকেলবেলার  দুঃখী আলো এসে আমাকে বলেছে, দেখা হবে ।

নৈশ রাজপথে এক আধপাগলা যুবতী ভিখিরি 

                               অকারণে হাত নেড়েছিল।

একটি হলুদ পাখি, একদিন আমাদের মৃত জবা গাছে

    বসেছিল কিছুক্ষণ--তারপর উড়ে গিয়েছিল ...

একটি পালক শুধু ঝরে পড়েছিল তার।কেন আমি কুড়িয়ে রাখিনি।


বিকেলের আলো আজ দুঃখহীন, মায়াহীন, উদ্ভাবনহীন.

নৈশ রাজপথে এক চাঁদভোলা কুকুর শুধু অকারণে কেঁদে কেঁদে ওঠে;

আজ কোনো পাখি নেই---একটি পালক শুধু মৃত জবা গাছে 

বারবার কাঁপে---কেন আজো তাকে ভুলতে পারিনি!

                  (একটি পালক শুধু,  নীল অপেরা)


39 বছরের স্বল্প জীবনে তাঁর মোট কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা মাত্র তিনটি।নীল অপেরা তাঁর মৃত্যুর পর 1990 সালে কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় উলুখড় থেকে।কবি ভাস্কর চক্রবর্তী বলেছেন---

" আজ এই জলরাশি ভেদ করে 'নীল অপেরা'য় --আমরা হয়ত দেখতে পাব সুব্রতর কবিতার এক নতুনতর আভাস, হয়ত শুনতে পাব নতুন এক সুর যা ফিসফিসিয়ে আমরাও বলতে চাই : মানুষই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে,আর সেখান থেকেই হয়ত ভোরবেলার শুরু।"


আজ তাঁর কবিতাগুচ্ছ আবার নতুন প্রজন্মের হাতে উঠে আসছে এতে প্রমাণিত হয় যে কবি সুব্রত চক্রবর্তীর কবিতা কালোত্তীর্ণ হয়েছে।তাঁর মৃত্যুর এত বছর পরেও তাঁর কবিতা পুনর্মুদ্রিত হচ্ছে বাংলা কবিতার পক্ষে এ বড় আশার কথা।এই চল্লিশ বছরে পৃথিবী অনেক বদলে গেলেও পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেওয়া এক প্রায় অখ্যাত কবির কবিতা ফিরে দেখার এই প্রচেষ্টা আমাদের ভীষণ রকম উদ্বেল করে।এভাবেই বাংলা কবিতার জয় হোক একদিন।


জন্ম 10ই অক্টোবর 1941 ,আসামের তেজপুরে।যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় এম এস সি।কর্মজীবন শুরু মহিষাদল রাজ কলেজে।তারপর কলকাতা সাউথ পয়েন্ট স্কুল হয়ে রামপুরহাট কলেজ ও সবশেষে 1966 সাল থেকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বর্ধমান রাজ কলেজে অধ্যাপনা।1967 সালে বিবাহ শ্রীহট্টের মালা বিশ্বাসের সঙ্গে।দুই সন্তান, কন্যা সাবর্ণি ও পুত্র রুদ্র।


প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ বিবিজান ও অন্যান্য কবিতা (1969,সখী সংবাদ প্রকাশনী)

বালক জানে না (1976,আনন্দ পাবলিশার্স)

নীল অপেরা (1990,উলুখড় প্রকাশনী)

প্রিয় পঁচিশ (2013,শব্দ হরিণ)।

পত্র পত্রিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রবন্ধগুলি নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশের পথে।

এছাড়াও লিখেছেন অনেক ছোটগল্প,বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ, কল্পবিজ্ঞানের গল্প,বেতার নাটক  ও একটি উপন্যাস যার নাম 'রুদ্রর দুপুর'।


কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর কথায়...

" সুব্রত যখন প্রধানত প্রথাবাহিত ভাষাকে সরিয়ে, মৃত্যুকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলছিল, তখনই নেমে এল এমনই এক স্তব্ধতা, যে স্তব্ধতার শব্দ আমাদের কাছে এখনও কর্কশ আর সত্যিই অসহনীয়।"

কবি অরণি বসুও বলেছেন ....

"আজ এতদিন পরেও তাঁর মৃত্যু কেন জানি না আমার কাছে মিথ্যে মনে হয়।এখনও তাঁর কথা বলার ভঙ্গি, হাঁটার ছাঁদ, কৃষ্ণকায় হাসি, গভীর দৃষ্টিপাত স্পষ্ট মনে পড়ে।এমনও হয়েছে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে পেছন থেকে কাউকে সুব্রতদা ভেবে এগিয়ে গিয়ে ভুল ভেঙেছে।মনে হয় সুব্রতদা প্রবাসে আছেন,একদিন ফিরে এসে জড়িয়ে ধরবেন।"

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন