যা কিছু লিখেছি সব সব প্রেমের কবিতা
১.
কিছুটা স্মৃতি, কিছুটা কল্পনা আর কিছু রৌদ্রের ঝিলিক
সারাদিন খুচরো পয়সার মতো গুণতে থাকি।
জান্তেপিকে মনে পড়ে।
জটিল নিদ্রা ভেঙ্গে তাকে কেউ না ভাবলেও
আমি জানি জ্যোৎস্নার আঙুলে জড়ানো লাজুক মুখে
তুমি স্থির হয়ে আছো।
২.
তুমি বড়ো এলোমেলো, আলস্যে মোড়ানো,
বলতে বলতে নীলে, দম আটকায় বিষাদে।
ক্ষণিক মাধুরী বয়ে আনা প্রণয়ের বিকেল
উসকায় স্মৃতি, অন্যপ্রান্তে প্রলয়ের ক্ষুধা,
ধূমায়িত চায়ে নিরবধি কার পদধ্বনি?
৩.
লুপ্ত অতীতের স্তব্ধ গল্পখণ্ড বেদনার ছায়া থেকে অল্প আলাদা
হয়ে পরিণয়সূত্রে মেলায় অস্পষ্ট জগৎ। ব্যর্থ লোকপুরাণ,
রূপকথা, হারিয়ে ফেলা শাশ্বত অন্ধকার, আষাঢ়ী পূর্ণিমায়
ছড়িয়ে দেয় খুলির অট্টহাসি, পায়রার জলরাশি।
তোমার হাড় হিম করা ফটোগ্রাফি, কতোরকম পাগলামী, রূপালি
ঝিলিক, স্মৃতির হাত ধরে জমা হয় লুতুপুত ভাবনার ভেতর।
৪.
শান্তাহার স্টেশনে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম। এক কম্পার্টমেন্ট
থেকে অন্য কম্পার্টমেন্টের ভূগোলে ঘুরতে ঘুরতে থেমে যায়
বুনো টাট্টু। আমিও হারিয়ে যাই।
কতো দূরে, কোথায় এসেছি চলে, উথাল ভাবনার মাঝে খুঁজে
দেখি নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে শিয়ালদহ স্টেশনের প্লাটফর্মে।
একে একে নর্থ ও সাউথের চৌহদ্দির মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে বিদ্বৎসমাজ।
আমাকে কে নেবে? সহস্র মাইলের ব্যবধান ভেঙ্গে অদ্ভুতভাবে
লেপ্টে যেতে থাকে বুনো বকুলের গন্ধ। পড়ার টেবিল, পোষা বাগান,
কুড়ানো বিড়ালছানা, গানের স্কুল, অভিজ্ঞানের শনপাপড়ি পথ দেখায়।
ধাপে ধাপে ইমামবাড়ার সুদীর্ঘ সিঁড়ি পেরিয়ে জড়িয়ে বসি সূর্যঘড়ির কাছে।
আমি তো পথ হারাইনি।
৫.
এলোমেলো হতে হতে দিনফুরানো পাতার মতো
গলা টিপে ধরা নদীর মতো
রোদ ঝলসে যাওয়া মুখের মতো
এত
বৃষ্টি
হলো
ভারী অন্ধকার পেপার ওয়েটের মতো
আমাকে ভাঙতে ভাঙতে ওর সব ডালপালা
আনন্দে ঠাসা পাখির বাসার ভেতর
পুঞ্জীভূত হলো।
তুমি দ্যাখো, তোমার জন্যই হাহাকার।
৬.
তুমি আমার, এর বেশি লিখতে থেমে যায় কলম
পাতার ফাঁক গলে, পথ করে দিচ্ছে সবুজ আলো।
আমি লিখতে পারছি না, আমি ঘুমাতে পারছি না।
মুখে লেগে থাকা উচ্ছিষ্ট, এঁটো-
জড়িয়ে যাচ্ছে চিন্তা, গলা শুকিয়ে-
ছাতিম ফুল, ছাতিম ফুল, সারা রাত তোমার ছায়া,
এলোমেলো গন্ধ, গলা শুকিয়ে আসছে, আমাকেও
স্পর্শ করছে পিপাসা।
৭.
মেঠো পথ, যেখানে কালো পিচের আঁচড় পড়েনি কখনো
তার বাঁক ধরে হঠাৎ দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন ডুমুর গাছ
জানে না, সামনে কীরকম নীরবতা
কোন ভূমিকা নিয়ে পথ তার দিক নির্দেশক
মোরগ ঝুঁলিয়ে রেখেছে।
যতোই হন্যে হয়ে খোঁজো, হারিয়ে যাওয়া মার্বেল
যেনো মায়াহরিণ, তোমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে
রোজ লোভ দেখাবে, সারারাত পাশে বসে
জোৎস্না মাখাবে, টেনে নিয়ে যাবে রহস্যের
দেবদারু বনে। যেনো ভুলে যাও
মানবজীবন, জন্মদিন, নিঃসঙ্গতা।
৮.
ঢেউহীন স্তব্ধ জলের অতলে, বকুল, তোমাকে মেলাতে পারিনা।
৯.
তোমার সঙ্গে কথা বলার জন্য কয়েক যুবক আমাকে শাসালে
ভয়ের পিরান পরে ঢুকে যাই গর্তে।
পড়ার টেবিলে মরে যাওয়া এক পোকাকে ঘিরে লাল পিঁপড়েদের
ভোজ উৎসবে কি মনে করে পোকাটিকে নাড়িয়ে দেই। মুহূর্তেই
ভেঙ্গে যাওয়া ভোজসভা থেকে হা হা করে ছুটে আসে পিঁপড়েরা,
শাসাতে থাকে। অতি সাহসী একজন কামড়ে দেয় হাতে। বিষের
তীব্র জ¦লুনি সয়েও কিছু বলিনি।
বাসা থেকে পড়ে যাওয়া এক শালিখ ছানাকে মায়ের কাছে
ফিরিয়ে দেবার মুহূর্তে কা কা করে উড়ে আসে অজস্র কাক।
ধারালো ঠোঁটের আঘাতে বিক্ষত আমি যন্ত্রণায় চেপে ধরি মাথা।
মানুষ, কাক, পিঁপড়ে কাউকেই কিছু বলিনি। বলবো না।
যেমন তোমাকে বলবো না, আদিগন্ত হলদু সর্ষে ফুলের মাঝে
ঘুরে বেড়ানো মৌমাছির কথা। মাটিতে আকাশের মিলে যাবার কথা।
১০.
মৃত্যুকে দূরে রেখে ছায়াকে আদর করি,
চুমো খাই।
তন্দ্রামগ্ন চোখ আচমকা দেখি
ছায়া-মৃত্যু একাকার, দুজনে দুজনার
জড়াজড়ি, হুটোপুটি।
আমি সরে যাই দূরে, অচেনা রাজপথে
পড়ে রয় শুধু খুনসুঁটি।
১১.
প্রহর চলে গেলে, চুপচাপ মহিষের ঘাড়ের চিহ্ন আাঁকা পথে
আগামীর সম্ভাবনায় ক্রমশ নম্র হয়ে আসে উৎসবমুখর পাখিরা।
১২.
মনে তো কতোজনই আছে, মনে পড়ে তুমুল বাক্যেচ্ছ্বাসে উড়ে যায়
দ্রুতগামী ইসকুল বেলা, স্মৃতির পাঠশালা, অনিঃশেষ সন্ধ্যা ও ছায়াকালে।
১৩.
এই ধুলো ওড়া, রুক্ষ, কাঁটাময় পথে প্রতিবিম্বের মতো তুমিও
ফুটে ওঠো অনন্ত সৌন্দর্র্যে।
তোমাতে আমাতে প্রভেদ, জাতকুলশীলে দ্বন্দ্ব, মুগ্ধতা জাগানিয়া বিষ্ময়।
দীর্ঘশ্বাস, আমাদের সরলরেখা অবস্থানে।
১৪.
ঝিরিঝিরি বাতাস আমার ভালোলাগে। ঝমঝম বৃষ্টি আমার ভালোলাগে। রোদেলা আকাশ আমার ভালোলাগে। পূর্ণিমারাত আমার ভালোলাগে। সবুজ পাতাদের আমার ভালোলাগে। শান্ত নদী আমার ভালোলাগে। শিউলি ফুলে ছেয়ে থাকা উঠোন আমার ভালোলাগে। বকুল, তোমাকে ভালোলাগে।
এইসব ভালোলাগাকে ভালোবাসতে বাসতে দেখি নোংরা ফুটপাতে, ডাস্টবিনের পাশে সূর্যমুখীর মতো ভাতের থালা হাতে এক শিশু বসে আছে সকল ভালোলাগা উপেক্ষা করে।
ছবি : বিধান দেব

৪,৫,৭,১০ ভালো লাগল।
উত্তরমুছুন