অর্জুন উবাচ--১৩
সৌহার্দ্যস্থাপনে পর্যটক পথ থেমে যায় অশ্বখুরের ধ্বনিতে। স্তম্ভিত চোখ অশ্বপৃষ্ঠে দেখে স্নিগ্ধ আগুন ।এক ঈপ্সিতা আগুনের পাশে দূরাগত ঈপ্সিত। পরিচয়পর্ব শেষে এক অমোঘ মোহের কাছে দাসখত। সব শর্ত নিঃশর্তে মেনে মণিপুরে ডানা মেলে ওড়ে তিনটি প্রেমার্ত বছর।
কিন্তু রক্তচক্ষু জিজ্ঞাসা তর্জনী উঁচিয়ে সামনে বলে, তৃতীয়-পান্ডব তবে প্রবৃত্তির দাস ? কৃষ্ণা ও উলূপীর অসাক্ষাতে এক শিকারী মনস্ক কামনা ? হে নির্লজ্জ বহুগামী, যে প্রেম আর তার থেকে অংকুরিত কুঁড়ি ইন্দ্রপ্রস্থে নিয়ে ফেরা অসম্ভব, কেন দু'টি নিস্পাপ ভবিষ্যৎ জ্বালালে লিপ্সার লকলকে আগুনে ? তোমার ভোগের সামগ্রীর দৃপ্ত উচ্চারণঃ চিত্রাঙ্গদার স্বামী এক ও অদ্বিতীয় অর্জুন, কিন্তু বহুগামী স্বামীর প্রেয়সীমাত্র তিনি। ''এই শুনে শুরু হয় না কি হৃদয়ের অন্তহীন দাহ ?
প্রশ্নবাণে বিদ্ধ পার্থ কি তবে সেই সারস্বত সুশীল, নিজস্ব প্রজ্ঞায় অদ্বিতীয়, কিন্তু অসংযমী লাম্পট্যে লাগামহীন ? দক্ষতা দায়হীন যথেচ্ছাচারে ? শরীরের সুখের জন্য, ইন্দ্রিয়ের সুখের জন্য নির্দ্বিধায় বেপথু ডুবে থাকতে চায় কর্দমাক্ত গোপনে? তবে কি অস্ত্রবিদ্যায় অদ্বিতীয় মন অসংযমী ঘুড়ি , লাটাই অন্যের হাতে ? এ ও কি তবে দেব শক্তির প্রভাব?
অর্জুন উবাচ - ১৬
বিচ্ছিন্ন বারোটা বছর উড়ে গেল মিশ্র আনন্দে
ভারত দর্শনে বর্ণিল আলোয় আলোকপ্রাপ্ত
তোমার সামনে আবার হাজির
এদেশের বিচিত্র বৈচিত্র্য আবিষ্কার
সে তো তোমারই নির্দেশ ও অশেষ করুণায়,
তা ছাড়া উলূপী কিংবা চিত্রাঙ্গদা উপাখ্যান
তোমার মতো ত্রিকালদর্শীর তো অজানা নয়
কেন তবে অধমের অকারণ সংবর্ধনা ?
আমি তবে বহুখ্যাত বাহুবলী ?
যাকে রক্তক্ষয়ী রাজনীতির নির্লজ্জ তোষণ ?
ভার লাঘব করতে প্রয়োজনে ছুড়ে ফেলা নর্দমায় ?
কিংবা সাজানো সংঘাতে নিকেশ অলিখিত নিয়ম ?
বাহুবলীর আলোকপ্রাপ্তি যুদ্ধজয় সমতুল্য ?
তাই বুঝি সংবর্ধনা ?
লজ্জিত সংবর্ধনা মাথা নীচু তোমার শ্রীচরণে
প্রেমের বিচিত্র লাবণ্যে স্নাত
আবিষ্কার অচেনা আমাকেই
সে তো তোমারই হিসেবি করুণায়
হে কৃষ্ণ, লজ্জিত সংবর্ধনা মাথা নীচু তোমার শ্রীচরণে।
অর্জুন উবাচ--১৭
রৈবতকে কিশোরী চাঁদ সামনে
এক নির্বাক শিলাখণ্ড তাকিয়ে আছি
সময় থেমে যায়
ফের শুরু হৃদয়ের খরা
নির্বাক কৌতূহল দেখে
চাঁদেরও দৃষ্টি নিবদ্ধ আমার দিকে !
দ্রৌপদী, উলূপী ও চিত্রাঙ্গদার ছবি
তখন কিছুটা ম্লান এক সম্ভাবনাহীন সম্ভাবনায়
তুমি বললে এ চাঁদ তোমার সহোদরা
আর আশ্বাসী পরামর্শ একে হরণ করা।
হে কৃষ্ণ, এটা সত্যি ভূ-ভারতে অপ্রতিরোধ্য পার্থ
স্নিগ্ধ দৃষ্টির কাছে পরাজিত
তাই আমাকে অপরাজেয় দেখতে চন্দ্রহরণের উপদেশ ?
না কি অত্মীয়তার বন্ধনে জড়িয়ে
এক বাহুবলী হাতের মুঠোয় রাখা ?
জানি তোমার অগ্রজের অজান্তে হরণ করলে
যুদ্ধ অনিবার্য, বাইরের এ যুদ্ধ সামলে নিলেও
ভিতরের যুদ্ধে নির্ঘাত পরাজিত হব,
কী করে সামনে দাঁড়াব
ইন্দ্রপ্রস্থে ব্যাকুল বারোটা বছরের ভার বুকে বয়ে
যিনি নির্বাক অপেক্ষায় ?
আমার অবাধ্য আবেগ কোনদিন লাগাম পরেনি
শোধরাতে সুযোগও তুমি দাওনি
উসকে দিয়েছ বীরত্বের আগুন
অপ্রতিরোধ্য পার্থ নিজের আবেগের কাছে বশীভূত জেনেও
তিন-তিনটি নারীর পাণি গ্রহণ করা জেনেও
উপদেশ সুভদ্রা হরণ ?
ছবি : বিধান দেব

বেশ সুন্দর লেখা, 'অর্জুন উবাচ'। কবি স্বার্থকভাবে রূপায়ণ করেছেন মহাভারতের অর্জুন চরিত্রকে। কবিকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই।
উত্তরমুছুন