মঙ্গলবার, ২৯ জুন, ২০২১

সম্পাদকের কথা


 আকাশ কিছুটা ঘোলাটে। মাঝে-মধ্যেই ঋতুরানি বর্ষা তার চঞ্চল কটাক্ষে আমাদের মোহিত করছে। আমরা যারা তার প্রেমিকপ্রবর তাকে পেয়ে খুশি। কিন্তু কিছুটা বিচলিত, বিভ্রান্তও। পৃথিবী এখনও পুরোপুরি সচল ও স্বাভাবিক নয়। এই পরিস্থিতিতে সাহিত্য সংক্রান্ত যে কোনও উৎসব অনুষ্ঠান বন্ধ। দুয়ারে খিল দিয়ে কত আর মন ভালো রাখা যায়! এই অবস্থার কাছে আমরা অসহায়। জীবনের দাবি অনেক। তবে সবচেয়ে বড় দাবি তার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা। আমরা এখন সেই কাজে ব্যস্ত। এই অতিমারির মধ্যে আগত ইয়াসের প্রভাবে জলমগ্ন ও সর্বস্বহারা আমাদের রাজ্যের বেশ কিছু এলাকা। মানুষ বড় কাঁদছে। সেই সঙ্গে চলে গেলেন আমাদের প্রিয় কবি গৌতম বসু ও সুব্রত ভুঁইয়া। সুব্রতদা ডায়মন্ডহারবারের মানুষ । কিছুটা হলেও তাঁর সঙ্গ পেয়েছি। কবি দীপক হালদার  ও বলরাম বাহাদুরের সঙ্গে একযোগে ডায়মন্ডহারবার থেকে এক সময় সম্পাদনা করেছেন অর্কেষ্ট্রা নামক সাহিত্য পত্রিকা। আমরা এঁদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আর একটি সংখ্যা প্রকাশিত হলেই সাহিত্যের বেলাভুমি ব্লগ তার এক বছর পূর্ণ করবে। মাঝে-মধ্যেই ভেবেছি এক বছর পূর্ণ করে এই প্রকাশ বন্ধ করে দেব। আবার বন্ধুদের নতুন নতুন লেখার ইচ্ছাকে সাগ্রহে গুরুত্ব দিয়ে ভাবি এগিয়ে যাব। যে কোনও পরিস্থিতিতেই আমাদের আনন্দিত থাকতে হবে। ভালো থাকা মন্দ থাকার কোনওটিই যেন  আমাদের আনন্দসত্তাকে টলাতে না পারে।

গদ্য : সুবীর সরকার


 


অঞ্চলকথা


১.

রংপুরের গান কি দিনাজপুরের গানের সঙ্গে জায়গা বদল করছে।না কি দিনাজপুরের গান পথ হারিয়ে ঢুকেই পড়ে রংপুরের গানের গহীনে।গানের এই জায়গাবদল নিয়ে ভাবতে বসলেই গানের মোহনমায়া ঘিরে ধরে।গান তো জায়গা বদল করতেই পারে।জায়গা বদলালে স্থান কালও বদলাতে পারে।তবে কি রংপুরের গানের বর্ণময়তায় লিপ্ত হতে পারে দিনাজপুরের গান।গান তো কেবলমাত্র গানই থাকে না,বিশেষত লোকগান;গানের কথা সুর বাজনার খুব অন্তরপ্রদেশ থেকে কেবল উঠে আসতে থাকে অন্তহীন সব মানুষেরা।মানুষ তো কেবলমাত্র মানুষই নয় যে তার দেশকাল হাটগঞ্জ আমোদপ্রমোদ জীবনযাপনের খুঁটিনাটি ভাষাবিন্যাস লোকাচার বাঁচবার প্রকৌশল সব সমস্তসহই তুমুল জীবন্ত হয়ে উঠতে থাকে।গানের ভিতর দিয়ে সে তার আঞ্চলিকতাকে যথার্থই চূড়ান্ত আঞ্চলিক করে তোলে।তাই রংপুরের গানের প্রবাহে প্রবাহিত হতে হতে রংপুর তার মানবজীবনের পানসি ভাসায় দিনাজপুরের ঘাটে।আবার অঞ্চলকথা নিয়ে দিনাজপুরও মিশে যায় রংপুরে।এই চলাচলটুকু ভ্রান্তির সীমাপরিসীমায় ধাক্কা খেতে খেতে রংপুরের গানের ভেতরকার গাড়িয়ালভাই ও গরুর গাড়ির চাকার যান্ত্রিক শব্দের চাপানউতোর নিয়ে দিনাজপুরের দিকে,দিনাজপুরের গানের দিকে যেন আশ্চর্য এক বাওকুমটা বাতাস হয়ে ঘুরে ঘুরে মরে।রংপুরের গানটি হাহাকার ছড়িয়ে দেবে দিনাজপুরের গানের পল অনুপলে।


২।


জায়গাবদল কিংবা স্থানবদলের প্রেক্ষিত স্পর্শযোগ্য এক কালখন্ডের ধাক্কায়,ধাঁধায়,ধরাছোঁয়ার অনির্নেয় কোন নিরপেক্ষতায় আশ্রয় খুঁজে পেতে চাইলেও গানের সুর তাল দিয়ে আমরা তো আদতে গানটিকেই ছুঁতে পাবার চেষ্টা করবো।রংপুরের গানের নিজস্বতায় কখন যেন আলগোছে দিনাজপুরিয়া গানের মাত্রা ও লয় এসে আছড়ে পড়বে সেই সামান্য মরমীয়া জীবনযাপন কিংবা দর্শনাশ্রিত যাপনের গাম্ভীর্যতায় কবেকার হারিয়ে যাওয়া চিলমারীর বন্দর তুষভান্ডারের বড় হাট দিনাজপুরের জমিদারের ধানগোলা গরুচুমানী গানের আসর বাঁশিয়ালের সুরের আবহে ভিনদেশী কোন মেজাজই বা এনে দিতে পারে।জীবনের গুঢ় কোন রহস্যময়তাই এক্ষেত্রে বড় হয়ে দেখা দিতে পারে যা অপেক্ষাকৃত দার্শনিক হয়ে প্রানান্তকর প্রচেষ্টায় কখন যেন গলাগলি হাঁসের মতো হাসির মতো দিনাজপুরের গান ভেঙে,গড়িয়ে নামে রংপুরীয়া গানের গোলকে।


৩।


উড়ে যাওয়া মেঘের নীচে মেঘেদের জটজটিলতায় সে কি শুনতে পায় কবেকার বাঘের ডাক।আদিঅন্তহীন জলজঙ্গলের ভিতর দিয়ে বহুধাব্যপ্ত নিসর্গের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ানো সেই সব বাঘেদের অস্ত্বিত্ব-অনস্ত্বিজাত ডাকগুলিও কেমন আত্মগত হয়ে ওঠে।সে তো ইতিমধ্যেই দেখেও ফেলে বিষ্মরণফেরত বাঘেদের নিঃসঙ্গ হেঁটে যাওয়া।দূরাগত বাঘের ডাক দিয়ে আস্ত এক বাঘভান্ডারই বুঝি নির্মিত হয়ে যায়।বাঘেদের ডোরাকাটা শরীরে দুপুররৌদ্র রৌদ্রপ্লাবনের গাম্ভীরর্যকে অসামান্য এক উজ্জ্বলতায় পৌঁছেই দেয় এমত ধারণাজাত কোলাহলে অরণ্যভূমের শাল জারুল শিমুল বৃক্ষরাজির সন্নাসীসুলভ মগ্নতায় বাঘেদের চোখে বারবার লেপ্টে যেতে থাকে জীবনমরণের এক ঘোর।মেঘের নিচে আলো ও অন্ধকারের যৌথতায় সংলাপবহুল কোন নাট্যকাব্যই যেন সমগ্রের চিরকুটবাহিত অংশ হয়ে একসময় সমগ্রতাকেই লজ্জিত করে ফেলতে থাকে।বাঘের থাবার নিচে ব্যাঘ্রশাবকের নিশ্চিন্ত নিদ্রার দৃশ্য নদীজলনিসর্গের ধারাবাহিকতায় অমোঘ এক ছায়াদৃশ্যই রচনা করে ফেলে যার বৈ্ধতার বাধ্যবাধকতায় অকালবর্ষণের এক পৃথিবীর জাগরণ পরবর্তী সহজতায় মাইল মাইল হাওয়াসমুদ্রের প্রচলিত লোকাচার লোকনাচের বিরহকালীন বিপন্নতায় কেবলই থিতু হয়,থিতু হতে থাকে।ঝোপঝাড়ে,ঝোরা নালা নদীর বহুবর্ণিল প্রবাহের গহনপ্রদেশে ডুবে যেতে যেতে লুপ্ত সময়পট থেকে বাঘের অতিবৃহৎ তর্জন গর্জন সমেত ফিরে ফিরে আসতে থাকে আর আকাশজোড়া পাখিদের উড়ে যাওয়ার দৃশ্যটিকে সংহত হতে দেবার অবকাশটুকুও না দিতে চেয়ে ধারাবাহিক জেগে ওঠে ভেসে ওঠে কেবলই বাঘের ডাক।


ছবি : বিধান দেব 

ধারাবাহিক গদ্য : দীপক হালদার


 

ডায়মণ্ড হারবারের সাহিত্যচর্চার ইতিবৃত্ত 
ডায়মন্ডহারবারের নাট্য সাহিত্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে আমি দুজনের নাম উল্লেখ করছি মাত্র ।আরও একজনের নাম এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য ।তিনি শংকর বিশ্বাস ।সমাজসেবী এই মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক নানা কাজকর্মে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন ।ওসব কাজকর্মের ফাঁকে নাটক মঞ্চস্থ করানো,নির্দেশনা দেওয়া, অভিনয়ে অংশগ্রহণ ইত্যাদি কাজে নিয়োজিত থাকতেও দেখা যায় তাঁকে ।কিন্তু তিনিও রচনা করেছেন নাটকের বই,নাম : 'ভালোবাসি নাটক'।বারোটা নাটকের সংকলন এই গ্রন্থের কিছু নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে ইতিমধ্যে ।শংকরবাবু বসবাস করেন ডায়মন্ডহারবার রেল স্টেশনের নিকটবর্তী কালীনগর গ্রামে ।
ফলতার বাসিন্দা সুরজিত প্রামাণিক কয়েক বছর ধরে সম্পাদনা করে আসছেন ' নিরক্ষরেখা' নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা ।মূলত কবিতাকেন্দ্রিক এই পত্রিকার প্রকাশ অনিয়মিত ।সুরজিত নিজেও সাহিত্য চর্চা করেন ।তাঁর একটি কবিতার বইও প্রকাশিত ।ওই অঞ্চলে রমা হালদার নামে একজনের কবিতা চোখে পড়ত একসময় ।বর্তমানে আর চোখে পড়ে না ওই নাম।
আর একজনের কবিতা মাঝেমধ্যে চোখে পড়ে ফেসবুকে, তিনি বৃষ্টি পুরকাইত ।টুকরোটাকরা লেখা এভাবেই নজরে আসে উজ্জয়িনী সাঁতরা নাম্নী এক লেখিকার ।কিন্তু এঁদের নিয়ে বিস্তারিত কিছু মন্তব্য করার বা লেখার মতো বিশেষ কিছু নেই আপাতত ।
            করোনাকালীন দীর্ঘ লক ডাউন, যানবাহনের অব্যবস্থার ফলে তথ্যাদি সংগ্রহে 
আমার বেশ  অসুবিধা হচ্ছে ।তাই আর কোনো 
সাহিত্যচর্চাকারীর নাম ,তাঁদের কাজ বর্তমানে আমার সংগ্রহে নেই।অনেকের কাছে এ বিষয়ে এলাকার তথ্যাদি প্রার্থনা করেছি।প্রতিশ্রুতি দিয়েও তাঁরা তাঁদের কথা রক্ষা করতে পারেন নি ।কোনো অসুবিধা হয়তো তাঁদেরকে একাজ থেকে বিরত রেখেছে ।তবে আমি নিশ্চিত সমাজের ভাঁজে ভাঁজে, আমার জানার বাইরের অন্ধকারে অনেক নতুন কবি - গল্পকার শান দিচ্ছেন তাঁদের শানিত কলমে ।সাহিত্যচর্চার ধারা কখনো থেমে থাকে না, বিরতি জানেনা।
         তাই এ যাত্রায় অনিবার্যভাবে থেমে যেতে হচ্ছে আমাকে ।আবার যেদিন আমার সন্ধিৎসার ঘট পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যাবে সেদিন নিশ্চয়ই তুলে ধরার চেষ্টা করব স্বজন পাঠকদের সুমুখে । আপাতত আমার এ পর্যন্ত লিখিত ইতিবৃত্তর সমস্ত অসংগতি, অপূর্ণতা,ভ্রান্তির দায় একান্তই আমার ।আশা করব কেউ এ বিষয়ে সত্য ও যথাযথ তথ্যের সম্ভার নিয়ে অচিরে  বা আগামী দনে  হাজির হবেন আমাদের সামনে, সুযোগ দেবেন সমৃদ্ধ হবার ।
            আমার এই  অনিবার্য অসম্পূর্ণতার জন্য সবিনয় ক্ষমা প্রার্থনা ক'রে এখনকার মতো বিদায় নিচ্ছি ।

                                                                          ( সমাপ্ত )
ছবি : বিধান দেব 
                  

ধারাবাহিক গদ্য : অভিজিৎ দাশগুপ্ত


 

সাধনপর্বের নির্জনতা



১৯.

৩৪.
মাঝখানে নদী গিরি, মাঝখানে তুমুল সভ্যতা।

তবু আজ সারা রাত তোমার জন্যই জেগে আছি।
তুমি কি কোথাও আছ,সত্যি-সত্যি কোনো বন্ধ 
                                                                ফ্ল্যাটে?
ঘুম ভেঙে ব্যালকনিতে দাঁড়ালে কি
                                  একটি বার
                 রক্তলাল টেলিফোন দেখে লোভ হল?

--- সবই তো নিয়েছ, নাও। নিরঙ্কুশ এই শূন্য,
একেও কি নেবে ?

দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'ভোররাতের দেবী ' বইটির '৩৪'  সংখ্যক কবিতা পড়তে পড়তে দুটো ছবি ভেসে ওঠে । যতবার পড়ি ততবারই ওই ছবি দুটি দেখতে পাই ।  কোনভাবে তাদের সরাতে পারি না ।  বা অন্য কোনো দৃশ্যে যে পৌঁছে যাব , তাও সম্ভব হয় না। তাহলে এখন প্রশ্ন ; কি সে ছবি!

যদি প্রথম ছবির কথায় আসি , সেখানে প্রকৃতির এক বিরাট বিপর্যয় চোখের ওপর ভেসে ওঠে । ২০১৩  সালে উত্তরাখণ্ডের সেই ভয়ঙ্কর বিপর্যয়। হিমবাহ ভাঙার কারণে চামোলি জেলা সম্পূর্ণ প্লাবিত হয় । ধৌলিগঙ্গার জলের স্তর বেড়ে যায়। তারপর তার যে ভয়ঙ্কর রূপ --- সে সমস্ত আমাদের এতদিনে জানা হয়ে গেছে ।  কিন্তু প্রশ্ন ;  এই কবিতার সঙ্গে তার সম্পর্ক সূত্র কোথায় ? কোন পংক্তিতে ধরা আছে অমোঘ সেই বিপর্যয়ের দৃশ্য!

কবিতার প্রথম দুটি পংক্তি ! কতবার পড়েছি। তবু প্রাকৃতিক বিপর্যয় ছাড়া আর কোন ছবি ভাবনায় আসেনি ।  গিরি কন্দরের  মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসা নদী তৈরি করেছে তুমুল সভ্যতা ।  তাকে কেন্দ্র করেই মানুষের এত আয়োজন ।  কিন্তু সেই সভ্যতার বিষটুকু একসময় গিলতে শুরু করে মানুষকে । তাই যার জন্য মানবের সভ্যতা প্রাণ পেয়েছে, সেই প্রকৃতির রোষেই সারারাত জেগে থাকতে হয় মানুষকে ।  অসহায় , শঙ্কিত , মৃত্যুভয়ে দীর্ণ মানুষ জেগে থাকে শুধুই নিজের কৃতকর্মের জন্য।

প্রকৃতির এমন অনুষঙ্গই তৃতীয় পংক্তিতে এসে মোড় নেয় । নিতে হয়। নদী, গিরি, তুমুল সভ্যতা মাঝখানে অবস্থান করে বুঝিয়ে দেয় তার প্রকৃত  আশ্রয় প্রেম ।  এবং সে প্রেম বহুদিন আগে চলে যাওয়া সম্পর্কের অসহনীয়তা ।  অতীতকে মুছে ফেলতে চেয়েও যা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বিভিন্ন ভাবে ।  তৃতীয় পংক্তি থেকে কবিতাটি আমার কাছে অন্য এক কৃষ্ণগহ্বর ছুঁয়ে থাকে। একান্তই ব্যক্তিগত ; তবু এমন অভিজ্ঞতা অথবা প্রতীকী ভাষা আরো অনেকের জীবনেই ঘটে। এই আটপৌরে জীবনে প্রেম-ই বাঁচিয়ে রাখে ভোরের শিশির ।  সে প্রেম নতুন হতে পারে , অথবা পুরোনো। কখনো তা বর্তমান , তো কখনো অতীত।

মোবাইল ছিলো না । হোয়াটসঅ্যাপ , ফেসবুক কল্পনারও অতীত ।  শুধু ওই লাল অথবা ধূসর টেলিফোনটুকুই ভরসা । সেই চলে যাওয়া প্রেম কি তাকে দেখে লোভাতুর হয় ! নাকি রক্তক্ষরণ ! সেও তো একই অসুখে আচ্ছন্ন । অস্তিত্বের সঙ্গে লড়াই করে আমাদের বেঁচে থাকা ।  অঙ্গারকে ধুয়ে-মুছে রাখি বিশল্যকরণী ভেবে ।  নিরঙ্কুশ শূন্যতাও একসময় ভালো লাগতে শুরু করে । জারিত হই বিশ্বাসের স্তরায়ণে।

এই কবিতা শেষ পর্যন্ত একটা প্রসন্নতার দিকে নিয়ে যায় আমাদের ।  বাতাস -রোদ -আলোর মিলিত উদ্ভাস যেন সে । শুধু তার মুখোমুখি  হতে হবে। হতে হবে কষ্টসহিষ্ণু । কবির ব্যক্তি-উচ্চারণ পরিসীমা ছেড়ে চলে আসে পাঠকের নিবিড় আলপথে । সে তখন একা ; একাকী ! তার হেঁটে যাওয়ার মধ্যে ধ্বনিত হয় হাজার বছর ধরে লেখা বাংলা কবিতার ম্যাজিক । কবি এবং পাঠক --- দুজনেই আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সেই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতায়।

২০.

রসায়ন

তোর ডান হাত ধরি পিতার মতন নির্ভয়ে
বাঁ-হাতটি যদিদং স্বামীদের।
প্রপিতামহের মতো স্নেহশীল তুই,
ঘর-গেরস্থালি ঠিক মায়ের মতন।

রোজ রাতে নীল ফানুসের মতো ফাঁপা গোল
                        আলো তৈরি হয়।
তার নীচে নির্ভয়ে ঢুকে যাস
রং চমকানো শ্বেতপাথরের
খুব ছোটো গম্বুজ খিলানে
ঘষটানো বকুলের তীব্র ঝাঁঝ ওঠে।
হাতে তোর সোনার গোলক থাকে দু-রকম
                   নরম কামনা বল।
দু-পায়ের মাঝখানে কালো ঘাসে পোঁতা
সোনার মশাল জ্বালিয়ে নারীত্ব পুড়িয়ে দিস।

লালচে ফলের বোঁটা দাঁতে কামড়ে
তারপর তুই হোস আমার সন্তান।

তোর ডান হাত ধরি পিতার মতন নির্ভয়ে।

কবিতাটির নাম ' রসায়ন ' ।  কবি দেবাঞ্জলি মুখোপাধ্যায় । যিনি জন্মেছিলেন এই কলকাতায় ১৯৫৫ সালে । আর চলে গেলেন ১৯৯৬ । মাত্র ৪০ বছরের আয়ু নিয়ে এসেছিলেন । ভৌগোলিক আর নৈসর্গিক চেতনা তাঁর কবিতায় আলোজ্বলা হয়ে দেখা দিত ।  জীবন চর্চাই ছিল দেবাঞ্জলির
অভিজ্ঞান ।  কিন্তু ওই নদী পাহাড় অরণ্য বা সমুদ্র সৈকত --- এতেই কি সব বিস্ময়ের অবসান ঘটাতেন তিনি ।  তা হয়তো নয় । নইলে 'রসায়ন '( 'পাতার মানবী ') নামে যে কবিতাটি এইমাত্র পড়লাম, তার অন্তঃস্থল অনুসন্ধান করব  কীভাবে!

বেটি ফ্রিডান  ১৯৬৩ সালে একটি বই লেখেন।
' দি ফেমিনিন মিস্টিক '। আলোড়ন ওঠে । বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন নারীদের অসুস্থতা, অস্থিরতা, ব্যাকুলতার  কথা তিনি তুলে ধরেন সেই গ্রন্থে । নারীদের এ সমস্ত সমস্যা ছিল নামহীন । নারীরা মনে করত তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই , তারা যেন বেঁচে মরে  আছেন ।

এটা কি শুধুই মার্কিন নারীদের সমস্যা ! নাকি পৃথিবীর সব দেশের সব নারীদেরই এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় প্রতিনিয়ত।

'রসায়ন ' কবিতাটি যতবার পড়বেন , ভিন্ন ভিন্ন ইমেজ সামনে আসবে ।  কখনো নারী, কখনো সন্তান , কখনো পুরুষ ।  কিন্তু সামগ্রিকতা দিয়ে যদি দেখি তাহলে অবশ্যই একে নারীর জীবন- ইতিহাস বলা চলে অনায়াসে ।  পিতা-স্বামী-প্রপিতামহ এবং মা --- এরাই ঘিরে থাকে একটি মেয়ের জীবন। সেখানেই পুরুষশাসিত সমাজের কাঠামো।

একটা নীল ফানুস , যার গোলাকৃতির ভেতর শুধুই শূন্যতা । তার মধ্যে নির্ভয়ে  বসবাস করতে চায় সকলে ।  কিন্তু " খুব ছোটো গম্বুজ খিলানে / ঘষটানো বকুলের তীব্র ঝড় ওঠে " । আসলে , মেনে নেওয়াই ধর্ম , না মানাটাই বিদ্রোহ ।  সোনার দু'রকম গোলক আর কাল ঘাস --- এই যেন পুরুষের চোখে নারী ।  এমন সাহসী উচ্চারণে-ই এই কবি তাঁর প্রতিবাদ জানিয়েছেন ।  অথবা জানাতে পারেননি। অবস্থার বর্ণনাটুকু দিয়েছেন মাত্র।

প্রতিদিন খবরের কাগজে নারী নির্যাতনের হাজার একটা খবর । ৮ মাস থেকে ৮০  বছর সকলেই তাতে পুড়ে যাচ্ছে ।  অথচ সমাজ অবিচলিত । কেউ বলছে জিন্স প্যান্ট আর টিশার্ট- এর দোষ , কেউ বলছে অতিরিক্ত মেলামেশা , আবার কারো চোখে মোবাইল- ল্যাপটপ ইত্যাদি ইত্যাদি । তাহলে মোদ্দা কথাটা কি দাঁড়ালো ! নিষ্ক্রিয় এক সত্তার অধিকারিণী করো তাকে । সংসারের সমস্ত কাজের দায়িত্ব ফেলে দাও তার কাঁধে ।  সে যেন মাথা তুলতে না পারে। আপন ভাগ্য জয় করবার মতো সাহস তাকে দিও
না ।  তাতেই মৃত্যু ঘনাবে সমাজের । বেটি ফ্রিডান তাঁর সংগীতে নারীর সেই মুক্তির কথাই বলেছিলেন। ---

" মুক্তি, মুক্তি এখন ---
ক্ষোভ আর ক্রোধের খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসছি
                                                           আমরা ,
মুক্তি এখন।

নারীত্ব – নারীত্ব কাকে বলে ?
পুরুষত্ব  --- সেটা কি ?
আমরা দু’জন সমান অংশীদার মানবতার।

মুক্তি, মুক্তি এখন ---
সময় এসেছে আমাদের সঠিক পরিচয় দেবার, আমরা মানুষ – নই শুধু নারী
মুক্তি এখন।

[ পাশ্চাত্যে নারীর ভোটাধিকারের ৫০ তম বার্ষিকী উপলক্ষে নারী আন্দোলনের জন্য বেটি ফ্রিডান রচিত সঙ্গীত। ভাষান্তর : সাগর চৌধুরী ]

তৃতীয় বিশ্বের মানুষ হয়ে অনেককাল কাটালাম। এবার সময় এসেছে সামাজিকভাবে অন্তত সঙ্গীকে কাছে ডেকে নেওয়ার । তার হাত ধরেই অর্থনীতিতে ঢেউ আসবে । আর তা না হলে ---- পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে । কবির সেই নির্মম সত্য উচ্চারণ মনে আছে তো ! শুধু কবিতার পংক্তি বলে কণ্ঠস্থ করার নয় এ ; একে মন্ত্রের মতো মাদুলি করে কন্ঠে ধারণ করার সময় এসেছে ।
       

ছবি : বিধান দেব 




 

ধারাবাহিক গদ্য : অরিন্দম রায়

 


ভিনদেশি তারা

রোজমেরি ডান 


জীবনে তিনি একটিমাত্র ফুটবল ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলেন। ‘প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়েছিল সেইদিন , খেলা দেখতে খুবই অসুবিধা হয়েছিল।’ সেদিনের কথা বলতে গেলে এটুকুই তাঁর মনে পড়ে। এরপর অনেকগুলো বছর কেটে গেছে, প্রায় চল্লিশ বছর বয়সে , দুই কন্যা সন্তানের মা , রোজমেরিকে গণ্য করা হয় হাতে গোনা সেইসব কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে যাঁরা পরিচিত ‘the Stroud Football Poets’ নামে। রোজমেরি বলেন যে, ‘পুরুষ আর ফুটবল খেলা নিয়ে প্রচুর পরিমাণে লেখালেখি হয়েছে।’ কিন্তু তিনি ‘ আগ্রহী খেলাটির প্রতি মেয়েদের দৃষ্টিভঙ্গি  নিয়ে , মেয়েরা কোন চোখে দেখছে ফুটবল খেলাকে সেটা নিয়ে। মাঠের বাইরে থেকে দেখার  মতো। ছোটবেলায় ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সকলেই ফুটবলে লাথি মারার সুযোগ পেত। ব্যাপারটার মধ্যে একটা অসম্ভব সরলতা ছিল। কিন্তু এরপরেই একটা মুহূর্ত আসত যখন লিঙ্গভেদাভেদের গণ্ডী টেনে দেওয়া হত আর তারপর ফুটবল নামক খেলাটা পরিণত হত ছেলেদের সম্পত্তিতে।’

রোজমেরি তাঁর ‘Different for Girls’ কবিতায় স্মৃতিচারণ করেছেন শৈশবে ফুটবল খেলতে তিনি কতটা পছন্দ করতেন আর এই কারণেই মাঠের অন্য মেয়েরা ( যারা ফুটবল খেলত না) তাঁকে ‘টমবয়’ বা পুরুষালি মেয়ে বলে ডাকত। তিনি আরও বলছেন ‘একটা সময় ছিল যখন আমিও অন্যান্য মেয়েদের মতো টাচলাইনের ধারে দাঁড়িয়ে আমার বয়ফ্রেন্ডকে ফুটবল খেলতে দেখতাম আর তার জন্য কমলালেবুর খোসা ছাড়িয়ে রাখতাম যাতে সে হাফটাইমের সময় সেগুলো খেতে পারে।’ পুরুষদের আগ্রাসন আর প্রাচীন প্রবৃত্তির রোজমেরি মৃদু সমালোচক। তিনি বলেন ‘আমি পুরুষদের ঘৃণা করি না, ফুটবল খেলার সময় তাদের আচরণ আমার গোলমেলে লাগে’। তিনি তাঁর লেখায় নতুন প্রজন্মের সেইসব মেয়েদের ব্যঙ্গ করতেও পিছপা হন না ,যারা ফুটবল খেলাটা দেখে থাকে  শুধুমাত্র এই কারণে যাতে তারা পুরুষ খেলোয়ারদের সুগঠিত পায়ের প্রশংসা করতে পারে। অবশ্য এরপর তিনি আরও বলেন যে ছেলেরা যদি মহিলা টেনিস খেলোয়ারদের অনাবৃত পায়ের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে পারে তাহলে এক্ষেত্রেও তিনি দোষের কিছু দেখেন না।

সম্প্রতি ‘The Trouble with Love’ নামে তাঁর একটি উপন্যাসও প্রকাশিত হয়েছে। ব্রিটেনের ব্রিস্টলে তাঁর বাড়ি। ‘City: Bristol Today in Poems and Pictures’ নামক সংকলন ছাড়াও আরও নানা কবিতা সংকলনে রোজমেরির কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।


 

ডেভিড বেকহ্যাম আমার পিছু নিয়েছিল


ডেভিড বেকহ্যাম আমায় অনুসরণ করে।

সুপারমার্কেটের আশেপাশে সে ঘোরাফেরা করে ,

আমাকে অরগ্যানিক জিনিসপত্র কিনতে অনুরোধ করে।

“এগুলো ভালো , এগুলো টাটকা ,”এইসব আবোলতাবোল বকে।

‘আর তুমি কি আমায় দেখেছিলে , টিভিতে , গত শুক্রবারে?’

 

ডেভিড বেকহ্যাম আমার পিছু নিয়েছে।

আমি সেদিন পাব-এ যাওয়ার পথে তাকে দেখেছিলাম।

“তুমি কি ব্রুকলিনে তোলা আমার ছবি দেখতে চাও?

ভিক্টোরিয়া তোমাকে তার ভালোবাসা জানিয়েছে।”

সে তার সবচেয়ে ভালো বালকসুলভ লাজুক হাসিটি হাসে।

তারপর আমাকে বলে , খুব একটা প্রাসঙ্গিক নয়:

“আমি বলটা মেরেছিলাম , আর সেটা সোজা জালের ভিতর ঢুকেছিল।”

 

ডেভিড বেকহ্যাম

রাতে আমার বিছানায় গুটিসুটি মেরে ঢোকে।

“সুইট ড্রিমস , ছারপোকাদের তোমায় কামড়াতে দিও না।”

তারপর সে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায় ,

প্রথমে তার শরীর , তারপর তার কান , যতক্ষণ পর্যন্ত তার হাসিটা

ওইটুকুই পড়ে থাকে।

একটা চেশায়ার বিড়াল ফুটবল খেলার দুটো পা সমেত।

আমি তার কানে ফিসফিস করে বলি: শুভরাত্রি ডেভ।”

এটুকুই , এর মধ্যে অশালীন কিছু নেই।

সে নিছকই আমার শীর্ষস্থানীয় বন্ধুদের মধ্যে একজন ,

আশ্চর্যজনকভাবে অযৌন । 

 

 

 

 

 

ভিক্টোরিয়া বেকহ্যাম , ডেভিড বেকহ্যামের স্ত্রী । ‘স্পাইস গার্লস’ নামক বিখ্যাত ব্যান্ডের অন্যতম সদস্য।


ধারাবাহিক গদ্য : চন্দন মিত্র




 

জন্মের আগের মুখ : জেন তত্ত্ব ও জেন কোয়ানের অমায়িক ভুবন     

পঞ্চম আচার্য হং-জেন : জন্মান্তরিত এক তাওবাদী 
 
জন্মান্তর, পুনর্জন্ম এই ধরণের শব্দগুলি আমাদের মনোজগতে এক রোমাঞ্চকর আবহ সৃষ্টি করে।  জীবনের অন্তহীন প্রবাহের কথা ভেবে; আমাদের জীবনদাঁড় দুলে ওঠে। আমরা আশ্বস্ত হই, প্রাণিত হই, নতুন করে সবকিছু শুরু করার সুযোগ পাওয়া যাবে ভেবে উৎফুল্ল হই। এজন্মের যাবতীয়  ভুলভ্রান্তি শুধরে নতুন হয়ে ওঠার এই সুযোগ আমাদের কতটা হ্লাদিত করে, তা কী আর কথায়  প্রকাশ করা সম্ভব! ভারতীয় উপমহাদেশে উদ্ভূত ধর্মগুলির প্রায় সবকটিই জন্মান্তরবাদের ধারণাকে ভরকেন্দ্র করে মাথা তুলেছে ও পল্লবিত হয়েছে। বিশেষত হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির প্রায় সমস্তটাই জন্মান্তরবাদকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। তুলনামূলকভাবে দেখলে বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতিতে জন্মান্তরবাদের প্রভাব লঘু। তাত্ত্বিকভাবে বৌদ্ধধর্ম আংশিক জন্মান্তরবাদী হলেও আত্মার অবিনশ্বরতায় বা শাশ্বত আত্মায় বিশ্বাসী নয়। বুদ্ধদেব আত্মাকে রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান ; এই পঞ্চস্কন্ধের সমাহার হিসাবে দেখেছেন। তাঁর মতে আত্মা নিত্যও নয়, আবার  অনিত্যও নয়। বাদবিসংবাদ এড়িয়ে তিনি এ বিষয়ে মধ্যমপন্থাকেই বেছে নিয়েছেন। তবে কোথাও কোথাও তাঁকে জন্মান্তরবাদের সমালোচনায় উচ্চকিত হয়ে উঠতেও দেখি। যেমন সুত্তপিটক-এর মজ্ঝিমনিকায়-এর চুলদুকখকখন্ধসুত্তে জৈন সন্ন্যাসীদের সঙ্গে কথোপকথনে তাঁকে আমরা ভিন্ন মাত্রায় পাই। রাজগৃহের গৃধ্রকুট পর্বতে অবস্থানকালে বুদ্ধ একদল মহাবীর-অনুগামীকে দেখেন, যাঁরা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কৃচ্ছ্রসাধন করছিলেন। তিনি তাঁদের জিজ্ঞাসা করে জানতে পারেন, ওইভাবে তাঁরা পূর্বজন্মের পাপ ক্ষয় করছেন এবং বর্তমান জন্মে পাপ-বিরত থাকছেন ও দুঃখ তাড়াচ্ছেন। তখন বুদ্ধ সেইসব  মহাবীর অনুগামীদের সঙ্গে কথোপকথনে রত হন। তিনি বলেন,    
 — বন্ধুগণ, আপনারা কি জানেন আপনারা পূর্বে জন্মেছিলেন কি জন্মাননি ? 
— না। আমরা তা ঠিক জানি না।
— আপনারা কি জানেন যে, পূর্বজন্মে পাপ করেছিলেন কি করেননি ?
— না। আমরা তা ঠিক জানি না।
— আপনারা পূর্বজন্মে কীধরনের পাপ করেছিলেন, তা কি জানা আছে ?
— না। আমরা তা ঠিক জানি না। 
— আপনারা কি জানেন, আপনাদের এই কৃচ্ছ্রসাধন কতটা দুঃখ কমাল এবং আরও কতটা দুঃখ কমাতে হবে অথবা আরও কতটা দুঃখ কমালে সমস্ত দুঃখই লোপ পাবে?  
— না। আমরা তা ঠিক জানি না।
বুদ্ধ, এবার তাঁদের যে কথা শোনালেন, তা শোনার জন্য তাঁরা আদৌ প্রস্তুত ছিলেন না। 
— তাহলে কি বিষয়টি এরকম নয় যে, যাঁরা পূর্বজন্মে পাপীতাপী, বর্বর বা নিকৃষ্ট শ্রেণির মানুষ ছিলেন তাঁরা সব এজন্মে পাপক্ষয়ের জন্য মহাবীরের দেখানো পথে কৃচ্ছ্রসাধন করছেন ? 
আবার মজ্ঝিমনিকায়-এর চুলমালুঙ্ক্যপুত্তসুত্তে আমরা দেখি, ভিক্ষু মালুঙ্ক্যপুত্ত-এর জিজ্ঞাসার উত্তরে বুদ্ধদেব বলছেন, শরীর ও আত্মা অভিন্ন বা শরীর ও আত্মা ভিন্ন ; মৃত্যুর পর তথাগতের পুনরায় জন্ম হয় বা জন্ম হয় না ; এসব কথা বিশ্বাস করলে অথবা বিশ্বাস না-করলে জন্ম-জরা-মরণ চক্রে তার কোনও প্রভাব পড়ে না। সুতরাং দুঃখ বিনাশের পথ জুড়ে দাঁড়ানো প্রশ্ন ছাড়া অন্য সব প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়াই উচিত। বস্তুত মানবকল্যানের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত নয়, এমন জিজ্ঞাসার উত্তরে বুদ্ধদেব অধিকাংশ সময় নীরবতা পালন করেছেন বা কৌশলী উত্তর দিয়েছেন। বুদ্ধের এই অলৌকিকতা বিরোধী ভূমিকা অনুসারীদের অনেককেই আহত করেছে।  তাই হয়তো তাঁদের উদ্যোগে সংকলিত হয়েছে জাতককাহিনি। বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া প্রচলিত গল্পকথাগুলিকে একত্রে গ্রন্থন করে কেন্দ্রীয় চরিত্রের স্থানে বসানো হয়েছে বোধিসত্ত্ব তথা বুদ্ধদেবকে। এই আখ্যানসম্ভারকে  বুদ্ধদেবের পূর্ববর্তী জন্মসমূহের বাস্তব-কাহিনি আখ্যা দিয়ে প্রচারও করা হয়েছে সচেতনভাবে।   
       ভারতবর্ষ যে কেবল জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসীদের দেশ, এমনটা নয় মোটেও।  ভারতবর্ষে জন্মান্তরবাদের ধারণাকে যারপরনাই ধ্বস্ত করেছে চার্বাক নামের দার্শনিকগোষ্ঠী। তাঁদের যুক্তি কিছুটা স্থূল হলেও বাস্তবিক, অকাট্য ও ক্ষুরধার। তাঁরা মাটি-জল-আগুন-হাওয়া এই চার ভূত বা উপাদান দিয়ে জগৎ ও জীবনের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করেছেন। যদি এই চার জড় উপাদান দিয়ে দেহ গঠিত হয় তাহলে চৈতন্য এল কোথা থেকে ? এর উত্তরে চার্বাকীয় যুক্তি — যেমন সবুজ পান, সাদা চুন ও কালো খয়ের একত্রে মিশ্রিত হয়ে লাল রং উৎপন্ন করে তেমন উক্ত ভূত চতুষ্টয় মিশ্রিত হয়ে চৈতন্যের তথা তথাকথিত আত্মার জন্ম দেয়। এ বিষয়ে তাঁরা আরও বলেছেন —  
তচ্চৈতন্য-বিশিষ্ট-দেহ এব আত্মা, দেহাতিরিক্তে আত্মনি প্রমাণাভাবাৎ।- (সর্বদর্শনসংগ্রহ)
অর্থাৎ :  চৈতন্য-বিশিষ্ট দেহই আত্মা। দেহাতিরিক্ত আত্মার কোনও প্রমাণ নেই।  

এবং 

ভস্মীভূতস্য ভূতস্য পুনরাগমনং কুতঃ।(চার্বাকষষ্ঠি-৩৩)
অর্থাৎ : ভস্মীভূত জীব বা দেহের পুনরাগমন কোনও কারণেই হতে পারে না।  
  
বুদ্ধের সমসময়ে অজিত কেশকম্বলীর মতো বস্তুবাদী দার্শনিকও ছিলেন, যিনি আত্মাকে দেহের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে দেহের মৃত্যু হলে আত্মারও বিনাশ ঘটে। আবার তিনি শ্রমণজীবন যাপনের মাধ্যমে একথাও বুঝিয়ে দিয়েছেন নীতি-নৈতিকতা বা বৈরাগ্যের সঙ্গে অলৌকিকত্বের কোনও ওতপ্রোত সম্পর্ক  নেই। কেবল অজিত কেশকম্বলী নয় তাঁর মতো আরও অনেক দার্শনিক বা শ্রমণ ছিলেন যাঁরা বেদ-ব্রাহ্মণের তোয়াক্কা না-করে নিরীশ্বরবাদী আত্মজ্ঞানের সাধনায় নিষ্ঠ ছিলেন। এই ধারাটি বিরল হলেও এখনও আমাদের দেশে চলমান। এখনও তন্নিষ্ঠ খোঁজ থাকলে মেলায়-মোচ্ছবে বস্তুবাদী নিরীশ্বর সাধুসন্তের সন্ধান মেলে। আর  বাউল-ফকিরেরা তো তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিক উভয় দিক থেকেই ঈশ্বর-আল্লা-স্বর্গ-নরক-দোজখ-বেহেস্তে আস্থাহীন। অবশ্য আমাদের মতো ছাপোষা মানুষের মাথায় এই ধাঁধাটা কোনোভাবেই ঢুকবে না যে, ঈশ্বর-আত্মা-স্বর্গ-নরক না-মেনেও মানুষ কীভাবে এমন অনিকেত-জীবন বেছে নিতে পারে !  
       পঞ্চম আচার্য হং-জেন-এর জীবনকাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক চমকপ্রদ জন্মান্তরবাদের বৃত্তান্ত। Denkoroku বা Transmission of The Dharma Jewel নথিতে এই অভিনব  জন্মান্তর-কথা লিপিবদ্ধ আছে। আচার্য হং-জেন পূর্বজন্মে ছিলেন একজন তাওবাদী ভবঘুরে। তাওবাদ (Taoism) চিনদেশের অন্যতম প্রাচীন এক প্রায়োগিক দর্শন, যাকে ধর্মমত হিসাবেও চিহ্নিত করা যায়। লাও ৎজে (Lao Tze) প্রণীত তাও তে চিং (Tao Te Ching) এই মতের প্রথম লিখিত নিদর্শন। প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে থেকে যৌগিক ক্রিয়াকলাপের চর্চা, বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ও ভেষজ দ্রব্যের ব্যবহার ইত্যাদির মাধ্যমে তাওবাদীরা দীর্ঘ ও নীরোগ জীবন লাভের সাধনায় ব্যাপৃত থাকতেন। তাওবাদী জন্মে হং-জেন-এর নিবাস ছিল পূর্ব চিনের হুয়াংমেই পরগনার চিচৌ নামক স্থানে। অল্পবয়স থেকে গাছ লাগানোর এক নেশা তাকে পেয়ে বসে। বয়স বাড়ে কিন্তু নেশা যায় না, বরং বাড়তে থাকে। ভবঘুরে জীবনে গাছেরাই তাঁর সংসার হয়ে ওঠে। একদা হুয়াংমেই-এর পার্বত্য অঞ্চলে গাছ লাগিয়ে বেড়ানোর সময় তিনি চতুর্থ আচার্য তাও-সিন-এর সম্মুখীন হন। তাও-সিন-কে দেখে তিনি বিনীত প্রার্থনা নিবেদন করেন, আপনি দয়া করে  আমাকে বোধিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণা দিন। তাও-সিন বলেন, আপনি ইতিমধ্যে পৌঢ়ত্বে উপনীত  হয়েছেন। আপনাকে আমি বোধি-সংক্রান্ত ধারণা দিলে তা আপনি কাজে লাগানোর মতো সময় পাবেন না। এ জন্মটা তো আপনি বহাল তবিয়তেই কাটিয়ে দিয়েছেন, আপনি বরং পরের জন্মে আমার কাছে আসবেন। আমি আপনার প্রতীক্ষায় থাকব। কথাবার্তা আর এগোয় না। তাও-সিন হন হন করে এগিয়ে যান। পৌঢ় তাওবাদীও পুনর্জন্ম  নেওয়ার জন্য উপযুক্ত জঠরের সন্ধানে বেড়িয়ে পড়েন। যেতে যেতে তিনি এক নদীর তীরে পৌঁছান। পথ শেষ  নদী পার হতে হবে। হঠাৎই পৌঢ় দেখেন, এক যুবতী নদীতে কাপড় ধুয়ে সেগুলি পাড়ে মেলে দিচ্ছেন। সেই  যুবতীকে তাঁর খুব  মনে ধরে। তিনি তাঁর কাছে গিয়ে কোনোরকম ভণিতা ছাড়াই অকপটে বলেন, আমি আপনার গর্ভে  জন্ম নেওয়ার জন্য আজ রাতে আপনার সঙ্গ পেতে চাই। পৌঢ় আগন্তুকের প্রস্তাব শুনে যুবতী তো  অবাক! সে বলে, বাড়িতে আমার দাদা আর বাবা আছে, আপনি বরং আমার সঙ্গে চলুন তাঁদের কাছে প্রস্তাব রাখুন। পৌঢ় সপ্রতিভভাবে জানান, কারোর অনুমতি নেওয়ার ইচ্ছে আমার নেই। আমি আপনার কাছে প্রস্তাব রেখেছি আপনি সম্মতি দিলে আপনার সঙ্গে আজ রাতটা থেকে যাব; আপনি অসম্মত হলে আমি এই মুহূর্তে এই স্থান ত্যাগ করব। পৌঢ়ের কথায় বোধহয় জাদু ছিল বা অন্যকিছু ! নচেৎ কেন বা সেই যুবতী অচেনা এক পৌঢ়ের সঙ্গে নির্জন নদীতীরে রাত্রিযাপনে  সম্মত হবে ! পৌঢ় তাঁর কথা রাখলেন, সকাল হতেই তিনি সেই স্থান ত্যাগ করে চললেন অনির্দেশ্য কোনও গন্তব্যে। যুবতীও ফিরলেন তাঁর বাড়িতে। কয়েকদিন পরে যুবতী অনুভব করলেন তিনি সন্তানসম্ভবা। বিষয়টা জানাজানি হতে বেশি সময় লাগল না। যুবতী তাঁর বাড়ি থেকে বিতাড়িত হলেন। একটি কুটিরে আশ্রয় নিয়ে তিনি কাপড় বুনে কোনোরকমে দিন গুজরান করতে থাকেন। যথাসময়ে তিনি এক সর্বাঙ্গসুন্দর ফুটফুটে পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। কিন্ত এক তীব্র ঘৃণায় সেই নবজাতককে তিনি কুটিরে ত্যাগ করে পালিয়ে যান। কিন্তু পরের দিন শিশুটির পরিণতি দেখার জন্য ফিরে আসেন। আর আশ্চর্য হয়ে দেখেন শিশুটি দুটি সারমেয় শাবকের সাথে দিব্যি খেলে বেড়াচ্ছে। সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঘুচিয়ে তিনি পরম মমতায় শিশুটিকে বুকে তুলে নেন।  
       পিতৃপরিচয় না-থাকায় শিশুটি সামাজিক অবজ্ঞার শিকার হয়, তাঁর মাও নিজের বৃত্তি হারিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নিতে বাধ্য হন। এইভাবে অভাবে অনাদরে বেড়ে উঠতে থাকে শিশুটি। একদিন চতুর্থ আচার্য তাও-সিন-এর নজরে পড়ে সে, তার তখন সাত–আট বছর বয়স, কোনও কোনও নথি অনুযায়ী বারো। পথ-বালকের অনিন্দ্যসুন্দর অবয়ব দেখে থমকে যান চতুর্থ আচার্য। তিনি ছেলেটিকে সস্নেহে কাছে ডেকে নেন, নাম জিজ্ঞাসা করেন। অতঃপর দুজনের মধ্যে শুরু হয় অলোকসামান্য কথোপকথন। 
– বালক, তোমার নাম কী ?
- আমার একটা নাম আছে, তবে তা স্থায়ী নয়।
- নামটি শুনি ।
- বুদ্ধ-প্রকৃতি । 
- সত্যিই কি তোমার অন্য কোনও নাম নেই।
- নাম তো শূন্য, ও নিয়ে আমি মোটেও মাথা ঘামাই না।  
তাও সিন-এর বুকের থেকে যেন পাথর নেমে যায়। এতদিনে তিনি তাঁর অন্বিষ্টকে নাগালে পেলেন। তিনি বালকের  সঙ্গে তাঁর মায়ের কাছে গেলেন। তাঁর মায়ের গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা করে তিনি সেই বালককে নিয়ে এলেন তাঁর পাহাড়তলির মঠে। 
       এই আখ্যান কি আক্ষরিক অর্থে কোনও জন্মান্তরবাদের ঘটনাকে আমাদের সামনে তুলে  ধরছে ? অথবা এই আখ্যান কি জন্মান্তরবাদীদের সন্তুষ্ট করতে সক্ষম ? দুটি ক্ষেত্রেই না-বাচক উত্তর আসবে। কারণ জন্মান্তর বা পুনর্জন্ম বলতে আমরা বুঝি মরে আবার জন্ম নেওয়া। অর্থাৎ, মৃত্যুর সময় একটি দেহ থেকে যে আত্মাটি বেরিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই আত্মাটি যখন কোনও গর্ভস্থ ভ্রূণের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে ক্রমপরিণতিতে নবজাতক হিসাবে ভূমিষ্ঠ হয়, কেবল তখনই বিষয়টিকে জন্মান্তর বা পুনর্জন্ম হিসাবে দেখানোই শাস্ত্রসম্মত। কিন্তু এক্ষেত্রে আত্মা স্থানান্তরের কোনও ঘটনাই  ঘটেনি। তা হলে এমন ঘটনাকে প্রামাণ্য চ্যান-নথিতে জন্মান্তর বলার কারণ কী ? এর উত্তর পেতে আমাদের সুদূর চিনদেশে দৌড়াতে হবে না, উত্তর আমাদের বাড়ির পাশেই আছে। আমাদের দেশের বস্তুবাদী সাধুসন্ত ও বাউল-ফকির-সহজিয়ারা সন্তানের জন্ম দেওয়াকে জন্মান্তর বা পুনর্জন্ম বলেন। তাঁরা বলেন পুনর্জন্ম মানেই মায়ার ফাঁদে পা দিয়ে দুঃখ-দুর্দশাকে আমন্ত্রণ জানানো। তখন সাধক আত্মজ্ঞানের পথ থেকে ভ্রষ্ট হয়ে আত্ম-প্রতিভূকে প্রতিষ্ঠা দিতে গিয়ে আত্মহারা হয়ে পড়েন। তাই তাঁরা সাধনসঙ্গিনী গ্রহণ করলেও সন্তান-গ্রহণে বিরত থাকেন। আর শাস্ত্রকথিত অনুমাননির্ভর জন্মান্তর তথা পুনর্জন্মকে তাঁরা উপহাসে উড়িয়ে দেন। চ্যানধারাও এই বস্তুবাদী জন্মান্তরকেই গ্রহণ করেছে। আর সেই তত্ত্বই এই আখ্যানের মাধ্যমে ব্যাখ্যাত হয়েছে।  
       হং-জেন, খুব অল্প বয়সেই পঞ্চম আচার্য তাও -সিন-এর পতোউ (Potou) উপত্যকার ঝেংজুই (Zhenjue) মঠে নবিশি শুরু করেন। তিনি প্রায় পাঁচ দশক গুরু তাও-সিন-এর সান্নিধ্যে থাকেন। তাও-সিন প্রথম দর্শনেই বুঝেছিলেন এই বালকই একদা হয়ে উঠবেন চ্যানধারার সম্মানীয় আচার্য। হং-জেন-এর জ্ঞানস্পৃহা, ধ্যান-তন্ময়তা কোনও কিছুই তাও-সিন-এর নজর এড়ায়নি। তিনি প্রিয় শিষ্যকে অধীত বিদ্যা উজাড় করে দেন। উপযুক্ত আধার বুঝেই হং জেন-কে তিনি ক্রম-বোধি ( Gradual Enlightment) ও হঠাৎ বোধি ( Sudden Enlightenment), এই দুই ধরনের বোধির জ্ঞান দান করেন। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে তাও-সিন,  প্রিয় শিষ্য হং-জেন-কে একটি স্তূপ নির্মাণের অনুরোধ করেন। শিষ্য বোঝেন গুরুকে আর  বেশিদিন ধরে রাখা যাবে না। একদিন সকলের অগোচরে তাও-সিন প্রিয় শিষ্যের হাতে পরম্পরিত চীবর ও ভিক্ষাভাণ্ড তুলে দেন। এইভাবে তাও-সিন, প্রিয় শিষ্য হং-জেন-কে পঞ্চম আচার্য হিসাবে নির্বাচন করেন। কয়েকদিন পরেই তাও-সিন উপবিষ্ট অবস্থায় নির্ভার মনে মহাপ্রস্থানের পথে পা রাখেন। 
       গুরু প্রদত্ত দায় শিরোধার্য করে হং-জেন নিজস্বতার খোঁজে বেড়িয়ে পড়েন। বেশিদূর যেতে হয় না, সুয়াংফেং (Suangfeng) পর্বতের ফেংমাও (Fengmao) উপত্যকায় তিনি পেয়ে যান অভীষ্ট সাকিন; নির্মাণ করেন তাঁর নিজস্ব চ্যানমঠ। একদিন তিনি খবর পান অদূরের রাও (Rao) নামের গঞ্জটিতে কী একটা পরব চলছিল, সেখানে কুখ্যাত জঙ্গলদস্যু কে-দাহান ( Ke Dhan) তার দলবল নিয়ে হানা দিয়েছে। অকুতোভয় হং-জেন একাই পৌঁছে যান দস্যুকবলিত গঞ্জে। দীর্ঘদেহী সুঠাম চেহারার ভিক্ষুকে দেখে দাহান ও তার দস্যুদল নিজেদের মধ্যে কানাকানি  করে তারপর অকুস্থল ত্যাগ করে। থমকে যাওয়া গঞ্জে আবার উৎসবের মেজাজ ফিরে আসে। গুরু তাও-সিন-এর মতো হং-জেনও অনতিবিলম্বে খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন। তাঁর মঠে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। চৈনিক নথি অনুয়ায়ী এই সংখ্যা পাঁচশ বা সাতশ। হং-জেনও গুরুর মতো ক্রম-বোধি ও হঠাৎ বোধি; এই দুইপ্রকার বোধি  সম্পর্কিত ধারণা শিষ্যদের সামনে তুলে ধরেন। গুরুকে অনুসরণ করে তিনিও লঙ্কাবতার সূত্রের সঙ্গে মহাপ্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র ও বজ্রচ্ছেদিকা সূত্রের চর্চা শুরু করেন। অচিরেই চ্যানগুরু হিসাবে হং-জেন-এর নাম রাজসভা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তাং বংশীয় সম্রাট গাওজং (Gaozong : 628-683) দূত মারফত তাঁকে রাজসভায় ডেকে পাঠান। ডেকে পাঠালেই হল, কার শিষ্য দেখতে হবে তো ! তাঁর গুরু কোনোদিন রাজাজ্ঞাকে পাত্তা দেননি,  তিনি কীকরে গুরুর আদর্শ লঙ্ঘন করেন ! শেষমেশ হং-জেন-এর জেদের কাছে নত হয়ে সম্রাট গাওজং ডংশান মঠের একগুঁয়ে অধ্যক্ষের জন্য উপঢৌকনসহ খাদ্যসামগ্রী ও ঔষধপত্র পাঠিয়ে দেন।  
       হং-জেন একদা, ষষ্ঠ আচার্য নির্বাচনের জন্য বুদ্ধ-প্রকৃতির স্বরূপ-নির্ণায়ক একটি শ্লোক প্রতিযোগিতার আয়োজন  করেন। তখন তিনি ষাটোত্তীর্ণ। মঠের সকলের মতো তিনিও জানতেন, প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করে শেনজিউ-ই হবেন ষষ্ঠ  আচার্য। কারণ অনুগামীদের মধ্যে শেনজিউ ছাড়া ওই গুরুভার কে বহন করবে ! সে যেমন বয়োজ্যেষ্ঠ, তেমন প্রাজ্ঞ। কিন্তু এই হিসাব মেলে না। মাত্র কয়েক মাস আগে দক্ষিণ দেশ থেকে আসা এক অকুলীন নিরক্ষর কাঠুরে হুইনেং একটি শ্লোক  লিখে ভবিতব্য বদলে দেন। কিন্তু হং-জেন বোঝেন, প্রকাশ্যে হুইনেং-এর হাতে পরম্পরিত চীবর ও ভিক্ষাভাণ্ড তুলে দিয়ে তাঁকে ষষ্ঠ আচার্য হিসাবে স্বীকৃতি জানালে তাতে সহজসরল গ্রাম্য কিশোরটির জীবন বিপন্ন হতে পারে। তাই তিনি এক রাত্রে হুইনেং-কে ষষ্ঠ আচার্যের পদে অভিষিক্ত করেন। শুধু তাই নয় তিনি পথপ্রদর্শক হয়ে হুইনেংকে সঙ্গে নিয়ে দুর্গম পার্বত্য পথ পার হয়ে তাঁকে নৌকায় চাপিয়ে নদী পার করে দেন। পরম্পরিত চীবর ও ভাণ্ড সুযোগ্য শিষ্যের হাতে পৌঁছে যাওয়ায়  হং-জেন এবার সমস্ত দায়দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চান। তিনি ভিক্ষু শুয়াংজে (Xuanze)কে একটি স্তূপ নির্মাণের  কথা বলেন। শাংয়ুইয়ান অব্দের দ্বিতীয় মাসের একাদশতম দিন, খ্রিস্টীয় হিসাবে ৬৭৫ অব্দ, হং-জেন তখন চুয়াত্তর ; সদ্য  সমাপ্ত স্তূপের নিকটে তিনি ধ্যানে বসেন, আর ওঠেন না।           

 তথ্যসূত্র : 
১. ভগবান বুদ্ধ, ধর্মানন্দ কোসম্বী, সাহিত্য অকাদেমি ২০১২
২. মধ্যম নিকায়, বেনীমাধব বড়ুয়া, ত্রিপিটক বোর্ড কলকাতা ১৯৪০
৩. THE MIDDLE LENGTH DISCOURSES OF THE BUDDHA : A TRANSLATION OF THE MAJJHIMA NIKAYA, TRANSLATED BY BHIKKHU NANAMOLI AND BHIKKHU BODHI, WISDOM PUBLICATION 1995.   
 ৪. DENKOROKU; THE RECORD OF THE TRANSMISSION OF THE LIGHT BY KEIZAN JOKIN ;  TRANSLATED BY HUBART NEARMAN, OBC SHOSTA ABBEY PRESS , CALIFORNIA .
৫. HISTORY OF ZEN BY YU-HISIU KU; SPRINGER, SINGAPORE.
৬. THE A TO Z OF BUDDHISM BY CARL OLSON, THE SCARECROW PRESS , UK. 
৭. ZEN MASTERS OF CHINA : THE FIRST STEP EASTBY RECHARD BRYAN MC DANIEL;   TUTTLE PUBLICATION, TOKYO/ VERMONT/ SINGAPORE.
৮. ZENS CHINESE HERITAGE BY ANDY FERGUSON ; WISDOM PUBLICATION, BOSTON. 

৯. THE ILLUSTRATED ENCYCLOPEDIA OF ZEN BUDDHISM BY HELEN J. BARONI ; THE ROSEN PUBLICATION GROUP , NEW YORK
১০. THE EMINENT MONK BY JOHN KIESCHNICK, A KURODA INSTITUTE, UNIVERSITY OF HAWAI PRESS, HONOLULU.     


ছবি : বিধান দেব 
                             

সোমবার, ২৮ জুন, ২০২১

কবিতা : প্রাণজি বসাক


 

মিরর 


তেল চুকচুকে কাঠের ফ্রেমে আটকানো বেলজিয়াম 
আয়নার বয়স বাড়ে না --- দিনদিন বাড়ে প্রতিচ্ছবির
আয়নাটির পেটে ভরা একমাথা ঝাকড়া চুলের ঢেউ 
কখনও লম্বা বিনুনি আর লালফিতের অহংকার 

আসন্ধ্যা সারা পাড়া চষে নির্মিত আখ্যান ঢুলুনি চোখে 
চিরুনি ও আয়না একসময় পড়ার ঘরে জোট বাঁধে 
ভুরুর ঢেউ ভেঙে নেমে গেছে ভোরের শাপলা
মেঠো স্কুলপথ এখন উন্নতির নামে শান বাঁধা 

পুকুরের ও-ই পাড়ে লুকনো দৃষ্টি ফেসবুকে আসে 
না-লেখা চিঠির বয়ান বেশ মাসতুতো বোনের ঘরে 
স্কুলছুটির পর দীর্ঘ বিকেল গ্রাস করে গেছে সন্ধ্যা 
সে-ও ঘুরপ্যাঁচে মায়াবী শহরের ক্ষুন্ন ফ্ল্যাটে এবেলা 

একা থাকলেই আয়নাটা কেমন আকাশ নামিয়ে আনে

প্রবাহ 


যাকেই বলি একটা মনমতো ছবি আঁকো ভাই 
সবাই আঁকে খন্ড খন্ড মেঘ নীল আকাশের গায়
অনেক দূরে দূরে মেঘেরা ভাসে ওড়াউড়ি করে 

রাতে ঘুম আসে না --- রাত-জাগা গার্ড যেন
অসংখ্য তারা গুনে গুনে তন্দ্রা আসে ভোরে 
কারা স্নান সেরে ভেজা কাপড়ে উঠোন পেরোয়

মনে হয় এপাড়ার সবাই বেশ ভালো আছে 
অচেনা মনে হয় না কারো চৌকাঠ চৌহদ্দি 
তবু্ও কেউ আঁকে না মেঘবালিকার ছবি 

নদীর কাছে গিয়ে বলে না --- দাঁড়াও বন্ধু সেল্ফি তুলি
সে যেন সবার কাছে অজানা অচেনা অমূলক অশ্রেয় 




অশনি 

এইতো এলে --- সঙ্গে বৃষ্টিও এলো এলোপাতাড়ি 
উত্তমপুরুষ বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে ভিজে একশা 
খেলা হবে এবার হোক তা কাদাজলে হাডুডু 
ছুঁয়ে দিলেই --- মরা...তছনছ কোটের কাটা দাগ 

সন্ধেবেলায় পুকুরপাড়ে একা যেও না কখনও 
কয়েকধাপ সিঁড়ি থাকে জলের তলায় ---- আর 
পুটিমাছেরা খুঁটে খেতে আসে পায়ের ভেজা নখ
চাঁদ এসে কখন চুপিচুপি ঢেলে দেয় রুপালি নদী 

ফেরার পথে ভুলভুলাইয়া লাগে পথ হারাবে নিশ্চিত 



আঁকিবুঁকি 


আলতামাখা পা কবে সরে গেছে বাংলার দৃশ্যান্তরে
ধামালি রোদ ফেলে অন্ধকারে গান ধরেছে ভ্রমর
কথার পিঠে কথা প্রশ্রয়ে রূপকথা সিরিয়াল 
কারুর কানে বাজেনি হারমোনিয়াম মিহিসুর

জল বাড়ে আষাঢ়ে --- শ্রাবণে ভাঙে ঘাট তবু
ভাঙা ভাঙা সংলাপে জমে ওঠে ভাদরের প্রত্যয়

সকলেই সকলের আসামী --- কে তবে বিচারক 
বাঁশতলায় বনে জোনাকির বৃত্ত ওড়াউড়ি করে 
আঁকার দিদিমণি এইসব নিত্য আঁকে ক্যানভাসে


ছবি : বিধান দেব 

কবিতা : সায়ন রায়


 

হাসপাতালে প্রেম 


ডেটলের গন্ধ আজ রজনীগন্ধার হাসি নিয়ে ঝরে পড়ছে তোমার মুখে।

প্রিয়তমা, তোমায় ভালবাসি।এটা বিনোদন পার্ক নয়।নয় নির্জন 

নদীর ধার।  ৪টে ৫টার ভিজিটিং আওয়ারে আমরা চালাচ্ছি

প্রেমালাপ।দূর বহুদূর থেকে ভেসে আসছে ঘন্টাধ্বনি। পাহাড় 

চুড়োয় কোনো ত্রিকালদর্শী দেবতার মন্দিরের নয়।সময় শেষের

ঘন্টি।মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে আসে।খরস্রোতা নদীর মত বয়ে যায় সময়।

আমাদের আয়ু বাড়ে। কথা ফুরোয় না।মর্ত্যের এক অতিসাধারণ 

দ্বাররক্ষী এসে ঘোষণা দিয়ে যান।  যিনি পারিজাত দেখেননি।

বাইরের দূষিত হাওয়ায় আমার হাত ভিজে আছে।না,তোমার হাত

ছোঁব না। বিদায় প্রিয়তমা।আজ যেখানে শেষ করলাম,কাল আবার

সেখান থেকেই শুরু হবে আমাদের খোঁজ। 


২.

তোমার ক্যাথিটার খোলা হলে যে আনন্দ হয় প্রিয়তমা, এখন মনে 

হয়, প্রথম চুম্বনে তা অধরাই ছিল।তোমাকে এভাবেও পাবো ভাবিনি

কখনো। নড়বড়ে সাঁকো দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি আমরা। আর কুয়াশার 

চাদরে ঢেকে যাচ্ছে রাস্তাঘাট দূর জনপদ। আশ্চর্য এক সুর জেগে 

উঠছে। নাচের ছন্দে মৃদু মৃদু দুলছে এই হাসপাতাল। সেই দোলা 

তোমাকেও বিভোর করেছে।যখনই তাকাই দেখি, চাদরের তলায়

তুমি হাত নাড়ছো দ্রুত। বিদায়বেলার হাসি।প্রত্যুত্তরে আমি কি 

করি! নিজের হৃদয়টিকেই দোলাতে থাকি মুখের সামনে।

৩.

শরীর যখন আছে তা তো বিগড়োবেই। তবু এত ঢেউ এসে ভেঙে 

দিচ্ছে বাঁধ। দেখে চমকে ওঠো কেন?  একটা টেলিফোন রিং 

এম্বুল্যান্সের  উচ্চকিত শব্দে ফেটে পড়ে।আধো ঘুম আধো জাগরণে 

দেখো মাঝিমাল্লারা সেরে নিচ্ছে রাতের আহার।  ভোর হলে যাত্রা

শুরু হবে। ট্রলির নৌকায় চেপে এক ল্যাব থেকে আরো এক ল্যাবে।

প্রিয়তমা,বড় ভালবাসি।তোমার বিষাদ করুণ এই সৌন্দর্যের দ্যুতি

একজীবনের চাওয়া হয়ে থেকে গেল চোখের পাতায়।


৪.

আশঙ্কার মেঘ সরে গেলে পুষ্পবৃষ্টি হয়।চুলের কিনার ধরে গোলাপের 

পাপড়ি ফুটে থাকে। ডানা ছড়িয়ে এই হাসপাতালও আজ ভেসেছে 

আকাশে। নীচে খুব নীচে এক ছোট আবাসন। সেখানে বাসনকোসন 

আর বালিশবিছানারা বলাবলি করে।মুখ চাওয়াচাওয়ি হয়। গৃহিণীর 

হাতের ছোঁয়ায় জেগে ওঠে ঘুমন্ত সংসার।ফটোফ্রেম আর দরাজ চেয়ার

আড় ভাঙে।ছাদের কোণে কোণে জমে থাকা ঝুল অশ্রু মুছে নেয় 

হাতের চেটোয়।


ছবি : বিধান দেব 





 


কবিতা : দীপান্বিতা সরকার


 

তুমিময়


অভিযোগ করেছি কি? 

আমার শহরে পথের দু'ধারে কত জারুল গাছ, 

তা-ই শুধু তাকিয়ে দেখেছি।


আমার আশরীর শোক

শূন্য ঘরদোর, হৃদি অনাঘ্রাতা 

অভিযোগ করিনি কারও কাছে

তুমিময় প্রাণটুকু অন্ধকার হলে 

আকাশের নীচে এই এত বেগুনি জারুলফুল

অমনিই থোকা থোকা ভরে থাকবে,

আদরবিহীন।


 ২

তোমার গা বেয়ে আমি বুনো ধুন্দুলের লতা

দেখেছ চাষবাস?

কুঞ্চি পোঁতা, বাঁশ দিয়ে মাচা করা--

তুমি বাঁশ

আর আমি কিনা খুঁজি আড়বাঁশি!

 যাবার যে জায়গা নেই কোনও

তোমাকে ঘিরে ঘিরেই ফুল ফোটাই

হলুদ রঙের 

তুমি জানো না, লক্ষ্মীটি 

কাঁটালে পোকা এসে যখন তখন

উফ মাগো!  সব খেতে চায়


ছবি : বিধান দেব 

কবিতা : নীলাদ্রি দেব


 ঘুম কিংবা ঘাম বিষয়ক 





এক.

ঘুম হারিয়ে গেলে ঢাল বেয়ে নেমে আসে কুয়াশা

উলঙ্গ ঘরের ভেতর যুদ্ধরত 

                             দুটো কাঁচা লোহার তলোয়ার

যুদ্ধবিরতি ব্যর্থ শব্দবন্ধের মতো 

সময়ের ক্ষত ও ক্ষয়ের বিপরীতে আলো জ্বলে ওঠে

চিমনি বেয়ে উঠে আসে উত্তপ্ত আর্তনাদ 

সামান্য মধুর জন্য এ রাতকে অস্বীকার কোরো না

হ্যারিকেনের ফিতে ক্রমশ বেঁটে হয়ে আসছে


দুই.

এক পিয়ানো গান নিয়ে বসে আছি 

উন্মুক্ত আকাশে কত ফড়িং! 

দীর্ঘ বিরতির মতো যদি দাঁড়িয়ে থাকো 

              যাবতীয় জলছাপ উবে যাবে 

এত উত্তাপ সহ্য হচ্ছে না 

নখে নখে জমে উঠছে প্রাচীন শ্যাওলা 

সমস্ত দীর্ঘ রাতে 

   কীটনাশকের পাশে গান হয়ে বেজো


তিন.

এই অস্বীকার পর্ব গভীর প্রলেপ হয়ে আছে

যাতায়াতের পথে আপাতত কোনো টোলগেট নেই

লজ্জাবতীর ফুলগুলো জেগে থাকে, মুদে যায় পাতা

অতএব একে একে দুই মিলিয়ে নিও না 

মাকড়সার তাঁতে কিছু মাকু ছিল,

                   ওসব এতটা কার্যকরী, ভুলেও ভাবিনি

কাঁচের সিলিংয়ে নিজস্ব নিথর ছবি ভেসে ওঠে

দক্ষিণের পর্দা বলতে অস্তমিত আঁচল,

                        দারুচিনির গন্ধ, বিষণ্ন হলুদের দাগ


চার.

এমন অপ্রস্তুত অন্ধকারে খুব ঘাম হয় 

ফুলের শুকনো রেণু ছড়িয়ে দিই পুরনো অ্যালবামে

পদ্মপুকুরে মৃত আলোপোকাদের ডানা 

এলোমেলো টেক্সটের উপর তারপিন তেল 

শেষ রাতে নাম না জানা পাখি ডাকে 

পিছলে যাই সময়ের নামতার ভেতর


পাঁচ.

রেসমাঠের নিচে আমাদের কাঠের বাড়ি,

                       এখনও শব্দ শুনতে পাই 

ঘোড়ার কথোপকথনের ভেতর হারিয়ে গিয়েছিলে

দেখতে পাওনি উল্টানো আংটি 

স্পর্শ ডিকোড করতে অবরোধ দরকার 

তাই ব্যারিকেডের পাশে রাতপোশাক 

                আর আয়ু ফুরিয়ে যাওয়া ঘুমের ওষুধ


ছবি : বিধান দেব 

কবিতা : বিপ্রতীপ দে


 পদাবলী গোধূলির 


   দিয়েছিলাম দুঃখ তুমি ফেরাওনি তা,

   দূরের প্রাচীন কথায় আজও ডাকছে পাখি!

   নিরুদ্দেশের মধ্যে যে মন হারিয়ে গেছে,

   সেতার তারে আঙুল আঘাত তাকেই ডাকি!


     মৃত তারার অনেক দূরের একটু আলো,

    আকাশ থেকে কখন এসে ভরেছে ঘর!

    এই রকমই তোমায় ভাবি অন্ধকারে,

    কবে কখন হাত ধরেছে অচেনা ঝড়!


    শুকনো পাতার কষ্ট কিছু লাঞ্ছনাকে

    প্রবল হাওয়া ওড়ায় যখন, নিঃস্ব ক'রে

    নিজের ভেতর একটা বাঁচা ঠিক তখনই

   ঝড়ভাঙা গাছ বৃন্তটি ফুল আঁকড়ে ধ'রে !


    কেমন আছো ওই আড়ালের মধ্যে নিজে,

       জলঝিনুকে যত্ন করে দুঃখ রাখা!

     দেখবে আমায় শেষবেলাতে তাকাও যদি

      ওই গোধূলির আকাশ আমিই রক্তমাখা!

   

  

আলোর গান 


দুহাত পেতে আকাশে চাই নিরাময়ের আলো;

বাতাসে বিষ-নিঃশ্বাসের স্পর্শ আজ ভারী!

তোমার মন আমার মনে যৌথ দীপ জ্বালো,

ভাবো না, ঘন দুর্যোগেই সূর্য হতে পারি!


অশথ ঝাউ দেবদারু আকাশে মাথা তোলা,

অনেক পাখি রেখেছে বুকে মায়ার আত্মীয়!

যে-কোনো ব্যথাবোধের পাশে ফুলের চোখ খোলা

সবুজ গানঃ প্রিভেন্টশন বেটার দ্যান কিওর!


কীসের ভয় দেখাও মেঘ কালো আঁধার বেশে?

বিদ্যুতের ওই আলোর জীবনটুকু চেনা!

নদীতে পোড়া শরীর ছাই,চোখের জল মেশে,

বুভুক্ষার নিয়তি এই বেড়েছে ধারদেনা!


টাইটানিক ডুবছে সেই দৃশ্য কোলাহলে,

ভয়ের চোখে চোখ রেখে বেহালা ছড়টানা!

সব ভয়ের ঊর্ধ্বে আজও সাহস কথা বলে,

তোমার হাত মুঠোতে,ভয়, পেরোবো ঠিক জানা!



চিহ্নিতকে


   আকাশ চেনা তোমার মতো

    সবুজ পাতাটিও,

     'মনখারাপের অন্ধকারে

       অশ্রুফোঁটা দিয়ো!'


      এই কথাটি বললে তুমি

       কখন যেন কবে,

       আর বলেছ মাঠের শেষের

       দিগন্ত কি হবে!


       না-ফোটা ফুল কুঁড়ি তোমার

       চেনা আকাঙ্ক্ষারা,

       অনেকখানি আত্মীয় হয়

        অন্ধকারের তারার!


        যেমন করে ভাবতে আমায়

         আজও কি আর ভাবো,

         দেখবে ধুলোয় ভাঙা মনের

         চিহ্ন রেখে যাবো!


ছবি : বিধান দেব 


   

কবিতা : সুভাষ বিশ্বাস

 




হন্তারক

কে আমায় পাহারা দাও রোজ
কে জানালা বন্ধ করতে শেখাও

নদীর ওপারে কার বসবাস!
কে ওইপার থেকে দিনরাত বাঁশি বাজায়
আমাকে শীতলপাটি বিছিয়ে দেয়
রোদ্দুর মেখে ঘুমিয়ে থাকতে বলে!

ওপার থেকে কারো চিৎকার ভেসে আসে
গুটিগুটি ছোট্ট ছোট্ট পায়ে নক্ষত্রের
               গভীরে তাকে নেমে যেতে দেখি

আমি ভয় পেয়ে চোখ খুললেই
ডিম ভেঙে বেরিয়ে আসে লক্ষকোটি
                            বছরের আদি রাক্ষস

আগুন

ক্রমে ঘুম নেমে আসে সাদা চোখে
বলেঃআজকের মতো শেষ হলো তোমার
                                           খেলার ঘর

ওদিকে রাত বাড়তেই থাকে,বাড়তেই
                                                      থাকে
অদ্ভুত তুলোর ঘর,তুলো ওড়ে,ঘরও ওরে

অসময়ে যখন-তখন কিছু চাইলেই কী
                                             পাওয়া যায়

সবরকম অভ্যাস আছে,অভ্যাসের ক্ষিদে
                                                    আছে
তাহলে বাতাসের চোখ কীভাবে দেখা
                                                      যাবে!

বাতাসের চোখে বুঝি তামাম রাত্রির
                                কাজল লেগে আছে
রাতেরও তো দৃষ্টি আছে,লেপমুড়ি দিয়ে
                                               শুয়ে পড়ি
স্বপ্নে নিশ্চিত বাতাসের চোখ খুঁজে পাব
ভেবে দরজা বন্ধ করি।ভোর এসে স্বপ্নে
                                  আগুন জ্বেলে দেয়                                             

ঘুণ

গলে গলে পড়ে রাত বায়ুভুক প্রতিটি
                                                প্রহরে

তীর্যক তীর এসে ছুটে যায় এক,দুই,
                                                   তিন...
লক্ষহীন রোদ ও বৃষ্টির ভেতর কারা যেন
পাথরের চাঁই কেটে কেটে,কাঠপোকাদের
                                                      মতো
ঘুণ রেখে যায় প্রতিদিন

খোলস

এইমাত্র রাত্রি শেষ করল তার গতিপথ
নক্ষত্রেরা ঘুমিয়ে পড়েছে,অস্তিত্বের অস্তি
                                                         নেই
এত অন্ধকার কোত্থেকে আসে
নিজেকে জাহির করে সম্রাটের মতো!

তবে কী অদেখার আলো থাকে আঁধারের
                                                         ঘরে
নিত্যমুক্ত সত্য-সন্ধানী হয়ে সর্বব্যাপি
                                         ছড়িয়ে রয়েছে
তাতেই কী সে মিলিয়ে গেল এইমাত্র

মাঝখানে পড়ে রইল শুধু একটা খোলস

পরিত্রাণ

যখন সকল কাজে যতিচিহ্ণ বসে যায়
অকারণে সূর্য ওঠার দিকে চেয়ে থাকা
                                                      ছাড়া
অন্যকোনো পরিত্রাণ জীর্ণ পাতার মতো

সোহহং

ওই যে ফুলে ফুলে ঢাকা বসন্ত শুয়ে
                                                    আছে
একটু পরে দাউ দাউ নক্ষত্র,জ্বলে উঠবে
হাঁটা শুরু হবে ফের কতো কল্প শেষ করে
ফিরে আসবে আবার এই বসন্তের ফুলের
                                                      ভেতর
                        
গঙ্গার ঘাটে কারা নেমে যাচ্ছে
এইমাত্র কার পিণ্ডদান শেষ হলো
হাত পেতে ধরে নিচ্ছে দাউ দাউ অগ্নিশ্বর
পিণ্ডদানে খুশি হয়ে নাহম নাহম,তুঁহু তুঁহু
                                                         বলে

সত্য

সূর্য নেই,শুধু অন্ধকারের ফোঁকর সিঁধিয়ে
আমার তামাম জগৎ শুয়ে একপাশে
জল-স্থল,অন্তর-বাহির কিছুই স্পষ্ট নয়
বলছে- সত্যের স্বরূপ তোমরা দেখতে
                                                    চাও?

আমি ভয়ে দুচোখ বুজে ফেললাম
চারপাশ ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেল
ঘনঘোর মেঘের বুক ফেঁড়ে সত্য কী দেখা
                                          দেখা দেবে!

আমি চোখ বুজেই আছি,বুজেই আছি
শেষে বড়ো পিসেমশাই বললেন- তুই চোখ বুজে আছিস বলে সত্য প্রকাশ পেতে দ্বিধা বোধ করছে,পাছে তুই সহ্য করতে পারবি না ভেবে সে বেচারাও লজ্জায় মুখ লুকিয়েছে।


ছবি : বিধান দেব 
 

কবিতা : আবু রাইহান


 এসো আঁকড়ে ধরি 


হায় আমরা কোনোদিন চিন্তা করে দেখিনা, কোথা থেকে আমরা 

                  সচল দৃশ্যমান মানুষে পরিণত হলাম! 

কোনোদিন কী গভীরভাবে নিরীক্ষণ করেছি, একফোঁটা তরল থেকে 

                                 ধাপে ধাপে কিভাবে সৃষ্টির সেরা হয়ে উঠলাম!


আমাদের বিস্ময়কর সৃষ্টি রহস্যময়, তবুও আমাদের 

অন্তর্গত হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে না কোনো বিস্ময়!

ঊর্ধ্বাকাশে সাত স্তরের আসমান থেকে চাঁদ ছড়ায় বিশুদ্ধ আলো 

আর প্রদক্ষিণরত প্রদীপ্ত সূর্যের ঔজ্জ্বল্ল্যে নির্বাপিত হয় 

                                                           আঁধার রাত্রির কালো!


সীমাহীন আকাশের দিকে তাকিয়েও নিজেদের অতি ক্ষুদ্রতায় 

                                                   কেন যে কম্পিত হয়না এ হৃদয়, 

তোমার অলৌকিক মাহাত্ম্যের কথা জেনেও আমরা 

                 কেন এত অবাধ্য আর নির্ভয়!

নুহু নবীর কালের মানুষদের মতো আঙুলের বদলে হেডফোন গুঁজে রাখি কানে 

বিশ্বাসীদের বলা অমোঘ সত্য কথন সচেতনভাবে ঢোকাতে চাইনা প্রাণে!

নিকৃষ্ট মানুষের মতো অহরহ প্রত্যাখ্যান করে চলেছি ন্যায়ের বাণী 

প্রাচীন অবাধ্য জাতির মতো  ধ্বংসপ্রাপ্তিকে যেন না টেনে  আনি!


এখন কেবল সংকেতময় ইশারা, সামনে সমাসন্ন 

              মহাশক্তিধরের ক্রোধের মহাপ্রলয়ের প্রবল বৃষ্টি 

ভেসে যাওয়ার আগে এসো  আঁকড়ে ধরি 

                  নূহের নৌকার মতো বিশ্বাসীদের কিস্তি!


এখন জগৎ জুড়ে মহাসমারোহে প্রবল গতিতে প্রবহমান 

                           দূষিত স্ফুর্তির মৌষণকাল 

অথচ আমাদের অজানা নয়, বিশ্বাসী হৃদয়ের জন্য কেবল 

                  গচ্ছিত রয়েছে মহাআনন্দময় অনন্তকাল!


ছায়াময় অন্ধকার


হে আমার সান্ধ্য নদীর বিষন্নতা 

তোমার মুখ জুড়ে কেন ছায়াময় অন্ধকার, আর নীরবতা

রূপনারায়ণের কূলে দূর গ্রামে অস্তগামী সূর্যের 

মায়াময় আলোয় জেগে থাকে কেবল 

                অন্তহীন ভালোবাসার কথকতা!


বারান্দার অন্ধকারে তোমার একাকী রোদনে 

এ পৃথিবীতে বৃষ্টি নামে, তুমি কি তা জানো প্রিয়তমা! 

প্রিয়জনের হৃদয় থেকে চুইয়ে নামে বিন্দু বিন্দু জল

বিশুদ্ধ হৃদয়ে কেবল সঞ্চিত রেখো মহৎ ক্ষমা!


আমি ভালোবাসি সিজদাবনত অশ্রুসিক্ত আঁখি 

তোমার স্বর্গীয় বিশ্বাস জারিত মুখের অনাবিল হাসি!


ছবি : বিধান দেব 



কবিতা : অবশেষ দাস


তোমাকেই লিখছি


জলের অপর নাম রাধা আর স্নানের অপর নাম বৈরাগ্য তুমি বলেছিলে।


জ্যোৎস্নায় হেঁটে হেঁটে কথা দিয়েছিলে‌ শ্রাবণের অরণ্য দেখাবে।তোমার লেখা সেই তারা খসার গল্প 

আর পড়ি না। তোমাকে কতদিন কিছু লিখি না।  


যতবার তোমাকে লিখতে সাধ হয়, ঠিক ততবার একটা করে গাছ পুঁতি মাটিতে। আমার চরাচর জুড়ে জ্যোৎস্না নেমে আসে।


একদিন দেখি, আমার হাতে বসানো গাছগুলো তাদের ছেলেপিলেদের  নিয়ে অরণ্য হয়ে গেছে। 

শ্রাবন অরণ্যের হাওয়া এসে তারা খসার গল্পকে উড়িয়ে দিয়ে যায়।


দ্বিধাহীন আমি, আজ শুধু তোমাকেই লিখছি।



ময়ূরাক্ষী


তোমার পায়ের তলায় ময়ূরাক্ষী নদী ঘুমোচ্ছো। 

তোমার ইচ্ছের ভেতর সমাধি দেওয়া আছে, সবুজ গাছের মত একটা মন।

তোমার জেদের ভেতর শুধু ছাই উড়ে যায়। ভাসে পোড়া পোড়া গন্ধ।


তোমার ভেতর বাল্মীকি অনন্ত যুদ্ধ লেখে। এক কণা শান্তি লেখে না।


ছবি : বিধান দেব 

কবিতা : মোনালিসা রেহমান




কোনও একদিন 


মেঘলাদুপুর স্বমেহণে 

একদিন বিষণ্ণ শরীরে 

ঘাম হয়ে  আসে।


দুর্লভ অতীতের

শৃঙ্খলে  আবদ্ধ

এক শেকড়ের টান

আর  মুক্ত আকাশের

 টানাপোড়েন...

 অবিরত গল্প পোড়ায়।


 একদিন হলুদপাখি 

 সমস্ত বিষণ্ণতা সরিয়ে  

 রৌদ্রের হাসিতে উড়ে যায়।

 শৈশবের স্মৃতিতে ঝাপসা হয়ে 

 আসে তার মাইথোলজি।


অক্ষরগুলো




মৃগনাভি থেকে পায়ের পাতা

ভালোবাসার অক্ষরগুলো আজো 

তেমনভাবে লিখিত হয় ...

প্রেমের ভাষা তো একি থাকে চিরদিন

শুধু স্থান কালভেদে তা পাল্টে যায়

যুগে যুগে।

অস্থি মজ্জা শিরা উপশিরাগুলি

কিছু কিছু আটকে থাকে শিখণ্ডীর মতো

মধ্য আকাশে।


আকাশের সোনালি আলোর ছটা 

রেখে যায়  ধুসর বিকেলগুলো 

 ভেঙে ফেলা হয় মানঅভিমানের 

অদৃশ্য প্রাচীর।

সব দুঃখ ভেসে যাক অমৃতলোকে


সংগোপনে 





কিছু কথা রেখে যাই সংগোপনে

নিস্তব্ধ ঘোরের ভেতর...

বিষাদমাখা অশ্রুরা কেবল 

ঘোরাফেরা করে বিষণ্নতা।


শীতল স্রোত নেমে যায় বুকের 

ভেতর অসময়ে...

বিন্দু বিন্দু ঘাম আর রক্তিম রেখা

কেবলই স্মৃতির  ওপর খোদাই করা

একটা ফলক।



 নিজের ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করতে

করতে  পৃথিবী ও রণক্লান্ত।


ছবি : বিধান দেব