মঙ্গলবার, ৩০ মার্চ, ২০২১
সম্পাদকের কথা
রং যেন মোর মর্মে লাগে আমার সকল কর্মে লাগে
হয়তো আজকের পরিস্থিতিতে অস্বাভাবিক এই উচ্চারণ। যদিও জ্ঞান হওয়া ইস্তক এত উজ্জ্বল রং খেলা কোনোদিনই আমার হয়নি। তবে রং লেগেছে মনে। লেখায়। যদিও সময়ের প্রেক্ষাপটে শব্দের অর্থ বদলায়। সেই হিসেবে রং আর খেলা দুটি শব্দই বর্তমানে অন্য চেহারায়। ভাষা বিবর্তনের এই অববাহিকায় দোলের শেষে আমরা আর তাদের আত্মীয় অথবা স্বজন হিসেবে চিনতে পারি না। কিন্ত আনন্দ হয় এই ভেবে যে আমাদের বাংলা ভাষা এখনও জীবন্ত, প্রবাহিত। তা কোনোভাবেই মর্মঘাতি নয়। বরং তা আমাদের ব্যবহারিক কর্মযোগকে আশ্রয় করেছে।
আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে ।। শর্বরী চৌধুরী
ধারাবাহিক গদ্য ।। দীপক হালদার
ধারাবাহিক গদ্য ।। অভিজিৎ দাশগুপ্ত
১৩.
ব্যক্তিগত ধাঁধা
লােলচর্মা এক বৃদ্ধাকে একবার আমি
শিয়ালদার ভয়ঙ্কর রাস্তা পার করে দিয়েছিলুম। অসাবধানে উঁচু থেকে পড়ে যাওয়া একবার এক
চড়ুই-বাচ্চাকে তার কাতর মায়ের কাছে
পৌঁছে দিয়েছিলুম ।
বহুদিন আগে আমাদের ক্লাসের এক গুণ্ডা ছেলে স্ট্রাইকে না যাওয়াতে আমাকে ঘুসি মেরেছিল পরদিন শিক্ষকের প্রশ্নেও তার নাম বলিনি
টিফিনে তাকে ঘুগনি খাইয়েছিলুম।
নেংটি ইঁদুররা আমার নারক শত্রু ইদানীং
আমার রাতজাগা সঙ্গী বই কেটে তছনছ করে, তাই খাঁচায় ফাঁদ পেতে তাদের ধরি
হত্যার মুহূর্তে তাদের ছেড়ে দিই
আমি যে কেন এরকম বুঝতে পারি না
বয়েস হয়েছে বলে কি রাগ কমে গেল
আমি তাে সব সময়ই মারপিট ভয় করি
মৃত্যু ভয় করি
কেন যে এই ধরনের চরিত্র আমার
বুঝতে পারি না ।
সুনীল বসুর ' নক্ষত্রের সাইকেলে অনন্ত ব্রহ্মে ' কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতা এটি । সহজ স্বীকারোক্তি। ব্যক্তিগত এই ধাঁধা প্রতিটি মানুষের মধ্যে কম বেশি আছে । ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক । এখানে কবির ব্যক্তিগত ধাঁধা ইতিবাচক । ঠিক এর
বিপরীত হত, যদি সেটা নেতিবাচক রূপ ধারণ করতো । অর্থাৎ শিয়ালদার ভয়ঙ্কর রাস্তা পার করে দিতে অরাজি কবি বৃদ্ধার অনুরোধ উপেক্ষা করলেন। অথবা চড়ুই বাচ্চাকে তার পাখি মাতার কোলে ফিরিয়ে দিলেন না । হত্যার মুহূর্ত দীর্ঘায়িত করে ইঁদুরগুলোকে নরকযন্ত্রণা দিতেন তিনি। অর্থাৎ ভালো - খারাপের দ্বন্দ্ব । যে উদ্দীপনা জীবন চালিত করে তাকে মান্যতা দেয়।
আসলে আমরা তো অল্পে খুশি , অল্পেই আবেগপ্রবণ, সামান্য কারণেই রেগে যাই । কিন্তু আত্মবিস্মৃতির এই সময়ে দাঁড়িয়ে কবি সুনীল বসু যেন আমাদের ভারত আত্মার সন্ধান দিয়েছেন । যে আত্মা একদিন জলধি মন্থন শেষে ঘোষণা করেছিল 'বসুধৈব কুটুম্বকম' । পৃথিবী একটি পরিবার । আজ যখন নিজেদের দিকে এতদিন পর তাকাবার সময় এসেছে , তখন সেই 'আত্মীয়তা ' আর খুঁজে পাচ্ছি না কেউ । সকাল-বিকাল হত্যা হিংসা ক্রোধের আগ্নেয় ফাঁদ । ' বিশ্বাস' শব্দটি উঠে যেতে বসেছে। ঘুষি মারা বন্ধুকে ঘুগনি খাওয়ানো বা শিক্ষকের কাছে তার নাম না বলার মধ্যে এক ধরনের সাহস আছে । এই শক্তি বা সাহস নৈতিক । যাকে আমরা 'নৈতিক বল ' বলে থাকি।
বয়স হলে আমরা নিজেদের খোঁজে নামি । সে অতলান্ত পথ । একাকী সেখানে যেতে হয় । ক্ষুদ্র আমিকে নিয়ে বৃহৎ আমির ভেতর প্রবেশ করার নামই নিজেকে জানা বা নিরন্তর খুঁজে যাওয়া । কিন্তু এই কবিতায় সমস্ত জীবনের কথা বলা হলো । নিরন্তর এক চলা -ধর্ম । স্কুল থেকে বার্ধক্য । 'মৃত্যু ভয়' তাকে পেরে ফেলে । তিনি প্রতিবাদ করতে ভুলে যান । কিন্তু এটুকু বলে থেমে গেলে অর্থের
একদেশীকরণ হয়ে যাবে । আসলে , মৃত্যু ভয় আছে। কিন্তু তা শুধুমাত্র কবির একার নয়। তা ওই লোলচর্ম বৃদ্ধা বা চড়ুই পাখির বাচ্চাটিরও। কারণ জনবহুল শিয়ালদার ভয়ঙ্কর রাস্তা পার হতে গিয়ে বৃদ্ধার যদি কিছু একটা হয়ে যায় । আবার একই কথা চড়ুই- বাচ্চাটার ক্ষেত্রেও খাটে । মা হারা হলে সে যে মারা যাবে । তাকে তখন কে করবে দেখাশোনা । নেংটি ইঁদুরের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা, তা আমরা বুঝতে পারি।
তাহলে কি হলো । কবি শুধু নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে চান না এই জল -মাটি -বাতাসের সবুজ জগতে । বরং মানবের সংস্কৃতি ধারণ করে তিনি ফিরে যেতে চান সেই অতীত সময়ে , যখন তপোবনের ঋষি আত্মদীপ প্রজ্বলিত করে গ্রহণ করে নিতে পারেন গোত্রহীন পিতৃপরিচয়হীন জবালার পুত্রকে । এখানেই মনুষ্যত্ব , এখানেই প্রাণের ধর্ম । তাকে অস্বীকারের অর্থ নেতিবাচক দিকগুলোকে উন্মোচনের রাস্তা তৈরি করে দেওয়া । তা হয় না কখনোই।
১৪.
স্পর্শ
অন্য কারো স্পর্শের আশায়
শূন্যে অন্ধের মতো হাত বাড়িয়েছিল
কিন্তু নিজেকে স্পর্শ করে সেই হাত ফিরে এসে
হতাশায় ভেঙে পড়ে ।
স্বপ্নের মধ্যে এভাবেই প্রথম রজস্বলা হয়ে ওঠে
একজন মানুষের ইন্দ্রিয়পরতন্ত্র হয়ে থাকার কথাই বলা হচ্ছে যেন । অন্তত পাঁচটা পংক্তি পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মত কবির কামনা- বাসনাকে উস্কে দিয়েছে সযত্নে। কিন্তু কেন এই স্পর্শ ? কেন এই অন্ধের হতাশা? উপনিষদ বলছে , অভেদজ্ঞানে যিনি দ্বৈতসত্ত্বাকে জানতে পারেন , তিনি সবসময় আনন্দের মধ্যেই অবস্থান করেন । অসৎ অবস্থা থেকে সৎ অবস্থায় জগৎ একদিন উপনীত হলো । নাম এবং রূপকে আশ্রয় করেই জগতের সেই নির্বিশেষ থেকে সবিশেষে যাত্রা।
আমরা প্রতিটি পলে এমন কাউকে চাই যে আমাকে ছুঁয়ে থাকবে । তার স্পর্শের আশায় একটা গোটা জীবন কেটে যায় কারো কারো । এই স্পর্শ কি শুধুই বাহ্যিক ? নাকি স্পর্শের আন্তরিকতাটুকুকে কবি পেতে চেয়েছেন প্রিয়জনের কাছ থেকে । অমিতাভ মৈত্র বাংলা কবিতার সেই সমস্ত স্বরের প্রতিনিধিত্ব করেন , যাঁরা মেধাবী এবং একই সঙ্গে শব্দের অন্তর্গত সৌন্দর্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল । এখানে প্রকরণ বা প্রকাশের শৈলী থেকে বড় হয়ে উঠেছে 'হেনরি' নামে এক যুবকের প্রতি কবির গভীর আকর্ষণ । তিনি হেনরীকে জানেন । হেনরি তাঁকে জানেন । এবং চেনেন ! হয়তো !
নিজেরাই নিজেদেরকে কষ্ট দিয়ে , যন্ত্রণা দিয়ে আনন্দ পায় ---- এমন মানুষ এই সমাজে রয়েছে। তাতেই তাদের আনন্দ । আবার এমনটাও দেখা
যায় , সেই আনন্দ গ্রহণ করতে করতে অথবা নিজেকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দিতে দিতে ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়ে । তার কাছে ইহজগৎ বলে কিছু থাকেনা। মনের আকাঙ্ক্ষাকে পথ দেখাতে দেখাতে ওই অন্ধের মতোই একসময় সে 'হতাশায় ভেঙে পড়ে'। আসলে সে তো মর্ষকামী নয় । সে নিজেকে ভালোবাসে । আবার একই সঙ্গে ভালোবাসে অন্য কোন জীবনকে।
স্বপ্ন এমন এক মানসিক অবস্থা যা চেতন-অবচেতনের ব্যবধান ঘুচিয়ে দেয় । বলা হয়, স্বপ্ন হলো মানুষের গোপন আকাঙ্ক্ষা । যে ইচ্ছাগুলির বহিঃপ্রকাশ ঘটে চূড়ান্ত এক আবেগ মুহূর্তে । সেই আবেগ তখন নারী-পুরুষের ভেদ বুঝতে সক্ষম হয় না । তা না হলে , কবি কেন বলবেন , ' স্বপ্নের মধ্যে এভাবেই প্রথম রজস্বলা হয়ে ওঠে হেনরি। '
'রজস্বলা ' শব্দটি নারী থেকে প্রতীক রূপ গ্রহণ করে কৃষিকাজে অনুপ্রবেশ করে সেই অতীতে । বৃষ্টির প্রথম স্পর্শে জেগে ওঠে জমি । নারীও তৈরি হয় রজস্বলা পরবর্তী সময়ের জন্য। তাই কৃষক লাঙ্গল দিতে দিতে আজও বলে ওঠে ----
"নাগর কোথায় রইলা রে
জল লেগেছে তোমার বাকুড়িতে। "
ধরিত্রীর মতো নারীও রজস্বলা হয়। আর তা অতীতের ঘটত পতিগৃহে ( গওনা ---- বিবাহিত নারী
দ্বিতীয় বার স্বামীর কাছে যাওয়া)। বর্তমানে সমাজ পাল্টেছে । আজ আর নারীর পতিগৃহে যেতে হয়
না । বরং পিতৃগৃহে তার কুসুমের মাস উদযাপিত
হয় । কিন্তু হেনরি ? সে কিভাবে রজস্বলা হবে। একজন পুরুষের (যদি হেনরি পুরুষের নাম হয়) পক্ষে তা সম্ভব নয় । তবে কি , বৈষ্ণব দর্শনের সেই কথা আমাদের আজ মানতে হবে । যেখানে বলা হচ্ছে , এই জগতে কৃষ্ণই একমাত্র পুরুষ , আর সকলেই নারী । রাধা ভাবে তন্ময় চৈতন্যদেব যার সার্থক রূপ । বৈষ্ণব কবি পাতায় পাতায় লিখে গেছেন অনুরূপ প্রেম -ভক্তি কথা।
আমাদের অবচেতনে যে স্পর্শ , তার মধ্যে
'হেনরি'-র মতোই রজস্বলা হয়ে ওঠা এক শূন্য সময়ও রয়েছে।
ধারাবাহিক গদ্য ।। অরিন্দম রায়
ভিনদেশি তারা
জর্জ কে
ছিল রুমাল হয়ে গেল বিড়াল! হতে চেয়েছিলেন আইনজীবী হয়ে গেলেন কবি । স্কটল্যান্ডের উত্তর-পূর্বের বাসিন্দা এই কবি ২০০২ সালে পেয়েছেন পোয়েট্রি স্লাম পুরস্কার। তাঁর একটি দীর্ঘ কবিতার অনুবাদ থাকল বেলাভূমির পাঠকের জন্য।
কে বানিয়েছিল?
কে বানিয়েছিল আগুন, কে বানিয়েছিল চাকা?
কে বানিয়েছিল মাটির পাত্র, কে বানিয়েছিল স্টিল?
কে গাছের ডালপালা দিয়ে বর্শা বানিয়েছিল?
এ সব কিছু আমাদের ভয় কমানোর জন্য?
কে বানিয়েছিল আশ্রয় , কে বানিয়েছিল ঘড়ি?
কে বানিয়েছিল ক্যালেন্ডার আর কে কথা বলতে শিখিয়েছিল?
কে বানিয়েছিল ভাষা , কে বানিয়েছিল গান?
কে আমাদের দেখতে শিখিয়েছিল ন্যায়ের থেকে অন্যায়?
কে বানিয়েছিল সাম্রাজ্যগুলো , কে বানিয়েছিল রাজাদের?
কে বানিয়েছিল তরবারি একে ওকে মারতে ?
কে বানিয়েছিল শহরগুলো , কে বানিয়েছিল আইন?
কে বানিয়েছিল নিখুঁত , কে বানিয়েছিল ত্রুটি?
কে বানিয়েছিল লিরিকস আর পাঠ্যবইয়ের লাইন?
কে বানিয়েছিল কামতাড়িত নিম্ফোম্যানিয়াকদের?
কে বানিয়েছিল অনাহার , কে বানিয়েছিল ফসল?
কে বানিয়েছিল কর্পোরেট সেই ফসলের মাথা কেটে নিতে?
কে বানিয়েছিল যন্ত্রপাতি , শিকল আর দাস ?
কে বানিয়েছিল নিয়ন্ত্রণের যত নিয়মকানুন?
কে বানিয়েছিল?
তুমি বানিয়েছিলে
আমি বানিয়েছিলাম
কারন আমরা মানুষ …
কে বানিয়েছিল ওয়াইল্ড-ওয়েস্ট , কোল্ট ফরটি ফাইভ?
কে বানিয়েছিল এমন নিয়মে যাতে শুধু শক্তিশালীই বাঁচে?
কে বানিয়েছিল কামান , কে বানিয়েছিল বন্দুক?
কে বানিয়েছিল ‘বড়ো , আরও ভালো একটা’
কে বানিয়েছিল স্মার্ট বোমা, কে বানিয়েছিল আবোদা?
দেশের পরে দেশ , কে রাখল বুড়ো আঙুলের নিচে?
কে বানিয়েছিল নিউকস , পারমানবিক বই?
কে বানিয়েছিল গজ , ঘোড়া আর নৌকোগুলো ?
কে বানিয়েছিল ট্যাঙ্ক আর নিউক্লিয়ার সাবমেরিন?
কে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল যত পাবলিক বার?
কে বানিয়েছিল ভি.আর. টিভি সেট ?
কে বানিয়েছিল জবড়জং হুমকি ?
কে লাখ লাখ টাকা বানিয়েছিল খনিজ তেল বেচে?
কে পৃথিবীকে বসিয়ে ছিল তপ্ত কড়ার উপর?
কে বাধ্য করেছিল আরমাগেডনকে যাতে সে ওৎ পেতে থাকে
কে বানিয়েছিল ক্যাপ্টেন কার্কের হাড়গোড়?
কে মহাকাশের বুকে বানিয়েছিল ক্যাপসুল?
কে বানিয়েছিল?
বানিয়েছিল মানুষ ।
কে বানিয়েছিল?
তুমি বানিয়েছিলে
আমি বানিয়েছিলাম
আমরা বানিয়েছিলাম
কারন আমরা ছিলাম মানুষ …ধারাবাহিক গদ্য ।। চন্দন মিত্র
দ্বিতীয় আচার্য হুইকে : এক নাছোড়বান্দা সন্ধিৎসু
হুলিয়া দেখলে আর যা জন্মাক, ভক্তি-শ্রদ্ধা যে জন্মাবে না সে বিষয়ে সংশয় না-রাখাই ভালো। দশাসই চেহারা, যেমন লম্বা তেমন চওড়া ; মাথার সামনের দিকে চুল নেই প্রশস্ত ললাট, মুখময় গোঁফদাড়ির জঙ্গল ; লাটিমের মতো অক্ষিগোলক— সবমিলিয়ে একেবারে বীভৎস রসের সমাহার। এহেন মূর্তিমান বিভীষিকাকে কেই বা ঘাঁটাতে চাইবে! এমন চেহারার সুবিধা এই যে, কখনও হাতাহাতির প্রয়োজন পড়ে না, খুব বেশি হলে একটা হুংকারই যথেষ্ট। শাওলিন মঠের সন্ন্যাসীরা প্রথমে ভেবেছিল নিছক খ্যাপাটে ভবঘুরে হবে বোধহয় ; কিন্তু পরে বুঝল এই উদ্ভট-হুলিয়ার আগন্তুককে মাপার মতো পর্যাপ্ত ফিতে তাদের নেই। কয়েক মুহূর্তেই তাদের মুখগুলি অশালীন মুখরতা হারিয়ে ম্লান ও জবুথবু হয়ে পড়ে। এক অভূতপূর্ব সমীহের ভারে তারা ন্যুব্জতার আড়াল নিতে বাধ্য হয়। আগন্তুক আর কেউ নয় বোধিধর্ম, পাঠক আপনি তা ইতোমধ্যে বুঝে গেছেন। বোধিধর্ম, শাওলিন মঠে গিয়েছিলেন বুদ্ধভদ্রের স্মৃতিকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। অতঃপর মঠ থেকে বেরিয়ে কিছু দূরে পেলেন একটি মনোমতো গুহা। ব্যাস, ধ্যানে বসে গেলেন , তবে একটু অদ্ভুতভাবে গুহার দেয়ালের দিকে মুখ করে। অচিরেই সেই অত্যাশ্চর্য ধ্যানের কথা বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। অত্যুৎসাহী কেউ কেউ বিরক্ত করতে বা আলাপ জমাতে গিয়ে যারপরনাই ব্যর্থ হল। আসলে তাঁর মুখ কেউ দেখতে পাচ্ছে না। তিনি তো গুহার দরজার দিকে পিছন ফিরে বসে আছেন! তিনি ধ্যানাসীন না এমনি বসে আছেন, বিরস বদনে না প্রসন্ন বদনে আছেন, বোঝার কোনও উপায় নেই। দর্শনার্থীদের ভিড় কমতে কমতে প্রায় বিরল হয়ে যায়। বোধিধর্ম কি কারও জন্য অপেক্ষা করছিলেন! কোনও নথি এর কোনও উত্তর দেয় না। তবে আমাদের মনে হয়, তিনি অবশ্যই যোগ্য উত্তরসূরির সন্ধানে ছিলেন। কারণ গুরুবাদী ধারায় উপযুক্ত উত্তরসূরির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কথায় বলে— গুরু মিলে লাখে লাখ, শিষ্য মিলে এক । সেই অলোকসামান্য শিষ্যের সন্ধানে সদগুরু তো জীবনপাত করবেন, যার হাত ধরে গুরুর কাছ থেকে পাওয়া ধারাটি অনন্তকালের দিকে এগিয়ে যাবে। এক-দু বছর নয় বোধিধর্মকে নয় বছর অতিবাহিত করতে হয়েছে উপযুক্ত আধারের সন্ধানে।
বয়স চল্লিশ ছুঁইছুঁই। কিন্তু বয়সকে নিছক বয়ে যেতে দেননি শেন কুয়াং। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই জ্ঞানানুসন্ধানকেই জীবনের ব্রত হিসাবে বেছে নিয়েছেন তিনি। একদিনও হেলায় না-হারিয়ে প্রকৃত গুরুর সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন মঠে-মঠে।হেনান প্রদেশের হুলাও নগরের এক সাধারণ পরিবারে ৪৮৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জন্ম। অধিকাংশ ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের মতো কুয়াং-এর জন্মবৃত্তান্তও অলৌকিকতামণ্ডিত। তাঁর বাবা-মা সন্তানলাভের কামনায় বুদ্ধের কাছে প্রার্থনা শুরু করেন। একদিন রাতে তাঁরা শয়নকক্ষে এক অপার্থিব জ্যোতি লক্ষ করেন। আর কয়েকদিন পরে বুঝতে পারেন তাঁদের পরিবারে এক নতুন অতিথির আগমন ঘটতে চলেছে। পুত্রসন্তান জন্ম নিলে তাঁরা নাম রাখলেন— কুয়াং অর্থাৎ আলো। বাল্যকাল থেকেই কুয়াং আপনভোলা প্রকৃতির। কৈশোরে পৌঁছে সে গান গাওয়া, কবিতা লেখায় দক্ষ হয়ে ওঠে। গৃহস্থালির কাজকর্মের থেকে তার কাছে বেশি প্রাধান্য পায় ভ্রমণ ও পুথিপাঠ। পাহাড়-পর্বত ও নদীর সান্নিধ্যে থাকতে তার ভালো লাগে। প্রকৃতির পরতে পরতে সে যেন কীসের অনুসন্ধানে ব্যাপৃত থাকে। পারিবারিক এমন কোনও ঐতিহ্য বা আভিজাত্য তার উপর বর্তায়নি যা তাকে অসাধারণ করে তুলতে পারে। কেবল সুতীব্র এক জীবনজিজ্ঞাসার তাড়নায় বেদম ছুটতে ছুটতে সেই কিশোর যৌবনের সীমায় পৌঁছে, কখন যে অসাধারণত্বের মহিমায় উন্নীত হয়েছিলেন তা নিজেও বুঝতে পারেননি। সমকালীন চিনের প্রায় সমস্ত ধর্মীয় ধ্যানধারণা যাচাই করে বেড়িয়েছেন কুয়াং। তাওবাদ, কনফুসিয়সবাদ, পরম্পরিত বৌদ্ধ মতবাদ সবকিছু তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখেছেন কোথায় লুকিয়ে আছে পরমসত্য। কথায় বলে— যে খায় চিনি/ তাকে যোগায় চিন্তামণি । খোঁজ আন্তরিক হলে অধরও ধরা দেন। আর আলোকাভিসারী গুরু তো দেহ-বর্তিকা জ্বালিয়ে বসে থাকবেন! তাঁর দায় তো আর ন্যালাখ্যাপা গুরুদের মতো নাম,কাম বা অর্থের নয়, তাঁর দায় জগৎ ও জীবনের প্রতি। এই মহৎ পারমার্থিক দায় থেকে নিস্তার পাওয়ার এক এবং অদ্বিতীয় পথ হল, একটি যথার্থ বর্তিকা যথাসময়ে প্রজ্বলন করে দেওয়া। শিষ্যও যেমন যথার্থ গুরুকে খুঁজে চলেন, গুরুও তেমন যথার্থ শিষ্যকে খুঁজে চলেন— গুরুবাদের এ এক মরমী লীলা! তাহলে কী বোধিধর্ম এত পথ পাড়ি দিয়ে কুয়াং-এর জন্যই চিনে পৌঁছেছিলেন এবং কুয়াংও অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে বোধিধর্মের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন! বিষয়টা এমনভাবে দেখে ফেলতে পারেন নিয়তিবাদীরা। বস্তুনিষ্ঠ দিক থেকে দেখলে ঘটনা কিন্তু এইটুকু বোধিধর্ম ও কুয়াং-এর দেখা হওয়া। যতটা সহজে দেখা হওয়া লিখে ফেললাম বিষয়টা কিন্তু ততটা সহজ ছিল না।
বোধিধর্মের দেয়ালমুখো ধ্যানের খবর পেয়ে কুয়াং আর দেরি করেননি। ভেবেছিলেন সেই আশ্চর্য সন্ন্যাসীর সঙ্গে বাক্যালাপ করে পথশ্রমের ক্লান্তি দূর করবেন। বাক্যালাপ তো দূরের কথা মুখদর্শনই করতে পারছেন না। তাহলে কী তাঁর এত ব্যাকুলতা, এত আকুতি সব বিফলে যাবে ! কুয়াং, এত সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নন। বোধিধর্মের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য টুকরো টুকরো কথা হাওয়ায় ভাসিয়ে দেন, যেগুলি আসলে তাঁর অকৈতব হৃদয়ের প্রতিভাস ছাড়া অন্য কিছু নয়। কিন্তু কথাগুলি আদৌ উদ্দিষ্ট ব্যক্তির কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হচ্ছে কিনা বা হলেও তাঁর মনে প্রভাব ফেলছে কিনা তা বোঝার উপায় নেই। মুখ দেখার উপায় বন্ধ, তিনি তো দেয়ালমুখো ধ্যানে বসেছেন! এদিকে ঋতুচক্রে হেমন্তের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে, শুরু থেকেই শীত তার শানিত দাঁতের কামড় বসাতে শুরু করেছে। দিনের বেলাটা তবু সহ্যসীমায় থাকে, কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় তুষার-পতন। এক-কোমর তুষারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকেন কুয়াং। মন্ত্রের মতো উচ্চারণ করেন প্রাণের আকুতি। শেষমেশ চূড়ান্ত এক সিন্ধান্ত গ্রহণ করেন কুয়াং। কোমর থেকে তলোয়ারখানা খুলে ডান হাতের বজ্রমুষ্টিতে তা ধারণ করেন। তারপর এক কোপে কেটে ফেলেন নিজের বামহাতখানা। অতঃপর কাটাহাতটি বোধিধর্মের মাথার উপর দিয়ে তাঁর সামনে ছুড়ে দেন। দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে হাতটি গিয়ে পড়ে ধ্যানমগ্ন বোধিধর্মের কোলের উপর। তিনি বুঝতে পারেন তাঁর পিছনে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি নিছক উপেক্ষার পাত্র নন। বোধিধর্ম ধ্যান ছেড়ে উঠলেন। কুয়াংকে বললেন—
বলুন, আপনি কেন আমার সঙ্গে বাক্যালাপের জন্য এতটা ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন ?
কুয়াং— আমার মনটাকে কিছুতে শান্ত করতে পারছি না প্রভু ! আপনি দয়া করে আমার মনটাকে শান্ত করে দিন।
বোধিধর্ম— দিন তো দেখি আপনার অশান্ত মনটাকে, আমি এখনই তাকে শান্ত করে দিচ্ছি।
কুয়াং— প্রভু আমি তো তাকে খুঁজেই পাচ্ছি না।
বোধিধর্ম— আরে পাবেন কী করে আমি তো তাকে শান্ত করে দিয়েছি।
কুয়াং, এই প্রথম এক অপার শান্তির রাজ্যে প্রবেশ করেন। তাঁর যাবতীয় অনুসন্ধিৎসা এই অদ্ভুত-দর্শন আগন্তুকের সামনে এসে থমকে দাঁড়ায়, সমূহ জিজ্ঞাসার উত্তর নিয়ে যেন বসে আছেন এই মহাজন। বোধিধর্ম কুয়াংকে দিলেন এক নতুন নাম—– হুইকে, যার অর্থ চৈতন্য।
হুইকের এই তলোয়ার দিয়ে হাত কেটে গুরুকে নিবেদন করার প্রসঙ্গ রোমাঞ্চকর বলে বহুচর্চিত। তবে ভিন্ন একটি তথ্যও পাওয়া যায়, তথ্যটি সাধুজীবনী (Hagiography)-র সঙ্গে সংগতি রাখতে না-পারায় তাকে বেমালুম গায়েব করার প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। বস্তুনিষ্ঠ সেই তথ্যটি হল, বোধিধর্মের সঙ্গে সাক্ষাতের অনেক আগেই ডাকাতদের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে কুয়াং তথা হুইকে তাঁর বামহাতটি হারিয়েছিলেন। সম্ভবত, হুইকের বামহাত না-থাকাকে মহিমান্বিত করে তোলার জন্য অত্যুৎসাহী কোনও রচয়িতা এমন রোমহর্ষক আখ্যান বুনে থাকবেন। আর সাধুজীবনী লিখতে বা পড়তে গিয়ে কে আর যুক্তিনিষ্ঠ থাকতে চায়!
বোধিধর্ম, চিনতে ভুল করেননি। হুইকে ছিলেন প্রকৃত অর্থে পণ্ডিত ও পরিশীলিত মনের মানুষ। তবে পাণ্ডিত্যের বোধ থেকে পুরোপুরি মুক্ত। হুইকে বোধিধর্মের সঙ্গে প্রায় ছয় বছর ছিলেন।এইসময় তিনি গুরুর কাছে লঙ্কাবতার সূত্রের পাঠ নিয়েছেন, শিখেছেন ধ্যানের খুঁটিনাটি ; একটি হাত নিয়ে গুরুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে কুং ফু চর্চাও করেছেন নিয়মিত। একদা বোধিধর্ম, উত্তরসূরি বেছে নেওয়ার তাগিদ অনুভব করেন। তিনি প্রিয় শিষ্যদের বোধ ও বোধি বিচার করে শেষমেশ হুইকের হাতেই চীবর ও ভিক্ষাভাণ্ড তুলে দেন। বোধিধর্মের ভারতে ফেরার পরে বা তাঁর মৃত্যুর পর হুইকে মতাদর্শ প্রচারে মন দেন। নথি অনুযায়ী হুইকে বোধিধর্মের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ৫২৮ খ্রিস্টাব্দের হেমন্তকালে। আর ৫৩৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে তিনি উত্তরের ওয়েই রাজ্যের এদু (Yedu) নগরে বসবাস শুরু করেন। এইসময় উত্তরের ওয়েই রাজ্য ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দাঙ্গাহাঙ্গামায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। হুইকে তাঁর প্রথাবিরুদ্ধ মতবাদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বৌদ্ধদের চক্ষুশূল হয়ে পড়েছিলেন। আক্রান্তও হয়েছেন কয়েকবার। সুতরাং এদুতে থাকা যে আত্মহননের সামিল তা আর বুঝতে বাকি থাকে না। হুইকে, এদু ত্যাগ করে ইয়াংসি নদীবিধৌত দক্ষিণ আনহুই (Unhui) প্রদেশের এক গোপনডেরায় থেকে মতাদর্শ প্রচার করে যান। সেখানেও তাঁর অনুসারী জুটে যায়। একদা এখানেই তাঁর সঙ্গে পরিচিত হন জনৈক ভবঘুরে ব্যক্তি পরবর্তীকালে যিনি সেং সান (Seng Tsan) নাম নিয়ে তৃতীয় আচার্যের পদে অভিষিক্ত হবেন।
দীর্ঘদিন অজ্ঞাতবাসের পর ৫৭৯ খ্রিস্টাব্দে হুইকে এদুতে ফিরে আসেন।এবার তাঁর অনুসারীও অনুগামীদের সংখ্যা এমন দাঁড়ায় যে, তা দেখে ধর্মজীবীরা ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। তাও হেং (Tao heng) নামের জনৈক ধর্মগুরু হুইকেকে হত্যার জন্য পেশাদার খুনি নিয়োগ করেন, কিন্তু হুইকের কথাবার্তায় সে এমন মোহিত হয়ে পড়ে যে, শেষে ক্ষমা চেয়ে ফিরে আসে। আসলে হুইকে তাঁর অকপট বক্তব্য ও অকৈতব জীবনচর্যার জন্য সাধারণ মানুষের আপনার জন হয়ে উঠেছিলেন। তিনি পানশালা, কসাইখানা সর্বত্রই যাতায়াত করতেন।কখনও মজুরদের সঙ্গে বসেও আড্ডা দিতেন। কোনও ছুতমার্গের ধার ধারতেন না। একবার কোনও এক উৎসবের সময় হুইকে কুয়াংকিউ(Kuangqiu) মঠের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখছিলেন। মঠের ভিতরে সেইসময় অধ্যক্ষ বিয়ানহে (Bianhe) নির্বাণসূত্র নিয়ে ভাষণ দিচ্ছিলেন।উপস্থিত শ্রোতৃমণ্ডলী যখন বুঝতে পারল, মঠের বাইরে হুইকে বক্তব্য রাখছেন, তখন তারা দল বেঁধে হুইকের চারদিকে ভিড় জমাল। বিয়ানহে নগরপালের কাছে হুইকের নামে ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ জানালেন।৫৯৩ খ্রিস্টাব্দে একজন একশ ছয় বছরের নিরপরাধ মানুষের মুণ্ডচ্ছেদ করা হল। চ্যানধারার তিনিই প্রথম শহিদ।
তথ্যসূত্র :
১. ZEN MASTERS OF CHINA : THE FIRST STEP EAST
BY RECHARD BRYAN MC DANIEL; TUTTLE PUBLICATION, TOKYO/ VERMONT/ SINGAPORE.
২. TRANSMISSION AND ENLIGHTENMENT IN CHAN BUDDHISM SEEN THROUGH THE PLATFORM SUTRA BY MORTEN SCHLUTTER ; TAIPEI CHUNG – HWA INSTITUTE OF BUDDHIST STUDIES
৩. ZENS CHINESE HERITAGE BY ANDY FERGUSON ; WISDOM PUBLICATION, BOSTON
৪. THE ILLUSTRATED ENCYCLOPEDIA OF ZEN BUDDHISM BY HELEN J. BARONI ; THE ROSEN PUBLICATION GROUP , NEW YORK
৫. ZEN BUDDHISM : A HISTORY VOLUME 1 INDIA AND CHINA BY HEINRICH DUMOULIN ( TRANSLATED BY J.W. HEISIG AND P. KNITTER ) MACMILAN PUBLISHING COMPANY
৬. ZEN AND ZEN CLASSICS ( VOLOUME-1) BY R.H.BLYTH, THE LIOKUSEIDO PRESS. TOKYO.
ছবি : বিধান দেব
সোমবার, ২৯ মার্চ, ২০২১
গুচ্ছ কবিতা : স্বপন শর্মা
গুচ্ছ কবিতা : মাসুদুল হক
গুচ্ছ কবিতা : অরুণ পাঠক
আকাশ
আকাশ কি উদ্দেশ্যহীন? প্রাণের উদ্দেশ্য?
কখনোই সব কথা বলে না জীবন
জীবনের খিদে থাকে, প্রাণ ও পরিত্রাণ থাকে
তার সদ্ ব্যবহার বিক্রি করে করে মানুষ
প্রাচীন হয়ে গেছে। পুনর্লিখিত সব কথা
মুখে মুখে বলছে মানুষ। বলছে সব
ঘাসে ঘাসে রক্তমাখা স্বপ্নদের বেঁচে থাকা
চুরি করছে কিছু কিছু উল্লসিত ধ্বনি
আমার জন্মই ছিল অধীত মুক্তিতে
তার বেশি দায়ভার আমি তো জানি না
আস্ত একটা আকাশের নাব্যতা শরীরে বয়ে বয়ে
ক্লান্ত অহংকারে কালো হয়ে যাচ্ছে মন, তবু
যা-এঁকেছি বিস্ময়, যা বলেছি আশ্চর্য
যা পেয়েছি---- সবটাই সুন্দর নয়, টেনে ধরা জিভে
একই কথা লিখতে হয়েছে আমায়
যা আমার পূর্ব পক্ষে সঞ্চিত সাগর
যেন নরকের স্তম্ভিত আগ্রাসে জন্মের কৃতজ্ঞ ধ্বনি
আঙুলে আঙুলে দাসত্ব , মনোবীজে খেতাবের লোভ
দূরে দূরে বাঈঘর, ঘোড়াশাল, চোখের শিকার
অবুঝ জঙ্গলে ঢাকা এসব সুপ্ত বাসনা থেকে
যে বালক ঘুড়িটি ওড়ায় আকাশ তাকে কী লেখে?
মেঘের অনেক নীচে আমরা তার কিচ্ছু বুঝি না!
উৎসব
বড় এক জানালার চৌদিকে উৎসব শুরু হয়ে গেছে
নকল সম্ভার ভরা একফালি আকাশের নিমজ্জিত কোণে
হৃদপিণ্ড দখল করে আছে মানুষেরা। মৃত্যুর রং নীল
তাই অতিক্রান্ত দিবসের পর এই সামান্য মায়াবিনী আলো
দুচোখ ভরে নিতে চাইছে মানুষ-পাহাড়।
তমোঘ্ন শান্তির আস্কারা নিয়ে ওই যারা নাচছে
তাদের পেখম ঢাকা পোশাকে ঘোমটা খুলছে বাংলা
সত্যের এ হেন বিভ্রম চমৎকারিত্বের পথে খুব ভালো
তবু একাকী নৈঃশব্দে আমি আজ আলো
না-জ্বালিয়ে
নিজের ভেতরে জ্বলে উঠি।
আলো
বিভিন্ন যন্ত্রণা থেকে আমি কিছু হাফটোন জল তুলে রাখি
কাজে লেগে যায়। দুহাতের অবসরে কখনও বা কালিঝুলিমাখা
সেই জলের অবতার মুখোমুখি হয়। আমি তাকে শান্ত করি
আরেকটু হৃদয় দিয়ে, অথবা আলোর জঞ্জালে জোনাকি ফেলার মতো মেখে নিই তীব্রতর জ্বালা।
আয়ুষ্মান চোখের কী হয়, সহ্যসম্ভব ফাল্গুনে দাঁড়াতে পারে না, তখন সে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটে, উপমার লাশ বয়ে বয়ে, সন্দিগ্ধ কপালে রাখে চুমোর পর্বত। তারপর স্নিগ্ধ হতাশায় সফল মিলন শেষে কাঁদে। যত গান এই পাওয়া, পেয়ে হেরে যাওয়া
সময় দুহিত অন্ন সৎকার প্রবণ, ভেঙে যাওয়া আগুনে হঠাৎ জেগে ওঠে, দাঁড়িয়ে যায়, শোকার্ত সঙ্গীরা ভুলে যায় হাততালি দিতে। শিস দেয় সুরশ্রী তারা আর ঠাণ্ডা কীট,
আমি নম্র আবদারে প্রার্থনা করি হাওয়ায় সামান্য কিছু রাখো, কৃতজ্ঞ করো, আগুন জ্বালাতে যদি হয় আগে জ্বালো।
সীমানা পাথর করে বিস্ময়মুখর সব চোখ পরাজয় কাঁধে তুলে নেয়, এবার যে যার ঘরে শব্দ নামাবে, তারপর মৃত কিছু হাড়গোড় অক্ষয় পূর্ণিমায় চাঁদের পায়ে বাঁধবে বীরের ঘুঙুর। সমুদ্র চাইবে কলরোল বেঁধে দেওয়া গানের কঙ্কাল।
আমি গলাতে দুহাত রেখে ভাবি, সুরেতে পূর্ণ আছে তো?
নইলে আলোকে কী দিয়ে সরাব পাথর থেকে, যদি সে ভেঙে যায়!
বিনত পুষ্প ও সান্ধ্য নির্জনতা
গা-ঘেঁষে থাকা বিকেল যেন একটি পরিবার। কম কথা তার
যেন এক্ষুনি ফুরিয়ে যাবে দিবসের মতো, যেন সে প্রণত পক্ষী
মৃত্যুর আগেই জেনেছে মৃত্যুকে। অতএব থামতে হয়
আকাশে কলঙ্কঢাকা ব্যাধ দুঃস্বপ্নের সাগর মাথায় নিয়ে যায়
তার অনুসরণের পথ পদ্ম-পলাশে মোড়া, সে ভ্রমণে সময় এমনভাবে ছোটে তাকে গতিশীল কাক মনে হয়
তোমার নিভে যাওয়া দরজার চোখ খুলে গেছে, মাথায় বিশ্বস্ত দাস-দাসী। তারাই তাতিয়ে দিচ্ছে,
জিহ্বা সুন্দর কোনও শোকে পড়িয়ে নিচ্ছে শুদ্ধ পুরাণ। কত না-জানা দিয়ে ব্যাখ্যা হচ্ছে তাদের।
ভূবৃত্তের হাওয়ায় হাওয়ায় জড়ো হচ্ছে বিনীত পুষ্প ও সান্ধ্য নির্জনতা। আমি হাত বাড়িয়ে রাখি
কিছু কিছু সাহাস্য পাথর তাদের আত্মসম্মান রেখে যায়।
সেটুকুই সম্পদ আমার। সমর্পণ করি। তুমি একটি নিবেদিত রঙে ডুবে আছ। অপেক্ষা করি রাত্রির সুবিদীর্ণ কোলাহলে। যেন স্রোতাচ্ছন্ন আত্মারা পরম শান্তিতে ঘিরে আছে আমায়। আর একটু পরেই প্রত্যক্ষ হয়ে যাবে সব ততটুকু দৃষ্টির সমত্ব নিয়ে, যা দিয়ে আবার আমি সবার অলক্ষে চলে যাব
গুচ্ছ কবিতা : মামুন রশীদ
যা কিছু লিখেছি সব সব প্রেমের কবিতা
১.
কিছুটা স্মৃতি, কিছুটা কল্পনা আর কিছু রৌদ্রের ঝিলিক
সারাদিন খুচরো পয়সার মতো গুণতে থাকি।
জান্তেপিকে মনে পড়ে।
জটিল নিদ্রা ভেঙ্গে তাকে কেউ না ভাবলেও
আমি জানি জ্যোৎস্নার আঙুলে জড়ানো লাজুক মুখে
তুমি স্থির হয়ে আছো।
২.
তুমি বড়ো এলোমেলো, আলস্যে মোড়ানো,
বলতে বলতে নীলে, দম আটকায় বিষাদে।
ক্ষণিক মাধুরী বয়ে আনা প্রণয়ের বিকেল
উসকায় স্মৃতি, অন্যপ্রান্তে প্রলয়ের ক্ষুধা,
ধূমায়িত চায়ে নিরবধি কার পদধ্বনি?
৩.
লুপ্ত অতীতের স্তব্ধ গল্পখণ্ড বেদনার ছায়া থেকে অল্প আলাদা
হয়ে পরিণয়সূত্রে মেলায় অস্পষ্ট জগৎ। ব্যর্থ লোকপুরাণ,
রূপকথা, হারিয়ে ফেলা শাশ্বত অন্ধকার, আষাঢ়ী পূর্ণিমায়
ছড়িয়ে দেয় খুলির অট্টহাসি, পায়রার জলরাশি।
তোমার হাড় হিম করা ফটোগ্রাফি, কতোরকম পাগলামী, রূপালি
ঝিলিক, স্মৃতির হাত ধরে জমা হয় লুতুপুত ভাবনার ভেতর।
৪.
শান্তাহার স্টেশনে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম। এক কম্পার্টমেন্ট
থেকে অন্য কম্পার্টমেন্টের ভূগোলে ঘুরতে ঘুরতে থেমে যায়
বুনো টাট্টু। আমিও হারিয়ে যাই।
কতো দূরে, কোথায় এসেছি চলে, উথাল ভাবনার মাঝে খুঁজে
দেখি নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে শিয়ালদহ স্টেশনের প্লাটফর্মে।
একে একে নর্থ ও সাউথের চৌহদ্দির মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে বিদ্বৎসমাজ।
আমাকে কে নেবে? সহস্র মাইলের ব্যবধান ভেঙ্গে অদ্ভুতভাবে
লেপ্টে যেতে থাকে বুনো বকুলের গন্ধ। পড়ার টেবিল, পোষা বাগান,
কুড়ানো বিড়ালছানা, গানের স্কুল, অভিজ্ঞানের শনপাপড়ি পথ দেখায়।
ধাপে ধাপে ইমামবাড়ার সুদীর্ঘ সিঁড়ি পেরিয়ে জড়িয়ে বসি সূর্যঘড়ির কাছে।
আমি তো পথ হারাইনি।
৫.
এলোমেলো হতে হতে দিনফুরানো পাতার মতো
গলা টিপে ধরা নদীর মতো
রোদ ঝলসে যাওয়া মুখের মতো
এত
বৃষ্টি
হলো
ভারী অন্ধকার পেপার ওয়েটের মতো
আমাকে ভাঙতে ভাঙতে ওর সব ডালপালা
আনন্দে ঠাসা পাখির বাসার ভেতর
পুঞ্জীভূত হলো।
তুমি দ্যাখো, তোমার জন্যই হাহাকার।
৬.
তুমি আমার, এর বেশি লিখতে থেমে যায় কলম
পাতার ফাঁক গলে, পথ করে দিচ্ছে সবুজ আলো।
আমি লিখতে পারছি না, আমি ঘুমাতে পারছি না।
মুখে লেগে থাকা উচ্ছিষ্ট, এঁটো-
জড়িয়ে যাচ্ছে চিন্তা, গলা শুকিয়ে-
ছাতিম ফুল, ছাতিম ফুল, সারা রাত তোমার ছায়া,
এলোমেলো গন্ধ, গলা শুকিয়ে আসছে, আমাকেও
স্পর্শ করছে পিপাসা।
৭.
মেঠো পথ, যেখানে কালো পিচের আঁচড় পড়েনি কখনো
তার বাঁক ধরে হঠাৎ দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন ডুমুর গাছ
জানে না, সামনে কীরকম নীরবতা
কোন ভূমিকা নিয়ে পথ তার দিক নির্দেশক
মোরগ ঝুঁলিয়ে রেখেছে।
যতোই হন্যে হয়ে খোঁজো, হারিয়ে যাওয়া মার্বেল
যেনো মায়াহরিণ, তোমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে
রোজ লোভ দেখাবে, সারারাত পাশে বসে
জোৎস্না মাখাবে, টেনে নিয়ে যাবে রহস্যের
দেবদারু বনে। যেনো ভুলে যাও
মানবজীবন, জন্মদিন, নিঃসঙ্গতা।
৮.
ঢেউহীন স্তব্ধ জলের অতলে, বকুল, তোমাকে মেলাতে পারিনা।
৯.
তোমার সঙ্গে কথা বলার জন্য কয়েক যুবক আমাকে শাসালে
ভয়ের পিরান পরে ঢুকে যাই গর্তে।
পড়ার টেবিলে মরে যাওয়া এক পোকাকে ঘিরে লাল পিঁপড়েদের
ভোজ উৎসবে কি মনে করে পোকাটিকে নাড়িয়ে দেই। মুহূর্তেই
ভেঙ্গে যাওয়া ভোজসভা থেকে হা হা করে ছুটে আসে পিঁপড়েরা,
শাসাতে থাকে। অতি সাহসী একজন কামড়ে দেয় হাতে। বিষের
তীব্র জ¦লুনি সয়েও কিছু বলিনি।
বাসা থেকে পড়ে যাওয়া এক শালিখ ছানাকে মায়ের কাছে
ফিরিয়ে দেবার মুহূর্তে কা কা করে উড়ে আসে অজস্র কাক।
ধারালো ঠোঁটের আঘাতে বিক্ষত আমি যন্ত্রণায় চেপে ধরি মাথা।
মানুষ, কাক, পিঁপড়ে কাউকেই কিছু বলিনি। বলবো না।
যেমন তোমাকে বলবো না, আদিগন্ত হলদু সর্ষে ফুলের মাঝে
ঘুরে বেড়ানো মৌমাছির কথা। মাটিতে আকাশের মিলে যাবার কথা।
১০.
মৃত্যুকে দূরে রেখে ছায়াকে আদর করি,
চুমো খাই।
তন্দ্রামগ্ন চোখ আচমকা দেখি
ছায়া-মৃত্যু একাকার, দুজনে দুজনার
জড়াজড়ি, হুটোপুটি।
আমি সরে যাই দূরে, অচেনা রাজপথে
পড়ে রয় শুধু খুনসুঁটি।
১১.
প্রহর চলে গেলে, চুপচাপ মহিষের ঘাড়ের চিহ্ন আাঁকা পথে
আগামীর সম্ভাবনায় ক্রমশ নম্র হয়ে আসে উৎসবমুখর পাখিরা।
১২.
মনে তো কতোজনই আছে, মনে পড়ে তুমুল বাক্যেচ্ছ্বাসে উড়ে যায়
দ্রুতগামী ইসকুল বেলা, স্মৃতির পাঠশালা, অনিঃশেষ সন্ধ্যা ও ছায়াকালে।
১৩.
এই ধুলো ওড়া, রুক্ষ, কাঁটাময় পথে প্রতিবিম্বের মতো তুমিও
ফুটে ওঠো অনন্ত সৌন্দর্র্যে।
তোমাতে আমাতে প্রভেদ, জাতকুলশীলে দ্বন্দ্ব, মুগ্ধতা জাগানিয়া বিষ্ময়।
দীর্ঘশ্বাস, আমাদের সরলরেখা অবস্থানে।
১৪.
ঝিরিঝিরি বাতাস আমার ভালোলাগে। ঝমঝম বৃষ্টি আমার ভালোলাগে। রোদেলা আকাশ আমার ভালোলাগে। পূর্ণিমারাত আমার ভালোলাগে। সবুজ পাতাদের আমার ভালোলাগে। শান্ত নদী আমার ভালোলাগে। শিউলি ফুলে ছেয়ে থাকা উঠোন আমার ভালোলাগে। বকুল, তোমাকে ভালোলাগে।
এইসব ভালোলাগাকে ভালোবাসতে বাসতে দেখি নোংরা ফুটপাতে, ডাস্টবিনের পাশে সূর্যমুখীর মতো ভাতের থালা হাতে এক শিশু বসে আছে সকল ভালোলাগা উপেক্ষা করে।
ছবি : বিধান দেব
গুচ্ছ কবিতা : উজ্জ্বল ঘোষ
অপূর্ব
অপূর্বর দিকে চেয়ে আছে অপূর্ব
বহুফসলি মাটির আলা নেই
বৃদ্ধের অশ্রু প'রে নেয় জমির খালি গা
অপেক্ষা করে থাকে চির সোমত্ত দোআঁশ
অপূর্ব চাকরি খোঁজে
অপূর্ব ঘুস দেয়
অপূর্ব ঠকে
অপূর্বর দিকে চেয়ে থাকে অপূর্ব
চন্দ্রশেখর
মাদুরে শুয়ে থাকে চন্দ্রশেখর
রেডিও শোনে
শুনতে শুনতে তার মনে হয়, সে-ও শুয়ে আছে
হাজার কৃষকের মাঠে রাস্তায়, ঠাণ্ডায় শীতে
ভাবে, সমর্থন নয়, সরকারের কাছে চেয়ে নেবে ন্যূনতম সম্মান মূল্য
যা সে পায়নি বাড়িতে, রাস্তায়, বাজারে
বৃদ্ধ স্বপ্নের দাবিতে ঘুম ভাঙে মিতার
সূর্য তখনও ওঠেনি
মিতা
পিতা হাল ছেড়ে দিয়েছে
হালে পানি পাচ্ছে না পুত্র
শুধু হাতা-খুন্তি ছাড়তে পারেনি মিতা
ওইতো ভাত ফোটে, রুটি ফোটে রাত্রিবেলা
মিতা হাল ধরে থাকে
মিতা মাটি হয়ে যায়
মাটি মিতা হয়ে চেয়ে থাকে আমাদের মুখ
ঋষি মিডিয়ার অভিশাপ
ঋষি মিডিয়ার অভিশাপে
সুরেরা পাথর হয়ে আছে সব।
ঘরে ঘরে জ্বলে আছে শুধু
ঋষির কল্পিত আলো।
কে যে তপস্যায় ব'সে
ঘটাবে শাপমোচন, ভাবছে মানুষ!
ছবি: বিধান দেব
কবিতা
সম্পাদকের কথা
দ্বিতীয় বর্ষ ।। অষ্টম সংখ্যা ।। মার্চ ২০২২ খুব অসহায় লাগছে এবার। আমাদের ডান পাশে ধস। বায়ে গিরিখাত। মাথায় বোমারু। পায়ে পায়ে হিমানীর ব...
-
চণ্ডী কথা ১ সুরথ সমাধি আখ্যান রাজ্যহারা রাজা সুরথ ঘুরতে ঘুরতে মেধামুনির আশ্রমে এলেন । ভাগ্যহারা বিষণ্ণ রাজা । কিন্তু ফেলে আসা রাজ্য ...
-
দোলায় আছে ছ'পণ কড়ি এক হেমন্তের গোধূলি আর সন্ধ্যার ভেতরে তেমন তো কোনও ফারাক থাকে না। ১৭ নভেম্বর ২০২০ হির্শবার্গের সন্ধ্যা আর কলকা...
-
শমীপোকা ও অর্জুনের বিষাদযোগ লাল, রেকসিনে বাঁধাই ছিল বইটা। ঠাকুরঘরে ঢুকে নকুলদানা খেলে কেউ কিছু বলত না, কিন্তু এই বইটায় হাত দেওয়া যাবে না...










