এ গ্রহে ফুল হোক
বিনামূল্যে বিতরণের জন্য
কুয়াশার ইথার থেকে শীতার্ত গন্ধ ভেসে আসে...
শিউলী বুড়ি ওঠেনি তখনো জেগে৷ সরুপথ মরা ঘাসে
অন্ধকার বুনে যায়... ও রাতের হাস্নুহেনা, নাইওর যান কি?
নদীর ঘুম ভাঙিয়ে ছলাত্ ছলাত্... পান্তা ভাতের শানকি
ধমকিয়ে যায় কুআশা মাখানো চায়ের কাপ৷
পৌষমাস রাতে যখন খেড়ো কুঠুরীতে অন্তর্ঝাঁপ
গ'লে লেপের ওমে লেগে থাকে, আমরা ও আমাদের
পুরোনো ব্যাধি আরো সর্বনাশা পুরোনো হয়ে দেখি শুয়ে থাকি শখে!
চোখে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ঘুম ও অলীক স্বপ্ন, কেউ কেউ স্বপনের
খামোকা মানে খোঁজে পাঠ্যপুস্তক ও গোলাপ-পাঁপড়ির মত নখে৷
ডট কম সময়ে রাতের শুভ্রপুষ্প রামের মা'র বেতের ঝুড়িতে
লুকিয়ে উপাসনা করে৷ চুনিয়ার ব্লেড কাটে তাকে৷ এক-দুই...কুড়িতে
এসে থামে৷ গ্রহের মানুষ তাদেরই আঙুলসমূহে টুকরো হয়ে
ঝুলে থাকে৷ প্রকৃতির লিঙ্গ নিয়ে কী অযথা প্রশ্ন উঠেছে সময়ে!
ওলো ফুলকুমারী, ওগো সখী, আমাদের তোমার ভ্রূণ-মাঝে নাও—
আমরা তোমার বৃক্ষ-নট৷ মহান সবুজ তোমার বাগানে আমাদের বিছাও!
নগর-হাটে তথাস্তু বিক্রি নিষিদ্ধ হবে তরতাজা স্বপ্ন-আনাজ...
কোথাও বাজছে অন্তর? খুলে দাও ঘাসফুল কসাই সর্পকূলের বন্ধ্যা কান আজ৷৷
পা-হাড়ের আদিকাব্য
[...মথুরার মেদোনী-বার্গীপাল সোজমেঘ সাজুরি উরি যায়
জুনোপহরে ভিজে মোন হারেয্যেয়ে সুরনত কৃষ্ণার বুগ ভাজি থায়৷
—কবি সুহৃদ চাকমা]
...সেইসব সুসুদূরে ফেলে আসা পদচিহ্ন...সহস্রীয়ান পা-য়ের ছাপ;
আজো দ্যাখো আমাদের হাড়-অস্থি-মজ্জা-রক্তগত উঠোনে
জলছবির মতন লেগে আছে! কী দাপটে চষে বেড়ায় নাগরিক মনঃস্তাপ
এবং আকাংখার অলি-গলি, আমি চুপিচুপি 'আমাকে' বলি; সেও শোনে৷
কড়কড়ে কড় গুণে আবিষ্কার করতে থাকে প্রপিতামহের সাহসের দেনা
আর যা' কিছু দৃশ্যমান; সহস্রাব্দের নিরেট প্রতিশিল্প; সুসবুজ পাহাড়...
তার বিশালত্বের কাছে এতটুকুন গোলমরিচের মতন সেই 'আমি' কত কী বোঝে; ক্ষুদ্রত্ব বোঝেনা!
আমার পা ও হাড়ের পেশী ও শিরায় সোঁদা সুঘ্রাণ ঢেলে দিয়ে গ্যাছে মহাকাল; বিস্তৃত অপার৷
আমি-আমরা ও আমাদের ইতিহাস যতই অণু-পরমাণু ডিঙিয়ে শূণ্য হয়ে যাই; অসীম মহাশূণ্য!
স্বপ্নীল নীলমেঘ ধর্ষিতা পাহাড়ী বালিকার গগনবিদারী কান্না হয়ে টুপ-টাপ ঝরে পড়ে
সবুজের প্রান্তরে...যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রতিবাদের লাল ছোপ ছোপ অরণ্য!
'পাহাড়ী'; 'উপজাতি'; 'ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী'...এরকম আরো আরো কটাক্ষ শব্দের মৌন ঠোঁটও নড়ে৷
আমার পা ও হাড় আমাকে শুধায়, কিহে অহমবাজ সহজিয়া সনাতনী ডিঙিয়ে
কতটুকুন হয়েছ ভিন্ আরব্য সিন্দাবাদ? মনন-যুদ্ধ; মল্ল-যুদ্ধ শেষে চকচকে তরবারীর বীর!!
মহেনজোদারো-হরপ্পার পলিতে ঠিকই গাঁথা আছে ইতিহাস, সময়ের প্রলেপ দিয়ে
মুছে ফেলা যাবে কি চৌদ্দপুরুষের নাম? শেকড়ের পুণরুত্থান কখনো রয়না স্থির৷
প্রস্তর-পর্ব
ক.
পাথরে ফোটেনা ফুল...সবজী-ফল-বৃক্ষও বটে!
মানুষ পাথর হয় অতি দুঃখ-শোক-সন্তপে...
পাথর বিশালতা ও নিরেটের প্রতীক ভূ-তটে।
একদা স্বনাবিস্কৃত মানুষ বনে-বাদাড়ে-ঝোঁপে,
সংসার বানাতে শিখেছিলো পাথরের গুহায়...
পাথরে পাথর ঘষে জ্বেলেছিলো আশ্চর্য আগুন,
প্রথম অস্ত্র বানিয়েছিলো পাথুরে; আত্মরক্ষায়।
একে একে প্রকাশ করেছিলো মানুষ স্বীয় গুণ!
সে সকল প্রস্তর-যুগ ইতিহাস, বিস্তর যুগে
পাথর ছেড়ে নেমেছে মানুষ সুসবুজ ভূমিতে—
চিনেছে মূল্যবান রত্ন-পাথর সৌন্দর্য হুজুগে!
পাহাড়ের বুক চিরে বানিয়েছে পথ জনহিতে।।
খ.
মানুষের কলা-শিল্প-পূর্বপুরুষের উপাখ্যান,
‘শিলালিপি’ তুলেছে মানুষ কত মাটি খুঁজে-খুঁড়ে...
সুউচ্চ পাথর চূঁড়া জয়ে বাজি ধরে স্বীয় প্রাণ
জয়ী হয়ে লেখাচ্ছে নাম ইতিহাসের পৃষ্ঠা জুড়ে!
ধর্মতে আরবদেশে শয়তানের গায়ে পাথর ছোঁড়া হয়—
কাবাঘরে ইব্রাহিম নবীর পা ছোঁয়ানো পাথরে;
হাজার বছরে কোটি কোটি চুম্বনে ধরেছে ক্ষয়।
সম্রাট শাহজাহান প্রিয়তমা বিহনে ব্যাকুল কাতরে
অমূল্য পাথরে গড়েছেন আশ্চর্য ‘তাজমহল’!
বিশ্ব শাসন করা মহারাণীর মুকুটে হীরক বড়;
ভূ-ভারতের ‘কোহিনুর’ কেড়ে নিয়ে গ্যাছে লুটেরার দল!!
বিনিময়ে আমাদের করে গ্যাছে দুই-তিন ভাগ...
আমাদের ভেতরের যে অস্তিত্বের প্রস্তর; জড়—
জাগুক প্রাণ তাতে, প্রতিবাদে ক্রীতদাস-পাথর জাগরে জাগ্৷৷
একজোড়া
১.
দু'টি পোষা পা খিড়কি খুলে দূর পথ হয়েছিল
কোনো এক দূরবীন রথে; অত্যন্ত প্রকৃতিগত !
আধুনিক ক্যালেন্ডার থেকে দৌড়ে নেমে
তুলসীতলায় ঘোমটামুখো সন্ধ্যা পুড়েছে...
নগরীর কাপে আজো ওড়ে সেই আড্ডার চুমুক !
কাজলাদিদির কোলে সুঁইয়ের আগায়
সেই কোনোদিন দুলেছিল শীতের রস...
তাই বয়স হিসেবে রেখেছে কেশবতী জলের আঙুল,
দৃশ্যের ফাঁকে ফাঁকে জ্বলেছিল অদৃশ্য লাল-নীল রোদ
আর পথের পায়ে পায়ে উড়েছিল ছায়ার বায়স...
পাড়াতুতো খোলাখাঁচা দুলেছিল তাই ভূমির হাসিতে ৷
২.
মেঘাতুর চোখে একটু একটু ডুবে যায় যৌ-মৌবন; জালি কলস
আর কাঁখ থেকে খুলে খুলে পড়েছে লাস্যময়ী রাধা...
তাই দেখে কোনো কোনো কৃষ্ণ এ গ্রহে জ্বলন্ত বৃক্ষ হয়ে গ্যাছে !
ঘড়িকে পাহাড়ায় রেখে সেই কবে থেকে ঘুমোচ্ছে বালিশ;
অভিমানের নগরে সবার আগে ঘুম ভেঙেছিল তাই ছাপা বাঁশকাগজের ৷
চাকার নাটাই ছাড়ে অচিন সুতো...পালতোলা ডানায়
ছা-পোষা পা যাচ্ছে তো যাচ্ছে তো যাচ্ছে তো যাচ্ছে
সব পথ ভুলতে ভুলতে দূর্গম নিজের ভেতর...
ছবি : বিধান দেব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন