জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন কোয়ানের অমায়িক ভুবন
পঞ্চম আচার্য হং-জেন : জন্মান্তরিত এক তাওবাদী
জন্মান্তর, পুনর্জন্ম এই ধরণের শব্দগুলি আমাদের মনোজগতে এক রোমাঞ্চকর আবহ সৃষ্টি করে। জীবনের অন্তহীন প্রবাহের কথা ভেবে; আমাদের জীবনদাঁড় দুলে ওঠে। আমরা আশ্বস্ত হই, প্রাণিত হই, নতুন করে সবকিছু শুরু করার সুযোগ পাওয়া যাবে ভেবে উৎফুল্ল হই। এজন্মের যাবতীয় ভুলভ্রান্তি শুধরে নতুন হয়ে ওঠার এই সুযোগ আমাদের কতটা হ্লাদিত করে, তা কী আর কথায় প্রকাশ করা সম্ভব! ভারতীয় উপমহাদেশে উদ্ভূত ধর্মগুলির প্রায় সবকটিই জন্মান্তরবাদের ধারণাকে ভরকেন্দ্র করে মাথা তুলেছে ও পল্লবিত হয়েছে। বিশেষত হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির প্রায় সমস্তটাই জন্মান্তরবাদকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। তুলনামূলকভাবে দেখলে বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতিতে জন্মান্তরবাদের প্রভাব লঘু। তাত্ত্বিকভাবে বৌদ্ধধর্ম আংশিক জন্মান্তরবাদী হলেও আত্মার অবিনশ্বরতায় বা শাশ্বত আত্মায় বিশ্বাসী নয়। বুদ্ধদেব আত্মাকে রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান ; এই পঞ্চস্কন্ধের সমাহার হিসাবে দেখেছেন। তাঁর মতে আত্মা নিত্যও নয়, আবার অনিত্যও নয়। বাদবিসংবাদ এড়িয়ে তিনি এ বিষয়ে মধ্যমপন্থাকেই বেছে নিয়েছেন। তবে কোথাও কোথাও তাঁকে জন্মান্তরবাদের সমালোচনায় উচ্চকিত হয়ে উঠতেও দেখি। যেমন সুত্তপিটক-এর মজ্ঝিমনিকায়-এর চুলদুকখকখন্ধসুত্তে জৈন সন্ন্যাসীদের সঙ্গে কথোপকথনে তাঁকে আমরা ভিন্ন মাত্রায় পাই। রাজগৃহের গৃধ্রকুট পর্বতে অবস্থানকালে বুদ্ধ একদল মহাবীর-অনুগামীকে দেখেন, যাঁরা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কৃচ্ছ্রসাধন করছিলেন। তিনি তাঁদের জিজ্ঞাসা করে জানতে পারেন, ওইভাবে তাঁরা পূর্বজন্মের পাপ ক্ষয় করছেন এবং বর্তমান জন্মে পাপ-বিরত থাকছেন ও দুঃখ তাড়াচ্ছেন। তখন বুদ্ধ সেইসব মহাবীর অনুগামীদের সঙ্গে কথোপকথনে রত হন। তিনি বলেন,
— বন্ধুগণ, আপনারা কি জানেন আপনারা পূর্বে জন্মেছিলেন কি জন্মাননি ?
— না। আমরা তা ঠিক জানি না।
— আপনারা কি জানেন যে, পূর্বজন্মে পাপ করেছিলেন কি করেননি ?
— না। আমরা তা ঠিক জানি না।
— আপনারা পূর্বজন্মে কীধরনের পাপ করেছিলেন, তা কি জানা আছে ?
— না। আমরা তা ঠিক জানি না।
— আপনারা কি জানেন, আপনাদের এই কৃচ্ছ্রসাধন কতটা দুঃখ কমাল এবং আরও কতটা দুঃখ কমাতে হবে অথবা আরও কতটা দুঃখ কমালে সমস্ত দুঃখই লোপ পাবে?
— না। আমরা তা ঠিক জানি না।
বুদ্ধ, এবার তাঁদের যে কথা শোনালেন, তা শোনার জন্য তাঁরা আদৌ প্রস্তুত ছিলেন না।
— তাহলে কি বিষয়টি এরকম নয় যে, যাঁরা পূর্বজন্মে পাপীতাপী, বর্বর বা নিকৃষ্ট শ্রেণির মানুষ ছিলেন তাঁরা সব এজন্মে পাপক্ষয়ের জন্য মহাবীরের দেখানো পথে কৃচ্ছ্রসাধন করছেন ?
আবার মজ্ঝিমনিকায়-এর চুলমালুঙ্ক্যপুত্তসুত্তে আমরা দেখি, ভিক্ষু মালুঙ্ক্যপুত্ত-এর জিজ্ঞাসার উত্তরে বুদ্ধদেব বলছেন, শরীর ও আত্মা অভিন্ন বা শরীর ও আত্মা ভিন্ন ; মৃত্যুর পর তথাগতের পুনরায় জন্ম হয় বা জন্ম হয় না ; এসব কথা বিশ্বাস করলে অথবা বিশ্বাস না-করলে জন্ম-জরা-মরণ চক্রে তার কোনও প্রভাব পড়ে না। সুতরাং দুঃখ বিনাশের পথ জুড়ে দাঁড়ানো প্রশ্ন ছাড়া অন্য সব প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়াই উচিত। বস্তুত মানবকল্যানের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত নয়, এমন জিজ্ঞাসার উত্তরে বুদ্ধদেব অধিকাংশ সময় নীরবতা পালন করেছেন বা কৌশলী উত্তর দিয়েছেন। বুদ্ধের এই অলৌকিকতা বিরোধী ভূমিকা অনুসারীদের অনেককেই আহত করেছে। তাই হয়তো তাঁদের উদ্যোগে সংকলিত হয়েছে জাতককাহিনি। বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া প্রচলিত গল্পকথাগুলিকে একত্রে গ্রন্থন করে কেন্দ্রীয় চরিত্রের স্থানে বসানো হয়েছে বোধিসত্ত্ব তথা বুদ্ধদেবকে। এই আখ্যানসম্ভারকে বুদ্ধদেবের পূর্ববর্তী জন্মসমূহের বাস্তব-কাহিনি আখ্যা দিয়ে প্রচারও করা হয়েছে সচেতনভাবে।
ভারতবর্ষ যে কেবল জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসীদের দেশ, এমনটা নয় মোটেও। ভারতবর্ষে জন্মান্তরবাদের ধারণাকে যারপরনাই ধ্বস্ত করেছে চার্বাক নামের দার্শনিকগোষ্ঠী। তাঁদের যুক্তি কিছুটা স্থূল হলেও বাস্তবিক, অকাট্য ও ক্ষুরধার। তাঁরা মাটি-জল-আগুন-হাওয়া এই চার ভূত বা উপাদান দিয়ে জগৎ ও জীবনের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করেছেন। যদি এই চার জড় উপাদান দিয়ে দেহ গঠিত হয় তাহলে চৈতন্য এল কোথা থেকে ? এর উত্তরে চার্বাকীয় যুক্তি — যেমন সবুজ পান, সাদা চুন ও কালো খয়ের একত্রে মিশ্রিত হয়ে লাল রং উৎপন্ন করে তেমন উক্ত ভূত চতুষ্টয় মিশ্রিত হয়ে চৈতন্যের তথা তথাকথিত আত্মার জন্ম দেয়। এ বিষয়ে তাঁরা আরও বলেছেন —
তচ্চৈতন্য-বিশিষ্ট-দেহ এব আত্মা, দেহাতিরিক্তে আত্মনি প্রমাণাভাবাৎ।- (সর্বদর্শনসংগ্রহ)
অর্থাৎ : চৈতন্য-বিশিষ্ট দেহই আত্মা। দেহাতিরিক্ত আত্মার কোনও প্রমাণ নেই।
এবং
ভস্মীভূতস্য ভূতস্য পুনরাগমনং কুতঃ।(চার্বাকষষ্ঠি-৩৩)
অর্থাৎ : ভস্মীভূত জীব বা দেহের পুনরাগমন কোনও কারণেই হতে পারে না।
বুদ্ধের সমসময়ে অজিত কেশকম্বলীর মতো বস্তুবাদী দার্শনিকও ছিলেন, যিনি আত্মাকে দেহের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে দেহের মৃত্যু হলে আত্মারও বিনাশ ঘটে। আবার তিনি শ্রমণজীবন যাপনের মাধ্যমে একথাও বুঝিয়ে দিয়েছেন নীতি-নৈতিকতা বা বৈরাগ্যের সঙ্গে অলৌকিকত্বের কোনও ওতপ্রোত সম্পর্ক নেই। কেবল অজিত কেশকম্বলী নয় তাঁর মতো আরও অনেক দার্শনিক বা শ্রমণ ছিলেন যাঁরা বেদ-ব্রাহ্মণের তোয়াক্কা না-করে নিরীশ্বরবাদী আত্মজ্ঞানের সাধনায় নিষ্ঠ ছিলেন। এই ধারাটি বিরল হলেও এখনও আমাদের দেশে চলমান। এখনও তন্নিষ্ঠ খোঁজ থাকলে মেলায়-মোচ্ছবে বস্তুবাদী নিরীশ্বর সাধুসন্তের সন্ধান মেলে। আর বাউল-ফকিরেরা তো তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিক উভয় দিক থেকেই ঈশ্বর-আল্লা-স্বর্গ-নরক-দোজখ-বে হেস্তে আস্থাহীন। অবশ্য আমাদের মতো ছাপোষা মানুষের মাথায় এই ধাঁধাটা কোনোভাবেই ঢুকবে না যে, ঈশ্বর-আত্মা-স্বর্গ-নরক না-মেনেও মানুষ কীভাবে এমন অনিকেত-জীবন বেছে নিতে পারে !
পঞ্চম আচার্য হং-জেন-এর জীবনকাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক চমকপ্রদ জন্মান্তরবাদের বৃত্তান্ত। Denkoroku বা Transmission of The Dharma Jewel নথিতে এই অভিনব জন্মান্তর-কথা লিপিবদ্ধ আছে। আচার্য হং-জেন পূর্বজন্মে ছিলেন একজন তাওবাদী ভবঘুরে। তাওবাদ (Taoism) চিনদেশের অন্যতম প্রাচীন এক প্রায়োগিক দর্শন, যাকে ধর্মমত হিসাবেও চিহ্নিত করা যায়। লাও ৎজে (Lao Tze) প্রণীত তাও তে চিং (Tao Te Ching) এই মতের প্রথম লিখিত নিদর্শন। প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে থেকে যৌগিক ক্রিয়াকলাপের চর্চা, বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ও ভেষজ দ্রব্যের ব্যবহার ইত্যাদির মাধ্যমে তাওবাদীরা দীর্ঘ ও নীরোগ জীবন লাভের সাধনায় ব্যাপৃত থাকতেন। তাওবাদী জন্মে হং-জেন-এর নিবাস ছিল পূর্ব চিনের হুয়াংমেই পরগনার চিচৌ নামক স্থানে। অল্পবয়স থেকে গাছ লাগানোর এক নেশা তাকে পেয়ে বসে। বয়স বাড়ে কিন্তু নেশা যায় না, বরং বাড়তে থাকে। ভবঘুরে জীবনে গাছেরাই তাঁর সংসার হয়ে ওঠে। একদা হুয়াংমেই-এর পার্বত্য অঞ্চলে গাছ লাগিয়ে বেড়ানোর সময় তিনি চতুর্থ আচার্য তাও-সিন-এর সম্মুখীন হন। তাও-সিন-কে দেখে তিনি বিনীত প্রার্থনা নিবেদন করেন, আপনি দয়া করে আমাকে বোধিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণা দিন। তাও-সিন বলেন, আপনি ইতিমধ্যে পৌঢ়ত্বে উপনীত হয়েছেন। আপনাকে আমি বোধি-সংক্রান্ত ধারণা দিলে তা আপনি কাজে লাগানোর মতো সময় পাবেন না। এ জন্মটা তো আপনি বহাল তবিয়তেই কাটিয়ে দিয়েছেন, আপনি বরং পরের জন্মে আমার কাছে আসবেন। আমি আপনার প্রতীক্ষায় থাকব। কথাবার্তা আর এগোয় না। তাও-সিন হন হন করে এগিয়ে যান। পৌঢ় তাওবাদীও পুনর্জন্ম নেওয়ার জন্য উপযুক্ত জঠরের সন্ধানে বেড়িয়ে পড়েন। যেতে যেতে তিনি এক নদীর তীরে পৌঁছান। পথ শেষ নদী পার হতে হবে। হঠাৎই পৌঢ় দেখেন, এক যুবতী নদীতে কাপড় ধুয়ে সেগুলি পাড়ে মেলে দিচ্ছেন। সেই যুবতীকে তাঁর খুব মনে ধরে। তিনি তাঁর কাছে গিয়ে কোনোরকম ভণিতা ছাড়াই অকপটে বলেন, আমি আপনার গর্ভে জন্ম নেওয়ার জন্য আজ রাতে আপনার সঙ্গ পেতে চাই। পৌঢ় আগন্তুকের প্রস্তাব শুনে যুবতী তো অবাক! সে বলে, বাড়িতে আমার দাদা আর বাবা আছে, আপনি বরং আমার সঙ্গে চলুন তাঁদের কাছে প্রস্তাব রাখুন। পৌঢ় সপ্রতিভভাবে জানান, কারোর অনুমতি নেওয়ার ইচ্ছে আমার নেই। আমি আপনার কাছে প্রস্তাব রেখেছি আপনি সম্মতি দিলে আপনার সঙ্গে আজ রাতটা থেকে যাব; আপনি অসম্মত হলে আমি এই মুহূর্তে এই স্থান ত্যাগ করব। পৌঢ়ের কথায় বোধহয় জাদু ছিল বা অন্যকিছু ! নচেৎ কেন বা সেই যুবতী অচেনা এক পৌঢ়ের সঙ্গে নির্জন নদীতীরে রাত্রিযাপনে সম্মত হবে ! পৌঢ় তাঁর কথা রাখলেন, সকাল হতেই তিনি সেই স্থান ত্যাগ করে চললেন অনির্দেশ্য কোনও গন্তব্যে। যুবতীও ফিরলেন তাঁর বাড়িতে। কয়েকদিন পরে যুবতী অনুভব করলেন তিনি সন্তানসম্ভবা। বিষয়টা জানাজানি হতে বেশি সময় লাগল না। যুবতী তাঁর বাড়ি থেকে বিতাড়িত হলেন। একটি কুটিরে আশ্রয় নিয়ে তিনি কাপড় বুনে কোনোরকমে দিন গুজরান করতে থাকেন। যথাসময়ে তিনি এক সর্বাঙ্গসুন্দর ফুটফুটে পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। কিন্ত এক তীব্র ঘৃণায় সেই নবজাতককে তিনি কুটিরে ত্যাগ করে পালিয়ে যান। কিন্তু পরের দিন শিশুটির পরিণতি দেখার জন্য ফিরে আসেন। আর আশ্চর্য হয়ে দেখেন শিশুটি দুটি সারমেয় শাবকের সাথে দিব্যি খেলে বেড়াচ্ছে। সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঘুচিয়ে তিনি পরম মমতায় শিশুটিকে বুকে তুলে নেন।
পিতৃপরিচয় না-থাকায় শিশুটি সামাজিক অবজ্ঞার শিকার হয়, তাঁর মাও নিজের বৃত্তি হারিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নিতে বাধ্য হন। এইভাবে অভাবে অনাদরে বেড়ে উঠতে থাকে শিশুটি। একদিন চতুর্থ আচার্য তাও-সিন-এর নজরে পড়ে সে, তার তখন সাত–আট বছর বয়স, কোনও কোনও নথি অনুযায়ী বারো। পথ-বালকের অনিন্দ্যসুন্দর অবয়ব দেখে থমকে যান চতুর্থ আচার্য। তিনি ছেলেটিকে সস্নেহে কাছে ডেকে নেন, নাম জিজ্ঞাসা করেন। অতঃপর দুজনের মধ্যে শুরু হয় অলোকসামান্য কথোপকথন।
– বালক, তোমার নাম কী ?
- আমার একটা নাম আছে, তবে তা স্থায়ী নয়।
- নামটি শুনি ।
- বুদ্ধ-প্রকৃতি ।
- সত্যিই কি তোমার অন্য কোনও নাম নেই।
- নাম তো শূন্য, ও নিয়ে আমি মোটেও মাথা ঘামাই না।
তাও সিন-এর বুকের থেকে যেন পাথর নেমে যায়। এতদিনে তিনি তাঁর অন্বিষ্টকে নাগালে পেলেন। তিনি বালকের সঙ্গে তাঁর মায়ের কাছে গেলেন। তাঁর মায়ের গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা করে তিনি সেই বালককে নিয়ে এলেন তাঁর পাহাড়তলির মঠে।
এই আখ্যান কি আক্ষরিক অর্থে কোনও জন্মান্তরবাদের ঘটনাকে আমাদের সামনে তুলে ধরছে ? অথবা এই আখ্যান কি জন্মান্তরবাদীদের সন্তুষ্ট করতে সক্ষম ? দুটি ক্ষেত্রেই না-বাচক উত্তর আসবে। কারণ জন্মান্তর বা পুনর্জন্ম বলতে আমরা বুঝি মরে আবার জন্ম নেওয়া। অর্থাৎ, মৃত্যুর সময় একটি দেহ থেকে যে আত্মাটি বেরিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই আত্মাটি যখন কোনও গর্ভস্থ ভ্রূণের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে ক্রমপরিণতিতে নবজাতক হিসাবে ভূমিষ্ঠ হয়, কেবল তখনই বিষয়টিকে জন্মান্তর বা পুনর্জন্ম হিসাবে দেখানোই শাস্ত্রসম্মত। কিন্তু এক্ষেত্রে আত্মা স্থানান্তরের কোনও ঘটনাই ঘটেনি। তা হলে এমন ঘটনাকে প্রামাণ্য চ্যান-নথিতে জন্মান্তর বলার কারণ কী ? এর উত্তর পেতে আমাদের সুদূর চিনদেশে দৌড়াতে হবে না, উত্তর আমাদের বাড়ির পাশেই আছে। আমাদের দেশের বস্তুবাদী সাধুসন্ত ও বাউল-ফকির-সহজিয়ারা সন্তানের জন্ম দেওয়াকে জন্মান্তর বা পুনর্জন্ম বলেন। তাঁরা বলেন পুনর্জন্ম মানেই মায়ার ফাঁদে পা দিয়ে দুঃখ-দুর্দশাকে আমন্ত্রণ জানানো। তখন সাধক আত্মজ্ঞানের পথ থেকে ভ্রষ্ট হয়ে আত্ম-প্রতিভূকে প্রতিষ্ঠা দিতে গিয়ে আত্মহারা হয়ে পড়েন। তাই তাঁরা সাধনসঙ্গিনী গ্রহণ করলেও সন্তান-গ্রহণে বিরত থাকেন। আর শাস্ত্রকথিত অনুমাননির্ভর জন্মান্তর তথা পুনর্জন্মকে তাঁরা উপহাসে উড়িয়ে দেন। চ্যানধারাও এই বস্তুবাদী জন্মান্তরকেই গ্রহণ করেছে। আর সেই তত্ত্বই এই আখ্যানের মাধ্যমে ব্যাখ্যাত হয়েছে।
হং-জেন, খুব অল্প বয়সেই পঞ্চম আচার্য তাও -সিন-এর পতোউ (Potou) উপত্যকার ঝেংজুই (Zhenjue) মঠে নবিশি শুরু করেন। তিনি প্রায় পাঁচ দশক গুরু তাও-সিন-এর সান্নিধ্যে থাকেন। তাও-সিন প্রথম দর্শনেই বুঝেছিলেন এই বালকই একদা হয়ে উঠবেন চ্যানধারার সম্মানীয় আচার্য। হং-জেন-এর জ্ঞানস্পৃহা, ধ্যান-তন্ময়তা কোনও কিছুই তাও-সিন-এর নজর এড়ায়নি। তিনি প্রিয় শিষ্যকে অধীত বিদ্যা উজাড় করে দেন। উপযুক্ত আধার বুঝেই হং জেন-কে তিনি ক্রম-বোধি ( Gradual Enlightment) ও হঠাৎ বোধি ( Sudden Enlightenment), এই দুই ধরনের বোধির জ্ঞান দান করেন। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে তাও-সিন, প্রিয় শিষ্য হং-জেন-কে একটি স্তূপ নির্মাণের অনুরোধ করেন। শিষ্য বোঝেন গুরুকে আর বেশিদিন ধরে রাখা যাবে না। একদিন সকলের অগোচরে তাও-সিন প্রিয় শিষ্যের হাতে পরম্পরিত চীবর ও ভিক্ষাভাণ্ড তুলে দেন। এইভাবে তাও-সিন, প্রিয় শিষ্য হং-জেন-কে পঞ্চম আচার্য হিসাবে নির্বাচন করেন। কয়েকদিন পরেই তাও-সিন উপবিষ্ট অবস্থায় নির্ভার মনে মহাপ্রস্থানের পথে পা রাখেন।
গুরু প্রদত্ত দায় শিরোধার্য করে হং-জেন নিজস্বতার খোঁজে বেড়িয়ে পড়েন। বেশিদূর যেতে হয় না, সুয়াংফেং (Suangfeng) পর্বতের ফেংমাও (Fengmao) উপত্যকায় তিনি পেয়ে যান অভীষ্ট সাকিন; নির্মাণ করেন তাঁর নিজস্ব চ্যানমঠ। একদিন তিনি খবর পান অদূরের রাও (Rao) নামের গঞ্জটিতে কী একটা পরব চলছিল, সেখানে কুখ্যাত জঙ্গলদস্যু কে-দাহান ( Ke Dhan) তার দলবল নিয়ে হানা দিয়েছে। অকুতোভয় হং-জেন একাই পৌঁছে যান দস্যুকবলিত গঞ্জে। দীর্ঘদেহী সুঠাম চেহারার ভিক্ষুকে দেখে দাহান ও তার দস্যুদল নিজেদের মধ্যে কানাকানি করে তারপর অকুস্থল ত্যাগ করে। থমকে যাওয়া গঞ্জে আবার উৎসবের মেজাজ ফিরে আসে। গুরু তাও-সিন-এর মতো হং-জেনও অনতিবিলম্বে খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন। তাঁর মঠে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। চৈনিক নথি অনুয়ায়ী এই সংখ্যা পাঁচশ বা সাতশ। হং-জেনও গুরুর মতো ক্রম-বোধি ও হঠাৎ বোধি; এই দুইপ্রকার বোধি সম্পর্কিত ধারণা শিষ্যদের সামনে তুলে ধরেন। গুরুকে অনুসরণ করে তিনিও লঙ্কাবতার সূত্রের সঙ্গে মহাপ্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র ও বজ্রচ্ছেদিকা সূত্রের চর্চা শুরু করেন। অচিরেই চ্যানগুরু হিসাবে হং-জেন-এর নাম রাজসভা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তাং বংশীয় সম্রাট গাওজং (Gaozong : 628-683) দূত মারফত তাঁকে রাজসভায় ডেকে পাঠান। ডেকে পাঠালেই হল, কার শিষ্য দেখতে হবে তো ! তাঁর গুরু কোনোদিন রাজাজ্ঞাকে পাত্তা দেননি, তিনি কীকরে গুরুর আদর্শ লঙ্ঘন করেন ! শেষমেশ হং-জেন-এর জেদের কাছে নত হয়ে সম্রাট গাওজং ডংশান মঠের একগুঁয়ে অধ্যক্ষের জন্য উপঢৌকনসহ খাদ্যসামগ্রী ও ঔষধপত্র পাঠিয়ে দেন।
হং-জেন একদা, ষষ্ঠ আচার্য নির্বাচনের জন্য বুদ্ধ-প্রকৃতির স্বরূপ-নির্ণায়ক একটি শ্লোক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। তখন তিনি ষাটোত্তীর্ণ। মঠের সকলের মতো তিনিও জানতেন, প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করে শেনজিউ-ই হবেন ষষ্ঠ আচার্য। কারণ অনুগামীদের মধ্যে শেনজিউ ছাড়া ওই গুরুভার কে বহন করবে ! সে যেমন বয়োজ্যেষ্ঠ, তেমন প্রাজ্ঞ। কিন্তু এই হিসাব মেলে না। মাত্র কয়েক মাস আগে দক্ষিণ দেশ থেকে আসা এক অকুলীন নিরক্ষর কাঠুরে হুইনেং একটি শ্লোক লিখে ভবিতব্য বদলে দেন। কিন্তু হং-জেন বোঝেন, প্রকাশ্যে হুইনেং-এর হাতে পরম্পরিত চীবর ও ভিক্ষাভাণ্ড তুলে দিয়ে তাঁকে ষষ্ঠ আচার্য হিসাবে স্বীকৃতি জানালে তাতে সহজসরল গ্রাম্য কিশোরটির জীবন বিপন্ন হতে পারে। তাই তিনি এক রাত্রে হুইনেং-কে ষষ্ঠ আচার্যের পদে অভিষিক্ত করেন। শুধু তাই নয় তিনি পথপ্রদর্শক হয়ে হুইনেংকে সঙ্গে নিয়ে দুর্গম পার্বত্য পথ পার হয়ে তাঁকে নৌকায় চাপিয়ে নদী পার করে দেন। পরম্পরিত চীবর ও ভাণ্ড সুযোগ্য শিষ্যের হাতে পৌঁছে যাওয়ায় হং-জেন এবার সমস্ত দায়দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চান। তিনি ভিক্ষু শুয়াংজে (Xuanze)কে একটি স্তূপ নির্মাণের কথা বলেন। শাংয়ুইয়ান অব্দের দ্বিতীয় মাসের একাদশতম দিন, খ্রিস্টীয় হিসাবে ৬৭৫ অব্দ, হং-জেন তখন চুয়াত্তর ; সদ্য সমাপ্ত স্তূপের নিকটে তিনি ধ্যানে বসেন, আর ওঠেন না।
তথ্যসূত্র :
১. ভগবান বুদ্ধ, ধর্মানন্দ কোসম্বী, সাহিত্য অকাদেমি ২০১২
২. মধ্যম নিকায়, বেনীমাধব বড়ুয়া, ত্রিপিটক বোর্ড কলকাতা ১৯৪০
৩. THE MIDDLE LENGTH DISCOURSES OF THE BUDDHA : A TRANSLATION OF THE MAJJHIMA NIKAYA, TRANSLATED BY BHIKKHU NANAMOLI AND BHIKKHU BODHI, WISDOM PUBLICATION 1995.
৪. DENKOROKU; THE RECORD OF THE TRANSMISSION OF THE LIGHT BY KEIZAN JOKIN ; TRANSLATED BY HUBART NEARMAN, OBC SHOSTA ABBEY PRESS , CALIFORNIA .
৫. HISTORY OF ZEN BY YU-HISIU KU; SPRINGER, SINGAPORE.
৬. THE A TO Z OF BUDDHISM BY CARL OLSON, THE SCARECROW PRESS , UK.
৭. ZEN MASTERS OF CHINA : THE FIRST STEP EASTBY RECHARD BRYAN MC DANIEL; TUTTLE PUBLICATION, TOKYO/ VERMONT/ SINGAPORE.
৮. ZENS CHINESE HERITAGE BY ANDY FERGUSON ; WISDOM PUBLICATION, BOSTON.
৯. THE ILLUSTRATED ENCYCLOPEDIA OF ZEN BUDDHISM BY HELEN J. BARONI ; THE ROSEN PUBLICATION GROUP , NEW YORK
১০. THE EMINENT MONK BY JOHN KIESCHNICK, A KURODA INSTITUTE, UNIVERSITY OF HAWAI PRESS, HONOLULU.
ছবি : বিধান দেব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন