মঙ্গলবার, ২৯ জুন, ২০২১
সম্পাদকের কথা
আকাশ কিছুটা ঘোলাটে। মাঝে-মধ্যেই ঋতুরানি বর্ষা তার চঞ্চল কটাক্ষে আমাদের মোহিত করছে। আমরা যারা তার প্রেমিকপ্রবর তাকে পেয়ে খুশি। কিন্তু কিছুটা বিচলিত, বিভ্রান্তও। পৃথিবী এখনও পুরোপুরি সচল ও স্বাভাবিক নয়। এই পরিস্থিতিতে সাহিত্য সংক্রান্ত যে কোনও উৎসব অনুষ্ঠান বন্ধ। দুয়ারে খিল দিয়ে কত আর মন ভালো রাখা যায়! এই অবস্থার কাছে আমরা অসহায়। জীবনের দাবি অনেক। তবে সবচেয়ে বড় দাবি তার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা। আমরা এখন সেই কাজে ব্যস্ত। এই অতিমারির মধ্যে আগত ইয়াসের প্রভাবে জলমগ্ন ও সর্বস্বহারা আমাদের রাজ্যের বেশ কিছু এলাকা। মানুষ বড় কাঁদছে। সেই সঙ্গে চলে গেলেন আমাদের প্রিয় কবি গৌতম বসু ও সুব্রত ভুঁইয়া। সুব্রতদা ডায়মন্ডহারবারের মানুষ । কিছুটা হলেও তাঁর সঙ্গ পেয়েছি। কবি দীপক হালদার ও বলরাম বাহাদুরের সঙ্গে একযোগে ডায়মন্ডহারবার থেকে এক সময় সম্পাদনা করেছেন অর্কেষ্ট্রা নামক সাহিত্য পত্রিকা। আমরা এঁদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আর একটি সংখ্যা প্রকাশিত হলেই সাহিত্যের বেলাভুমি ব্লগ তার এক বছর পূর্ণ করবে। মাঝে-মধ্যেই ভেবেছি এক বছর পূর্ণ করে এই প্রকাশ বন্ধ করে দেব। আবার বন্ধুদের নতুন নতুন লেখার ইচ্ছাকে সাগ্রহে গুরুত্ব দিয়ে ভাবি এগিয়ে যাব। যে কোনও পরিস্থিতিতেই আমাদের আনন্দিত থাকতে হবে। ভালো থাকা মন্দ থাকার কোনওটিই যেন আমাদের আনন্দসত্তাকে টলাতে না পারে।
গদ্য : সুবীর সরকার
অঞ্চলকথা
১.
রংপুরের গান কি দিনাজপুরের গানের সঙ্গে জায়গা বদল করছে।না কি দিনাজপুরের গান পথ হারিয়ে ঢুকেই পড়ে রংপুরের গানের গহীনে।গানের এই জায়গাবদল নিয়ে ভাবতে বসলেই গানের মোহনমায়া ঘিরে ধরে।গান তো জায়গা বদল করতেই পারে।জায়গা বদলালে স্থান কালও বদলাতে পারে।তবে কি রংপুরের গানের বর্ণময়তায় লিপ্ত হতে পারে দিনাজপুরের গান।গান তো কেবলমাত্র গানই থাকে না,বিশেষত লোকগান;গানের কথা সুর বাজনার খুব অন্তরপ্রদেশ থেকে কেবল উঠে আসতে থাকে অন্তহীন সব মানুষেরা।মানুষ তো কেবলমাত্র মানুষই নয় যে তার দেশকাল হাটগঞ্জ আমোদপ্রমোদ জীবনযাপনের খুঁটিনাটি ভাষাবিন্যাস লোকাচার বাঁচবার প্রকৌশল সব সমস্তসহই তুমুল জীবন্ত হয়ে উঠতে থাকে।গানের ভিতর দিয়ে সে তার আঞ্চলিকতাকে যথার্থই চূড়ান্ত আঞ্চলিক করে তোলে।তাই রংপুরের গানের প্রবাহে প্রবাহিত হতে হতে রংপুর তার মানবজীবনের পানসি ভাসায় দিনাজপুরের ঘাটে।আবার অঞ্চলকথা নিয়ে দিনাজপুরও মিশে যায় রংপুরে।এই চলাচলটুকু ভ্রান্তির সীমাপরিসীমায় ধাক্কা খেতে খেতে রংপুরের গানের ভেতরকার গাড়িয়ালভাই ও গরুর গাড়ির চাকার যান্ত্রিক শব্দের চাপানউতোর নিয়ে দিনাজপুরের দিকে,দিনাজপুরের গানের দিকে যেন আশ্চর্য এক বাওকুমটা বাতাস হয়ে ঘুরে ঘুরে মরে।রংপুরের গানটি হাহাকার ছড়িয়ে দেবে দিনাজপুরের গানের পল অনুপলে।
২।
জায়গাবদল কিংবা স্থানবদলের প্রেক্ষিত স্পর্শযোগ্য এক কালখন্ডের ধাক্কায়,ধাঁধায়,ধরাছোঁয়ার অনির্নেয় কোন নিরপেক্ষতায় আশ্রয় খুঁজে পেতে চাইলেও গানের সুর তাল দিয়ে আমরা তো আদতে গানটিকেই ছুঁতে পাবার চেষ্টা করবো।রংপুরের গানের নিজস্বতায় কখন যেন আলগোছে দিনাজপুরিয়া গানের মাত্রা ও লয় এসে আছড়ে পড়বে সেই সামান্য মরমীয়া জীবনযাপন কিংবা দর্শনাশ্রিত যাপনের গাম্ভীর্যতায় কবেকার হারিয়ে যাওয়া চিলমারীর বন্দর তুষভান্ডারের বড় হাট দিনাজপুরের জমিদারের ধানগোলা গরুচুমানী গানের আসর বাঁশিয়ালের সুরের আবহে ভিনদেশী কোন মেজাজই বা এনে দিতে পারে।জীবনের গুঢ় কোন রহস্যময়তাই এক্ষেত্রে বড় হয়ে দেখা দিতে পারে যা অপেক্ষাকৃত দার্শনিক হয়ে প্রানান্তকর প্রচেষ্টায় কখন যেন গলাগলি হাঁসের মতো হাসির মতো দিনাজপুরের গান ভেঙে,গড়িয়ে নামে রংপুরীয়া গানের গোলকে।
৩।
উড়ে যাওয়া মেঘের নীচে মেঘেদের জটজটিলতায় সে কি শুনতে পায় কবেকার বাঘের ডাক।আদিঅন্তহীন জলজঙ্গলের ভিতর দিয়ে বহুধাব্যপ্ত নিসর্গের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ানো সেই সব বাঘেদের অস্ত্বিত্ব-অনস্ত্বিজাত ডাকগুলিও কেমন আত্মগত হয়ে ওঠে।সে তো ইতিমধ্যেই দেখেও ফেলে বিষ্মরণফেরত বাঘেদের নিঃসঙ্গ হেঁটে যাওয়া।দূরাগত বাঘের ডাক দিয়ে আস্ত এক বাঘভান্ডারই বুঝি নির্মিত হয়ে যায়।বাঘেদের ডোরাকাটা শরীরে দুপুররৌদ্র রৌদ্রপ্লাবনের গাম্ভীরর্যকে অসামান্য এক উজ্জ্বলতায় পৌঁছেই দেয় এমত ধারণাজাত কোলাহলে অরণ্যভূমের শাল জারুল শিমুল বৃক্ষরাজির সন্নাসীসুলভ মগ্নতায় বাঘেদের চোখে বারবার লেপ্টে যেতে থাকে জীবনমরণের এক ঘোর।মেঘের নিচে আলো ও অন্ধকারের যৌথতায় সংলাপবহুল কোন নাট্যকাব্যই যেন সমগ্রের চিরকুটবাহিত অংশ হয়ে একসময় সমগ্রতাকেই লজ্জিত করে ফেলতে থাকে।বাঘের থাবার নিচে ব্যাঘ্রশাবকের নিশ্চিন্ত নিদ্রার দৃশ্য নদীজলনিসর্গের ধারাবাহিকতায় অমোঘ এক ছায়াদৃশ্যই রচনা করে ফেলে যার বৈ্ধতার বাধ্যবাধকতায় অকালবর্ষণের এক পৃথিবীর জাগরণ পরবর্তী সহজতায় মাইল মাইল হাওয়াসমুদ্রের প্রচলিত লোকাচার লোকনাচের বিরহকালীন বিপন্নতায় কেবলই থিতু হয়,থিতু হতে থাকে।ঝোপঝাড়ে,ঝোরা নালা নদীর বহুবর্ণিল প্রবাহের গহনপ্রদেশে ডুবে যেতে যেতে লুপ্ত সময়পট থেকে বাঘের অতিবৃহৎ তর্জন গর্জন সমেত ফিরে ফিরে আসতে থাকে আর আকাশজোড়া পাখিদের উড়ে যাওয়ার দৃশ্যটিকে সংহত হতে দেবার অবকাশটুকুও না দিতে চেয়ে ধারাবাহিক জেগে ওঠে ভেসে ওঠে কেবলই বাঘের ডাক।
ধারাবাহিক গদ্য : দীপক হালদার
ধারাবাহিক গদ্য : অভিজিৎ দাশগুপ্ত
১৯.
৩৪.
মাঝখানে নদী গিরি, মাঝখানে তুমুল সভ্যতা।
তবু আজ সারা রাত তোমার জন্যই জেগে আছি।
তুমি কি কোথাও আছ,সত্যি-সত্যি কোনো বন্ধ
ঘুম ভেঙে ব্যালকনিতে দাঁড়ালে কি
রক্তলাল টেলিফোন দেখে লোভ হল?
--- সবই তো নিয়েছ, নাও। নিরঙ্কুশ এই শূন্য,
একেও কি নেবে ?
দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'ভোররাতের দেবী ' বইটির '৩৪' সংখ্যক কবিতা পড়তে পড়তে দুটো ছবি ভেসে ওঠে । যতবার পড়ি ততবারই ওই ছবি দুটি দেখতে পাই । কোনভাবে তাদের সরাতে পারি না । বা অন্য কোনো দৃশ্যে যে পৌঁছে যাব , তাও সম্ভব হয় না। তাহলে এখন প্রশ্ন ; কি সে ছবি!
যদি প্রথম ছবির কথায় আসি , সেখানে প্রকৃতির এক বিরাট বিপর্যয় চোখের ওপর ভেসে ওঠে । ২০১৩ সালে উত্তরাখণ্ডের সেই ভয়ঙ্কর বিপর্যয়। হিমবাহ ভাঙার কারণে চামোলি জেলা সম্পূর্ণ প্লাবিত হয় । ধৌলিগঙ্গার জলের স্তর বেড়ে যায়। তারপর তার যে ভয়ঙ্কর রূপ --- সে সমস্ত আমাদের এতদিনে জানা হয়ে গেছে । কিন্তু প্রশ্ন ; এই কবিতার সঙ্গে তার সম্পর্ক সূত্র কোথায় ? কোন পংক্তিতে ধরা আছে অমোঘ সেই বিপর্যয়ের দৃশ্য!
কবিতার প্রথম দুটি পংক্তি ! কতবার পড়েছি। তবু প্রাকৃতিক বিপর্যয় ছাড়া আর কোন ছবি ভাবনায় আসেনি । গিরি কন্দরের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসা নদী তৈরি করেছে তুমুল সভ্যতা । তাকে কেন্দ্র করেই মানুষের এত আয়োজন । কিন্তু সেই সভ্যতার বিষটুকু একসময় গিলতে শুরু করে মানুষকে । তাই যার জন্য মানবের সভ্যতা প্রাণ পেয়েছে, সেই প্রকৃতির রোষেই সারারাত জেগে থাকতে হয় মানুষকে । অসহায় , শঙ্কিত , মৃত্যুভয়ে দীর্ণ মানুষ জেগে থাকে শুধুই নিজের কৃতকর্মের জন্য।
প্রকৃতির এমন অনুষঙ্গই তৃতীয় পংক্তিতে এসে মোড় নেয় । নিতে হয়। নদী, গিরি, তুমুল সভ্যতা মাঝখানে অবস্থান করে বুঝিয়ে দেয় তার প্রকৃত আশ্রয় প্রেম । এবং সে প্রেম বহুদিন আগে চলে যাওয়া সম্পর্কের অসহনীয়তা । অতীতকে মুছে ফেলতে চেয়েও যা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বিভিন্ন ভাবে । তৃতীয় পংক্তি থেকে কবিতাটি আমার কাছে অন্য এক কৃষ্ণগহ্বর ছুঁয়ে থাকে। একান্তই ব্যক্তিগত ; তবু এমন অভিজ্ঞতা অথবা প্রতীকী ভাষা আরো অনেকের জীবনেই ঘটে। এই আটপৌরে জীবনে প্রেম-ই বাঁচিয়ে রাখে ভোরের শিশির । সে প্রেম নতুন হতে পারে , অথবা পুরোনো। কখনো তা বর্তমান , তো কখনো অতীত।
মোবাইল ছিলো না । হোয়াটসঅ্যাপ , ফেসবুক কল্পনারও অতীত । শুধু ওই লাল অথবা ধূসর টেলিফোনটুকুই ভরসা । সেই চলে যাওয়া প্রেম কি তাকে দেখে লোভাতুর হয় ! নাকি রক্তক্ষরণ ! সেও তো একই অসুখে আচ্ছন্ন । অস্তিত্বের সঙ্গে লড়াই করে আমাদের বেঁচে থাকা । অঙ্গারকে ধুয়ে-মুছে রাখি বিশল্যকরণী ভেবে । নিরঙ্কুশ শূন্যতাও একসময় ভালো লাগতে শুরু করে । জারিত হই বিশ্বাসের স্তরায়ণে।
এই কবিতা শেষ পর্যন্ত একটা প্রসন্নতার দিকে নিয়ে যায় আমাদের । বাতাস -রোদ -আলোর মিলিত উদ্ভাস যেন সে । শুধু তার মুখোমুখি হতে হবে। হতে হবে কষ্টসহিষ্ণু । কবির ব্যক্তি-উচ্চারণ পরিসীমা ছেড়ে চলে আসে পাঠকের নিবিড় আলপথে । সে তখন একা ; একাকী ! তার হেঁটে যাওয়ার মধ্যে ধ্বনিত হয় হাজার বছর ধরে লেখা বাংলা কবিতার ম্যাজিক । কবি এবং পাঠক --- দুজনেই আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সেই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতায়।
২০.
রসায়ন
তোর ডান হাত ধরি পিতার মতন নির্ভয়ে
বাঁ-হাতটি যদিদং স্বামীদের।
প্রপিতামহের মতো স্নেহশীল তুই,
ঘর-গেরস্থালি ঠিক মায়ের মতন।
রোজ রাতে নীল ফানুসের মতো ফাঁপা গোল
আলো তৈরি হয়।
তার নীচে নির্ভয়ে ঢুকে যাস
রং চমকানো শ্বেতপাথরের
খুব ছোটো গম্বুজ খিলানে
ঘষটানো বকুলের তীব্র ঝাঁঝ ওঠে।
হাতে তোর সোনার গোলক থাকে দু-রকম
নরম কামনা বল।
দু-পায়ের মাঝখানে কালো ঘাসে পোঁতা
সোনার মশাল জ্বালিয়ে নারীত্ব পুড়িয়ে দিস।
লালচে ফলের বোঁটা দাঁতে কামড়ে
তারপর তুই হোস আমার সন্তান।
তোর ডান হাত ধরি পিতার মতন নির্ভয়ে।
কবিতাটির নাম ' রসায়ন ' । কবি দেবাঞ্জলি মুখোপাধ্যায় । যিনি জন্মেছিলেন এই কলকাতায় ১৯৫৫ সালে । আর চলে গেলেন ১৯৯৬ । মাত্র ৪০ বছরের আয়ু নিয়ে এসেছিলেন । ভৌগোলিক আর নৈসর্গিক চেতনা তাঁর কবিতায় আলোজ্বলা হয়ে দেখা দিত । জীবন চর্চাই ছিল দেবাঞ্জলির
অভিজ্ঞান । কিন্তু ওই নদী পাহাড় অরণ্য বা সমুদ্র সৈকত --- এতেই কি সব বিস্ময়ের অবসান ঘটাতেন তিনি । তা হয়তো নয় । নইলে 'রসায়ন '( 'পাতার মানবী ') নামে যে কবিতাটি এইমাত্র পড়লাম, তার অন্তঃস্থল অনুসন্ধান করব কীভাবে!
বেটি ফ্রিডান ১৯৬৩ সালে একটি বই লেখেন।
' দি ফেমিনিন মিস্টিক '। আলোড়ন ওঠে । বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন নারীদের অসুস্থতা, অস্থিরতা, ব্যাকুলতার কথা তিনি তুলে ধরেন সেই গ্রন্থে । নারীদের এ সমস্ত সমস্যা ছিল নামহীন । নারীরা মনে করত তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই , তারা যেন বেঁচে মরে আছেন ।
এটা কি শুধুই মার্কিন নারীদের সমস্যা ! নাকি পৃথিবীর সব দেশের সব নারীদেরই এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় প্রতিনিয়ত।
'রসায়ন ' কবিতাটি যতবার পড়বেন , ভিন্ন ভিন্ন ইমেজ সামনে আসবে । কখনো নারী, কখনো সন্তান , কখনো পুরুষ । কিন্তু সামগ্রিকতা দিয়ে যদি দেখি তাহলে অবশ্যই একে নারীর জীবন- ইতিহাস বলা চলে অনায়াসে । পিতা-স্বামী-প্রপিতামহ এবং মা --- এরাই ঘিরে থাকে একটি মেয়ের জীবন। সেখানেই পুরুষশাসিত সমাজের কাঠামো।
একটা নীল ফানুস , যার গোলাকৃতির ভেতর শুধুই শূন্যতা । তার মধ্যে নির্ভয়ে বসবাস করতে চায় সকলে । কিন্তু " খুব ছোটো গম্বুজ খিলানে / ঘষটানো বকুলের তীব্র ঝড় ওঠে " । আসলে , মেনে নেওয়াই ধর্ম , না মানাটাই বিদ্রোহ । সোনার দু'রকম গোলক আর কাল ঘাস --- এই যেন পুরুষের চোখে নারী । এমন সাহসী উচ্চারণে-ই এই কবি তাঁর প্রতিবাদ জানিয়েছেন । অথবা জানাতে পারেননি। অবস্থার বর্ণনাটুকু দিয়েছেন মাত্র।
প্রতিদিন খবরের কাগজে নারী নির্যাতনের হাজার একটা খবর । ৮ মাস থেকে ৮০ বছর সকলেই তাতে পুড়ে যাচ্ছে । অথচ সমাজ অবিচলিত । কেউ বলছে জিন্স প্যান্ট আর টিশার্ট- এর দোষ , কেউ বলছে অতিরিক্ত মেলামেশা , আবার কারো চোখে মোবাইল- ল্যাপটপ ইত্যাদি ইত্যাদি । তাহলে মোদ্দা কথাটা কি দাঁড়ালো ! নিষ্ক্রিয় এক সত্তার অধিকারিণী করো তাকে । সংসারের সমস্ত কাজের দায়িত্ব ফেলে দাও তার কাঁধে । সে যেন মাথা তুলতে না পারে। আপন ভাগ্য জয় করবার মতো সাহস তাকে দিও
না । তাতেই মৃত্যু ঘনাবে সমাজের । বেটি ফ্রিডান তাঁর সংগীতে নারীর সেই মুক্তির কথাই বলেছিলেন। ---
" মুক্তি, মুক্তি এখন ---
ক্ষোভ আর ক্রোধের খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসছি
মুক্তি এখন।
নারীত্ব – নারীত্ব কাকে বলে ?
পুরুষত্ব --- সেটা কি ?
আমরা দু’জন সমান অংশীদার মানবতার।
মুক্তি, মুক্তি এখন ---
সময় এসেছে আমাদের সঠিক পরিচয় দেবার, আমরা মানুষ – নই শুধু নারী
মুক্তি এখন।
[ পাশ্চাত্যে নারীর ভোটাধিকারের ৫০ তম বার্ষিকী উপলক্ষে নারী আন্দোলনের জন্য বেটি ফ্রিডান রচিত সঙ্গীত। ভাষান্তর : সাগর চৌধুরী ]
তৃতীয় বিশ্বের মানুষ হয়ে অনেককাল কাটালাম। এবার সময় এসেছে সামাজিকভাবে অন্তত সঙ্গীকে কাছে ডেকে নেওয়ার । তার হাত ধরেই অর্থনীতিতে ঢেউ আসবে । আর তা না হলে ---- পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে । কবির সেই নির্মম সত্য উচ্চারণ মনে আছে তো ! শুধু কবিতার পংক্তি বলে কণ্ঠস্থ করার নয় এ ; একে মন্ত্রের মতো মাদুলি করে কন্ঠে ধারণ করার সময় এসেছে ।
ধারাবাহিক গদ্য : অরিন্দম রায়
রোজমেরি ডান
জীবনে তিনি একটিমাত্র ফুটবল ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলেন। ‘প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়েছিল সেইদিন , খেলা দেখতে খুবই অসুবিধা হয়েছিল।’ সেদিনের কথা বলতে গেলে এটুকুই তাঁর মনে পড়ে। এরপর অনেকগুলো বছর কেটে গেছে, প্রায় চল্লিশ বছর বয়সে , দুই কন্যা সন্তানের মা , রোজমেরিকে গণ্য করা হয় হাতে গোনা সেইসব কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে যাঁরা পরিচিত ‘the Stroud Football Poets’ নামে। রোজমেরি বলেন যে, ‘পুরুষ আর ফুটবল খেলা নিয়ে প্রচুর পরিমাণে লেখালেখি হয়েছে।’ কিন্তু তিনি ‘ আগ্রহী খেলাটির প্রতি মেয়েদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে , মেয়েরা কোন চোখে দেখছে ফুটবল খেলাকে সেটা নিয়ে। মাঠের বাইরে থেকে দেখার মতো। ছোটবেলায় ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সকলেই ফুটবলে লাথি মারার সুযোগ পেত। ব্যাপারটার মধ্যে একটা অসম্ভব সরলতা ছিল। কিন্তু এরপরেই একটা মুহূর্ত আসত যখন লিঙ্গভেদাভেদের গণ্ডী টেনে দেওয়া হত আর তারপর ফুটবল নামক খেলাটা পরিণত হত ছেলেদের সম্পত্তিতে।’
রোজমেরি তাঁর ‘Different for Girls’ কবিতায় স্মৃতিচারণ করেছেন শৈশবে ফুটবল খেলতে তিনি কতটা পছন্দ করতেন আর এই কারণেই মাঠের অন্য মেয়েরা ( যারা ফুটবল খেলত না) তাঁকে ‘টমবয়’ বা পুরুষালি মেয়ে বলে ডাকত। তিনি আরও বলছেন ‘একটা সময় ছিল যখন আমিও অন্যান্য মেয়েদের মতো টাচলাইনের ধারে দাঁড়িয়ে আমার বয়ফ্রেন্ডকে ফুটবল খেলতে দেখতাম আর তার জন্য কমলালেবুর খোসা ছাড়িয়ে রাখতাম যাতে সে হাফটাইমের সময় সেগুলো খেতে পারে।’ পুরুষদের আগ্রাসন আর প্রাচীন প্রবৃত্তির রোজমেরি মৃদু সমালোচক। তিনি বলেন ‘আমি পুরুষদের ঘৃণা করি না, ফুটবল খেলার সময় তাদের আচরণ আমার গোলমেলে লাগে’। তিনি তাঁর লেখায় নতুন প্রজন্মের সেইসব মেয়েদের ব্যঙ্গ করতেও পিছপা হন না ,যারা ফুটবল খেলাটা দেখে থাকে শুধুমাত্র এই কারণে যাতে তারা পুরুষ খেলোয়ারদের সুগঠিত পায়ের প্রশংসা করতে পারে। অবশ্য এরপর তিনি আরও বলেন যে ছেলেরা যদি মহিলা টেনিস খেলোয়ারদের অনাবৃত পায়ের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে পারে তাহলে এক্ষেত্রেও তিনি দোষের কিছু দেখেন না।
সম্প্রতি ‘The Trouble with Love’ নামে তাঁর একটি উপন্যাসও প্রকাশিত হয়েছে। ব্রিটেনের ব্রিস্টলে তাঁর বাড়ি। ‘City: Bristol Today in Poems and Pictures’ নামক সংকলন ছাড়াও আরও নানা কবিতা সংকলনে রোজমেরির কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।
ডেভিড বেকহ্যাম আমার পিছু নিয়েছিল
ডেভিড বেকহ্যাম আমায় অনুসরণ করে।
সুপারমার্কেটের আশেপাশে সে ঘোরাফেরা করে ,
আমাকে অরগ্যানিক জিনিসপত্র কিনতে অনুরোধ করে।
“এগুলো ভালো , এগুলো টাটকা ,”এইসব আবোলতাবোল বকে।
‘আর তুমি কি আমায় দেখেছিলে , টিভিতে , গত শুক্রবারে?’
ডেভিড বেকহ্যাম আমার পিছু নিয়েছে।
আমি সেদিন পাব-এ যাওয়ার পথে তাকে দেখেছিলাম।
“তুমি কি ব্রুকলিনে তোলা আমার ছবি দেখতে চাও?
ভিক্টোরিয়া তোমাকে তার ভালোবাসা জানিয়েছে।”
সে তার সবচেয়ে ভালো বালকসুলভ লাজুক হাসিটি হাসে।
তারপর আমাকে বলে , খুব একটা প্রাসঙ্গিক নয়:
“আমি বলটা মেরেছিলাম , আর সেটা সোজা জালের ভিতর ঢুকেছিল।”
ডেভিড বেকহ্যাম
রাতে আমার বিছানায় গুটিসুটি মেরে ঢোকে।
“সুইট ড্রিমস , ছারপোকাদের তোমায় কামড়াতে দিও না।”
তারপর সে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায় ,
প্রথমে তার শরীর , তারপর তার কান , যতক্ষণ পর্যন্ত তার হাসিটা
ওইটুকুই পড়ে থাকে।
একটা চেশায়ার বিড়াল ফুটবল খেলার দুটো পা সমেত।
আমি তার কানে ফিসফিস করে বলি: শুভরাত্রি ডেভ।”
এটুকুই , এর মধ্যে অশালীন কিছু নেই।
সে নিছকই আমার শীর্ষস্থানীয় বন্ধুদের মধ্যে একজন ,
আশ্চর্যজনকভাবে অযৌন ।
ভিক্টোরিয়া বেকহ্যাম , ডেভিড বেকহ্যামের স্ত্রী । ‘স্পাইস গার্লস’ নামক বিখ্যাত ব্যান্ডের অন্যতম সদস্য।
ধারাবাহিক গদ্য : চন্দন মিত্র
সোমবার, ২৮ জুন, ২০২১
কবিতা : প্রাণজি বসাক
কবিতা : সায়ন রায়
হাসপাতালে প্রেম
ডেটলের গন্ধ আজ রজনীগন্ধার হাসি নিয়ে ঝরে পড়ছে তোমার মুখে।
প্রিয়তমা, তোমায় ভালবাসি।এটা বিনোদন পার্ক নয়।নয় নির্জন
নদীর ধার। ৪টে ৫টার ভিজিটিং আওয়ারে আমরা চালাচ্ছি
প্রেমালাপ।দূর বহুদূর থেকে ভেসে আসছে ঘন্টাধ্বনি। পাহাড়
চুড়োয় কোনো ত্রিকালদর্শী দেবতার মন্দিরের নয়।সময় শেষের
ঘন্টি।মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে আসে।খরস্রোতা নদীর মত বয়ে যায় সময়।
আমাদের আয়ু বাড়ে। কথা ফুরোয় না।মর্ত্যের এক অতিসাধারণ
দ্বাররক্ষী এসে ঘোষণা দিয়ে যান। যিনি পারিজাত দেখেননি।
বাইরের দূষিত হাওয়ায় আমার হাত ভিজে আছে।না,তোমার হাত
ছোঁব না। বিদায় প্রিয়তমা।আজ যেখানে শেষ করলাম,কাল আবার
সেখান থেকেই শুরু হবে আমাদের খোঁজ।
২.
তোমার ক্যাথিটার খোলা হলে যে আনন্দ হয় প্রিয়তমা, এখন মনে
হয়, প্রথম চুম্বনে তা অধরাই ছিল।তোমাকে এভাবেও পাবো ভাবিনি
কখনো। নড়বড়ে সাঁকো দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি আমরা। আর কুয়াশার
চাদরে ঢেকে যাচ্ছে রাস্তাঘাট দূর জনপদ। আশ্চর্য এক সুর জেগে
উঠছে। নাচের ছন্দে মৃদু মৃদু দুলছে এই হাসপাতাল। সেই দোলা
তোমাকেও বিভোর করেছে।যখনই তাকাই দেখি, চাদরের তলায়
তুমি হাত নাড়ছো দ্রুত। বিদায়বেলার হাসি।প্রত্যুত্তরে আমি কি
করি! নিজের হৃদয়টিকেই দোলাতে থাকি মুখের সামনে।
৩.
শরীর যখন আছে তা তো বিগড়োবেই। তবু এত ঢেউ এসে ভেঙে
দিচ্ছে বাঁধ। দেখে চমকে ওঠো কেন? একটা টেলিফোন রিং
এম্বুল্যান্সের উচ্চকিত শব্দে ফেটে পড়ে।আধো ঘুম আধো জাগরণে
দেখো মাঝিমাল্লারা সেরে নিচ্ছে রাতের আহার। ভোর হলে যাত্রা
শুরু হবে। ট্রলির নৌকায় চেপে এক ল্যাব থেকে আরো এক ল্যাবে।
প্রিয়তমা,বড় ভালবাসি।তোমার বিষাদ করুণ এই সৌন্দর্যের দ্যুতি
একজীবনের চাওয়া হয়ে থেকে গেল চোখের পাতায়।
৪.
আশঙ্কার মেঘ সরে গেলে পুষ্পবৃষ্টি হয়।চুলের কিনার ধরে গোলাপের
পাপড়ি ফুটে থাকে। ডানা ছড়িয়ে এই হাসপাতালও আজ ভেসেছে
আকাশে। নীচে খুব নীচে এক ছোট আবাসন। সেখানে বাসনকোসন
আর বালিশবিছানারা বলাবলি করে।মুখ চাওয়াচাওয়ি হয়। গৃহিণীর
হাতের ছোঁয়ায় জেগে ওঠে ঘুমন্ত সংসার।ফটোফ্রেম আর দরাজ চেয়ার
আড় ভাঙে।ছাদের কোণে কোণে জমে থাকা ঝুল অশ্রু মুছে নেয়
হাতের চেটোয়।
ছবি : বিধান দেব
কবিতা : দীপান্বিতা সরকার
তুমিময়
১
অভিযোগ করেছি কি?
আমার শহরে পথের দু'ধারে কত জারুল গাছ,
তা-ই শুধু তাকিয়ে দেখেছি।
আমার আশরীর শোক
শূন্য ঘরদোর, হৃদি অনাঘ্রাতা
অভিযোগ করিনি কারও কাছে
তুমিময় প্রাণটুকু অন্ধকার হলে
আকাশের নীচে এই এত বেগুনি জারুলফুল
অমনিই থোকা থোকা ভরে থাকবে,
আদরবিহীন।
২
তোমার গা বেয়ে আমি বুনো ধুন্দুলের লতা
দেখেছ চাষবাস?
কুঞ্চি পোঁতা, বাঁশ দিয়ে মাচা করা--
তুমি বাঁশ
আর আমি কিনা খুঁজি আড়বাঁশি!
যাবার যে জায়গা নেই কোনও
তোমাকে ঘিরে ঘিরেই ফুল ফোটাই
হলুদ রঙের
তুমি জানো না, লক্ষ্মীটি
কাঁটালে পোকা এসে যখন তখন
উফ মাগো! সব খেতে চায়
ছবি : বিধান দেব
কবিতা : নীলাদ্রি দেব
ঘুম কিংবা ঘাম বিষয়ক
এক.
ঘুম হারিয়ে গেলে ঢাল বেয়ে নেমে আসে কুয়াশা
উলঙ্গ ঘরের ভেতর যুদ্ধরত
দুটো কাঁচা লোহার তলোয়ার
যুদ্ধবিরতি ব্যর্থ শব্দবন্ধের মতো
সময়ের ক্ষত ও ক্ষয়ের বিপরীতে আলো জ্বলে ওঠে
চিমনি বেয়ে উঠে আসে উত্তপ্ত আর্তনাদ
সামান্য মধুর জন্য এ রাতকে অস্বীকার কোরো না
হ্যারিকেনের ফিতে ক্রমশ বেঁটে হয়ে আসছে
দুই.
এক পিয়ানো গান নিয়ে বসে আছি
উন্মুক্ত আকাশে কত ফড়িং!
দীর্ঘ বিরতির মতো যদি দাঁড়িয়ে থাকো
যাবতীয় জলছাপ উবে যাবে
এত উত্তাপ সহ্য হচ্ছে না
নখে নখে জমে উঠছে প্রাচীন শ্যাওলা
সমস্ত দীর্ঘ রাতে
কীটনাশকের পাশে গান হয়ে বেজো
তিন.
এই অস্বীকার পর্ব গভীর প্রলেপ হয়ে আছে
যাতায়াতের পথে আপাতত কোনো টোলগেট নেই
লজ্জাবতীর ফুলগুলো জেগে থাকে, মুদে যায় পাতা
অতএব একে একে দুই মিলিয়ে নিও না
মাকড়সার তাঁতে কিছু মাকু ছিল,
ওসব এতটা কার্যকরী, ভুলেও ভাবিনি
কাঁচের সিলিংয়ে নিজস্ব নিথর ছবি ভেসে ওঠে
দক্ষিণের পর্দা বলতে অস্তমিত আঁচল,
দারুচিনির গন্ধ, বিষণ্ন হলুদের দাগ
চার.
এমন অপ্রস্তুত অন্ধকারে খুব ঘাম হয়
ফুলের শুকনো রেণু ছড়িয়ে দিই পুরনো অ্যালবামে
পদ্মপুকুরে মৃত আলোপোকাদের ডানা
এলোমেলো টেক্সটের উপর তারপিন তেল
শেষ রাতে নাম না জানা পাখি ডাকে
পিছলে যাই সময়ের নামতার ভেতর
পাঁচ.
রেসমাঠের নিচে আমাদের কাঠের বাড়ি,
এখনও শব্দ শুনতে পাই
ঘোড়ার কথোপকথনের ভেতর হারিয়ে গিয়েছিলে
দেখতে পাওনি উল্টানো আংটি
স্পর্শ ডিকোড করতে অবরোধ দরকার
তাই ব্যারিকেডের পাশে রাতপোশাক
আর আয়ু ফুরিয়ে যাওয়া ঘুমের ওষুধ
কবিতা : বিপ্রতীপ দে
পদাবলী গোধূলির
দিয়েছিলাম দুঃখ তুমি ফেরাওনি তা,
দূরের প্রাচীন কথায় আজও ডাকছে পাখি!
নিরুদ্দেশের মধ্যে যে মন হারিয়ে গেছে,
সেতার তারে আঙুল আঘাত তাকেই ডাকি!
মৃত তারার অনেক দূরের একটু আলো,
আকাশ থেকে কখন এসে ভরেছে ঘর!
এই রকমই তোমায় ভাবি অন্ধকারে,
কবে কখন হাত ধরেছে অচেনা ঝড়!
শুকনো পাতার কষ্ট কিছু লাঞ্ছনাকে
প্রবল হাওয়া ওড়ায় যখন, নিঃস্ব ক'রে
নিজের ভেতর একটা বাঁচা ঠিক তখনই
ঝড়ভাঙা গাছ বৃন্তটি ফুল আঁকড়ে ধ'রে !
কেমন আছো ওই আড়ালের মধ্যে নিজে,
জলঝিনুকে যত্ন করে দুঃখ রাখা!
দেখবে আমায় শেষবেলাতে তাকাও যদি
ওই গোধূলির আকাশ আমিই রক্তমাখা!
আলোর গান
দুহাত পেতে আকাশে চাই নিরাময়ের আলো;
বাতাসে বিষ-নিঃশ্বাসের স্পর্শ আজ ভারী!
তোমার মন আমার মনে যৌথ দীপ জ্বালো,
ভাবো না, ঘন দুর্যোগেই সূর্য হতে পারি!
অশথ ঝাউ দেবদারু আকাশে মাথা তোলা,
অনেক পাখি রেখেছে বুকে মায়ার আত্মীয়!
যে-কোনো ব্যথাবোধের পাশে ফুলের চোখ খোলা
সবুজ গানঃ প্রিভেন্টশন বেটার দ্যান কিওর!
কীসের ভয় দেখাও মেঘ কালো আঁধার বেশে?
বিদ্যুতের ওই আলোর জীবনটুকু চেনা!
নদীতে পোড়া শরীর ছাই,চোখের জল মেশে,
বুভুক্ষার নিয়তি এই বেড়েছে ধারদেনা!
টাইটানিক ডুবছে সেই দৃশ্য কোলাহলে,
ভয়ের চোখে চোখ রেখে বেহালা ছড়টানা!
সব ভয়ের ঊর্ধ্বে আজও সাহস কথা বলে,
তোমার হাত মুঠোতে,ভয়, পেরোবো ঠিক জানা!
চিহ্নিতকে
আকাশ চেনা তোমার মতো
সবুজ পাতাটিও,
'মনখারাপের অন্ধকারে
অশ্রুফোঁটা দিয়ো!'
এই কথাটি বললে তুমি
কখন যেন কবে,
আর বলেছ মাঠের শেষের
দিগন্ত কি হবে!
না-ফোটা ফুল কুঁড়ি তোমার
চেনা আকাঙ্ক্ষারা,
অনেকখানি আত্মীয় হয়
অন্ধকারের তারার!
যেমন করে ভাবতে আমায়
আজও কি আর ভাবো,
দেখবে ধুলোয় ভাঙা মনের
চিহ্ন রেখে যাবো!
ছবি : বিধান দেব
কবিতা : সুভাষ বিশ্বাস
হন্তারক
কে আমায় পাহারা দাও রোজ
কে জানালা বন্ধ করতে শেখাও
নদীর ওপারে কার বসবাস!
কে ওইপার থেকে দিনরাত বাঁশি বাজায়
আমাকে শীতলপাটি বিছিয়ে দেয়
রোদ্দুর মেখে ঘুমিয়ে থাকতে বলে!
ওপার থেকে কারো চিৎকার ভেসে আসে
গুটিগুটি ছোট্ট ছোট্ট পায়ে নক্ষত্রের
গভীরে তাকে নেমে যেতে দেখি
আমি ভয় পেয়ে চোখ খুললেই
ডিম ভেঙে বেরিয়ে আসে লক্ষকোটি
বছরের আদি রাক্ষস
আগুন
ক্রমে ঘুম নেমে আসে সাদা চোখে
বলেঃআজকের মতো শেষ হলো তোমার
ওদিকে রাত বাড়তেই থাকে,বাড়তেই
অদ্ভুত তুলোর ঘর,তুলো ওড়ে,ঘরও ওরে
অসময়ে যখন-তখন কিছু চাইলেই কী
সবরকম অভ্যাস আছে,অভ্যাসের ক্ষিদে
তাহলে বাতাসের চোখ কীভাবে দেখা
বাতাসের চোখে বুঝি তামাম রাত্রির
রাতেরও তো দৃষ্টি আছে,লেপমুড়ি দিয়ে
স্বপ্নে নিশ্চিত বাতাসের চোখ খুঁজে পাব
ভেবে দরজা বন্ধ করি।ভোর এসে স্বপ্নে
ঘুণ
গলে গলে পড়ে রাত বায়ুভুক প্রতিটি
তীর্যক তীর এসে ছুটে যায় এক,দুই,
লক্ষহীন রোদ ও বৃষ্টির ভেতর কারা যেন
পাথরের চাঁই কেটে কেটে,কাঠপোকাদের
ঘুণ রেখে যায় প্রতিদিন
খোলস
এইমাত্র রাত্রি শেষ করল তার গতিপথ
নক্ষত্রেরা ঘুমিয়ে পড়েছে,অস্তিত্বের অস্তি
এত অন্ধকার কোত্থেকে আসে
নিজেকে জাহির করে সম্রাটের মতো!
তবে কী অদেখার আলো থাকে আঁধারের
নিত্যমুক্ত সত্য-সন্ধানী হয়ে সর্বব্যাপি
তাতেই কী সে মিলিয়ে গেল এইমাত্র
মাঝখানে পড়ে রইল শুধু একটা খোলস
পরিত্রাণ
যখন সকল কাজে যতিচিহ্ণ বসে যায়
অকারণে সূর্য ওঠার দিকে চেয়ে থাকা
অন্যকোনো পরিত্রাণ জীর্ণ পাতার মতো
সোহহং
ওই যে ফুলে ফুলে ঢাকা বসন্ত শুয়ে
একটু পরে দাউ দাউ নক্ষত্র,জ্বলে উঠবে
হাঁটা শুরু হবে ফের কতো কল্প শেষ করে
ফিরে আসবে আবার এই বসন্তের ফুলের
গঙ্গার ঘাটে কারা নেমে যাচ্ছে
এইমাত্র কার পিণ্ডদান শেষ হলো
হাত পেতে ধরে নিচ্ছে দাউ দাউ অগ্নিশ্বর
পিণ্ডদানে খুশি হয়ে নাহম নাহম,তুঁহু তুঁহু
সত্য
সূর্য নেই,শুধু অন্ধকারের ফোঁকর সিঁধিয়ে
আমার তামাম জগৎ শুয়ে একপাশে
জল-স্থল,অন্তর-বাহির কিছুই স্পষ্ট নয়
বলছে- সত্যের স্বরূপ তোমরা দেখতে
আমি ভয়ে দুচোখ বুজে ফেললাম
চারপাশ ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেল
ঘনঘোর মেঘের বুক ফেঁড়ে সত্য কী দেখা
আমি চোখ বুজেই আছি,বুজেই আছি
শেষে বড়ো পিসেমশাই বললেন- তুই চোখ বুজে আছিস বলে সত্য প্রকাশ পেতে দ্বিধা বোধ করছে,পাছে তুই সহ্য করতে পারবি না ভেবে সে বেচারাও লজ্জায় মুখ লুকিয়েছে।
কবিতা : আবু রাইহান
এসো আঁকড়ে ধরি
হায় আমরা কোনোদিন চিন্তা করে দেখিনা, কোথা থেকে আমরা
সচল দৃশ্যমান মানুষে পরিণত হলাম!
কোনোদিন কী গভীরভাবে নিরীক্ষণ করেছি, একফোঁটা তরল থেকে
ধাপে ধাপে কিভাবে সৃষ্টির সেরা হয়ে উঠলাম!
আমাদের বিস্ময়কর সৃষ্টি রহস্যময়, তবুও আমাদের
অন্তর্গত হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে না কোনো বিস্ময়!
ঊর্ধ্বাকাশে সাত স্তরের আসমান থেকে চাঁদ ছড়ায় বিশুদ্ধ আলো
আর প্রদক্ষিণরত প্রদীপ্ত সূর্যের ঔজ্জ্বল্ল্যে নির্বাপিত হয়
আঁধার রাত্রির কালো!
সীমাহীন আকাশের দিকে তাকিয়েও নিজেদের অতি ক্ষুদ্রতায়
কেন যে কম্পিত হয়না এ হৃদয়,
তোমার অলৌকিক মাহাত্ম্যের কথা জেনেও আমরা
কেন এত অবাধ্য আর নির্ভয়!
নুহু নবীর কালের মানুষদের মতো আঙুলের বদলে হেডফোন গুঁজে রাখি কানে
বিশ্বাসীদের বলা অমোঘ সত্য কথন সচেতনভাবে ঢোকাতে চাইনা প্রাণে!
নিকৃষ্ট মানুষের মতো অহরহ প্রত্যাখ্যান করে চলেছি ন্যায়ের বাণী
প্রাচীন অবাধ্য জাতির মতো ধ্বংসপ্রাপ্তিকে যেন না টেনে আনি!
এখন কেবল সংকেতময় ইশারা, সামনে সমাসন্ন
মহাশক্তিধরের ক্রোধের মহাপ্রলয়ের প্রবল বৃষ্টি
ভেসে যাওয়ার আগে এসো আঁকড়ে ধরি
নূহের নৌকার মতো বিশ্বাসীদের কিস্তি!
এখন জগৎ জুড়ে মহাসমারোহে প্রবল গতিতে প্রবহমান
দূষিত স্ফুর্তির মৌষণকাল
অথচ আমাদের অজানা নয়, বিশ্বাসী হৃদয়ের জন্য কেবল
গচ্ছিত রয়েছে মহাআনন্দময় অনন্তকাল!
ছায়াময় অন্ধকার
হে আমার সান্ধ্য নদীর বিষন্নতা
তোমার মুখ জুড়ে কেন ছায়াময় অন্ধকার, আর নীরবতা
রূপনারায়ণের কূলে দূর গ্রামে অস্তগামী সূর্যের
মায়াময় আলোয় জেগে থাকে কেবল
অন্তহীন ভালোবাসার কথকতা!
বারান্দার অন্ধকারে তোমার একাকী রোদনে
এ পৃথিবীতে বৃষ্টি নামে, তুমি কি তা জানো প্রিয়তমা!
প্রিয়জনের হৃদয় থেকে চুইয়ে নামে বিন্দু বিন্দু জল
বিশুদ্ধ হৃদয়ে কেবল সঞ্চিত রেখো মহৎ ক্ষমা!
আমি ভালোবাসি সিজদাবনত অশ্রুসিক্ত আঁখি
তোমার স্বর্গীয় বিশ্বাস জারিত মুখের অনাবিল হাসি!
ছবি : বিধান দেব
কবিতা : অবশেষ দাস
তোমাকেই লিখছি
জলের অপর নাম রাধা আর স্নানের অপর নাম বৈরাগ্য তুমি বলেছিলে।
জ্যোৎস্নায় হেঁটে হেঁটে কথা দিয়েছিলে শ্রাবণের অরণ্য দেখাবে।তোমার লেখা সেই তারা খসার গল্প
আর পড়ি না। তোমাকে কতদিন কিছু লিখি না।
যতবার তোমাকে লিখতে সাধ হয়, ঠিক ততবার একটা করে গাছ পুঁতি মাটিতে। আমার চরাচর জুড়ে জ্যোৎস্না নেমে আসে।
একদিন দেখি, আমার হাতে বসানো গাছগুলো তাদের ছেলেপিলেদের নিয়ে অরণ্য হয়ে গেছে।
শ্রাবন অরণ্যের হাওয়া এসে তারা খসার গল্পকে উড়িয়ে দিয়ে যায়।
দ্বিধাহীন আমি, আজ শুধু তোমাকেই লিখছি।
ময়ূরাক্ষী
তোমার পায়ের তলায় ময়ূরাক্ষী নদী ঘুমোচ্ছো।
তোমার ইচ্ছের ভেতর সমাধি দেওয়া আছে, সবুজ গাছের মত একটা মন।
তোমার জেদের ভেতর শুধু ছাই উড়ে যায়। ভাসে পোড়া পোড়া গন্ধ।
তোমার ভেতর বাল্মীকি অনন্ত যুদ্ধ লেখে। এক কণা শান্তি লেখে না।
ছবি : বিধান দেব
কবিতা : মোনালিসা রেহমান
কোনও একদিন
মেঘলাদুপুর স্বমেহণে
একদিন বিষণ্ণ শরীরে
ঘাম হয়ে আসে।
দুর্লভ অতীতের
শৃঙ্খলে আবদ্ধ
এক শেকড়ের টান
আর মুক্ত আকাশের
টানাপোড়েন...
অবিরত গল্প পোড়ায়।
একদিন হলুদপাখি
সমস্ত বিষণ্ণতা সরিয়ে
রৌদ্রের হাসিতে উড়ে যায়।
শৈশবের স্মৃতিতে ঝাপসা হয়ে
আসে তার মাইথোলজি।
অক্ষরগুলো
মৃগনাভি থেকে পায়ের পাতা
ভালোবাসার অক্ষরগুলো আজো
তেমনভাবে লিখিত হয় ...
প্রেমের ভাষা তো একি থাকে চিরদিন
শুধু স্থান কালভেদে তা পাল্টে যায়
যুগে যুগে।
অস্থি মজ্জা শিরা উপশিরাগুলি
কিছু কিছু আটকে থাকে শিখণ্ডীর মতো
মধ্য আকাশে।
আকাশের সোনালি আলোর ছটা
রেখে যায় ধুসর বিকেলগুলো
ভেঙে ফেলা হয় মানঅভিমানের
অদৃশ্য প্রাচীর।
সব দুঃখ ভেসে যাক অমৃতলোকে
সংগোপনে
কিছু কথা রেখে যাই সংগোপনে
নিস্তব্ধ ঘোরের ভেতর...
বিষাদমাখা অশ্রুরা কেবল
ঘোরাফেরা করে বিষণ্নতা।
শীতল স্রোত নেমে যায় বুকের
ভেতর অসময়ে...
বিন্দু বিন্দু ঘাম আর রক্তিম রেখা
কেবলই স্মৃতির ওপর খোদাই করা
একটা ফলক।
নিজের ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করতে
করতে পৃথিবী ও রণক্লান্ত।
ছবি : বিধান দেব















