বুধবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

আলো ও রঙের মনোভূমি ।। দেবাশিস দাশ


আলো ও রঙের মনোভূমি


১. বিজ্ঞানের আলো, আলোর বিজ্ঞান

যা কিছু আমরা দেখি, যা কিছু দেখি না, সমস্ত জুড়ে আলোর খেলা। শক্তির অভাবনীয় প্রকাশ এই আলো। কোয়ান্টাম বিজ্ঞানী জানেন, মানুষের মতোই আলোও আসলে দ্বিচারী। যা চোখে দেখছি, তা-ই বাস্তব নয়। অন্য এক জগৎ আছে, যা আমাদের ভাল-লাগা, আমাদের আকাঙ্ক্ষা-পূরণের স্বপ্নময়তা দিয়ে তৈরি। এক ঔপনিষদিক কোয়ান্টাম বিশ্ব। সমান্তরাল মায়া-ব্রহ্মাণ্ড। 

আলোর কথায় ফিরে আসা যাক। ব্রহ্মাণ্ডের সফ্টওয়্যার-গেম আলোর গতির সীমা দিয়েই বাঁধা রয়েছে। এর চেয়ে জোরে ছুটতে পারলেই টাইম-মেশিন আবিষ্কৃত হবে। কিন্তু সে আরেক আজব তত্ত্ব। বিজ্ঞানী বলেন, মানুষের মন যেরকম, আলোও অনেকটা তেমনই। বড্ড শেয়ানা সে। তার চরিত্রের ঠিক নেই। কখনও সে ঢেউ, কখনও আবার থোকা-থোকা সূক্ষ্মতম (অথচ ভরবিশিষ্ট) বস্তুকণা। ঢেউও কি সহজ-সরল? আসলে সেও দু'দুটো শক্তির প্রবাহ— পরস্পর ৯০° কোণে একটাই অক্ষের দড়ি বেয়ে একসঙ্গে ছুটে চলা তড়িৎ আর চুম্বকের তরঙ্গ মিলেমিশে গড়ে তুলেছে আলোর সেই ঢেউ-সত্তা। সে যখন কোনও জিনিসের ওপর আছড়ে পড়ে, তখন প্রতিফলিত হতে পারলে জিনিসটার আকৃতি বুঝে প্রতিবিম্ব গড়ে তোলে আমাদের চোখের লেন্সে। এই বিম্বিত রশ্মির প্রভাবে রেটিনা-লাগোয়া স্নায়ুদের প্রান্তগুলো উত্তেজিত হয়। উত্তেজনার স্পন্দন তড়িদ্বেগে মস্তিষ্কে দৌড়ে গিয়ে দেখার বোধ তৈরি করে আমাদের চেতনায়। 

আলো নিজে অদৃশ্য থাকে; সত্যিকারের কবিতার মতো, নিরাময়দায়ী। আমাদের চোখে ধরা পড়ে কেবল আলোকিত বস্তু, যার ওপর আপতিত আলোকরশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিস্তার দর্শকের দৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ। অবলোহিত অতল অন্ধকারের গভীরে থাকা আলো তাই আমরা দেখতে বা বুঝতে পারি না। ভৌতিক গল্পে ভূতেদের অস্তিত্ব অবলোহিত-টর্চে ধর্তব্য হতে পারে, ঠিক যেমনটা সমুদ্রগর্ভেও পারে; কিংবা নাইট-ভিশন বাইনোকুলারে। অন্যদিকে আমরা কিন্তু অতিবেগুনি ও তার ওপারে থাকা বিভিন্ন রশ্মিজালকেও টের পেতে পারি না। দৃশ্যবর্ণালি ছাপিয়ে, একদিকে তেজস্ক্রিয় অদেখা বিভাবিশ্ব, অন্যদিকে বেতার শ্রুতির কিনারা পর্যন্ত কাঁপতে থাকে অধরা জগৎ। আমরা মূর্খের মতো, সবজান্তার মতো, কিছু না দেখেও, সর্বজ্ঞানে প্রচারিত হতে চাই! 

২. শুশ্রূষার জন্য চাই রং

রঙের ধারণা বলা যায় অনেকটাই ব্যক্তিগত। ভাল লাগা, না-লাগা দিয়ে গঠিত চিন্তা ও অনুভূতির রং। তবু, সর্বজনীন কিছু বোধ, কিছু আবেগ বের করা গিয়েছে বই-কী। লাল, কমলা ও হলুদ এক-রকম গরম অনুভূতি জোগান দেয়, যা তেজ, রাগারাগি অথবা বিদ্বেষের চেতাবনি হতে পারে। অন্যদিকে, নীল, বেগুনি ও সবুজ হল শীতল রং। শান্ত প্রকৃতির দরুন মনে বিষাদ অথবা ঔদাস্যের ধারণা জাগাতে পারে এরা। মনোবিদ্যার জন্য প্রাচীনকাল থেকে মানুষ তাই বর্ণ-চিকিৎসার বিভিন্ন আয়োজন করে এসেছে। মিশর, চিন ইত্যাদি দেশের পুরনো সংস্কৃতিতে নিজস্ব বর্ণ-চিকিৎসার পদ্ধতি দেখা যেত। হয়তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রংয়ের প্রভাব আর ক্ষমতাকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল। আসলে মনোভাব বা আবেগের ওপর রংয়ের কাজ অস্থায়ী এবং অনেকটাই পরিবেশ-নির্ভর। যেমন, আকাশি নীল রঙের ঘরে চুপচাপ বসে থাকতে-থাকতে শান্ত ভাব আসে, খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও। তার পর, জেদি মানুষের বিক্ষিপ্ত বহুগামী মন সেই প্রশান্তিটুকুকে নিজের অভ্যাসেই হয়তো-বা অস্বীকার শুরু করে। পরিপাটি সাদা বেডকভার-ঢাকা বিছানায় বসে কবিতা লেখার আরামই আলাদা। জ্ঞানে বোঝাই পৃথিবী থেকে নিমেষে কখন একলা পরম শান্তির দেশে পৌঁছে যাওয়া যায়! পাগল স্রষ্টার জন্য সাদা রং তাই নার্সিংহোমের বেডকভার। 

বিভিন্ন রঙের প্রকৃতি, তাদের (চিকিৎসার কাজে) ব্যবহারযোগ্যতা আর ক্ষতিকর দিকগুলো টেবিলভুক্ত করে তালিকায় সাজিয়ে ধরা যায়। এখানে লেখাকে অযথা ভারী করে তুলতে চাই না। কোনও পাঠকের সত্যিই যদি আগ্রহ জাগে, তবে কোভিড-উত্তীর্ণ দিনে সহৃদয় আমন্ত্রণ থাকল আমার নিজস্ব বর্ণালি দিয়ে গড়া ছোটখাটো কবিতা-কুটিরে। ভালবাসার রং, রস ও বিজ্ঞানের তথ্য ভাগ করে নিতে পারব হয়তো। আপাতত দু'একটা রঙিন নমুনা পেশ করা যাক। ঘন নীল বর্ণাভা'র প্রকৃতি বেশ ঠান্ডা। আকাশি নীলের মতো অতখানা কর্মদক্ষ করে তোলার ক্ষমতা কিম্বা প্রশমনবিদ্যা শ্রাবণঘন নীলের আয়ত্তে নেই বটে, কিন্তু এই রং চামড়ার রোগের সমস্যা বেশ কম রাখতে পারে। তবে, শীতল-শান্ত স্বভাবের সামান্য ক্ষতিকর দিকও তো আছে। নাড়ির বেগ, দেহের উষ্ণতা কমিয়ে মনে বিষাদবোধ জাগাতে পারে। তাই, ওষুধ হিসেবে রংকেও মাপ-মতো গ্রহণ করা জরুরি মনে হয়। অন্য আরেকটি রং হল গোলাপি। শান্ত। প্রেম ও রোমান্সের প্রতীক। জেলখানার কক্ষের দেয়ালে ড্রাংক পিঙ্ক রং ব্যবহার করা হয় কারাবন্দীদের মনকে শান্ত, নির্জীব রাখার জন্য। তবে ক্ষতির ব্যাপারটা হল প্রথম দিকে স্থির ও শান্ত করতে পারলেও খুব বেশিক্ষণ এই রঙের পাল্লায় পড়লে অতিরিক্ত এক উত্তেজনা আসবে— এক নরম মাতাল হাওয়া। আসলে রং হলেও তার মধ্যেও দোষ আর গুণ দুইই রয়েছে কি-না!

এ-বারের মতো এখানেই ক্ষান্ত হলাম। পরে কোনওদিন সুযোগ বুঝে, সুরের সঙ্গে রঙের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করব। স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ শক্তির বিচ্ছুরণজনিত কম্পনের কথা কিছুটা লিখেছেন তাঁর 'রাগ ও রূপ' বইটিতে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাংগীতিক সাত স্বরের বর্ণাভাও উল্লেখ করা হয় তুলনামূলক সারণির মাধ্যমে। সে এক অন্য গহন চিকিৎসা-পদ্ধতি, যা সুর আর রঙের যৌথ শুশ্রূষাধর্মের প্রতি আস্থা বাড়ায়।


ছবি : বিধান দেব 



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন